একুশ
ঘুম ভাঙার পর নবকুমারের কিছুক্ষণ বিছানায় পড়ে থাকার অভ্যেস ছিল গ্রামের বাড়িতে। বার- পাঁচেক মায়ের ডাক না শুনলে বিছানা ছাড়তে ইচ্ছে করত না। এখানে আসার পর আজ সকালে ঘুম ভাঙতে মনে হল, আরও কিছুক্ষণ শুয়ে থাকে। একটু আগে সে ওই স্বপ্নটা দেখেছে। যেদিন বঙ্কিমচন্দ্রের কপালকুণ্ডলা, গ্রামের বাড়িতে আধাশোওয়া হয়ে হ্যারিকেনের আলোয় পড়েছিল সেই রাতে প্রথম দেখেছিল। তারপর মাঝেমাঝেই স্বপ্নটা ঘুমের মধ্যে চলে আসত। কেউ ইচ্ছে করলেই যদি পছন্দমতো স্বপ্ন ঘুমের মধ্যে দেখতে পেত তাহলে নবকুমার একটি কারণে ওই স্বপ্ন দেখতে চাইতে।
নৌকোয় চেপে বেশ কয়েকজন যাত্রীর সঙ্গে সে যাচ্ছে। তাদের গ্রামের অনেকেই আছে সেই নৌকোয়। বিশেষ করে গ্রামের পঞ্চায়েত প্রধান হর্ষবর্ধনজ্যাঠা ঠিক নৌকোয় থাকত। একটু খিদে পেয়ে যেতে জঙ্গলে, এক দ্বীপে নৌকো ভেড়ানো হল। রান্নাবান্না হবে। হর্ষবর্ধনজ্যাঠা বলল, ‘ওহে নবকুমার, যাও কিছু শুকনো কাঠ কুড়িয়ে নিয়ে এসো। মরা গাছ পেলে কেটে নিয়ে আসবে, এই কুড়োলটা নিয়ে যাও সঙ্গে।’ সে কাঠ কাটতে গেল। অনেকটা কাটা কাঠ দড়ি দিয়ে বেঁধে কাঁধে তুলে ফিরে এসে সে অবাক! কেউ নেই তার অপেক্ষায়। জল বেড়ে গেছে খুব। প্রাণ বাঁচাতে গ্রামের লোক নৌকোয় উঠে চলে গেছে চোখের আড়ালে। খুব মন খারাপ হয়ে গেল তার। খিদে পেয়েছে, দিনও শেষপর্যন্ত ফুরিয়ে আসছিল। একটা আশ্রয়ের আশায় জঙ্গল ভেঙে এগিয়ে যাচ্ছিল সে।
হঠাৎ একটি স্ত্রীকণ্ঠ ভেসে এল, ‘পথিক, তুমি কি পথ হারাইয়াছ?’ অবাক হয়ে মুখ ফিরিয়ে সে যাকে দেখল সে অবশ্যই উদ্ভিন্ন যৌবনা তরুণী। কিন্তু তার মুখ ঝাপসা। চোখ, নাক, গাল, কপালের ওপর গভীর ছায়া মাখামাখি। এই তরুণীকে দেখেই ঘুম ভেঙে যেত তার। বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস খুলে সেই তরুণীর রূপের বর্ণনা বারংবার পড়া সত্বেও স্বপ্নে তার মুখ দেখতে পেত না। যে কয়েকবার সে ওই স্বপ্ন দেখেছে তা ভেঙে গেছে রহস্যাবৃত মুখের কারণে। আজ ভোরে সেই স্বপ্নটা আবার দেখল নবকুমার। কিন্তু এ কী দেখল সে!
নৌকো দেখতে না পেয়ে সে হতাশ হয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকার পর আশ্রয়ের আশায় জঙ্গলের পথ ধরে যখন যাচ্ছিল তখন হঠাৎ গাছগুলো যেন বিশাল-বিশাল অট্টালিকা হয়ে গেল এবং সেই অট্টালিকার পাশে দাঁড়িয়ে সেই তরুণী জিজ্ঞাসা করল, ‘পথিক, তুমি কি পথ হারাইয়াছ?’
নবকুমার চমকে দেখল এখন সেই তরুণীর মুখ আর অস্পষ্ট নয়। এই মুখ ছুটকির। সে বলতে চাইল, ‘ছুটকি তুমি!’ কিন্তু সঙ্গে-সঙ্গে তরুণীর মুখ মন্দিরার হয়ে গেল। মন্দিরা যেন উত্তরের অপেক্ষায় রয়েছে। নবকুমার এক-পা এগোতেই তরুণী মুখ নামাল। তারপর আবার যেই মুখ তুলল তখন নবকুমার ইতিকে দেখতে পেল। ইতি তার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে। আর তখনই ঘুম ভেঙে এল।
এই স্বপ্ন প্রথম যখন সে দেখেছিল তখন ছুটকি, মন্দিরা বা ইতিকে সে দ্যাখেনি। তখন গাছের জঙ্গল ছিল। এখন অট্টালিকার জঙ্গল। এটা কেমন করে হয়ে গেল? তা ছাড়া, তা ছাড়া…ছুটকি এবং মন্দিরার সঙ্গে ইতি মিলে গেল কী করে? ইতি তো এই এলাকার বাসিন্দা। তাহলে? ওদের মধ্যে কি কোনও মিল আছে?
এটুকু ভাবতেই দরজায় শব্দ হল। মুক্তোর গলা কানে এল, ‘এই বয়সেই এত ঘুম! বয়সকালে কী হবে?’
ধড়মড়িয়ে উঠে বসল নবকুমার। এখন ক’টা বাজে? এই ঘরে ঘড়ি নেই। শেফালি-মা তাকে সকালে দেখা করতে বলেছিলেন। সে লাফিয়ে খাট থেকে নেমে পড়ল।
.
এই সকালবেলায় বাথরুমে ঢুকে খেয়াল হল নবকুমারের। কাপড় কাচার সাবান কেনা হয়নি। এখানে আসার সময় যা-যা এনেছিল তা একের-পর-এক পরে গেছে! এবার নোংরা জামাপ্যান্ট না কাচলে নয়। অন্তর্বাসগুলো সে লুকিয়ে গায়ে মাখার সাবান দিয়ে কেচে নিয়েছে রোজ। তাই দিয়ে শার্টপ্যান্ট কাচলে মুক্তো ঠিক বুঝে যাবে।
স্নান শেষ করে বের হতেই সে মুক্তোকে দেখতে পেল। চুপচাপ ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে, ‘বাপের কি কাপড়জামার দোকান আছে?’
‘না।’ মাথা নাড়ল নবকুমার।
‘তাহলে ময়লা জামাগুলো কি ধুতে হবে না? বের করে দাও।’
‘মানে?’
‘হুকুম হয়েছে ওগুলো ধুয়ে দিতে হবে।’ চোখ ঘোরাল মুক্তো।
‘আমি আজ সাবান কিনে এনে ধুয়ে নেব।’
‘কাল থেকে করলে খুশি হব। ওগুলো দাও।’
ময়লা জামাপ্যান্টগুলো নিয়ে চলে যাওয়ার সময় মুক্তো বলল, ‘তোমার ও ঘরে যাওয়ার কথা শুনছিলাম। মনে নেই তোমার?’
মাথা নাড়ল নবকুমার, ‘এই যাচ্ছি?’
হঠাৎ গলা নামাল মুক্তো, ‘আচ্ছা, কাল রাত্রে তোমরা যখন ওই চামচিকেটার খোঁজে বেরিয়েছিলে তখন কি কিছু হয়েছিল?’
হেসে ফেলল নবকুমার, ‘মাস্টারদা পুলিশদের গান শুনিয়ে ছাড় পেয়ে গিয়েছিল।’
‘ও:! মায়ের কথা জিজ্ঞাসা করছি!’
‘পুলিশের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয়েছিল। কেন?’
‘কী জানি! ফিরে আসার পর একটাও কথা বলেনি। রাত্রে ভালো করে ঘুমায়নি। একবার কাঁদতেও শুনেছি। সকালে শুধু একটাই কথা বলেছে, মুক্তো, ছেলেটার জামাপ্যান্টগুলো ধুয়ে দিবি। মুখ হাঁড়ি করে রেখেছে। যাই।’ মুক্তো চলে গেল।
.
শেফালি-মায়ের পরনে লালপেড়ে সাদা শাড়ি, সাদা জামা। কাঁচা-পাকা-ভেজা চুল পিঠের ওপর ছাড়া। বয়সের কারণে শরীর ঈষৎ ভারী। কিন্তু লম্বা বলে সেটা তেমন দৃষ্টিকটু নয়।
নবকুমার ঘরে ঢুকে ওঁর মুখের দিকে তাকাল। কোনও প্রসাধন নেই। ভরাট ধোয়া মুখে গাম্ভীর্য যেন বাসা বেঁধে আছে। শেফালি-মা বললেন, ‘বোসো।’
নবকুমার বসল।
‘সকালে কিছু খেয়েছ?’
নবকুমার ইতস্তত করল, ‘ঘুম ভাঙতে একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল!’
শেফালি-মা গলা তুললেন, ‘মুক্তো?’
একবার ডাকতেই মুক্তো দরজায় পৌঁছে গেল, ‘ওকে চা জলখাবার দিসনি?’
‘কী করে দেব? এতক্ষণে তো ঘুম ভাঙল। তা ছাড়া, ও জলখাবার খায় না। একেবারে ভাত খেয়ে বেরিয়ে যায়।’ মুক্তো বলল।
‘আমাদের চা-বিস্কুট দিয়ে যা।’
‘এখনই আনছি।’ মুক্তো চলে গেল।
শেফালি-মা চেয়ারে বসলেন, ‘নবকুমার, কাল থানায় যা হয়েছে তা তোমার কেমন লাগল?’
‘বড়বাবু আর এস আই খুব ভালো। কিন্তু—!’ থেমে গেল নবকুমার।
‘বলতে পারছ না কেন? ওই বাকিরা, যারা আমাদের দেখে হাসাহাসি করছিল, যে জমাদারটা মুখ খুলেছিল এরাই কিন্তু সংখ্যায় বেশি। রাস্তাঘাটে যেসব ভদ্রমানুষেরা ঘুরে বেড়ায় তাদের অনেকেই কিন্তু ওর মতো কথা বলে।’ শেফালি-মা বললেন, ‘কাল থেকে মনে হচ্ছে আমার সারা শরীরে নর্দমার জল চেপে বসে আছে। অনেক ধুলেও সেটা যাবে না।’
‘কিন্তু বড়বাবু তো লোকটাকে ডেকে ক্ষমা চাওয়ালেন।’
‘উনি ভদ্রলোকের মতো কাজ করেছেন। চাকরির ভয়ে ওই লোকটি ক্ষমা চেয়েছে, মন থেকে চায়নি।’ মাথা নাড়লেন শেফালি-মা।
‘আপনি এসব মনে রাখবেন না।’ নবকুমার নীচু গলায় বলল।
‘মনে রাখব না? আমি যখন যাত্রায় এসেছিলাম তখন খুব কম ভদ্র পরিবারের মেয়েদের যাত্রায় দেখা যেত। শুধু যাত্রা কেন, সিনেমা, থিয়েটারের প্রথম দিকে মেয়েদের ভূমিকায় অভিনয় করত এই খারাপ পাড়ার মেয়েরা। যারা সফল হত, তারা এখান থেকে ভদ্র পাড়ায় চলে যেত। যাত্রাতেও তাই। আমি এলাম। লোকে ভাবল ভদ্র শিক্ষিত মেয়ে। সেরকম বিজ্ঞাপনও দেওয়া হয়েছিল। যতদিন অভিনয় করেছি, মাথা উঁচু করে থেকেছি। আমি যাকে আমার স্বামী ভেবেছি তিনি এখানে বাড়ি কিনেছিলেন সস্তায় পেয়েছিলেন বলে। প্রথমে আমি খুব আপত্তি করেছিলাম। চিৎপুরে রিহার্সাল করতে আসতাম। আসা যাওয়ার পথে রাস্তায় দাঁড়ানো মেয়েদের দেখে খুব খারাপ লাগত। কিন্তু উনি চলে যাওয়ার পরে রাজ্যের মানুষের অত্যাচারে যখন অস্থির হয়ে পড়লাম তখন মনে হল, বাড়িটা যখন আমার নামে কেনা হয়েছে তখন আমিই তো এখানে থাকতে পারি। এই যে এখানে ঢুকব আর বের হব না। বই পড়ে গান শুনে বাকি জীবন কাটিয়ে দেব। এখানে থাকলে কেউ আমাকে বিরক্ত করতে আসবে না। এলেও আমি দেখা করব না। কিন্তু কাল অবধি ভাবিনি এখানে থাকার জন্যে কেউ আমাকে এখানকার মেয়েদের মতো অসম্মানের চোখে দেখবে। সারাজীবনে যা হয়নি, এই বুড়ো বয়সে এসে তা শুনতে হল।’ শেফালি-মা কেঁদে ফেললেন।
চুপ করে বসে থাকল নবকুমার।
শেফালি-মা কান্না গিললেন, ‘এই আমার শরীরটা যদি শুকিয়ে কাঠ হয়ে যেত তাহলে হয়তো কথাগুলো শুনতাম না। আমার শরীর এর জন্যে দায়ী।’
নবকুমার বলল, ‘আচ্ছা, আপনি যদি অন্য জায়গায় বাসা নেন—!’
‘কোন জায়গায়?’
‘আমি তো কলকাতার ভালো জায়গাগুলোর নাম জানি না।’
অদ্ভুত হাসি ফুটল শেফালি-মায়ের মুখে, ‘নবকুমার, কলকাতায় আর এমন কোনও জায়গা নেই যেখানে এইসব মেয়েদের মতো মেয়ে নেই!’
‘কী বলছেন আপনি?’ বেশ জোরে শব্দগুলো বেরিয়ে এল মুখ থেকে?
‘ঠিকই বলছি। এখানে সেই মির্নাভা থিয়েটার থেকে গ্রে স্ট্রিট আর চিৎপুর থেকে সেন্ট্রাল অ্যাভিন্যুর মাঝখানের জায়গায় এরা দল বেঁধে থাকে বলে লোকে সোনাগাছিকে খারাপ পাড়া বলে। এরা পেটের জন্যে দালাল, মাসি, গুন্ডার অত্যাচার সহ্য করেও এখানে পড়ে আছে। আর শহরের অন্যান্য জায়গায় যারা থাকে, তারা পাড়ায় মুখোশ পরে ভদ্রমেয়ের মতো থাকে। দুপুরেই বেরিয়ে যায় নানান গেস্ট হাউস, হোটেলে। একসময় এদের বলা হত কলগার্ল। স্বামীর অজান্তেই দুপুরে শরীর বিক্রি করতে যায়। আমার কাছে ওরা এদের চেয়েও খারাপ। কিন্তু সমাজের চোখে এরা মা, স্ত্রী, মেয়ে।’
থামলেন শেফালি-মা। তারপরেই মুখ তুলে বেশ জোরে বললেন, ‘কিন্তু কেন যাব? ওই দুর্বারে কাজ করতে কত শিক্ষিতা মেয়ে এ পাড়ায় আসছে না? চন্দ্রিমার মতো মেয়ে যদি এই কাজ এখানে এসে করতে পারে তাহলে আমি এখানে থাকতে পারব না কেন?’
নবকুমার ঠিক বুঝতে পারছিল না, শেফালি-মা কী বলতে চাইছেন। একটু আগে বললেন, এখানে থাকার কারণে তাকে নোংরা কথা শুনতে হয়েছে। আবার বলছেন, কেন এখান থেকে যাবেন। চন্দ্রিমাদিকে কি নোংরা কথা শুনতে হয় না? সে জিজ্ঞাসা করতে সাহস পেল না।
এইসময় মুক্তো চা এবং বিস্কুট ট্রেতে করে নিয়ে এল। যাওয়ার সময় বলে গেল, ‘ঠান্ডা না করে খেয়ে নাও।’
‘ভাত বসিয়েছিস?’ শেফালি-মা জিজ্ঞাসা করলেন।
‘হ্যাঁ।’
নি:শব্দে চা খেয়ে নিলেন শেফালি-মা। দেখাদেখি নবকুমারও।
কাপ নামিয়ে শেফালি-মা বললেন, ‘একসময় পুরুষ মানুষদের আমি এড়িয়ে চলতাম। পুরুষ মানেই একজন মেয়ের জীবনে সমস্যা। যাকে ভালোবেসেছিলাম, সে-ও তো আমার জন্যে শুধু সমস্যাই তৈরি করে গেছে। ভেবেছিলাম, এইভাবেই বাকি জীবন কাটিয়ে দেব। কিন্তু তুমি আমাকে খুব ভাবাচ্ছ। আমি জানি, তুমিও পুরুষ মানুষ। হয়তো ভুল করছি কিন্তু স্নেহ তো সত্যিই বিষম বস্তু।’
নবকুমারের গলায় মেঘ জমল। সে ঠোঁট কামড়ে নিজেকে স্থির করল।
‘হ্যাঁ নবকুমার, যদি তোমার কোনও উপকার হয় তাহলে তোমার যাত্রাদলের মালিককে বোলো আমি আবার অভিনয়ের কথা ভাবছি। গত রাত্রের ঘটনার পর সব নতুন করে ভাবতে হচ্ছে।’ শেফালি-মা ম্লান হাসলেন।
আচমকা কথাগুলো শুনে চমকে তাকাল নবকুমার।
