1 of 2

কলিকাতায় নবকুমার – ২৯

উনত্রিশ

ছুটন্ত ট্যাক্সিতে বসা নিরুপমাদির চুল বাতাসে উড়ছে। সেদিকে তাকিয়ে নবকুমারের খারাপ লাগল। তাকে আজ আবার মিথ্যে কথা বলতে হবে। সে বাইরে তাকাল।

ফুটপাতে রান্না করছে কয়েকজন শীর্ণা চেহারার মহিলা। পাশে অর্ধনগ্ন শিশু, ঝুপড়ি। জ্যামের কারণে ট্যাক্সিটা দাঁড়িয়ে ছিল। দেখতে-দেখতে নবকুমারের খুব খারাপ লাগছিল। এরা কারা? এরা কি কলিকাতারা মানুষ নয়? ঝড় জল যখন হয় তখন এরা কোথায় যায়? তাদের গ্রামের অধিকাংশ মানুষ গরিব কিন্তু কেউ খোলা আকাশের নীচে এভাবে রেঁধে খায় না। থাকে না।

সে নিরুপমাদিকে জিজ্ঞাসা করল, ‘এরা কারা?’

নিরুপমাদি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কারা? ও। এই মেয়েরা বাড়ি-বাড়ি বাসন মেজে রোজগার করে। ছেলেরা কেউ দিনমজুর, কেউ রিক্সা চালায়। বেশির ভাগই বউ-এর পয়সায় খায়।’

‘এদের বাড়িঘর নেই?’

‘না:।’ হাসলেন নিরুপমাদি, ‘ওরা ফুটে থাকে বলে ভেবো না, খুব খারাপ আছে। অনেক নিম্নবিত্ত মানুষের চেয়ে ওদের আয় কম নয়।’

‘সরকার কিছু বলে না? মন্ত্রীরা তো এই রাস্তা দিয়ে নিশ্চয়ই যান।’

‘যায়। চোখ বন্ধ করে রাখে যাওয়ার সময়। তুমিও চোখ বন্ধ রাখো।’ নিরুপমাদি শব্দ করে হাসলেন।

গদি থেকে নিরুপমাদির বাড়িতে পৌঁছতে বেশি সময় লাগে না। ট্যাক্সি ছেড়ে দিয়ে একটা তিনতলা বাড়িতে ঢুকলেন নিরুপমাদি। বাইরে অন্ধকার নেমে গিয়েছে। কিন্তু এই বাড়ির সিঁড়িতে আলো নেই।

নিরুপমাদি সামনে হাঁটতে-হাঁটতে বললেন, ‘কোনও ভয় নেই। আমাকে ফলো করো।’ তিনতলার ছাদের দরজার তালা খুলে নিরুপমাদি বললেন, ‘দ্যাখো, আকাশ দ্যাখো।’

নবকুমার ছাদে পা ফেলে ওপরে তাকাল। ঘোলাটে আকাশ। কয়েকটা তারা সেই আকাশে ছড়িয়ে। কিন্তু দৃশ্যটা মোটেই আকর্ষণীয় নয়। এর চেয়ে তাদের গ্রামের আকাশ ঢের বেশি সুন্দর।

ছাদের একপাশে পরপর তিনটে ঘর। তার একটার দরজা খুলে আলো জ্বেলে নিরুপমাদি বললেন, ‘এসো ভাই। বসো।’

‘এটা আপনার বাড়ি?’ নবকুমার একটা বেতের চেয়ারে বসল।

‘দূর। এই বাড়িটার সব তলায় ভাড়াটে ভরতি। আমি ছাদের ওপর এই তিনটে ঘর নিয়ে থাকি। ওপরে বলে বেশ নিরাপদে আছি।

‘আপনি একাই থাকেন?’

‘না গো। আমার এক ছেলে আছে। কলেজে পড়ে। সে আজ গেছে তারকেশ্বরে। মামার বাড়িতে। আমার মা ওখানে ছেলের কাছে থাকেন, ওঁকে নিয়ে আসতে। এখন বলো, কী খাবে? চা কফি না অন্য কিছু। না বললে কিন্তু খুব রাগ করব।’

‘আপনি এত পরিশ্রম করে এসে চা বানাবেন?’

‘ওম্মা! চা বানাতে কষ্ট হয় নাকি? তা ছাড়া, কোনও-কোনও কাজ ছেলেদের কাছে খুব কষ্টের মনে হলেও মেয়েরা আনন্দ পায়।’

নিরুপমাদির কথা শেষ হতেই বাইরে কারও গলা শোনা গেল। জড়িয়ে-জড়িয়ে কিছু বলছে। নিরুপমাদির মুখ শক্ত হল। বললেন, ‘তুমি একটু বসো, আমি আসছি।’

নিরুপমাদি ছাদে পা রাখতেই নবকুমার শুনতে পেল, ‘এই যে, ঘরে কে? কাকে নিয়ে এসেছ? আমি নেই, কিন্তু ছেলে তো আছে। সে কোথায়?’

‘তুমি আবার মদ খেয়ে এই বাড়িতে এসেছ?’ নিরুপমাদি চাপা গলায় বললেন।

‘এক্কেবারে হাত খালি। জীবনের শেষ মদটা আজ খেয়ে ফেলেছি। আর কোনও মদ এখন থেকে গলায় নামবে না। বিশ্বাস করো। তা বাবুটি কে? যাত্রার?’

‘তুমি এখান থেকে চলে যাও!’

‘কেন? আরে লজ্জা পাচ্ছ কেন? এতদিন এখানে-সেখানে লুকিয়ে-চুরিয়ে ফস্টিনস্টি করতে, এখন সোজা ঘরে তুলে এনেছ। তার মানে সাহস বেড়েছে। দাও না, শ’খানেক হলেই হবে। চেয়ে এনে দাও।’

‘তুমি একটি ইতর। ঘরে যে বসে আছে সে আমার ছেলের সমবয়সি। তাকে নোংরা কথা শুনতে দিতে আমি রাজি নই। যাও, বিদায় হও। এক্ষুনি।’

‘যা:। ছেলের বয়সি! কী গুল মারছ? কই দেখি।’ জোরে-জোরে পা ফেলে ঘরে ঢুকে পড়ল লোকটা। তারপর একটা বেতের চেয়ারে শব্দ করে বসে পড়ল। নোংরা পাজামা-পাঞ্জাবি, মুখে পানের দাগ। লোকটা নবকুমারকে ভালো করে দেখে বলল, ‘ও। তাই তো। তা বাবাজীবন, কী করা হয়?’

‘প্রম্পট করি।’

‘বুঝলাম। ওই সূত্রে আলাপ। তুমি তো নিরুপমার ছেলের বয়সি। তাই তো? আমি নিরুপমার ছেলের বাবা। তাহলে তুমিও আমার ছেলের বয়সি। কী, ঠিক বললাম তো? আমার না মাইরি সম্পর্কগুলো কীরকম গুলিয়ে যায়।’

নিরুপমাদি বললেন, ‘এবার তোমাকে যেতে হবে।’

‘যেতে তো হবেই। অমর কে কোথা কবে? বুঝলে হে প্রম্পটার। এই যে আমাকে দেখছ, দেহপট সনে নট সকলি হারায়, আমার অবস্থা এখন তাই। কিন্তু তিরিশ-বত্রিশ বছর আগে বিজ্ঞাপনে আমার ছবির নীচে লেখা হত, সুদর্শন নায়ক এবং গায়ক। আলাদা গাড়ি, রোজ এক টিন সিগারেট, কোলিয়ারিতে গেলে সবচেয়ে ভালো হোটেলের সেরা ঘর—! সব ব্যবস্থা ছিল আমার জন্যে। আমার কোনও প্রম্পটারের দরকার হত না। একবার পড়লেই মুখস্থ হয়ে যেত। একেবারে স্বামী বিবেকানন্দের মতো মেমারি ছিল তখন। সব গেল। বিয়ে করে সর্বনাশ হয়ে গেল ভাই। বিয়ে করেছ? করোনি? বেঁচে গেছ। কখনও করো না।’ হাত নাড়তে লাগল লোকটা। নিরুপমাদি চলে গেলেন পাশের ঘরে।

‘আপনি আর যাত্রায় অভিনয় করেন না?’

‘নো। আমি কি ভিখিরি? বাসে পাঁচজনের সঙ্গে যাব, বারোয়ারি খাবার খাব, তিন মিনিটের একটা পার্ট করব?’

‘এরকম হল কেন?’

‘নেক্সট ডে। আর একদিন বলব। প্রথমদিনেই সব শুনতে চেয়ো না প্রম্পটার। দাও, শ’খানেক হলেই চলে যাবে।’ হাত বাড়াল লোকটা।

‘কী?’

‘একশটা টাকা দাও। ভ্যানতাড়া কোরো না। শোধ দিয়ে দেব। কথা দিচ্ছি।’

‘কিন্তু—।’

‘ধ্যাত। নো কিন্তু। এই যে আমার বউ-এর সঙ্গে নির্জনে আড্ডা মারছ তা কি তোমার দলের লোকজন জানে? জানে না? আমি কথা দিচ্ছি জানবে না। দাও।’

‘আপনি এসব কী বলছেন? উনি আমার দিদির মতো।’

‘মতো? এই ক্যালকাটায় মতো বলে কিছু নেই প্রম্পটার।’ হাত নাচাল লোকটা।

দ্রুত ভেতরের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে নিরুপমাদি বলল, ‘নাও, নিয়ে দূর হও।’

একশো টাকার নোট দেখে হাসি ফুটল লোকটির মুখে। খপ করে সেটা ধরে পকেটে পুরে উঠে দাঁড়াল, ‘মাইরি বলছি, তুমি না এখনও ফাইন অ্যাকটিং করতে পারো। যাচ্ছি বাবা যাচ্ছি।’ দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে লোকটা মাথা ঘোরাল, ‘প্রম্পটার। আর একদিন হবে। তোমার যেদিন গল্পটা শুনতে ইচ্ছে করবে, সেদিন।’

লোকটা চলে গেলে নিরুপমাদি চেয়ারে বসে পড়লেন। বাঁ-হাতে আঁচল টেনে নিয়ে তাতে মুখ ঢাকলেন। সামান্য ফোঁপানির শব্দ শুনতে পেল নবকুমার। মিনিটদুয়েক পরে আঁচল সরিয়ে চোখ মুছলেন নিরুপমাদি, ‘বিশ্বাস করো, ও যে আজ এখানে আসবে আমি ভাবতে পারিনি।’

‘উনি কোথায় থাকেন?’

‘কাশীপুর না কোথায়, আমি ঠিক জানি না।’

‘প্রায়ই টাকার জন্যে আসেন?’

‘প্রায়ই। তবে কখনও গদিতে গিয়ে বিরক্ত করে না। আবার বাড়িতে ছেলে আছে জানলে কখনও ওপরে ওঠে না। কী করে যে জানতে পেরে যায়।’

‘এরকম হল কেন?’

‘অনেক গল্প। আচ্ছা বলো তো, অমৃত কখন বিষ হয়ে যায়?’

বুঝতে পারল না নবকুমার। শ্বাস নিলেন নিরুপমাদি, ‘ভালোবাসলে। থাক এসব কথা। এতক্ষণ বসে আছ, অথচ কিছুই খেতে দিতে পারিনি তোমাকে। আর একটু বসো ভাই।’ নিরুপমাদি ভেতরে চলে গেলেন।

কথাটা মাথায় ঢুকে আর বেরুচ্ছিল না নবকুমারের। ভালোবাসলে অমৃত বিষ হয়ে যায়? কেন? ভালোবাসলে বিষ কি কখনও অমৃত হয়ে উঠে না?

‘নাও।’

দুটো সন্দেশ, এক গ্লাস শরবত সামনে রাখলেন নিরুপমাদি।

‘আপনি খাবেন না?’

‘একবারে রাত্রে খাব।’

সন্দেশ মুখে পুরল নবকুমার। কলিকাতার মিষ্টি গ্রামের থেকে শতগুণে ভালো। চিবুতে পরম তৃপ্তি জাগে।

‘তোমাকে যে জন্যে এত কষ্ট দিলাম—!’

‘হ্যাঁ বলুন।’ শরবতে চুমুক দিল নবকুমার।

‘বড়বাবু তো তোমাকে খুব পছন্দ করেন, সবাই বলছিল।’

হাঁ হয়ে গেল নবকুমার। কোনওমতে বলল, ‘আমি জানি না।’

‘দলের সবাই বলে। সত্যি কথাটা বলবে ভাই? আমাদের ঘরে কি কোনও বড় অভিনেত্রী আসছে, যে মায়ের পার্ট করবে?’ কাতর চোখে তাকালেন নিরুপমাদি?

সঙ্গে-সঙ্গে বড়বাবুর মুখ মনে পড়ল। তিনি নিষেধ করেছেন কাউকে কিছু বলতে। কলিকাতায় বাস করতে হলে মিথ্যে বলতে জানতে হয়। সে মাথা নাড়ল, ‘আমি তো কিছু জানি না। সুধাময়বাবু—!’

‘না! উনিও জানেন না। মাস্টার কথাটা রটাচ্ছে।’ হাসলেন নিরুপমাদি, ‘তুমি যখন কিছু জানো না তখন খবরটা সত্যি নয়।’

‘মাস্টারদা বলেছেন?’

‘ওইভাবে কী বলে? এই যেমন, তোমার বারোটা বেজে গেল। দলে নতুন মা আসছেন। কে তিনি জিজ্ঞাসা করলে, চোখ ঘোরায়, কী জানি!’

‘নতুন কেউ এলে আপনার বারোটা বাজবে কেন?’

‘বা রে! আমি তখন কী চরিত্র করব? আমাকে তো নায়িকা, বউদি এসব চরিত্রে মানাবে না। এখন সব দলে কাস্টিং হয়ে গেছে। এখানকার চাকরি চলে গেলে কোথাও কাজ পাব না। রোজগার বন্ধ হয়ে যাবে যে।’ নিরুপমাদি বললেন, ‘তার ওপর তো একটা অজুহাত আছেই।’

‘অজুহাত।’

‘ওই যে, আমি কানে কম শুনি! আমি নিজে বুঝতে পারি না। সত্যি বলো তো, তোমার কী মনে হয়? কম শুনি?’

‘আপনি তো বলেছেন একটু জোরে প্রম্পট করতে।’

‘ওই জন্যেই তো তোমাকে ডেকেছি।’

‘মানে?’

‘তুমি যদি শুধু আমারটা জোরে বলো তাহলে অন্যদের বুঝতে অসুবিধা হবে না যে আমি কানে কম শুনি। তোমাকে তাই সাহায্য করতে হবে।’

‘কীভাবে?’

‘পুরো নাটকটায় আমি বড়জোর পনেরো ষোলো মিনিট স্টেজে থাকব। তুমি তোমার বুক পকেটে একটা সেল ফোন রাখবে। যখনই আমার সংলাপ আসবে তখনই ফোন অন করে কথা বলবে। আমি আমার বুকের মধ্যে আর-একটা সেল ফোন রাখব। কর্ডলেশ রিসিভার কানে গুঁজে রাখলে কেউ বাইরে থেকে দেখতে পাবে না। আমার সংলাপগুলো তুমি বললে আমি স্পষ্ট শুনতে পাব। এতে একটু খরচ হবে। তা ধরো পার শো কুড়ি টাকা। কিন্তু কেউ টের পাবে না। এটুকু আমার জন্যে করবে না ভাই?’

‘কিন্তু যদি ভুল হয়ে যায়?’

‘রিহার্সাল দিয়ে নিলে ভুল হবে না। কিন্তু মনে রেখো, গদিতে রিহার্সাল যখন দেব তখন যেন কেউ টের না পায় ব্যাপারটা।’

হেসে ফেলল নবকুমার, ‘ঠিক আছে। এটুকু করতেই পারি। আজ আমি উঠি। অনেক দূরে যেতে হবে।’

‘যেতে হবে মানে? আমি তো তোমাকে পৌঁছে দেব বলেছি।’

‘না-না। তার দরকার নেই।’

দরজায় তালা দিয়ে নিরুপমাদি নবকুমারকে নিয়ে একতলায় নামতেই দেখলেন, তাঁর ছেলে মাকে নিয়ে বাড়ি ফিরছে। নবকুমারের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলেন তিনি। ছেলে জিজ্ঞাসা করল, ‘উনি এরমধ্যে খেয়ে নিয়েছেন?’

‘নারে। মিষ্টি ছাড়া কিছু খেল না।’

‘তুমি তো ওর জন্যে রান্না করেছিলে—।’

‘আর একদিন খাবে। তুই এক কাজ কর, ও রাস্তাঘাট চেনে না। ওকে আমাদের যাত্রার গদি পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে আয়।’

‘বেশ তো। চলুন।’

নিরুপমাদির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে কয়েক পা হাঁটার পর নবকুমার বলল, ‘আপনি আমাকে একটা ট্রামে তুলে দিন। তাহলেই হবে।

‘মা যে বলল—!’

‘ট্রামে উঠলে আমার সুবিধে হবে।’ যাত্রার গদি ছাড়িয়ে সোনাগাছির গলির মুখে ছেলেটির সঙ্গে নামতে চাইল না নবকুমার।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *