1 of 2

কলিকাতায় নবকুমার – ৬

ছয়

অন্ধকার নেমেছিল আগেই। ঝুপঝুপ করে মাঠঘাট, চাষের খেত ঢেকে ফেলেছিল। তারপর হঠাৎ যেন বড়-বড় কয়েকটা জোনাকিকে জ্বলতে দেখল নবকুমার। কিন্তু এত বড় জোনাকি কী করে হবে? ট্রেনের জানলা দিয়ে সে আচমকা অজস্র আলো জ্বলতে দেখল। সেই আলোয় আলোকিত দোতলা, তিনতলা বাড়িঘর। ঠাসাঠাসি। চলন্ত ট্রেন থেকে রাস্তা দেখা যাচ্ছে। সেই রাস্তায় লোকজন, গাড়ি। আর এতক্ষণ যে ট্রেনটা খুঁড়িয়ে-খুঁড়িয়ে আসছিল সে হঠাৎ পক্ষীরাজ ঘোড়ার মতো বিপুল বিক্রমে ছুটতে শুরু করেছে।

ঘাড় ঘুরিয়ে নবকুমার মাস্টারদাকে জিজ্ঞাসা করল, ‘আমরা কলিকাতায় এসে গিয়েছি, না?’

মাস্টারদা মাথা নাড়ল, ‘উলটোডিঙি পেরোচ্ছে। যদি এখানে থামে তাহলে আমরা টুক করে নেবে পড়ব। এখান থেকে চিৎপুর কাছে।’

ঝাঁ-চকচকে আলোজ্বলা প্ল্যাটফর্মে ট্রেন ঢুকল। প্রথমে মনে হল এখানে ট্রেন দাঁড়াবে না। কিন্তু গতি কমতে লাগল। শেষপর্যন্ত আলো না থাকা প্ল্যাটফর্মের শেষ প্রান্তে গিয়ে হাটি-হাটি পা-পা করতে লাগল। মাস্টারদা দ্রুত তার ঝোলা নিয়ে দরজা থেকে পা বাড়াল প্ল্যাটফর্মে। নেমেই চেঁচিয়ে বলল, ‘ইঞ্জিনের দিকে মুখ করে নামো, নইলে পড়ে যাবে।’

স্যুটকেস সামলে হোঁচট খেতে-খেতে সামলে উঠে নবকুমার দেখল ট্রেনটা আবার গতি বাড়াচ্ছে। কামরাগুলোর জানলায় মানুষের মুখ। এক সেকেন্ডের কম সময়ের জন্যে মন্দিরার মুখ দেখতে পেল সে। তারপর চারপাশ অন্ধকার।

নবকুমার জিজ্ঞাসা করল, ‘মাস্টারদা, ট্রেনটা তো কলিকাতায় যাবে। আমরা এখানে কেন নেমে পড়লাম? আমাদের তো কলিকাতায় যাওয়ার কথা।’

‘আচ্ছা পাগল। এটাও কলিকাতা। তোমাদের গ্রামে যেমন উত্তরপাড়া, বামুনপাড়া, দক্ষিণপাড়া, বাগদিপাড়া থাকে তেমনি কলিকাতাতেও অনেক পাড়া আছে। এই যেমন উলটোডিঙি, এখান থেকে আমরা যাব আর-এক পাড়াতে, যার নাম চিৎপুর। এসব কলিকাতার পাড়া।’ মাস্টারদা হাঁটতে-হাঁটতে বোঝাচ্ছিল।

বেরোবার রাস্তা অদ্ভুত। দু-দুটো ট্রেন লাইন পেরিয়ে সরু পাথরে পা ফেলে উলটোদিকের প্ল্যাটফর্মে চলে এল মাস্টারদা। সেখান থেকে নীচে নেমে আসতেই পৃথিবীর সব শব্দ যেন একসঙ্গে কানের সুড়ঙ্গে হুড়মুড়িয়ে ঢুকতে লাগল। অটোর হর্ন, গাড়ির আওয়াজ এবং মানুষের চিৎকারের সঙ্গে মাথার ওপর ব্রিজ দিয়ে ছুটে যাওয়া ট্রেনের চাকার আওয়াজ মিলেমিশে ভয়ঙ্কর অবস্থা তৈরি করেছে। নবকুমার এক হাতে স্যুটকেস অন্য হাতে কান চাপা দিল। ততক্ষণে হাত নেড়ে একটা অটোরিকশা থামিয়েছে মাস্টারদা, ‘চিৎপুর?’

‘বি কে পাল।’

‘বেশ তাই চল, উঠে এসো নবকুমার।’

.

.

নবকুমার উঠতেই অটো ছাড়ল। পেছনে আর-একজন ভদ্রলোক বসে আছেন। একটু পরে ড্রাইভারের দুপাশে আরও দুজন করে কোনওমতে শরীর একচিলতে জায়গায় ঠেকিয়ে বসল। দুপাশে আলো ঝলমলে দোকান, বড়-বড় বাস, অগুনতি মানুষ। নবকুমার বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখছিল। এই শহরের নাম কলিকাতা।

সামনে একটা ব্রিজ আসছে। পাশে বসা লোকটি জিজ্ঞাসা করল, ‘কোত্থেকে আসা হচ্ছে ভাই? কটক না ভুবনেশ্বর?’

মাস্টারদা খিঁচিয়ে উঠল, ‘হঠাৎ ওই নামগুলো মনে পড়ল কেন আপনার?’

ভদ্রলোক হাসলেন, ‘নামটা শুনে তাই ভাবলাম। আজকাল ওড়িশাতেই নবকুমার নামটা শুনতে পাওয়া যায়। আমাদের পাড়ার পানের দোকানদারের বাড়ি কটকে। ওর নাম নবকুমার। আমরা নব বলে ডাকি।’

মাস্টারদা নবকুমারের দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল, ‘যত্ত সব।’

অটোয় যেতে-যেতে মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল নবকুমারের। রাস্তায় আরও মানুষ, অটো, হাতটানা রিকশা, গাড়ি বাসের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। কখনও মনে হচ্ছে তাদের অটোকে পাশের বাসটা যে-কোনও মুহূÓর্তেই ধাক্কা দেবে। আবার সামনের রাস্তা দেখাই যাচ্ছে না মাঝে-মাঝে। কলিকাতার মানুষগুলোর এতে কোনও অসুবিধা হচ্ছে না। গাড়ির জটলার মধ্যেই তারা সুড়ুৎ-সুড়ুৎ করে রাস্তা পারাপার করছে।

শেষপর্যন্ত যেখানে অটোরিকশা থেকে নামতে হল সেখানে পায়ের নীচে ট্রাম লাইন। ট্রামের কথা নবকুমার জানে। এই পথটুকুতে সে একটিও ট্রাম দেখেনি।

‘দশটা টাকা দিয়ে দাও।’ মাস্টারদা বলল।

সযত্নে রাখা টাকা থেকে দশটা টাকা বের করে নবকুমার মাস্টারদার হাতে দিতে সে ভাড়া মিটিয়ে দিল। মাস্টারদা বলল, ‘তোমাকে পয়সা খরচ করাচ্ছি। দলে না গেলে তো অগ্রিম পাব না। পেলে শোধ করে দেব।’

ততক্ষণে দোকানপাট বন্ধ হতে চলেছে। আলো নিভছে। মাস্টারদার সঙ্গে হাঁটতে গিয়ে কেবলই হোঁচট খাচ্ছিল নবকুমার। পথ ভাঙাচোরা। কোথাও-কোথাও কাদা পড়ে আছে। সে বলল, ‘মাস্টারদা, কলিকাতার পথ এত খারাপ কেন?’

‘পাঁচ ভূতের ব্যাপার। তার ওপর খোট্টা পাড়া। আজ সারালে কালই এই অবস্থা হবে। চোখ মেলে হাঁটো।’ মাস্টারদা উপদেশ দিল।

শেষপর্যন্ত এক চৌমাথায় এসে মাস্টারদা বলল, ‘একটু দেরি হয়ে গেল হে।’

‘মানে?’

‘এই হল চিৎপুর। তাকিয়ে দ্যাখো ঘরে-ঘরে যাত্রার বিজ্ঞাপন ঝুলছে। কিন্তু ন’টা বেজে যাওয়ায় সব দোকান বন্ধ করে চলে গিয়েছে।’ মাস্টারদার গলা বিষণ্ণ।

নবকুমার দেখল। রঙিন-রঙিন পোস্টার। বধূ এল ঘরে। ডাইনির নাম শাশুড়ি। দজ্জাল বউ-এর ভেরুয়া স্বামী। কমলেকামিনী। ফাটাফাটি হান্টারওয়ালি। এরকম কত নাম। নবকুমার জিজ্ঞাসা করল, ‘এসব যাত্রার নাম?’

‘হ্যাঁ।’

‘ঐতিহাসিক যাত্রা এখানে হয় না?’

‘আর কী বলব ভাই। আমার তো বঙ্গে বর্গী, শাজাহান, সিরাজ—সব পার্ট মুখস্থ। কিন্তু পাবলিক ওসব আর দেখতে চায় না।’

‘ঠিক। আমাদের গ্রামে গেল শীতে যাত্রা এসেছিল কলিকাতা থেকে, শাশুড়ি বনাম বউমা।’ নবকুমার হাসল, ‘মেয়েরা ঝেঁটিয়ে গিয়েছিল।’

‘তা তো হল। এখন কী উপায়?’ মাস্টারদাকে চিন্তিত দেখাল। একটু ভেবে বলল, ‘আচ্ছা, চল।’ হাঁটতে-হাঁটতে বলল, ‘মন দিয়ে শোন। নিজেকে এখন থেকে হাঁস বলে ভাবতে শুরু কর। জলে নামবে কিন্তু শরীর ভেজাবে না।’

‘সেটা কী করে করব?’

‘দেখবে শুনবে কিন্তু জড়াবে না, কোনও কিছু ভালো বা খারাপ লাগলেও আগ বাড়িয়ে প্রকাশ করবে না। তিন বাঁদরের ছবি দেখেছ?’ মাস্টারদা হাঁটতে-হাঁটতে তাকাল।

‘কোন তিন বাঁদর?’

‘একজন চোখ ঢেকেছে, দ্বিতীয়জন কান, তৃতীয়জন মুখ।’

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, কলেজে দেখেছি।’ নবকুমার মজা পেল।

‘ঠিক ওইরকম হয়ে থাকবে। তুমি কিছু বলছ না, শুনছ না, দেখছ না।’

‘ঠিক আছে।’ নবকুমার মাথা নাড়ল।

বড় রাস্তা ছেড়ে একটা আধো আলোর গলিতে ঢুকল মাস্টারদা। গলির মুখেই যারা দাঁড়িয়ে আছে তাদের মুখে রং মাখা বলে মনে হল নবকুমারের। ওদের দেখে খিকখিক করে হেসে একজন হিন্দি গান গাইতে লাগল। আর-একজন ‘আ যা আ যা’ বলে দু-হাত দু-দিকে মেলে নিতম্ব দোলাতে থাকল। চাপা গলায় কিছু একটা বলে মাস্টারদা একটা সরু সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে এল। সিঁড়ির মুখেও মেয়েদের জটলা। হারমোনিয়ামে গলা মেলাচ্ছে কোনও মেয়ে কাছাকাছি ঘরে।

একটা ঘরের ভেজানো দরজায় টোকা মারল মাস্টারদা, ‘শেফালি-মা, শেফালি-মা!’

‘কে? কে ডাকে। চেনা গলা বলে মনে হচ্ছে। মুক্তো, দ্যাখ দিকিনি।’ ভেতর থেকে গলা ভেসে এল। তারপর যে দরজা খুলল তাকে দেখে চোখ কপালে উঠল নবকুমারের। প্রায় ছয় ফুট লম্বা, তেমনি চওড়া, আবলুশ কাঠের মতো কালো, চুড়ো করে চুল বাঁধা বলে আরও লম্বা দেখাচ্ছে। মাস্টারদার দিকে তাকিয়ে গজদন্ত বের করল, ‘ও, ম্যাস্টর এসেছে মা। ওপাড়ার ম্যাস্টর। সঙ্গে যে তাকে চিনি না।’

ততক্ষণে ভেতরে ঢুকে ঝুঁকে নমস্কার করেছে মাস্টারদা, ‘জানি বিরক্ত করছি।’

যিনি আধশুয়ে ছিলেন খাটে তাঁর পরনে গরদ, সেই রঙের ব্লাউজ। ফরসা, বেশ মোটাসোটা, মুখে বোধহয় জোড়া পান। মুক্তোকে ইশারা করলেন তিনি। মুক্তো দ্রুত পিক ফেলার পাত্র তুলে নিয়ে পাশে ধরল। ধীরেসুস্থে তাতে পানের পিক ফেলে উঠে বসলেন শেফালি-মা। আস্তে-আস্তে তাঁর মুখে হাসি ফুটল, ‘জানো যখন, তখন বিরক্ত করছ কেন? এ তো জ্ঞানপাপী!’

মাস্টারদা মুখ নামাল, ‘না করে পারলাম না। সোজা দেশ থেকে আসছি। সঙ্গে এ এসেছে। এর নাম নবকুমার। প্রথম গ্রামের বাইরে এল। পথে ট্রেন দাঁড়িয়েছিল অনেক ঘণ্টা। ফলে যখন পৌঁছলাম তখন যাত্রার গদি বন্ধ হয়ে গিয়েছে।’

শেফালি-মা এবার নবকুমারের দিকে তাকালেন, ‘পুরো নাম কী?’

‘নবকুমার রায়।’

‘বামুন নয় তো?’

‘না।’

‘কখনও গ্রামের বাইরে যাওনি?’

চট করে মাস্টারদাকে দেখে নিল নবকুমার। শেষপর্যন্ত সত্যি কথা বলল, ‘গিয়েছি। গঞ্জে। সেখানকার কলেজে পড়েছি।’

‘শহরে যাওনি?’

‘আজ্ঞে না।’

‘কদ্দুর পড়েছ?’

‘বিএ পাশ করেছি।’

‘বাব্বা। এ তো লেখাপড়া জানা ছেলে! কী উদ্দেশে এখানে এলে?’

‘রোজগার করতে। চাকরির চেষ্টা করব।’

‘থাকবে কোথায়?’

‘মাস্টারদা বলেছে ব্যবস্থা হয়ে যাবে।’

শেফালি-মা এবার মাস্টারদার দিকে তাকালেন। ‘একেবারে হরিণশিশুকে শহরে নিয়ে এলে মাস্টার। এ তো কসাইদের খপ্পরে পড়ল বলে। থাকো এখানে আজ রাত্রে। কাল ওকে নিয়ে যাত্রার গদিতে চলে যেও। মুক্তো, ও-পাশের ঘরে নিয়ে যা ওদের।’

মাস্টারদা বললেন, ‘নব, শেফালি-মাকে নমস্কার কর।’

নবকুমার ঝুঁকে নমস্কার করতে শেফালি-মা বলল, ‘শোনো ছেলে। মাস্টার তোমাকে কোন পাড়ায় নিয়ে এসেছে তা বুঝেছ তো?’

মাথা নেড়ে না বলল নবকুমার।

‘বোঝোনি? অ্যাঁ! বলে কী? এতগুলো মেয়েমানুষ ডিঙিয়ে এই ঘরে ঢুকলে আর বুঝতে পারলে না বাবা! এটা হল বেবুশ্যেদের পাড়া। ভদ্দরলোকেরা টাকা দিয়ে মজা লুঠতে আসে এখানে। তুমি আমাদের দুজনের বাইরে আর কারও সঙ্গে কথা বলবে না। নিজের মা কি আজও বেঁচে আছেন?’ শেফালি-মা জিজ্ঞাসা করলেন।

‘হ্যাঁ।’

‘যখনই এদের দেখবে তাঁকে স্মরণ করবে। কোনও ফাঁদে পা দেবে না। যাও।’

মুক্তো তাদের যে-ঘরে নিয়ে এল সেখানে একটা বড় খাট পাতা আছে। মুক্তো বলল, ‘পাশেই কল-পায়খানা। সব সেরে নাও। একটু পরে খাবার দিয়ে যাচ্ছি। কপাল ভালো।’

‘কীরকম?’ মাস্টারদা হাসল।

‘এই ছোঁড়া সঙ্গে আছে বলে মা থাকার জায়গা দিল।’

খাওয়া শেষ করে ওরা পাশাপাশি শুয়ে পড়ল আলো নিভিয়ে।

অনেকক্ষণ থেকে যে প্রশ্ন মনে ফুটছিল সেটা উগরে দিল নবকুমার, ‘মাস্টারদা, শেফালি-মা এখানে থাকেন কেন?’

‘বা:। থাকবে না? এই বাড়ির বাড়িওয়ালি তো উনিই।’

‘বেবুশ্যেদের বাড়িওয়ালি?’

‘হ্যাঁ।’

‘কিন্তু ওকে দেখে তো মনেই হয় না।’

‘কেন?’

‘উনি কত্ত ভালো।’

অন্ধকারে মাস্টারদার হাসি শোনা গেল, ‘এককালে শেফালি-মায়ের নামে চিৎপুর কাঁপত। খুব বড় অভিনেত্রী ছিলেন। উনি যে-দলের নায়িকা হতেন তাদের কাছে ভিড় জমাত নায়করা। প্রতিদিন শো। কী ডিমান্ড! এক সোনাই দিঘি বোধহয় হয়েছে পাঁচ হাজার রাত। তারপর বয়স বাড়তেই মায়ের চরিত্রে চলে গেলেন। কিন্তু সেই চরিত্রটি হত পালার প্রধান চরিত্র। সেই সময় প্রেমে পড়লেন শেফালি-মা। পড়ে যাত্রা ছাড়লেন প্রেমিকের চাপে। কিন্তু প্রেমিকের হল ক্যান্সার। তাকে সারাতে নিজের জমানো টাকা জলের মতো খরচ করে গেলেন তিনি। সেই প্রেমিকের পরিবার ছিল। অবস্থাও ভালো। তারা এক পয়সাও খরচ করতে চায়নি ওই প্রেমের জন্যে। মারা যাওয়ার আগে এই বাড়িটা শেফালি-মায়ের নামে কিনে গিয়েছিলেন ওঁর প্রেমিক। তখন থেকে উনি চলে এলেন এখানে।’ মাস্টারদা বলল, ‘আর নয়। এবার ঘুমিয়ে পড়। সারাদিন অনেক ধকল গেছে।’

মাস্টারদা ঘুমিয়ে পড়ল কিন্তু নবকুমারের ঘুম আসছিল না। কেবলই মনে হচ্ছিল কলিকাতায় আজ তার প্রথম রাত। শেফালি-মায়ের দয়ায় এই ঘরে শোবে, এখানে অন্ন জুটবে তা কিছুক্ষণ আগেও তার জানা ছিল না। ছুটকি, মন্দিরা, ওদের মা-বাবাকে কি চিনতে পারত ট্রেনে না উঠলে!

রাত বাড়ছিল। ওপাশের ঘরগুলোতে গান বাজনা থেমে গিয়েছে। মাঝে-মাঝে জড়ানো গলায় কোনও মাতাল চিৎকার করে উঠছে। নবকুমারের মনে হল শেফালি-মা যতই ভালো হোন এই পরিবেশে থাকা ঠিক নয়। যাত্রার গদিতে যদি থাকার ব্যবস্থা হয় তাহলে নিশ্চয়ই সেই জায়গা এখান থেকে অনেক ভালো হবে। হঠাৎ কানে চিৎকার, চেঁচামেচি কান্না ভেসে এল। তড়াক করে উঠে জানলার খড়খড়ি সরাতেই সে দেখতে পেল কালো ভ্যানে কিছু লোককে টেনে তুলছে পুলিশ। কয়েকটা মেয়ে পাগলের মতো দৌড়ে গেল। তারপর ভ্যানটা চলে গেলে সব শান্ত। কোনও একটা লোক চিৎকার করে উঠল, ‘জয় মা কালী কোলকাত্তাওয়ালী। ঘুমা, এবার ঘুমিয়ে পড়।’

নবকুমার প্রথম রাত্রেই কলিকাতা-দর্শন শুরু করল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *