1 of 2

কলিকাতায় নবকুমার – ৩১

একত্রিশ

গতরাতে বাড়ি ফেরার সময় প্যাকেটটা রাস্তায় পড়ে গিয়ে থাকলে এখন সেটাকে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। কিন্তু নবকুমার ভাবতেই পারছিল না যে প্যাকেটটা তার হাত থেকে পড়ে গেল এবং সে টের পেল না। এ হতেই পারে না! অথচ প্যাকেটটা নেই। মুক্তো খামোখা মিথ্যে বলবে না। ওই প্যাকেট না পেলে সে বড়বাবুর সামনে গিয়ে দাঁড়াতে পারবে না। শেফালি-মাকেই বা কী বলবে!

তবু আশায়-আশায় রাস্তায় নামল নবকুমার। এই রাস্তা দিয়েই সে গতকাল বাড়ি ফিরেছে। সতর্ক চোখে মাটির দিকে তাকিয়ে হাঁটছিল সে। প্যাকেট দূরের কথা, একটা কাগজের টুকরো পর্যন্ত পড়ে নেই।

খানিকটা হাঁটার পর বাঁ-দিকের ডাস্টবিনের সামনে লোকটাকে দেখতে পেল সে। পরনে হ্যাফপ্যান্ট আর গেঞ্জি, সিড়িঙ্গে চেহারার। কাঁধে একটা বস্তা, ডান হাতে লোহার শিক, ডাস্টবিন থেকে উপচে পড়া জঞ্জালে কিছু খুঁজছে। এই লোকটা কে? তাদের গ্রামে এই ধরনের মানুষ সে কোনওদিন দ্যাখেনি। ডাস্টবিনের আবর্জনা যে খুঁচিয়ে দ্যাখে, সে নিশ্চয়ই রাস্তায় পড়ে থাকা প্যাকেটটাও তুলে নেবে।

‘আপনি কী খুঁজছেন?’ কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল নবকুমার।

‘লোকে ফালতু বলে যা ফেলে দেয়, তার কিছু-কিছু বিক্রি করা যায়। তাই খুঁজছি।’

‘ও। আপনি কি একটা প্যাকেট পেয়েছেন?’

‘প্যাকেট?’ লোকটা তাকাল।

‘হ্যাঁ। প্যাকেটের মধ্যে কাগজ, মানে খাতা আছে।’

‘না।’ মাথা নাড়ল লোকটা।

হতাশ হল নবকুমার, ‘তবু, একবার দেখবেন?’

‘ভ্যাট! কী-কী মাল বস্তায় পুরেছি তা আমি জানি না নাকি?’ লোকটা আবার জঞ্জাল খোঁচানো শুরু করল।

নবকুমার পথে নামল। হাঁটতে-হাঁটতে ডানদিকে ঘুরে ট্রাম রাস্তা পর্যন্ত চলে এল সে। না, কোথাও প্যাকেটটা পড়ে নেই।

‘আপনি এখানে।’

নবকুমার দেখল সেদিন যাদের সঙ্গে মারপিট হয়েছিল তাদের একজন দাঁড়িয়ে আছে সামনে। বেশ শান্ত মুখ। নবকুমার বলল, ‘একটা প্যাকেট হাত থেকে কাল রাত্রে পড়ে গিয়েছিল রাস্তায়, টের পাইনি। আজ, এখন আর খুঁজে পাচ্ছি না।’

‘দামি জিনিস ছিল?’

‘না-না। খাতা ছিল।’

তাহলে কেউ এ-পাড়ায় নেবে না। হয়তো কাগজ কুড়োনিরা নিয়ে গেছে। চা খাবেন? নিত্যদা, দুটো ডাবল হাফ।’ চেঁচাল ছেলেটা।

নবকুমার না বলার সুযোগ পেল না। ছেলেটা বলল, ‘আপনার সঙ্গে সেদিন রং নম্বর হয়ে গিয়েছিল। আসলে এত ঝামেলা যে মাথা ঠিক থাকে না। আমি শালা বেশিক্ষণ আপনি বলতে পারি না। তুমি বলছি, ঠিক হ্যায়?’

মাথা নাড়ল নবকুমার।

ছেলেটা হাসল, ‘বুঝলে গুরু, আজ কিছু মাল আসবে পকেটে।’

‘কীরকম?’

‘দ্যাখো, এই সোনাগাছিতে গতর ভাঙিয়ে যেসব মেয়েরা কামাই করে তারা বেশ গরিব। বাড়িওয়ালি নেয়, আমরা নিই। কেন নিই? আমরা ওদের কাস্টমারের ঝামেলা থেকে বাঁচাই। এখন দুর্বার হয়েছে। ওদের যৌনকর্মী বলছে। ওদের পাশে দাঁড়াচ্ছে। ঠিক আছে। কিন্তু রাতে যখন খদ্দের ষাট দেব বলে ঢুকে চল্লিশ দিয়ে হাওয়া হতে চাইছে তখন দুব্বার কোথায়? অফিস বন্ধ করে বাড়ি ফুটে গিয়েছে। তখন তো আমরাই খদ্দেরটাকে ধরে টাকা আদায় করে দিই। ঠিক কি না?’

চা এল। একটু ঘন, আধকাপ। এটা ডাবল হাফ কী করে হল, বুঝতে পারছিল না নবকুমার। চায়ে চুমুক দিয়ে ভালো লাগল, ‘আজ কী হবে বলছিলেন?’

‘গুরু, আপনি বললে খেপে যাব।’

‘বেশ।’

‘শোন যারা এখানে থাকে বা বাইরে থেকে এসে পেটের জন্যে কামাই করে তাদের জন্যে দুব্বার লড়ছে। ঠিক আছে। কিন্তু ভদ্দরলোকের বউ যদি ফূর্তি করার জন্যে সোনাগাছিতে আসে তাদের তো মাল্লু ছাড়তেই হবে। ঠিক কি না?’

‘এরকম হয় নাকি?’ অবাক হল নবকুমার।

‘বহুত। ঘণ্টায় দুশো টাকা বাড়িওয়ালিকে দিচ্ছে। দুপুরবেলায়, যখন পুলিশের ঝামেলা নেই। বাবুরা নিয়ে আসছে ভদ্দর মেয়েছেলেকে। ভদ্দর মেয়েছেলেরা নিয়ে আসছে অল্পবয়সি ছেলেদের। হোটেলে ঘর ভাড়া করতে বেশি পয়সা লাগে। তা ছাড়া খাতায় নামটাম লিখতে হয়। পুলিশ রেইড করতে পারে। চেনা লোক দেখে ফেলতে পারে। কিন্তু এখানে এলে সেসব ঝামেলা নেই। আর এসে ওঠে হলুদকমল, সবুজকমল, রক্তকমলে। হোটেলের চেয়ে কমতি কিছু না। ঢোকে মাথায় ঘোমটা দিয়ে, বের হয় ওইভাবেই।’ ছেলেটা চা শেষ করল, ‘নিত্যদা, কাপ! একটা হাফবুড়ি লাস্ট তিনমাস ধরে এখানে ছেলের বয়সি লাভারকে নিয়ে আসে। দু-ঘণ্টা থাকে। একটা থেকে তিনটে। দুজনে ভদকা খায়। বাড়িওয়ালিকে চারশো, চাকরকে পঞ্চাশ আর আমাদের জন্যে দেড়শো দিয়ে ঘোমটা মাথায় ট্যাক্সিতে ওঠে।’

নবকুমার না হেসে পারল না।

‘হেসো না গুরু। লাস্ট দিন আমি ফলো করেছিলাম। আর-একটা ট্যাক্সিতে চেপে দেখলাম উলটোডাঙা ভিআইপিতে ছেলেটা নেমে গেল। হাফবুড়ি ট্যাক্সি ছাড়ল সল্টলেকের একটা বাড়ির সামনে। ট্যাক্সি চলে যাওয়ার পর দশ মিনিট হেঁটে একটা গলিতে ঢুকে যে বাড়ির সামনে গিয়ে বেল টিপল, সেটা দেখতে আলিশান। একটা কাজের মেয়ে দরজা খুলে দিলে হাফবুড়ি ভেতরে ঢুকে গেল। আমি পাত্তা লাগালাম। হাফবুড়ির দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। বাইরে থাকে। বর বুড়ো হয়ে গেলেও নাকি জাহাজে চাকরি করে। একেবারে সলিড পার্টি।’ হাসল ছেলেটা।

‘তারপর?’

‘আজ ওদের আসার ডেট। হলুদকমল থেকে বের হওয়ামাত্র ওদের হাতেনাতে ধরব। হুজ্জত শুরু হয়ে গেলে হাফবুড়িকে ঠিকানা বলে দিয়ে মাল্লু চাইব। অন্তত দশ হাজার। বলো গুরু, অন্যায় করছি? তুই তোর লাভারকে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে ফূর্তি কর। তা করবে না। যদি জানাজানি হয়।’

‘বাইরে ভিড় না জমিয়ে ভেতরে গিয়ে তো কথা বলা যায়।’

‘যায়? কিন্তু হলুদকমলের বাড়িওয়ালি সেটা করতে দেবে না। তার খদ্দের হাতছাড়া হয়ে যাবে তো।’ ছেলেটা মাথা নাড়ল, ‘তুমি ভাই দুব্বার পার্টিকে বলো এদিকটা দেখতে। এখানকার মেয়েদের লোকে খানকি বলে। কিন্তু এই ভদ্দর মেয়েছেলেরা পেটের জন্যে তো ওসব করছে না। এদের তো আরও খারাপ নামে ডাকা উচিত।’

‘ঠিকই। সত্যি কথা। কিন্তু লোক জমিয়ে ঝামেলা করলে যদি পুলিশ আসে, তাহলে তোমার ইনকাম নাও হতে পারে। তখন পুলিশই কেসটা নিয়ে নেবে।’

‘একদম ঠিক বলেছ গুরু। শালা মাথায় আসেনি। একটা সিনেমা দেখেছিলাম। একটা নেকড়ে এসে হরিণ মারল। সিংহ এসে হরিণটাকে খেয়ে নিল। তাহলে কী করা যায় বলো তো?’

‘আমি কী করে বলব?’

‘ঠিক আছে। মাথায় এসেছে। বেরিয়ে আসামাত্র আট-দশটা মেয়েকে দিয়ে ওদের ঘিরে ঝামেলা পাকাব। তখন আমরা দুজন মেয়েদের হাত থেকে ওদের উদ্ধার করে এখান থেকে একটু সরিয়ে নিয়ে গিয়ে টাকা চাইব।’ হাসল ছেলেটা।

‘আমার ভাই দেরি হয়ে যাচ্ছে।’

‘ও। কিন্তু প্যাকেটটা যে পেলে না!’

‘খুব ক্ষতি হয়ে যাবে। চাকরিও চলে যেতে পারে।’

‘আচ্ছা, কাল যখন পাড়ায় ঢুকেছিল তখন প্যাকেটটা সঙ্গে ছিল?’

‘হ্যাঁ। আমি ট্রাম থেকে নামার পরেও ছিল।’

‘তারপর?’

‘পাড়ায় ঢুকে দেখলাম লোডশেডিং হয়ে গেছে। ঘুটঘুটে অন্ধকার। তখন একটা বাড়ি থেকে ডেকে বলল না-যেতে। কোথায় মার্ডার হয়েছে। পুলিশ যাকে পাচ্ছে তাকে ধরছে। আমি বাধ্য হয়ে সেই বাড়িতে গিয়েছিলাম।’

‘কোন বাড়ি? চলো তো দেখি।’

হাঁটতে গিয়ে নবকুমার জিজ্ঞাসা করল, ‘চায়ের দামটা—।’

‘লিখে রাখবে। এ কী বলছ গুরু!’

গলি এখন জমে ওঠার কথা নয়। তবু কিছু মেয়ে, যারা নিতান্তই ঈশ্বরের কৃপা থেকে বঞ্চিত, দাঁড়িয়ে আছে দরজায়-দরজায়।

ইতি যে বাড়িতে থাকে, সেই বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াল নবকুমার।

‘ওই বাড়ি?’

‘মনে হচ্ছে।’

‘দাঁড়াও।’ ভেতরে ঢুকে গেল ছেলেটা। মিনিটতিনেক বাদে বেরিয়ে এল হাসতে-হাসতে। তার হাতে প্যাকেটটা, ‘তুমি ফেলে গিয়েছিলে রাস্তায়। ওরা কুড়িয়ে রেখেছিল।’

আনন্দে চোখ বন্ধ হয়ে গেল নবকুমারের, ‘উ:! বাঁচলাম। কী বলে যে—।’

‘কিছু বলতে হবে না। যদি পারো ওদের দশটা টাকা দিও। চা খাবে।’

পকেটে কিছু ছিল না। নবকুমার ঘাড় নাড়ল।

হাঁটতে-হাঁটতে ছেলেটা বলল, ‘দুপুরে থাকবে নাকি?’

‘দুপুরে?’

‘আমি তো ভদ্দরলোকের মতো কথা বলতে পারি না। তুমি যদি বলো—। না-না। এমনি খাটাব না, হিস্যা পাবে।’

‘আমাকে যে কাজে যেতে হবেই।’

‘ও। ঠিক আছে। দেখা হলে বলব, কী ড্রামাবাজি হল।’

মাথা নেড়ে জোরে-জোরে পা ফেলে বাড়ি ফিরে এল নবকুমার। আজ ছেলেটা তার বড় উপকার করেছে। ওর কথায় রাজি হলে কিছু টাকা পাওয়া যেত ঠিকই। কিন্তু সে আজ থেকে সোনাগাছির আর-একটা মাস্তান হয়ে যেত। তাকে দলে টানতে চেয়েছিল ছেলেটা। নবকুমার ঠিক করল দূরত্বটা বাড়াতে হবে।

.

শেফালি-মা অবাক হয়ে বললেন, ‘প্যাকেটটা কোথায় ফেলে এসেছিলে?’

সত্যি কথাটা বলল নবকুমার। কিন্তু ছেলেটার প্রসঙ্গ তুলল না।

‘দ্যাখো কাণ্ড। এটা যদি না পেতে তাহলে বড়বাবু তো খেপে যেত।’

‘হ্যাঁ।’

‘মুক্তো বলল, তুমি কী খুঁজতে বেরিয়েছ। আমি তো ভেবেই পাচ্ছিলাম না। না:, তোমার কপাল দেখছি ভালো। কলকাতায় কিছু হারালে আর পাওয়া যায় না। তুমি পেলে।’

প্যাকেটটা খুললেন শেফালি-মা। তাঁর মুখ থেকে বেরিয়ে এল, ‘উরে ব্বাবা।’

‘কী?’

‘তোমার বড়বাবুর সাহস আছে। কিন্তু এটা কোনটা?’ পাতা উলটে কয়েক লাইন পড়লেন তিনি। তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, ‘মা নামে কোনও উপন্যাস পড়েছ?’

‘হ্যাঁ।’

‘কার লেখা?’

‘অনুরূপা দেবী।’

‘হ্যাঁ-হ্যাঁ। উনিও মা নামে একটা উপন্যাস লিখেছিলেন। কিন্তু সারা পৃথিবীতে সবচেয়ে প্রচারিত এবং জনপ্রিয় মা নামের উপন্যাস লিখেছেন গোর্কি। গোর্কির মাদার উপন্যাস পড়োনি?’ শেফালি-মা জিজ্ঞাসা করলেন।

‘আমাদের ওখানে পাওয়া যায় না।’

‘ও। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, এটা গোর্কির মাদার নয়। এই নাট্যকারের নামও আমি শুনিনি। কিন্তু এখন কি এই নামের পালা চলবে? কাগজে তো যেসব নাম দেখি তার বেশিরভাগই ছ্যাবলামি। মনে হয় দর্শকের রুচিও সেরকম হয়ে গেছে।’

‘এখন যেটার রিহার্সাল চলছে, সেটায় কিন্তু ছ্যাবলামি নেই।’

‘তাই? তাহলে তোমাদের বড়বাবুকে সাহসী বলতে হবে।’

‘ওঁকে কী বলব?’

‘বলবে আমার দু-দিন সময় লাগবে। মন দিয়ে পড়তে হবে, ভাবতে হবে। তারপর জানাব, কথা বলব কি না!’

‘ঠিক আছে। আমি যাই।’

‘এসো!’

তাড়াতাড়ি স্নান খাওয়া শেষ করে জামাপ্যান্ট পরে নিল নবকুমার। টেবিল থেকে খুচরো পয়সা তুলতে গিয়ে কার্ডটাকে দেখতে পেল।

গীতিময় ঘোষ। ফিল্ম ডিরেক্টার। নীচে ল্যান্ড এবং মোবাইল নম্বর। ভদ্রলোক বলেছিলেন সকাল দশটায় ওঁকে ফোন করতে। দশটা বেজে গেছে অনেক আগে। ফোন না করে গদিতে চলে এল নবকুমার।

একটু-একটু করে লোকজন জমছিল। নিরুপমাদি এসেই মুচকি হাসলেন। মাস্টারদা ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করল, ‘কিছু হল?’

‘নাটক পড়ে মত দেবেন বলেছেন।’

‘উ:! কবে দেবে?’

উত্তর দেওয়ার আগে কাজের লোক এসে জানাল, নবকুমারকে বড়বাবু ডাকছেন।

ঘরে ঢুকতেই বড়বাবু জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আজ সকাল দশটায় গীতিময়কে ফোন করার কথা ছিল?’

ঢোঁক গিলল নবকুমার, ‘আজ্ঞে হ্যাঁ।’

‘করোনি কেন?’ গর্জন করলেন বড়বাবু।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *