1 of 2

কলিকাতায় নবকুমার – ৪১

একচল্লিশ

গতরাত্রে বাড়ি ফিরেছিল মন্দাক্রান্তার গাড়িতে। দর্জিপাড়ার বাসস্টপে তাকে নামিয়ে চলে গিয়েছিল ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে। টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছিল। নবকুমার দেখল, এখন সোনাগাছির গলি ফাঁকা। সেই চেঁচামেচি, গান, মেয়েদের দরজায় দাঁড়ানোর পরিচিত দৃশ্য এখন নেই। এমনকি তাদের বাড়ির দরজা ভেজানো। সেখানে কোনও মেয়ে খদ্দেরের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে নেই। ঠেলতেই দরজা খুলে গেল।

নীচের ঘর থেকে কেউ বলল, ‘এসে গিয়েছে। এবার দরজা বন্ধ করে দে।’

একটি মেয়ে দরজা বন্ধ করে চলে যাচ্ছিল। নবকুমার জিজ্ঞাসা করল, ‘কী হয়েছে?’

‘কাল মমতা বাংলা বনধ ডেকেছে।’ মেয়েটি দাঁড়াল না।

বনধ? বনধ মানে হরতাল। তাদের গ্রামগঞ্জে হরতাল হলে বাস চলত না। বাজার বসতো না। কিন্তু ছোট দোকান খোলা থাকত। লোকে রাস্তাঘাটে ঘুরে বেড়াত। কাল যদি হরতাল হয়, তাহলে আজ কেন মানুষ ভয় পাচ্ছে?

দোতলায় উঠে আসতেই মুক্তোর দেখা পেল নবকুমার, ‘তোমার দেখছি পাখা গজিয়ে গিয়েছে। যাও, শেফালি-মা তীর্থের কাক হয়ে বসে আছে।’

‘সেকী! উনি ঘুমাননি?’

মুক্তো জবাব না দিয়ে দরজা বন্ধ করতে চলে গেল।

শেফালি-মা বই পড়ছিলেন। তাকে ঢুকতে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কীভাবে ফিরলে? ওরা পৌঁছে দিয়ে গিয়েছে?’

‘হ্যাঁ।’

‘খেয়ে এসেছ?’

‘হ্যাঁ।’

‘কী হল আজ?’

‘কন্ট্রাক্টে সই করাল। পরশু স্টুডিওতে যেতে বলেছে।’

‘কেন?’

‘ট্রেনিং দেবে বলে ডেকেছে।’

‘ও। তাহলে আজ ওয়ার্কশপ করোনি?’

‘না।’

‘তাহলে এত রাত হল কেন?’

নবকুমার দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে সবকথা খুলে বলল। তাকে মন্দাক্রান্তা কীভাবে হাঁটতে হবে তা শিখিয়েছে। তারপর খুব দামি দোকানে নিয়ে গিয়ে শার্ট-প্যান্ট জুতো কিনে দিয়েছে। সে আপত্তি করলেও শোনেনি। বাড়িতে ফিরে গিয়ে খাইয়ে তবে ছেড়েছে। হুইস্কির কথাটা বলতে পারল না নবকুমার। হুইস্কি খেয়ে তার কোনও প্রতিক্রিয়া হয়নি বলে না-বলতে সুবিধে হল।

‘মন্দাক্রান্তার বয়স কীরকম?’

‘জানি না। আমার চেয়ে বড়।’

‘দেখতে?’

‘খুব সুন্দর। সবসময় সেজে থাকেন।’

‘বড়বাবুর কে হয় ও?’

‘আমি জানি না।’

‘আবার কবে যেতে বলেছে তোমাকে?’

‘কাল।’

‘হুঁ। কাল তুমি বাড়ির বাইরে পা দেবে না। নন্দীগ্রামে পুলিশের গুলিতে অনেক কৃষক মারা গিয়েছে। তার প্রতিবাদে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কাল বাংলা বনধ ডেকেছেন। গাড়িঘোড়া চলবে না। দোকানপাট বন্ধ থাকবে। সরকার হয়তো জোর করে কিছু বাস চালাতে চাইবে, কিন্তু তুমি কোথাও যাওয়ার চেষ্টা করবে না।’

মাথা নাড়ল নবকুমার।

‘যাও, শুয়ে পড়ো। অনেক রাত হয়ে গিয়েছে।’

যেতে গিয়ে ঘুরে দাঁড়াল নবকুমার, ‘নন্দীগ্রাম কোথায়? সেখানে পুলিশ কেন কৃষকদের গুলি করে মেরেছে?’

‘তুমি খবরের কাগজ পড়ো না?’

‘না। পাই না—।’

‘কাল মুক্তো তোমাকে এক মাসের কাগজ দিয়ে আসবে। পড়ে জেনো।’

‘কিন্তু বনধ তো আগামীকাল। আজ এখানে সব চুপচাপ, দরজা বন্ধ কেন?’

‘প্রতিবার যখন এক পার্টি বনধ ডাকে তখন তাদের বিরোধী পার্টি আগের রাত্রে সোনাগাছির রাস্তায় মিছিল করে, ভয় দেখায় যেন কেউ বনধ না করে। অকারণে বোমা ফাটায়। আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করে। সেকারণেই এই এলাকার সবাই ভয় পাচ্ছে এবারও সেরকম কাণ্ড হবে।’ শেফালি-মা বললেন।

নিজের ঘরে চলে এল নবকুমার। হাত-মুখ ধুয়ে পাজামা পরে বিছানায় শুতেই মন্দাক্রান্তার মুখ, শরীর ভেসে উঠল চোখের সামনে। শেফালি-মায়ের মতো বোধহয় মন্দাক্রান্তাও তাকে ভালোবেসে ফেলেছে। তার কুষ্ঠিতে লেখা আছে সে মানুষের ভালোবাসা সহজেই পাবে। কিন্তু মন্দাক্রান্তা একদম আলাদা। মনে হয়, সবসময় যদি ওর পাশে থাকা যেত।

.

খঞ্জনির আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল। দূর থেকে এগিয়ে আসছে গান। লুকিয়ে বিছানা থেকে নেমে জানলায় গিয়ে দাঁড়াল নবকুমার। সেই বয়স্ক মানুষেরা গান গাইতে-গাইতে হাঁটছেন, ‘রাই জাগো রাই জাগো, শুকসারি বলে—।’

চোখের আড়ালে চলে গেলেন ওঁরা। নবকুমারের মনে হল, বুক জুড়িয়ে গেল।

দাঁত মাজার পরে চেয়ারে বসতেই মুক্তো নিয়ে এল এক বান্ডিল কাগজ। সামনে রেখে বলল, ‘নাও, বাসি খবর সারাদিন ধরে গেল। চা আনছি।’

মুক্তো চলে গেলে নবকুমার কাগজগুলো গুছিয়ে নিল।

.

দুপুরের মধ্যে পড়া শেষ হয়ে গিয়েছিল। জলখাবার দেওয়ার সময় আজকের কাগজটাও দিয়ে গিয়েছিল মুক্তো। প্রথম পাতায় বড় অক্ষরে ছাপা হয়েছে, আজ বাংলা বনধ। তার নীচে ‘নন্দীগ্রামে আগুন জ্বলছে। আরও মৃত্যুর আশঙ্কা। বনধ থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে অ্যাম্বুলেন্স, হাসপাতাল, খবরের কাগজ, দমকল।’

আজকের খবরটা পড়ে ফেলার পর মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল তার। শিল্প স্থাপিত না হলে দেশের উন্নতি হবে না, একথা সত্যি। কিন্তু শিল্পের জন্যে জমি দরকার। এই দেশে চাষ হয় না এমন জমি অনেক রয়েছে। সেগুলো বন্দর এবং এয়ারপোর্ট থেকে অনেকদূরে। তাই কৃষকদের কাছে আবেদন করা হয়েছিল, তারা প্রয়োজনীয় জমি যেন সরকারকে বিক্রি করে দেন। কৃষকদের অধিকাংশই রাজি হননি। প্রথম কথা, ওই জমিতে তাঁরা তিনবার চাষ করেন, দ্বিতীয়ত পিতৃপুরুষের সূত্রে পাওয়া জমির মালিকানা তাঁরা হাতছাড়া করতে চান না। তৈরি হয়ে গেল জমিরক্ষা কমিটি।

সরকার আলোচনার পথে না গিয়ে, ধৈর্য ধরে তাঁদের না বুঝিয়ে সংঘর্ষের পথে গেলেন। পুলিশ অকারণে মহিলা এবং শিশুদের পেছন থেকে গুলি করে মারল। মাথা দোলাল নবকুমার। ঠিক হয়েছে। বনধ ডাকা উচিত কাজ হয়েছে। যদি এই ঘটনা তাদের গ্রামে ঘটত? কিন্তু বনধ ডেকে এই সমস্যার সমাধান হবে? ওই নির্দোষ নিহতরা কি প্রাণ ফিরে পাবে? অথবা কৃষকরা কি তাঁদের জমি রক্ষা করতে পারবেন? যদি পারেন তাহলে শিল্পের উন্নতি কী করে হবে? খবরের কাগজ পড়ে নবকুমারের মনে হচ্ছিল, যদি মুখ্যমন্ত্রী এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কোনও পূর্ব শর্ত না রেখে আলোচনায় বসতেন তাহলে একটা পথ খুঁজে পাওয়া যেত। কিন্তু দু-পক্ষই যেভাবে শর্ত আঁকড়ে আছেন তাতে পথ খোঁজার ইচ্ছে আদৌ আছে কি না তাতে সন্দেহ হচ্ছে।

সকাল থেকে ওই খবরগুলোর সঙ্গে বাস করে মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল নবকুমারের। বিকেলে মাস্টারদাকে দেখে অবাক হল সে।

সে জিজ্ঞাসা করল, ‘তুমি এলে কী করে? আজ তো সব বনধ?’

‘পা গাড়িতে। এমন কি দূর? তোর খবর কী?’

‘ভালো।’

‘কীরকম ভালো?’

‘কাল স্টুডিওতে যেতে হবে রিহার্সাল দিতে।’

‘তার মানে তো কাজ পাকা?’

‘হ্যাঁ।’

‘চরিত্রটা কীরকম? সিরিয়াস?’

‘জানি না। শুনেছি খুব নিরীহ। মানে সাহেব বিবি গোলামের ভূতনাথ, অভয়ের বিয়ের অভয়। ভূতনাথকে আমি দেখেছি, অভয় কে তা জানি না।’

‘কিছু ভাবিস না। ঠাকুর শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ যাত্রাটা তুই দেখেছিস? হ্যাঁ। ঠাকুর কীভাবে হাঁটতেন মনে আছে?’ বলে মাস্টারদা ঘরের ওপাশে গিয়ে হাঁটাটা দেখাল।

হেসে ফেলল নবকুমার।

‘হাসছিস কেন? বেশি সরল মানুষ এইভাবেই হাঁটে।’ মাস্টারদা বলল, ‘তুই ডায়লগগুলো নিয়ে আয়, আমি ফাটাফাটি অভিনয় শিখিয়ে দেব।’

‘ঠিক আছে।’ কথা ঘোরালে নবকুমার, ‘যাত্রার খবর কী?’

‘খারাপ। নিরুপমাদির চাকরি গিয়েছে।’

‘সেকী?’

‘একদম মনে রাখতে পারে না সংলাপ। সুধাময়দা আর ম্যানেজ করতে পারল না। কানেও কম শুনছে।’

‘এখন কী করে ওর চলবে?’

মাস্টারদা তাকাল, ‘শোনো নবকুমার। এই পশ্চিমবাংলায় হাজার-হাজার মানুষ রোজগার না থাকা সত্বেও বেঁচে আছে। কীভাবে বেঁচে আছে, জানতে চেও না। জানলে পাগল হয়ে যাবে। এই যে রাস্তাঘাটে এত লোক হাঁটে তাদের কজন দিনে একটাকার মুড়ি খেয়ে আছে, কেউ বুঝতে পারবে? কাল কখন আসব?’

‘কেন?’

‘আরে, স্টুডিওতে তোর একা যাওয়া ঠিক হবে না। নায়করা কখনও একা ঘোরে না। আমিও তোর সঙ্গে যাব। লোকে যদি ভাবে, আমি তোর চামচে তা ভাবুক। কিন্তু আমাকে একটা চান্স পাইয়ে দিস।’

মাস্টারদা বেরিয়ে গেল। ওকে নিয়ে যাওয়াটা ঠিক হবে কি না বুঝতে পারছিল না নবকুমার। সে জানলায় এল। আশ্চর্য! কখন সোনাগাছি আবার তার নিজস্ব চেহারায় ফিরে গিয়েছে সে টেরই পায়নি। আলো জ্বলছে। রিকশা চলছে, বেলফুল বলে হেঁকে গেল ফুলওয়ালা। রাস্তার ওপাশের বাড়ির দরজায় ক’টা মেয়ে সেজেগুজে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু বনধ তো চব্বিশ ঘণ্টার জন্যে। সেই সময়সীমা শেষ হতে তো আজকের রাতটা চলে যাওয়ার কথা।

‘বিদেয় হয়েছে শেষ পর্যন্ত!’ মুক্তো ঘরে এল।

‘মুক্তোদি, বনধ উঠে গিয়েছে?’

‘না তো।’

‘তাহলে সব কিছু স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছে কী করে?’

‘যারা বনধ ডেকেছিল, তারা দুপুর অবধি চলার পর খুশি হয়ে ঘোষণা করেছে বনধ সার্থক। কিন্তু যারা বনধ চায় না সেই পার্টি শাসিয়ে গিয়েছে বিকেলের পর যদি বনধ চলতে থাকে তাহলে এ-পাড়ার কোনও মেয়েকে কাল থেকে ব্যাবসা করতে দেওয়া হবে না। ও পক্ষকে সকালে খুশি করা হয়েছে, এ-পক্ষকে এখন করা হচ্ছে। তবে স্বাভাবিক নয় গো, স্বাভাবিকের মতো হয়েছে।’ মুক্তো বলল।

‘মানে?’

‘খদ্দের কোথায়? কে আসবে? রাস্তায় বাস গাড়ি তো নেই। ট্যাক্সিও চলছে না। তা সত্বেও যদি কেউ আসে সেই আশায় দাঁড়িয়ে আছে ওরা। হ্যাঁ, যে জন্যে এসেছিলাম, মা ডাকছে তোমাকে।’ মুক্তো বলল।

শেফালি-মায়ের ঘরে ঢুকে অবাক হয়ে গেল নবকুমার। চেয়ারে নয়, একটা মোড়ায় বসে কথা বলছে ইতি। ও এখানে কেন?

শেফালি-মা বললেন, ‘এসো। বড়বাবু আমার শর্ত মেনে নিয়েছেন। এই বয়সে আবার যাত্রা করতে যেতে হবে। আগে মুক্তো আমার সঙ্গে যেত। জিনিসপত্র হাতে-হাতে এগিয়ে দেওয়া, সবকিছু খেয়াল রাখার কাজটা ও করত। এখনও ওরও বয়স হয়েছে, এই সংসার সামলাচ্ছে। দু-দিক পেরে উঠবে না। তাই ইতিকে কাজটা দিচ্ছি।’

নবকুমার চুপ করে থাকলেও অনেক প্রশ্ন কিলবিলিয়ে উঠল মনে।

শেফালি-মা হাসলেন, ‘ও তো সিদ্ধান্ত নিয়েছে পুরোনো কাজটা করবে না। মরে গেলেও না। ওর বাড়িওয়ালি ছাড়ছিল না। যে গুন্ডাগুলো তোমাকে মেরেছিল তারাই বাড়িওয়ালিকে রাজি করিয়েছে ছেড়ে দিতে। বোধহয় তোমাকে ওরা এখন পছন্দ করছে। দুর্বারের সঙ্গেও আমার কথা হয়েছে। ওরাও খুব খুশি। তাই ইতি আমাদের সঙ্গে ভবানীপুরের বাড়িতে যাবে।’

মাথা নাড়ল নবকুমার।

ইতি বলল, ‘মা, ওঁর বোধহয় পছন্দ নয়—।’

শেফালি-মা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমার আপত্তি আছে?’

নবকুমার বলল, ‘আপনি যা স্থির করেছেন তা তো না ভেবে করেননি। ও থাকলে আপনার নিশ্চয়ই উপকার হবে। তাহলে আমি কেন আপত্তি করব?’

‘এই তো, হল?’ শেফালি-মা তাকালেন ইতির দিকে।

আর সেই সময় দূরে প্রচণ্ড শব্দে বোম ফাটতে লাগল। পরপর অনেকগুলো। বাইরে লোকজনের চিৎকার শুরু হল। মুক্তো ঘরে ঢুকে উত্তেজিত গলায় বলল, ‘বোমাবাজি শুরু হয়ে গিয়েছে। সবাই দরজা বন্ধ করছে। এই মেয়েটাকে এখন ফিরে যেতে দিও না।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *