ছাব্বিশ
দ্রুত খাওয়া শেষ করে নবকুমার উঠে দাঁড়াল। হাত ধোওয়া দরকার। গ্লাসের জল প্লেটে ফেলে হাত ধুতে সঙ্কোচ হচ্ছিল। সে চারপাশে তাকাল। বড়বাবু বা তাঁর মেয়ে বারান্দায় না থাকায় কয়েক সেকেন্ড বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইল। এরা কেমন মানুষ? কাউকে খেতে দিয়ে সামনে থেকে চলে গেল?
নবকুমার এগোল। নিশ্চয়ই হাত ধোওয়ার কল কাছাকাছি কোথাও আছে। লম্বা বারান্দা দিয়ে অনেকটা চলে এল সে। সব ঘরের দরজা ভেতর থেকে ভেজানো। বড়বাবু যে বিশাল বড়লোক তা বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে না। এত বড়লোক কেন যাত্রাদল চালাচ্ছেন? ওঁর তো উচিত অনেক বড়-বড় ব্যাবসা করা।
‘কী চাই? কে তুমি? কী উদ্দেশ্যে বিচরণ করছ এখানে?’
প্রশ্ন তিনটে যিনি করলেন তাঁর গলার স্বর খনখনে। একেবারে শেষের ঘরের দরজায় দাঁড়ানো লোকটি যেমন রোগা তেমন অদ্ভুত পোশাক পরা। পোশাকটার নাম হয়তো আলখাল্লা কিন্তু তাতে প্রচুর জরির কাজ। এখন একটু বিবর্ণ। মানুষটি বেশ বৃদ্ধ এবং সাদা দাড়ি ছুঁচলো হয়ে বুকে নেতিয়ে রয়েছে। চোখে মোটা কাচের চশমা।
নবকুমার বলল, ‘আজ্ঞে, হাত ধোব।’
‘হাত? এই শহরের কোথাও কি হাত ধোওয়ার ব্যবস্থা ছিল না যে আমার দরজায় এসে দাঁড়িয়েছ? তার চেয়ে সত্যি কথা বলে ফেলো।’
‘আমি সত্যি কথাই বলছি।’
‘আমি যদি বলি তুমি একটি তস্কর তাহলে আমাকে মিথ্যে প্রমাণ করতে পারবে?’
‘তস্কর? আমি? না-না। বড়বাবু আমাকে এখানে আসতে বলেছিলেন।’
‘বড়বাবু? হা-হা-হা! এই প্রাসাদে আমি তোমাকে নেমন্তন্ন করেছি?’
‘আজ্ঞে আপনি নন, বড়বাবু—।’
‘আমি ছাড়া এই প্রাসাদে আর কোনও বড়বাবু থাকতে পারে না। আমি একমেবাদ্বিতীয়ম! আমার বয়স কত তুমি জানো?’
‘আজ্ঞে না।’
‘নাইনটি ফোর। ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড ওয়ারের আগে জন্মেছি।’
‘আজ্ঞে, বড়বাবু মানে যিনি আমাদের যাত্রাদলের মালিক—।’
‘চোপ। আবার মিথ্যে কথা। নাম কী?’
‘আজ্ঞে নবকুমার।’
‘অ্যাঁ? তাই নাকি? বঙ্কিমবাবু রেখেছিলেন?’
‘বঙ্কিমবাবু? মানে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়?’
সঙ্গে-সঙ্গে বৃদ্ধ ভেতরে চলে গেলেন। ঘরের ভেতরটা ভালো দেখা যাচ্ছিল না। গলা ভেসে এল, ‘কাম। কাম ইনসাইড।’
নবকুমার ঘরে ঢুকল। সবক’টা জানলা বন্ধ। ঘরে ছ’টা বিশাল কাঠের আলমারি ছাড়া একটি পালঙ্কের ওপর মোটা গদির বিছানা। বেঁটে-বেঁটে কয়েকটা টুল রয়েছে। পালঙ্কের পাশে।
‘ওইখানে জল আছে। বেসিনে হাত ধোবে। তারপর সোপকেস থেকে সাবান তুলে হাতে মাখবে। সেই সাবানহাত ভালো করে ধোবে। ধুয়ে নিয়ে সাবানটাকে একটু সময় কলের জলে রেখে সোপকেসে ফিরিয়ে দেবে। দুবার বলতে পারব না।’ বলেই শব্দ করে হাসলেন, ‘মানুষ, এত বুদ্ধু যে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে ভাবে কাজ হয়ে গেল। সাবানটাকে পরিষ্কার করার কোনও দায়িত্ব যেন তার নেই। হুঁ:!’
বৃদ্ধ যা আদেশ করল তা মান্য করল নবকুমার। হাত এবং মুখ ধোওয়ার পর স্বস্তি হল। কিন্তু এই বুড়ো কে? বড়বাবুর বাড়িতে থেকেও তাঁকে অস্বীকার করছেন?
‘ইট ওয়াজ নাইনটিন থার্টি, আমি প্রথম বঙ্কিমচন্দ্র পড়েছিলাম। আনন্দমঠ। এগারোশো ছিয়াত্তর সালে গ্রীষ্মকালে একদিন পদচিহ্ন গ্রামে রৌদ্রের উত্তাপ বড় প্রবল। গ্রামখানি গৃহময় কিন্তু লোক দেখি না—। ব্যস। আমার যাত্রা শুরু হয়ে গেল।’
বৃদ্ধ পালঙ্কে বসে তাঁর সাদা দাড়িতে আঙুল বোলাতে লাগলেন চোখ বন্ধ করে। কয়েক সেকেন্ড চলে গেল। নবকুমারের মনে হল, উনি সেই সময়ে চলে গেছেন।
‘অথচ দ্যাখো, আমি এখন হাঁটতে পারি না। সিঁড়ি ভাঙতে পারি না। মানুষকে সারাজীবন কার সঙ্গে লড়াই করত হয় বলো তো?’ তাকালেন বৃদ্ধ।
‘কত রকমের সমস্যা—।’
‘কিস্যু জানো না। প্রত্যেক মানুষকে যুদ্ধ করতে হয় তার শরীরের সঙ্গে। সবসময়। এক-একটা জায়গা বিদ্রোহ করে আর ডাক্তারের সাহায্যে সেই বিদ্রোহ দমন করার চেষ্টা হয়। আমার হাঁটুদুটো বিদ্রোহ করে জিতে গিয়েছে। চোখ জিতে যেতে পারে যে-কোনওদিন। কিন্তু আমার স্মৃতিশক্তি এখনও আমার বশে আছে। এবার বলো, আমি কে?’ বৃদ্ধ খুব গম্ভীর।
‘আমি ঠিক—?’
‘আমি বড়বাবু। এ-বাড়ির বড়বাবু। আনন্দমঠ যাত্রা কোম্পানির বড়বাবু। সে একটা সময় ছিল যখন চিৎপুর মানেই আমি। তখন ওই ফিলিমের পুতুলগুলোকে চিৎপুরে ঢুকতে দেওয়া হত না। দশ হাজার লোক মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে পালা শুনত কোনও মাইকের সাহায্য ছাড়াই। তুমি যাকে বড়বাবু বলে ভেবেছিলে, তার গর্ভধারিণী হলেন আমার স্বর্গীয়া পত্নী। বুঝেছ?’
‘হ্যাঁ।’ এবার ধাতস্থ হল নবকুমার। নীচু হয়ে প্রণাম করতে গেল সে।
‘নো-নো। আগে কর্তব্য করো, তারপর প্রণাম করবে। শোনো হে নবকুমার, প্রণাম করতেও যোগ্যতা অর্জÇন করতে হয়।’
‘আপনি বলুন কী করতে হবে আমাকে?’
‘আমি বন্দি। সম্রাট শাজাহানের মতো এই দুর্গে বন্দি করে রেখেছে আমার উদ্ধত পুত্র ঔরঙ্গজেব। তুমি আমাকে মুক্ত করো।’
‘কীভাবে? মানে—’
‘সেটাও আমাকে বলে দিতে হবে? প্রম্পটার ছাড়া কী তোমরা এক সেকেন্ড কথা বলতে পারো না? কী অবনতি!’
‘আপনি যদি বাইরে যেতে চান তাহলে আমি বড়বাবুকে, না, মানে, আপনার ছেলেকে বলতে পারি।’ নবকুমার বলল।
‘সে আমাকে বের করতে চায় কাঁধে চড়িয়ে। ওকে বললে তুমি বিতাড়িত হবে। তুমি কী করো নবকুমার?’
‘আমি এতকাল গ্রামে ছিলাম। কোনওদিন কলিকাতায় আসিনি। এই ক’দিন হল চাকরির সন্ধানে কলিকাতায় এসে আপনার ছেলের যাত্রাদলে প্রম্পটারের চাকরিতে লেগেছি।’ নবকুমার বলল।
‘কী বললে? কলিকাতা বললে না?’
‘আজ্ঞে ওই নাম গ্রামে সবাই বলে। আমারও অভ্যেস হয়ে গিয়েছে।’
‘ও:! অনেকদিন পরে সঠিক নামটা শুনলাম। কান জুড়িয়ে গেল। একেবারে আসল নাম বলেছ তুমি। সুতানুটি, গোবিন্দপুর আর কলিকাতা। আহা, কলিকাতা কমলালয়। যাও, তোমার সব অপরাধ মার্জনা করে দিলাম।’ হাত তুলে আশীর্বাদের ভঙ্গি করলেন বৃদ্ধ।
‘তাহলে আপনিই প্রথম যাত্রা দল তৈরি করেছিলেন।’
‘ইয়েস। বাপের জলে ধোওয়া টাকা ছিল। এই প্রাসাদ, বাগান, যাত্রাদল সব ওই টাকায়। আমি যদি সব উড়িয়ে দিতাম তাহলে কি ও এত ফুটুনি মারতে পারত?’
‘জলে ধোওয়া টাকা মানে?’
‘জাহাজ ডুবি হয়েছিল ডায়মন্ড হারবারে। ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড ওয়ারের সময়। প্যাসেঞ্জারদের বাঁচাতেই হিমসিম খেয়ে গিয়েছিল গবমেন্ট। ডুবে যাওয়া জাহাজের পেট থেকে ডুবুরি লাগিয়ে পাঁচ বস্তা রাত্রের অন্ধকারে ডাঙায় নিয়ে এসেছিলেন আমার পিতৃদেব। সেই বস্তায় ছিল লন্ডনে ছাপা টাকার নোট। কয়েকদিন ধরে সেগুলো লুকিয়ে বেচে পাঁচ লাখপতি হয়ে যান তিনি। অবস্থা বদলে গেল আমাদের!’
‘পুলিশ কিছু বলেনি?’
‘তখন তো কলিকাতা থেকে মানুষ পালাচ্ছে। বোমার ভয়ে। কে কাকে ধরবে? হা-হা-হা! কিন্তু এসব গপ্পো শুনে কী হবে? আমার মুক্তির কী ব্যবস্থা করলে?’
‘আপনি কোথায় যেতে চান?’
‘চিৎপুরে। গিয়ে গদিটাতে আগুন ধরিয়ে দিতে চাই।’
‘কেন?’
‘কেন? তুমি আমাকে জিজ্ঞাসা করছ, কেন? ওখানে কি যাত্রা হচ্ছে? ফস্টিনস্টি হচ্ছে। যাত্রার নামে মিনমিনে গলায় ভ্রষ্টাচার হচ্ছে। আমি শিব তৈরি করতে চেয়েছিলাম আর ঔরঙ্গজেব সেটাকে বাঁদর তৈরি করছে। নিয়ে যাবে?’
‘আপনাকে বড়বাবু নীচে ডাকছেন।’
নবকুমার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল, একজন কাজের লোক দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে।
‘অ্যাই হারামজাদা! তোকে হাজারবার বলেছি আমি ছাড়া এই বাড়িতে আর কোনও বড়বাবু নেই! কানে যায় না, না? দূর করে দেব এখান থেকে।’ খেঁকিয়ে উঠলেন বৃদ্ধ।
‘আমি তাহলে যাই?’
‘যাবে? না। এই, তুই এখান থেকে দূর হ। ও একটু পরে যাবে।’
লোকটি চলে গেলে শিশুর মতো হাসলেন বৃদ্ধ, ‘এই যে তুমি আদেশ শোনামাত্র গেলে না, এতে কার জয় হল? ওর না আমার?’
‘আপনার।’
‘ঠিক। তোমাকে আমার ভালো লেগেছে। দাঁড়াও।’
বৃদ্ধ উঠে একটা আলমারি খুললেন। তারপর খানিকক্ষণ দেখে নিয়ে কাছে এলেন, ‘এটি তোমাকে দিলাম। মহামূল্যবান টাকা।’
হাতে নিয়ে অবাক হয়ে গেল নবকুমার। দুই ইঞ্চি চওড়া, আড়াই ইঞ্চি লম্বা একটা এক টাকার ঈষৎ বিবর্ণ নোট। এরকম নোট সে কোনওদিন দ্যাখোনি।
বৃদ্ধ বললেন, ‘লন্ডনে ছাপা। সেই বস্তায় ছিল। তখন টাকা আসত চেক বই-এর মতো। চেক ছেঁড়ার মতো বই থেকে ছিঁড়ে জিনিস কিনতে হত। এই টাকা সাধারণ মানুষ নেবে না। কিন্তু পুরোনো জিনিস যারা সংগ্রহ করে, তারা অনেক দাম দিয়ে কিনতে চাইবে। নবকুমার, আমি মরার আগে তুমি এটা বিক্রি করো না। দাও। খামে ভরে দিচ্ছি।’
বৃদ্ধকে প্রণাম করে খামটা পকেটে নিয়ে বেরিয়ে এল নবকুমার। মনে হচ্ছিল মহামূল্যবান সম্পদ তার পকেটে।
.
বড়বাবু একা নন, আর একজন মধ্যবয়সি ভদ্রলোক তাঁর উলটোদিকে বসে আছেন।
‘ওই ঘরে গেছিলে কেন?’ বড়বাবুর গলার স্বরে বেশ বিরক্তি।
‘আমি হাত ধোওয়ার জল খুঁজছিলাম, উনি ডাকলেন।’ নবকুমার বলল।
‘তোমাকে দেখলেন কী করে? উনি কখনোই ঘরের বাইরে আসেন না। নিশ্চয়ই ওঁর ঘরের দরজার সামনে গিয়েছিলে?’
‘আমি জানতাম না—!’
‘ওখানে যা শুনেছ, তা মনে রাখার দরকার নেই। নব্বুই-এর ওপর বয়স, অসংলগ্ন কথা বলেন। আমি যেন আর কারও কাছে না শুনি যে তুমি ওঁর কথা গল্প করেছ। মনে থাকবে?’
মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল নবকুমার।
‘কী ব্যাপার?’ কৌতূহলী মুখে জিজ্ঞাসা করলেন ভদ্রলোক।
‘ব্যাপারটা না জানলে আপনি কি খুব অসুবিধায় পড়বেন?’
‘না, না।’ লোকটা কুঁকড়ে গেলেন।
বড়বাবু বললেন, ‘তোমাকে যা বলেছি তা মনে রাখবে।’
আবার মাথা নাড়ল নবকুমার।
হঠাৎ ভদ্রলোক জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এই ছেলেটি কী করে?’
‘গ্রামের ছেলে। কাজের চেষ্টা করতে এখানে এসেছিল। আমার দলে প্রম্পটারের কাজে লেগেছে। কেন?’ বড়বাবু তাকালেন।
‘একটু কথা বলতে পারি ওর সঙ্গে?’
‘বেশ। বলুন।’
‘কী নাম ভাই?’ ভদ্রলোক তাকালেন।
‘নবকুমার।’
‘বাব্বা! একেবারে কুমার হয়ে কলকাতায় এসেছ। তুমি যখন প্রম্পট করো তখন অভিনেতারা বুঝতে পারে?’
বড়বাবু বললেন, ‘অবান্তর প্রশ্ন। না বুঝতে পারলে ওর চাকরিটা থাকত না।’
‘ও, তাই তো! অভিনয় করেছ কখনও?’
‘না।’
‘কতদূর পড়েছ?’
‘বিএ পাশ করেছি।’
ভদ্রলোক বড়বাবুর দিকে তাকালেন, ‘ওকে লক্ষ করুন। অপুর সংসারের সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মধ্যে যে লুকটা ছিল ওর মধ্যে ঠিক সেটা আছে। যদি অভিনয়টা পারে তাহলে কিন্তু ক্লিক করে যেতে পারে।’
বড়বাবু তাকালেন নবকুমারের দিকে। কিছুক্ষণ দেখার পর বললেন, ‘লোকে হলে ঢোকার আগে নাম দ্যাখে। আপনি কি চাইছেন, কেউ হলে না ঢুকুক?’
‘নাম? এখন যেসব হিরো করে খাচ্ছে তাদের দেখে-দেখে মানুষ ক্লান্ত। সবাই মুখ বদলাতে চাইছে। আমরাই দর্শকের মনের মতো নায়ক রিপ্লেস করতে পারছি না।’
‘ঠিক আছে, একেবারে অপুর সংসারের মেকআপ দিয়ে ওকে ক্যামেরায় দেখুন। কথা বলান, হাঁটান। তারপর সিডিতে ট্রান্সফার করে আমার কাছে পাঠিয়ে দেবেন। সেটা দেখে মতামত জানাব। নবকুমার তুমি যেতে পার।’ বড়বাবু বললেন।
নবকুমার যখন গেটের কাছে পৌঁছে গেছে, তখন পেছন থেকে কেউ চিৎকার করল, ‘এই যে ভাই, একটু দাঁড়াও।’
