উনিশ
ঘরে ফিরে এসে নবকুমার বলল, ‘মাস্টারদা, আমাকে বোধহয় কাল সকালে এই বাড়ি ছেড়ে অন্য জায়গায় চলে যেতে হবে।’
মাস্টারদা খাটে বসে বিড়ি খাচ্ছিল। শুনে হাঁ হয়ে গেল কয়েক সেকেন্ড। তারপর বলল, ‘খেপে গেছে মনে হচ্ছে। খেপির হাত-পা ধরলে না কেন?’
নবকুমার জবাব দিল না। তার নিজেরই খারাপ লাগছিল। একটা মানুষ সিন্ধান্ত নিয়েছে, তাকে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে বলার মতো সম্পর্ক তো তার নয়।
মাস্টারদা বলল, ‘শেফালি-মা নিশ্চয়ই জানে আমি তোমার কাছে এসেছি।’
‘আমাকে কিছু বলেননি।’
মাস্টারদা উঠে দাঁড়াল, ‘সব ভোগে গেল। ভাবলাম মালিকের মন পেয়ে যাব ওঁকে রাজি করতে পারলে, চাকরিটা পাকা হয়ে যাবে। যাক গে, কাল যদি তোমাকে তাড়িয়ে দেয় তাহলে আর কী করবে, গদিতে গিয়ে থাকবে। আমি চলি।’
মাস্টারদা দরজা পর্যন্ত গিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়াল, ‘তোমার দ্বারা কিস্যু হবে না। একটা মেয়েছেলেকে ভালো কথা বলে রাজি করাতে পারলে না।’
.
মন মেজাজ খারাপ হয়ে গিয়েছিল নবকুমারের। সে জানলায় গিয়ে দাঁড়াল। এখন সামনের রাস্তায় আবার মেলা বসে গেছে। মাগুর মাছের গায়ে ছাই মাখালে যেমন দেখতে লাগে, রাস্তার পাশে দাঁড়ানো মেয়েদের সেরকম দেখাচ্ছে। ওরা হাসছে, শরীর দোলাচ্ছে কিন্তু এসব যে মন থেকে করছে না তা এ ক’দিনে সে বুঝে গেছে। শুধু পেটের জন্যে এরা অভিনয় করছে। কিন্তু এই অভিনয়ের সংলাপ কোনও প্রম্পটারের মুখ থেকে শুনে ওরা মুখস্থ করেনি। নিজেদের সংলাপ প্রতিরাতে নিজেরাই বানিয়ে নেয়।
হঠাৎ হইহই চিৎকার উঠল। সঙ্গে-সঙ্গে মেয়েগুলো যে যার বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল হুড়মুড়িয়ে। রাস্তা ফাঁকা এবং কয়েকজন লোককে ছুটে পালাতে দেখল নবকুমার। তারপরেই চোখে পড়ল মাস্টারদাকে। ছুটতে-ছুটতে এদিকে আসছে আর তার পেছনে ছুটে আসছে একটা সেপাই। অত মোটা শরীর নিয়েও সেপাইটা মাস্টারদাকে ধরে ফেলল। রাস্তায় পড়ে গেল মাস্টারদা। লোকটা ওর জামার কলার ধরে টেনে তুলে হিঁচড়ে পেছনে নিয়ে যেতে একটা পুলিশের ভ্যান এসে দাঁড়াল। সেপাইটা মাস্টারদাকে ভ্যানের মধ্যে ছুড়ে দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল।
দৃশ্যটি দেখা মাত্র নবকুমার চিৎকার করে উঠল, ‘মাস্টারদা।’ কিন্তু ভ্যান চোখের আড়ালে চলে গেল।
এ পাড়া থেকে বেরোনোর জন্যে পুলিশ মাস্টারদাকে ধরে ভ্যানে তুলেছে। অথচ মাস্টারদার কোনও দোষ নেই। নবকুমার দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে ভেতরের প্যাসেজে চলে এল। কিছু একটা করা উচিত। মাস্টারদাকে মুক্ত করতে ঠিক কী করা উচিত তা সে বুঝতে পারছিল না। বেশ উত্তেজিত হয়ে নবকুমার শেফালি-মায়ের দরজার সামনে গিয়ে দেখতে পেল, সেটা ভেতর থেকে বন্ধ। দরজায় শব্দ করল সে।
‘কে?’ শেফালি-মায়ের গলা ভেসে এল।
ওপাশ থেকে এগিয়ে এল মুক্তো, ‘ওকী! দরজায় শব্দ করছ কেন? মা এখন শুয়ে পড়েছে।’
নবকুমার মুক্তোর দিকে তাকিয়ে উত্তেজিত গলায় বলল, ‘মাস্টারদাকে ধরে পুলিশ ভ্যানে তুলেছে। আমি নিজের চোখে দেখেছি।’
‘তুলুক। একটু পরে ছেড়ে দেবে। ওই চামচিকে তো পকেটখালির জমিদার, জানতে পারলেই রদ্দা মেরে ভ্যান থেকে নামিয়ে দেবে।’ মুক্তো বেশ নিষ্পৃহ গলায় বলল, ‘ঘরে যাও। আমি আসছি।’
‘কী আশ্চর্য! মানুষটাকে যদি ওরা মারধোর করে?’
‘করে করবে! ও তো তোমার মতো গাঁয়ের ভূত না, চালু মাল। ঠিক বেরিয়ে যাবে।’ মুক্তোর কথা শেষ হতেই দরজা খুলে গেল। শেফালি-মা বিরক্ত মুখে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী হয়েছে? তুমি দরজায় ধাক্কা দিয়েছ?’
‘হ্যাঁ। আপনি কিছু মনে করবেন না। একটু আগে জানলা দিয়ে দেখলাম পুলিশ মাস্টারদাকে ধরে ভ্যানে তুলেছে। তাই বাধ্য হয়ে—!’ নবকুমারকে কথা শেষ করতে দিল না মুক্তো, ‘আমি দেখতে পাওয়ার আগেই ও এখানে চলে এসেছিল।’
‘মাস্টারকে পুলিশ ধরেছে? ও এখানে কী করছিল?’
‘মাস্টারদা আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল।’ নবকুমার বলল।
শেফালি-মা মুক্তোর দিকে তাকালেন, ‘মাস্টার এ-বাড়িতে এসেছিল, তুই বলিসনি তো!’
‘তুমি শুয়ে পড়লে বলে বলিনি।’ মুক্তো জবাব দিল।
শেফালি-মা নবকুমারের দিকে তাকালেন, ‘ও! মাস্টার এসে তোমাকে বুঝিয়েছে যে আমাকে আবার অভিনয়ে ফিরে যাওয়ার জন্যে রাজি করাতে। তাই তো?’
মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল নবকুমার।
‘সে নিজে বলতে পারল না কেন? আমাকে তো অনেককাল চেনে। তোমার সঙ্গে তো দু-দিনের আলাপ। সেটাও ওরই মাধ্যমে।’
‘আপনাকে বলতে সাহস পাচ্ছিল না।’
‘সাহস পাবে কী করে! মেরুদণ্ডহীনের দল সব।’ তারপর শেফালি-মায়ের গলার স্বর পালটে গেল, ‘মুক্তো, তোকে বলেছিলাম রাতে এ বাড়িতে আসা যাওয়ার পেছনের রাস্তাটা এদের দেখিয়ে দিবি। দিয়েছিলি?’
‘তালেগোলে সময় পাইনি।’
‘আজকাল তুই আমার অবাধ্য হওয়ার চেষ্টা করছিস?’
‘না মা। দিব্যি কাটছি, খেয়াল ছিল না। বিশ্বাস করো।’
‘যা, গিয়ে দেখে আয় ভ্যানটা পাড়ার ভেতরে আছে কি না। এক্ষুনি যা।’
‘আমি? এত রাত্রে?’
‘ন্যাকামো করিস না। তোকে দেখে সেপাইগুলোও কিছু বলবে না। যা।’
মুক্তো বেরিয়ে গেলে শেফালি-মা বললেন, ‘তুমি নিজের ঘরে যাও। যখন দরকার হবে তখন ডেকে পাঠাব।’
নবকুমার নিজের ঘরে চলে গেল।
ঘরে ঢুকে নম্বর দেখে ফোন করলেন শেফালি-মা। এখন দুর্বার বন্ধ থাকায় কথা। সমিতির মেম্বাররা তো বটেই, সম্পাদক বা দায়িত্বে থাকা মেয়েরা এই সময়ে পেট চালাতে ব্যাবসা করতে বাধ্য হয়। কিন্তু আজ এখন কবিতাকে পেয়ে গেলেন শেফালি-মা। বললেন, ‘আমি শেফালি-মা বলছি। তুমি এখনও ওখানে?’
‘আর বলবেন না। আপনার এই ছেলেটা, কী যেন নাম—।’
‘নবকুমার।’
‘হ্যাঁ। নবকুমারই বটে। সেদিন আপনার বাড়ির দুর্গাকে এনে হাজির করল। ওকে মেডিক্যাল কলেজের ট্রপিক্যালে ভরতি করতে হচ্ছে। খুব যন্ত্রণা হচ্ছে বেচারার। তারপর খবর দিয়ে গেল, আর একটা মেয়ে খুব অসুস্থ হয়ে ঘরে পড়ে আছে। অনেক কষ্টে তাকে তো তুলে নিয়ে আসা হল। ডাক্তারবাবু পরীক্ষা করে বলে গেলেন, বসন্ত হয়েছে। এখন ওর সারা শরীরে গুটি বেরুবে। শুনে ওর বাড়িওয়ালি রাখতে চাইল না। ওকে এখানেই রাখা হয়েছে। বসন্তের তো তেমন ওষুধ নেই। তিন সপ্তাহ লাগবে সুস্থ হতে।’
‘এখন তো স্মল পক্স হয় না। তাহলে রাখতে চাইল না কেন?’
‘ভয় পাচ্ছে। যদি অন্য মেয়েদের হয় তাহলে ব্যাবসা লাটে উঠবে। বলুন, এত রাতে হঠাৎ আপনি ফোন করলেন?’ কবিতা জিজ্ঞাসা করল।
‘তোমাদের সঙ্গে পুলিশের চুক্তি হয়েছিল না, নিরাপরাধ লোকদের রাতে ভ্যানে তুলে টাকা আদায় করার চেষ্টা করবে না?’
‘হয়েছিল। কিন্তু মানছে কই! বললেই বলে লোকগুলো হল্লা করছিল, গোলমাল ঠেকাবার জন্যে ধরেছে। ভ্যানগুলো থাকার কথা সেন্ট্রাল অ্যাভিন্যুতে, কিন্তু রাত হলেই ভেতরে এসে পাক খায়। এখন নাকি একটা নতুন আইন চালু হবে।’
‘কী সেটা?’
‘মেয়েরা ঘরে বসে ব্যাবসা করলে পুলিশ কিছু বলবে না। কিন্তু যেসব ছেলে তাদের কাছে আসবে তারা অন্যায় করছে বলে পুলিশ ধরবে।’
‘ওমা!’ শেফালি-মা বিরক্ত হলেন, ‘সেই একটা নাটক করেছিলাম যাতে একটা চরিত্রকে বলা হয়েছিল, মাংস কাটতে পারো কিন্তু এক ফোঁটা রক্ত যেন না পড়ে।’
‘আপনার চেনাজানা কাউকে ধরেছে?’
‘হ্যাঁ।’
‘আমি আসছি।’ কবিতা ফোন রেখে দিল।
.
মুক্তো ফিরে এসে জানাল, একটা পুলিশের ভ্যান সেন্ট্রাল অ্যাভিন্যুতে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু তার ভেতরে মাস্টারদা নেই। তারপর অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘ওকী! এত রাত্রে কোথায় যাচ্ছ?’
‘তুই একটা ট্যাক্সি ডাক। বলবি ঘণ্টা পিছু ভাড়া দেব।’ শেফালি-মা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সাজ শেষ করতেই মুক্তো ফিরে এসে দরজায় দাঁড়িয়ে বলল, ‘কবিতা এসেছে। দুর্বারের কবিতা।’
‘ভেতরে আসতে বল। আর নবকুমারকে ডেকে দিয়ে ট্যাক্সি নিয়ে আয়।’ মুক্তো চলে গেলে কবিতা ঘরে এল। বেচারা আজ সমিতির কাজ নিয়ে এত ব্যস্ত ছিল যে নিজের ব্যাবসার জন্যে সময় বের করতে পারেনি। ওর চোখ মুখে এক ফোঁটা রং নেই। সমাজসেবিকাদের যে চেহারা শেফালি-মা জানেন, তার সঙ্গে এক ফোঁটা পার্থক্য নেই।
এইসব মেয়েরা, সমাজ যাদের বেশ্যা বলে, তাদের আর-একটা চেহারা দুর্বার তৈরি হওয়ার পর দেখতে পাওয়া গেল। মানুষের মতো বাঁচার আন্দোলনে এরা নিজেদের দুটো ভাগ করে নিয়েছে। এদের প্রত্যেকেই সামাজিক মানুষের লালসার শিকার। স্বামী বা প্রেমিকের বিশ্বাসঘাতকতায় শরীর বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু তারপরেও এরা মাথা তুলে দাঁড়াতে চাইছে এক হয়ে। এই এক হওয়াটাই অনেকে পছন্দ করছে না।
‘এসো। বসো।’
কবিতা বসে হাসল, ‘আপনাকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে।’
‘অ্যাই! চুপ। তোমার মায়ের বয়সি আমি!’
‘বা:। মাকে সুন্দর দেখালে তা বলব না।’
‘শোনো। যাত্রাদলে অভিনয় করে একজন, আমার কাছে এসেছিল। এখান থেকে ফেরার সময় পুলিশ ধরে ভ্যানে তুলেছে।’
‘আপনি কি ওকে ছাড়াতে যেতে চাইছেন?’ কবিতা জিজ্ঞাসা করল।
‘হ্যাঁ।’
‘আমার মনে হয় আপনার না যাওয়াই ভালো। আমি দেখছি। কী নাম ওঁর?’
‘মাস্টার বলেই ডাকে সবাই।’
‘একটা ভালো নাম নিশ্চয়ই আছে।’
এইসময় নবকুমার ঘরে ঢুকে কবিতাকে দেখে বেশ অবাক হয়ে গেল। শেফালি-মা তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘মাস্টারের ভালো নাম কী?’
ফাঁপরে পড়ল নবকুমার। মাথা নেড়ে বলল, ‘আমি জানি না। মাস্টারদা বলে ডাকি।’
‘একটু সমস্যা হবে। দেখছি।’ কবিতা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘ওই মেয়েটাকে আপনার কথায় নিয়ে এসেছি দুর্বারে। ওর পক্স হয়েছে।’
‘সে কী! ইতির পক্স হয়েছে?’
‘ও বাব্বা! ওর নাম বুঝি ইতি? কিছুতেই নাম বলতে চাইছিল না। জিজ্ঞাসা করলে, ওই অসুস্থ অবস্থাতেও বলেছে ওর নাম বিদ্যা বালান।’ হেসে ফেলল কবিতা, ‘যাক। আসল নামটা জানা গেল।’
শেফালি-মা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এখানকার কোনও মেয়ে চট করে নিজের আসল নাম বলতে চায় না। তোমাকে বলল কেন?’
