সাঁয়ত্রিশ
সকালবেলায় মাস্টারদা এসে ঘুম ভাঙিয়ে দিল নবকুমারের। ঘুমচোখে উঠে বসতে-বসতে ফোঁপানির আওয়াজ কানে এল তার। চোখ পরিষ্কার হয়ে যেতেই দেখল, তার বিছানার একপাশে বসে মাস্টারদা দুই হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। সে অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘কী হয়েছে? কাঁদছ কেন? কোনও খারাপ খবর?’
মাস্টারদার কান্না থামছিল না। এগিয়ে গিয়ে তার কাঁধে হাত রাখল নবকুমার। এবার মাস্টারদা কান্নাজড়ানো গলায় বলল, ‘তুই পারলি? তুই এমন করতে পারলি?’
‘কী করেছি আমি?’ বুঝতে না পেরে জিজ্ঞাসা করল নবকুমার।
‘শেষপর্যন্ত তুইও নব—।’ নাক টানল মাস্টারদা।
‘আমি? কী?’
‘তোকে আমি গাঁ-থেকে পিঠে বয়ে কলকাতায় নিয়ে এলাম। বড়বাবুকে হাতেপায়ে ধরে প্রম্পটারের চাকরি পাইয়ে দিলাম। বল, দিইনি?’
‘দিয়েছ। তুমি না নিয়ে এলে কলিকাতায় আসা—।’
‘চুপ কর। অন্য কেউ হলে ভাবতাম এই তো জগতের নিয়ম। যার জন্যে তুমি করবে, সেই তোমাকে বাঁশ দেবে। কিন্তু তুই এখনও কলিকাতা বলাটা ছাড়িসনি তাই তোকে বলছি, আমাকে এতবড় দু:খ কেন দিলি?’ চোখ মুছল মাস্টারদা।
‘বিশ্বাস করো, তুমি কী বলতে চাইছ মাথায় ঢুকছে না।’
‘বেশ। তোকে আমি নিয়ে এসেছিলাম এই বাড়িতে। শেফালি-মা যদি দু-একদিন আশ্রয় দেন। দু-একদিন দূরের কথা, শেফালি-মা তো তোকে প্রায় পুষ্যিপুত্র করে ফেলেছে। রোজ ভালোমন্দ খাওয়াচ্ছে। সেসব খাওয়ার সময় তোর একবারও আমার কথা মনে পড়েছে? পড়েনি? মাঝে-মাঝে পয়সার অভাবে আমি ছাতু খেয়ে থাকি তা জানিস? তোকে সিঁড়ি পাইয়ে দিলাম আর তুই সেই যে গাছে উঠে গেলি, একবারও নীচের দিকে তাকালি না। তারপর বড়বাবুর নেক নজরে পড়লি। তাঁর বাড়িতে গেলি। যা। কিন্তু আমাকে বললি না। কিন্তু বড়বাবু যে তোকে সিনেমায় চান্স দিচ্ছে, একেবারে হিরোর রোল দিচ্ছে সেটাও চেপে গেলি?’ তাকাল মাস্টারদা।
‘ওটা এখনও ফাইনাল হয়নি। বিশ্বাস করো। আমি করব কি না এখনও ঠিক করতে পারিনি। তাই তোমাকে বলিনি।’
‘মিথ্যে কথা বলিস না নব।’ ধমকে উঠল মাস্টারদা।
‘মিথ্যে বলছি না।’ মাথা নাড়ল নবকুমার।
‘বাসি মুখে মিথ্যে বলতে পারছিস? এটা কী?’
পকেট থেকে একটা খাম বের করল মাস্টারদা।
‘আমি জানি না।’
‘কাল বিকেলে বড়বাবু এই খামটা আমাকে দিয়ে বলল তোকে পৌঁছে দিতে। তোর একমাসের মাইনে এর মধ্যে আছে।’
‘কেন?’
‘তোকে আর প্রম্পটারের চাকরি করতে হবে না।’ মাস্টারদা অদ্ভুত হাসল, ‘আমি তোর হয়ে বলতে গিয়ে শুনলাম, তুই সিনেমায় নায়ক হচ্ছিস, তাই এই চাকরিতে তোকে মানাবে না। শুনে আমি সারারাত ঘুমাতে পারিনি। এতবড় খবরটা তুই চেপে গেলি কী করে?’
‘তোমাকে তো বললাম, আমার একটুও ইচ্ছে নেই। বড়বাবু বলেছেন, আমি রাজি হইনি। কিন্তু শেফালি-মা জোর দিয়ে বলায় এখন দোলায় পড়েছি।’ নবকুমার বিছানা থেকে নেমে এল। এইসময় মুক্তো এসে দরজায় দাঁড়াল। মাস্টারদাকে দেখে বলল, ‘কে মরেছে?’
মাস্টারদা বিরক্ত হল, ‘জানি না।’
‘ঘর থেকে কান্নার আওয়াজ বেরিয়েছিল কিনা, তাই জিজ্ঞাসা করলাম। তা হ্যাঁগো ছেলে, তুমি কি আজ বাড়ি দেখতে যাচ্ছ?’ মুক্তো নবকুমারকে জিজ্ঞাসা করল।
‘শেফালি-মা তাই বলেছিলেন।’
‘যাও দেখে এস। মা এখন তোমাকে ছাড়া এক পা চলছে না। বলেছে, তোমার পছন্দ হলে টাকাপয়সা দিয়ে সামনের এক তারিখে ওখানে উঠে যাবে।’
মুক্তোর কথা শেষ হতেই মাস্টারদা বলল, ‘শেফালি-মা এই বাড়ি ছেড়ে দেবে?’
‘হ্যাঁ।’ মুক্তো বলল, ‘আবার যাত্রায় নামবে। তখন তো রোজ যাতায়াত করতে হবে। মা এখানে এসেছিল, বিশ্বব্রহ্মাণ্ড থেকে দূরে সরে থাকতে। তা যখন থাকা যাবে না তখন—।’
.
.
‘কোথায় যাচ্ছেন উনি?’
‘ভবানীপুরে। ভদ্র পাড়ায়।’
মাস্টারদার মুখ কালো হয়ে গেল। সেটা লক্ষ করে নবকুমার বলল, ‘উনি যে যাওয়ার সিদ্ধান্ত পাকা করেছেন তা আমি জানতাম না।’
মাস্টারদা কথা না বলে মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকল।
মুক্তো বলল, ‘হ্যাঁ। যে জন্যে এসেছিলাম, মাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, মা বলল তোমার সঙ্গে কথা বলতে।’
‘কী কথা?’ নবকুমার জিজ্ঞাসা করল।
‘উষার ব্যাঙ্কে আমার একটা খাতা আছে। তাতে প্রতিমাসে টাকা জমাই। ব্যাঙ্ক তো এখানে। ভবানীপুরে চলে গেলে টাকা জমা দিতে কিংবা তুলতে এতদূরে আসতে হবে। আমি তো একা পারব না?’ মুক্তো বলল।
‘উষার ব্যাঙ্ক মানে?’
মুক্তো বলল, ‘মহিলা দুব্বার সমিতি এলাকার মেয়েদের উপকারের জন্যে একটা ব্যাঙ্ক চালু করেছে। নাম হল, উষা কোঅপারেটিভ। যে যেমন পারে টাকা রাখে নিজের নামে। দরকার পড়লে ব্যাঙ্ক থেকে ধারও নেওয়া যায়। যার যেমন টাকা থাকে, সে তেমন ধার পায়। আমিও রেখেছি।’
‘কত টাকা মাসে রাখতে হয়?’
‘যে যেমন পারে। এ-বাড়ির কেউ-কেউ বিশ-পঞ্চাশ রাখে আবার রক্তকমলের দু-তিনজন শুনেছি মাসে পাঁচ-দশ হাজার রাখে।’ মুক্তো বলল।
মাস্টারদা মুখ তুলল, ‘উষা কোঅপারেটিভ ব্যাঙ্কে বাইরের লোক টাকা রাখে না, শুধু যৌনকর্মীদের জন্যে ওই ব্যাঙ্ক?’
‘এইজন্যে তোমার মুখে ঝাঁটার বাড়ি মারতে ইচ্ছে করে। আমি কে? আমি কি যৌনকর্মী?’
‘না, না, মানে এই এলাকার মেয়েদের জন্যে মা বাইরের—।’
‘গিয়ে খবর নাও তাহলে জানতে পারবে। তা হ্যাঁগো ছেলে, তোমার সঙ্গে তো দুব্বারের দিদিদের আলাপ আছে। একটু জিজ্ঞাসা করো তো। ওরা যদি ভবানীপুরে কোনও ব্যাঙ্কে ব্যবস্থা করে দেয় তাহলে বাঁচি।’ মুক্তো চলে গেল।
মাস্টারদা বলল, ‘মেয়েছেলেটার মুখ দেখলে? নর্দমা।’
‘মন কিন্তু খুব ভালো।’ নবকুমার বাথরুমে ঢুকে গেল।
.
দাঁত মাজতে-মাজতে নবকুমার ভাবছিল। মাস্টারদার রাগ করার যথেষ্ট কারণ আছে। কিন্তু ইচ্ছে করে যে সে ওর কাছ থেকে এসব কথা গোপন করেছিল তাও নয়। এখন মুক্তো যদি শুধু তার জন্যে চা নিয়ে আসে তাহলে আর-একটা সমস্যা হবে।
বাইরে বেরিয়ে এসে সে দেখল, দু-কাপ চা টেবিলের ওপর রেখে গেছে মুক্তো। দেখে স্বস্তি হল। বলল, ‘কী হল, চা তো দিয়ে গেছে।’
‘আমাকে তো খেতে বলেনি।’ মাস্টারদা গম্ভীর।
চায়ের কাপ তুলে মাস্টারদার হাতে ধরিয়ে দিল নবকুমার।
এবার খুশি হল মাস্টারদা। চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, ‘টাকা তুলে রাখ। আর হ্যাঁ, বাড়িতে মানি অর্ডার করিস।’
‘এখন আমার জীবন অনিশ্চিত।’
‘কেন?’
‘যদি অভিনয় করতে না পারি তাহলে ওরা বাদ দিয়ে দেবে। তখন রোজগারের আর কোনও পথ খোলা থাকবে না। বাড়িতেও টাকা পাঠাতে পারব না।’
‘তুই একটা ক্যালানে। আগে থেকে কু গাইছিস। কিস্যু চিন্তা করিস না। আমি তো মরে যাইনি। তোকে দেখিয়ে দেব।’ মাস্টারদা চা শেষ করল।
‘কীভাবে?’
‘তোকে নিশ্চয়ই আগে ডায়ালগ দেবে। বাড়িতে নিয়ে আসবি, আমি তোকে দেখিয়ে দেব কী করে সেগুলো বলতে হবে।’
‘তোমাকে আমি সবসময় পাব?’ নবকুমার বলল, ‘ক’দিন পরে তো দল কলিকাতার বাইরে শো করতে চলে যাবে।’
‘হুঁ।’ চোখ বন্ধ করে ভাবল মাস্টারদা। তারপর জিজ্ঞাসা করল, ‘তোকে কত টাকা দেবে বলেছে?’
‘পাকা কথা কিছু হয়নি।’
‘সিনেমার নায়ক যখন তখন নিশ্চয়ই ভালোই দেবে।’
‘কেন?’
‘আমি ভাবছি যাত্রা ছেড়ে দেব।’ গম্ভীর গলায় বলল মাস্টারদা।
‘কেন?’
‘আর পোষাচ্ছে না। রাতের-পর-রাত জাগা। এতদিন হয়ে গেল! তবু শো পিছু মাত্র দুশো পঁচাত্তর টাকার বেশি দেয় না। সারা মাসে দশ কী পনেরো শো। বেশি হলে কুড়ি। কী হয় বল।’ মাস্টারদা বলল।
‘ছেড়ে দিয়ে কী করবে?’
‘তুই আমার একটা উপকার করবি?’
‘সাধ্যে থাকলে নিশ্চয়ই করব।’
‘আমার না সিনেমায় অভিনয় করার খুব শখ। অনেক চেষ্টা করেছি, কেউ চান্স দেয়নি। তুই তোদের ডিরেক্টারকে বলবি আমায় একটা ছোট রোল দিতে। টাকাপয়সা যা দেবে তাই নেব।’ মাস্টারদা নবকুমারের হাত ধরল, ‘অভিনয় আমি খারাপ করব না রে।’
‘বেশ। কিন্তু এখনই বলব না।’
‘সেটা তুই সুবিধেমতো বলিস।’
‘কিন্তু তুমি এখনই যাত্রা ছেড়ো না।’
মাস্টারদা উঠে দাঁড়াল, ‘দেখি। আমার কথা মনে রাখিস ভাই।’
.
সকাল দশটায় শেফালি-মায়ের সঙ্গে ট্যাক্সিতে উঠে বসল নবকুমার। এই সময়টায় সোনাগাছি শান্ত। শহরের যে কোনও পাড়ার মতোন। সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ ধরে সোজা চলে এল ট্যাক্সি মেট্রো সিনেমার সামনে। এই জায়গাগুলো সে একটু-একটু চিনতে পারছে। খানিকক্ষণ যাওয়ার পর শেফালি-মা বললেন, ‘ওই দ্যাখো ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল। ডানদিকে গড়ের মাঠ।’
নবকুমারের মনে পড়ল, চিড়িয়াখানায় যাওয়ার সময় এই রাস্তা দিয়েই তারা গিয়েছিল। সঙ্গে-সঙ্গে ছুটকির মুখ ভেসে উঠল মনে। মেয়েটার সঙ্গে আর দেখা হয়নি। দেখা করতে চাইলে ওদের বাড়িতে যাওয়া যায় কিন্তু যাওয়ার ইচ্ছেটাই হয়নি। মেয়েটা, এমনকি ওর দিদিও, প্রেম ছাড়া কিছু জানে না। প্রেমের জন্যে সময় নষ্ট করার সময় তার নেই।
‘ডানদিকে আশুতোষ কলেজ, আমরা বাঁ-দিকে যাব। ভাই, বাঁ-দিকে।’ শেষ কথাটা ট্যাক্সি ড্রাইভারের উদ্দেশ্যে বললেন শেফালি-মা।
রাস্তাটা দু-ভাগ হয়ে গিয়েছে। ডানদিকেরটা ধরে একটু এগোতেই শেফালি-মা বললেন, ‘বাঁ-দিকের বাড়িটা পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থ শংকর রায়ের বাড়ি।’ নবকুমার দেখল। বিশাল বাড়ি। পাঁচিল।
মোড়ের কাছাকাছি একটা সুন্দর দোতলা বাড়ির সামনে ট্যাক্সি থামালেন। শেফালি-মা ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এসো।’
দরজার পাশে বেলের বোতাম টেপা মাত্র একজন কাজের মেয়ে সেটা খুলে দিয়ে বলল, ‘আসুন।’
শেফালি-মা বললেন, ‘ওরা তো কেউ বাড়িতে নেই, তাই না?’
‘না। দেশের বাড়িতে কী যেন ঝামেলা হয়েছে। তাই চলে গেছেন। কিন্তু আমাকে বলে গেছেন আপনাকে বাড়িটা ঘুরিয়ে দেখাতে।’
দোতলা বাড়ি। ভেতরটা সুন্দর। মোট ঘর ছ’টা। পেছনে এক চিলতে বাগানও আছে। ছাদে উঠল ওরা। আশেপাশে লম্বা-লম্বা বাড়ি থাকায় দোতলা বাড়ির ছাদটার কোনও গোপনীয়তা নেই।
শেফালি-মা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কেমন লাগছে তোমার?’
‘ভালো। খুব ভালো।’
‘পাড়াটাও বেশ শান্ত।’
ঠিক তখনই একটা ট্যাক্সি এসে দাঁড়াল সামনের বাড়ির দরজায়। ছাদে দাঁড়িয়ে ওরা দেখল, একটা জিনস পরা মেয়ে ট্যাক্সি থেকে নেমে বাড়ির বেল বাজাল। কিন্তু কেউ দরজা খুলল না। মেয়েটা একটু পিছিয়ে এসে চিৎকার করল, ‘কী হল? দরজা খোলো। ওপেন দ্য ডোর।’
কোনও সাড়া এল না। মেয়েটা খুব ক্ষিপ্ত হয়ে দরজায় লাথি মারতে লাগল। তাই দেখে রাস্তায় যারা হাঁটছিল তারা দাঁড়িয়ে গেল।
এইসময় ওই বাড়ির দোতলায় ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ালেন এক প্রৌঢ়া, ‘তোমার জন্যে এ-বাড়ির দরজা বন্ধ। অনেকবার বলেছি। তুমি শোনোনি। কাল সারারাত যেখানে ছিলে, সেখানেই চলে যাও।’ বলে ফিরে গেলেন ভেতরে।
‘হোয়াট? বললেই হল। আমি এ-বাড়ির মেয়ে। এখানে থাকার রাইট আছে আমার। ও কে। আমি থানায় যাচ্ছি। পুলিশ আমাকে হেল্প করবে বাড়িতে ঢুকতে।’ বলতে-বলতে মেয়েটা ট্যাক্সিতে উঠে গেল। ট্যাক্সি চলে গেল। শেফালি-মা তাকালেন নবকুমারের দিকে। মাথা নেড়ে হাসলেন। তারপর বললেন, ‘চলো।’
