1 of 2

কলিকাতায় নবকুমার – ৩২

বত্রিশ

নবকুমার মাথা নীচু করল। বড়বাবু বললেন, ‘প্রশ্নের জবাব না পেলে আমি সহ্য করতে পারি না।’

‘উনি অভিনয় করার কথা বলেছিলেন। আমার সেই ইচ্ছে একদম নেই।’ নবকুমার বলল।

বড়বাবু কিছুক্ষণ চুপচাপ ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘তা এই কথাটা ওঁকে টেলিফোন করে ঠিক সময়ে বলা উচিত ছিল। আমার পয়সায় ক্যামেরা ভাড়া করে উনি বসে আছেন তোমাকে টেস্ট করবেন বলে। টাকাটা জলে যেত না?’

‘আমি জানতাম না।’

‘জানতাম না! তুমি কলকাতার কী জান? ক’দিন পা দিয়েছ এই শহরে, অ্যাঁ?’ বড়বাবু গজগজ করছিলেন, ‘আজ তোমার প্রম্পট করার দরকার নেই। যাও।’

নবকুমার বেরিয়ে এল। সে কী করবে ভেবে পাচ্ছিল না। গীতিময়বাবুর কাছে গেলে বড়বাবুর টাকা নষ্ট হত না, এটা সে জানত না।

একজন এসে বলল, ‘সুধাময়বাবু ডাকছেন।’

নবকুমার এগিয়ে গেল। সবাই এসে গিয়েছে। সুধাময়বাবু বললেন, ‘আরম্ভ করো।’

মাথা নাড়ল নবকুমার, ‘বড়বাবু নিষেধ করেছেন প্রম্পট করতে।’

‘সে কী!’ সুধাময়বাবু এমনভাবে বললেন যে ঘরের সবাই অবাক হয়ে নবকুমারের দিকে তাকাল। বড়বাবুর নিষেধ মানে চাকরি চলে যাওয়া, এটা সবাই বুঝতে পেরে গম্ভীর হয়ে থাকল। মাস্টারদা বলল, ‘তখনই বলেছিলাম, বেশি বাড় বেড়ো না, ঝড়ে পড়ে যাবে। এখন কী হবে? যাও, দেশে ফিরে যাও। আমার আর কিছু করার নেই।’

নিরুপমাদি বলল, ‘কিন্তু ও কী অপরাধ করেছে?’

মাস্টারদা বলল, ‘জানি না। এখন একজনই ওকে বাঁচাতে পারে।’

‘কে?’ নিরুপমাদি তাকাল।

‘ও-ই জানে।’

সুধাময়বাবু বললেন, ‘এসব কথা থাক। আমি একবার দেখা করে আসি।’

সুধাময়বাবু বড়বাবুর ঘরে চলে যাওয়ার পর কেউ মুখ খুলল না। মনে-মনে সিদ্ধান্ত নিল নবকুমার। মরে গেলেও শেফালি-মাকে বলবে না বড়বাবুকে তার হয়ে সুপারিশ করতে। তার চেয়ে দেশে চলে গেলে—। সঙ্গে-সঙ্গে মন বিদ্রোহ করল। না। কখখনো না। হেরে গিয়ে মাথা নীচু করে সে দেশে ফিরবে না।

কাজের লোকটি এসে বলল, ‘বড়বাবু ডাকছেন।’

কৌতূহলী মুখগুলোর সামনে থেকে চলে গেল নবকুমার।

বড়বাবুর উলটোদিকে বসে আছেন সুধাময়বাবু। ঘরে ঢোকামাত্র বড়বাবু জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমাকে কি বলেছি আর কাজ করতে হবে না?’

‘আজকে প্রম্পট না করতে বলেছেন।’ মাথা নীচু করে বলল নবকুমার।

‘হ্যাঁ। আজকে। কালকে নয়। আর তুমি বলে বেড়াচ্ছ তোমার চাকরি নেই।’

সুধাময়বাবু বললেন, ‘ও কিছু বলেনি। আপনি আজ নিষেধ করেছেন শুনে ধরে নিয়েছে যে ও বরখাস্ত হয়েছে।’

‘অদ্ভুত!’ ড্রয়ার থেকে একশো টাকার নোট আর একটা কাগজ বের করে সামনে ঠেলে দিয়ে বড়বাবু বললেন, ‘এখখনই এই ঠিকানায় গিয়ে গীতিময়ের সঙ্গে দেখা করো। জানি ভস্মে ঘি ঢালা হচ্ছে—! ট্যাক্সি নিয়ে যাবে। ভাড়ার টাকা দিলাম। যাও।’

টাকা আর কাগজ তুলে নিল নবকুমার। কাগজে ঠিকানা লেখা।

বড়বাবু বললেন, ‘বিকেলের মধ্যে ছাড়া পেলে এসে দেখা করে যাবে।’ বাইরে বেরিয়ে কোনওদিকে না তাকিয়ে জোরে হাঁটতে লাগল নবকুমার।

এই প্রথম একা ট্যাক্সিতে উঠল নবকুমার। ড্রাইভারকে ঠিকানা বলতে গাড়ি ছুটল। লোকটা গম্ভীর মুখে গাড়ি চালাচ্ছে। নবকুমার সিঁটিয়ে বসেছিল। দুপাশের বাড়ি, সামনের রাস্তা একটুপরেই অচেনা হয়ে গেল। স্টিয়ারিং-এর পাশে একটা মিটারে একের-পর-এক সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। লোকটা যদি অনেক ঘুরিয়ে বলে ঠিকানা খুঁজে পাচ্ছি না তখন সে কী করবে? যদি তখন একশো টাকার বেশি ভাড়া দিতে হয়?

নবকুমার শুকনো গলায় জিজ্ঞাসা করল, ‘ওই ঠিকানায় যেতে কত ভাড়া দিতে হবে?’

‘কত আর! বেশি নয়!’

ওর কাছে কোনটা কম কোনটা বেশি তা লোকটা বুঝবে কী করে?

মিনিট কুড়ি পরে লোকটা গাড়ি থামাল, ‘এসে গেছে।’

কোথায়?’

‘এটাই গণেশ অ্যাভিন্যুর হিন্দ সিনেমা। নেমে খুঁজে নিন।’

‘কত ভাড়া দিতে হবে?’

‘আটচল্লিশ।’

একশো টাকার নোটটা দিলে পঞ্চাশ ফেরত দিয়ে লোকটা বলল, ‘খুচরো নেই।’ রাস্তায় নবকুমার নামতেই ট্যাক্সি চোখের আড়ালে চলে গেল।

অদ্ভুত তো। দুটো টাকার কোনও মূল্য নেই! গ্রামে কেউ যদি দুটো টাকা কম দিত তাহলে মারপিট হয়ে যেত। এই কলিকাতায় সব সম্ভব। এক পয়সা দূরের কথা, পাঁচ পয়সা, দশ পয়সা, পঁচিশ পয়সা দিয়ে কিছু কেনা যায় না। ওগুলো কেউ কাউকে দেয় না, নেয় না। তাহলে তৈরি হয় কেন?

একটা পানের দোকানদারকে কাগজটা দেখাল নবকুমার। লোকটা হিন্দিতে বলল, ‘আমি পড়তে জানি না। মুখে বলুন।’

ঠিকানাটা পড়ে শোনাল নবকুমার। পানওয়ালা বাঁ-দিকের একটা বাড়ি দেখাল, ‘ওই হলুদ কোঠি। ওখানে জিজ্ঞাসা করুন।’

হলদে বাড়ির দারোয়ান ঠিকানা দেখে বলল, ‘পাঁচতলায় চলে যান। বাঁ-দিকে লিফট আছে।’

লিফটের সামনে গিয়ে দাঁড়াল নবকুমার। জীবনে কখনও সে লিফটে চড়েনি। পাঁচতলায় হেঁটে উঠতে অসুবিধে কী! মিনিটখানেক অপেক্ষা করার পরেও যখন লিফটের দরজা খুলল না তখন সে সিঁড়িতে পা দিয়ে স্বস্তি পেল। পাঁচতলায় উঠেই দরজার গায়ে কাগজে লেখা নামটা দেখতে পেল। সন্তর্পণে দরজায় শব্দ করল সে।

এইসময় লিফট থেকে বেরিয়ে এসে একটি লোক দরজায় পাশের রঙিন বোতাম টিপলেন। লোকটি খুব বিরক্ত হয়ে আছেন বলে মনে হয় নবকুমারের।

দরজা খুলল। সে লোকটা তাকে প্রায় ঠেলে সরিয়ে দিয়ে ঢুকে গেলেন। নবকুমার জিজ্ঞাসা করল, ‘গীতিময় ঘোষ আছেন?’

‘আপনি?’

‘আমি নবকুমার। উনি আমাকে আসতে বলেছেন।’

‘আসুন।’ দরজা বন্ধ করে লোকটা একটা পরদা ফেলা দরজার সামনে গিয়ে বলল, ‘ঢুকে যান। ভেতরে আছেন।’

নবকুমার পরদা সরাতেই দেখতে পেল, ঘরে জোরাল আলো জ্বলছে আর একজন সুন্দরী মহিলা একা দাঁড়িয়ে পাগল-পাগল হাসি হাসছেন।

‘ওকে! কাট! খুব ভালো লাগছে বল্লরী।’ কণ্ঠস্বর গীতিময়ের।

‘এখানে কী চাই, অ্যাঁ?’ একজন এগিয়ে এল।

নবকুমার বলল, ‘গীতিময় ঘোষ—।’

লোকটা ঘুরে চিৎকার করল, ‘গীতিদা?’

যন্ত্রটা যে ক্যামেরা তা পরে বুঝেছিল নবকুমার। তার আড়াল থেকে বেরিয়ে এলেন গীতিময়, ‘আচ্ছা!’ তাহলে বড়বাবুর ঠেলা খেয়ে এখানে আসতে বাধ্য হলে?’

নবকুমার মাথা নাড়ল, ‘না-না, আসলে—!’

.

.

‘কোনও আসল নকল নয়। তোমাকে ফোন করতে বলেছিলাম, করোনি কেন?’

‘খেয়াল ছিল না।’

কিছু একটা বলতে গিয়েও শেষপর্যন্ত গিলে ফেললেন গীতিময়, ‘বোসো। ওখানে।’ দেওয়ালের গায়ে সাজিয়ে রাখা চেয়ারগুলোর একটায় বসল নবকুমার। গীতিময় বললেন, ‘নেক্সট। বল্লরী তুমি মেকআপ তুলে নাও। স্বপন, নেক্সটকে পাঠাও।’

নবকুমার দেখল, সামনে দাঁড়ানো মেয়েটি পাশের ঘরে ঢুকে গেল এবং সেখান থেকে আর একটি মেয়ে বেরিয়ে এল।

বেশ কিছুক্ষণ ধরে বিভিন্ন ভঙ্গিমায় গীতিময় মেয়েটির ছবি তুললেন। তারপর বললেন, ‘এবার তোমার গলা শুনব। একটা কবিতা বলো।’

মেয়েটা যেন খুব লজ্জা পেল, ‘আমি কবিতা জানি না।’

‘অ। বেশ, ধরো তোমার নায়ক সামনে দাঁড়িয়ে আছে, তাকে তুমি বলছ, আমি তোমাকে ভালোবাসি, আমাকে ছেড়ে যেও না, তাহলে আত্মহত্যা করব। বলো।’

‘কাকে বলব?’

‘কল্পনা করে নাও, নায়ক সামনে দাঁড়িয়ে আছে।’

মেয়েটি মাথা নাড়ল। গীতিময় চেঁচালেন, ‘স্টার্ট সাউন্ড।’

মেয়েটি বলল। গীতিময় বললেন, ‘যাও, মেকআপ তুলে নাও।’

‘আমি চান্স পাব তো?’ মেয়েটি চোখের কোণে তাকাল।

‘প্রাোডাকশন ম্যানেজার জানিয়ে দেবে। তুমি এসো।’

এবার নবকুমারকে ডাকলেন গীতিময়। ডেকেই চেঁচালেন, ‘মেকআপ।’

একটা লোক তোয়ালে আর ছোট্ট ব্যাগ নিয়ে দৌড়ে এল।

‘ওকে পাউডারিং করে চুল আঁচড়ে দাও। অদ্ভুত! অডিশন দিতে কেউ এই পোশাক পরে আসে।’

মেকআপম্যান ততক্ষণে নবকুমারের মুখ ঘষতে শুরু করেছে, তোয়ালে দিয়ে। পাউডারের পাফ বুলিয়ে চিরুনি এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘আগে নিজে আঁচড়ান।’

যন্ত্রের মতো আদেশ মান্য করল নবকুমার।

এবার সেই চুলে একটু কায়দা করল লোকটা, ‘হয়ে গেছে।’

গীতিময় ডাকলেন, ‘এখানে এসে দাঁড়াও। এটা হল ক্যামেরা। তোমাকে যেমন-যেমন বলব তুমি তেমন তেমন করবে। ওকে?’

নবকুমার জীবনে প্রথমবার এত বড় সাইজের ক্যামেরা দেখল।

গীতিময় চিৎকার করলেন, ‘লাইটস অন। স্টার্ট ক্যামেরা।’ একটু থেমে বললেন, ‘তুমি বাঁ-দিকে তাকাও, এবার সামনে, ক্যামেরার দিকে, গুড। এবার ডানদিকে। মুখ তোলো, ছাদ দ্যাখো, এবার মেঝের দিকে তাকাও। এবার পিছন ফিরে সোজা ওই দেওয়ালের দিকে চলে যাও আস্তে হেঁটে। এবার ঘুরে এসে ঠিক আবার জায়গায় দাঁড়াও। কাট। লাইটস অফ।’

গীতিময় ক্যামেরার পেছনে গেলেন। যে লোকটি ছবি তুলছিল সে কাজ করতে-করতে বলল, ‘একটু আনস্মার্ট লাগছে।’

‘দেখি।’

কী দেখলেন গীতিময় তা নবকুমার বুঝতে পারল না। হেসে বললেন, ‘বুঝলে হে, এ চোখ একেবারে জহুরির। চরিত্রটা কী? ওয়ান থার্ড সাহেব বিবি গোলামের ভূতনাথ, ওয়ান থার্ড অভয়ের বিয়ের অভয় আর বাকিটা শ্রীকান্ত। এই চরিত্র কী করে স্মার্ট হবে। উত্তমবাবু বলেই ভূতনাথ আর অভয়কে ওরকম ক্যাবলা করতে পেরেছিলেন। আমি একেবারে সান অফ দ্য সয়েল চাইছি। এবার ভয়েস দেখতে হবে। নবকুমার, কোনও কবিতা জান?’

মাথা নাড়ল নবকুমার তার কপালে ঘাম জমছিল।

‘চার লাইন বলবে। গলা খুলে বলবে। তারপর এই চারটে লাইন গলা নামিয়ে বলবে। মনে থাকবে?’

মাথা নাড়ল নবকুমার এবং তখনই সে আবিষ্কার করল কোনও কবিতার লাইন তার মনে পড়ছে না। সুকান্ত ভট্টচার্যের কবিতা বলে সে স্কুলে পুরস্কার পেয়েছিল। প্রথম লাইনের পর দ্বিতীয় লাইন গুলিয়ে যাচ্ছে।

‘স্টার্ট সাউন্ড। নবকুমার—।’

শেষপর্যন্ত মাথায় এল যে লাইনগুলো, তাই উঁচু পরদায় বলল নবকুমার, ‘কুমোর পাড়ার গরুর গাড়ি, বোঝাই করা কলসি হাঁড়ি, গাড়ি চালায় বংশীবদন, সঙ্গে যে যায় ভাগ্নে মদন। হাট বসেছে শুক্রবারে—।’

‘কাট।’

থেমে গেল নবকুমার। গীতিময় বললেন, ‘উ:। কপালে জোটেও। তুমি কবিতা বলতে এইটে বোঝ? যাক গে।’

কানে যন্ত্র লাগিয়ে রেকর্ডেড গলা শুনলেন গীতিময়। একটু ভাবলেন। তারপর বললেন, ‘গলা নামিয়ে বলো তো লাইনগুলো।’

আবার রেকর্ড করা হল। সেটা শুনে একটু খুশি হলেন গীতিময়।

এগিয়ে এসে বললেন, ‘ধরো, কোনও সুন্দরী মহিলা তোমাকে প্রেম নিবেদন করছেন, কিন্তু তুমি সেটা গ্রহণ করতে চাও না। ভয় পাচ্ছ। তুমি তাকে সেটাই বলছ। কী বলবে?’

ভেবে পেল না নবকুমার। তাকিয়েছিলেন গীতিময়। বললেন, ‘ভাবো, ভেবে বলো। তোমার বাবা-মা গরিব মানুষ, তোমার মুখ চেয়ে আছে। তোমার পক্ষে প্রেম করা সম্ভব নয়।’

নবকুমার প্রথমে ভেবে পাচ্ছিল না। তারপর হঠাৎ ফাল্গুনী মুখার্জির একটা উপন্যাসের কথা মনে পড়ল। সেখানেও নায়ক এইরকম বিপদে পড়েছিল।

‘স্টার্ট সাউন্ড। বলো।’

‘যার মাথার ওপর আকাশ আর পায়ের তলায় মাটি তাকে রাজপ্রাসাদের স্বপ্ন কেন দেখাচ্ছেন?’ বলেই রবীন্দ্রনাথ মনে এল, ‘আমার মতো নিষ্ফল, অসফলকে নিজের মতো থাকতে দিন।’

হাততালি দিলেন গীতিময়, ‘একটু কাব্য হয়ে গেল। এই চরিত্র অতটা কাব্য করবে না। তবু, ঠিক আছে। তুমি যেতে পার। আমি বড়বাবুর সঙ্গে কথা বলব। ওঁকেও তো দেখাতে হবে।’

এইসময়, যে মেয়েটির নাম বল্লরী, এগিয়ে এসে হাত বাড়াল, ‘কনগ্রাটস।’

নবকুমার অবাক হয়ে বলল, ‘মানে!’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *