এক
বাবা বলেছিল, ‘যেতে চাইলে বাধা দেব না। নিজের পায়ে দাঁড়াবি, গোটা জীবন তোর সামনে পড়ে আছে, সেটা যাতে ভালোভাবে কেটে যায়, তার জন্য চেষ্টা করবি বইকি।’
ওপাশে তখন মায়ের আঁচলচাপা কান্না বাজছে। সেই কান্না যখন থামে, কথা বের হয়। আর প্রতিটি কথায় দু:খ মাখামাখি, ‘বাপ ঠাকুরদা তো এখানেই জীবন কাটাল। জমিতে খাটলে কি ফসল পাওয়া যায় না? জঙ্গলে ঢুকলে কাঠ, ফল তো পাওয়াই যায়। নদীতে কমতে-কমতেও মাছ মেলে জাল ফেললে। তাহলে এই জায়গা ছেড়ে দূরে যাওয়ার কী দরকার? বাপ হয়ে যদি ছেলের সর্বনাশ করে তাহলে আর কে ঠেকাবে? আমার মরে যেতে ইচ্ছে করছে।’ কথা কমলো, কান্না শুরু হল, আবার। ওই এককথা।
বাপ গলা চড়াল, ‘ও কী গরু না ছাগল যে উঠোনে দড়ি বেঁধে রাখবে! আমাদের সময়ে কিছু ছিল? তিনমাইল দূরে ইস্কুল, দশমাইল দূরে কলেজ। বেশ করেছি ওকে পড়িয়েছি। নিজে সাধ মেটাতে পারিনি, ওকে দিয়ে মিটিয়েছি।’
‘পড়িয়ে মাথা কিনে নিয়েছ। ঘরে আগ দিয়ে হাওয়া করেছ!’
বাবা মাথা নাড়ল, ‘শোনো, যেতে চাইছ যখন যাও। আমাদের জন্যে চিন্তা কোরো না।’
‘এ কী বলছেন!’ সে তখন মাথা তুলল।
‘যা সত্যি তাই বলছি। শুঁয়ো যখন প্রজাপতি হয় তখন সে উড়তে ভালোবাসে। হ্যাঁ, যেতে চাইছ যখন তখন কামাখ্যা অবধি যেতে পারো। শুনেছি সেখানে কাঁচা বয়সের ছেলে গেলে মন্ত্র পড়ে ছাগল বানিয়ে রাখে। শোনা কথা। কিন্তু সেই ছাগল বলি দেওয়া হয় না। তুমি কামাখ্যায় গেলে ছাগল হয়েও বেঁচে থাকতে পারো, কিন্তু দোহাই, ওই কলিকাতায় যেও না। কলিকাতা তোমাকে আস্ত গিলে ফেলবে। মরে ভূতও হতে পারবে না তাহলে। হ্যাঁ।’
বাবা বলল।
‘কলিকাতা তো একটা নগরের নাম। আমাদের পশ্চিমবাংলার রাজধানী। মুখ্যমন্ত্রী, মন্ত্রীরা সবাই সেখানে থাকেন।’ একটু প্রতিবাদ জানিয়েছিল সে।
‘তাঁরা কি পথঘাটে ঘুরে বেড়ান? স্বর্গে যেমন দেবতারা থাকেন তাঁরাও সেখানে আলাদা থাকেন। দেবতারা থাকেন বলে রাক্ষস দৈত্য কি নেই? তাহলে প্রতি বছর দুগ্গা পুজো হত না। কাঁচা বয়সের ছেলে পেলে কলিকাতায় মেয়েমানুষরা হাড্ডি থেকে মাস বের করে গিলে ফেলে। এ গল্প আমি অনেক শুনেছি।’ বাবা মাথা নাড়ল।
সঙ্গে-সঙ্গে মায়ের কান্না আরও জোরালো হল।
এতক্ষণে তাদের উঠোনে বেশ ভিড় জমে গিয়েছে। আশপাশের বাড়ির লোকজন গম্ভীর মুখে ওদের দেখছে। হঠাৎ হর্ষবর্ধনকাকাকে ভিড়ের মধ্যে এসে দাঁড়াতে দেখে ঈষৎ বল পেল সে। এগিয়ে গিয়ে বলল, ‘কাকা, আপনি তো গ্রামপ্রধান। স্কুলের পড়া শেষ করেছিলেন, অনেক খবর রাখেন, বাবাকে একটু বুঝিয়ে বলুন।’
হর্ষবর্ধন এগিয়ে এল, ‘বোঝাবার কিছু নেই। তোমার বাবা তাঁর মতো ঠিক কথা বলেছেন।’
‘কথাটা সত্যি বলে মনে হচ্ছে আপনারাও?’ অবাক হয় নবকুমার।
‘কোনটে সত্যি কোনটে মিথ্যে তা কি এক কথায় বলা যায়? এই যেমন, একজন জিজ্ঞাসা করল, আচ্ছা, গাছ চিনব কী দিয়ে? একজন জবাব দিল, ফল দিয়ে। আমফল, জামফল, কাঁঠালফল মানে সেইসব গাছ। তাই শুনে আর-একজন বলল, যে গাছে ফল ফলে না তার পরিচয় পাতা দিয়ে। আবার ফল ফলে না কিন্তু ফুল ফোটে সেই গাছের পরিচয় ফুল দিয়ে। বুঝলে হে, কতগুলো সত্যি বেরিয়ে এল! কোনওটাকে অস্বীকার করতে পারবে?’ হর্ষবর্ধন মাথা নাড়ল, ‘তার পরেও আছে। ফল, পাতা, ফুলের পরেও আছে। সেটা হল শেকড়। মাটি খুঁড়ে আমরা দেখি এটা ওল, কিংবা কচু। কচুর আবার কত রকম, সোনাকচু, মানকচু, মুথিকচু। তাই বলছিলাম, তোমরা বাবা তাঁর মতো ঠিক কথা বলেছেন।’
বাবা বলল, ‘এখন যদি মাথায় ঢোকে!’
‘এই দ্যাখো, এত বছর বয়স হয়ে গেল, আমি কখনও কলিকাতায় যাইনি। কেন যাইনি? না, প্রয়োজন পড়েনি তাই যাইনি। এই গ্রামের মানুষের সেবা করতেই সময় চলে যাচ্ছে। কিন্তু যারা গিয়েছে তারাই বলেছে, কলিকাতায় পা দিলে মনে নেশা ধরে। যারা নেশা করে তাদের বেশিরভাগ মাটিতে গড়াগড়ি খায়, আমরা বলি মাতাল হয়ে গিয়েছে গো! আবার কেউ-কেউ দেখবে নেশা করে দিব্যি মাথা উঁচু করে ভাটিখানা থেকে বাড়িতে ফিরে যায়, একটুও পা টলে না। এই দ্বিতীয় লোকটির মতো যদি চলতে পারো তাহলে কলিকাতায় গেলে তোমার কোনও ক্ষতি হবে না।’ হর্ষবর্ধন হাত নাড়ল, ‘এবার আপনারা যে যার কাজে চলে যান, এদের কথা বলতে দিন।’
নবকুমার হর্ষবর্ধনকে বলল, ‘আপনি মা-বাবাকে বুঝিয়ে বলুন কাকা!’
হর্ষবর্ধন ততক্ষণে পড়শিদের হাত নেড়ে বিদায় করেছে। কাছে এসে বলল, ‘বলছ যখন তখন তো নাক গলাতেই হয়। কী বলো দাদা?’
বাবা বলল, ‘দ্যাখো, ওটা আবার ভোঁতা না হয়ে যায়।’
‘তুমি দেখছি বিপুল খেপে আছ। তা নব, তুমি কলিকাতায় কেন যেতে চাও?’ গুছিয়ে বলল হর্ষবর্ধন।
‘আজ্ঞে, রোজগার করতে। এখানে যা পাওয়া যায় তা বাবাই ঘরে আনতে পারেন। তাতে তো কিছুই হয় না। আমি তো একটু-আধটু পড়াশোনা করেছি। কলিকাতায় গেলে কিছু-না-কিছু কাজ পেয়ে যাব।’ নবকুমার বলল।
‘অ। ভালো। কিন্তু কলিকাতায় যাবে তো ট্রেনে। তার ভাড়া কত জানা আছে?’
‘হ্যাঁ। বন্ধুরা বলেছে চাঁদা তুলে টিকিট কেটে দেবে।’
‘বন্ধুরা? মানে তোমার সঙ্গে যাদের দেখি? তারা তো কোনও ভালো কাজে এক পয়সা চাঁদা তোলে না! বেশ, কলিকাতায় থাকবে কোথায়? খাওয়াবে কে?’ হর্ষবর্ধন হাসল।
‘প্রথম-প্রথম কষ্ট হবে। কিন্তু তারপর ঠিক ব্যবস্থা হয়ে যাবে।’
‘এবার বলো তো বাবা, তোমার মাথায় এসব ঢোকাল কে?’
‘নানান মানুষের কথা শুনে আমার মনে হয়েছে। স্কুলে পড়েছি, বিদ্যাসাগরমশাই বীরসিংহ গ্রাম থেকে হাঁটতে-হাঁটতে কলিকাতায় গিয়েছিলেন। না গেলে তিনি বিদ্যাসাগর হতেন না।’ মুখে আলো ফুটল নবকুমারের।
হর্ষবর্ধন মুখ ফেরাল, ‘দাদা। যেতে দাও। ঠোকর খাবে। তারপর একসময় সুড়সুড় করে ফিরে আসবে।’
মা এতক্ষণ চুপ করে শুনছিল। এবার আচমকা তার গলা থেকে কান্না ছিটকে বেরোল। অবশ্য সেটাকে চিৎকার বললেও কম বলা হয়।
হর্ষবর্ধন বলল, ‘ও বউদি, থামুন! এরকম মরাকান্না কাঁদবেন না।’
‘আমার এক ছেলে, কলিকাতার রাক্ষুসিরা আস্ত গিলে খাবে, আমি কাঁদব না ঠাকুরপো? বুক আমার শুকিয়ে যাচ্ছে। বেশ, যাবে যখন তখন যাক, কিন্তু যাওয়ার আগে ওকে বিয়ে করে বউ রেখে যেতে হবে। এই বলে দিলাম।’ মা বলল।
বাবার চোখ বড় হয়ে গেল, ‘মাথাটা গেছে, একদম গেছে। ও হর্ষ, এবার আমিই যে পাগল হয়ে যাব।’
‘তাতো বলবেই। ঠাকুরপো, পিছুটান থাকলে ও ঘরে ফিরবেই।’ মা বলল।
বাবা বলল, ‘দ্যাখো হর্ষবর্ধন, কাদের সঙ্গে ঘর করছি। রোজগার নেই যার, বাপের ঘাড়ে বসে খাচ্ছে তার বিয়ে দিয়ে বউ আনতে হবে ঘরে। আজকালকার কোনও মেয়ে এমন ছেলেকে বিয়ে করতে রাজি হবে? আর যদি হয় তাহলে তাকে আমি খাওয়াব কেন? অসম্ভব।’
আলোচনাটা সেখানেই থেমে থাকবে না তা নবকুমার জানে। সে কলিকাতায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর থেকেই এটা শুরু হয়েছে। আর কথা না বাড়িয়ে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এল নবকুমার।
.
স্টেশনের সামনে একটাই চায়ের দোকান। সারাদিনে ট্রেন থামে ছয়বার। তখন চা-বিস্কুট বিক্রি হয়। দোকানটা ছিল হরিজ্যেঠুর। সন্ন্যাস রোগে মারা যাওয়ার পর ওর ছেলে রতন দোকান চালাচ্ছে। ছেলেবেলায় তার সঙ্গে রতন কিছুদিন স্কুলে গিয়েছিল, সেই সুবাদে বন্ধুত্ব।
কাঁচা পয়সা হাতে আসার পর থেকে রতনের চালচলন বদলেছে। এই বয়সেই প্রকাশ্যে চারমিনার খায় সে। তাকে দেখে রতন সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ল, ‘আয়। শুনলাম তোকে তোর মা যেতে দেবে না!’
‘হুঁ।’ বেদিতে বসল নবকুমার।
‘চা খাবি।’
‘না।’
‘শালা লোকে বিনি পয়সায় বিষ পেলেও খেয়ে নেয়, তোর কী হল?’
‘ভালো লাগছে না। মাস্টারদা এসেছিল?’ জিজ্ঞাসা করল নবকুমার।
‘আজ ট্রেনের চাকা খোঁড়া হয়ে গেছে। এসে পড়ল বলে।’ রতন তার সহকারীকে ইশারায় চা বানাতে বলল।
তারপর সিগারেটের শেষটা ছুড়ে ফেলে জিজ্ঞাসা করল, ‘কলিকাতায় গিয়ে কী করবি?’
‘জানি না।’
‘জানিস না যখন তখন যাচ্ছিস কেন?’
‘ওখানে গেলে ঠিক কাজ পেয়ে যাব। চেষ্টা করলে টাকা রোজগার করা যায়। এখানে থেকে কী হবে? হাজার চেষ্টা করলেও কোনও রোজগার হবে না। বাপ ঠাকুরদার মতো জমি চাষ করে কোনও মতে বেঁচে থাকতে হবে।’ ওর কথার মধ্যেই দূরে ট্রেনের হুইসল বেজে উঠল। রতন এবার ব্যস্ত হল। তার সহকারীকে ধমকে চা রেডি করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
ট্রেনটা ঢোঁড়া সাপের মতো হেলেদুলে এসে দাঁড়াল স্টেশনে। কিছু লোক নামছে। ভ্যান রিকশাওয়ালা চেঁচিয়ে এক-একটা জায়গার নাম বলছে। একজন-একজন করে খদ্দের জুটে গেল রতনের। হাতে-হাতে চায়ের গ্লাস আর লেড়ো বিস্কুট ধরিয়ে দিল রতন।
এইসময় একটা সিড়িঙ্গে লোক এসে রতনকে জিজ্ঞাসা করল, ‘ভাইটি, দক্ষিণপাড়া চেনো?’
‘জন্মেছি এখানে, না চিনে পারি? চা?’
‘না-না। অ্যাসিড হয়। কীভাবে যাব?’
‘ডানদিক দিয়ে চলে যান। কার বাড়িতে যাবেন?’
‘হলধর রায়।’
নবকুমারের দিকে একবার তাকাল রতন। তারপর বিনীতভাবে বলল, ‘উদ্দেশ্যটা কী যদি বলেন তাহলে আপনাকে সাহায্য করতে পারি।’
‘আর বলো না। আমার এক শ্যালিকাকে কেউ বলেছে হলধরবাবুর একটি বিবাহযোগ্য পুত্র আছে। হলধরবাবুর স্ত্রী তার বিয়ে দিয়ে ঘরে গৌরী আনতে চান। শ্যালিকার চাপে বাধ্য হয়ে খবর নিতে আসতে হল। আচ্ছা, চলি।’ লোকটা ঘুরে দাঁড়াল।
সঙ্গে-সঙ্গে রতন বলল, ‘দাঁড়ান, দাঁড়ান। আপনার শ্যালিকার মেয়ে কি কানা বোবা অথবা খোঁড়া? মানে, বিয়ে দিতে পারছেন না?’
‘অ্যাঁ! তার তো বয়স মাত্র চৌদ্দ। কোনও খুঁত নেই।’ লোকটার চোখ ছোট হল।
‘তাহলে না যাওয়াই ভালো।’ রতন আর-একবার নবকুমারের দিকে তাকাল।
‘কেন?’
‘রক্তের দোষ আছে ছেলেটার। দু-বছর আগে মনসামেলার সময় যে খারাপ মেয়েরা এসে হোগলার ছাউনিতে ব্যাবসা করতে আসে তাদের কাছে গিয়েছিল তো! গঞ্জের ডাক্তারের ওষুধে রোগ কমেছে। ওর মায়ের ধারণা, ছেলের বিয়ে দিলে সেটা একদম সেরে যাবে।’ মাথা দুলিয়ে-দুলিয়ে বলল রতন। তারপর অন্য খদ্দেরদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
লোকটা হতভম্বের মতো কিছুটা সময় দাঁড়িয়ে থেকে হনহন করে স্টেশনে ফিরে গেল। উলটোদিক থেকে আর-একটা ট্রেন আসছে। এই স্টেশনে সান্টিং হবে। দুটো ট্রেন দু-দিকে চলে যাবে। এত তাড়াতাড়ি ফেরার ট্রেন পেয়ে লোকটা যেন বেঁচে গেল।
দোকানের ভিড় কমে গেলে রতন চিৎকার করল, ‘তোকে বাঁচিয়ে দিলাম।’
‘কিন্তু তাই বলে ওই দুর্নাম দিলি তুই। এই লোকটা তিন ভুবনের মানুষকে বলে বেড়াবে কথাটা। আমি কি কোনওদিন ওইসব মেয়েমানুষের কাছে গিয়েছি?’ সোজা হয়ে দাঁড়াল নবকুমার। অনেকক্ষণ নিজেকে সামলে রেখেছে তা বোঝা যাচ্ছিল।
‘আহা, চটছিস কেন? এছাড়া লোকটাকে আটকানো যেত না। ব্যাটা চৌদ্দ বছরের শালির মেয়েকে তোর কাঁধে চাপিয়ে দিত। এই জন্যে বলে যেচে তোদের উপকার করতে নেই।’ দ্বিতীয় ট্রেনটি স্টেশনে পৌঁছে যেতে রতন কথা বন্ধ করল। এখন তার বিক্রির সময়। সে হাঁকতে লাগল, ‘চা, চা, গরম চা। চাগ্রম!’
দ্বিতীয় ট্রেন থেকে নেমে যে লোকটা এগিয়ে এল বয়স বছর তিরিশেক। পরনে পাজামা শার্ট। চুল খুলির সঙ্গে সাঁটা। একটু বাবরি রেখেছে। হাঁটাচলা কথা বলা, এমনকি হাসিতেও মেয়েলি ছাপ স্পষ্ট।
‘এই যে কলির কেষ্ট, মুখে মেঘ কেন?’ লোকটা বেঞ্চিতে বসল।
‘আর বলবেন না মাস্টারদা। বাড়ির সবাই আমাকে পাগল করে দিচ্ছে।’
‘ওমা। কেন গো?’
‘আমি কলিকাতায় রোজগারের জন্যে যাব বলতেই—!’ কথা শেষ করল না নবকুমার।
‘অ। এই কথা। বড়-বড় সাধুদের সাধনা নষ্ট করতে দেবতারাই কত বাধা তৈরি করত। তুমি তো মানুষ। অর্জুনের মতো হও। সামনে মাছের চোখ ছাড়া আর কিছু নেই। আমি বলি কী, আজ বিকেলেই চলো।’ মাস্টারদা হাত নেড়ে বলল।
‘আজ বিকেলেই? মানে, এত তাড়াতাড়ি?’
‘ওই তো মুশকিল। মনটাকে পাখির মতো করে নাও হে। যেই ইচ্ছে হল অমনি ডানা মেলে আকাশ ধরলে। এ কি বিয়ে করতে যাচ্ছ? দিন ঠিক করে লগ্ন কখন জেনে তবে বেরুবে!’ মাস্টারদা হাঁকল, ‘ও রতনা, চা খাওয়াবে না?’
‘একটু দাঁড়াও!’ রতন ভিড়ের ভেতর থেকে উত্তর দিল।
মাস্টারদা বলল, ‘উটের মতো দাঁড়িয়ে কেন বন্ধু? বসো। হ্যাঁ, আজ সকালেই খবর পাঠিয়েছেন ম্যানেজারমশাই। নতুন পালার রিহার্সাল শুরু হচ্ছে। আমার কথা ভেবে একটা ফাটাফাটি পার্ট লেখা হয়েছে। খবর পাওয়ামাত্র যেন চলে আসি। শোনামাত্রই বুকের ভেতর কাতলা মাছ ঘাই মারতে শুরু করল। তা তুমি যখন মনস্থ করেছ তখন চলো আমার সঙ্গে আজই। দুই বন্ধুতে যাই রাজধানীতে।’
‘বেশ। তাই যাব। কিন্তু এখনও বেশি টাকা জোগাড় করতে পারিনি।’
‘কত পেরেছ?’
‘দুশো।’
খিলখিলিয়ে হাসল মাস্টারদা, ‘আমার পকেটে তো শুধু টিকিটের দাম। ওটা না থাকলে শ্রীঘরে পচতে হবে।’
‘খাওয়া থাকা—।’
‘ঠিক হয়ে যাবে। নিজেকে স্রোতে ভাসা কুটো ভেবে নাও। ঠেকবে, আবার এগোবেও। মাথার ওপরে চিন্তামণি থাকতে তুমি চিন্তা করবে কেন? দেখবে, তিনিই ঠিক চিনি জুগিয়ে যাবেন। কাউকে বলার দরকার নেই যে তুমি আজই যাচ্ছ!’ রতনের সহকারীর হাত থেকে চায়ের গ্লাস নিয়ে লম্বা চুমুক দিয়ে মাস্টারদা বলল, ‘তাহলে গোপন কথাটি রবে না গোপনে।’
মাস্টারদার কথা বলার ধরন খুব ভালো লাগে নবকুমারের। বেশ নতুন-নতুন কথা শোনা যায়। কী মিষ্টি।
ভিড় চলে গেলে রতন এসে বসল ওদের পাশে। ‘বুঝলে মাস্টারদা, তুমি যখন ওকে কলিকাতায় নিয়ে যাচ্ছ তখন যাত্রাপার্টিতে লাগিয়ে দাও।’
গ্লাস সহকারীর দিকে এগিয়ে মাস্টারদা বলল, ‘ছাগলকে দিয়ে লাঙল টানাতে পারবে? পারলে জমিতে লাঙলের ফলা বসবে?’
‘তুমি ওকে ছাগল বলছ?’ হেসে ফেলল রতন।
‘নিজেকে বলদ বললে ওকে ছাগল বলতেই পারি। যে সাঁতার জানে না তাকে জলে ফেলে যদি বলি কাটো সাঁতার, পারবে? অভিনয়, গান হল সাধনার বস্তু। অনেক অনুশীলন, অনেক পরিশ্রম করতে এক কণা পাওয়া যায়।’
‘এক কণা? বাকিটা?’
‘জন্মাবার সময় তিনি দিয়ে দেন। যাও হে বাবু, তৈরি হয়ে এসো। বিকেল-বিকেল ট্রেন ধরতে হবে।’ মাস্টারদা বলল।
হঠাৎ রতন খিকখিক করে হাসল।
‘কী হল চা-বাবু?’ মাস্টারদা জিজ্ঞাসা করল।
‘জ্ঞান হওয়ার পর গ্রামের কেউ কলিকাতায় গিয়েছে বলে শুনিনি। নব যাচ্ছে, কিন্তু ওর কপাল খুব খারাপ।’
‘কী করে বুঝলে চাঁদ যে ওর কপাল খারাপ?’
‘কিছুক্ষণ আগে একজন এসেছিল দোকানে। ওর বাবার সঙ্গে দেখা করতে চায়। তার শালির চৌদ্দবছরের মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দিতে চায়।’
‘তো?’
‘আমি কাটিয়ে দিলাম। বললাম, ওর রক্তে দোষ হয়েছে। মনসামেলায় গিয়ে হোগলার ছাউনির মেয়েদের কাছে গিয়েছিল। ব্যস, সঙ্গে-সঙ্গে লোকটা ফিরতি ট্রেন ধরল। হি-হি-হি।’ রতন মন খুলে হাসল।
মাস্টারদা মাথা নাড়ল, ‘চা-বিক্রি করে তোর বুদ্ধিতে আর কত ধার হবে। অন্য কিছু বলে কাটাতে পারলি না। আর কাটাবার দরকারই বা কী ছিল। যেত ওর বাড়িতে। বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলে খুশি হয়ে ফিরে যেত। আজই তো বরযাত্রী নিয়ে ওকে বিয়ে করতে যেতে হত না। এখন লোকটা কথা ছড়াবে। পাঁচটা মানুষ…পচা খবর শুনতে ভালোবাসে। হয়তো কথাটা ভাসতে-ভাসতে ওর মা-বাবার কানে চলে আসবে। তখন মানুষ দুটোর কী হাল হবে, বল?’
রতন শরীরটাকে ত্রিভঙ্গ মুরারী করে দাঁড়িয়ে রইল।
