1 of 2

কলিকাতায় নবকুমার – ২৪

চব্বিশ

শেফালি-মাকে আজ খুব সুন্দর দেখাচ্ছিল। এই প্রথম ওকে নীল শাড়ি পরতে দেখল নবকুমার। সাতসকালেই স্নান সেরে নিয়েছেন। ঘরে ঢোকামাত্র বললেন, ‘একটু পড়া ধর তো!’ তারপর দেওয়াল আলমারি থেকে একটা মোটা বই খুলে সূচিপত্র দেখে পাতা খুলে নবকুমারের হাতে দিলেন। নবকুমার দেখল বইটার নাম সঞ্চয়িতা। কবিতার নাম কর্ণকুন্তী সংবাদ।

‘তুমি চেয়ারটায় বসো। আমি বসে-বসে কবিতা বলতে পারি না।’ হাসলেন শেফালি-মা। আজ তার বয়স যেন অনেক কম বলে মনে হচ্ছিল নবকুমারের।

চোখ বন্ধ করে শেফালি-মা শুরু করলেন, ‘পুণ্য জাহ্নবীর তীরে সন্ধ্যাসবিতার বন্দনায় আছি রত। কর্ণ নাম যার, অধিরথসূতপুত্র, রাধাগর্ভজাত সেই আমি—কহ মোরে তুমি কে গো মাত:!’

হাঁ করে শুনছিল নবকুমার। আবৃত্তি থামিয়ে ধমক দিলেন শেফালি-মা, ‘আরে! তুমি এদিকে তাকিয়ে কী দেখছ? ভুল বলছি কি না বইয়ে চোখ রেখে দ্যাখো। প্রম্পটার কখনও পাতা থেকে চোখ সরায় না।’

আবার আবৃত্তি শুরু করলেন তিনি। বলতে-বলতে আটকে গেলেন এক জায়গায়। নবকুমার ধরিয়ে দিতে যাচ্ছিল, হাত তুলে ইশারা করলেন কথা না বলতে। কয়েকবার চেষ্টা করলেন মনে করতে। তারপর বললেন, ‘না:। সত্যি বুড়ি হয়ে গেছি। স্মৃতি কাজ করছে না। অথচ জানো, সেই প্রথমদিন থেকে, যখন অভিনয়ে এলাম, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে এই কবিতা বলে অভিনয় প্র্যাকটিস করতাম। গড়গড় করে বলে যেতাম। অভিনয় ছাড়ার পর স্মৃতির ওপর এভাবে মরচে পড়বে কল্পনাও করিনি। কী যেন লাইনটা?’

নবকুমার বলল, ‘ওই পরপারে যেথা জ্বলিতেছে দীপ স্তব্ধ স্কন্ধাবারে পাণ্ডুর বালুকাতটে—।’

শেফালি-মা বললেন, ‘বা:। তোমার গলা তো বেশ ভরাট। যখন এমনি কথা বল তখন এরকম লাগে না। তার মানে এই গলা স্বাভাবিক গলা নয়।’

বাকি কবিতাটি শেষ করলেন শেফালি-মা। যখন বললেন, ‘শুধু এই আশীর্বাদ দিয়ে যাও মোরে,/জয়লোভে যশলোভে রাজ্যলোভে, অয়ি,/বীরের সদগতি হতে ভ্রষ্ট নাহি হই’ তখন গলায় এমন একটা ভাব ফুটে উঠল যে নবকুমারের চোখে জল এসে যাচ্ছিল। কোনওক্রমে নিজেকে সামলাল সে।

শেফালি-মা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কেমন লাগল?’

‘খুউব ভালো।’

‘আগে যা বলতাম তার অর্ধেকও পারলাম না। যাক সে,’ খাটে গিয়ে বসলেন শেফালি-মা, ‘তোমার দলের বড়বাবুর বক্তব্য কী?’

‘উনি আপনার সঙ্গে দেখা করতে চান।’ নবকুমার জানাল।

‘কেন?’

‘তা জানি না। বললেন গদিতে না যদি যান তাহলে যেখানে হোক বললে যেতে ওঁর আপত্তি নেই। আপনি রাজি হয়েছেন শুনে খুব খুশি হয়েছেন।’

‘আমি তোমাকে বলেছি ভেবে দেখব। রাজি হয়েছি বলিনি। ঠিক আছে, ওঁকে এখানে এসে আমার সঙ্গে কথা বলতে বলবে।’

‘ঠিক আছে বলব। আজ ছুটি, কাল বলব।’

‘ও। আজ তুমি কী করবে?’

‘কলিকাতার দ্রষ্টব্য জায়গাগুলো দেখতে যাব। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে কীভাবে যেতে হয়? আর সেখান থেকে গড়ের মাঠ কতদূরে?’ নবকুমার জিজ্ঞাসা করল।

‘চিড়িয়াখানা?’

‘হ্যাঁ। সেখানেও যাব। কিন্তু আজ বোধহয় সব জায়গায় যাওয়া যাবে না।’

‘যাবে।’ বলে গলা তুললেন, ‘মুক্তো, মুক্তো!’

মুক্তো এল দরজায়। শেফালি-মা বললেন, ‘আজাদকে খবর দে। গাড়ি নিয়ে দশটায় যেন দরজায় আসে। তুই এর মধ্যে জলখাবার খাইয়ে দে। নিজেও খাবি। আমরা তিনজনে ঠিক দশটায় বেরুব। সঙ্গে জলের বোতল নিবি।’

‘কোথায় যাব?’

‘কলকাতার, না, কলিকাতার দ্রষ্টব্যস্থান দেখতে। উ:, কবে যে শেষবার জাদুঘর, চিড়িয়াখানায় গিয়েছি মনেই পড়ে না। নবকুমারের দৌলতে আজ দেখে আসি চল।’

‘আপনি যাবেন? সত্যি?’ নবকুমার বিশ্বাস করতে পারছিল না।

‘জলে নেমে শুধু কোমর ভেজাব কেন? ডুব দিয়ে স্নানটা সেরে নিই। বুঝলে?’

নবকুমার মাথা নেড়ে বোঝাল, সে বোঝেনি।

শেফালি-মা হাসলেন, ‘চেষ্টা করো, ঠিক বুঝতে পারবে।’

.

ট্যাক্সি সোনাগাছি থেকে একটা চওড়া রাস্তায় পড়ে ডানদিকে বাঁক নিতেই পেছনে বসে থাকা শেফালি-মা বললেন, ‘এই রাস্তটার নাম জানো?’

এইদিক দিয়ে গদিতে যাওয়া আসা করে না নবকুমার। মাথা নাড়ল, না।

‘সেন্ট্রাল অ্যাভিন্যু। এখন বলে চিত্তরঞ্জন অ্যাভিন্যু। এই যে রাস্তাটা পেরিয়ে যাচ্ছি, এটা বিডন স্ট্রিট। এই বিডন স্ট্রিটেই মিনার্ভা থিয়েটার ছিল। এখন তো বন্ধ। এককালে বিখ্যাত নাটক ওখানে হয়েছে। উৎপল দত্ত অঙ্গার, কল্লোল ওখানে করেছিলেন। আমিও ওখানে অনেক শো করেছি।’

‘এখন বন্ধ কেন?’

‘শুনেছি কীসব আন্দোলন হয়েছিল, থিয়েটারের মান পড়ে যাওয়ায় দর্শক হত না। এই রাস্তা হল বিবেকানন্দ রোড।’

শেফালি-মা একের-পর-এক রাস্তার নাম, বিখ্যাত বাড়িগুলোর কথা বলে যাচ্ছিলেন। সবগুলো মাথায় রাখতে পারছিল না নবকুমার। কিন্তু তার ভালো লাগছিল।

‘এই হল ধর্মতলা। আবার এসপ্ল্যানেডও বলে। ওই যে মনুমেন্ট।’

গাড়িতে বসেই অনেক উঁচু একটা স্তম্ভ দেখতে পেল নবকুমার। বইতে সে পড়েছে ওটা স্মৃতিসৌধ। মানুষের বাস করার জন্যে তৈরি নয়।

‘ওটা কার স্মৃতিসৌধ?’

শেফালি-মা বললেন, ‘অতশত জানি না। এক সাহেবের বোধহয়, কী যেন নাম। অক্টো, অক্টো, দূর!’

গাড়ি আর একটু এগোতেই বিশাল সবুজ মাঠ চোখে পড়ল।

‘এই হল তোমার গড়ের মাঠ। গড়ের মাঠ কেন বলে জানো? গড় মানে দুর্গ। দুর্গের সামনে মাঠ, গড়ের মাঠ।’

‘এখানে দুর্গ কোথায়?’

‘ওই যে, ওপাশে, দুর্গের নাম উইলিয়াম। ফোর্ট উইলিয়াম।’

‘ও। কিন্তু শহরের মাঝখানে দুর্গ কেন? শত্রুরা এলে তো শহরটাকেই দখল করে ফেলবে। বইতে পড়েছি শহর থাকত দুর্গের ভেতরে। যাতে শত্রুরা দখল না করতে পারে।’

হাসলেন শেফালি-মা, ‘ওটা ইংরেজরা বানিয়েছিল যাতে তাদের কেউ দুর্গের ভেতর ঢুকে না মারতে পারে। তখন তো ঘরে বাইরে ওদের শত্রু ছিল। এখন বাইরের সাত সমুদ্র পার হয়ে এতদূরে আসতে পারবে না।’

‘তাহলে ইংরেজদের তৈরি দুর্গটা কি দ্রষ্টব্যস্থান হিসাবে রাখা হয়েছে?’

‘না-না। ওখানে শুনেছি মিলিটারিরা থাকে।’

কিছুটা দূরে শ্বেত পাথরের বিশাল বাড়ি যা দেখতেই তাজমহলের ছবি মনে ভেসে ওঠে, নবকুমার উৎফুল্ল হল, ‘বা:, কী সুন্দর।’

পেছন থেকে শেফালি-মা বললেন, ‘ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল।’

বিস্ফারিত চোখে নবকুমার দেখছিল স্মৃতিসৌধকে।

‘ভেতরে যাওয়া যাবে?’

‘এখন নয়। ফেরার পথে। ডানদিকে যে ঘেরা মাঠ দেখছ ওটা রেসকোর্স। ঘোড়া দৌড়ায়, কেউ জেতে, কেউ হারে। ভুলেও কখনও ওখানে যাবে না।’

ওরা চিড়িয়াখানায় ঢুকল। আজ বেশ ভিড়। লাইন দিয়ে টিকিট কাটতে হল। ভাগ্যিস রোদ নেই, মেঘলা হয়ে আছে আকাশ। কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরির পর শেফালি-মা বললেন, ‘আর পারছি না। আমরা এখানে বসছি। তুমি বাঘ ভাল্লুকদের দেখে এখানে ফিরে এসো। তারপর ওই রেস্টুরেন্টে গিয়ে দুপুরের খাবার খাব।’

নবকুমার মাথা নেড়ে পা বাড়াল। পাখিদের খাঁচার সামনে দাঁড়িয়ে সে মুগ্ধ। কতরকমের পাখি। এক ভদ্রলোক তার ছেলেকে বললেন, ‘ওই দ্যাখ কাকাতুয়া।’

ছেলেটি জিজ্ঞাসা করল, ‘কথা বলে?’

কাকাতুয়া ঘাড় ঘুরিয়ে ছেলেটাকে দেখল। তারপর স্পষ্ট বলল, ‘মারব।’

নবকুমার হেসে ফেলল। পাখি মুখ ঘুরিয়ে নিল।

একটার-পর-একটা প্রাণী দেখতে-দেখতে নবকুমার জলহস্তীদের কাছে পৌঁছতেই একজন বিশাল হাঁ করে মুখের ভেতরটা দেখাল। কাদাজলে দাঁড়িয়ে আছে সে। জলহস্তী তাকে আকর্ষণ করল না। হঠাৎ খেয়াল হল, অনেকক্ষণ সে একা ঘুরছে। একজনকে জিজ্ঞাসা করে জানল একটা বেজে গেছে। ফিরতে গিয়ে সে ধন্দে পড়ল। ঠিক কোন জায়গায় শেফালি-মা-রা বসে আছেন বুঝতে পারছিল না। হাঁটতে-হাঁটতে সাপের বাড়ির সামনে পৌঁছে ভেতরে যাওয়ার লোভ সামলাতে পারল না। বড়-বড় কাচের বাক্সে নানান প্রজাতির সাপ। কিন্তু তারা বেশিরভাগই নিজেদের লুকিয়ে রাখতে চাইছে দর্শকদের কাছ থেকে। দর্শকরা এখানে সংখ্যায় বেশি।

‘ছি:! সাপ দেখলেই শরীর ঘিনঘিন করে ওঠে। আমি এখানে থাকব না।’ বলে যে মেয়েটি বেরিয়ে যাচ্ছিল তাকে খুব চেনা বলে মনে হল নবকুমারের। পেছন থেকে দেখছে সে, কিন্তু গলার স্বর কোথাও যেন শুনেছে। মেয়েটার সঙ্গে বছর তেইশের একটি ছেলে। সে বোঝাতে-বোঝাতে হাঁটছিল। নবকুমার বাইরে এসে দেখল ওরা দাঁড়িয়ে কথা বলছে। আর তখনই মেয়েটা মুখ ঘোরাতেই চোখাচোখি হয়ে গেল। একটু অপ্রস্তুত হলেও দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে ছুটকি হাত নেড়ে হাসতে লাগল। কী করা উচিত, বুঝতে পারছিল না নবকুমার। ছুটকি এগিয়ে এল, ‘কী? চিনতে পাচ্ছ না? এর মধ্যেই ভুলে গেলে? আমি ভেবেছিলাম তুমি আর পাঁচটা ছেলের মতো নয়।’

‘না মানে—, ভুলব কেন!’ তোতলাল নবকুমার।

‘সেই যে ট্রেনে এত কথা বললে, কত প্রমিস করলে আর কলকাতার জল পেটে পড়তেই পালটি খেয়ে গেলে?’ ঠোঁট ফোলাল ছুটকি।

নবকুমার দেখল ছেলেটা দূরে দাঁড়িয়ে এদিকে তাকিয়ে আছে। সে জিজ্ঞাসা করল, ‘তুমি কবে ফিরলে?’

‘তার মানে?’

‘আমি জানতাম তোমার বাবা-মা কলিকাতার বাইরে কোনও আত্মীয়ের বাড়িতে তোমাকে রেখে এসেছে। সেখান থেকে বিয়ের চেষ্টা করছে।’ নবকুমার বলল।

‘কী করে জানলে? নাকি মনে-মনে ভেবে খুশি হলে?’

‘আমি তোমাদের বাড়িতে গিয়েছিলাম।’

‘অ্যাঁ? তাই? কবে?’

‘কিছুদিন আগে। এখানে আসার পরপরই। তোমার দিদির কাছে শুনেছিলাম।’

‘ও!’ একটু ভাবল ছুটকি, ‘সেদিন বাড়িতে দিদি একা ছিল, তাই না?’

‘হ্যাঁ।’

‘তোমার চরিত্র নষ্ট করেছিল?’

‘কী যা তা বলছ?’

‘ঠিক বলেছি। আমি যাকেই ভালোবাসব দিদি তার দিকে হাত বাড়াবে। নিশ্চয়ই দিদি তোমার সঙ্গে বাইরে দেখা করে?’

‘না। আর দেখা হয়নি। তবে বেরিয়ে আসার সময় পাড়ার ছেলেরা আমাকে ধরেছিল। খুব শাসাচ্ছিল। ওদের একজন নাকি তোমাকে ভালোবাসে। শেষে বলল, তোমাকে বুঝিয়ে বলতে যাতে তুমিও ওকে ভালোবাসো।’

নবকুমারের কথা শেষ হওয়ামাত্র বেশ জোরে হেসে উঠল ছুটকি। আশেপাশের লোকজন সেই শব্দে এদিকে তাকাল। হাসতে-হাসতে ছুটকি বলল, ‘এরকম কয়েক ডজন ছেলে আমার পিছনে ঘুরে বেড়ায়। আমি তাদের পাত্তাই দিই না। যাকে দিয়েছি সে আমার কথা ভাবেই না। তুমি কী গো!’

নবকুমার জিজ্ঞাসা করল, ‘এই চিড়িয়াখানা কি তোমার বাড়ির কাছে?’

‘দূর! কোথায় বেলগাছিয়া আর কোথায় আলিপুর!’ ছুটকি হাসল, ‘ও অনেকদিন থেকে বায়না করছিল। তাই আজ বেড়াতে এলাম।’

‘ও কে?’

‘ভালো করে চিনি না। টালাপার্কে আলাপ হয়েছে। খুব বড়লোকের ছেলে। বলছে আমাকে বিয়ে না করলে পাগল হয়ে যাবে।’ হাসল ছুটকি।

‘কবে বিয়ে হবে?’

‘অ্যাঁ? তোমার মতলব কী বলো তো? যে বলবে তাকেই বিয়ে করতে হবে? আমি কি এত ফ্যালনা? আচ্ছা, তোমার কোনও ফোন নম্বর আছে?’

‘না।’

‘ঠিকানা বলো।’

ইতস্তত করেও শেষ পর্যন্ত চিৎপুরের যাত্রার গদির ঠিকানা বলে ফেলল সে।

ছুটকি বলল, ‘ও, তুমিও নর্থে থাক? তাহলে চলো, একসঙ্গে ফিরব। যাওয়ার সময় ও অম্বরে খাওয়াবে। তুমি নিশ্চয়ই এখনও অম্বরে খাওনি?’

‘আমাকে খাওয়াবে কেন?’

‘আমি বললে ও না বলবে কী করে? এসো।’ ছুটকি ছেলেটাকে হাত নেড়ে ডাকতেই মুক্তোকে দেখতে পেল নবকুমার। হনহন করে সামনে এসে মুক্তো বলল, ‘মা খুব রাগ করছে। এখনই চলো।’

বেঁচে গেল নবকুমার। ছুটকি জিজ্ঞাসা করল, ‘মা? মা মানে?’

‘মায়ের তো একটাই মানে হয়? আসছি।’ মুক্তোর সঙ্গে হাঁটতে লাগল নবকুমার।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *