1 of 2

কলিকাতায় নবকুমার – ২০

কুড়ি

নবকুমার তাকাল। শেফালি-মাকে সাজগোজ করায় একেবারে অন্যরকম দেখাচ্ছে। ঠিক দুর্গাঠাকুরের মতো। কিন্তু ওঁর মুখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট।

সে বলল, ‘একদিন সন্ধের পরে আসার সময়ে ইতি আমাকে এই বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছিল। তখন নাম জিজ্ঞাসা করাতে সে প্রথমে বলতে চায়নি। সিনেমার নায়িকাদের নাম বলেছিল। শেষ পর্যন্ত কী মনে হতে বলেছিল ওর আসল নাম ইতি। মেয়েটা ভালো।’

‘কে ভালো, কে মন্দ, তা এখানে পা দিয়েই জেনে গেলে! এ-বাড়িতে থাকতে হলে এদের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করতে হবে। বুঝতে পেরেছ?’ শেফালি-মা বললেন। নি:শব্দে মাথা নাড়ল নবকুমার।

মুক্তো এসে জানাল, ‘ট্যাক্সি এসে গেছে।’

শেফালি-মা বললেন, ‘কবিতা, আমি নবকুমারকে নিয়ে তোমার সঙ্গে যেতে চাইছি।’

‘আপনি জানেন না শেফালি-মা, ওরা কী মুখ খারাপ করে।’ কবিতা বলল।

‘এখানে তো সারাদিনই খিস্তি খেউড় শুনছি। তার চেয়ে বেশি কী শোনাবে। চলো। মুক্তো, তুই জেগে থাকবি। আমি না ফেরা পর্যন্ত যেন দরজায় চোখ রাখিস।’

পুলিশের ভ্যান পাড়া ছেড়ে চলে যাওয়ার পরে রাস্তা আবার আগের মতো। মেয়েরা দরজায় দাঁড়িয়ে সিনেমার গানের কলি ছুড়ে দিচ্ছে।

শেফালি-মা সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসতেই মেয়েরা হাঁ করে দেখল। অনেকেই শেফালি-মায়ের কথা জানে কিন্তু চোখে দ্যাখেনি। প্রায় ষাট ছোঁওয়া রাজেন্দ্রাণীর মতো শেফালি-মা কবিতাকে নিয়ে ট্যাক্সির পেছনের সিটে উঠে বসলেন, সামনে নবকুমার। ট্যাক্সিওয়ালা জিজ্ঞাসা করল, ‘কোথায় যাব?’

‘এ-পাড়ায় কোনও পুলিশের ভ্যান আছে কিনা ঘুরে দেখুন।’ শেফালি-মা বললেন।

সঙ্গে-সঙ্গে ট্যাক্সিওয়ালা ঘুরে তাকাল, ‘পুলিশের ভ্যান? ঝামেলায় পড়ব না তো?’

‘না।’

বোঝা গেল নিতান্ত অনিচ্ছায় ট্যাক্সিওয়ালা কয়েকটা বড় গলি ঘুরে শেষপর্যন্ত সেন্ট্রাল অ্যাভিন্যুতে চলে গেল। শেফালি-মা বললেন, ‘ওকে থানায় যেতে বলো।’

কবিতা ট্যাক্সি ড্রাইভারকে নির্দেশ দিল। নবকুমার দেখল, ট্যাক্সিটা এখন একটা ট্রাম লাইনের ওপর দিয়ে চলছে। রাস্তায় লোকজন খুব কম। শেষপর্যন্ত একটা চৌমাথার মোড়ে এসে গাড়ি ডানদিকে ঘুরল। শেফালি-মা বললেন, ‘ওকে একটু দাঁড়াতে বল।’

ট্যাক্সিওয়ালা ব্রেক চাপল। শেফালি-মা বললেন, ‘নবকুমার, বাঁ-দিকে তাকিয়ে দ্যাখো। এখন ওটা স্টার সিনেমা হয়েছে। কিন্তু ওটা ছিল স্টার থিয়েটার। বিনোদিনীর নাম শুনেছ? গিরিশ ঘোষমশাই? ওই থিয়েটারে তাঁদের মতো বড়-বড় মাপের অভিনেতা অভিনেত্রীরা অভিনয় করে গেছেন। আমি যখন খুব ছোট, তখন মায়ের সঙ্গে এসেছিলাম নাটক দেখতে। শ্যামলী। উত্তমকুমার আর সাবিত্রী চ্যাটার্জি। সেই স্টার থিয়েটারে আগুন লাগল আর পুড়ে গেল নাটকের ঐতিহ্য। খুব কষ্ট হয়। চলো।’

নবকুমার উৎসুক চোখে স্টার থিয়েটার দেখছিল। কোনও একটা বইতে সে স্টার থিয়েটার তৈরির কাহিনি পড়েছে। ট্যাক্সি থামল থানার সামনে।

শেফালি-মা বললেন, ‘কবিতা, ওকে বলো যদি অপেক্ষা করে তাহলে মিটারে যা উঠবে তার থেকে বেশি দেব।’

কবিতাকে বলতে হল না। তার আগেই ড্রাইভার বলল, ‘ঠিক আছে, আমি থাকছি।’

জীবনে কখনও থানায় যায়নি নবকুমার। দুই মহিলার পেছন-পেছন থানায় ঢুকল সে। সামনে যে সেপাই দাঁড়িয়েছিল সে কবিতাকে দেখে নি:শব্দে যে হাসিটা হাসল তা খুব বিশ্রী বলে মনে হল তার। কবিতা জিজ্ঞাসা করল, ‘বড়বাবু আছেন?’

‘দেখা হবে না।’ সেপাই নি:শব্দে হেসে বলল।

‘কেন?’

‘এত রাত্রে বড়বাবু মেয়েছেলের সঙ্গে দেখা করেন না।’

‘নিজের মা-বউ-মেয়ের সঙ্গেও না?’ কবিতা খেপে যায়।

‘অ্যাই চোপ!’

‘তোমার বড়বাবুর সাহেব যদি মহিলা হতেন তাহলে তুমি তাকে একথা বলতে পারতে?’

‘যত্ত শালা, ঝুট ঝামেলা।’ লোকটা চেঁচিয়ে উঠল।

এইসময় একজন এস আই ভেতরে থেকে বেরিয়ে এলেন, ‘কী হয়েছে?’ তারপর কবিতাকে দেখে বললেন, ‘ও, তুমি? কী ব্যাপার?’

‘ইনি শেফালি-মা। আগে যাত্রার নামকরা অভিনেত্রী ছিলেন।’ কবিতা বলল।

এস আই শেফালি-মায়ের দিকে বেশ সম্ভ্রমের সঙ্গে তাকাল, ‘মাপ করবেন, শেফালি দেবীই কি আপনি?’

কবিতা উত্তর দিল, ‘হ্যাঁ।’

‘আসুন আপনারা।’

ঘরে কয়েকটা টেবিল। পুলিশ অফিসাররা এক-এক টেবিলে বসে বিভিন্ন লোকের সঙ্গে কথা বলছেন। একজন বেশ জোরে ধমক দিতেই ওরা সেদিকে তাকাল। এস আই ভ্রূক্ষেপ না করে নিজের টেবিলে গিয়ে ওদের বসতে বললেন।’

বসার পর এস আই জিজ্ঞাসা করল, ‘বলুন, কী ব্যাপার?’

নবকুমারের মনে হল এই লোকটা ভালো। আচ্ছা, সে-ও তো পরীক্ষা দিয়ে এই চাকরিটা করতে পারে। তার শিক্ষাগত যোগ্যতা, বয়স, উচ্চতা ওই চাকরির পক্ষে তো উপযুক্ত। এই চাকরি করলে সে কত মানুষের উপকার করতে পারবে।

শেফালি-মা বললেন, ‘সোনাগাছিতে আমার একটা বাড়ি আছে। অভিনয় থেকে অবসর নেওয়ার পরে আমি সেই বাড়ির দোতলায় থাকি। কোনও কারণে আমি একাই থাকতে চাই, বাইরের লোকের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে চাই না। তাই ওই বাড়িতে আমি বেশ শান্তিতে থাকতে পারি। আমার কাছে যাত্রাদলে পরিচিত একটি লোক আজ দেখা করতে এসেছিল। ঠিক আমার কাছে বলব না। এই ছেলেটি আমার কাছে থাকে। যে এসেছিল এ তার গ্রাম সম্পর্কের ভাই। কলকাতায় থাকার জায়গা নেই বলে লোকটির অনুরোধে একে আমার কাছে রেখেছি। তা দেখা করে বেরোবার সময় পুলিশ বিনা কারণে ওকে ধরে নিয়ে গিয়েছে। আপনারা লোকটিকে ছেড়ে দিন। সে যাত্রায় বিবেকের পার্ট করে।’

এস আই চুপচাপ শুনলেন, ‘পুলিশ কোনও কারণ ছাড়া কাউকে ধরবে কেন?’

কবিতা চট করে তেতে গেল, ‘কেন ধরে সবাই জানে। আমরা, দুর্বার থেকে প্রতিবাদ করলে আপনারা কিছুদিন চুপচাপ থাকেন, তারপর যে কে সেই।’

‘তুমি যদি এইভাবে কথা বলো তাহলে আমার কিছু করার নেই।’

‘কেন থাকবে না? পুলিশের কাজ শান্তি রক্ষা করা, অশান্তি সৃষ্টি করা নয়। সোনাগাছিতে যৌনকর্মীরা কাজ করে। মনে রাখবেন তাঁরা আর পাঁচটা খেটে খাওয়া কর্মীর থেকে আলাদা নয়।’

এস আই কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘আচ্ছা, এত গুছিয়ে, যেভাবে ইউনিয়নের নেতারা কথা বলেন ঠিক সেইভাবে কথা বলতে তুমি শিখল কী করে? এটা একটা বিস্ময়ের ব্যাপার। যেসব মেয়ে দুর্বারের কোনও পদে নির্বাচিত হয় তার কথাবার্তা কয়েক মাসের মধ্যেই বদলে যায়। শোনো, উনি যার কথা বললেন, সে দুর্বারের সদস্য বা কোনও সদস্যের ক্লায়েন্ট নয়। অতএব তুমি চুপ করো।’ তারপর শেফালি-মায়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ওই এলাকায় যে ভ্যান গেছে সেটা ফিরে এসেছে কি না খোঁজ করছি। আপনি বসুন।’

এস আই উঠে গেলে নবকুমার চারপাশে তাকাল। কয়েকজন পুলিশ এদিকে তাকিয়ে নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করছে। ওরা যে শেফালি-মা এবং কবিতাকে নিয়ে কথা বলছে তা বুঝতে অসুবিধে হল না। নবকুমারের ভালো লাগল না।

একজন পুলিশ যেতে-যেতে দাঁড়িয়ে গেলেন, ‘কী হে! আবার কী হল? সমিতি করে তো বিখ্যাত হয়ে গেছ তোমরা। শুনতে পেলাম দেশ বিদেশ থেকে প্রচুর টাকা পাচ্ছে তোমাদের সমিতি।’

‘আমাদের খবর আপনারা দেখছি ভালোই জানেন!’

‘ট্যাকটেকিয়ে কথা বলবে না। দিনকে দিন কত দেখব। ইনি কোন বাড়ির?’

‘কেন?’

‘আগে কখনও দেখিনি। সোনাগাছিতে এরকম কেউ আছে আর আমি জানতাম না। কোন বাড়ি?’

‘উনি যৌনকর্মী নন।’

‘অ। এটা গৃহস্থের বাড়ির নাকি? হাফ গেরস্থরা বেশি ইন্টারেস্টিং হয়।’

শোনামাত্র শেফালি-মা উঠে দাঁড়ালেন, ‘আপনি কী বলতে চাইছেন?’

‘কিছুই না। একটু খোঁজ খবর নিচ্ছিলাম।’

‘কী জন্যে?’

‘দ্যাখো—।’

‘দেখুন বলুন। আমি আপনাকে তুমি বলছি না।’

‘অ! সোনাগাছির কোন বাড়িতে কোন মেয়েমানুষ থাকে তার খবর আমাদের রাখতে হয়। ওটা তো ক্রিমিন্যালদের ডেরা। আজ দুর্বার হয়েছে বলে রাতারাতি সব মেয়েমানুষ সতী হয়ে গেছে এমন ভাবার কারণ নেই। তুমি, সরি, আপনার মতো, যাকে বলে সম্ভ্রান্ত চেহারার মেয়েমানুষ ওখানে ঘর নিয়েছে তা জানতাম না। তাই ঠিকানাটা জিজ্ঞাসা করছি।’ লোকটির মুখে হাসি।

মাথা গরম হয়ে যাচ্ছিল নবকুমারের। সে উঠে দাঁড়িয়ে রাগত গলায় বলল, ‘আপনি ঠিকভাবে কথা বলুন। উনি ওখানে ঘর নেননি, একটা বাড়ির মালিক উনি। কোনও যৌনকর্মী নন।’

‘অ্যাই! কার সঙ্গে কথা বলছিস জানিস?’ লোকটি চিৎকার করে উঠতেই এস আই ফিরে এলেন, ‘আসুন। বড়বাবু কথা বলবেন।’

শেফালি-মা তখন রাগে ফুঁসছেন, ‘এই লোকটি—।’

‘ছেড়ে দিন। আসুন।’

ঘরে ঢোকামাত্র বড়বাবু নমস্কার করলেন, ‘আসুন, আসুন। আপনাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে বলে দু:খিত। আমি এই ফিরলাম। আপনার অভিনয় আমি দেখেছি। শুনেছি আপনি অভিনয় করা ছেড়ে দিয়েছেন। শুনে খারাপ লেগেছিল। বলুন।’

‘আমি প্রথমে জানতে চাই সোনাগাছি পাড়ায় থাকা মানে আমি একটা মেয়েমানুষ একথা বলার অধিকার একজন পুলিশের আছে কি না।’ শেফালি-মা জিজ্ঞাসা করলেন।

বড়বাবু এস আই-এর দিকে তাকাতে তিনি নীচু গলায় কিছু বলতে তিনি বললেন, ‘ডাকুন ওকে।’ এস আই বেরিয়ে গেলে বড়বাবু বললেন, ‘আমি ক্ষমা চাইছি। আসলে আপনার মতো বিখ্যাত অভিনেত্রী ওখানে আছেন তা অনেকে ভাবতে পারে না।’

‘আমার মনে হয়েছিল তথাকথিত সভ্য মানুষদের কাছে এলাকাটা নিষিদ্ধ বলে আমি নিশ্চিন্তে ওখানে থাকতে পারব।’ শেফালি-মা বললেন।

এস আই-এর সঙ্গে সেই পুলিশটি ঘরে আসতেই বড়বাবু জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এঁকে চেনো?’

মাথা নেড়ে নি:শব্দে না বলল লোকটি।

‘উনি বিখ্যাত অভিনেত্রী শেফালিদেবী। ওঁকে যা বলেছ তার জন্যে এখনই ওঁর কাছে ক্ষমা চাও।’ বড়বাবু কড়া গলায় বললেন।

‘মাপ করবেন।’ এক কথায় বলে ফেলল লোকটি।

‘যাও।’

লোকটি বেরিয়ে গেলে এস আই জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনাদের যে লোকটিকে ভ্যানে তোলা হয়েছিল তার নাম কী?’

শেফালি-মা বললেন, ‘আমরা ওকে মাস্টার বলে ডাকতাম।’

একটা কাগজে চোখ বুলিয়ে এস আই বললেন, ‘এই নামের কেউ ভ্যানে ছিল না। তিনজনকে নিয়ে আসা হয়েছে। দেখুন এদের কেউ কি না।’

সেপাইকে হুকুম দিতে সে তিনটে লোককে ঘরে নিয়ে এল। তাদের মধ্যে মাস্টারদাকে দেখতে পেল না নবকুমার।

কবিতা বলল, ‘তাহলে টাকা নিয়ে ওকে ছেড়ে দিয়েছে।’

এস আই তিনজনের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ভ্যান থেকে কাউকে কি ছেড়ে দিয়েছে?’

তিনজনেই মাথা নেড়ে না বলল। একজন হাসল।

‘হাসছ কেন?’

‘একজন, রোগা, বেঁটে লোক, যাত্রার গান শুনিয়েছিল, তাকে ছেড়ে দিয়েছে।’ লোকটি উত্তর দিল। এস আই বললেন, ‘যাক। আপনাদের লোক এখানে আসেনি।’

শেফালি-মা বড়বাবুকে ধন্যবাদ দিয়ে বেরিয়ে আসছিলেন। হঠাৎ কানে এল, ‘আরে শালা, পচা আলুর সঙ্গে থাকলে ভালো আলুও পচে যায়।’

কবিতা ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। শেফালি-মা ধমকালেন, ‘চলো।’

সারাটা পথ কোনও কথা বলেননি শেফালি-মা। ভাড়া মিটিয়ে দিলে কবিতা চলে গেল। মেয়েদের ভিড় দু-ভাগ হল। শেফালি-মায়ের পেছন-পেছন ওপরে উঠে এল নবকুমার।

নিজের ঘরে ঢোকার আগে শেফালি-মা বললেন, ‘সব গোলমাল হয়ে গেল। কাল সকাল আটটায় আমার সঙ্গে দেখা করবে নবকুমার।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *