1 of 2

কলিকাতায় নবকুমার – ৩

তিন

রাত গভীর। ট্রেনটা এখন ঠিক খুঁড়িয়ে-খুঁড়িয়ে চলছে। কামরার আলোর তেজ কমে গিয়ে একটা হলদেটে চেহারা নিয়েছে। যাত্রীদের বেশিরভাগের চোখ বন্ধ। এর মাথা ওর কাঁধে প্রায় ঢলে পড়েছে। বৃদ্ধকে বয়স্কা একইসঙ্গে খানিকটা জায়গা দেওয়ায় তিনি ঈষৎ কাত হতে পেরেছেন। বৃদ্ধার চোখ বন্ধ। নাক ফুলছে। ঠোঁট সামান্য ফাঁক। এপাশে পঞ্চাশ এবং পঁয়ত্রিশ ঘুমে কাদা। নবকুমারের ডানদিকে বসা পনেরো মাঝেমধ্যেই শরীর বাঁকাচ্ছে, বোধহয় অচেনা লোক পাশে বসে থাকায় তার ঘুম আসছে না।

নবকুমার কামরার অন্য প্রান্তে তাকাল। সেখানেও ঘুম। কিন্তু বেঞ্চির একটুখানি খালি হয়েছে। ওখানে বসলে স্বচ্ছন্দে জানলায় মাথা রাখা যায়। নবকুমার সন্তর্পণে ওঠার চেষ্টা করতেই উ: শব্দটি উচ্চারণ করতে বাধ্য হল। তার ডান পায়ের জুতোর ওপর প্রচণ্ড জোরে পায়ের চাপ রেখেছে পনেরো, রেখেই পা সরিয়ে নিয়েছে। ওর মুখের দিকে তাকিয়ে অবাক হল নবকুমার। চোখ বন্ধ, যেন গভীর ঘুমে তলিয়ে গিয়েছে।

নবকুমার অনুমান করল ব্যাপারটা নেহাতই দুর্ঘটনা। হঠাৎ হয়ে গিয়েছে। জেনেবুঝে কেন পনেরো তার পায়ের ওপর এত জোরে চাপ দেবে? কিন্তু মেয়েটা একটু আগেও ঘুমোয়নি বলে তার মনে হচ্ছিল। নবকুমার আবার ওঠার চেষ্টা করতেই গোড়ালির কাছে লাথি খেল। সে অবাক হয়ে পনেরো বছরের দিকে তাকাল। চোখ বন্ধ, মাথা এখন তার পঁয়ত্রিশ কাঁধে ঘুমে এলিয়ে পড়েছে। এই অবস্থায় কী করে লাথি মারছে? হঠাৎ খেয়াল হল নবকুমারের, কেউ-কেউ ঘুমাবার সময় পা ছোঁড়ে। এর বোধহয় সেইরকম অভ্যাস আছে। খুব খারাপ অভ্যাস। শুয়ে যারা পা ছোঁড়ে তারা বসেও নিশ্চয় শান্ত থাকে না। অন্তত এই পনেরো বছরের মেয়ে তো নয়ই সেটা বোঝা যাচ্ছে।

নবকুমার আর উঠতে সাহস পেল না। দু-দুবারের লাথির আঘাত তার পায়ে বেশ টনটনানি তৈরি করেছে। সে ঘুমোবার চেষ্টা করল।

প্রায় ঘণ্টাখানেক বাদে যখন তার চোখে জব্বর ঘুম তখনই কথাগুলো কানে যাওয়ায় সে সম্বিত ফিরে পেল। পনেরো পঁয়ত্রিশকে কিছু বলছে কিন্তু পঁয়ত্রিশ সেটা কানে তুলছে না। পনেরো বলল, ‘চল না, আমার একা যেতে ভয় করছে।’

‘আমার ঘুম পেয়েছে। এই ঘুম ভেঙে গেলে সারারাত জেগে কাটাতে হবে।’ পঁয়ত্রিশ ঘুম জড়ানো গলায় বলল।

‘তাহলে আমি কী করব?’ কাঁদো-কাঁদো গলা পনেরোর।

‘অন্য কাউকে বল।’

তারপর মিনিট খানেক চুপচাপ। নবকুমার চোখ খুলে দেখল পুরো পরিবার ঘুমে কাদা হয়ে আছে একমাত্র পনেরো ব্যতিক্রম। চোখাচোখি হতেই পনেরো বলল, ‘আমার সঙ্গে যেতে হবে।’

‘কোথায়?’ নবকুমার ঘাবড়ে গেল।

‘আমি বাথরুমে যাব। ওঠা হোক।’ পনেরো উঠে দাঁড়াল।

‘আমার বাথরুম পায়নি।’ অসহায় গলায় বলল নবকুমার।

‘আ:। আমি বলছি আমার কথা আর ইনি নিজের কথা ভাবছেন। এই রাত্রে একা একজন মেয়ে দামড়া-দামড়া পুরুষদের সামনে দিয়ে বাথরুমে যেতে পারে? আমার পেছন-পেছন আসা হোক।’

পনেরো আসনগুলোর ফাঁক দিয়ে এগোতে নবকুমার বাধ্য হল অনুসরণ করতে। একেবারে শেষ প্রান্তের দুপাশে দুটো টয়লেট। টয়লেটের দরজা বন্ধ। পনেরো বলল, ‘আচ্ছা হাঁদা তো। খুলে দেখা হোক ভেতরে কেউ আছে কি না?’

নবকুমার দরজা ঠেলল। উঁকি মেরে দেখল, সেখানে কেউ নেই। সে মাথা নেড়ে বলল, ‘না নেই। তাহলে আমি যাই!’

দ্রুত মাথা নাড়ল পনেরো, ‘না। একদম না।’ বলে ভালো করে নবকুমারকে দেখতে লাগল। নবকুমার অস্বস্তিতে মুখ ঘোরাল, এত বাথরুম পেয়েছে যার সে কী করে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট করে! দেখা শেষ করে পনেরো চারপাশে তাকাল। কিছু দেহাতি মানুষ খানিকটা দূরে ট্রেনের দুলুনিতে অচেতন। সে ফিক করে হাসল।

নবকুমার অবাক হয়ে বলল, ‘ভিতরে যাওয়া হবে না?’

‘ভ্যাট!’ ঠোঁট মোচড়ালো পনেরো।

‘এই যে এখানে আসা হল—’ নবকুমার কথা শেষ করতে পারল না।

‘একটা কথা জিজ্ঞাসা করব বলে সঙ্গে নিয়ে এখানে এলাম। ওখানে মাসির পাশে বসে তো জিজ্ঞাসা করা যেত না। বাথরুমে একা যেতে ভয় করছে বললে কেউ কিছু মনে করবে না। হ্যাঁ।’ পনেরো হাসল।

‘কী কথা?’ নবকুমারের কেমন শীত-শীত করছিল এবার।

‘কত বয়েস?’

‘কুড়ি।’

‘হুঁ। লাভার আছে?’

‘অ্যাঁ?’

‘নেকু। লাভার আছে নিশ্চয়ই। আসবার আগে কেউ খুব কান্নাকাটি করেছে?’

‘মা করেছে।’

‘ধ্যাৎ! মায়ের কথা কে বলছে? লাভার জানা নেই?’

‘না-না! আমার ওরকম কেউ নেই।’

‘সত্যি?’

‘আমি মিথ্যে বলছি না।’

‘তাহলে আমার এই আঙুলটা ধরে তিনবার বলা হোক, সত্যি, সত্যি, সত্যি।’

‘কেন?’

‘তাহলে বুঝব সত্যি-সত্যি কেউ নেই।’

অতএব বাধ্য হল নবকুমার। পনেরোর আঙুলটা কী নরম!

হাসি ফুটল পনেরোর মুখে। লজ্জা-লজ্জা ভাব করে বলল, ‘এর পরে যেন আর কোনও মেয়ে জীবনে না আসে। আমাদের আজ ইয়ে হয়ে গেল।’

‘কী হল?’

‘নেকু! মানুষ করতে আমার মাথাখারাপ হয়ে যাবে বুঝতে পারছি। আমাদের লভ হয়ে গেল। এল ও ভি ই। ঠিক আছে? এখন দয়া করে এখানে আর একটুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা হোক। আমি আগে যাই, তারপরে যেন আসা হয়।’ পনেরো পাখির মতো ডানা মেলে চলে গেল তার জায়গায়।

মাথা ভোঁভোঁ করছিল নবকুমারের। বলল কী মেয়েটা? তাদের লভ হয়ে গেল? গাঁয়ের কোনও মেয়ে, কলেজে পড়ার সময়েও কোনও মেয়ে তাকে এমন কথা বলেনি! একটা বইতে সে পড়েছে, প্রথম দর্শনেই প্রেম! এটা সেরকম নাকি? কিন্তু ওর মনে প্রেম আসতেই পারে, তার মনে তো সেরকম কিছু হচ্ছে না। এখন পর্যন্ত ওর ডাকনামটা সে শুনেছে, ছুটকি। ভালো নাম কী তা জানা নেই। কারও নাম ছুটকি হলে মনে প্রেম আসে? তা ছাড়া সে যাচ্ছে রোজগারের আশায়, প্রেম করতে নয়। নবকুমার ঠিক করল কথাটা পনেরোকে বুঝিয়ে বলে দেবে।

নিজের জায়গায় ফেরার সময় সে মাস্টারদার দিকে তাকাল। হাঁ করে ঘুমোচ্ছে। তাহলে যাওয়ার সময় দ্যাখেনি। ঘুমোলে মানুষের মুখ কীরকম কুৎসিৎ হয়ে যায়!

নিজের জায়গায় বসে কিছুক্ষণ উদ্বিগ্ন হয়ে ছিল নবকুমার। কিন্তু পনেরো বছর এখন তার মাসির দিকে পাশ ফিরে বসে ঘুমোচ্ছে। এত তাড়াতাড়ি কোনও মানুষ যে ঘুমোতে পারে তা জানত না নবকুমার। একটু আগে পনেরো যেসব কথা বলেছে তার বিন্দুমাত্র প্রতিক্রিয়া এখন ওর মধ্যে নেই। অনেক মানুষ ঘুমিয়ে-ঘুমিয়ে কথা বলে, ঘুমের ঘোরে হাঁটে। ওদের গ্রামের একটি লোক ঘুমের ঘোরে হাঁটতে-হাঁটতে পুকুরে নেমে পড়েছিল। সাঁতার জানত বলে বেঁচে গিয়েছিল। নবকুমারের মনে হল, পনেরো কি সেইরকম কিছু করল? যদি তাই হয় তাহলে কাল সকালে সব ভুলে যাবে, ওকে আর কিছু বোঝাবার দরকার হবে না।

.

ভোরবেলায় ট্রেনটা যেখানে থমকে দাঁড়াল সেখানে ঘরবাড়ি বা স্টেশন নেই। দুপাশে শুধু চাষের মাঠ। ইতিমধ্যে ঘুম উধাও, সবাই ব্যস্ত হয়ে জানতে চাইছে, ট্রেন দাঁড়িয়ে কেন? নবকুমার দরজায় এসে দাঁড়িয়ে দেখল কিছু যাত্রী নেমে পড়েছে। কেউ-কেউ সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। মাস্টারদা পাশে এসে দাঁড়াল, ‘ঘুম হল?’

‘না:। আপনার?’

‘দিব্যি ঘুমালাম। বাথরুমের দরকার থাকলে এইবেলা সেরে ফেল। পরে ওখানে ঢুকতে পারবে না। এসো।’ প্রায় হুকুমের ভঙ্গিতে কথাগুলো বলে এগিয়ে গেল মাস্টারদা। বাধ্য হয়ে অনুসরণ করল নবকুমার। দু-দুটো বাথরুমে তখন জল প্রায় শেষ হওয়ার মুখে। অভিজ্ঞতা মানুষকে কত বিপদ থেকে বাঁচায়। পরে, যখন বাথরুম জলশূন্য, কিছু লোক মরিয়া হয়ে ধানখেতে নেমে গিয়েছে, তখন এই কথাটা বারংবার মনে পড়ছিল।

সামনের একটা সাঁকো নড়বড়ে হয়ে গিয়েছে। যতক্ষণ না রেল কোম্পানির লোক সেটাকে সারাচ্ছে ততক্ষণ ট্রেন নড়বে না। কথা চাউর হতেই লোকজন ট্রেন থেকে নেমে পড়ল। শিশু আর মেয়েরা এসে দাঁড়াল ট্রেনের দরজাগুলোতে।

নবকুমার নামেনি। সে ধানখেত ছাড়িয়ে দূরের দিকে তাকিয়েছিল। এই জায়গাটার কাছাকাছি ঘর-বাড়ি যদিও থাকে সেগুলো গাছগাছালির জন্যে দেখা যাচ্ছে না। মাস্টারদা পাশে এসে দাঁড়াল, ‘হাঁটতে পারবে?’

‘হাঁটব? কোথায়?’

এই ট্রেন কখন ছাড়বে তা ঈশ্বরও বলতে পারবেন না। সারাদিন এখানে বসে শুকিয়ে না থেকে, চলো, বাস ধরি।’ মাস্টারদা বলল।

‘এখানে তো বাসের রাস্তা আছে বলে মনে হচ্ছে না।’ নবকুমার বলল।

‘থাকতেই হবে। ট্রেন লাইন থাকলে বাস থাকেই। আর ঘণ্টাআড়াই চললে আমরা কলিকাতায় পৌঁছে যেতাম। বাস ধরলে না হয় ঘণ্টাচারেক লাগবে।’

মাস্টারদা হাতল ধরে নীচে নামতে নবকুমার পেছনে তাকাল। পঁয়ত্রিশ এবং পনেরো ওদের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। পঁয়ত্রিশ জিজ্ঞাসা করল, ‘তোমরা বাসে করে কোলকাতায় যাবে?’

নবকুমার কুণ্ঠিত হল, ‘আমি তো প্রথম যাচ্ছি। উনি যেমন বলবেন তেমনই করতে হবে।’

পঁয়ত্রিশ জিগ্যেস করল, ‘বাস রাস্তা কত দূরে?’

‘আমি জানি না।’

‘তাহলে যাওয়ার চেষ্টা করা কেন? আমরা সবাই আছি যখন তখন থাকলেই হয়।’ পঁয়ত্রিশ গম্ভীর মুখে বলল।

পনেরো বলল, ‘মাসি, উনি যখন ওকে নিয়ে যাচ্ছেন তখন নিশ্চয়ই রাস্তা আছে। সত্যি তো, এই ট্রেন কখন ছাড়বে কেউ জানে না। চলো না, আমরাও ওদের সঙ্গে যাই।’

‘তোর কি মাথাখারাপ হয়ে গিয়েছে। মা-বাবা হাঁটতে পারবে ওই ধানখেত দিয়ে? তা ছাড়া, হেঁটে কোথায় পৌঁছবে তা এরাই জানে না।’ পঁয়ত্রিশ মাথা নাড়ল।

নীচ থেকে মাস্টারদা চেঁচিয়ে উঠল, ‘কী হল কী?’

নবকুমার বলল, ‘আসি।’

‘আসি মানে?’ পঁয়ত্রিশ ধমকাল, ‘আলাপ পরিচয় হল আর উধাও হয়ে যাওয়া হচ্ছে? যেতে চাও যাও। শোনো, কোলকাতায় বেলগাছিয়া বলে একটা জায়গা আছে। তার ট্রামডিপোর পেছনে তিন নম্বর মা দুর্গা লেনে আমরা থাকি। এসে দেখা করবে।’

‘ঠিক আছে।’

এবার পনেরো বলল, ‘ঠিক থাকবে না। একটু পরেই রাস্তার নামটা ভুলে যাওয়া হবে।’

হেসে ফেলল নবকুমার, ‘না। মা দুর্গাকে কী করে ভুলব?’ মাথা নেড়ে সে নীচে নেমে এল স্যুটকেস নিয়ে। স্টেশনের বাইরে যাওয়ার সময় খুব ইচ্ছে হচ্ছিল পেছন ফিরে তাকাতে। কিন্তু পাশে মাস্টারদা থাকায় সে সাহস পেল না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *