নয়
মাথা নাড়ল নবকুমার, ‘আমি এখানে থাকি না।’
‘থাকো না! কোথায় থাকো?’ কবিতা অবাক হল।
‘গ্রামে।’
‘আশ্চর্য! সেখান থেকে এ-পাড়ায় ভরদুপুরে এসেছ ফূর্তি করতে?’ কবিতায় গলায় ঝাঁঝ মিশোনো। সেটা কানে যেতে চন্দ্রিমা বেরিয়ে এলেন।
‘না-না। আমি চাকরির খোঁজে এসেছি!’ খুব খারাপ লাগছিল নবকুমারের।
কবিতা চন্দ্রিমাকে বলল, ‘শুনলে! এ ছেলে এই পাড়ায় চাকরির খোঁজে এসেছে? এত বছরে এই প্রথম এমন কথা শুনলাম।’
চন্দ্রিমা জিজ্ঞাসা করল, ‘তুমি যে তখন বললে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দরকার আছে। ও তোমাকে চাকরি দেবে একথা কে বলেছে?’
‘না-না। ওনার কাছে আমি একটা চিঠি দিতে এসেছি। এই নিন।’ কবিতার হাতে খাম দিল নবকুমার।
কবিতা খাম খুলে চিঠি বের করে বলল, ‘বা:! কী সুন্দর হাতের লেখা। ওমা! এটা শেফালি-মায়ের চিঠি!’ ধীরে-ধীরে গোটা-গোটা করে পুরো চিঠি জোরে-জোরে পড়ল কবিতা। তারপর বলল, ‘দেখলে দিদি, ঠিক পাচার করে দিয়েছে। বয়স কম ছিল এই খবরটা তাহলে সত্যি। এখন কী করা যাবে?’
চন্দ্রিমা বললেন, ‘এ-পাড়ায় না থাকলে আমাদের কিছু করার নেই। তুমি বরং অন্য এলাকায় খবর পাঠিয়ে দাও। যদি সেখানে গিয়ে তোলে তাহলে যেন ব্যবস্থা নেয়।’
হঠাৎ মনে পড়তে কবিতা জিজ্ঞাসা করল, ‘তুমি বললে গ্রাম থেকে এসেছ? তাহলে শেফালি-মাকে চিনলে কী করে?’
‘মাস্টারদা কাল রাত্রে ওঁর বাড়িতে আমাকে নিয়ে এসেছিল।’
‘মাস্টারদা কে?’
‘আমার চেনা। যাত্রা করে এখানে।’
চন্দ্রিমা চিঠিটা দেখলেন, ‘এটা শেফালি-মায়ের লেখা নয়। ওর সই-এর সঙ্গে চিঠির লেখা মিলছে না।’
আমাকে লিখতে বলেছিলেন উনি।’
‘ও। কদ্দুর পড়েছ?’
‘বিএ পাশ করেছি।’
‘গ্রামে বা মফস্বলে চাকরি খুঁজলে না কেন?’
‘ওখানে চাকরি নেই। অনার্স না থাকলে কেউ কথাই বলে না। আমি সাধারণ গ্র্যাজুয়েট। কলিকাতায় তো অনেক মানুষ, অনেকরকমের কাজ আছে। তাই—। আচ্ছা, চলি।’ নবকুমার মাথা নাড়ল।
‘দাঁড়াও। তুমি আমার সঙ্গে ভেতরে এসো।’ চন্দ্রিমা শক্ত গলায় বলে ঘরের ভেতরে চলে গেলেন। নবকুমার বাধ্য হল অনুসরণ করতে।
সে দেখল বসে থাকা মেয়েরা একের-পর-এক উঠে নিজের পরিচয় জানাচ্ছে অতিথিকে। যৌনকর্মী শব্দটি এর আগে কখনও শোনেনি নবকুমার। মানে বুঝতে একটু সময় লাগল, কিন্তু—। ভেতরে-ভেতরে টালমাটাল হল। মানুষ যে কাজটা করে, তা পেট ভরাবার জন্যে হোক অথবা মনের টানে হোক সে সেই বিষয়ের কর্মী। যেমন জমাদারকে বলা হয় সাফাইকর্মী, আবার নার্সকে বলা হয় সেবাকর্মী।
যৌনকর্ম যিনি করেন তিনি যৌনকর্মী? এ কাজে তো পুরুষদের প্রয়োজন হয়। তাহলে পুরুষরাও কি যৌনকর্মী? এই যে এখানে এতগুলো মেয়ে নিজেকে যৌনকর্মী বলে যখন পরিচয় দিচ্ছে তখন সঙ্কোচ তো বোধ করছেই না বরং পরিচয় দিতে পেরে গর্বিত বলে মনে হচ্ছে।
সবাই নিজেকে পরিচিত করার পর নরনারায়ণ রায় বললেন, ‘তোমাদের মধ্যে কে-কে এইডসে আক্রান্ত?’
সঙ্গে-সঙ্গে তিনটি মেয়ে হাত তুলল।
চন্দ্রিমা বললেন, ‘নিয়মিত চিকিৎসা হচ্ছে ওদের। উপযুক্ত ব্যবস্থা না নিয়ে কেউ কাস্টমার অ্যাটেন্ড করে না।’
ছোটখাটো কিন্তু খুব মিষ্টি দেখতে একটি মেয়েকে নরনারায়ণ রায় প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি কি জানো কীভাবে আক্রান্ত হলে?’
মেয়েটি উঠে দাঁড়াল। ‘আমি মেদিনীপুরের গ্রামে থাকতাম। সেখানে শ্বশুরবাড়ি। আমার স্বামী বোম্বাইতে সোনার কাজ করত। বিয়ের ছয়মাস পরে যখন ফিরে এল তখন দেখতাম ওর শরীর খারাপ। পাতলা পায়খানা আর মাঝে-মাঝে বমি করছে। ও চলে যাওয়ার পর আমার শরীর খারাপ হল। গাঁয়ের ডাক্তারবাবুর ওষুধে কাজ হল না। উনি রক্ত পরীক্ষা করাতে বললেন। সেটা করতেও দেরি হল। গ্রাম থেকে অনেক দূরে যেতে হয়। সেই রক্ত পরীক্ষার পর ওরা বলল, আমার এইডস হয়েছে।’
‘তারপর?’ নরনারায়ণ শুনতে চাইলেন।
‘আমাকে শ্বশুরবাড়ির সবাই আলাদা করে দিল। কিছুদিন পরে খবর এল আমার স্বামী মরে গিয়েছে। তখন সবাই মিলে আমাকে বাপের বাড়িতে পাঠাতে চাইল। আমি জোর করে থেকে গিয়েছিলাম। কিন্তু আমার শরীর খারাপ হচ্ছিল। এই সময় ঘাটালে এইডসের বিরুদ্ধে প্রচার করতে গিয়েছিলেন দুর্বার সমিতির কয়েকজন দিদি। খবর পেয়ে তাঁদের সঙ্গে গিয়ে দেখা করলাম। তাঁরাই আমাকে এখানে নিয়ে এলেন চিকিৎসার জন্যে। আমি জানি বেশিদিন বাঁচব না। তা মানুষকে তো একদিন মরতেই হয়। কিন্তু এখানে ওষুধ খেয়ে আমি আগের থেকে ভালো আছি।’ মেয়েটি হাসল।
‘তুমি নিজের পরিচয় দিয়েছ যৌনকর্মী বলে। তুমি কি এখানে আসার পর যৌনকর্মী হয়েছ?’ নরনারায়ণের প্রশ্নটা শুনে অন্য মেয়েরা শব্দ করে হেসে উঠতেই মেয়েটি লজ্জা পেল। হাসি থামলে সে বলল, ‘না। আমি দুর্বারের অফিসে পিওনের কাজ করি। অফিসের মধ্যেই। কিন্তু দুর্বার তো যৌনকর্মীদের জন্যে তাই নিজেকে যৌনকর্মী বলতে ভালো লাগে।’
‘বলো।’ নরনারায়ণ রায় এবার নবকুমারের দিকে তাকালেন। নবকুমার দরজার এপাশে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তাকে হাত নেড়ে কাছে ডেকে নরনারায়ণ রায় জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি কি এখানকার ছেলে?’
মাথা নাড়ল নবকুমার। চন্দ্রিমা তখন সংক্ষেপে নবকুমারের পরিচয় দিলেন।
‘ও। কী নাম তোমার?’
‘নবকুমার।’
চন্দ্রিমা শেফালি-মায়ের চিঠি নরনারায়ণ রায়ের হাতে দিলেন। তাতে চোখ বুলিয়ে বললেন, ‘বা:। এ তো মুক্তাক্ষর। দ্রুত লিখতে হলে এরকম স্ট্যান্ডার্ড রাখতে পারবে?’
‘চেষ্টা করব।’
‘তুমি এখানে চাকরির সন্ধানে এসেছ কোনও সোর্স ছাড়াই?’
‘হ্যাঁ।’
‘কেন?’
‘কলিকাতায় চাকরির সুযোগ বেশি তাই।’
‘কী চাকরি খুঁজছ তুমি?’
‘যে-কোনও চাকরি।’
‘তুমি কলিকাতা শব্দটি ব্যবহার করলে কেন?’
‘বইতে পড়েছি এটাই এখানকার আসল নাম। ইংরেজরা এসে নামটাকে বিকৃত করেছিল। সেই বিকৃত নাম মানুষ ভুলভাবে উচ্চারণ করে থাকে।’
‘বা:। চন্দ্রিমা, দ্যাখো, তোমাদের এখানে একে রেখে দিতে পার কি না। আমিও ওর কথা খেয়ালে রাখব। নবকুমার, তুমি এখন যেতে পার। হ্যাঁ। আপনাদের দিদিরা আমাকে যেজন্যে এখানে আমন্ত্রণ করে এনেছে তাই নিয়ে কথা বলা যাক—।’ নবকুমার নরনারায়ণ রায়ের বক্তৃতার শুরুর মুখে বাইরে বেরিয়ে এলেও তার ওখানে থাকতে ইচ্ছে করছিল। বৃদ্ধ মানুষটির বক্তৃতা শুনতে ভালো লাগছিল তার।
অফিসে ঢোকার মুখে একটি প্রৌঢ়া জোরে-জোরে কথা বলছে একজন মহিলার সঙ্গে, ‘আমার মধ্যে কুমতলব থাকলে কি এখানে আসতাম? তোরা কি পুলিশ না এটা থানা?’
মহিলাটি সম্ভবত দুর্বারের কর্মী। বলল, ‘এখন দিদিরা মিটিং করছে। বাইরে থেকে মানীগুণী মানুষ এসেছে। তুমি বরং পরে এসো।’
‘আমি বারবার আসতে পারব না। তুমি তোমার দিদিকে বলে দিও, আমি এসেছিলাম। যে মেয়েটাকে আনতে হুকুম হয়েছিল সে দু-দিনের জন্যে বেড়াতে এসেছিল। গতর বিক্রি করার মেয়েমানুষ নয়। তোমরা ডেকেছ শুনে লজ্জায় আমাকে না বলেই তার দেশে চলে গিয়েছে। আমার আর কিছু করার নেই।’ মহিলা কথা বলছিল হাত নাড়তে-নাড়তে।
‘আমি কিছু বলতে পারব না, বীণা। যা বলার তুমি এসে বলো। লোকে বলছে দুর্বার জানতে পেরেছে শুনে তুমিই মেয়েটাকে হাওয়া করে দিয়েছ।’
‘কে বলেছে? কে বলেছে এই কথা? নিশ্চয়ই ওই বাড়িওয়ালি আমার নামে বদনাম দিয়েছে। ওই হারামজাদী ছাড়া আর কারও বুকের পাটা নেই একথা বলার। সে আমার কাছে ঠিকঠাক ভাড়া পাচ্ছে। এখন আমি আমার ঘরে তিন-চারজনকে যদি ব্যাবসা করতে দিই তাহলে ওর বুক টাটাবে কেন?’ বীণা চেঁচাল।
মহিলা বলল, ‘তাই বলে তুমি বাচ্চা মেয়েকে ঘরে বসাতে পারো না। দুর্বার নিয়ম করে দিয়েছে আঠারো বছরের নীচে যেমন মেয়েদের বিয়ে দেওয়া বেআইনি তেমনি আঠারোর নীচে কোনও মেয়েকে আর ব্যাবসা করতে দেবে না।’
‘আঠারো? চৌদ্দ-পনেরো বছরে আমাদের মা-ঠাম্মারা মা হয়নি? কোনও অসুবিধে হয়েছিল তাদের? নিজের খুশি মতো নিয়ম করে দিলেই হল? যাকগে, যতই মিটিং করুক, একটু বাইরে আসতে বলো তোমাদের পেসিডেনকে, এসেছি যখন দেখা করেই যাব।’ বীণা বলল।
মহিলা নবকুমারের পাশ কাটিয়ে ভেতরে চলে গেল। নবকুমার বাইরে এসে বীণাকে দেখল। এই মহিলার কথাই শেফালি-মা তাকে দিয়ে লিখিয়ে দুর্বার সমিতিকে জানিয়েছে।
বীণাও তাকে দেখছিল। কিন্তু কিছু বলল না।
ফিরে এল নবকুমার। পাড়াটা এখনও একইরকম। নিস্তরঙ্গ।
তাকে দেখতে পেয়ে মুক্তো গম্ভীর গলায় বলল, ‘ও ঘরে যাও। মাস্টার এসেছে। তাকে বসিয়ে রাখা হয়েছে।’
পরদা সরিয়ে ভেতরে ঢুকে মাস্টারদাকে দেখতে পেল নবকুমার। একটা টুলের ওপর বসে আছে। শেফালি-মা তাঁর খাটের ওপর বাবু হয়ে বসে আছেন। তাকে দেখতে পেয়ে বললেন, ‘দিয়েছ?’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ।’
‘কিছু বলল?’
নবকুমার খুব সংক্ষেপে যা হয়েছিল তা জানাল। শেফালি-মা বললেন, ‘তোমার ভাগ্য ভালো। প্রথম দিনেই ওঁর মতো মানুষের দর্শন পেলে।’
‘আপনি ওঁকে জানেন?’
শেফালি-মা বললেন, ‘সে অনেক বছর আগের কথা। বিডন স্কোয়ারে যাত্রা উৎসব হচ্ছিল। আমরা করছিলাম ঝাঁসির রানি পালা। খুব নাম হয়েছিল তখন। তো কমিটি আমাকে সংবর্ধনা দিয়েছিল। সেই আসরে প্রধান অতিথি হিসেবে নরনারায়ণ রায় এসেছিলেন। আমার হাতে পুরস্কার তুলে দিয়ে আশীর্বাদ করেছিলেন। পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতেই বলেছিলেন, মা তুমি মানুষকে সচেতন করছ। দেশকে ভালোবাসতে শেখাচ্ছ। রামকৃষ্ণদেব বলেছিলেন লোকশিক্ষা। আমরা হাজার বক্তৃতা দিয়েও যা পারি না তোমরা অভিনয়ের মাধ্যমে তা কত সহজে পেরে যাও।’ শেফালি-মায়ের মুখ বিষণ্ণ হয়ে গেল, ‘তখন কি জানতাম আমার শেষজীবন এমন নরকের পাঁক ঘেঁটে কাটবে।’
মাস্টারদা কথা বলল, ‘ও:। সেসব দিন আমারও মনে আছে। আপনি আছেন জানলেই রথের দিনেই কত বায়না হয়ে যেত।’
‘ওসব কথা থাক। মাস্টার, এই ছেলেটিকে তুমি তাহলে নিয়ে যাবে?’
‘হ্যাঁ। মালিকের সঙ্গে কথা বলেছি। আমাদের প্রম্পটার ছিলেন বিশুবাবু। ওর বুকের ব্যামো হয়েছে। রিহার্সালের সময় নবকুমার যদি কাজটা চালিয়ে যেতে পারে তাহলে খাওয়া থাকা ছাড়া একটা হাতখরচ দেবেন।’ মাস্টারদা বলল।
‘সেটা কত?’ শেফালি-মা তাকালেন।
‘আমি জিজ্ঞাসা করিনি। কাজটা ভালোভাবে করুক, সবাই যদি খুশি হয় তাহলে—। আসলে তো থাকা-খাওয়াই সমস্যা। যেটা হয়ে গেলে আর দুশ্চিন্তা থাকে না। রিহার্সাল শুরু হয় দুপুর থেকে। তার আগে সারা সকাল পড়ে থাকবে। তখন ও অন্য কাজ করে নিতে পারে।’ মাস্টারদা বলল।
‘হুঁ। কিন্তু ভবিষ্যৎ?’
‘আপাতত তো একটা ঠেকা দেওয়া গেল। চেহারাপত্র ভালো আছে, গলা থাকলে আর দেখতে-দেখতে অভিনয়টা শিখে নিলে, মানে সেই সুযোগটা তো থাকছেই। আমি ওকে কথা দিয়েছিলাম তোমাকে সুযোগ করে দেব তারপর তুমি চরে খাও। সেটা করে দিচ্ছি।’
মাস্টারদা উঠে দাঁড়াল।
‘ও রাত্রে থাকবে কোথায়?’
‘রিহার্সালের পর ওখানেই ঘুমাবে।’
‘দল যখন বাইরে যাবে?’
‘ঢাকে কাঠি পড়তে এখনও অনেক দেরি। তখন চিন্তা করা যাবে।’
‘না।’ মাথা নাড়লেন শেফালি-মা।
অবাক চোখে তাকাল মাস্টার।
‘তোমার মালিককে বলো খাওয়া-থাকার ব্যবস্থা করতে হবে না। ও যে ঘরে কাল ছিল সেখানেই থাকবে, এখানেই খাবে। দুপুরে পৌঁছে যাবে রিহার্সালে। তোমার মালিককে বোলো ওর পেছনে যে খরচ হত সেটাই মাস গেলে ওকে ধরে দিতে।’ শেফালি-মা কথাগুলো বলে তাকালেন নবকুমারের দিকে, ‘কী, তোমার আপত্তি আছে?’
