পাঁচ
‘কথা দিয়ে যে কথা রাখে না তার কাছ থেকে কেন নেব?’ হাসল পঁয়ত্রিশ।
ধন্দে পড়ল নবকুমার। তার মাথায় এল না কোন কথা দিয়ে সে রাখেনি। সেটা বুঝতে পেরে পঁয়ত্রিশ বলল, ‘আমাকে আপনি বলতে নিষেধ করেছিলাম।’
‘ও।’ নবকুমার লজ্জা পেল, ‘আপনি আমার থেকে অনেক বড়।’
‘বড়? তোমার থেকে এমন কেউ বড় নেই যাকে তুমি বলো?’
সঙ্গে-সঙ্গে মায়ের মুখ মনে পড়ে যাওয়ায় মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল নবকুমার।
‘তাহলে?’ পঁয়ত্রিশ হাসল, ‘আর এমন কী আর বড়!’
‘বেশ। নাও।’
মুড়ির ঠোঙা নিল পঁয়ত্রিশ। ‘এই তো, লক্ষ্মী ছেলে।’
‘টাকা দুটো!’
‘ওটাও নিতে হবে? বেশ দাও।’
কয়েক পা হেঁটেই দাঁড়িয়ে গেল পঁয়ত্রিশ, ‘আচ্ছা, তুমি কী?’
‘কেন?’
‘এই যে আমার সঙ্গে কথা বলছ, মুড়ির ব্যবস্থা করে দিলে, কেউ যদি এসে তোমাকে জিজ্ঞাসা করে ওর নাম কী, জবাব দিতে পারবে?’ ঠোট কামড়ালো পঁয়ত্রিশ।
‘তাই তো!’
‘আমার নাম মন্দিরা।’
মাথা নাড়ল নবকুমার। মন্দিরা বলল, ‘চলো, এবার তোমার দাবি মেটাই।’ প্রথমে ঠাওর করতে পারিনি। কামরায় ওঠার পর মন্দিরা বলল, ‘দ্যাখো, কাকে ধরে নিয়ে এসেছি। ওর জন্যেই মুড়ি কিনতে পারলাম।’
বৃদ্ধা বললেন, ‘তাই? আমি ভাবলাম বলা নেই, কওয়া নেই, ছেলে হুট করে বাস ধরতে চলে গেল। বসো-বসো।’
পঞ্চাশের কাঁধে মুখ গুঁজে বসেছিল পনেরো। কথাগুলো কানে গিয়েছে, ধীরে-ধীরে সোজা হল। তার চোখে বিস্ময়, মুখে হাসি ফুটল। পঞ্চাশকে এই প্রথম কথা বলতে শুনল নবকুমার, ‘বাব্বা। এতক্ষণে যেন এর ধড়ে প্রাণ এল।’
কথাটা উপেক্ষা করে মন্দিরা বলল, ‘ওকে একটু সরষের তেল দিতে হবে, কীসে দেওয়া যায়? প্ল্যাটফর্মে সরষের তেল খুঁজে বেড়াচ্ছিল।’
এবার মনে পড়ল নবকুমারের। সঙ্কুচিত হল।
বৃদ্ধা তার ঝুলি থেকে একটা ছোট্ট শিশি বের করে, বড় বোতল থেকে সামান্য তেল তাতে ঢেলে এগিয়ে দিলেন, ‘নাও। এতে হবে তো?’
‘হ্যাঁ। হ্যাঁ। বেশি হয়ে যাবে।’
‘হোক।’
নবকুমার বলল, ‘তাহলে চলি!’
বৃদ্ধা বললেন, ‘ওমা! কোথায় যাবে? এখানেই তো অনেক জায়গা।’
মন্দিরা, ‘না। বারণ করো না। ওদিকের এক কামরায় ওর গুরুদেব বসে আছেন। তাকে ছেড়ে ও এখানে থাকে কী করে? এক কাজ করো, মুড়ি খেয়ে গুরুদেবকে নিয়ে এখানেই চলে এসো।’
বৃদ্ধা বললেন, ‘মুড়ি খাবে বলে তেল নিলে? তাহলে একটা পেঁয়াজ আর দুটো লঙ্কা নিয়ে যাও। স্বাদ বাড়বে।’
অম্লান বদনে সেগুলো নিয়ে নবকুমার ফিরে এল মাস্টারদার কামরায়। মাস্টারদা তখন চোখ বন্ধ করে বিড়ি খাচ্ছিল। চোখ খুলে চমকে উঠল, ‘আরে, তুমি ম্যাজিক জানো?’
.
ট্রেন ছাড়ল বিকেল চারটের একটু আগে। প্রথম দিকে তার চাকা খুব দ্রুত ঘুরতে লাগল। সেই দুপুরবেলা মুড়ি তেল পেঁয়াজ লঙ্কা দিয়ে খেয়ে মাস্টারদা চোখ বন্ধ করেছিল এখনও খাবার ইচ্ছে নেই। নবকুমারের সাহস হয়নি কামরা পালটানোর। নদী যে ঘাট ছুঁয়ে বয়ে যায় সেখানে আর ফিরে যায় না শোনার পরে আর কোন মুখে বলবে। কিন্তু মাস্টারদাও জানতে চায়নি কোত্থেকে সে তেল পেঁয়াজ লঙ্কা জোগাড় করল।
সন্ধের মুখে মাস্টারদার ঘুম ভাঙল, ‘কোথায় এলাম?’
‘ডানকুনি ছেড়ে গিয়েছে।’
‘ও বাব্বা। এসেই গেছি। তুমি ঘুমাওনি?’
‘না। দেখতে ভালো লাগছিল।’
‘অ। দেখা ভালো। যা দেখবে তা মনে রেখে দেবে।’ দু-হাত ওপরে তুলে শরীর মোচরালো মাস্টারদা, ‘আবার খিদে পেয়ে গেছে।’
‘মুড়ি তো শেষ।’
‘ধ্যাৎ, এখন মুড়ি খেতে কে চাইছে।’ মাস্টারদা বলল, ‘ওদের কাছে খাবার নেই?’
‘কাদের কাছে?’
‘আহ। ন্যাকামো করো না। যাদের কাছ থেকে নিয়ে এলে!’
‘ও।’ ট্রেনটা একটা ছোট্ট স্টেশনে দাঁড়াতেই নবকুমার দ্রুত নেমে পড়ল। কয়েকটা কামরা পেরিয়ে যেই সে ওপরে উঠেছে তখনি ট্রেন ছেড়ে দিল। তার মুখ থেকে ‘যা’ শব্দটি বেশ জোরে বেরিয়ে আসতেই সামনের লোকটি জিজ্ঞাসা করল, ‘কী হয়েছে?’
‘আমার স্যুটকেস ওখানে ফেলে এসেছি।’
‘হয়ে গেল! এ জিন্দেগীতে আর ওর দেখা পাবে না।’
সেটা মনে হতেই মাস্টারদার কথা ভেবে একটু স্বস্তি পেল নবকুমার। মাস্টারদা নিশ্চয়ই বেশ খেয়াল রাখবে তার স্যুটকেসটাকে।
‘একী। তুমি?’
চমকে মুখ ফেরাতে ছুটকিকে দেখতে পেল নবকুমার। দরজার পাশের বাথরুম থেকে বেরিয়েছে। কামরায় যথেষ্ট ভিড় থাকায় মন্দিরাদের দল আড়ালে পড়েছে।
‘সেই তেল নিয়ে চলে গেলে তো গেলেই।’
‘কী করব! মাস্টারদাকে ফেলে আসব কী করে?’
‘হুম। তোমাকে একটা কথা বলি।’ ছুটকি আগে পাশের লোকজনের দিকে দ্রুত দৃষ্টি বুলিয়ে বলল, ‘এদিকে সরে এসো।’
নবকুমার কোণের দিকে সরে গেল। ভিখিরি গোছের কয়েকজন সেখানে মেঝের ওপর বসে ঢুলছে। চাপা গলায় ছুটকি বলল, ‘আমি চাই না তুমি মাসির সঙ্গে বেশি কথা বলো। মনে থাকবে?’
‘মাসি?’
‘আ:! যে তোমাকে নিয়ে এসে তেল দিল।’
‘কেন?’
‘ওর স্বভাব ভালো নয়। বিয়ের আগে ছেলে দেখলেই গলে যেত!’
‘বিয়ে হয়ে গিয়েছে?’
‘হয়েছিল। লোকটা ছিল আরও খারাপ। বিয়ে টেঁকেনি।’
‘ইস!’
‘ইস মানে? দরদ উথলে উঠলে যে! খবরদার, আমি তাহলে আত্মহত্যা করব।’
‘আশ্চর্য। তুমি খামোকা আত্মহত্যা করবে কেন?’ নবকুমার অবাক হল।
‘খামোকা? তুমি খামোকা বলছ? কাল রাত্রে পাকা কথা হয়ে যায়নি?’
‘ও।’
‘তারপরে কী করে খামোকা বলছ?’
‘আশ্চর্য! উনি আমার থেকে বয়সে অনেক বড়!’
‘বড়! হাসালে। কত লোকের বউ তাদের থেকে বয়সে বড় হয়। আমি তো শুনেছি মহাত্মা গান্ধীর বউয়ের বয়স বেশি ছিল।’
‘আমি শুনিনি।’
‘তুমি তো হাঁদা গঙ্গারাম। শোনো, সামনের রবিবার বিকেল পাঁচটার সময় সোজা বেলগাছিয়া চলে আসবে। না। আমাদের বাড়িতে নয়। আমাদের পাড়ায় পরেশনাথের মন্দির আছে। সেখানে ঢুকে দেখবে সুন্দর বাগান। সেখানে আমি তোমার সঙ্গে দেখা করব। মনে থাকবে?’ ছুটকি আড়চোখে তাকাল।
‘পরেশনাথের মন্দির! আমি তো চিনি না।’
‘লোকজনদের জিজ্ঞাসা করলেই বলে দেবে।’
‘তোমাদের বাড়িতে যাব না?’
‘কী দরকার। ওদের সঙ্গে পথে আলাপ, পথেই রেখে দাও।’
নবকুমার হেসে ফেলল। মাস্টারদার সঙ্গে ছুটকির কথার কিছু মিল আছে। কিন্তু ছুটকির সঙ্গেও তো পথেই আলাপ।’
‘হাসছ যে।’
‘তোমার ভয় দেখে!’
‘অ। ভয় তো পাবই। মেয়েদের বড় শত্রু মেয়েরাই। সে মাসিই হোক আর দিদিই হোক।’ ছুটকি তার দলের দিকে এগিয়ে যেতে নবকুমার অনুসরণ করল। তাকে দেখে হইচই করে উঠলেন বৃদ্ধা, মন্দিরাও। এতক্ষণ কেন সে অন্য কামরায় ছিল তাই নিয়ে প্রশ্নের জবাবদিহি দিতে হল।
বৃদ্ধ জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কিছু পেটে পড়েছে তো?’
হঠাৎই মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল নবকুমার।
বৃদ্ধা বললেন, ‘আমাদের বাড়ির খাবার যা বেঁচে ছিল তা টকে যাচ্ছে দেখে ভিখিরিদের দিয়ে দিলাম।’
‘না-না। আমি পেট ভরে খেয়েছি।’ নবকুমার স্বচ্ছন্দে মিথ্যা কথা বলল। মিথ্যা বলতে এত সুখ সে আগে জানত না।
বৃদ্ধ বললেন, ‘এবার বাড়ি গিয়ে গরম ভাতে ভাত খাব। আজ ওদের বেশি রান্না করতে বারণ করলাম।’
বৃদ্ধা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমার থাকার জায়গা চিৎপুরে, খাওয়ার জায়গা ঠিক আছে তো বাবা?’
‘ঠিক না থাকলেও হয়ে যাবে।’
‘কী বলব। বেলগাছিয়ায় যদি যেতে তাহলে বলতাম দুটো খেয়ে যেও।’
হঠাৎ খুব ভালো লাগল নবকুমারের।
অল্প কিছুদিনের মধ্যে দেখা করবে কথা দিয়ে পরের স্টেশনে গাড়ি থামতেই সে নীচে নেমে এল। এই বৃদ্ধ-বৃদ্ধার তো কোনও স্বার্থ নেই। অথচ ওঁদের মনে কী অপরিসীম স্নেহ! এইসব মানুষের কথা সে গ্রামে বসে থাকলে কখনই জানতে পারত না। ছুটকিটা পাগল। কিন্তু এই পাগলামির কথাও অজানা থেকে যেত গ্রাম ছেড়ে না এলে। ঈশ্বর জানেন, তার জন্যে এখন কত বিস্ময় অপেক্ষা করে রয়েছে।
