1 of 2

কলিকাতায় নবকুমার – ১৬

ষোলো

মাস্টারদা হাঁ হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, ‘তুমি এর মধ্যেই বুঝে গেছ কে কীরকম? এই মুক্তোর ভয়ে সবাই কাঁটা হয়ে থাকে আর তুমি বলছ, ও ওইরকম?’

নবকুমার বলল, ‘আমার মনে হয় যারা মুখে কড়া-কড়া কথা বলে তাদের মন নরম হয়।’

কেক দিয়ে চা খেতে-খেতে মাস্টারদা বলল, ‘শোনো নবকুমার। এটা তোমার গ্রাম নয়। এই নগর ভয়ঙ্কর জায়গা। মন দুর্বল হলে তোমাকে চিবিয়ে খাবে।’ মাস্টারদা তাকাল, ‘এই যে ঘর, এই ঘরটা ভাড়া নিতে গেলে ভদ্রপাড়ায় তিন-চার হাজার টাকা চাইবে। শেফালি-মা তার থাকার এলাকায় অন্য মেয়েকে ঢোকাবেন না বলে খালি রেখেছেন। তোমায় থাকতে দিয়েছেন। কিন্তু দেখবে, ঠিক তোমাকে দিয়ে নিজের কাজ করিয়ে নেবেন।’

চা শেষ করে উঠল নবকুমার।

‘যে কথাটা বলছিলাম, তোমাকে একটা কাজ করে দিতে হবে।’ মাস্টারদার গলায় এবার অনুরোধের সুর।

নবকুমার তাকাল, কিছু জিজ্ঞাসা করল না।

‘আমাদের মালিক চাইছেন শেফালি-মা আবার অভিনয় করুন। একটা দারুণ নাটক তাঁর ধরা আছে কিন্তু উপযুক্ত অভিনেত্রী না পাওয়ায় উনি নামাতে চাইছেন না। কিন্তু শেফালি-মা যদি রাজি হন তাহলে ওঁর সম্মানদক্ষিণা নিয়ে কোনও কার্পণ্য করবেন না। এর আগে অনেকবার প্রস্তাব দিয়েছেন লোক মারফত, কিন্তু শেফালি-মা সেসব কানে তোলেননি। তোমাকে উনি পছন্দ করেন। তুমি যদি ওঁর মত বদলাতে পারো তাহলে আমাদের দুজনের মাইনে বাড়িয়ে দেবেন মালিক। তোমাকে রাজি করাতেই হবে নবকুমার।’ মাস্টারদা উঠে এলেন পাশে।

‘আমার কথা উনি শুনবেন কেন?’ নবকুমার ফাঁপরে পড়ল।

‘শুনতেও তো পারেন। চেষ্টা করে দ্যাখো না ভাই। যদি রাজি করাতে পারো তাহলে আমরা মালিকের কাছের লোক হয়ে যাব। বুঝতে পারছ?’

‘উনি এই বয়সে কি পারবেন?’

‘কী এমন বয়স? ওঁর চেয়ে অনেক বেশি বয়সের অভিনেতা-অভিনেত্রী এখনও অভিনয় করে যাচ্ছেন। আরে, অসুখ-বিসুখ তো নেই।’

‘আমি জানি না। আমি ওঁকে যখনই দেখেছি তখনই উনি বিছানায় বসে আছেন। হাঁটাচলা করতেও দেখিনি।’ নবকুমার বলল।

‘ওই শুয়ে বসে থাকলে গাঁটে-গাঁটে বাত হয়ে যাবে। এসব বলে বোঝাও। বলবে বাংলার দর্শকরা ওঁকে চাইছে।’

‘যদি রেগে যান?’

‘চান্স নিয়ে দেখো না।’ মাস্টারদা বলল, ‘আমি এখন চলি। দুপুরে গদিতে যাওয়ার আগে কথা বলে নিও।’

.

মুক্তো তাকে নীচে নিয়ে এল। সেখানে তখন এ-বাড়ির যত মেয়ে ভিড় করে দাঁড়িয়ে দেখছে। সেই প্রৌঢ়াকে মুক্তো জিজ্ঞাসা করল, ‘সে কোথায়?’

‘ঘরে বসে আছে। যেতে চাইছে না।’ প্রৌঢ়া বলল।

মুক্তো বলল, ‘ঝাড়ু মারো মুখে। অসুখটা বাধাবার সময় খেয়াল ছিল না? হাত না পুড়িয়ে যখন রাঁধতে শেখেনি তখন মলম লাগাতে তো হবেই।…এই মেয়ে, এদিকে আয়। এই ভদ্দরলোকের ছেলেকে শেফালি-মা বলেছে, তোকে দুর্বারে নিয়ে যেতে। বাঁচতে চাস তো এর সঙ্গে যা।’

খানিকটা কথা কাটাকাটির পর মেয়েটি বেরোল। রোগা, অল্পবয়সি, ময়লা গায়ের রং। চুল উসকোখুসকো।

মুক্তো প্রৌঢ়াকে বলল, ‘তুমিও সঙ্গে যাও।’

‘আমার এখন অনেক কাজ দিদি। এক দঙ্গল লোক গিয়ে কী হবে?’

‘আশ্চর্য! তোমার ঘরের মেয়ে, ওর পয়সায় মজা মেরেছ আর এখন ঝেড়ে ফেলতে পারলে বেঁচে যাবে বলে ভেবেছ? যাও ওর সঙ্গে।’

রাস্তায় নামল নবকুমার। পেছনে মেয়েটি, তার পেছনে প্রৌঢ়া।

দুর্বারের অফিসে পৌঁছতে আজ অসুবিধে হল না।

দরজাতেই দেখা হয়ে গেল কবিতার সঙ্গে। কবিতা বলল, ‘কী ব্যাপার?’

‘শেফালি-মা এই মেয়েটিকে আপনাদের কাছে পাঠালেন।’ নবকুমার বলল। কবিতা মেয়েটাকে দেখল। মুখ নীচু করে দাঁড়িয়ে আছে। পাশে প্রৌঢ়া।

‘তোমার মেয়ে?’

‘প্রৌঢ়া মাথা নাড়ল, ‘না-না। আমার ঘরে থাকতে দিয়েছিলাম।’

‘কী হয়েছে তোমার?’

মেয়েটি জবাব দিল না। শেফালি-মায়ের বলা কথাগুলো উগরে দিল নবকুমার। ‘কাল সারারাত যন্ত্রণায় চিৎকার করেছে। শেফালি-মা সন্দেহ করছেন, খারাপ অসুখ হয়েছে। কিন্তু ডাক্তারের কাছে যাওয়ার পয়সা নেই।’

কবিতা ডাকল, ‘কাছে এসো। কী নাম?’

‘দুর্গা।’

‘হুম। কনডোম ব্যবহার করো না?’

মাথা নেড়ে নি:শব্দে না বলল দুর্গা।

‘সর্বনাশ! কেন? তুমি জানো না কনডোম ব্যবহার না করলে অসুখ হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়? তোমাকে কেউ বলেনি?’

প্রৌঢ়া বলল, ‘বলিনি? কত বলেছি। কানেই তোলেনি।’

দুর্গা নীচু গলায় বলল, ‘রাজি না হলে কী করব? অন্য ঘরে চলে যাবে বলে শাসায়। তখন মাসি মারে!’

‘তুমি আমার সঙ্গে এসো। আচ্ছা ভাই, অনেক ধন্যবাদ। এই মেয়েরা জেনেশুনেও বিষ খেতে বাধ্য হচ্ছে। শেফালি-মাকে বোলো আমরা যা করার তা করার চেষ্টা করব। ডাক্তারবাবু আসুক।’ কবিতা বলল।

‘ওকে কি আজ আবার ফিরে যেতে হবে।’

‘বুঝতে পারলাম না।’ কবিতা বলল।

‘ও যেখানে ছিল সেখানে বোধহয় থাকতে দেওয়া হবে না।’

‘কেন?’

নবকুমার প্রৌঢ়ার দিকে তাকাল। প্রৌঢ়া বলল, ‘সাধ করে কি কেউ লক্ষ্মীকে পায়ে ঠেলে? কিন্তু লক্ষ্মী যদি অলক্ষ্মী হয়ে যায় তাহলে?’

‘কী বলছ পরিষ্কার করে বলো।’ কবিতা রেগে গেল।

‘সারারাত ধরে চেঁচিয়ে পাড়ার লোকদের ঘুমোতে দেয়নি, রোগ হয়েছে জানাজানি হলে খদ্দের পা বাড়াবে না! আমরা কি না খেয়ে মরব?’ প্রৌঢ়া বলল।

‘তা আমরা জানি না। এতদিন ওর রোজগারে ভাগ বসিয়েছ, এখন ও বিপদে পড়েছে বলে তাড়িয়ে দেবে, তা চলবে না। এই দুর্গা, তুমি কি দুর্বারের মেম্বার?’

‘মাসি হতে দেয়নি।’ দুর্গা বলল।

‘ও মা! কী মিথ্যে কথা! আমি আবার কখন হতে দিলাম না? দিনদুপুরে এমন মিথ্যে বললি দুগগি? এত বড় জিভ তোর?’ প্রৌঢ়া চেঁচাল।

‘বুঝতে পেরেছি। আমার সঙ্গে চলো। ডাক্তারদিদি তোমাকে পরীক্ষা করবেন। তেমন বুঝলে আমাদের ডে সেন্টারে দু-দিন থাকতে পারো, অবশ্য যদি ডাক্তারদিদি বলেন। এই যে মাসি, তুমি ঘণ্টাখানেক বাদে ঘুরে এসো।’ কবিতা বলল।

‘না বাপু। সত্যি বলছি, পারব না। হাজারটা কাজ হাঁ করে বসে আছে। আমি বিকেলবেলায় খোঁজ নিয়ে যাব।’ বলেই আর দাঁড়াল না প্রৌঢ়া।

নবকুমারের কৌতূহল হচ্ছিল, ‘আপনাদের সমিতিতে ডাক্তার আসেন?’

‘হ্যাঁ। আপনি দুর্বার সম্পর্কে কিছু জানেন না?’

মাথা নেড়ে না বলল নবকুমার।

‘আসুন। এই, তুমিও এসো।’

যে ঘরে আগেরবার নরনারায়ণ রায় বক্তৃতা দিয়েছিলেন সেই ঘরটি এখন ফাঁকা। সেখানে ঢুকে পাশের টেবিল থেকে কিছু ছাপা কাগজ এনে কবিতা নবকুমারকে দিয়ে বলল, ‘এগুলো পড়ে ফেলুন। আমি ওকে নিয়ে যাচ্ছি।’

নবকুমার কাগজগুলো নিয়ে বলল, ‘আমাকে এখনই কাজে যেতে হবে। আমি এগুলো সঙ্গে নিয়ে যেতে পারি?’

‘বেশ তো।’ কবিতা মাথা নাড়ল।

বড্ড দেরি হয়ে গিয়েছিল। মুক্তোর দেওয়া ভাত মাছ খেয়ে বেরোতে গিয়ে থমকে দাঁড়াল নবকুমার। পেছনে দাঁড়িয়েছিল মুক্তো, জিজ্ঞাসা করল, ‘কী হল?’

‘শেফালি-মা কি—।’

‘কলঘরে। একঘণ্টা লাগে।’

‘ও।’

গদিতে ঢোকামাত্র সুধাকান্তবাবু ডাকলেন, ‘এই যে নবকুমার। কাল থেকে আর একটু আগে আসবে। এখানে এসো।’

বয়স্ক অভিনেতা অনিলবাবু হাসলেন, ‘কলকাতায় নতুন, পথঘাট চেনে না। তা কোনও কপালকুণ্ডলার দেখা পেলে?’

সঙ্গে-সঙ্গে সবাই হেসে উঠল।

সুধাকান্তবাবু একটা খাতা এগিয়ে দিলেন, ‘ঝটপট প্রথম পাঁচটা সিন পড়ে ফেলো। নিজে স্বচ্ছন্দ না হলে প্রম্পট করবে কী করে?’

নবকুমার খাতা নিয়ে একটু দূরে গিয়ে বসল। হাতের লেখা বেশ ভালো, পড়তে অসুবিধে হচ্ছিল না। দৃশ্যগুলো প্রথমবার পড়া হয়ে গেলে দ্বিতীয়বার পড়া শুরু করতেই কানের কাছে মাস্টারদার গলা ভেসে এল, ‘কথা হয়েছে?’

চমকে মুখ ফেরাল নবকুমার। তারপর মাথা নেড়ে না বলল।

‘অদ্ভুত ছেলে তো! পইপই করে বলে আসলাম আর তুমি ওঁর সঙ্গে কথা না বলে চলে এলে? একটু পরেই মালিক জিজ্ঞাসা করলে কী জবাব দেব?’

‘বিশ্বাস করুন, দুর্বারে গিয়ে বেশ দেরি হয়ে গিয়েছিল—!’

‘কাঁথায় আগুন দুর্বারের। ক’টা খারাপ মেয়েদের ইউনিয়ন। তোমার সঙ্গে কী সম্পর্ক? এই কাজটা যে কত জরুরি তা তোমাকে বলিনি?’

‘তাহলে আরও একঘণ্টা দেরি হয়ে যেত। উনি স্নান করতে ঢুকেছিলেন।’

‘আমাকে ঢপ দিচ্ছ না তো!’ চোখ ছোট করল মাস্টারদা।

‘ঢপ!’ নবকুমারের মুখ থেকে শব্দটা একটু জোরেই বেরিয়ে এল।

এই সময় নিরুপমাদি পাশে এসে বসলেন, ‘এ কী ছেলে রে বাবা! ঢপ মানে জানে না! কেউ বলেনি, পথিক তুমি কি পথ হারাইয়াছ?’

‘না।’ মুখ নামাল নবকুমার।

‘তাহলে আর ঢপ-এর মানে বুঝবে কী করে! ওটাই তো জীবনের সবচেয়ে বড় ঢপ।’ হেসে গড়িয়ে পড়লেন নিরুপমাদি।

এই সময় জুতোর শব্দ হতেই সবাই গম্ভীর হয়ে গেল। মালিক এসে তাঁর চেয়ারে বসে বললেন, ‘শুরু করুন সুধাকান্তবাবু।’

সুধাকান্তবাবু বললেন, ‘আজ প্রথম দৃশ্য থেকে শুরু করাই।’

এই সময় একজন মহিলার গলা শুনতে পেল নবকুমার, ‘সুধাদা, আমি তো কিছু না জেনে, না বুঝে রিহার্সাল করতে পারব না।’

আর-একটি পুরুষ কণ্ঠ মহিলাকে সমর্থন করলেন, ‘আমারও একই কথা।’

সুধাকান্তবাবু বললেন, ‘বেশ। সবাই পাঁচটা দৃশ্য শোনো। প্রশ্ন থাকলে করতে পারো। তারপরে বসে-বসেই আমরা সংলাপ গলায় তুলব। নবকুমার পড়া আরম্ভ করো। একেবারে সরলগলায় পড়বে।’

নবকুমার পড়া শুরু করল। নাটকীয় সংলাপগুলো সে নিরুত্তাপ গলায় পড়ল। চব্বিশ মিনিট পরে পড়া শেষ হলে মহিলা কণ্ঠ প্রশ্ন করল, ‘এই ছেলেটি কে? আগে তো দেখিনি?’

মালিক জবাব দিলেন, ‘মাস্টার নিয়ে এসেছে গ্রাম থেকে। ওকে প্রম্পটার হিসেবে নেওয়া যায় কি না দেখছি।’

‘অবশ্যই। চমৎকার গলা, খুব ভালো পড়েছে ও।’

সুধাকান্তবাবু হাসলেন, ‘নবকুমার, প্রথমদিনেই নায়িকার সার্টিফিকেট পেয়ে গেলে। তোমার চাকরি পাকা হয়ে গেল।’

যেদিক থেকে গলার স্বর ভেসে এসেছিল, সেদিকে তাকাতে সঙ্কোচ হচ্ছিল নবকুমারের।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *