তেরো
নবকুমার দেখল ছেলেগুলো অদ্ভুত চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। সে কাছে এগোল, ‘বলুন।’
‘কোথায় থাকা হয়?’ প্রথমজন জিজ্ঞাসা করল।
‘এখানে চিৎপুরের একটা বাড়িতে।’
‘কলকাতায় নতুন?’ যে ছেলেটি তাকে পৌঁছে দিয়েছিল সে বাঁকা হাসল।
‘হ্যাঁ।’
‘এদের সঙ্গে আলাপ ট্রেনে?’ দ্বিতীয়জন প্রশ্ন করল।
‘হ্যাঁ।’
‘ওরা কাল ফিরেছে। তার মানে কাল আলাপ হয়েছে। ব্যস, পরেরদিনই লাইন মারতে ছুটে এসেছ এখানে?’ প্রথমজন জিজ্ঞাসা করল।
‘এসব কী বলছেন?’ নবকুমার প্রতিবাদ করল।
‘চেনা নেই জানা নেই, ট্রেনে আলাপ হয়েছে, ট্রেনেই শেষ। এখানে কোন ধান্দায় এসেছ? জবাব দাও।’ দ্বিতীয়জন একটা অশ্লীল শব্দ উচ্চারণ করল।
‘ওঁরা আমার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেছিল, বাড়িতে আসতে বলেছিল, তাই এসেছি। আমার আর কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে?’ নবকুমার খুব নার্ভাস হয়ে পড়েছিল।
‘কে আসতে বলেছিল? ছুটকি?’ দ্বিতীয়জন জানতে চাইল।
‘না। বড়রা?’
‘তার মানে মন্দিরা? বাপন! এ তো বোয়াল মাছ। মায়ের বয়সি মেয়ের সঙ্গে লুডো খেলছে। তা বুলাদি কী বলল?’
‘বুলাদি?’ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল নবকুমার।
‘আচ্ছা, এ শালা দেখছি একদম খরগোশের বাচ্চা। বুলাদির নাম শোনেনি? সবার সঙ্গে বুলাদি!’ হাসল ছেলেটা।
প্রথমটা বলল, ‘এই, কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোল। শোনো ভাই, মন্দিরাকে আমরা বুলাদি বলি। শালি দেখা হলেই জ্ঞান দেয়। তোমার সঙ্গে তো অনেকক্ষণ কথা বলল, ছুটকিকে কোথায় নিয়ে গেছে জানো?’
‘না।’ জেনেশুনে মিথ্যে বলল নবকুমার। ছুটকিকে যে রানাঘাটের মামার বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে একথা না বললে কী ক্ষতি হবে?
‘তার মানে তোমাকেও বিশ্বাস করেনি।’
‘সবাই কোথায় জিজ্ঞাসা করেছিলাম। উনি বললেন দক্ষিণেশ্বরে গেছে।’
‘ঢপ। সেই ভোরবেলায় মেয়েটাকে নিয়ে হাওয়া হয়ে গেছে ওরা।’
নবকুমার বলল, ‘এবার আমি যেতে পারি?’
‘দাঁড়াও।’ দ্বিতীয় ছেলেটা বলল, ‘দ্যাখো, তোমার সঙ্গে আমরা কোনও খারাপ ব্যবহার করিনি। আমি ছুটকিকে লভ করি। ছুটকি কোথায় আছে, তা জানতে তুমি আমাকে হেল্প করো।’
‘আমি কী করে জানব?’
‘তুমি কালই ওই বাড়িতে যাবে। বুলাদি খুব ঘোড়েল। কিন্তু ওই বুড়োবুড়ি দুটো একটু সরল। ওদের কাছ থেকে জেনে নিতে পারবে একটু চাপ দিলেই।’
প্রথমজন বলল, ‘তোমাকে বলবে। কারণ তুমি পাড়ার ছেলে নও।’
‘ঠিক আছে। আসব।’
‘কবে?’
‘কাল অথবা পরশু।’
‘গুড।’ তৃতীয়জন জিজ্ঞাসা করল, ‘কী যেন নাম তোমার?’
‘নবকুমার।’
‘তোমার বাড়ি কি উড়িষ্যায়?’
‘না-না। আমি বাঙালি।’
‘যাচ্চলে! আমি দুটো নবকুমারকে চিনি। দুজনেরই কটকে বাড়ি। যাও।’
মাস্টারদা যেখান থেকে ট্রামে তুলে দিয়েছিল সেখানে পৌঁছতে অনেকটা সময় লাগল। লাইনের ওপর দিয়ে ট্রেনের মতো চলছে কিন্তু ট্রেনকে সবাই আগে যেতে দেয়, ট্রামকে দেয় না। একটা বড় মোড়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়েছিল ট্রাম। জানলায় বসে নবকুমার ইলেকট্রিকের আলোয় অবাক হয়ে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে ঘোড়ার পিঠে বসে থাকতে দেখল। দেখে খুব ভালো লাগল। এই সেই কলিকাতা যেখানে একসময় সুভাষচন্দ্র বসু বাস করতেন, রবীন্দ্রনাথ থাকতেন। শেষপর্যন্ত সে এই শহরে আসতে পেরেছে শুধু মাস্টারদার জন্যে। এইসব ভেবে সে যখন পুলকিত হচ্ছিল তখন একটি মেয়ে আর ছেলে তার সামনের খালি আসনে এসে বসল। মেয়েটার পরনে শার্ট প্যান্ট, চুল ছোট। এরকম সাজে ওর গ্রামের কোনও মেয়েকে দেখা যায় না। হঠাৎ মেয়েটা বলল, ‘এই, কী হচ্ছে! এটা ট্রাম!’
‘সরি।’ ছেলেটা বলল।
‘পাকা কথা এখনও দাওনি। দুই-এর নীচে হবে না।’
‘এক করো গুরু।’ ছেলেটা অনুরোধ করল।
‘ভাঁড় মে যাও। আমি নেমে যাচ্ছি।’ মেয়েটা ওঠার ভান করতেই ট্রাম এগোনো শুরু করল। ছেলেটা সাততাড়াতাড়ি বলল, ‘ঠিক আছে, ঠিক আছে। ওয়ান ফিফটি। ব্যস, পাকা হয়ে গেল।’
মেয়েটা মাথা নাড়ল, ‘অসম্ভব। আমি তিনশোর নীচে কাজ করি না। তুমি ইয়ং বলে দু-শোয় রাজি হয়েছিলাম। এখন যদি ঢপলি মারো তাহলে দয়া করে কেটে পড়ো। ফালতু টাইম নষ্ট কোরো না।’
‘বাপস। ঠিক আছে, দুশো পাবে।’
‘ওখানে গিয়ে যদি বিলা করো তাহলে নিজের পায়ে ফিরতে পারবে না।’ মেয়েটা এবার হাসতে-হাসতে বলল।
কান খাড়া করে সংলাপ শুনছিল নবকুমার। সে বুঝতে পারছিল না, মেয়েটা ঠিক কী চাইছে? যা চাইছিল তার অর্ধেক নিতে কিছুতেই রাজি হল না। ওরা নিশ্চয়ই প্রেমিক-প্রেমিকা। কলিকাতা এত বড় নগর যে পরিচিত মানুষের চোখ এড়িয়ে এরা ঘোরাফেরা করতে পারছে। কিন্তু এত রাত পর্যন্ত বাড়ির বাইরে আছে বলে মেয়েটা একটুও চিন্তিত নয় কেন? ওকে বাড়িতে বকাবকি করে না?
মাস্টারদা জায়গাটাকে চিনিয়ে দিয়েছিল একটা পার্ক দেখিয়ে। সেখানে ট্রাম থামামাত্র নবকুমার নেমে পড়তে-পড়তে দেখল ওই ছেলেমেয়েরাও তার পেছনে নেমে এল।
ছেলেটা জিজ্ঞাসা করল, ‘কতদূরে?’
‘কাছেই।’ মেয়েটা এগিয়ে এল, ছেলেটা তার পাশে।
দুপুরে যে পথে এসেছিল সেই পথে হাঁটছিল নবকুমার। ট্রাম লাইন ছেড়ে বাঁ-দিকের গলিতে ওদের ঢুকতে দেখে তার মাথা পরিষ্কার হল। এরা প্রেমিক-প্রেমিকা নয়। তাই মেয়েটা বলেছিল, আমি তিনশো টাকার নীচে কাজ করি না। কথাটা তখন মনে আসেনি। ও এই পাড়ায় থাকে। নেতাজি সুভাষ বসুর মূর্তির কাছে গিয়েছিল খদ্দের জোগাড় করতে। খুব খারাপ লাগছিল নবকুমারের। মেয়েটার খুব টাকার দরকার? এখানে অপেক্ষা করে ও কি খদ্দের পায় না? কিন্তু ট্রামে ছেলেটার সঙ্গে যেভাবে কথা বলছিল তাতে সেরকম কিছু মনে হয়নি।
এই সময় সামনের রাস্তায় চিৎকার চেঁচামেচি শুরু হল। দুপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েগুলো দুদ্দাড় করে ভেতরে ঢুকে পড়ল। রাস্তার লোকজন ছুটছে যে যেদিকে পারে। সামনে হাঁটা ছেলেটা হঠাৎ মেয়েটির সঙ্গ ত্যাগ করে নবকুমারের পাশ দিয়ে দৌড়ে পেছনে চলে গেল। নবকুমার বুঝতে পারছিল না এত আতঙ্ক কীসের জন্যে!
ঠিক তখনই পুলিশের ভ্যানটা সামনে চলে এল। তিনটে সেপাই একটা লোককে ধরে টানতে-টানতে সেই ভ্যানে তুলল। এই লোকটা নিশ্চয়ই কোনও অন্যায় করেছে কিন্তু ভাবনাটা মনে আসামাত্র একজন সেপাই খপ করে তার হাত ধরল, ‘এই শালা আয়, ওঠ।’
লোকটা তাকে ভ্যানের দিকে টানতে লাগল। হাত ছাড়াবার চেষ্টা করল নবকুমার, ‘আরে! আমাকে টানছেন কেন? আমি কোনও অন্যায় করিনি। ছাড়ুন, ছাড়ুন হাত।’
‘অন্যায় করিনি!’ লোকটা ভ্যাঙচাল, ‘সন্ধের পর খানকি পাড়ায় এসে বলে অন্যায় করিনি। ওঠ ভ্যানে।’
টানাহ্যাঁচড়া যখন চলছে, তখন সেই মেয়েটা এগিয়ে এল পাশের বাড়ির দরজা দিয়ে, ‘ও সীতারামজি, ওকে ছেড়ে দাও। আমার লোক।’
‘তুমার লোক?’ সীতারাম নামক সেপাই একটু দ্বিধায় পড়ল।
‘হ্যাঁগো। আমার ইয়েতুতো আত্মীয়। ধরো!’
একটা কিছু বাঁ-হাত বদল হওয়া মাত্র সেপাই নবকুমারের হাত ছেড়ে দিয়ে বলল, ‘যা: শালা, আজ বেঁচে গেলি।’
সঙ্গে-সঙ্গে চিলের মতো ছোঁ মেরে মেয়েটা নবকুমারকে নিয়ে বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়ল। সেখানে দাঁড়িয়ে আরও মেয়েরা নাটক দেখছিল। এবার একজন ঠ্যা-ঠ্যা করে হেসে বলল, ‘কেউ মাছ ধরে ছিপে কেউ জালে, তুই শালা চিলের মতো ছোঁ মেরে।’
ততক্ষণে একটা ছয় ফুট বাই সাত ফুট ঘরে নবকুমারকে নিয়ে ঢুকে পড়ে মেয়েটি বলল, ‘আর কোনও চিন্তা নেই। এখানে পুলিশ আসবে না।’
নবকুমার মাথা নাড়ল, ‘আমি কোনও অন্যায় করিনি। তবু পুলিশ আমাকে ধরল কেন?’
‘না ধরলে ওদের পকেট ভারী হবে কী করে? বসো এখন। আমার নাম রানি। রানি মুখার্জি।’ মেয়েটা খুব কায়দা করে হাসল।
এই ছোট্ট ঘরে তক্তাপোষই বেশি জায়গা দখল করে রেখেছে। নবকুমার বলল, ‘আমি যাই এখন।’
‘যাবে মানে? আবার পুলিশের ভ্যানে উঠতে চাও? এক ঘণ্টার মধ্যে রাস্তা পরিষ্কার হয়ে যাবে। কী নাম তোমার?’
‘নবকুমার।’
‘বাব্বা। উত্তরকুমার, অশোককুমার, দিলিপকুমার। কুমার এখন পচে গেছে। এখন খান। সলমন খান, আমির খান, শাহরুখ খান। তুমি আজ থেকে আমার কাছে নবখান।’ মেয়েটা খিলখিল করে হাসল।
‘আমি মুসলমান নই।’
‘এম্মা! শিল্পীদের যেমন কোনও জাত নেই তেমনি এখানে যারা মধু খেতে আসে তাদের কোনও জাত থাকে না।’ রানি কাছে চলে এল।
‘আমি ওসব করতে আসিনি!’ জোর দিয়ে বলল নবকুমার।
‘ভ্যাট। তোমার জন্যে একটা দয়লা হাতছাড়া করলাম ইয়ার্কি মারতে? সেই শ্যামবাজার থেকে ট্রামে তোমাকে দেখেছি। ফলো করে একই স্টপে নামলে। পেছন-পেছন আসছিলে। এসব আমি লক্ষ করিনি ভেবেছ?’
‘সত্যি কথা না। আমি ওই ট্রামে বেলগাছিয়া থেকে বসে এসেছি। আর আমি এখানেই কাল থেকে থাকছি।’ নবকুমার বলল।
‘তুমি এখানে থাকছ?’ অবাক হল মেয়েটা, ‘কোন বাড়িতে?’
‘শেফালি-মায়ের বাড়িতে?’
‘শেফালি-মা কেউ হয়?’
‘না। উনি আমাকে আশ্রয় দিয়েছেন।’
‘কোথায় বাড়ি তোমার?’
গ্রামে। অনেক দূরে। কলিকাতায় এসেছি চাকরির জন্যে।’
‘কলিকাতা?’ খিলখিল করে হেসে উঠল মেয়েটা, ‘দাও।’
‘কী?’
‘দয়লা। সেপাইকে ওটা না দিলে ছাড়ত না তোমাকে।’
‘দয়লা মানে কী?’
‘হাঁদা। দশটা টাকা।’
সন্তর্পণে পকেট থেকে দশটা টাকা বের করে মেয়েটার হাতে দিতে সে মুখ বেঁকাল, ‘আজ কার মুখ দেখে উঠেছি! শোনো, আমার নাম রানি মুখার্জি না। আজ রানি, কাল কাজল, পরশু ঐশ্বরিয়া হই আমি! চলো, তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আসি।’ নবকুমারকে নিয়ে মেয়েটি বেরুতেই দরজায় দাঁড়ানো একটা মেয়ে খিলখিল করে হাসল, ‘এত তাড়াতাড়ি হয়ে গেল!’
ঘুরে দাঁড়াল মেয়েটা, ‘না। কারণ কাক কাকের মাংস খায় না।’
