1 of 2

কলিকাতায় নবকুমার – ৩০

তিরিশ

সন্ধে পেরিয়ে গিয়েছে অনেকক্ষণ। সাবধানে হাঁটছিল নবকুমার। ট্রাম থেকে নেমে গলিতে ঢুকল নবকুমার। ঢুকে অবাক হল। শুনশান গলি। কোথাও গান বাজছে না। সাজুগুজু করা মেয়েদের কাউকেই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না দুপাশের বাড়ির দরজায়-দরজায়। অথচ এই রাস্তাই সন্ধের পরে তো বটেই, বিকেলেও মেলার চেহারা নেয়।

কিছু একটা হয়েছে। কী হতে পারে?

‘এ ভাই, এদিকে। জলদি, চলে এসো।’

বাঁ-দিকের একটা দরজা থেকে যে কথাগুলো বলল তাকে অন্ধকারে বুঝতে পারল না নবকুমার।

‘মার্ডার হয়ে গেছে। পুলিশ যাকে পারছে, তাকে ধরছে। জলদি চলে এসো।’

কীরকম শিরশির করে উঠল শরীর। আর তখনই ঝুপ করে আলো নিভে গেল রাস্তার। একটা চাপা চিৎকার ছড়িয়ে পড়ল বাড়িগুলোতে। সঙ্গে-সঙ্গে কেউ একজন দরজা বন্ধ করে দিল। এইসময় মোমবাতিটা চোখে পড়ল। যেন ভয়ে কাঁপছে তার আলো।

‘কী হয়েছে?’ নবকুমার আবার জিজ্ঞাসা করল। এখন সে বুঝতে পেরেছে, এটা একটা বাড়ির প্যাসেজ। সেখানে বেশ কয়েকজন নারীপুরুষ অন্ধকারে ওই মোমবাতির আলো সম্বল করে দাঁড়িয়ে আছে।

‘এই পাড়ার পুরোনো খদ্দের। সে খুন হয়ে গেছে। ধরতে পারেনি। পুলিশের সন্দেহ খুনিরা এখানেই লুকিয়ে আছে।’

আর একটি মেয়ে বলে উঠল, ‘যাদের ধরছে তারা খুনের মধ্যে ছিল না। আপনি আর একটু গেলে আপনাকেও ধরত।’

‘আমাকে, আমাকে আপনি চেনেন?’

‘হ্যাঁ।’ শব্দটা অনেকগুলো মেয়ের মুখ থেকে উচ্চারিত হল। একসঙ্গে।

পুরুষকণ্ঠ বলল, ‘কাল যাদের সঙ্গে আপনার মারপিট হয়েছিল, মানে যারা মেয়েদের হাতে ধোলাই খেয়েছিল, আপনি নাকি তাদের সঙ্গে আজ ভালোভাবে কথা বলেছেন। তাই এখানকার সবাই বলছে, আপনি লোকটা ভালো।’

মিনিটপাঁচেক বাদে বাইরে চিৎকার শোনা গেল। পুলিশ কাউকে ধরেছে এবং সে প্রতিবাদ করছে। এইসময় বাইরে বের হওয়া মানে ভ্যানে চেপে থানায় যাওয়া। বোকামি করার কোনও মানে হয় না।

.

রাত এগারোটা নাগাদ বাড়ি ফিরল নবকুমার।

এ-বাড়ির দরজাও ফাঁকা। অর্থাৎ খুনের জন্যে সবাই আতঙ্কে রয়েছে। সে সিঁড়ির দিকে এগোতেই মুক্তোর গলা কানে এল, ‘দরজাটা সাবধানে বন্ধ করে দাও’। বলেই এগিয়ে এল, ‘থাক, আমি দিচ্ছি, দয়া করে চুপচাপ নিজের ঘরে চলে যাও। জুতোয় শব্দ যেন না হয়। সাবধান।’ গলা নীচে নামল।

‘কেন?’

‘আ:। যা বলছি, তাই করো।’ চাপা গলায় ধমক দিল মুক্তো।

বাড়িটা আজ একদম ফাঁকা। সিঁড়ির গায়ে বা মুখেও কোনও মেয়ে দাঁড়িয়ে নেই। সবাই খদ্দের পেয়ে নিজের ঘরের দরজা দিয়েছে এমনটা কখনও দ্যাখেনি নবকুমার। নি:শব্দে নিজের ঘরে এসে জুতো খুলে খাটে বসতেই মুক্তো এল, ‘এত রাত হল কেন?’

‘কে নাকি খুন হয়েছে, তাই রাস্তা দিয়ে আসা যাচ্ছিল না—।’

‘হুঁ! এদিকে শেফালি-মা বারংবার জিজ্ঞাসা করায় মিথ্যে কথা বলতে হল। বললাম, তুমি বলে গেছ বাড়ি ফিরতে দেরি হবে। একটু আগে ডেকেছিল। বললাম, খেয়ে দেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছ। দয়া করে নি:শব্দে জামা ছেড়ে খেয়ে নাও।’

‘এই বাড়িতে কিছু হয়েছে?’

‘মন্দির, শ্মশান আর বেশ্যা বাড়ি, সবসময় কিছু-না-কিছু হয়। খাবার আনছি।’

আলোটা কম পাওয়ারের। খাওয়া শেষ হলে থালা গ্লাস তুলে নিতে-নিতে মুক্তো বলল, ‘দুগ্গার হাড় জুড়িয়েছে।’

‘মানে?’ চমকে উঠল নবকুমার।

‘মারা গিয়েছে। বাড়ির সব মেয়েমানুষ তাকে নিয়ে নিমতলায় গিয়েছে।’

‘সে কী!’

‘দুব্বারের দিদিরা এসে খবর দিয়েছিল। খবর শুনে একদল ছুটেছিল হাসপাতালে, আর একদল শ্মশানে। আমাকে এখন জেগে বসে থাকতে হবে কখন তারা মড়া পুড়িয়ে ফিরবে।’ মুক্তো দরজার দিকে পা বাড়াল।

‘দুর্গা মরে গেল। ও:।’

‘খুব কষ্ট হচ্ছে? তাকে দেখেছ তো একটি বার!’

‘তুমি বুঝবে না মুক্তোদি।’

‘হ্যাঁ। আমি তো কিছুই বুঝি না। দুগ্গা মরেছে। আজ না হয় কাল মরত। কিন্তু ওকে যে রোগ দিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল, তাকে যে গুন্ডা খুন করে গেছে তাতে আমি খুশি হয়েছি।’

‘তার মানে?’

‘ওফ! কিছুই বুঝতে পারো না, শুধু মানে-মানে করো।’ মুক্তো যেতে-যেতে বলে গেল, ‘শুয়ে পড়ো।’

রাত আড়াইটে পর্যন্ত জেগে ছিল নবকুমার। আড়াইটে সোনাগাছিতে তেমন ভারী রাত নয়। কিন্তু আজ চারধার নিস্তব্ধ। হঠাৎ দূরে একটা চিৎকার শোনা যেতে নবকুমার জানলায় গিয়ে দাঁড়াল। রাস্তা অন্ধকার। চিৎকারটা ভেসে আসছে। ওটা যে সম্মিলিত গলা থেকে ছিটকে ওঠা ধ্বনি তা বুঝতে সময় লাগল। গলাগুলো মেয়েদের।

তারপরেই ওদের দেখতে পেল নবকুমার। পনেরো কুড়িটা মেয়ে এই নির্জন নিস্তব্ধ অন্ধকারকে খান-খান করে এগিয়ে আসছে একটা ধ্বনির সাহায্যে, ‘বল হরি, হরি বোল।’

হঠাৎ বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠল নবকুমারের। এই নিশুতি রাতে কিছু মানুষ যেন ঈশ্বরীর মতো আকাশ থেকে নেমে এসে জানিয়ে দিচ্ছে, এখনও পৃথিবীতে ভালোবাসা আছে। অমৃতের জন্ম হয় বিষের যন্ত্রণা থেকে।

মুক্তো ওদের দরজা খুলে দিয়েছিল। দু-একজন কাঁদল। তারপর কথারা ডুবে গেল নিস্তব্ধতায়। এই বাড়িতে শরীর বিক্রি করে বাবা-মায়ের দেওয়া প্রাণটাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে যে মেয়েটা সংগ্রাম করে যাচ্ছিল এতকাল, সে আর পৃথিবীর কোথাও থাকবে না। এ-বাড়িটাও আগামীকাল ঠিকঠাক হয়ে যাবে। শুধু দুর্গা জানতে পারল না, তার জন্যে অনেকেই শ্মশানে গিয়েছিল। তার কথা মনে পড়তেই কারও বুক মুচড়ে কান্না উথলে উঠেছিল।

নবকুমারের মনে হল, এই কলিকাতায় বাঁচতে হলে শুধু মিথ্যে কথা বলতে পারাটাই শেষ কথা নয়। এই কলিকাতায় ভালোবাসাও আছে। শুধু যে জানে সেই জানতে পারে।

.

সকালে মাস্টারদা এসে বলল, ‘কী রে। আবার ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাচ্ছিস?’

‘তার মানে?’ শুয়েছিল নবকুমার, উঠে বসল।

‘গাঁয়ের চায়ের দোকানে বসে দিনভর গুলতানি মারতিস! চেহারাপত্তর ভালো বলে আমি তোকে তুলে নিয়ে এসে যাত্রায় ভিড়িয়ে দিলাম। আমার আগেই ভাবা উচিত ছিল। একে কলকাতা কর্পোরেশনের জল, তার ওপর সোনাগাছির কল, না হলে এত তাড়াতাড়ি আমাকে টুপি পরাতে না। খুব দু:খ পেয়েছি ভাই।’ মাস্টারদা বলল।

‘আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।’

‘পারছ না! কাল নিরুপমার বাড়িতে নেমন্তন্ন খেতে যাওনি?’

‘গিয়েছিলাম। উনি জোর করে নিয়ে গিয়েছিলেন।’

‘কেন? তোমাকেই খাওয়াল কেন?’ হাসল মাস্টারদা, ‘কারণ তুমি বড়বাবুর পেয়ারের মানুষ হয়ে গেছ! তাঁর সব গোপন কাজ তোমাকে দিয়ে তিনি করান। তাই তোমাকে হাতে রাখলে দলে কোনও বিপদ হবে না। তাই না?’

‘বড়বাবু আমাকে দিয়ে কোনও গোপন কাজ করাননি।’

মাস্টারদা ঠোঁট ছুঁচলো করে নবকুমারকে খানিকক্ষণ দেখল, ‘কী খাওয়াল?’

‘কে?’

‘আ:। নিরুপমাদি?’

‘দুটো সন্দেশ। আর শরবত।’

‘যা:। এখন তোমার কী হবে।’

‘মানে?’

‘খবরটা আজই গদিতে এলে সবাই জানতে পারবে। গড়াতে-গড়াতে সেটা বড়বাবুর কানে পৌঁছবে। মেয়েছেলে শিল্পীর বাড়িতে দলের কেউ যাক, তা বড়বাবু পছন্দ করেন না। দল থেকে চলে যেতে বলতে পারেন তোমাকে।’

‘আমার তো কোনও দোষ নেই।’

‘বিচার করবে কে?’

‘আমি যে ওই বাড়িতে গিয়েছিলাম, সে কথা কে বলল?’

বিড়ি ধরাল মাস্টারদা, ‘নিরুপমাদির বর। এক নম্বরের হারামি।’

‘সেকি! উনি এসে বলেছেন?’

‘হুঁ। তোমাকে ওই বাড়ি থেকে ফলো করে ট্রামে ওঠে। ভেবেছিল তুমি গদিতে নামবে। নামোনি। নেমেছ পরের স্টপে। নেমেই সোনাগাছিতে ঢুকে গেছ। ও ব্যাপারটা ভাবতে পারেনি। পেছন-পেছনে যেতে গিয়েও ফিরে আসে। সোনাগাছিতে নাকি কাল পুলিশ খুব হুজ্জতি করছিল। শেষে গদিতে যায়। কারণ, ও জানত তখন ওখানে আমি ছাড়া কেউ থাকবে না। আমি অবশ্য ওকে দেখেই বাইরে বেরিয়ে এসেছিলাম। তখন শুনলাম সব। তুমি যে সোনাগাছির মেয়েমানুষের কাছে রাত কাটাতে যাও, এই খবরটা ওকে বেশ উত্তেজিত করেছিল। কী হাসি-হাসি মুখে কথা বলছিল। আমি অবশ্য ওর ভুলটা ভাঙিয়ে দিইনি।’ মাস্টারদা হাসল।

‘সে কী?’

‘থাক না। যে যা ভেবে আনন্দ পায় তাকে তাই পেতে দাও।’ মাস্টারদা বলল, ‘কিন্তু খবরটা এখনও পর্যন্ত আমার কানেই ঢুকে আছে।’

‘এই যে বললেন গদিতে এলে সবাই জেনে যাবে!’

‘হ্যাঁ। আমি যদি মুখ খুলি, তাহলে?’

‘আপনি আমার ক্ষতি করবেন?’

‘একদম ইচ্ছে করছে না। তাই তো সকাল হতেই ছুটে এলাম।’

‘কিন্তু আমি তো কিছুই জানি না।’

‘নিরুপমাদি তোমাকে কিছু জিজ্ঞাসা করেনি?’

মাথা নাড়ল নবকুমার, ‘উনি নাকি শুনেছেন দলে একজন অভিনেত্রী আসছেন বাইরে থেকে যিনি মায়ের চরিত্রে অভিনয় করবেন। কথাটা শোনার পর ওঁর খুব ভয় করছে। বড়বাবু তাহলে আর ওঁকে দলে রাখবেন না। তাই জানতে চেয়েছিলেন, উনি ঠিক শুনেছেন কি না।’

‘তুমি কী বলছ?’

‘আমি মিথ্যে কথা বলেছি। বলেছি কিছুই জানি না।’

‘ঠিক বলেছ। আমরা আদার ব্যাপারি, জাহাজের খবর নিতে যাব কেন? কিন্তু ভাই, নিরুপমাদি কী করে জানল, তোমার কাছ থেকে ঠিক খবর পাওয়া যাবে?’

‘আমি জানি না।’

হঠাৎ গলা নামাল মাস্টারদা, ‘রাজি হয়েছেন?’

‘কে?’

‘শেফালি-মা?’

সঙ্গে-সঙ্গে মনে পড়ে গেল। কাল বড়বাবু তাকে নাটকের খাতাটা দিয়েছিলেন শেফালি-মাকে পৌঁছে দেওয়ার জন্যে। সেটা কোথায় গেল? নিরুপমাদির বাড়ি থেকে বেরিয়ে ট্রামে ওঠার সময়েও তার সঙ্গে ছিল। মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল।

‘কী? শেফালি-মা রাজি হয়েছেন?’

‘নাটকটা পড়ার পর বলবেন।’

‘অ। শেফালি-মাকে রাজি করানোর জন্যে বড়বাবু কত টাকা দেবেন?’

‘আমি জানি না।’

‘কিছু বলেনি?’

‘না।’

‘দেবে নিশ্চয়ই। শোনো, যা দেবে তার অর্ধেক আমার। আমি যদি তোমাকে না নিয়ে আসতাম তুমি কিছুই পেতে না। ঠিক কি না?’

‘হুঁ।’

‘শেফালি মাকে বলো না, তোমার জন্যে দশ হাজার চাইতে।’

‘দশ হাজার?’ চোখ কপালে উঠল নবকুমারের।

‘আরে দূর। উনি রাজি হলে এটা কোনও টাকাই না।’

‘না। আমি বলতে পারব না।’

‘কেন?’

‘উনি আমাকে খারাপ বলে ভাববেন।’

‘নবকুমার, জলে নেমে গা না ভিজিয়ে থাকলে আর যাই হোক স্নান করা হয় না। ঠিক আছে, যা পাবে তা ফিফটি-ফিফটি। মনে থাকে যেন। ততদিন আমি মুখ বন্ধ করে রাখব। কাকপক্ষীও টের পাবে না।’

মাস্টারদা চলে যেতে তড়াক করে উঠে গতকালের জামাপ্যান্ট দেখল সে। কোথাও নেই। টেবিলেও রাখেনি।

সে বাইরে বেরিয়ে আসতেই মুক্তোকে দেখতে গেল, ‘আচ্ছা, কাল রাত্রে আমার হাতে কোনও খাতা ছিল। প্যাকেট—?’

‘না। কোথায় ফেলে এসেছ! খুঁজে দ্যাখো।’ বলে মুক্তো চলে গেল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *