পঁয়ত্রিশ
বাইরে বেরিয়ে সমস্যায় পড়েছিল নবকুমার। বাস রাস্তা পর্যন্ত হেঁটে এসে সে বুঝতে পারছিল না কোনদিকে গেলে সোনাগাছিতে পৌঁছনো যাবে। দুজন লোক দাঁড়িয়েছিল। সে তাদের কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘ক’টা বাজে?’
লোকটা সেলফোনের ঘড়ি দেখে বলল, ‘সাড়ে ন’টা।’ বলে সঙ্গীর সঙ্গে কথা বলতে লাগল। সিঙ্গুর নিয়ে তর্ক চলল ওদের মধ্যে।
একটা বাস এল। প্রায় খালি। নবকুমার এগিয়ে গিয়ে কন্ডাক্টরকে জিজ্ঞাসা করল, ‘আচ্ছা, এই বাস কোথায় যাবে?’
‘আপনি কোথায় যাবেন?’
‘সোনাগাছি।’
‘অ্যাঁ। কী হারামি লোক রে। বলে সোনাগাছি যাব।’ বাসের লোক কন্ডাক্টরের কথায় দাঁত বের করে তাকাল। বাস চলে গেল।
সিঙ্গুর নিয়ে তর্ক থামিয়ে যে সময় বলেছিল, সে জিজ্ঞাসা করল, ‘অ্যাই! এটা কী হল? বাসে মেয়েছেলে বসে আছে দেখেও তুমি এই ইয়ার্কি মারলে?’
‘আমি তো ইয়ার্কি মারিনি।’
‘মানে?’
‘আমি গাড়িতে এখানে এসেছিলাম। কলিকাতায় নতুন। রাস্তাঘাট চিনি না। তাই বাসটা সোনাগাছির কাছে যাবে কি না জিজ্ঞাসা করেছি। আমি তো ওখানে থাকি।’
‘তুমি কলকাতায় সোনাগাছিতে থাকো? ইয়ার্কি? মেরে মুখ ভেঙে দেব।’
‘বিশ্বাস করুন। আমি ইয়ার্কি মারছি না।’
দ্বিতীয়জন বলল, ‘তা তুমি নতুন এসে আর কোনও জায়গা না চিনে ওই সোনাগাছি চিনলে কী করে?’
‘মাস্টারদা নিয়ে গিয়েছিল। আমি শেফালি-মায়ের বাড়িতে থাকি।’
‘শেফালি-মা?’ লোকটা তাকাল সঙ্গীর দিকে, ‘নন্দরানির মতো কেউ বোধহয়।’
‘না-না।’ প্রতিবাদ করল নবকুমার, ‘শেফালি-মা যাত্রার খুব নামকরা অভিনেত্রী ছিলেন। অনেকদিন অভিনয় ছেড়ে দিয়েছেন।’
দ্বিতীয়জন বলল, ‘শেফালি? আরে বাপ। বিরাট অভিনেত্রী ছিলেন। আমি ওর অ্যাক্টিং দেখেছি। তা তিনি এখন সোনাগাছিতে থাকেন? ভাবা যায় না।’
‘উনি বাড়ি থেকে বের হন না। কারও সঙ্গে মেশেন না।’
একটা বাস আসছিল। দ্বিতীয় লোকটা বলল, ‘এটায় উঠে পড়ো। কন্ডাক্টরকে সোনাগাছি বলবে না। বলবে, দর্জিপাড়ায় নামব। যাও।’
বাসে উঠে দাঁড়াতেই কন্ডাক্টর টিকিট চাইল। নবকুমার বলল, ‘দর্জিপাড়ায় যাব। কত ভাড়া?’
ভাড়া মিটিয়ে টিকিট নিয়ে পেছনের খালি সিটে বসল নবকুমার। রাতের নির্জন পথে বাস ছুটে চলেছে। দর্জিপাড়া জায়গাটা সোনাগাছি থেকে কতদূরে? যদি কন্ডাক্টর বলে এই জায়গাটাই দর্জিপাড়া তাহলে মেনে নিয়ে নেমে যেতে হবে। কীরকম অসহায় লাগছিল নিজেকে। সে মাথা নাড়ল, না, কন্ডাক্টর তাকে ভুল জায়গায় নামাবে না। তবে দর্জিপাড়াটা যদি সোনাগাছির কাছাকাছি না হয় তাহলেই ঝাামেলায় পড়তে হবে।
আজ সন্ধেয় ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো মনে করার চেষ্টা করল নবকুমার। বড়বাবুকে বুঝতে কোনও অসুবিধে হয় না তার। তিনি যা বলেন তা মুখের ওপর বলতে পছন্দ করেন। নিশ্চয়ই বড়বাবু তার ভালো চাইছেন, কিন্তু সে যোগ্য কি না তা বুঝতে পারছেন না। বরং এই ভদ্রমহিলার কথা শেষ পর্যন্ত তার ভালো লেগেছে। কিন্তু বড়বাবু একবারও পরিচয় করিয়ে দেননি। এই ভদ্রমহিলা কে? দারুণ সুন্দরী। সাজগোজ দেখে মনে হয় সিনেমার অভিনেত্রী। কিন্তু ওরকম দেখতে কোনও নায়িকাকে তার মনে পড়েনি। বড়বাবু হুকুম করেছেন আর উনি তাকে সাহায্য করতে চাইছেন। মাস্টারদা বলল, প্রাোডিউসার। সিনেমায় টাকা ঢালেন। হঠাৎ মনে হল, কী এমন ক্ষতি হবে? অভিনয় করতে না পারলে ওরা বাদ দিয়ে দেবে। তখন তার অবস্থা এখনকার মতো থাকবে। আর অভিনয়ে কোনওমতে উতরে গেলে সে বলবে, বড়বাবু আপনার হুকুম আমি পালন করলাম, এবার আমাকে রেহাই দিন। ব্যস।
‘দর্জিপাড়ার বাঁ-দিকে না ডানদিকে?’
পাশ থেকে প্রশ্ন ভেসে এল। নবকুমার দেখল লোকটাকে। এইসময় বাসের বেশিরভাগ যাত্রী চোখ বন্ধ করে ঢুলছে। এই লোকটিও ঢুলছিল।
আগে হলে নবকুমার বলত কোনদিকে যাবে সে জানে না। নামার পর লোকজনকে জিজ্ঞাসা করে দিক ঠিক করবে। কিন্তু এই কয়েক দিনে সে বুঝে গেছে সবকথা খোলাখুলি অজানা মানুষকে বলা ঠিক নয়।
উলটে নবকুমার জিজ্ঞাসা করল, ‘কেন বলুন তো?’
‘আমি ডানদিকে থাকি। সেখানে আপনাকে কখনও দেখিনি।’
‘আমিও আপনাকে আগে দেখিনি।’ নবকুমার বিরক্ত হচ্ছিল।
‘আসলে এত রাতে বাসে উঠে জিজ্ঞাসা করলেন দর্জিপাড়ার ভাড়া কত, তাই মনে হল আপনি নতুন লোক, ওদিকে প্রথম যাচ্ছেন। নতুন লোকরা এত রাতে দর্জিপাড়ার বাঁ-দিকে যায়।’ বলে হাসতে লাগল লোকটা।
‘কেন?’
‘রেডলাইট এরিয়া। ফূর্তি করার জায়গা।’ লোকটা চোখ টিপল।
নবকুমার মুখ ঘুরিয়ে নিল। রেডলাইট এরিয়া মানে সোনাগাছি। তাহলে ঠিক বাসে উঠেছে সে। কিন্তু সোনাগাছি শব্দটা উচ্চারণ না করেও লোকটা যেভাবে হাসল, তাতে একটা গা ঘিনঘিনে ভাব ছিল। সে ওই জায়গায় থাকে জানলে যে-কোনও সাধারণ মানুষ অন্য চোখে দেখবে। অথচ সে কী করে বোঝাবে ওখানে থাকতে তার বিন্দুমাত্র অসুবিধে হচ্ছে না। যদি সোনাগাছি একটা নর্দমার নাম হয় তাহলে তার গায়ে কোনও নোংরা জল ছিটকে লাগছে না। তবু, ভদ্রমহিলা ঠিকই বলেছেন, তার উচিত ওই জায়গা ছেড়ে চলে যাওয়া। কিন্তু কোথায় যাবে?’
কন্ডাক্টর দর্জিপাড়া বলে হাঁক দিতেই নবকুমারের সঙ্গে পাশের লোকটাও উঠে দাঁড়াল। বাস থেকে নেমে নবকুমার দেখল একটা চওড়া রাস্তা যার ফুটপাত শুনশান। বাস চলে গেলে সে দেখল, লোকটা হনহন করে রাস্তা পেরিয়ে একটা গলিতে ঢুকে যাচ্ছে। এতক্ষণে রাস্তাটাকে চিনতে পারল। শেফালি-মায়ের সঙ্গে থানায় যাওয়ার সময় এই রাস্তায় এসেছিল ট্যাক্সিটা। একটা পুলিশের ভ্যান দাঁড়িয়ে আছে ফুটপাথ ঘেঁষে। কোন গলি দিয়ে ভেতরে ঢুকবে ঠাওর করছিল নবকুমার।
একটা বাস এসে স্টপেজে দাঁড়াল। বাস থেকে একজন ভদ্রলোক, ভদ্রমহিলা দুটো বাচ্চা নেমে দ্বিতীয় গলির দিকে হাঁটতে লাগল। ভদ্রমহিলা মাথায় ঘোমটা তুলে দিলেন। বাচ্চা দুটো বাবার হাত ধরে হাঁটছে। এদের দেখে নবকুমারের মনে হল নিশ্চয়ই পথ ভুল করেছে। এইরকম চেহারার পরিবার সোনাগাছিতে থাকবে কেন? সে কৌতূহলী হয়ে ওদের পেছন-পেছন হাঁটছিল। একটু বাদেই সেই পরিচিত দৃশ্য চোখে পড়ল। সেজেগুজে মেয়েরা দাঁড়িয়ে আছে দরজায়-দরজায়। গান বাজছে। ‘বেলফুল’ চিৎকার করে বলে গেল ফুলওয়ালা। এসব উপেক্ষা করে পরিবারটি রাস্তার পাশের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে একটা দরজায় কড়া নাড়ল বেশ জোরে। ভেতর থেকে কেউ জানতে চাইলে ভদ্রলোক বললেন, ‘দরজা খোলো। আমরা।’
দরজা খুলে গেল। চারজন ভেতরে চলে গেলে সেটা আবার বন্ধ হল। তখনই চোখে পড়ল নবকুমারের। দরজার ওপর একটা বোর্ডে লেখা রয়েছে, ‘গৃহস্থের বাড়ি, দয়া করে দরজায় শব্দ করবেন না।’
নবকুমার হতভম্ব হয়ে গেল। একটি ভদ্র পরিবার সোনাগাছির এই নোংরা পরিবেশে নিজেদের বাঁচিয়ে কী করে থাকছে? ভদ্রলোক নিশ্চয়ই চাকরি বা ব্যাবসা করেন। সেখানে নিজের ঠিকানা বলার সময় কী বলেন?
‘এই যে গুরু! কী দেখছ?’
মুখ ঘুরিয়ে নবকুমার হাসল, ‘কী খবর?’
যে ছেলেটার সঙ্গে মারপিট হয়েছিল, পরে ভাব হওয়ার পর যে তাকে খাইয়েছিল, সে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।
‘আমার জব্বর খবর আছে। কিন্তু তুমি ওখানে দাঁড়িয়ে কী দেখছ?’
‘ওই দরজার লেখাটা পড়ছিলাম।’ নবকুমার দেখাল।
‘ও, ব্যানার্জিবাবু। বহুদিনের ভাড়াটে। ওঁর বাবাও এখানে ভাড়ায় ছিলেন। বাড়িওয়ালি কত চেষ্টা করেছে তুলে দিতে, কিন্তু পারেনি।’ ছেলেটা বলল।
‘উনি ফ্যামিলি নিয়ে এখানে আছেন কেন?’
‘তিরিশ টাকা ভাড়াতে আড়াইখানা ঘর কোথায় পাবেন? কার্তিক পুজোর সময় আমাদের একটা বিজ্ঞাপন এনে দেন। যাক গে, আজ জব্বর খেল হল।’
‘কীরকম?’
‘তার আগে বলো, তুমি মাল খাও?’
‘না।’
‘যা: শালা। আমি আজ সন্ধে থেকে পাঁইট খেয়ে ফেলেছি, আনন্দে।’
‘কেন?’
‘মাল্লু পেয়েছি। পাঁচ হাজার। ভাগাভাগির পর দুই আমার পকেটে এসেছে। দিনটা আজ খুব ভালো গেল।’
‘তাই?’
‘আরে তোমায় বলেছিলাম না, বড়লোকের বউ লাভার নিয়ে এখানে ফূর্তি করতে আসে। ধরব বলেছিলাম, আজ ধরেছি।’
‘এখানে?’
‘না। মোড়ের মাথায়। বললাম, দিদিভাই, এটি আপনার কে হয়? কী বলল জানো!’ হা-হা করে হাসল ছেলেটা, ‘যাকে ভাই বলল সে শালা ট্যাক্সির মধ্যে নেংটি ইঁদুরের মতো বসেছিল ভয়ে। বললাম, ‘আপনি মাইরি খুব হারামি মেয়েছেলে নইলে ভাইকে নিয়ে সোনাগাছিতে আসেন মজা মারতে। তা চলুন, আপনার বাড়িতে গিয়ে দেখি সবাই এই মালকে আপনার ভাই বলে কি না। তাতেই কাজ হয়ে গেল, ছেলেটাই প্রথম কেঁদে ফেলল। হাতজোড় করে বলল, আর আসব না। আমাকে মাপ করে দিন। মেয়েছেলেটা প্রথমে ভাঙছিল না। যখন বললাম, আপনার স্বামী জাহাজে কাজ করে, সল্টলেকে থাকেন। পয়সার তো অভাব নেই, তাহলে ফাইভস্টারে না গিয়ে সোনাগাছিতে আসছেন কেন? তখন ভাঙল। দুজনে মিলে পাঁচহাজার গুণে হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, আর হবে না ভাই। তখন ট্যাক্সিটা ছেড়ে দিলাম। এরকম আরও কয়েকটা পার্টি আছে। সবক’টাকে চটকাব। দিল খুশ হয়ে গেছে আজ। তুমি তো মাল খাবে না। চলো মিত্র কাফেতে গিয়ে চিকেন কবিরাজি খেয়ে আসি। জব্বর করে।’
‘আজ থাক। আমার শরীরটা ভালো নেই।’
‘অ। দু-নম্বরের কামাই বলে অ্যাভয়েড করছ না তো।’
‘দূর। কিছুই ভাবছি না। চলি।’ নবকুমার পা বাড়াতে ছেলেটা আবার ডাকল, ‘গুরু! তুমি কি খবরটা পেয়েছ?’
‘কী খবর?’
‘প্রীতি জিন্টা বাড়িতে ফিরে এসেছে।’
‘প্রীতি জিন্টা? সে তো সিনেমা করে।’
হাসল ছেলেটা। ‘যা: শালা! সে নয়, এখানকার কাস্টমারদের হিরোইনদের নাম বলে নিজেকে চালায়। কিন্তু বাড়ি ফেরার পর কাস্টমার নিচ্ছে না। বলছে, শরীর খুব দুর্বল। দুব্বারের দিদিরা বলেছে, একমাস রেস্ট নিতে। আরে, যাকে তুমি পক্স হয়েছে বলে দুব্বারকে খবর দিয়েছিলে।’
ইতির মুখ মনে পড়ল নবকুমারের। মেয়েটা সুস্থ হয়ে ফিরে এসেছে শুনে ভালো লাগল। ছেলেটা কাছে এগিয়ে এল, ‘তুমি যদি চাও ওর সঙ্গে দেখা করতে পার। তুমি গেলে বোধহয় খুশি হবে।’
‘ভাবছি।’ নবকুমার আর দাঁড়াল না।
.
মুক্তো বলল, ‘মা খুব রাগ করেছে। খায়নি। বলেছে, তুমি বাড়িতে না ফেরা পর্যন্ত জেগে থাকবে। যাও, গিয়ে ক্ষমা চাও।’
আড়ষ্ট হল নবকুমার। শেফালি-মায়ের ঘরের দরজায় শব্দ করল সে।
শেফালি-মায়ের গলা ভেসে এল, ‘কে?’
‘আমি। নবকুমার।’
‘ভেতরে এসো।’
ভেতরে ঢুকে নবকুমার দেখল শেফালি-মা বিছানায় বসে আছেন। তার সামনে বড়বাবুর দেওয়া খাতাটা খোলা।
‘তোমার আজকাল এত রাত হচ্ছে কেন নবকুমার?’
‘বড়বাবু একটা জায়গায় নিয়ে গিয়েছিলেন। বাসে ফিরতে হল।’
‘দেরি হচ্ছে বুঝলে ফোন করে দেবে। আমার টেনশন হয়। ও হ্যাঁ, এই পালা পড়লাম। খারাপ নয়। কাল সকাল ন’টায় বড়বাবুর সঙ্গে ফ্লুরিস রেস্টুরেন্টে কথা বলতে যাব। তুমিও সঙ্গে যাবে।’
‘আমি?’
‘হ্যাঁ। আমি একা ওঁর সঙ্গে কথা বলতে যাব না। যাও, খেয়ে নাও।’
হঠাৎ স্থির হয়ে গেল নবকুমার। শেফালি-মা তাকে এতটা ভালোবাসেন অথচ সে ওঁর কাছে কথাটা গোপন করে যাচ্ছে। সোনাগাছি ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবছে। খুব অন্যায় করছে সে।
‘কিছু বলবে?’
‘আপনি সোনাগাছির বাইরে অন্য কোথাও গিয়ে থাকবেন?’
‘হঠাৎ?’ শেফালি-মা তাকালেন।
‘এখানে আপনাকে মানায় না।’
শেফালি-মা হাসলেন, ‘তুমি যখন বলছ, তখন নিশ্চয়ই ভেবে দেখব। তবে সোনাগাছি তো আর এখন একটু জায়গাতে সীমাবদ্ধ নয়। সেটাই হয়েছে মুশকিল। যাও, খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ো। কাল কথা বলব।’
