দুই
স্নান খাওয়া শেষ করে নবকুমার ঘোষণা করল। শোনামাত্র মা মুখে আঁচল চাপা দিয়ে সরে গেল সামনে থেকে। চিৎকার দূরের কথা, একচিলতে কান্নাও তাঁর গলা থেকে বের হল না। কিন্তু বাবা এসে দাঁড়াল সামনে, ‘যাচ্ছ যাও, কিন্তু কাল যদি তোমার মা মারা যায় তাহলে খবর পাঠাব কোন ঠিকানায়? সেটা দিয়ে যাবে।’
হকচকিয়ে গেল নবকুমার। মাস্টারদার সঙ্গে সে কলিকাতায় যাবে রোজগার করতে। এর বাইরে সে কিছুই জানে না। সেখানে যাওয়ার পরে যেখানে থাকবে সেটাই তার ঠিকানা হবে। মাস্টারদাও কিছু বলেনি। একবার বলেছিল, ‘মনে রেখো এখন তুমি একটা পাতা। গাছ থেকে খসে নদীর স্রোতে পড়েছ। নদী তোমাকে কোথায় নিয়ে গিয়ে তুলবে তা তুমি জানবে কী করে? নদী নিজেই জানে না। এই নদীর নাম কী জানো?’ হেসেছিল মাস্টারদা, ‘জীবন।’
এসব কথা শুনতে খুব ভালো লেগেছিল। এখন বাবার সামনে দাঁড়িয়ে সে বুঝতে পারল মনে যা দাগ কাটে মুখে তা বলা যায় না। নবকুমার নীচু গলায় বলেছিল, ‘কলিকাতায় যাওয়ার পর ঠিকানা জানতে পারব।’
‘ও।’ বাবা একটু ভাবল, ‘দিনসাতেকের মধ্যে যদি ঠিকানা না জানাতে পার তাহলে দয়া করে ফিরে এসো দশ দিনের মাথায়।’
বেরুবার সময় মা-বাবাকে প্রণাম করতেই বাবার প্রশ্ন, ‘সঙ্গে টাকা আছে?’
‘হ্যাঁ।’
‘কত?’
‘দুশো।’
‘সর্বনাশ। এত টাকা তুমি কোথায় পেলে?’
‘অনেকদিন ধরে জমিয়েছি।’
‘চমৎকার।’
‘মা!’
মা অন্যদিকে মুখ ঘোরানো। ‘কলিকাতা থেকে কোনও শাখচুন্নিকে বউ করে নিয়ে এলে আমি গলায় দড়ি দেব।’
হাতে একটা টিনের স্যুটকেস। স্যুটকেসের ওপর একটা লাল গোলাপ আঁকা। স্টেশনের পথে আসার সময় অন্তত তেরোজন হাজার প্রশ্ন করল। এই গ্রামের কেউ রোজগার করতে কলিকাতায় যায়নি। নবকুমার যখন যাচ্ছে, তখন নিশ্চয়ই অনেক বড়লোক হয়ে ফিরবে। কেউ-কেউ আবদার করল, নবকুমার ওখানে গিয়ে থিতু হলে ভরসা পেয়ে সে-ও যাবে।
রতনের দোকানে মাস্টারদা বসে পা দোলাচ্ছে। তাকে দেখে বলল, ‘ভালো করেছিস। শার্ট পাজামা পরলে চালাক-চালাক বলে মনে হয় না। তাই যে দেখবে, সে-ই তোকে ভালোমানুষ বলে মনে করবে। চল।’
সেকেন্ড ক্লাস ট্রেনে কলিকাতায় পৌঁছতে অনেক টাকার টিকিট কাটতে হল। ট্রেন এল। মাস্টারদা তাকে নিয়ে যে কামরায় উঠল সেটা যাত্রীঠাসা। কোনওমতে বেঞ্চির এক চিলতে জায়গা আবিষ্কার করে মাস্টারদা বলল, ‘দয়া করে বসে পড়। আমার জন্য চিন্তা কোরো না। আমি ঠিক জায়গা তৈরি করে নেব।’
.
.
কামরা দুলে উঠল, ট্রেন চলল। আধখানা জানলা দিয়ে শেষ বিকেলের আলোয় নবকুমার দেখতে পেল গ্রামে যাওয়ার রাস্তা, ভ্যানরিকশা, মুখার্জিদের পোড়ো শিবমন্দির পেছনে-পেছনে যাচ্ছে। তারপরেই মাঠঘাট, জঙ্গলের ছবি। বুকের ভেতরটা কীরকম শিরশির করে উঠল তার। চোখ বন্ধ করে বসে রইল কিছুক্ষণ। স্কুলে পড়ার সময় একজন প্রবীণ শিক্ষক কিছুদিনের জন্যে তাদের স্কুলে এসেছিলেন। তিনি বলতেন, ‘যখনই মন অনিশ্চিত হবে, সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না, ভয় পাবে তখনই চোখ বন্ধ করে বিবেকানন্দের কথা ভাববে। দু-হাত বুকের ওপর ভাঁজ করা সেই তেজোদীপ্ত মানুষটিকে বন্ধ চোখের পাতায় দেখতে চাইবে। দেখবে মনে বল এসে যাবে।’ সমস্যায় পড়লেই সে চোখ বন্ধ করে বিবেকানন্দকে স্মরণ করত। আজ এই সন্ধে নামা সময়ে ছুটন্ত ট্রেনের কামরায় বসে চোখ বন্ধ করে বিবেকানন্দকে দেখার পর ধীরে-ধীরে মন ধাতস্থ হল।
ইতিমধ্যে তিনটি স্টেশন ছুঁয়ে ট্রেন চলেছে অন্ধকার দিয়ে। মাস্টারদা ইতিমধ্যে জায়গা পেয়ে গেছে। আশেপাশের লোকদের এগিয়ে দেওয়া বিড়ি টানতে-টানতে তাদের গল্প শোনাচ্ছে। ও-পাশে কিছু লোক ঘুমোচ্ছে। হঠাৎ খেয়াল হল মাস্টারদার, ‘আরে, তুমি এখনও উচ্চিংড়ের মতো বসে আছো? কত লোক নামল, জায়গা করে নিলে না। শোনো নবকুমার, বঙ্কিমচন্দ্র মানুষের উপকার করতে তোমাকে কাঠ কাটতে পাঠিয়ে নৌকো ছেড়ে দিয়েছিল। তা থেকে তোমার শিক্ষা নেওয়া উচিত। ওই, ওইখানে গিয়ে আরাম করে বোসো।’
দূর থেকে চেঁচিয়ে কথাগুলি বলে আঙুল দিয়ে জায়গাটা দেখিয়ে দিল মাস্টারদা। জায়গাটা দেখে সিঁটিয়ে গেল নবকুমার। কামরার কোণের দিকে যে পরিবারটি চলেছে তাদের পাঁচজনের মধ্যে চারজনই মহিলা। একজন বৃদ্ধ ওদের সঙ্গে। স্টেশনে-স্টেশনে কিছু লোক নেমে যাওয়ায় ওরা হাত-পা ছড়িয়ে বসেছে। ওখানে গেলে ওরা নিশ্চয়ই খুশি হবে না।
‘আরে! ভাবার কী আছে?’ মাস্টারদা চেঁচল, ‘এই পৃথিবীর নিয়ম হল কেউ তোমাকে জায়গা করে দেবে না, তোমাকে নিজেই জায়গা আদায় করতে হবে। যাও।’ মাস্টারদা এর মধ্যেই যাদের সঙ্গী করে ফেলেছে, তারা দাঁত বের করে হাসছে দেখে নবকুমার উঠে দাঁড়াল। স্যুটকেস নিয়ে ভিড় সামলে কোণের দিকে গিয়ে দাঁড়াল সে। সবচেয়ে বয়স্কার বয়স অন্তত সত্তর। তারপর পঞ্চাশ, পঁয়ত্রিশ, পনেরো। ওরা তাকে দেখেও দেখল না। প্রায় ঘাড়ের কাছে স্যুটকেস হাতে দাঁড়িয়ে আছে একজন দেখে দলের ছুটকি চাপা গলায় বলল, ‘একটু কাত হয়ে শুয়ে পড়ি।’
বয়স্ক ব্যাপারটা না বুঝে বলল, ‘এই ভর সন্ধেবেলায় শুবি কীরে? হ্যাঁ! একটু পরে খাবার খেয়ে তারপর ঘুমাস!’
পঞ্চাশ বলল, ‘মা, বোতলে জল কম আছে।’
‘থাকবেই তো। ইস্টিশনে এসেই ঢোঁক-ঢোঁক করে এক পেট জল খেয়ে নিলেন ইনি। পইপই করে বললাম, যাও আবার জল ভরে নিয়ে এসো, কানেই তুলল না।’ বয়স্কা ঝাঁঝিয়ে উঠলেন।
একপাশে বসে বৃদ্ধ চোখ বন্ধ করে থেকেই বললেন, ‘কী করব! ট্রেন এসে গিয়েছিল যে। জল আনতে গেলে টেরেনে উঠতে পারতাম না।’
‘তাহলে খাবার খেয়ে জল চেয়ো না।’
ছুটকি বলল, ‘ঠিক আছে, ঠিক আছে। পরের স্টেশনে নেমে জল নিয়ে আসব।’
বয়স্কা চোখ কপালে তুলল, ‘সর্বনাশ! এই রাত্তিরে অজানা জায়গায় তুই যাবি জল আনতে? ঘাটে কি আর মড়া নেই যে তুই যাবি ভিড় বাড়াতে?’
ধমক খেয়ে ছুটকি চুপ। বৃদ্ধ বললেন, ‘কাউকে যেতে হবে না। আমিই যাব।’
পঞ্চাশ বলল, ‘না বাবা। যদি ট্রেন ছেড়ে দেয় আর তুমি উঠতে না পারো।’
‘তাহলে তোর মা দু-হাত তুলে নাচবে, তোরা নৃত্য দেখবি।’ বৃদ্ধ বললেন।
পঁয়ত্রিশ বয়স্কাকে ইশারা করল চুপ করতে। তারপর বলল, ‘তার চেয়ে কাউকে একটু ভালো করে বললেই হয়, এনে দেবে। মানুষের মনে তো এখনও দয়ামায়া আছে।’
বয়স্কা, ‘তাই নাকি? দেখি!’ মুখ ফিরিয়ে নবকুমারের দিকে তাকিয়ে একটু হাসার চেষ্টা করল। ‘ও ভালোমানুষের ছেলে, বলি যাওয়া হচ্ছে কোথায়?’
এতক্ষণ নবকুমারের মনে হচ্ছিল রেডিওর নাটক শুনছে। বলল, ‘কলিকাতায়।’
সঙ্গে-সঙ্গে পঁয়ত্রিশ আর পনেরো খিলখিল করে হেসে উঠল।
বয়স্কা ধমক দিল, ‘অ্যাই, থাম।’
বৃদ্ধও ধমক দিলেন, ‘হাসছিস কেন? হ্যাঁ, ছেলেবেলায় শুনেছি, আসল নাম ছিল কলিকাতা। সাহেবরা বলত ক্যালকাটা। তা থেকে কোলকাতা। তা বাবা, তুমি কি কোলকাতায় থাকো।’
‘না।’ নবকুমার বুঝতে পারছিল না এরা এইভাবে হাসল কেন? সে বইতে পড়েছে, কলিকাতা, সুতানুটি এবং গোবিন্দপুর নামে তিনটি গ্রাম ছিল। পরে তারা একত্রিত হলে নাম রাখা হয় কলিকাতা। তা হলে ভুল কী বলল?
‘এই প্রথম যাচ্ছ নাকি?’ বৃদ্ধের কৌতূহল কমছিল না।
‘হ্যাঁ।’
‘তা বলছিলাম কী, আমাদের একটু জল দরকার। আমি তো বুড়োমানুষ আর সঙ্গে, দেখতেই পাচ্ছ, সব মেয়েছেলে।’
এই সময় ট্রেনের গতি কমে এল। অন্ধকার পেরিয়ে একটু আলোকিত স্টেশনে গাড়ি থামতেই পঁয়ত্রিশ দু-দুটো জলের বোতল নবকুমারের দিকে এগিয়ে ধরল। হাতের স্যুটকেস কোথায় রাখবে বুঝতে পারছিল না সে। পঁয়ত্রিশ বলল, ‘এই, স্যুটকেসটা ধর।’
পনেরো ছোঁয়া বাঁচিয়ে স্যুটকেস ধরল।
বোতল দুটো নিয়ে দরজার দিকে পা বাড়িয়ে মাস্টারদার দিকে তাকাল নবকুমার। মাস্টারদা তখন তার পাশের লোকটিকে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে কিছু বোঝাচ্ছে।
কামরা থেকে নামল নবকুমার। আধা আলোছায়ায় মোড়া প্ল্যাটফর্মে জলের কল নজরে এল না। একজনকে জিজ্ঞাসা করতে সে দূরের দিকে হাত তুলল। নবকুমার দ্রুত পা চালাল। অনেকটা যাওয়ার পরে টিউবওয়েল চোখে পড়ল। তাকে ঘিরে একটা জটলা। শেষপর্যন্ত সুযোগ পেতেই সে হাতল নাড়তে-নাড়তে বোতলে জল ভরতে লাগল। এবং তখনই হুইসল দিয়ে ট্রেন চলতে শুরু করল।
একটা বোতলের গলা পর্যন্ত জল ভরে এসেছে, দ্বিতীয়টি ফাঁকা। সেই অবস্থায় দৌড়তে লাগল নবকুমার। ইতিমধ্যে ট্রেনের গতি বাড়ছে। যে কামরায় ওরা ছিল সেখানে পৌঁছনো অসম্ভব বুঝতে পেরে কোনওমতে সামনের কামরায় উঠে পড়ল সে। উঠে দেখল কামরাটা প্রায় ফাঁকা। দুজন লোক গম্ভীর হয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
‘নেক্সট স্টেশনে নেমে যাবে।’ একজন গম্ভীর গলায় বলল।
দ্রুত মাথা নাড়ল নবকুমার। তখনও তার বুকের ভেতরটা ধকধক করছিল। আর একটু হলেই ট্রেনটাকে ধরতে পারত না। মাস্টারদা নিশ্চয়ই খুব রেগে যাবে। অন্যের উপকার করতে গিয়ে নিজের বিপদ ডেকে আনার জন্যে ধমকাবে। এবং এটা মনে হতেই হেসে ফেলল সে। নবকুমার সহযাত্রীদের উপকার করতে কাঠ কাটতে জঙ্গলে গিয়ে পথ হারিয়েছিল। তাকে ফেলেই সহযাত্রীরা নৌকো নিয়ে চলে গিয়েছিল। তারও অবস্থা আর-একটু হলে ওইরকম হচ্ছিল।
হঠাৎ কানে এল, ‘পাগল নাকি? একা-একা হাসছে!’ শোনামাত্র নবকুমার গম্ভীর হয়ে গেল। সে বুঝতে পারল না এত বড় কামরায় মাত্র দুজন লোক বসে আছে কেন? যেখানে অন্য কামরায় যাত্রীরা ঠাসাঠাসি সেখানে একটা পুরো কামরা খালি যাচ্ছে?
পরের স্টেশনে ট্রেন থামতেই সে প্ল্যাটফর্মে নেমে দাঁড়াল। সঙ্গে-সঙ্গে দুজনের একজন দরজায় চলে এসে গম্ভীর গলায় বলল, ‘এটা মিলিটারির অফিসারদের জন্য। এর পরের বার না দেখে উঠলে বিপদে পড়বে। গেট আউট।’
দ্রুত পা চালাল নবকুমার। হঠাৎ কানে এল, ‘ওই যে, ওই যে।’
মুখ তুলে সে দেখতে পেল পনেরো বছরকে। কামরার দরজায় দাঁড়িয়ে হাত তুলে তাকে দেখাচ্ছে পঁয়ত্রিশকে। নবকুমার দরজার কাছে পৌঁছতে পঁয়ত্রিশ বলল, ‘উ: কী ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম আমরা। আপনি যদি জলের জন্যে ট্রেনে না উঠতে পারতেন তাহলে আমরাই দায়ী হতাম।’
পনেরো বলল, ‘আগে ওকে ওপরে উঠে আসতে বলো তারপর এসব শোনাও।’ নবকুমার লক্ষ করল দূর থেকে তাকে দেখে পনেরোর মুখে যে উচ্ছ্বাস ঠিকরে উঠেছিল এখন তা উধাও। সে ওপরে উঠে এসে এক বোতল জল পঁয়ত্রিশের দিকে এগিয়ে ধরল। ‘কোনওমতে একটাই ভরতে পেরেছিলাম।’
‘তাতেই হবে। অনেক ধন্যবাদ।’ ওরা ফিরে গেল নিজের-নিজের জায়গায়।
মুখ ফেরাতেই চোখাচোখি হল মাস্টারদার সঙ্গে। বিড়ি টানতে-টানতে উঠে এল মাস্টারদা, সামনে দাঁড়িয়ে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল।
‘তুমি কার সঙ্গে কলিকাতায় যাচ্ছ?’
‘আপনার সঙ্গে।’
‘অতএব আমার কিছু দায়িত্ব থেকেই যাচ্ছে তোমার সম্পর্কে।’
মুখ তুলল না নবকুমার।
‘পরোপকার করার ধান্দায় যদি অজানা স্টেশনে জল আনতে ছুটে যাও এবং ফিরে না আস তাহলে বঙ্কিমবাবু যাই বলে থাকুন আমি তোমাকে গর্দভ ছাড়া আর কিছু বলব না। দ্বিতীয়বার এই কর্মটি কোরো না।’ বিড়ির বাকিটা বাইরে ছুড়ে ফেলে খিকখিক শব্দে হাসল মাস্টারদা।
বকুনির পরেই হাসিতে অবাক হল নবকুমার, ‘হাসছেন কেন?’
‘হাসব না? তুমি তো দেখছি জব্বর মেয়ে-কপালে ছোকরা। ট্রেনে উঠতে-না-উঠতেই মেয়ে জুটিয়ে ফেললে। তা-ও একটা নয়, এক জোড়া?’
‘কী যা তা বলছেন?’
‘যা-তা? বোনঝি বলে আমার দোষ, মাসি বলে আমার!’
‘আপনি কী করে এদের সম্পর্ক জানলেন?’
‘এটা জানতে না পারলে চিৎপুরে করে খাচ্ছি কী করে? তোমাকে জল আনতে পাঠাল কেন বলে ধমকাতেই সব বেরিয়ে পড়ল। তবে একটা কথা শোনো, মেয়ে-কপালে হও অথবা পরোপকারে ঝাঁপাও, সবসময় মনে রাখবে তুমি একটা ঘোড়া, তোমাকে রাশ টেনে নিজেকে থামাতে হবে।’ মাস্টারদা চলে গেল তার জায়গায়।
নবকুমার ভেবেছিল, সে ফিরে এসে সবার কাছে সহানুভূতির কথা শুনতে পাবে। মানুষের উপকার করতে যাওয়াটা এখন অপরাধ বলে মনে হল।
স্যুটকেসটা নেওয়ার জন্য সে মহিলাদের কাছে যেতেই বয়স্কা বলল, ‘খুব চিন্তায় পড়েছিলাম বাবা। কোনও সমস্যা হয়নি তো?’
‘না।’
‘বেশ সাহসী মনে হচ্ছে!’ পঁয়ত্রিশ কথাটা বলে ঠোঁট মোচড়াল।
‘আমার স্যুটকেসটা!’
‘ওমা, তুমি তো কোলকাতায় যাবে, এখনই স্যুটকেস নিয়ে কী করবে! এসো! ওখানে বসো। বাড়ি থেকে কি খাবার এনেছ? বয়স্কা জিজ্ঞাসা করল।
‘না।’
‘তা হলে তো তোমাকে বসতেই হবে। ও ছুটকি, একটু জায়গা করে দে না।’ যাকে বলা হল তার মুখ গম্ভীর, ‘আবার?’
‘ওহো! আর ভুল হবে না।’ বয়স্কা হাসল।
পনেরো বছর খানিকটা শরীর সরালে বসার জায়গা পেল নবকুমার। সন্তর্পণে সে বসল সেখানে। বসেই মাস্টারদার দিকে তাকাল। মাস্টারদার মুখ দেখা যাচ্ছে না ওখান থেকে।
এইবার বয়স্কা ব্যাগ থেকে অনেকগুলো কৌটো বের করে খাওয়ার ভাগ করতে শুরু করল। পঞ্চাশ তাকে সাহায্য করছিল। গোটা চারেক রুটি, তরকারি আর একটা মিষ্টি শালপাতায় সাজিয়ে বয়স্কা এগিয়ে ধরতে পঁয়ত্রিশ সেটা নিয়ে নবকুমারকে দিল। নবকুমার অপেক্ষা করল। আজ দুপুরে বাড়ির খাবার সে তৃপ্তি করে খেতে পারেনি। এখন খাবার দেখার পর খিদে বেশ চাগিয়ে উঠল। কিন্তু আগেই খেতে শুরু করলে অভদ্রতা হবে বলে সে চুপচাপ বসে রইল।
খাওয়া শুরু করার পর বয়স্কা জিজ্ঞাসা করল, ‘কেমন লাগছে রান্না?’
বৃদ্ধ এতক্ষণ চুপচাপ ছিলেন। এবার বললেন, ‘এটা আবার রান্না নাকি? একটা যাহোক তরকারি বুঝলে হে, নামটা কী যেন—?’
‘আজ্ঞে, নবকুমার।’
পাশে বসা পনেরো বছর ফিক করে হেসে উঠল।
নবকুমার বুঝল, এই মেয়েটার অকারণে হাসির অভ্যেস আছে।
‘হ্যাঁ, বুঝলে হে নবকুমার, আমার মায়ের হাতের রান্না খেলে ভুলতে পারবে না।’ বৃদ্ধ চোখ বন্ধ করে বললেন, ‘অমৃত হার মানে?’
‘কান ঝালাপালা হয়ে গেল। যেন অমৃত কত খেয়েছে!’ বয়স্কা বলল। সঙ্গে-সঙ্গে বৃদ্ধ চুপ। খেতে একটু অসুবিধে হচ্ছিল নবকুমারের। আলু-পটলের তরকারিতে যেন চিনি ঢেলে দিয়েছে রান্নার সময়। তাদের বাড়িতে রান্না হয় একটু ঝাল-ঝাল। শুকনো লঙ্কা নয়, কাঁচা লঙ্কার ঝাল থাকলেও স্বাদ হয় ভালো। তরকারিতে মিষ্টি খাওয়ার কথা ওরা ভাবতেই পারে না। তবু খেতে হল।
‘যে এনেছে সে এক ঢোঁক জল প্রথমে খাক।’ পঁয়ত্রিশ বোতল এগিয়ে ধরল। ঠিক এক ঢোঁক জল গলায় ঢেলে শালপাতা বাইরে ফেলে দিল নবকুমার জানলা গলিয়ে। হঠাৎ তার খারাপ লাগা শুরু হল। একসঙ্গে এসে সে একা-একা খেয়ে নিল আর মাস্টারদা না খেয়ে রয়েছে। নবকুমার উঠল। মাস্টারদার কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘খাওয়াদাওয়া করবেন না?’
‘সামনের স্টেশনে পাঁচ মিনিট থামবে। তখন পুরি আর তরকারি খাব।’
‘আমাকে ওরা জোর করল! অবশ্য খেতে একটুও ভালো লাগেনি। কী মিষ্টি!’
‘পেটে তো গেছে। আরে এতে সঙ্কোচের কারণ নেই। একজনের খাওয়া খরচ তো বেঁচে গেল। পরে ওটা কাজে লাগবে। মেয়েছেলেগুলোকে শুধু ঘাড়ে চড়তে দিও না।’
