সাতাশ
নবকুমার দেখল, সেই ভদ্রলোক তার কাছে এগিয়ে এলেন। পকেট থেকে একটা কার্ড বের করে বললেন, ‘এটা তোমার কাছে রাখো।’
নবকুমার কার্ডটা নিল। গীতিময় ঘোষ। ফিল্ম ডিরেক্টার। নীচে ল্যান্ড এবং মোবাইল ফোনের নাম্বার।
‘তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ, আমরা কী নিয়ে আলোচনা করছিলাম?’
মাথা নাড়ল নবকুমার, ‘না।’
‘মাই গড!’ ভদ্রলোক নবকুমারকে একটু দেখলেন, ‘অবশ্য এইটে একদিক দিয়ে ভালো। শহরের চালিয়াত ছেলে আমি চাই না। তোমাকে একটু ঘষেমেজে নিতে হবে, এই যা। শোনো, পরশু সকাল দশটায় তুমি আমাকে মোবাইলে ফোন করবে।’
‘কেন?’
‘কেন! তুমি কাজ খুঁজতে গ্রাম থেকে এসেছ। প্রম্পটারের কাজের চেয়ে ঢের ভালো একটা কাজের জন্যে তোমাকে ইন্টারভিউ দিতে হবে, বুঝেছ?’
‘আপনি কি আমাকে অভিনয় করতে বলবেন?’
‘হ্যাঁ। এতক্ষণে বুঝেছ দেখছি।’ হাসলেন গীতিময় ঘোষ।
‘আমি পারব না।’
‘পারবে না মানে?’
‘আমি কখনও করিনি। আমার ইচ্ছেও নেই।’
‘অ। যাত্রায় প্রম্পট করতে পারবে আর সিনেমায় অভিনয় করতে পারবে না। হাজার-হাজার ছেলে এরকম সুযোগ পাওয়ার জন্যে মুখিয়ে আছে। আমি বললেই এসে লাইন দেবে তারা? তুমি সিনেমা দ্যাখো না?’
‘দেখি।’
‘দেখে অভিনয় করতে ইচ্ছে করে না?’
‘না। কারণ আমি জানি, করতে পারব না।’
গীতিময় বললেন, ‘ঠিক আছে। তোমাকে অভিনয় করতে হবে না। ওটা আমি বুঝে নেব। তুমি যেমন কথা বলো তেমনি বলবে। মঙ্গলবারে ফোন করবে মনে করে। শুনলে তো, বড়বাবু সিডি দেখতে চেয়েছেন।’
ট্রাম রাস্তায় এসে নবকুমারের মনে পড়ল, নিরুপমাদি বলেছিলেন ওঁর বাড়িতে যেতে। রাত্রের খাওয়া খেয়ে আসতে। কিন্তু মুক্তোকে কিছুই বলা হয়নি। সে নিশ্চয়ই তার জন্যে রান্না করেছে। না খেলে শেফালি-মাকে বলবে যে, নবকুমারের জন্যে খাবার নষ্ট হয়েছে। তা ছাড়া, বাগবাজার কতদূরে তা তার জানা নেই। সেখান থেকে রাত্রের খাবার খেয়ে বাড়ি ফিরতে যদি বেশি রাত হয়ে যায়, তাহলে সোনাগাছির রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফিরতে মুশকিলে পড়তে হবে। রাত ন’টার পর থেকেই তো পুলিশ লোকজনকে হয়রান করতে শুরু করে। তাছাড়া, হঠাৎ নিরুপমাদি তাকে খাওয়াতে চাইল কেন? নিরুপমাদি দলে মায়ের ভূমিকায় অভিনয় করে। রিহার্সালে ওর সংলাপগুলো একটু জোরে বলতে হয়। কারণ, সুধাকান্তবাবু বলেছেন ইদানীং নাকি কানে কম শুনছেন নিরুপমাদি। শেফালি-মা যদি দলে আসেন তাহলে মায়ের চরিত্র পাবেন না নিরুপমাদি। উনি কি কোনও আঁচ পেয়ে খবরটা জানার জন্যে তাকে নেমন্তন্ন করেছেন?
নবকুমার স্থির করল সে বাগবাজারে যাবে না। কাল নিরুপমাদি জিজ্ঞাসা করলে বানিয়ে কিছু বলতে হবে। মিথ্যে কথা বলতে তার খুব অস্বস্তি হয়। কিন্তু এখনও অনেক সময় আছে, তাই ভেবেচিন্তে বাহানাটা ভালো করে বানিয়ে নিতে হবে।
ট্রাম থেকে নেমে সোনাগাছিতে ঢুকল নবকুমার। চিৎকার, চেঁচামেচি, গান, হাসি যেমন রোজ চলে তেমনি চলছে সন্ধ্যার পরে। সে মুখ নীচু করে হাঁটছিল। হাঁটতে-হাঁটতে ইতিদের বাড়ির সামনে দিয়ে আসার সময় অসতর্কভাবেই চোখ তুলল সে। চার-পাঁচটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেজেগুজে। তাদের পাশে দুটো বিশ্রী চেহারার ছেলে। ছেলেদুটোর চাউনি ভালো লাগল না। মুখ ফিরিয়ে একটু দ্রুত পা চালাল নবকুমার। কিছু দূরে যেতে-না-যেতে তার কাঁধে হাত পড়তেই সে ঘুরে দাঁড়াল। ওরা তার সামনে দাঁড়িয়ে দেখছে। যে হাত রেখেছিল, সে জিজ্ঞাসা করল, ‘কীরে? তুই তোর বাপের বাসি বিয়ে দেখতে চাস?’
‘কী বলছেন আপনি?’ নবকুমার চেঁচিয়ে উঠতেই আশেপাশের মেয়েরা এদিকে তাকাল। কেউ-কেউ ঢুকে গেল বাড়ির ভেতরে।
‘কী বলছি? শালা পকেটখালির জমিদার, সোনাগাছির মেয়েমানুষের সঙ্গে মাগনায় প্রেম মাড়াতে এসেছিস? মুখ খোল শালা!’ দ্বিতীয়জন বলল।
‘আপনারা কী বলতে চাইছেন, বুঝতে পারছি না।’
‘মেয়েমানুষটার অসুখ হয়েছে তো তোর কী! দুব্বারের কাছে খবরটা দিতে গেলি কেন? ও তোর বউ?’
‘একটা মানুষ অসুস্থ, তার চিকিৎসা হওয়ার দরকার, তাই—!’
কথা শেষ করার আগে ছেলেটা ঘুষি ছুড়ল নবকুমারের মুখ লক্ষ করে। কোনওরকমে মাথা সরিয়ে নিজেকে বাঁচাতে পারল নবকুমার। এবার দ্বিতীয় ছেলেটা তাকে সজোরে লাথি মারতে সে তাল সামলাতে না পেরে পড়ে গেল মাটিতে।
সঙ্গে-সঙ্গে প্রথম ছেলেটা ওর বুকের ওপর জুতো তুলে দিয়ে বলল, ‘যা করেছিস তার জন্যে তোকে পাঁচ হাজার টাকা দিতে হবে। কবে দিবি?’
ওঠার চেষ্টা করেও পারল না নবকুমার। মাথা নেড়ে বলল, ‘আমার কাছে অত টাকা নেই।’
সঙ্গে-সঙ্গে জামার কলার ধরে ওকে দাঁড় করিয়ে প্রথম ছেলেটা দ্বিতীয়কে বলল, ‘শালাকে ন্যাংটো কর। সোনাগাছির মেয়েমানুষরা দেখুক ওকে। আমাদের জিনিসে হাত দিলে কী হয় তা ওকে বুঝিয়ে দে।’
দ্বিতীয় ছেলেটা হ্যা-হ্যা করে হেসে নবকুমারের প্যান্টের দিকে হাত বাড়াতে সে শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে তাকে আঘাত করল।
‘আই বাপ’ বলে ছেলেটা মুখে হাত দিল, ‘গুরু! রক্ত বের করে দিয়েছে!’ বলেই ঝাঁপিয়ে পড়ল নবকুমারের ওপর। প্রথম ছেলেটাও হাত-পা চালাতে লাগল। মাটিতে পড়ে যেতে-যেতে নবকুমার শুনল কারা যেন চিৎকার করছে।
ছেলেদুটো থমকে গেল। যেখানে যত মেয়ে দাঁড়িয়েছিল, সবাই চিৎকার করে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। তারপরেই ছুটে এল ওদের কয়েকজন। দেখাদেখি অন্য মেয়েরাও এগিয়ে এল। মুহূর্তেই ছেলেদুটোকে মাটিতে ফেলে বেধড়ক মারতে লাগল মেয়েরা। নবকুমার কবিতাকে দেখতে পেল, ‘উঠতে পারবে? খুব লেগেছে?’
নবকুমার উঠে দাঁড়াল। কবিতা মেয়েদের থামাল। ছেলেদুটোর জামা প্যান্ট ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। একটা মেয়ে ওদের বলল, ‘ক্ষমা চা। ওর পায়ে ধরে বল আর করবি না। বল।’
রক্তাক্ত ছেলেদুটো কোনওমতে উঠে দাঁড়িয়ে হাতজোড় করল।
কবিতা জিজ্ঞাসা করল, ‘বাড়িতে হেঁটে যেতে পারবে?’
নবকুমার মাথা নাড়ল।
হাঁটতে গিয়ে নবকুমারের মনে হল, এক দৌড়ে এইসব মানুষদের চোখের আড়ালে চলে যেতে। এই যে ওরা তাকে মার খেতে দেখল, মাটিতে পড়ে যাওয়ার পর লাথি খেতে দেখল, কেউ-না-কেউ নিশ্চয়ই ভেবেছে সে কোনও অন্যায় করেছিল বলে ছেলেদুটো তাকে মারল। কী করে সে সবাইকে বলবে যে একটি মেয়ে তার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেছিল এবং তার অসুস্থতার কথা জেনে সে চিকিৎসার জন্যে মহিলা দুর্বার সমিতির কাছে নিয়ে গিয়েছিল। এই অপরাধে গুন্ডারা তাকে মারবে?
লজ্জা, আফসোস এবং সঙ্কোচে মাথা নীচু করে হাঁটতে গিয়ে শরীরের যন্ত্রণা উপেক্ষা করছিল নবকুমার। কিছুক্ষণ হাঁটার পর তার খেয়াল হল চারপাশের পরিবেশ এখন একদম স্বাভাবিক। সেই চেঁচামেচি, গান, ‘বেলফুল চাই’ হাঁক, হাসির আওয়াজ এখন রাস্তার দু-ধারে। কেউ তার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়েও নেই। অর্থাৎ একটু আগে যে ঘটনাটা ঘটেছিল তার কোনও প্রতিক্রিয়া এখানে পৌঁছয়নি। নবকুমারের মনে হল কলিকাতা এক আজব শহর। এই শহরে স্নেহ যেমন আছে তেমনি অকারণ নিষ্ঠুরতা প্রচণ্ড। আবার উদাসীন মানুষের সংখ্যাও কম নয়।
ওকে দেখে দরজায় দাঁড়ানো মেয়েরা সরে গিয়ে রাস্তা করে দিতেই একজন চেঁচিয়ে উঠল, ‘এম্মা! কী হয়েছে?’
চিৎকারটা এমন আচমকা যে নবকুমার দাঁড়িয়ে গেল। সঙ্গে-সঙ্গে মেয়েরা ভিড় করে এল তার চারপাশে। মুখ ফুলে গিয়েছে কেন, শার্ট প্যান্টে এত ময়লা লাগল কী করে, ইত্যাদি প্রশ্ন বেরিয়ে আসতে লাগল বিভিন্ন মুখ থেকে। নবকুমার নীচু গলায় বলল, ‘কিছু হয়নি।’
‘হয়নি মানে? নিশ্চয়ই কেউ মেরেছে। কে মারল? এই, রতনদাকে ডাক তো! তোমাকে মারবে আর আমরা চুপ করে বসে থাকব?’
নবকুমারের মনে হচ্ছিল, লজ্জায় তার মাথা কাটা যাচ্ছে। কিন্তু এই মেয়েদের ভিড় সরিয়ে সে কী করে যাবে।
ইতিমধ্যে পেটানো শরীর, লুঙ্গি আর পাঞ্জাবি পরা একজন হাজির হয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘কী হয়েছে?’
মেয়েরা যে যা পারল তা বোঝাল।
লোকটা জিজ্ঞাসা করল, ‘তোমাকে কি এ-পাড়ার কেউ মেরেছে?’
নবকুমার তাকাল। মনে হল এই লোকটাও গুন্ডা। গুন্ডাদের হাতে মার খেয়ে সে গুন্ডার সাহায্য নেবে?
নবকুমার মাথা নাড়ল, ‘না। মার খাইনি। পড়ে গিয়েছিলাম।’
‘অ। তাহলে আমার কিছু করার নেই।’ লোকটা ঘুরে দাঁড়াল।
‘ওপরে উঠে এসো। এ্যাই, ওকে রাস্তা দে।’
সিঁড়ির ওপর থেকে চেঁচিয়ে হুকুম করল মুক্তো।
এবার মেয়েরা সরে গেল। ধীরে-ধীরে ওপরে উঠে প্যাসেজ দিয়ে নিজের ঘরে চলে এল নবকুমার। মুক্তো পিছনে এল।
‘কী হয়েছে?’
‘কিছু না।’
‘ন্যাকামি করো না। মুখে ঘুষো মেরেছে কে?’
‘বলছি তো কিছু হয়নি।’
মুক্তো চলে গেল। তাড়াতাড়ি বাথরুমে ঢুকে জামাপ্যান্ট বদলে ফেলল নবকুমার। মুখে জল দিতে চিড়বিড় করে উঠল একটা জায়গা। সন্তর্পনে মুখ মুছে বাইরে বেরিয়ে আসতেই হতভম্ব হয়ে গেল।
শেফালি-মা দরজায় দাঁড়িয়ে। পিছনে মুক্তো।
‘তুমি মারামারি করেছ এটা আমি ভাবতে পারছি না।’
মাথা নামাল নবকুমার, ‘আমি মারামারি করিনি।’
‘ওরা তোমাকে মারল কেন?’
‘একটি অসুস্থ মেয়েকে সাহায্য করার জন্যে আমি মহিলা দুর্বার সমিতিকে বলেছিলাম। ওঁরা সাহায্য করেছিলেন। এটাই নাকি অপরাধ।’
‘তোমার এত বনের মোষ তাড়ানোর শখ কেন? দুর্গা কষ্ট পাচ্ছে, তাকে নিয়ে ছুটলে সাহায্য করতে। এই মেয়েটা—কে মেয়েটা? চিনলে কী করে?’
‘একদিন কথা বলেছিল।’
‘বা:! না। তোমার এখানে থাকা চলবে না।’
শুনে অসহায় চোখে তাকাল নবকুমার।
‘তুমি যদি সোনাগাছিতে থেকে পরের উপকারের জন্যে নিজের কাঁধ এগিয়ে দাও তাহলে আজ মুখ ফেটেছে, কাল খুন হয়ে যাবে। তার চেয়ে এখান থেকে বিদায় হও, আমি বেঁচে যাই।’
‘একটা কথা জিজ্ঞাসা করব?’
‘যা ইচ্ছে করো। আজ তোমার এখানে শেষ রাত।’
‘সোনাগাছির বাইরে গিয়ে যদি কারও উপকার কেউ করে তাহলে তাকে কেউ মারধোর করে না?’ নবকুমার তাকাল।
চমকে গেলেন শেফালি-মা। কয়েক সেকেন্ড চুপ করে মুক্তোর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এক বাটি গরম জল আর তুলো নিয়ে আয়। আমার টেবিলে ডেটল, ক্রিম আর ব্যান্ডেজ আছে। ওগুলোও আনবি।’
নবকুমার মাথা নীচু করে দাঁড়িয়েছিল। শেফালি-মা বললেন, ‘বসো। কবিতা ফোন করে বলল। ওর মনে হয়েছে, তুমি খুব আহত হয়ে থাকতে পার।’
‘আমি ভাবতে পারিনি এইজন্যে কেউ কাউকে মারতে পারে।’
‘এই শহরের নাম কলকাতা। এখানে পাঁচ পয়সার জন্যে ঝগড়া শুরু হলে যে কেউ খুন হয়ে যায়। খুব কষ্ট হচ্ছে?’
‘একটু—।’
‘তাহলে শুয়ে পড়ো।’
‘না, ঠিক আছে।’
‘যা বলছি তাই শোনো। কথার অবাধ্য হলে আমার খুব রাগ হয়।’
শোওয়ার পর মনে পড়ল নবকুমারের। সে বলল, ‘আজ বড়বাবুর সঙ্গে কথা হয়েছে। উনি আপনার সঙ্গে—।’
‘একদম ওসব কথা এখন বলবে না। কাল সকালে সব শুনব।’
মুক্তো জল তুলো ওষুধ নিয়ে এল। পাশে বসে শেফালি-মা খুব যত্ন করে গরম জলে ক্ষত ধুয়ে ওষুধ লাগিয়ে ব্যান্ডেজ লাগিয়ে দিচ্ছিলেন।
ব্যথা ভুলে গেল নবকুমার। আচমকা বঙ্কিমচন্দ্রের কথাগুলো মনে পড়ে গেল তার, ‘আত্মোপকারীকে বনবাসে বিসর্জন করা যাহাদিগের প্রকৃতি, তাহারা চিরকাল আত্মোপকারীকে বনবাস দিবে—কিন্তু যতবার বনবাসিত করুক না কেন, পরের কাষ্ঠাহরণ করা যাহার স্বভাব, সে পুনর্বার পরের কাষ্ঠাহরণে যাইবে। তুমি অধম—তাই বলিয়া আমি উত্তম না হইব কেন?’
