তেতাল্লিশ
মাস্টারদার শরীর পড়ে আছে ভ্যানে, অথচ সে ফিরে যাচ্ছে সোনাগাছিতে!
কিন্তু ছেলেটি তাকে বোঝাল, এখন নবকুমারের কিছু করার নেই। আহত হয়ে বেঁচে থাকলে অনেক কিছু করা যেত, বাঁচানোর চেষ্টা করতে নবকুমার ঝুঁকি নিতে পারত। কিন্তু লোকটা যখন বেঁচে নেই, তখন আর কী করতে পারে সে? থানায় গিয়ে যদি বলে, ওই মৃতদেহ তার পরিচিত তাহলেও লাশ মর্গে নিয়ে যাবে, পোস্টমর্টেম হবে। আর পুলিশ রগড়াবে নবকুমারকে। তার কোনও কথাই বিশ্বাস করতে চাইবে না। তার চেয়ে কাল সকাল হলে ভেবেচিন্তে লোকটার পরিচিত মানুষদের নিয়ে থানায় আসাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
রিকশা ছুটছিল। হঠাৎ কেঁদে উঠল নবকুমার। মাস্টারদার মুখ, কথাগুলো মনে আসতেই কান্না ছিটকে বের হল। ছেলেটা চুপ করে থাকল।
সোনাগাছিতে ঢুকে রিকশাওয়ালা দাঁড়িয়ে গেল। রিকশা থেকে নেমে ছেলেটা জিজ্ঞাসা করল, কত দিতে হবে? রিকশাওয়ালা মাথা নাড়ল, কী বলব? আপনার যা ইচ্ছে তাই দিন।
ছেলেটা পকেট থেকে একটা কুড়ি টাকার নোট বের করে লোকটার হাতে দিয়ে নবকুমারকে বলল, ‘তুমি চলে যাও। কাল সকালে তোমার সঙ্গে দেখা হবে। আচ্ছা চলো, তোমাকে এগিয়ে দিচ্ছি।’
‘না-না। আমি একাই যাচ্ছি।’ নবকুমার হাঁটতে লাগল।
ছেলেটা ডাকল, ‘শোনো।’
নবকুমার দাঁড়াল। ছেলেটা কাছে এসে জিজ্ঞাসা করল, ‘একটু মাল খাবে? মাল খেলে তোমার কষ্ট কমে যাবে। ঘুম আসবে।’
মাথা নাড়ল নবকুমার।
এখন মধ্যরাত পেরিয়ে গিয়েছে। সোনাগাছি গ্রামের রাস্তার মতো নিস্তব্ধ। বাড়ির দরজা বন্ধ। সে শব্দ করতে একটি মেয়ে এসে খুলে দিল, ‘কে মারা গিয়েছে?’
জবাব না দিয়ে ওপরে উঠে আসতেই মুক্তো দেখা দিল, ‘শেফালি-মা তোমার জন্যে জেগে বসে আছে।’
ঘরে ঢুকতেই শেফালি-মা কিছু বলতে গিয়েও সামলে নিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী হয়েছে?’
‘মাস্টারদা মরে গিয়েছে।’
‘অ্যাঁ? চমকে গিয়েছে শেফালি-মা।
‘ওর শরীর থানায় নিয়ে গিয়েছে। কাল সকালের আগে কিছু করা যাবে না।’
‘তুমি থানায় গিয়ে নিজের চোখে দেখে এসেছ?’
নি:শব্দে মাথা নাড়ল নবকুমার।
‘কী করে এসব হল?’
‘আমার সঙ্গে দেখা করে ফেরার সময় বোমাবাজির মধ্যে পড়েছিল বোধহয়। বিনা দোষে মরে গেল মানুষটা। উ:! আমাকে মাস্টারদা কলিকাতায় নিয়ে এসেছিল। থাকায় জায়গা, চাকরি সব তার জন্যে পেয়েছি। সেই মানুষটা দুম করে কোনও কারণ ছাড়াই মরে গেল!’
পাথরের মতো বসেছিলেন শেফালি-মা। হঠাৎ দরজার ওপাশে কান্নার শব্দ উঠল। মুক্তো কাঁদছে। অবাক হয়ে গেল নবকুমার। যেভাবে মাস্টারদার সঙ্গে মুক্তো কথা বলত তাতে মনে হত দু-চক্ষে দেখতে পারে না ওকে। অথচ এখন সে ডুকরে-ডুকরে কাঁদছে। এই কান্নাটা বিন্দুমাত্র বানানো নয়।
শেফালি-মা বললেন, ‘কাল সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। যাও শুয়ে পড়ো।’
.
অন্ধকার ঘরে চুপচাপ বসেছিল নবকুমার। এই ঘরে এসে মাস্টরদা তার কাছে কত কথা বলে গিয়েছে। প্রথম-প্রথম অভিভাবকের মতো ব্যবহার করত, শাসন করত। শেষের দিকে তাকে সাহায্যের জন্যে অনুনয় বিনয় করত। লোকটার বাড়িতে কে-কে আছে তা কখনও জিজ্ঞাসা করা হয়নি। যদি স্ত্রী সন্তান থাকে তাহলে তাদের খবর দেওয়া দরকার। কীভাবে দেবে? তাহলে কাল সকালেই দেশে যেতে হয়। হঠাৎ মনে হল, বড়বাবুর গদিতে নিশ্চয়ই মাস্টারদার ঠিকানা আছে। মাস্টারদা বলেছিল, তাকে চিঠি পাঠিয়ে ডেকে আনা হয়েছিল।
যারা বোমা ছুঁড়েছিল তারা মাস্টারদাকে চেনে না, শত্রুতা নেই। তা সত্বেও ওর শরীরে বোমা ছুড়ে মারল কেন? যে মেরেছে তার শাস্তি হওয়া দরকার। এ পাড়ার মানুষরা নিশ্চয়ই হামলাকারীদের চেনে। নবকুমার ঠিক করল, কালই এ ব্যাপারে খোঁজখবর করবে।
কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল। গানের শব্দে ঘুম ভাঙল। তখনও ভালো করে আলো ফোটেনি। সেই প্রভাতফেরীর দল গান গাইতে-গাইতে যাচ্ছে। কিন্তু আজ গানের লাইন বদলে গিয়েছে। দুজনের গলায় গান বাজছে। জানলায় গেল নবকুমার। আজ যেন দলটা একটু বড় হয়েছে। দুজন বয়স্ক মানুষ গাইছেন, ‘ও আমার দেশের মাটি, তোমার পায়ে ঠেকাই মাথা—।’
এই গান তারা স্কুলে প্রার্থনার সময় গাইত। সঙ্গে-সঙ্গে মনে পড়ে গেল, আজ পঁচিশে বৈশাখ। ইতি বলেছিল ভোরবেলায় ট্রামস্টপে দাঁড়িয়ে থাকবে। তাকে নিয়ে যাবে জোড়াসাঁকোয়। কিন্তু মাস্টারদা এখন মর্গে শুয়ে আছে। তার পক্ষে কোথাও যাওয়া অসম্ভব।
মুখ ধুয়ে সে বাইরে এসে দেখল শেফালি-মায়ের দরজা তো বটেই, মুক্তো যে ঘরে শোয় তার দরজাও খোলেনি। একটু ইতস্তত করল নবকুমার। ইতি নিশ্চয়ই দাঁড়িয়ে আছে ট্রামস্টপে। ওকে খবরটা দেওয়া দরকার। নেমে এল নবকুমার।
এ-বাড়ির সদর দরজা এখনও খোলা হয়নি। নবকুমার আজ প্রথম সেটা খুলল। রাস্তায় লোকজন নেই। হাঁটতে-হাঁটতে মোড়ের মাথায় পৌঁছে সে তাকাল মুখ ঘুরিয়ে। মাস্টারদা যেখানে পড়েছিল সেখানে এই কাকভোরে এক ফুলওয়ালা বসেছে ফুল নিয়ে। ওপাশের মন্দিরে ঢোকার আগে লোকে ওর কাছ থেকে ফুল কিনবে।
চিৎপুরে পৌঁছেই ইতিকে দেখতে পেল নবকুমার। কী আশ্চর্য, ইতি আজ সাদা শাড়ি পরে এসেছে। একেবারে পালটে গিয়েছে ওর চেহারা। চুল বেঁধেছে টানটান করে। তাকে দেখে হেসে বলল, ‘এমন কিছু দেরি হয়নি।’
নবকুমার গম্ভীর মুখে বলল, ‘আমার আজ যাওয়া হবে না।’
‘কেন?’
‘আমাকে এখানে যিনি এনেছিলেন, তাকে কাল রাত্রে গুন্ডারা বোমা মেরে খুন করেছে। আমার সঙ্গে দেখা করে ফিরে যাওয়ার পথে তিনি খুন হন। পুলিশ ওঁর শরীর নিয়ে গিয়েছে। আজ থানায় গিয়ে সেই শরীর ছাড়িয়ে শ্মশানে নিয়ে যেতে হবে। ওঁর বাড়িতে খবর দিতে হবে। বুঝতেই পারছ, আমার মন খুব খারাপ হয়ে আছে। আমি ভাবতেই পারছি না।’
‘কাল এখানে একজন বোমায় মারা গিয়েছে। তিনি—?’
‘হ্যাঁ।’
‘কিন্তু সকাল ন’টার আগে থানায় গেলে কেউ কোনও কথাই বলবে না।’
‘তাই?’
‘হ্যাঁ। এভাবে কেউ মারা গেলে শুনেছি পুলিশের ডাক্তার কাটাছেঁড়া করে দেখে তারপর বডি দেয়। তার জন্যেও অনেক সময় লাগবে।’
‘আমি কী করব? আমি ভাবতেই পারছি না—।’
‘উনি কি আপনার আত্মীয়?’
‘না। কিন্তু উনি চেয়েছিলেন বলেই আমি এখানে আসতে পেরেছি।’
‘তাহলে থাক। চলুন, ফিরে যাই।’
‘তুমি যাও। ওখানে যাবে বলে বেরিয়ে ফিরে যাচ্ছ কেন?’
ইতি একটু ভাবল। তারপর বলল, ‘একটা কথা বলব?’
‘হ্যাঁ।’
‘ওখানে গেলে আপনার মন থেকে ভার নেমে যাবে। আধঘণ্টা থেকে না হয় চলে আসবেন।’ ইতি মুখ তুলল।
সেইসময় একটা ট্রাম আসছিল বাগবাজারের দিক থেকে।
ইতি বলল, ‘চলুন।’
ইতস্তত করল নবকুমার। সে না গেলে যদি ইতির যাওয়া বন্ধ হয় তাহলে খারাপ লাগবে। সে বলল, ‘আমি টাকা নিয়ে বের হইনি।’
ট্রামটা থামতেই ইতি বলল, ‘ঠিক আছে। উঠুন।’
.
এই সাতসকালেই গান ভেসে আসছে গলির ভেতর থেকে। বিরাট লাইন পড়েছে। নবকুমার জিজ্ঞাসা করল, ‘লাইনে দাঁড়াতে হবে?’
‘যারা বাড়ির ভেতরে ঢুকে দেখতে চায় তাদের জন্যে লাইন। অনেক সময় লাগবে। পাশ দিয়ে চলুন, আমরা বাড়ির বাইরে থাকব।’ ইতি হাঁটতে লাগল।
একটা বিশাল প্যান্ডেল। গিজগিজ করছে লোক, এই সময়েই। ওপাশে মঞ্চে একজন গায়ক গাইছেন, ‘নয়ন ছেড়ে গেলে চলে, এলে সকল মাঝে—।’ নবকুমারের মনে হল এই গান যেন মাস্টারদার উদ্দেশ্যে গাওয়া হচ্ছে। গান শুনতে-শুনতে মন একটু-একটু করে হালকা হয়ে যাচ্ছিল।
নবকুমার লক্ষ করল, পঁচিশে বৈশাখের এই ভোরবেলায় যাঁরা ওখানে এসেছেন তাঁদের পোশাকে রুচি আছে। মহিলারাও কেউ চড়া সাজে সাজেননি। সে বাড়িটার দিকে তাকাল। এই বাড়িতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থাকতেন। হয়তো সে যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে তাঁর পা পড়েছিল। সেই ছেষট্টি বছর আগে যিনি চলে গিয়েছেন পৃথিবী থেকে, তাঁর জন্মদিনে মানুষ কেন এভাবে ছুটে আসে?
একের-পর-এক গান কবিতা শিল্পীদের কণ্ঠে উচ্চারিত হচ্ছিল।
ইতি জিজ্ঞাসা করল, ‘চা খাবেন?’
অবাক হয়ে তাকাল নবকুমার। ইতি বলল, ‘ওখানে বিক্রি হচ্ছে।’
মাথা নাড়ল নবকুমার, না। ট্রামের টিকিট ইতি কেটেছে। ফেরার সময়েও কাটবে। ওকে আর খরচ করতে দেওয়া উচিত নয়।
ইতি হাসল, ‘আমার খুব ইচ্ছে করছে।’
‘গান শুনতে ভালো লাগছে না?’
‘কেন লাগবে না? তার সঙ্গে চা খাওয়ার শত্রুতা থাকবে কেন? আসুন।’
.
বাড়িতে ফেরার পরে মিশ্র ভাবনায় আচ্ছন্ন হয়েছিল নবকুমার। মাস্টারদার জন্যে যে কষ্ট প্রবল হয়েছিল, সেটা যেন একটু মিইয়ে গিয়েছে। জোড়াসাঁকোর বাড়িটা, শিল্পীদের গাওয়া গান, মানুষের ঢল আর-এক পৃথিবীর দ্বার তার কাছে খুলে দিয়েছে। এ এক অদ্ভুত মন নিংড়ানো অনুভূতি।
সকাল ন’টায় শেফালি-মা তাকে ডেকে বললেন, ‘তুমি এখনই গদিতে যাও। বড়বাবু তোমাকে যেতে বলেছেন।’
‘বড়বাবু?’
‘মাস্টারের খবরটা তাকে এইমাত্র দিয়েছি। যা ব্যবস্থা করার উনি করবেন।’
একটু হালকা লাগল নবকুমারের। শেফালি-মা বললেন, ‘যা হওয়ার তা তো এ-পাড়ার মধ্যেই হবে। তুমি দুপুরে বাড়িতে এসে খেয়ে যাবে।’
মাথা নাড়ল নবকুমার।
.
খারাপ খবর বাতাসের আগে দৌড়ায়। নইলে সকাল সাড়ে-দশটায় গদিতে এত ভিড় জমত না। সবাই জেনে গিয়েছে, নবকুমারের সঙ্গে দেখা করে ফেরার সময় মাস্টার বোমার ঘায়ে মারা গিয়েছে। সুতরাং সবাই জানতে চাইছিল ঠিক কী ঘটেছে। নবকুমারের যতটুকু জানা ততটুকু তাকে বারবার বলতে হচ্ছিল। একজন জিজ্ঞাসা করল, ‘বোমা কি ডাইরেক্ট মাথায় লেগেছিল?’
‘আমি দেখিনি। সেখানে আমি ছিলাম না।’
আর একজন বলল, ‘কী দরকার ছিল মাস্টারের সোনাগাছিতে যাওয়ার! সোনাগাছির বোমাবাজিতে মারা গিয়েছে একথা তো বাড়ির লোককে বলা যাবে না।’
সাড়ে-দশটায় বড়বাবু গাড়ি থেকে নামলেন। ভিড় তাঁকে রাস্তা করে দিল। নিজের ঘরে ঢুকে তিনি নবকুমারকে ডেকে পাঠালেন।
আবার ওই এক প্রশ্ন, একই উত্তর দিল নবকুমার।
‘তুমি ওর বাড়ির লোকদের চেনো?’
‘না।’
‘তোমার সঙ্গে পরিচয় কী করে হয়েছিল?’
‘আমাদের গ্রামের স্টেশনের চায়ের দোকানে।’
‘হুঁ। আমাদের কাছে যে ঠিকানা আছে, তার থানায় খবর পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে বাড়ির লোক খবরও পেয়ে গিয়েছে। ওরা যদি বিকেলের মধ্যে চলে আসে তাহলে—। পুলিশ বিকেলেই বডি ছেড়ে দেবে।’ যেন নিজেকেই কথাগুলো বলছিলেন বড়বাবু।
‘আমি যাই?’
‘অ্যাঁ? হ্যাঁ। সবাইকে বলো, বিকেলে এখানে চলে আসতে। মাস্টারকে নিয়ে শ্মশানে যাবে সবাই।’ বড়বাবু বললেন।
‘আচ্ছা।’
‘ওহো, তুমি আসবে না। তোমার না এলেও চলবে।’
‘আমি শ্মশানে যাব না?’
‘গিয়ে কী করবে? তোমার তো আজ বিকেলে জরুরি কাজ আছে।’
অবাক হয়ে তাকাল নবকুমার।
‘অদ্ভুত ছেলে তো! তোমার তো এন টি ওয়ানে যাওয়ার কথা। যে চলে গিয়েছে, তার দাহ দেখার থেকে যে কাজটা করলে ভবিষ্যতে উপকার হবে, সেটা করা অনেক জরুরি। নবকুমার, আবেগ মানুষকে অন্ধ করে দেয়। তাই সেই আবেগের রাশ না টানলে পতন অনিবার্য। যাও।’ বড়বাবু ফোন তুললেন।
নবকুমারের মনে হল সে একটা পুতুল ছাড়া আর কিছু নয়।
