1 of 2

কলিকাতায় নবকুমার – ৩৮

আটত্রিশ

ট্যাক্সিতে ফিরতে-ফিরতে শেফালি-মা বলেছিলেন, ‘একেই বলে যাবি কোথায়? ওরে যম আছে তোর পিছে। সোনাগাছি থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্যে ভবানীপুরে যাচ্ছি। আর দ্যাখো, বাড়ির সামনে ওরকম মেয়ে রোজ ঝামেলা বাধাবে।’

‘ক’দিন করবে? একদিন, দু-দিন? দরজা না খুললেই তো হল।’

‘ওই যে বলল, থানায় যাবে। গিয়ে বানিয়ে-বানিয়ে মা-বাবার বিরুদ্ধে বলবে। পুলিশ এসে মা-বাবাকে জিজ্ঞাসা করে মিটিয়ে নিতে বলবে। পাড়ার লোকেরাও বলবে হাজার হোক মেয়ে, বের করে দিলে থাকবে কোথায়!’ মাথা নাড়লেন শেফালি-মা।

‘অদ্ভুত ব্যাপার। মেয়ে যদি অন্যায় করে, বাইরে রাতে কাটায়, বললেও কথা কানে না তোলে তবু তাকে বাড়িতে থাকতে দিতে হবে?’ নবকুমার একটু উত্তেজিত।

‘আগে ত্যাজ্যপুত্র করা চালু ছিল, ত্যাজ্যাকন্যার কথা কেউ ভাবেনি। কারণ মেয়েরা তখন এমন কাজ করার সাহসই পেত না যার জন্যে বাবা-মা তাদের ত্যাগ করতে পারে। প্রেম করে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করেছে জানালে তবে তাদের জন্যে বাপের বাড়ির দরজা বন্ধ হত। এখন শিক্ষিত মেয়ে বন্ধুদের সঙ্গে হোটেলে নাচতে যাচ্ছে, ড্রিঙ্ক করছে, লেট নাইটে বাড়ি ফিরছে। এটা তো আকছার হচ্ছে। কেউ-কেউ সেই রাতে বাড়ি ফেরে না। সাতদিন এক বন্ধু পরের সাতদিন আর একজনের সঙ্গে হুল্লোড় করছে। বাবা-মা বলে-বলেও যখন পারেন না শোধরাতে, তখন মেনে নেন। চিৎকার চেঁচামেচি করে পাড়ার লোকদের জানাতে চান না। যাঁরা মানতে পারেন না তাঁরা দরজা বন্ধ করে রাখেন। কিন্তু এমন কোনও আইন নেই তার জন্যে চিরকাল দরজা বন্ধ রাখার।’ শেফালি-মা শ্বাস ফেললেন।

‘এরা, মানে এই মেয়েরা এসব করে কেন? টাকার জন্যে?’

নবকুমারের প্রশ্ন শুনে তাকালেন শেফালি-মা, ‘কেউ-কেউ হয়তো এভাবেই টাকা রোজগার করে। কিন্তু বেশিরভাগ স্রেফ ফূর্তির জন্যে করে। জীবনটাকে স্বাধীনভাবে উপভোগ করতে চায় তারা। বাবা-মা তখন তুচ্ছ হয়ে যায়।’

‘আমাদের গ্রামে এরকম ঘটনার কথা কেউ ভাবতেই পারবে না।’

‘এখন পর্যন্ত হয়তো পারবে না। তবে অসুখটা তো ছোঁয়াচে। বলা যায় না।’

.

শেফালি-মাকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে দুপুরের খাওয়া খেয়ে নিয়ে নবকুমার দুর্বারের অফিসে গিয়ে কবিতার সঙ্গে দেখা করল। কবিতা বলল, ‘কেমন আছ নবকুমার?’ কোনও সমস্যা হয়নি তো?’

‘না। আমার সমস্যা হয়নি। মুক্তোর হয়েছে।’

‘মুক্তো?’

‘শেফালি-মায়ের কাছে কাজ করে। আপনাদের যে ব্যাঙ্ক আছে। উষা, উষা…?’ মনে করার চেষ্টা করলে নবকুমার।

‘উষা কোঅপারেটিভ।’

‘হ্যাঁ। ওখানে ও মাসে-মাসে টাকা জমা দেয়। কিন্তু শেফালি-মা সামনের মাসে ভবানীপুরে চলে যাচ্ছেন। মুক্তোকেও যেতে হবে। অতদূর থেকে ওর এখানে আসা সম্ভব নয়। তাই আমাকে বলল, আপনাকে জিজ্ঞাসা করতে, ‘কী করবে ও?’

‘তোমরা এখান থেকে চলে যাচ্ছ?’ অবাক হল কবিতা।

‘হ্যাঁ।’

একটু যেন ভাবল কবিতা। তারপর বলল, ‘একটা অ্যাপলিকেশন দিয়ে অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে সব টাকা তুলে নিয়ে ভবানীপুরের কোনও ব্যাঙ্কে নতুন অ্যাকাউন্ট খুলতে হবে ওকে। সহজ ব্যাপার।’ কবিতা বলল।

‘ভবানীপুরে উষার কোনও অফিস আছে?’

নবকুমারের প্রশ্ন শুনে হেসে ফেলল কবিতা। বলল, ‘যৌনকর্মীদের প্রয়োজন মেটাতে এই ব্যাঙ্কের জন্ম। মেয়েরা টাকা জমাতে পারে না। গুন্ডা বা বাড়িওয়ালির অত্যাচারে নি:স্ব হয়ে থাকে। বাইরের কোনও ব্যাঙ্কে গিয়ে অ্যাকাউন্ট খুলতে চাইলে নানান ঝামেলা। ওইসব ব্যাঙ্ক যেসব কাগজ চায় তা দেওয়া সম্ভব হয় না বেশিরভাগ সময়ে। আমাদের এলাকার মধ্যে উষা কোঅপারেটিভ ব্যাঙ্ক হওয়ায় ওরা যে যেমন পারে এসে জমা দিচ্ছে। প্রয়োজনে টাকা তুলতে পারছে। এছাড়া আমাদের লোকজন বাড়ি-বাড়ি ঘুরে টাকা নিয়ে আসে রসিদ দিয়ে। যদি ওদের পক্ষে ব্যাঙ্কে আসা সম্ভব না হয়। একদিন গিয়ে দেখে এসো। আর পাঁচটা ব্যাঙ্কের সঙ্গে কোনও পার্থক্য নেই। ব্যাঙ্কের কাজকর্ম জানেন এমন শিক্ষিত মানুষই ওখানে কাজ করেন। এই একটা ব্যাঙ্ক কোনওভাবে দাঁড় করানো গিয়েছে। বাইরে আরও ব্যাঙ্ক করার কথা আমরা ভাবতে পারি না। সত্যি কথা বলতে কী, সেটা চাইও না।’

ওরা কথা বলছিল দুর্বারের অফিসের বাইরের ঘরে বসে। ঠিক এইসময় ইতিকে ঘরে ঢুকতে দেখল নবকুমার। একেবারে আটপৌরে পোশাক, মুখে একটুও প্রসাধন নেই। একটা লম্বা খাতা টেবিলের ওপর রেখে সে নবকুমারের দিকে তাকিয়ে এক চিলতে হাসল, ‘ভালো?’

নবকুমার নি:শব্দে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল।

কবিতা বলল, ‘ইতি, নবকুমারকে তোমার খাইয়ে দেওয়া উচিত।’

‘না, না। মিছিমিছি কেন—।’

‘মিছিমিছি নয় ভাই।’ কবিতা বলল, ‘তুমি ওর অসুখের খবরটা না দিলে যে কী হত। ডাক্তারবাবুও বলেছেন, ওর যে ধরনের পক্স হয়ছিল তা ঠিক সময়ে চিকিৎসা না হলে মারাত্মক কাণ্ড হয়ে যেত। আর খবরটা দিয়েছিলে বলে গুন্ডারা তোমাকে মেরেছিল। ও তোমার কাছে কৃতজ্ঞ।’

নবকুমার হাসল, ‘খাইয়ে দিলেই কৃতজ্ঞতা শেষ হয়ে যাবে?’

‘অকৃতজ্ঞদের সেটা মনে হয়।’ কবিতা বলল।

‘আমি একটা সাধারণ কাজ করেছি, তার জন্যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা ঠিক নয়। আর সেদিন যারা আমাকে মারতে এসেছিল, তারা এখন বন্ধুর মতো হয়ে গেছে।’

নবকুমারের কথা শেষ হলে ইতি প্রথমবার কথা বলল, ‘জানি।’

‘জানিস মানে?’ কবিতা তাকাল।

‘ওরাই আমাকে বলেছে সবকথা। ওঁকে আসতেও বলেছিল, উনি আসেননি।’

‘না গিয়ে ভালোই করেছে। সবাই তো তোর মতো নয়।’ কবিতা বলল।

‘তাহলে আমি উঠি—।’ নবকুমার উঠে দাঁড়াল।

‘তুমি ইতিকে এখানে দেখে অবাক হচ্ছ না?’ কবিতা বলল, ‘ও এখনও পুরো সুস্থ নয়। আমরা ওকে দুর্বারের কাজে নিয়েছি। আর কাজ শিখতে গিয়ে ও বলছে আর পুরোনো পেশায় ফিরে যাবে না। ও যা রোজগার করত সেই টাকা তো আমরা দিতে পারব না। কিন্তু সামান্য টাকাতেই ও রাজি হয়ে গিয়েছে। আমাদের এখন জায়গা দরকার। এই বাড়িতে কুলোচ্ছে না।’

হঠাৎ নবকুমারের মনে হল শেফালি-মা ভবানীপুরে চলে গেলে ওই বাড়ির দোতলা খালি হয়ে যাবে। বাড়িটা যদি তিনি বিক্রি করে না দেন তাহলে নিশ্চয়ই ভাড়া দেবেন। ওখানে কোনও ভদ্রপরিবার ভাড়া দিয়ে থাকবে না। দিতে হলে যৌনকর্মীদেরই দিতে হবে। সে বলল, ‘আমি শেফালি-মাকে বলতে পারি।’

‘ওঁর সন্ধানে জায়গা আছে? এ-পাড়ার বাইরে হলে কিন্তু অসুবিধে হবে।’

‘আপনাকে বললাম যে, উনি আগামী মাসের এক তারিখে ওই বাড়ি ছেড়ে ভবানীপুরে চলে যাচ্ছেন। বাড়িটা হয় উনি ভাড়া দেবেন, নয় বন্ধ করে রাখবেন।’

‘হ্যাঁ-হ্যাঁ। ঠিক। তাহলে তো আজই কথা বলতে হয়। ক’টা ঘর আছে?’

‘চারটে তো হবেই। দোতলায়।’

‘আমি কমিটিকে ব্যাপারটা জানাচ্ছি। শেফালি-মায়ের সঙ্গে আমার সম্পর্ক বেশ ভালো। তুমি শুধু বলে রেখো, আমাদের না জানিয়ে তিনি যেন অন্য কোনও ব্যবস্থা না করেন।’

তারপরেই কবিতা ইতির দিকে তাকাল, ‘তুই এক কাজ কর। নবকুমারকে দিয়ে বলানো ঠিক নয়। তুই এই কথাটা আমাদের তরফ থেকে বলে আয়। উনি কী বলছেন জানলে আজ বিকেলের মিটিং-এ সবাইকে বলব।’

ইতি মাথা নাড়তেই নবকুমার বাইরে বেরিয়ে এল। ইতি তার পেছনে আসছে কিন্তু পাশাপাশি হাঁটা ঠিক হবে কি না বুঝতে পারছিল না। সে পেছন ফিরে তাকাতেই ইতি হেসে ফেলল, ‘ছেলেবেলায় গাঁয়ে এরকম দেখেছি।’

‘কীরকম?’

‘স্বামী হনহন করে গিয়ে যাচ্ছে, বউ পড়ে থাকছে পেছনে। আমার পাশে হাঁটতে কি অসুবিধে হচ্ছে?’ হাঁটতে-হাঁটতে ইতি জিজ্ঞাসা করল।

‘আমার অসুবিধে হবে কেন? তোমার কথা ভেবেই—।’

‘এখন আমার কোনও অসুবিধে নেই। কারণ আমি আর কাউকে ভয় করি না। গুন্ডা, দালাল, বাড়িওয়ালি জেনে গিয়েছে আমার কাছ থেকে কিছু পাওয়ার নেই। মুখের এই দাগগুলো যদি চিরকাল থাকত খুব খুশি হতাম।’

‘মুখে তো তেমন ছাপ পড়েনি।’

‘কেন পড়ল না? ক্ষতবিক্ষত হয়ে থাকলে আর কেউ আমার দিকে তাকাত না।’

ওরা পাশাপাশি হাঁটছিল। সোনাগাছিতে দুপুরবেলায় ভিড় কম থাকে। যারা ছিল তারা উদাস চোখে তাদের দেখল।

কিছুক্ষণ হাঁটার পর ইতি বলল, ‘তাহলে আপনিও চলে যাচ্ছেন এখান থেকে? ভালোই হবে। এই নরকে কতদিন পড়ে থাকবেন।’

‘সোনাগাছির বাইরেটা কি স্বর্গ বলে তোমার ধারণা?’ নবকুমার বলল, ‘এই নরকে যারা রোজ আসে ফূর্তি করতে তারা তো ওই স্বর্গের বাসিন্দা।’

‘সেটা ঠিক। আমার না আজকাল খুব ইচ্ছে হয়, ওই লোকগুলোর বাড়ি-বাড়ি গিয়ে বলে দিয়ে আসতে, ওদের স্বরূপ জানিয়ে আসতে। তারপর মনে হয়, কী লাভ! ওরা আসে বলেই এখানকার মেয়েরা বেঁচে থাকতে পারে। আচ্ছা, আপনি তো কিছুদিন পরে এখানকার কথা ভুলে যাবেন। তাই না?’

‘দ্যাখো, কলিকাতায় যে রাত্রে প্রথম এসেছিলাম সেই রাত্রেই এই পাড়ায় থাকার জায়গা পেয়েছিলাম। এখানকার কথা কি ভোলা যায়?’

‘কী-কী মনে থাকবে?’

‘সব। এই পাড়া, ঝগড়াঝাঁটি, দুর্বার সমিতি—।’

‘আর?’

হেসে ফেলল নবকুমার। ইতি জিজ্ঞাসা করল, ‘হাসছেন কেন?’

‘রবীন্দ্রনাথের নাম শুনেছ?’

‘বা রে! আমি জোড়াসাঁকোতে একদিন গিয়েছিলাম।’

‘তাই! দ্যাখো, আমার আজও যাওয়া হল না।’

‘যাবেন? কাল পঁচিশে বৈশাখ। রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন।’

‘কখন যেতে হবে?’

‘ভোরবেলায়। শুনেছি তখন উৎসব হয়।’

‘ঠিক আছে। যাব।’

‘তাহলে ভোর সাড়ে-পাঁচটায় গলির মুখে ট্রাম স্টপেজে চলে আসবেন। আমি তো ওইদিনে কখনও যাইনি। আপনার জন্যে যাওয়া হবে।’

ওরা বাড়ির দরজায় পৌঁছে গিয়েছিল। এসময় দরজায় কোনও মেয়ে নেই। নবকুমার বলল, ‘চলুন।’

‘আপনি কিন্তু জবাবটা এখনও দেননি।’

‘কীসের?’

‘আর কী মনে থাকবে, জিজ্ঞাসা করতে হেসে পাশ কাটিয়েছেন!’

‘কাল বলব। জোড়াসাঁকোতে গিয়ে।’ নবকুমার ভেতরে ঢুকে পড়ল।

সিঁড়িতে, এখানে ওখানে মেয়েরা অলস সময় কাটাচ্ছিল। ইতিকে দেখে তারা অবাক। ইতি গম্ভীর মুখ করে নবকুমারের পেছন-পেছন দোতলায় উঠে এল। মুক্তো দাঁড়িয়েছিল দরজায়।

নবকুমার বলল, ‘তোমাকে এখানকার ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে সব টাকা তুলে নিয়ে ভবানীপুরের ব্যাঙ্কে নতুন অ্যাকাউন্ট খুলতে হবে।’

‘ও বাবা। এ তো ঝামেলার ব্যাপার।’ মুক্তোর মুখ শুকনো।

‘কোনও ঝামেলা নেই। আমি দরখাস্ত লিখে দেব। তুমি সই করে দুর্বারে গিয়ে কবিতাদির সঙ্গে দেখা করবে। এর নাম ইতি। এর কাছেও যেতে পারো। শেফালি-মা কোথায়?’ নবকুমার জিজ্ঞাসা করল।

‘এইমাত্র খেয়ে দেয়ে শুয়েছে।’

ইতি বলল, ‘তাহলে কি আমি বিকেলে আসব?’

‘দাঁড়াও দেখি।’ মুক্তো চলে গেল। এবং ফিরে এল তখনই, ‘এসো।’

শেফালি-মা খাটে বসে বই পড়ছিলেন। ইতিকে দেখে অবাক হলেন।

নবকুমার বলল, ‘মুক্তোর ব্যাঙ্কের ব্যাপারে খোঁজ নিতে দুর্বারের অফিসে গিয়েছিলাম। কবিতাদি বলল, আপনি যদি এই দোতলা ভাড়া দেন তাহলে আগে ওদের বলতে। ওদের জায়গার অভাব হচ্ছে।’

‘এটি কে?’

‘দুর্বারে কাজ করে। ওর নাম ইতি।’

‘তোমার পক্স হয়েছিল?’

‘হ্যাঁ।’ নীচু গলায় বলল ইতি।

একটু ভাবলেন শেফালি-মা, ‘তুমি কি সেই মেয়ে যার কথা দুর্বারকে বলায় দালালরা নবকুমারের ওপর হামলা করেছিল?’

মাথা নেড়ে নি:শব্দে হ্যাঁ বলল ইতি।

‘তুমি দুর্বারের কাজ করছ। ব্যাবসায় নেই?’

‘না। আমি আর কখনও ওই জীবনে ফিরে যাব না।’ জোর দিয়ে কথাগুলো বলল ইতি। আর তখনই ফোনটা বেজে উঠল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *