চার
স্টেশনের বাইরে বুনো গাছ আর চারপাশে ধানের খেত। এখন মাঠে ধান নেই। কয়েকদিনের বৃষ্টি এখন কাদা তৈরি করে রেখেছে। কোনও রিকশা নেই, নেই চায়ের দোকান। একটা মাটির রাস্তা চলে গিয়েছে এঁকেবেঁকে। কিছু যাত্রী স্টেশনের কর্মচারীদের জিজ্ঞাসা করছিল কতদূর গেলে বাসের দেখা পাওয়া যেতে পারে। আড়াই ক্রোশ শুনে তারা দোনামনা করছিল। মাস্টারদা হাঁটতে শুরু করায় সঙ্গী হতে হল নবকুমারকে।
‘আড়াই ক্রোশ পথ এমন কিছু বেশি নয়, বলো?’ মাস্টারদা জিজ্ঞাসা করল।
‘স্যুটকেসটা না থাকলে বেশি লাগত না।’
‘তাই বলে ওটাকে তো ফেলে রেখে যেতে পারো না।’
নবকুমার কথা বলল না। সে যখন এসব রাস্তার কিছুই জানে না তখন মাস্টারদা যা বলছে তাই শোনাই ভালো।
‘তোমাকে একটা কথা বলি নবকুমার। মনুষ্যজীবন হল নদীর মতো। যে নদীতে স্রোত নেই সেই নদী মজে যায়। তাকে আর শেষপর্যন্ত নদী বলা যায় না। নদীর উৎপত্তি পাহাড়ে। প্রথমে ঝরনা, তারপর সমতলে এসে তীব্র স্রোতে বয়ে চলে সমুদ্রের দিকে। পাহাড়ে জন্মানো নদীর সমুদ্রে না মেশা পর্যন্ত শান্তি নেই। মাতৃগর্ভ থেকে বেরিয়ে বৃদ্ধ বয়সে মৃত্যুর দেখা পাওয়া পর্যন্ত যে জীবন সেটাও নদীর মতো। শুধু ছুটে চলা। দেখা শোনা। আর, আর তাতেই পৃথিবীর স্বাদ উপভোগ করার মধ্যেই পূর্ণতা। আমার কথা বুঝতে পারছ?’ মাস্টারদা পথ চলতে-চলতে জিজ্ঞাসা করল।
‘পারছি।’
‘পাহাড় থেকে সমুদ্রে যাওয়ার পথে নদীকে দুপাশের কতশত ঘাট ছুঁয়ে যেতে হয়। আবার প্রকৃতির এমনই নিয়ম, নদী ফেলে আসা ঘাটগুলোর কাছে আর ফিরে যেতে পারে না। এ ব্যাপারে তাকে নির্লিপ্ত হতেই হয়। মানছ?’
‘হুঁ।’
‘এইসব কথা তোমাকে মনে করিয়ে দিলাম, কেন জানো?’
‘না।’
‘জীবনের পথে চলতে গিয়ে দেখবে কত মানুষের সঙ্গে আলাপ হচ্ছে। তাদের কাছ থেকে অভিজ্ঞতাটুকু নেবে, কিন্তু কখনই নিজেকে জড়িয়ে ফেলবে না। এতে করে যদি নিজেকে জড়িয়ে ফেল তাহলেই সর্বনাশ হয়ে যাবে। ওই বন্ধন তোমাকে আর এগোতে দেবে না। এই বিশাল পৃথিবীর বেশিরভাগটাই তোমার অজানা থেকে যাবে। তোমার জীবন হয়ে যাবে ওই মজা নদীর মতো।’ মাস্টারদা বলল, ‘পথের আলাপ পথেই রেখে যাবে। বুঝতে পারছ?’
নবকুমার এতক্ষণে ধরতে পারল। পঁয়ত্রিশ-পনেরোর কথা ভেবে মাস্টারদা এইসব বলছে। তাহলে কি কাল রাতে ছুটকির পাগলামির খবর মাস্টারদা জেনে ফেলেছে? নরম মাটির রাস্তায় স্যুটকেস হাতে নিয়ে হাঁটতে-হাঁটতে কেবলই ছুটকির মুখ মনে পড়ছিল নবকুমারের। কাল রাত্রে ছুটকি যেসব কথা বলেছে, আজ অবধি তার সঙ্গে কেউ ওরকম কথা বলেনি।
ক্রমশ দু-একজন লোককে দেখা গেল। তারা গরু চরাচ্ছে। মাস্টারদার প্রশ্নের উত্তরে একজন বলল, ‘তা এখনও আধ ক্রোশ পথ। তবে বাস বন্ধ আছে আজ।’
‘সে কী? কেন?’ মাস্টারদা হতভম্ব।
‘মাওবাদীরা বনধ ডেকেছে।’
‘কেন? হঠাৎ বনধ ডাকল কেন?’
‘পুলিশ ওদের তিনজনকে ধরে নিয়ে গিয়েছে গ্রামের মুখ থেকে। আপনারা কোথা থেকে আসছেন? কোথায় যাবেন?’
মাস্টারদা সংক্ষেপে ঘটনাটা জানাল।
‘আমার মনে হয় আর না যাওয়াই ভালো। মাওবাদীরা আপনাদের পুলিশের লোক ভাববে আবার পুলিশ ভাববে মাওবাদী। নতুন মুখ তো। তা ছাড়া বাসও পাবেন না।’ লোকটি গম্ভীর মুখে উপদেশ দিয়ে একটা গরুর পেছনে ছুটল।
মাস্টারদা হতাশ গলায় নবকুমারকে বলল, ‘কী গ্যাঁড়াকলে পড়লাম। এখন কী করা?’
‘বোধহয় ফিরে যাওয়াই ভালো।’
‘তা ছাড়া উপায় তো দেখছি না।’
‘হুঁ। আচ্ছা, এমন তো হতে পারে, উটকো লোক দেখে ও মিথ্যে কথা বলল!’
‘মিথ্যে বলে ওর কী লাভ?’
‘অবোধের গোবধেও আনন্দ হয়। না:। আর-একজনকে জিজ্ঞাসা করতে হচ্ছে।’
দ্বিতীয়জনকে পাওয়া গেল। সাইকেলে আসছে লোকটা। পেছনে একটা বস্তা বাঁধা। মাস্টারদা হাত তুলে তাকে থামাতেই সে সাইকেল থেকে নেমে জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনারা কি ওই ইস্টেশন থেকে আসছেন?’
‘হ্যাঁ।’
‘অনেক লোক আটকে আছে ওখানে?’
‘হ্যাঁ।’
‘তাহলে খবরটা ঠিক পেয়েছি। চলি।’ লোকটা আবার সাইকেলে উঠল।
‘দাঁড়ান, দাঁড়ান। আজ কি মাওবাদীদের স্ট্রাইকের জন্যে বাস বন্ধ?’ মাস্টারদা বেশ গলা তুলেই প্রশ্ন ছুঁড়ল।
লোকটা এমনভাবে মাথা নেড়ে চলে গেল যে তার অর্থ হ্যাঁ কিংবা না বোঝা মুশকিল হল। মাস্টারদা বলল, ‘আচ্ছা বেকুফ। ট্রেন বন্ধ, লোক আটকে আছে বলে এত আনন্দ হল যে কথা বলতেও চাইল না।…চলো, ফেরাই যাক।’
শেষ অবধি আর পা চলছিল না। নবকুমার যখন স্যুটকেসটা বয়ে স্টেশনের সামনে পৌঁছল তখন মাস্টারদা নির্বিকার। চার ক্রোশ পথ ওর কাছে যেন পায়চারি করা। কিন্তু ওকী! এত লোক কোত্থেকে এল? প্ল্যাটফর্মে মেলা বসে গিয়েছে যেন। যে যার মতো খাবারের জিনিস বিক্রি করছে। সেই লোকটাকেও দেখা গেল। বস্তা থেকে মুড়ি বের করে দোকান সাজিয়েছে। যাত্রীরাও চিঁড়ে মুড়ি গুড় কিনে ফেলছে চটপট। ট্রেন কখন ছাড়বে কেউ জানে না, খিদেটাকে তো সামাল দিতে হবে। নবকুমার বলল, ‘কিছু কিনবেন মাস্টারদা? খিদে পেয়েছে।’
মাস্টারদা বলল, ‘দাঁড়াও।’ তারপর সেই মুড়িওয়ালার সামনে গিয়ে বলল, ‘এই যে ভাই, এই দুটো মুখকে মনে পড়ছে?’
‘হেঁ-হেঁ কী যে বলেন। একটু আগেই তো দেখা হল।’ লোকটা একগাল হাসল।
‘আমি যদি বলতাম ট্রেন চলে গিয়েছে, কোনও প্যাসেঞ্জার নেই, তাহলে তো ফিরে যেতে।’
‘তা অবশ্যই। তবে কি না মিথ্যে কেন বলবেন!’
‘বেশ। দুজনের মুড়ি চাই। একটু বেশি করে দাও। নবকুমার, ওকে চার টাকা দিয়ে দাও।’ লোকটা একটা বড় ঠোঙায় মুড়ি ঢেলে দিলে নবকুমার চার টাকা দিয়ে দিল।
‘লঙ্কা চাই?’ লোকটা জিজ্ঞাসা করল।
‘আছে নাকি? বা:। তুমি লোকটা বেশ। কত দিতে হবে লঙ্কার জন্য?’
দুটো লঙ্কা ঠোঙায় ফেলে লোকটা বলল, ‘এটা ফাউ।’
সামনের কামরা ফাঁকা। ওরা তাতেই উঠে বসে মুড়ি খেতে শুরু করল। শুকনো মুড়ি, গলা দিয়ে নামতেই চায় না। লঙ্কার ঝাল বেশি হওয়ায় জিভে জল আসছে বলে কিছুটা রক্ষে। মাস্টারদা বলল, ‘একটু সরষের তেল আর পেঁয়াজ পেলে খুব জমত।’
‘সেইসঙ্গে আলুর চপ।’ নবকুমার ঝাল সামলাতে জিভ টানল।
‘এই ধ্যাড়ধ্যেড়ে গোবিন্দপুরে আলুর চপ। একটু তেল হলে…না:, বেশি খাওয়া যাচ্ছে না। গলায় আটকে যাচ্ছে। তুমি খেয়ে নাও।’ মাস্টারদা বলল।
‘একটু তেলের চেষ্টা করব?’
‘কোথায় পাবে?’
‘এত যাত্রী, কারও কাছে কি সরষের তেল পাব না?’
‘চেষ্টা করে দ্যাখো। পাবে বলে মনে হয় না।’
শোনামাত্র তড়াক করে নীচে নেমে এল নবকুমার। ইতিমধ্যে হঠাৎ গজানো দোকানদারদের সব মাল বিক্রি হয়ে যাওয়ায় বাজার ভেঙে গিয়েছে। হঠাৎ নিজের নাম কানে এল, ‘নবকুমার। ও নবকুমার।’
লোকজনের মাথার ফাঁক দিয়ে শেষপর্যন্ত পঁয়ত্রিশকে দেখতে পেয়ে এগিয়ে গেল নবকুমার। কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘ডাকছেন।’
‘একী? তুমি চলে যাওনি?’
‘না।’
‘খুব ভালো করেছ। তা আমাদের ওখানে ওঠোনি কেন?’
‘সামনে খালি পেলাম তাই। আপনি এখানে?’
‘আর বোলো না, এতক্ষণে মায়ের খেয়াল হল সঙ্গে যা খাবার আছে তা দুপুরের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে। আমি চিড়ে মুড়ি কিনতে নীচে নেমে দেখি সব বিক্রি হয়ে গিয়েছে।’ পঁয়ত্রিশ হাসল।
‘আপনি একাই নেমেছেন?’
‘আর কে সঙ্গে নামবে? ও ছুটকির কথা বলছ? তার মন খারাপ, সে ঘুমাচ্ছে। আহ্লাদি। তুমি কী করছিলে?’
‘তেল খুঁজছি। সরষের তেল। শুকনো মুড়ি খাওয়া যাচ্ছে না।’
পঁয়ত্রিশ চোখ ঘোরাল, ‘তেল না দিলে তেল মেলে না।’
‘আমার কাছে তেল কোথায় যে দেব।’
‘আহা। ওই তেলের কথা কে বলছে? তুমি দেখছি নিতান্তই ভালো ছেলে।’
‘আপনাদের কাছে তেল আছে?’
‘হুঁ!’
‘একটু দেবেন?’
‘দিতে পারি। কিন্তু ওই যে বললাম, তেল আমাকেও তুমি দিলে, তবে দেব।’
‘কীভাবে?’
‘প্রথম কথা, আমাকে আপনি বলা চলবে না। আজকাল ছোটরাও বড়দের তুই বলে। আর দু-নম্বর হল, দ্যাখো না, কারও কাছে মুড়ি চিঁড়ে পাও কি না। পঁয়ত্রিশ নবকুমারের হাত ধরল।
সঙ্গে-সঙ্গে নবকুমারের মনে পড়ল মুড়িওয়ালার কথা। দ্রুত ছুটে গেল সে তার কাছে। লোকটা তখন উঠে দাঁড়িয়েছে। তাকে দেখে জিজ্ঞাসা করল, ‘মুড়ি ভালো ছিল তো?’
‘ভালো। কিন্তু আরও চাই।’
‘সব শেষ। সব বিক্রি হয়ে গিয়েছে।’ লোকটা হাসল।
‘আমি জানি না। আপনি এখানকার লোক, জোগাড় করে দিন।’
লোকটা চোখ বন্ধ করে একটু ভাবল। তারপর বলল, ‘ঠিক আছে। আধ ঘণ্টাটাক অপেক্ষা করতে হবে। গ্রামে ফিরে গিয়ে আর-এক বস্তা নিয়ে আসছি। কিন্তু মুশকিল হল তার মধ্যে যদি ট্রেন ছেড়ে দেয় তাহলে মুশকিলে পড়ব।’
‘কেন? মুশকিল কীসের। ঘরের মুড়ি ঘরে থাকবে।’
মাথা নাড়ল লোকটা। ‘এত মুড়ি কি ঘরে থাকে? মুদির দোকান থেকে কিনে এনেছিলাম। আবার কিনতে হবে। বিক্রি না হলে মুদিওয়ালা ফেরত নেবে না।’ বলতে-বলতেই ওর মুখের চেহারা বদলাল, ‘আর একটা পথ আছে। দিন দশ টাকা। বরাতে থাকলে নিয়ে আসছি।’
‘দশ টাকা কেন? পাঁচ টাকার মুড়ি হলেই হবে।’ নবকুমার বলল।
‘ডবল না দিলে ও মুঠো খুলবে না।’
‘কে?’
স্টেশন মাস্টারের লোক এসে দু-কেজি কিনে নিয়ে গিয়েছে ব্ল্যাক করবে বলে।’
পঁয়ত্রিশ ফস করে একটা দশ টাকার নোট বাড়িয়ে ধরল। লোকটা সেটা নিয়ে তার বস্তা দেখতে বলে ছুটল। পঁয়ত্রিশ নবকুমারের মুখ দেখে জিজ্ঞাসা করল, ‘কী হল তোমার?’
‘ব্ল্যাকে জিনিস কেনা অন্যায়।’ নবকুমার ম্লানমুখে বলল।
‘কেন?’
‘তাতে অসৎ লোককে প্রশ্রয় দেওয়া হয়।’
‘ঠিক কথা। কিন্তু পেট তো কালা। এইসব নীতিকথা শুনতে পায় না।’ হাসল পঁয়ত্রিশ, ‘তোর গার্জেন কোথায় গেল?’
‘গার্জেন? ও, মাস্টারদা। ওই দিকের কামরায় বসে আছে।’
‘ওর বাড়িতেই গিয়ে উঠবে?’
‘আমি জানি না।’
‘ও যাবে কোথায়?’
‘চিৎপুর নামের একটা জায়গায়। কলিকাতার মধ্যেই।’ নবকুমার এবার গর্বিত গলায় বলল, ‘মাস্টারদা যাত্রা করে।’
‘ওকে দেখেই সেটা মনে হচ্ছিল। তা তোমারও যাত্রা করার শখ আছে নাকি?’
‘আমি কি পারব? মাস্টারদা বলে, না শিখলে যেমন সাঁতার কাটা যায় না, তেমনি অভিনয় আগে শিখতে হয়।’ নবকুমারের কথা শেষ হতেই মুড়িওয়ালা একটা মাঝারি ঠোঙা নিয়ে ফিরে এল, ‘নিন। দু-টাকা কম দিয়েছি।’ মুড়ি আর টাকা দুটো সে নবকুমারের হাতে তুলে দিল।
নবকুমার বলল, নিন। মনে হয় এতে চারজনের হয়ে যাবে।’
মাথা নাড়ল পঁয়ত্রিশ, ‘না। নেব না।’
‘সেকী? নেবেন না কেন?’ নবকুমার অবাক।
