তেত্রিশ
গদিতে যখন ফিরে এল, তখন রিহার্সাল চলছে। কিন্তু আজ কেউ প্রম্পট করছে না। কেউ আটকে গেলে সুধাময়বাবু ধরিয়ে দিচ্ছেন। সমস্যায় পড়েছেন নিরুপমাদি। তাঁকে ঘরের একপাশে বসিয়ে রাখা হয়েছে। মুখ ভার, চোখ ছলছল। নবকুমারকে দেখে মাথা নেড়ে ইশারায় ডাকলেন। নবকুমার তাঁর কাছে গিয়ে বসলে ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কোথায় গিয়েছিলে তুমি?’
‘বড়বাবু যেতে বলেছিলেন।’ নবকুমার গলা নামিয়ে জানাল।
‘আমার সর্বনাশ হয়ে গেছে। পার্ট মুখস্ত হয়নি বলে বসিয়ে দিয়েছে। কী হবে।’
সুধাকান্তবাবু হাত তুলে রিহার্সাল থামিয়ে খুব শান্ত গলায় বললেন, ‘এটা কাজের জায়গা। গল্প করার ইচ্ছে হলে বাইরে বেরিয়ে গিয়ে করো।’
নবকুমার উঠে দাঁড়াল, ‘উনি প্রশ্ন করেছিলেন বলে আমি উত্তর দিয়েছিলাম।’
‘ঠিক আছে।’
‘আমি কি প্রম্পট করব?’
‘আগে দেখে নিই কে বাড়িতে কেমন মুখস্থ করেছে। আমি চাই সবাই একটু সিরিয়াস হোক। হ্যাঁ, শুরু করো।’
নবকুমারের মনে হল, সে যে ফিরে এসেছে তা বড়বাবুকে জানিয়ে দেওয়া দরকার। আসার সময় আর ট্যাক্সি নেয়নি। ফলে অনেক টাকা বেঁচে গেছে। সে উঠে এগিয়ে গেল। বড়বাবুর ঘরের দরজা ফাঁক করে জিজ্ঞাসা করল, ‘আসব?’
বড়বাবু একজন ভদ্রমহিলার সঙ্গে কথা বলছিলেন। তার দিকে তাকিয়ে নবকুমারের মনে হল, এমন সুন্দরী সে কখনও দ্যাখেনি। মহিলার চোখে কালো চশমা, কাঁধ পর্যন্ত ফাঁপানো চুল, শঙ্খের মতো নিটোল হাত যার রং দুধের সঙ্গে আলতা গোলা এবং হাতকাটা জামা পরায় যার ঔজ্জল্য আরও বেড়ে গেছে। মহিলাও তার দিকে তাকালেন।
‘এসো।’ বড়বাবুর গলা যেন ঈষৎ হালকা।
নবকুমার ঘরে ঢুকে টেবিলের ওপর চারটে দশটাকার নোট আর খুচররোগুলো রেখে দিতে বড়বাবু অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এগুলো কী?’
‘খরচ হয়নি।’ সোজা হয়ে দাঁড়াল নবকুমার।
‘কেন? ট্যাক্সিতে যাওয়া আসা করোনি?’
‘যাওয়ার সময় গিয়েছিলাম। ফেরার সময় বাস পেয়ে গেলাম।’
‘বাস? কলকাতার কোন বাস কোথায় যায় তা তুমি জানো?’
‘জিজ্ঞাসা করে নিয়েছিলাম।’
‘কিন্তু তোমার উচিত ছিল ট্যাক্সিতে আসা। তাহলে আরও আগে ফিরে আসতে পারতে। যাও। ও হ্যাঁ, শুনলাম তুমি নাকি রিফ্যুজ করেছ! বলেছ, তোমার দ্বারা অভিনয় হবে না! কলকাতার জল পেটে পড়তেই নিজের সম্পর্কে অনেক জেনে গেছ দেখছি! হবে কি হবে না সেটা আমি বলব, তুমি নয়! বুঝতে পেরেছ? অতি বড় বিজ্ঞের মতো বলে এলে, আমার দ্বারা হবে না। রাবিশ।’ বড়বাবু ভদ্রমহিলার দিকে তাকালেন, ‘এই ছেলেটির নাম নবকুমার।’
ভদ্রমহিলার মুখে কোনও অভিব্যক্তি ফুটল না।
‘গ্রামের ছেলে। গ্র্যাজুয়েট। কলকাতায় এসেছে চাকরির সন্ধানে। আজ একটা ছবির জন্যে অডিশনে পাঠিয়েছিলাম। পরিচালকের নাকি ভালো লেগেছে। কিন্তু ইনি বলে এসেছেন অভিনয় ওর দ্বারা হবে না। ভাবতে পারেন?’ বড়বাবু হাসলেন।
‘ফ্যান্টাস্টিক। শুনে আমার খুব ভালো লাগছে। আমি ওকে কয়েকটা প্রশ্ন করতে পারি?’ মহিলা চশমা ঠেলে মাথার ওপরে তুলে দিতেই চেহারাটা ঝট করে বদলে গেল।
‘নিশ্চয়ই। বাচ্চা ছেলে।’
‘আচ্ছা নবকুমার, আপনি মিথ্যে কথা অনায়াসে বলতে পারেন?’
খুব খারাপ লাগছিল নবকুমারের। কিন্তু বড়বাবুর সামনে বসে আছেন বলে সে কোনও কথা মুখে না বলে মাথা নেড়ে জানাল, না।
‘কষ্ট করে?’
‘দেশে কখনও বলিনি।’
‘কলকাতায় আসার পর?’
‘দু-একবার। খুব খারাপ লেগেছে বলতে।’
‘হুম। তুমি নিশ্চয়ই প্রেম করেছ? গ্রামের পুকুরের ধারে বা কোনও জলাজঙ্গলে! ক’টা মেয়ের সঙ্গে করেছ?’
‘ওসব চিন্তা আমার মাথায় ছিল না। আমার দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষমতা নেই। ওসব করব কেন?’ নবকুমারের গলার স্বর কড়কড়ে হয়ে গেল।
‘গ্রামে তো অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে যায়। তোমার হয়েছে?’
‘বললাম তো! ওসব চিন্তা আমার মাথায় নেই।’
‘গান গাইতে পার?’
‘না।’
‘তাহলে তোমার কী ভালো লাগে?’
‘বই পড়তে। গল্পের বই।’
‘আ-চ-ছা! ঠিক আছে। তুমি এখন যেতে পার।’
বড়বাবু বললেন, ‘শোনো, আমাকে না জানিয়ে গদি থেকে যাবে না।’
সে বেরিয়ে যেতে-যেতে শুনল ভদ্রমহিলা খিলখিলিয়ে হেসে উঠলেন।
খুব খারাপ লাগছিল নবকুমারের। সে গদির বাইরে চলে এল। এসব কী হচ্ছে? বড়বাবুর সামনে ওই মহিলা ওসব প্রশ্ন করার সাহস পেলেন অথচ তিনি একটুও আপত্তি করলেন না? ওরকম জাঁদরেল বড়বাবুকেও ওঁর সামনে কীরকম নরম দেখাচ্ছিল।
এইসময় মাস্টারদা পাশে এসে দাঁড়াল, ‘একটা বিড়ি খাবে?’
না বলতে গিয়ে হ্যাঁ বলে ফেলল নবকুমার। বিড়ি ধরিয়ে দিল মাস্টারদা। একগাল ধোঁয়া বের করে বলল, ‘ব্যাপারটা কী? মুখ দেখে মনে হচ্ছে কেউ লেঙ্গি মেরেছে! বড়বাবু কোথায় পাঠিয়েছিল?’
‘সিনেমার অডিশন দিতে।’
‘অ্যাঁ। সে কী! নিশ্চয়ই গাড্ডা খেয়েছ। আরে বাবা, তোমার মতো গেঁয়ো কখনও ক্যামেরার সামনে কথা বলতে পারে! যাওয়ার আগে একটু যদি বলতে তাহলে আমি তোমাকে উত্তমকুমারের কয়েকটা স্টাইল শিখিয়ে দিতাম। বড়বাবুও যেমন! মুরগি দিয়ে হালচাষ করাবেন!’ হাসল মাস্টারদা।
‘আচ্ছা, বড়বাবুর ঘরে যে ভদ্রমহিলা বসে আছেন তিনি কে? কোনও অভিনেত্রী?’ জিজ্ঞাসা করলে নবকুমার।
‘আই বাপ! প্রাোডিউসার। বিশাল প্রাোডিউসার। আটখানা সুপারহিট ছবি বানিয়েছেন। বড়বাবুর কাছে কেন এসেছেন জানি না। ওই যে গাড়িটা ওটা ওঁর গাড়ি। কত দাম জানো গাড়িটার?’ মাস্টারদা আঙুল তুলে দেখালেন।
মাথা নাড়ল নবকুমার। না।
‘কম করে বিশ লাখ। বড়-বড় হিরোরা ওকে দেখলে মাথা নীচু করে নমস্কার করে। সুধাময়দা বলছিলেন বড়বাবুর শ্বশুরবাড়ির দিকের আত্মীয়।’ মাস্টারদা বলল।
এইসময় ভদ্রমহিলা বেরিয়ে এলেন। তাঁর হাঁটার ধরনটাই আলাদা। লম্বা ছিপছিপে চেহারা পা ফেলার তালে-তালে যেন ছন্দে দুলছে। পাশ দিয়ে হেঁটে গাড়িতে উঠতেই সেটা বেরিয়ে গেল। গাড়ির কাচ রঙিন। নবকুমারকে যেন চিনতেই পারলেন না। মাস্টারদা বলল, ‘একেবারে ইঞ্জিন থেকে ডিকি পর্যন্ত এসি লাগানো। বুঝলে?’
রিহার্সাল শেষ হলে সুধাকান্তবাবু নিরুপমাদিকে নিয়ে বসলেন। বললেন, ‘কাল তোমাকে আসতে হবে না। কিন্তু পরশু যখন আসবে, তখন তোমার সংলাপ কেউ প্রম্পট করবে না। কালকের মধ্যে মুখস্থ করে ফেলবে। না পারলে এসো না।’
অনেক কাকুতি মিনতি করলেন নিরুপমাদি। সুধাকান্তবাবু বললেন, ‘আমার কিছু করার নেই। এটা বড়বাবুর হুকুম।’
চোখ মুছতে-মুছতে চলে গেলেন নিরুপমাদি।
গদি এখন ফাঁকা। সন্ধে নেমে গেছে। মাস্টারদা এর মধ্যে স্নান করে ভালো পোশাক পরে চলে এল, ‘যাবি?’
‘কোথায়?’
‘কলকাতায় এসেছিস, সোনাগাছিতে আছিস, অথচ কোনও ফূর্তিফার্তা করলি না। আমার এক পুরনো দোস্ত থাকে গণেশ টকির কাছে। জাহাজে চাকরি করে। পরশু কলকাতায় এসেছে। চল ওর ওখানে।’
‘আমি চিনি না, উনি কী মনে করবেন?’
‘দূর। জাহাজিদের তুই চিনিস না। এত্ত বড় হৃদয় হয়। আজ না হয় এট্টুকখানি ফরেন মাল খেয়ে দেখলি।’
‘অসম্ভব।’ জোরে বলে ফেলল নবকুমার।
‘তুই শালা এক নম্বরের ক্যালানে।’ মাস্টারদা চলে গেল। আজকাল মাস্টারদা প্রায়ই তাকে তুমি না বলে তুই বলছে।
নবকুমার ঠিক করল আজ তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে যাবে। সে বড়বাবুর দরজার দিকে যাওয়ার জন্যে পা বাড়াচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই তিনি বেরিয়ে গেলেন। পেছনে বেয়ারা ওঁর ব্যাগ নিয়ে আসছে।’
‘যাক। চলে যাওনি।’
‘আপনি বলেছিলেন বলে যেতে।’
‘চলো।’
বলে এগিয়ে গেলেন দরজার দিকে জুতোয় মশমশ শব্দ তুলে। হাঁ হয়ে গেল নবকুমার। তাকে কোথায় যেতে বলছেন বড়বাবু? শেফালি-মায়ের সঙ্গে কি ফোনে কথা হয়েছে? আজই কি দেখা করছেন শেফালি-মা?’
বড়বাবু গাড়িতে উঠে বসলেন, ‘সামনে বসো।’
সে ড্রাইভারের পাশে বসতেই আদেশ হল, ‘বেল্টটা বেঁধে নাও। নইলে পুলিশ ধরে ফাইন করলে তোমার মাইনে থেকে কেটে নেব।’
বেল্ট বাঁধতে ড্রাইভারের সাহায্য নিতে হল। গাড়ি ঘোরাতে বললেন বড়বাবু। তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, ‘রাতে সোনাগাছিতে ফিরতে কোনও সমস্যা হয় না তোমার? ওখানে তো ছিনতাই গুন্ডামি লেগেই আছে। আমি কিছুতেই বুঝতে পারি না শেফালি-মায়ের মতো মানুষ এই বয়সে ওই পরিবেশ কী করে সহ্য করছেন?’
নবকুমার উত্তর দিল না। বড়বাবুও দ্বিতীয়বার জানতে চাইলেন না।
বেশ কিছুক্ষণ গাড়িটা চলার পরে বড়বাবু জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এদিকটা চেনো?’
‘আজ্ঞে না।’
‘ঘোরাঘুরি করোনি কেন?’
‘গিয়েছিলাম। চিড়িয়াখানা, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল। কলিকাতা শহরটা এত বড় যে অনেকদিন লাগবে চিনে নিতে।’
‘তোমার তাহলে কলিকাতাকে চেনার ইচ্ছে আছে! গুড। তা তুমি যে বিড়ি খাও তা আমি জানতাম না। অবশ্য তোমার আমি কতটুকুই বা জানি। বিড়ি ছোটলোকেরা খায়। আমি দু-চক্ষে দেখতে পারি না।’
শক্ত হয়ে গেল নবকুমার। সে বিড়ি খেয়েছে এই খবর বড়বাবুর কানে তুলে দিল কে? মাস্টারদা ছাড়া আর কেউ জানে না। বড় মানুষদের চোখ কত দিকে থাকে কে জানে। সে যে নিয়মিত বিড়ি খায় না, এ কথা বলতে পারল না।
বড়বাবুর নির্দেশমতো গাড়ি থামল একটা লোহার গেটের সামনে। দারোয়ান কাছে এসে বড়বাবুকে দেখে সেলাম করে গেট খুলে দিল। দুপাশে বাগান। গাড়ি থামল একটা গাড়িবারান্দার নীচে। এই বাড়িটা বড়বাবুর বাড়ির চেয়েও বড়। কিন্তু ওরকম গম্ভীর দেখতে নয়।
‘নামো।’ বড়বাবু নেমে এগিয়ে গেলেন সিঁড়ির দিকে।
বেল্ট পরতে যেমন ঝামেলা, খোলার সময়েও তাই। গাড়ি থেকে নেমে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গিয়ে বড়বাবুকে দেখতে পেল না নবকুমার। সে যখন এদিক-ওদিক দেখছে, তখন ওপর থেকে একটা লোক নেমে এসে বলল, ‘আসুন।’
লোকটাকে অনুসরণ করে দোতলায় উঠে এসে একটা চমৎকার সাজানো ঘরে ঢুকল সে। পায়ের তলায় কার্পেট। দেওয়ালে বড়-বড় হরিণের শিং, জ্যান্ত দেখতে বাঘের মুখ, চামড়া।
লোকটা বলল, ‘এদিকে আসুন। এইখানে। টয়লেটে।’
‘টয়লেটে?’
‘আপনাকে পেস্ট দিয়ে মুখ ধুয়ে নিতে বলেছেন মেমসাহেব।’
‘কেন?’
‘আমি জানি না।’
খামোখা কেন পেস্ট দিয়ে মুখ ধোবে সে? কিন্তু লোকটি এগিয়ে গেল দরজার দিকে। বলল, ‘এখানে।’
অতএব সেখানে ঢুকতে হল। বড় আয়নাওয়ালা টয়লেট। সামনে সাবানের কেস, পেস্ট রয়েছে। বাধ্য হয়ে আঙুলে পেস্ট মাখিয়ে দাঁত মাজল নবকুমার। তারপর মুখ ধুয়ে আয়নার দিকে তাকাতেই মনে পড়ল সে বিড়ি খেয়েছিল এবং বড়বাবু বিড়ি খাওয়া দু-চক্ষে দেখতে পারেন না। তাই বিড়ির গন্ধও সহ্য করতে পারেন না। কিন্তু তাকে দাঁত মাজতে মেমসাহেব হুকুম করলেন কেন? তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছে চুল আঁচড়ে নিল নবকুমার।
লোকটাকে অনুসরণ করে আর-একটি ঘরের সামনে যেতেই সে দাঁড়িয়ে গেল, ‘ভেতরে যান বাবু।’ লোকটা চলে গেল।
নবকুমার পা বাড়াতেই মহিলা উঠে দাঁড়ালেন, ‘ওয়েলকাম। ওয়েলকাম। বা:। এখন আপনাকে খুব ফ্রেশ দেখাচ্ছে। বসুন।’
বড়বাবু বসে আছেন সোফায়। গম্ভীর গলায় বললেন, ‘এবার এটা চালাও।’
