1 of 2

কলিকাতায় নবকুমার – ২৮

আঠাশ

সকালে মাস্টারদা এসে ঘুম ভাঙাল। নবকুমারের মুখ দেখে চমকে গেল সে।

‘আই বাপ! তোমার মুখের ভূগোল পালটে গেল কী করে?’

মুখে হাত দিতে ব্যান্ডেজটা টের পেল নবকুমার। সে হেসে বলল, ‘পড়ে গিয়েছিলাম।’

‘অ্যাঁ। তুমি এর মধ্যেই মাল খাওয়া আরম্ভ করেছ নাকি?’

‘মাল খাওয়া?’

‘মদ।’

‘ধ্যাৎ! ট্রাম থেকে নামতে গিয়ে পড়ে গিয়েছিলাম।’ অবলীলায় মিথ্যে বলে নিজেই অবাক হল নবকুমার। গ্রামে থাকতে এরকম সহজ গলায় বলতে পারত না সে।

‘ও। রানিং ট্রাম থেকে নামার একটা কায়দা আছে। শরীরটাকে পেছনে হেলিয়ে গোড়ালির ওপর ভর করে নামতে হয়। যাক, ঠেকে শিখলে। পরের বার আর পড়বে না। তুমি কাল গদিতে গিয়েছিলে?’ প্রসঙ্গ পালটাল মাস্টারদা।

‘হ্যাঁ।’

‘বড়বাবুকে ফোন করেছিলে?’

‘হ্যাঁ।’

‘খুব সাহস তো! কেন?’

‘উনি ফোন করতে বলেছিলেন।’

‘তোমাকে? কেন?’

‘মাস্টারদা, বড়বাবু বলেছেন কাউকে যেন কারণটা না বলি।’

গম্ভীর হয়ে গেল মাস্টারদা। তারপর বলল, ‘শেষ পর্যন্ত তুমিও বেইমানি করলে নবকুমার। আমি ভাবতে পারিনি।’

‘আমি আপনার সঙ্গে বেইমানি করেছি?’

‘হ্যাঁ। ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাচ্ছ। আমি তোমাকে ভালো ছেলে ভেবে গ্রাম থেকে তুলে নিয়ে এলাম আর তুমি আমাকে এড়িয়ে বড়বাবুর সঙ্গে লাইন করে ফেললে? আমি গদিতে ফিরে শুনলাম, তুমি বড়বাবুকে ফোন করে ঠিকানা জেনে বেরিয়ে গেছ। বড়বাবুর বাড়িতে গিয়েছিলে?’

‘হ্যাঁ।’

‘তুমি কি জান, আজ পর্যন্ত বড়বাবু বাড়িতে কাউকে ডাকেননি। এমনকি সুধাকান্তবাবুকেও নয়।’

‘কী করে জানব?’

‘কী বলল বড়বাবু?’

‘অনেক কিছু খাওয়ালেন।’

‘যাক গে। তোমাকে সাবধান করে দিচ্ছি, বেশি বাড় বেড়ো না, ঝড়ে পড়ে যাবে। বড়লোকদের খেয়াল মিটে যেতে এক সেকেন্ডও লাগে না। শেফালি-মায়ের সঙ্গে বড়বাবু দেখা করেছেন?’

‘না।’

‘কেন? উনি তো দেখা করার জন্যে ছটপট করছিলেন?’

‘নিশ্চয়ই দেখা করবেন।’

এইসময় মুক্তো এসে দাঁড়াল, ‘অ। তুমি কখন জুটলে? লোকজন সব হুটহাট ওপরে চলে আসছে, আমি টেরও পাই না। জানান দিয়ে ওপরে আসতে পারো না? নিশ্চয়ই তোমাকেও চা দিতে হবে?’

মাস্টারদা হাসল, ‘আমি কখনও না বলি না।’

‘গত রাতে যদি গুন্ডারা তোমাকে প্যাঁদাতো তাহলে আমি খুশি হতাম।’ মুক্তো চলে গেল চা আনতে।

মাস্টারদা নবকুমারের মুখের দিকে তাকাল, ‘মানে? গুন্ডারা পেঁদিয়েছে কাল? ও হঠাৎ কথাটা বলল কেন?’

‘আমি কী করে বলব? ওকেই জিজ্ঞাসা করো।’

‘তুমি কারও সঙ্গে মারপিট করোনি তো?’

‘পাগল!’

‘কলকাতায় দলের জোর না থাকলে কেউ মারপিট করে না। ও হ্যাঁ, তোমার একটা চিঠি এসেছে। ভুলেই গিয়েছিলাম।’ পকেট থেকে একটা পোস্টকার্ড বের করে এগিয়ে দিল মাস্টারদা। চোখ রাখল নবকুমার।

‘স্নেহের খোকা। তোমার চাকরির সংবাদে খুব খুশি হয়েছি। আশা করি নিজের খরচ মিটাইয়া এখানে কিছু পাঠাইতে পারিবে। তোমার মা খুব তোমার কথা বলেন। চাকরি পাকা হইলে তিনি তোমার বিবাহ দিতে ইচ্ছুক। সেই মতো চারিদিকে সন্ধান লইতেছেন। ভালো থাকিও। আশীর্বাদান্তে তোমার বাবা।’

মাস্টারদা বলল, ‘গাছে কাঁঠাল আর গোঁফে তেল। এই চাকরি কোনওদিন পাকা হয় না। আমাদের গ্রামের লোকেদের কোনওদিন প্রাকটিক্যাল জ্ঞান হবে না।’

.

.

চা দিয়ে গেল মুক্তো, ‘তুমি চা খেয়ে বিদায় হও। মা বলেছে নব যেন চা খেয়ে স্নান করে তাঁর সঙ্গে দেখা করে।’

.

শেফালি-মা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এখন কেমন আছ?’

‘ভালো।’

‘ব্যথা আছে।’

‘খুব কম।’

‘এখন বলো, তোমায় বড়বাবু কী বলেছেন?’

‘উনি বলেছেন, যদি আপনার অসুবিধে না হয় তাহলে ফ্লুরিস নামের চায়ের দোকানে আপনার সঙ্গে কথা বলতে চান।’

হাসলেন শেফালি-মা, ‘ওটা শুধু চায়ের দোকান নয়, খুব নামকরা কেক প্যাস্ট্রির দোকান। না:। তুমি ওঁকে বলো আমাকে ফোন করতে।’

‘বলব।’

‘তুমি ওঁর ফোন নাম্বার জান?’

চোখ বন্ধ করল নবকুমার। গতকাল যে নাম্বারটা সে ডায়াল করেছিল সেটা মনে করার চেষ্টা করতেই দেখল ভুলে যায়নি। সে মাথা নাড়ল।

‘এক কাজ করো। তুমি ওঁকে ফোন করে বলো আমার সঙ্গে কথা বলতে। কোথাও গিয়ে কথা বলার আগে আমার কিছু জানার আছে। ওই যে ফোন।’

নবকুমার ফোনের পাশে গিয়ে ডায়াল করল। প্রথমে ফুঁ-ফুঁ শব্দ হল। সে দ্বিতীয়বার ডায়াল করতে রিং হল। কেউ একজন হ্যালো বললে সে জিজ্ঞাসা করল, ‘বড়বাবুর সঙ্গে কথা বলতে পারি?’

‘কে বড়বাবু?’

‘বড়বাবু, মানে, যাত্রাদলের—।’

‘কত নম্বর চান?’

নম্বরটা বলল নবকুমার। সঙ্গে-সঙ্গে ‘রং নাম্বার’ বলে ফোন ছেড়ে দিল লোকটা।

নবকুমার অবাক গলায় বলল, ‘কী হল?’

শেফালি-মা বললেন, ‘বোধহয় কোনও একটা নম্বর তুমি গুলিয়ে ফেলেছ। এক কাজ করো। একটা কাগজে আমার নাম্বার লিখে নিয়ে ওঁকে দিয়ে বলো এখানে ফোন করতে। আমার কথা বলা দরকার।’

.

রাস্তায় বেরিয়ে একটু ইতস্তত করল নবকুমার। তারপর অস্বস্তি কাটিয়ে কাল রাত্রে যে রাস্তা দিয়ে ফিরেছিল সেই রাস্তায় পা বাড়াল। ছেলেদুটো যদি তাকে আজও মারতে আসে, তাহলে সে ছেড়ে দেবে না। নাইবা থাকল তার কোনও দল।

এখন সকাল। সেই রাত্রের উন্মাদনা এখন পথের দুপাশে নেই। ইতিদের বাড়ির কাছাকাছি এসে একটু আড়ষ্ট হয়ে নবকুমার দেখল, ছেলেদুটো একটা বাড়ির রকে বসে আড্ডা মারছে। একজনের হাতে ব্যান্ডেজ।

ওরা ওকে দেখামাত্র মুখ ফিরিয়ে নিল। যেন কোনওদিন তাকে দ্যাখেনি। নবকুমার দাঁড়াল। তারপর এগিয়ে এল ওদের সামনে।

‘তোমাদের একটা প্রশ্ন করব। কাল যে আমাকে মারলে আমি কী অন্যায় করেছিলাম?’

ওরা জবাব না দিয়ে উদাসীন মুখে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকল।

‘ওই মেয়েটা অসুস্থ। তাকে কোনও চিকিৎসা করা হচ্ছিল না। আমি সেটা করার জন্যে দুর্বারকে বলে কী অন্যায় করেছি?’ নবকুমার জিজ্ঞাসা করল।

এবারও কোনও জবাব এল না।

নবকুমার হাসল, ‘তোমরাও যদি অসুস্থ হতে তাহলে একই কাজ করতাম।’

এবার একজন বলল, ‘আমরা মেয়েছেলে নই। দুর্বার পাত্তা দিত না।’

‘তাহলে হাসপাতালে নিয়ে যেতাম।’

এবার ওরা অবাক চোখে নবকুমারের দিকে তাকাল। নবকুমার বলল, ‘চলি।’

গলি থেকে বেরিয়ে খুব ভালো লাগল নবকুমারের। মন এখন হালকা।

.

আজ চুটিয়ে রিহার্সাল হল। কিন্তু মুশকিল হচ্ছিল নিরুপমাদিকে নিয়ে। বারবার তাঁকে সংলাপ বলে দিতে হচ্ছিল। সুধাময়বাবু বললেন, ‘তোমাকে অনেকবার বলেছি সংলাপ মুখস্থ করে ফেলতে কিন্তু তুমি শুনছ না। বড়বাবুর কানে গেলে বিপদে পড়ে যাবে নিরুপমা।’

‘না-না। ঠিক ম্যানেজ হয়ে যাবে।’ নিরুপমাদি বললেন।

‘আর দুটো দিন তোমাকে সময় দিলাম। দেখি, কী করে ম্যানেজ করো।’

টিফিনের সময় আধঘণ্টা ছুটি। নিরুপমাদি নবকুমারকে এক পাশে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘কাল এলে না কেন?’

‘আমি চিনতে পারিনি।’ আবার মিথ্যে বলল নবকুমার।

‘বাজে কথা বলবে না। যেভাবে বলে দিয়েছিলাম সেভাবে একজন অন্ধও চলে যেতে পারে। কত রান্না করেছিলাম তোমার জন্যে, জান?’

নবকুমার মুখ নামাল।

‘অল্পবয়সি কোনও মেয়ে ডাকলে তো ছুটে যেতে।’

‘না-না।’

‘শোনো। আমাকে সাহায্য করতে হবে।’

‘বলুন।’

‘এখানে বলব না। রিহার্সালের পর আমার সঙ্গে যাবে।’

নিস্তার পেয়ে নবকুমার দ্রুত পা চালাল। বড়বাবুর বেয়ারাকে বলল, সে দেখা করতে চায়। লোকটা ভেতরে গিয়ে অনুমতি নিয়ে আসার পর নবকুমার ঘরে ঢুকল।

বড়বাবু কিছু লিখছিলেন। মুখ না তুলে গম্ভীর গলায় বললেন, ‘কী দরকার?’

‘আজ্ঞে, শেফালি-মা বলেছেন—।’

সঙ্গে-সঙ্গে মুখ তুললেন বড়বাবু।

কাগজটা টেবিলের ওপর রেখে নবকুমার বলল, ‘ওঁকে এই নম্বরে ফোন করতে।’

‘ফোন করতে? কেন? ডিসিশন চেঞ্জ করেছেন নাকি?’

‘কী কথা যেন বলবেন।’

নাম্বার দেখে মোবাইলের বোতাম টিপলেন বড়বাবু। তারপর সেটা এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘উনি ধরলে, বলবে আমি কথা বলব।’

দামি মোবাইল কানে চেপে ধরতে-না-ধরতেই গলা শুনতে পেল সে।

নবকুমার বলল, ‘শেফালি-মা, আমি নবকুমার বলছি। বড়বাবু আপনার সঙ্গে এখন কথা বলবেন।’

‘দাও।’ শেফালি-মা যেন নির্লিপ্ত।

মোবাইল সেটটা নিয়ে বড়বাবু বললেন, ‘নমস্কার, নমস্কার। আপনি এখন কেমন আছেন? বা:। শুনলাম এই বয়সেও আপনি বেশ সুস্থ আছেন। হ্যাঁ।…আমার তো ব্ল্যাড প্রেসার, সুগার। ওষুধের ওপর থাকতে হয়। হ্যাঁ, বলুন। হুঁ, হুঁ।…মানে, আপনার মতো এত বড় মাপের অভিনেত্রী একটা সেন্টিমেন্টাল কারণে সরে দাঁড়ানোর জন্যে যাত্রা ইন্ড্রাস্ট্রির বিশাল ক্ষতি হয়েছে। নায়কেরা তো এখনও আপনাকে চাইছেন। আপনি যদি উপযুক্ত মর্যাদা পান তাহলে আবার শুরু করতে অসুবিধে কোথায়? হ্যাঁ, হ্যাঁ।…বলুন। আমি আপনাকে এই বছরই চাইছি।…বেশ। আমি আজই নবকুমারের হাত দিয়ে পাঠিয়ে দেব। আপনি পড়ে দেখুন। আমার বিশ্বাস আপনার ভালো লাগবে।…বেশ তো, তারপরই না হয় অন্য কথা হবে।…না-না। আপনার লিখিত সম্মতি না পাওয়া পর্যন্ত আমি কাউকে ব্যাপারটা জানাব না।…হ্যাঁ। অনেক ধন্যবাদ।’

ফোন অফ করে বড়বাবু বলছেন, ‘তুমি আজ রিহার্সালের পর সোজা বাড়ি ফিরবে। আর যাওয়ার আগে আমার সঙ্গে দেখা করবে। আমি একটা প্যাকেট দেব। সেটা শেফালি-মাকে দিয়ে দেবে। এটা টপ সিক্রেট। কেউ যেন জানতে না পারে।’

মাথা নেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল নবকুমার। বড়বাবু ডাকলেন, ‘দাঁড়াও’। তারপর ড্রয়ার খুলে একটা পাঁচশো টাকার নোট বের করে বললেন, ‘এটা রাখো। তুমি অনেক করেছ আমার জন্যে।’

‘না, না, আমি কিছুই করিনি।’ হাত নাড়ল নবকুমার।

‘আ:। রাখো তো!’

.

রিহার্সালের পরে বড়বাবুর দেওয়া প্যাকেটটা নিয়ে বেরুচ্ছিল নবকুমাার। কয়েক পা হাঁটতেই দেখল একটা ট্যাক্সিতে বসে আছেন নিরুপমাদি। হাত নেড়ে তাকে ডাকছেন। সে কাছে গেলে দরজা খুলে দিয়ে বললেন, ‘ওঠো।’

‘কেন?’

‘আমি তোমাকে কয়েকটা কথা বলব বলেছিলাম।’

‘আজ নয় দিদি। আজ আমাকে এখনই বাড়ি ফিরতে হবে।’

‘ঠিক আছে। আমি তোমাকে ট্যাক্সিতে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসব। ওঠো।’

ভ্যাবাচাকা খেয়ে ট্যাক্সিতে উঠেই নবকুমারের মনে হল, সর্বনাশ। নিরুপমাদির সঙ্গে ট্যাক্সিতে সোনাগাছিতে কী করে যাবে? এই সন্ধের সময়ে!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *