1 of 2

কলিকাতায় নবকুমার – ১৫

পনেরো

আচমকা ঘুম ভেঙে গেল নবকুমারের। কেউ চিৎকার করে কাঁদছে। মাঝে-মাঝে সেটা গোঙানিতে বদলে যাচ্ছে। তার পরেই, ‘ওরে মা-রে, ওরে বাবারে, মরে গেলাম, উ:।’

বিছানায় উঠে বসল সে। এখন নিশ্চয়ই গভীর রাত। জানলার পাশে এসে সে দেখল, সামনের রাস্তাটা শুনশান। আলো নিভে গেছে। কীরকম ঘুমঘুম ভাব চারপাশ। অথচ কান্নাটা হয়েই চলেছে। এই সময় আর-একটি বয়স্কা গলা কানে এল। কথাগুলো স্পষ্ট নয়। কিন্তু যে কাঁদছে তাকে ধমকাচ্ছে। নবকুমার বুঝতে পারল, কান্নাটা এই বাড়ির ভেতর থেকেই ভেসে আসছে। খুব যন্ত্রণা না পেলে কেউ এভাবে কাঁদে না।

নবকুমার আর সহ্য করতে পারছিল না। ক্রমাগত কান্না কানে এলে ঘুম হবে না। সে দরজা খুলল। প্যাসেজে আলো জ্বলছে। ধীরে-ধীরে শেফালি-মায়ের দরজা পেরিয়ে সে শেষপর্যন্ত সিঁড়ির কাছে চলে এল। কান্নার শব্দ এবার জোরাল হয়েছে। সে বুঝতে পারল নীচের কোনও ঘর থেকে আওয়াজটা আসছে। এবার বয়স্কার গলা শুনতে পেল, ‘এখন চিৎকার করে পাড়া জানিয়ে কী হবে? দাঁতে দাঁত চাপ। পইপই করে বলি খদ্দের চাইলেই বিপদ ডেকে আনবি না। শুনিসনি কথা, এখন মর।’

‘ও মাসি, যন্ত্রণা হচ্ছে গো, জ্বলে যাচ্ছে, ও:, আমি কী করব?’

‘এখন কিছু করার নেই। সকাল হোক, তারপর ডাক্তারের কাছে যাস। তোর কাছে কত টাকা আছে? ডাক্তারকে টাকা দিতে পারবি তো?’

‘আমি জানি না। কিছু জানি না।’

নবকুমার বুঝল, তার পেছনে কেউ এসে দাঁড়িয়েছে। সে মুখ ফেরাতেই মুক্তো বলল, ‘এখানে কী করছ? তোমার তো এখানে আসার কথা নয়। শেফালি-মা শুনলে খুব রাগ করবে। যাও, ঘরে যাও।’

নবকুমার বাধ্য হল ঘরের দিকে ফিরতে, ‘চিৎকার কানে এল। তাই—।’

‘এসব এখানে প্রায়ই হয়। যেচে রোগ নেয় মেয়েগুলো। খদ্দের যেই একটু বেশি দিল অমনি নোলা বাড়ল, নিজের যে বিপদ হতে পারে তা ভুলে গেল। কালই শেফালি-মাকে বলব ওটাকে দূর করে দিতে।’ মুক্তো বলল।

‘ওর কি কোনও যাওয়ার জায়গা আছে?’

‘না থাক। হাসপাতালে যাক, রাস্তায় মরুক। ওর জন্যে রাত্রের ঘুম চলে যাবে আমাদের? মনে হচ্ছে তোমার মনে দয়া জেগেছে?’

নবকুমার কোনও কথা না বলে ঘরে ঢুকে গেল।

একটু পরেই মুক্তোর চিৎকার শুনতে পেল, ‘মতির মা, ওকে বল চুপ করতে। শেফালি-মায়ের ঘুম ভেঙে গেলে এই রাত্রেই বেরিয়ে যেতে হবে।’

সঙ্গে-সঙ্গে চিৎকারটা নীচুতে নেমে গেল।

ঘুম আসছিল না নবকুমারের। শেফালি-মা ঠিকই বলেছেন, এরা কেউ সুখে নেই। যতই ফস্টিনস্টি করুক, গান গাক, প্রতিটি দিন এরা শরীরে বিষ নিচ্ছে কয়েকটা টাকার বিনিময়ে। যারা বিষ দিয়ে যাচ্ছে, তারা তো ভদ্রপাড়ায় থাকে। সেখানকার প্রতিবেশীরা জানেই না লোকটার শরীরে বিষ আছে। একে তাড়িয়ে দেওয়ার আগে সেই লোকটাকে খুঁজে বের করে শাস্তি দেওয়া উচিত।

.

একটু বেলায় ঘুম ভাঙল নবকুমারের। ঘুম ভাঙাল মাস্টারদা। বেশ জোরেই বলল, ‘কাল বিকেলে বেলগাছিয়ায় যাব বলে হাওয়া হয়ে গেলে, রাতে ফিরতে পারলে কি না তার খবর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করলে না। চব্বিশ ঘণ্টায় এখানকার জল পেটে পড়ে গেল? শুনলাম রাত হওয়ার পর বাড়ি ফিরেছ?’

‘তেমন রাত নয়। এখানে যে সন্ধের পরেই চেহারা বদলে যায় আমি জানতাম না। তা ছাড়া, তখন যাত্রাদলের দরজা বন্ধ ছিল।’ নবকুমার বলল।

‘দুশ্চিন্তা হয়, বুঝলে? তোমার বাবা মা নিশ্চয়ই এতদিনে রতনের কাছ থেকে জেনে গেছে যে তুমি আমার সঙ্গে এসেছ। কিছু হলে তারা আমাকেই ধরবে। বাড়িতে চিঠি দিয়েছ?’

‘না।’

‘বা:। চমৎকার!’ পকেট থেকে একটা পোস্টকার্ড বের করে সামনে রাখলেন মাস্টারদা, ‘এখনই লেখো, যাওয়ার সময় পোস্ট করে দেব।’

তখনও মুখ ধোওয়া হয়নি। মাস্টারদার এগিয়ে ধরা কলম নিয়ে নবকুমার লিখল, ‘শ্রীচরণেকমলেষু বাবা, আমি ভালোভাবে কলিকাতায় পৌঁছাইয়াছি। মাস্টারদার চেষ্টায় একটি চাকুরিও হইয়াছে। মাহিনা পাইলে টাকা পাঠাইতে পারিব। তুমি ও মা আমার ভক্তিপূর্ণ প্রণাম গ্রহণ করিও। ইতি সেবক, নবকুমার।’

লিখে জিজ্ঞাসা করল, ‘কী ঠিকানা দেব?’

‘যাত্রার গদির ঠিকানা দাও। একশো আট বাই ওয়ান বাই বি চিৎপুর রোড।’

চিঠি লিখে বাথরুমে গিয়ে মুখে জল দিল নবকুমার। আর তখনই নীচ থেকে চিৎকার চেঁচামেচি ভেসে এল। মনে হল কাল রাতের ঘটনাটা আবার ঘটছে।

নবকুমার মাস্টারদাকে বসতে বলে প্যাসেজ দিয়ে শেফালি-মায়ের দরজার সামনে পৌঁছতে ঘরের ভেতর থেকে মহিলার গলা ভেসে এল, ‘আমার দরকার নেই অমন মেয়েছেলের। সারারাত কেঁদে ককিয়ে জাগিয়ে রেখেছে। এখন বলছি যে-দিকে ইচ্ছে চলে যাও, কিন্তু হতচ্ছাড়ি যেতে চাইছে না। আপনি একটা বিহিত করুন।’

শেফালি-মায়ের গলা শুনতে পেল নবকুমার, ‘যাওয়ার কোনও জায়গা আছে?’

‘ছিল। কিন্তু যে স্বামী হাত ধরে এখানে ঢুকিয়ে দিয়ে মাসে-মাসে টাকা নিয়ে যায় সে তো আবার বিয়ে করেছে। সেই সংসারে সতীন ঢুকতে দেবে ওকে?’ মহিলা একনিশ্বাসে বলে গেল।

‘ওর স্বামীকে ডেকে পাঠাও, এলে নিয়ে যেতে বোলো।’

‘ও বাব্বা। সে তো ক্যানিং-এ। অসুখ হয়েছে শুনলে এদিকে পা বাড়াবেই না।’

এবার মুক্তোর গলা শোনা গেল, ‘কিন্তু আর আমরা রাত জাগতে পারব না। ওকে হাসপাতালে যেতে বলো।’

‘সে তো বলেছি। কিন্তু এই রোগে তো হাসপাতাল জায়গা দেবে না। তা ছাড়া, ওই রুগি ঘরে থাকলে তো ব্যাবসার বারোটা বেজে যাবে। অন্য মেয়েরাও আপত্তি করছে।’

‘মেয়েটার বয়স কত?’ শেফালি-মা জিজ্ঞাসা করলেন।

‘মুক্তো, একবার নবকুমারকে ডাক তো।’

‘সে আবার কী করবে?’

‘তোকে যা বললাম তাই কর। আজকাল বড্ড প্রশ্ন করিস!’

নবকুমার সরল মনে পরদা সরিয়ে ঘরে ঢুকতেই মুক্তোর মুখোমুখি হল, ‘আরে! তুমি এখানে কেন? মাস্টার এসে তো ঘুম ভাঙাল?’

‘উনি আমাকে ডাকছিলেন।’

‘ডাকছিলেন? তুমি শুনতে পেলে কী করে? ও, দরজার পাশে দাঁড়িয়ে শুনছিলে? দেখে তো মনে হয় ভাজা মাছ উলটে খেতে জানো না, এ তো মিচকে শয়তান।’

‘আ: মুক্তো! অন্য কেউ হলে ঝটপট নিজের ঘরে চলে যেত। বুঝতেও দিত না ওখানে দাঁড়িয়ে কথা শুনেছে। ও সরল বলে চলে এল। নবকুমার, এদিকে এসো।’ শেফালি-মা বললেন।

নবকুমার সামনে চলে এল। শেফালি-মা তাকালেন, ‘তোমার সঙ্গে তো কবিতার আলাপ হয়েছে। মহিলা দুর্বার সমিতির সভাপতি—!’

‘হ্যাঁ!’ মাথা নাড়ল নবকুমার।

‘তুমি কবিতার কাছে এদের নিয়ে যাও। পারবে?’

‘কখন?’

‘সকাল সাড়ে দশটায় শুনেছি ওদের কাজ শুরু হয়ে যায়। তখনই যেও।’

‘ঠিক আছে। কিন্তু গিয়ে কী বলব?’

‘বলবে আমি তোমাকে পাঠিয়েছি। যে অসুস্থ, সে আমার বাড়িতেই থাকে। তার থাকার জায়গা আর নেই। ওর একটা ব্যবস্থা করা দরকার।’

শেফালি-মায়ের কথা শেষ হতেই প্রৌঢ়া মহিলা দ্রুত মাথা নাড়লেন, ‘নেবে না। ওরা মেম্বার না হলে কোনও সাহায্য করবে না।’

‘মেম্বার হওনি কেন তোমরা?’

‘দালালরা ভয় দেখিয়েছিল। দুর্বারের মেম্বার হলে ওরা খদ্দের নিয়ে ঘরে বসাবে না। পাঁচজনে পাঁচরকম কথাও বলেছিল।’

‘তবু একবার চেষ্টা করে দেখতে দোষ কী? তোমার রিহার্সাল কখন?’

‘দুপুরবেলায়।’

‘যাও। চানটান করে তৈরি হও। মুক্তো খবর দিলে ঘুরে এসে খেয়েদেয়ে কাজে যাবে। চা খেয়েছ?’

না বলতে সঙ্কোচবোধ করল নবকুমার। অথচ মিথ্যেও বলা যায় না।

সে কিছু বলার আগেই মুক্তো বলল, ‘খাবেটা কী করে? ওইটুকু ছেলে যদি ভরদুপুর পর্যন্ত ঘুমায় তাহলে ঘুমন্ত অবস্থায় ঝিনুকে করে খাইয়ে দিতে হয়।’

শেফালি-মা ঝট করে কড়া চোখে মুক্তোর দিকে তাকাল। মুক্তো বলল, ‘ঠিক আছে বাবা! ঘাট মানছি। যাও, ঘরে যাও, চা পৌঁছে দিচ্ছি।’

ঘরে যেতেই মাস্টারদা জিজ্ঞাসা করল, ‘হ্যাঁগো, তুমি কি এ-বাড়ির সর্বত্র ঘুরে বেড়াও? কেউ কিছু বলে না?’

‘আমি এই ঘরে থাকি আর ডাকলে শেফালি-মায়ের ঘর ছাড়া কোথাও যাই না। শেফালি-মা ডেকেছিলেন বলে গিয়েছিলাম।’

‘ডাকল কেন?’ মাস্টারদা উন্মুখ হল।

‘এখানকার একটা মেয়ে খুব অসুস্থ। ওকে দুর্বার সমিতিতে নিয়ে যেতে হবে।’

‘সর্বনাশ, তোমাকে দিয়ে এসব করাচ্ছে নাকি? উঁহু, ব্যাড। ভেরি ব্যাড। দুর্বার সমিতি কি তা জানো? এখানে যেসব মেয়ে শরীর বিক্রি করে তাদের এক করে দাবি করছে শ্রমিকের মর্যাদা দিতে হবে। বোঝো! কারখানায় যারা কাজ করে, মাঠে যারা চাষ করে, তাদের সঙ্গে নিজেদের এক করতে চাইছে। আসলে কিছু বাইরের লোক এদের ব্যবহার করে ফায়দা তুলতে চাইছে।’ মুখ ভ্যাটকাল মাস্টারদা।

‘কে কী করছে জানি না। কিন্তু তাতে যদি এখানকার মানুষের উপকার হয় তার চেয়ে ভালো কাজ আর কী হতে পারে?’ নবকুমার জিজ্ঞাসা করল, ‘দুর্বারের কাউকে চেনা আছে?’

‘না:।’

‘তাহলে মাস্টারদা, কিছু না দেখেশুনে মন্তব্য করা কি ঠিক?’

মাস্টারদা মাথা নাড়ল, ‘এসব আমার কথা নাকি?’ পাঁচজনে যা বলছে, তাই বললাম। কিন্তু নব, তোমার তো এখানে থাকা ঠিক হচ্ছে না।’

‘কেন?’

‘এইসব খারাপ মেয়েছেলেদের সঙ্গে জড়িয়ে গেলে বদনামের চূড়ান্ত হবে।’

‘জড়িয়ে যাচ্ছি কে বলল?’

‘গুড। জড়াবে না। জলে সাঁতার কাটবে কিন্তু ডানা ভেজাবে না। তোমার সঙ্গে শেফালি-মা কীরকম ব্যবহার করেন?’

‘ভালো।’

‘তা তো করবেনই। অতি ভদ্রবাড়ির মেয়ে। যাত্রায় নেমেছিলেন যখন, তখন অভিনয়ের নেশা ধরেছিল। চরিত্র ছিল হিরের মতো। ওই প্রেমে পড়েই তো সর্বনাশ হল। বয়সকালে এই বাড়ির বাড়িওয়ালি হয়েছেন বটে, কিন্তু উনি গোবরে পদ্মফুল। তা ভাই, তোমাকে একটা কাজ করে দিতে হবে।’ মাস্টারদা কাছে এল।

‘কী কাজ?’

মাস্টারদা মুখ খোলার আগেই মুক্তো এল একটা থালায় চায়ের কাপ আর একটা টিফিন কেক নিয়ে। এসেই চেঁচাল, ‘ওম্মা! তুমি এখনও চান না করে গপ্পো মারছ? শেফালি-মা কী বলেছে খেয়ালে নেই?’

‘যাচ্ছি!’ নবকুমার বলল।

‘ফিরে এলে এটা তো জল হয়ে যাবে। আমি আবার গরম করে দিতে পারব না বাপু। কোথায় ভাবলাম চান সেরে চা-জলখাবার খাবে। এগুলো গিলেই চান করতে যাও।’ মুক্তো বলে গেল থালা রেখে।

‘দেখলে? কী অপমান। আমি আর কোনওদিন এ-বাড়ির জলস্পর্শ করব না।’ চিৎকার করে বলল মাস্টারদা।

নবকুমার খানিকটা চা প্লেটে ঢেলে কেক আধটুকরো করে নিজের জন্যে নিয়ে বলল, ‘ওর ওপর রাগ করবেন না। ও ওইরকম! যা বলছিলেন তা বলুন।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *