1 of 2

কলিকাতায় নবকুমার – ১৮

আঠারো

নবকুমারের মুখ দেখে চন্দ্রিমা বললেন, ‘এই অসুখের কথা শোনোনি? জেনিটাল হারপিস খুবই সংক্রামক। খুব কষ্ট দেয়। অবশ্যই কোনও কাস্টমারের কাছ থেকে পেয়েছে মেয়েটা।’

নবকুমার জিজ্ঞাসা করল, ‘এই অসুখ সেরে যাবে তো?’

‘নিশ্চয়ই যাবে। তবে ওকে বেশ কিছুদিন নিয়মিত ওষুধ খেতে হবে। নিজের ব্যাবসায় ফিরে যেতে পারবে না, যতদিন না সুস্থ হয়।’ চন্দ্রিমা জানালেন।

‘ওকে কি আপনারা ততদিন রেখে দিতে পারবেন?’

‘দু-তিনদিন থাক। এরমধ্যে আমরা আলোচনা করে ঠিক করে নেব।’

নবকুমার খুশি হল। তারপরেই ওর মনে পড়ে গেল। সে ইতির কথা চন্দ্রিমাকে জানাল। ইতি অসুস্থ। কিন্তু দুর্বারে এসে ডাক্তার দেখাতে ভয় পাচ্ছে।

‘ওর বাড়িওয়ালি বা গুন্ডা কি বাধা দিচ্ছে?’

‘বোধহয়।’

হেসে ফেললেন চন্দ্রিমা, ‘এটাই এখানকার বড় সমস্যা। মুশকিল হল কোনও মেয়ে যদি এগিয়ে এসে দুর্বারের সদস্য না হয় তাহলে আমরা কিছু করতে চাইলে ঝামেলা বেধে যায়। আমি দেখছি ব্যাপারটা। কিন্তু গ্রাম থেকে এখানে এসে কী ঠিক করেছ? মেয়েদের উপকার করে বেড়াবে?’

‘না-না। আমি দেখলাম। তাই ভাবলাম আপনাকে জানিয়ে দিই।’

‘ঠিক আছে। ঠিকানাটা বলো।’

‘ঠিকানা।’ মাথা নাড়ল নবকুমার। রাস্তা এবং বাড়িটা বুঝিয়ে দিল।

.

বাড়িতে ঢুকল নবকুমার। আর অমনি তাকে ঘিরে রং মাখা মেয়েদের ভিড় জমে গেল। এই মেয়েগুলো প্রথম-প্রথম দূরে দাঁড়িয়ে টিপ্পনি কাটত কিন্তু কেউ সামনে এসে কথা বলেনি। আজ বলল।

‘দুগ্গার কী হল?’

মুখ নীচু করে নবকুমার বলল, ‘ডাক্তার দেখেছে। ওষুধ দিয়েছে।’

‘কোথায় আছে ও?’

‘দুর্বারের অফিসে।’

সঙ্গে-সঙ্গে একটা স্বস্তির শব্দ বেরিয়ে এল মেয়েদের মুখ থেকে। তারপরেই প্রশ্ন ভেসে এল, ‘কী হয়েছে ওর?’

‘নিশ্চয়ই সিফিলিস?’

‘নারে! আমার সন্দেহ হচ্ছে এইডস!’

‘ভ্যাট। এইডস হলে ওজন কমে যায়, পাতলা পায়খানা হয়। ওর তো সেসব কিছুই হচ্ছিল না। ক্যানসার হলে যন্ত্রণা হয়। কী হয়েছে শুনলেন?’

মনে করে অসুখটার নাম বলল নবকুমার, ‘জেনিটাল হারপিস।’

‘ওমা! এ কী রোগ? বাপের জন্মে নাম শুনিনি। বাঁচবে তো?’

‘হ্যাঁ। তবে বেশ কিছুদিন চিকিৎসা করাতে হবে।’

এইসময় রোগা, মাঝারি উচ্চতার একজন লোক দরজা দিয়ে ঢুকে বাঁ-দিকে চলে যাচ্ছিলেন। একটা মেয়ে চেঁচিয়ে ডাকল তাঁকে, ‘ও জামাইবাবু, দাঁড়ান না।’

‘কী হল?’

‘ওই যে কী নাম, জেনিটাল, জেনিটাল।’

আর একটা মেয়ে ধরিয়ে দিল, ‘হারপিস।’

‘হ্যাঁ। ওটা কী রোগ?’

‘কার হয়েছে?’

‘দুগ্গার।’ আর-একজন বলল।

‘সব্বোনাশ।’ লোকটির মুখ করুণ হল, ‘কোথায় ও?’

‘দুর্বারের ডাক্তারের কাছে। কী রোগ?’

‘একটা ভয়ঙ্কর ধরনের অ্যালার্জি যা মেয়েদের যোনিদ্বারে হয়ে থাকে। প্রচণ্ড চুলকায়, যন্ত্রণা হয়। চিকিৎসা না করালে মারাও যেতে পারে। ও নিশ্চয়ই কোনও খদ্দেরের কাছ থেকে রোগটা পেয়েছে।’ লোকটি চোখের আড়ালে চলে গেলেন।

সঙ্গে-সঙ্গে যে মেয়েটি প্রশ্ন শুরু করেছিল, সে চেঁচিয়ে উঠল, ‘নিশ্চয়ই টাকলু কালুয়া। ওকে আমি অনেকবার চুলকাতে দেখেছি। এখানে এসেই দুর্গার ঘরে ঢুকত।’

আর-একজন বলল, ‘খবরদার কেউ ওকে ঘরে বসাবি না।’

‘এবার এলে শালার টাক ভাঙব।’

‘কিন্তু দুর্গা এত কষ্ট পাচ্ছে, ও পাচ্ছে না কেন?’

‘হয়তো মেয়েদের হলে রোগটা বেশি যন্ত্রণা দেয়, ছেলেদের দেয় না।’

‘শালা ভগবানটা না নিজে ছেলে বলে নিজের জাতভাইকে সবসময়—।’

নবকুমার সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। একটি মেয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, ‘দুগ্গাকে আপনি বাঁচিয়ে দিলেন। আপনি খুব ভালো লোক।’

আর একজন বলল, ‘আপনাকে আমরা আওয়াজ দিতাম বলে ক্ষমা চাইছি।’

উঠে এল নবকুমার। সিঁড়ির গায়ে যারা দাঁড়িয়েছিল, তারাও বেশ সম্ভ্রমের চোখে তার দিকে তাকিয়েছিল।

ঘরে ঢুকে নবকুমার অবাক। মাস্টারদা তার খাটে শুয়ে আছে। ওকে দেখে তড়াক করে উঠে বসে জিজ্ঞাসা করল, ‘এতক্ষণ কার ধানে মই দিচ্ছিলে?’

‘মানে?’

‘সেই কখন গদি থেকে বেরিয়েছ, কোথায় গিয়েছিলে?’

‘মহিলা দুর্বার সমিতির অফিসে।’

‘উ:। ওখানে তোমার কী দরকার? আজেবাজে ঝামেলায় না জড়িয়ে কাজের কাজটা এবার করো। আজই শেফালি-মাকে রাজি করাও। আরে ভাই, তুমি বুঝতে পারছ না কেন, শেফালি-মা রাজি হলে তোমার কপাল খুলে যাবে।’

এইসময় মুক্তো এসে দাঁড়াল, ‘তুমি কখন বিদায় হবে?’

‘আচ্ছা আমাকে দেখলেই তুমি হাঁড়িমুখো হও কেন?’

‘কারণ, তোমার মতো ধান্দাবাজ পুরুষ আমার চেনা, তাই। একটু পরেই পুলিশ রাস্তায় যাকে পাবে তাকে তুলবে। নিজের ভালো চাও তো কেটে পড়ো।’

‘যাচ্ছি বাবা যাচ্ছি। পুলিশ আমার মামা। ভাগনেকে কিছু বলবে না।’

মুক্তো মুখ ভ্যাটকাল। তারপর নবকুমারের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তোমাকে মা ডাকছেন। এখনই।’

‘একেই বলে মেঘ না চাইতেই জল। যাও-যাও।’ মাস্টারদা হাসল।

.

এই প্রথম শেফালি-মাকে বিছানায় বসা অবস্থায় দেখতে পেল না নবকুমার। ঘর খালি। নবকুমার যখন ইতস্তত করছে তখন ওপাশের দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকলেন তিনি। নবকুমার অবাক হল। বসে থাকা মানুষের চেহারা স্পষ্ট বোঝা যায় না। শেফালি-মা বেশ লম্বা, শরীর ভারী হলেও ছাঁদ নষ্ট হয়নি। হেসে বললেন, ‘কেমন আছ?’

‘ভালো।’

‘কলকাতা শহরের সব ভালো জায়গাগুলো ঘুরে-ঘুরে দেখবে। দক্ষিণেশ্বর, বেলুড়ে গিয়ে প্রণাম করে আসবে। আমাদের খুব কাছে জোড়াসাঁকোয় রবীন্দ্রনাথের বাড়ি। সেখানেও একদিন যেও।’

শেফালি-মা খাটে বসলেন।

‘আমাকে ডেকেছেন?’

‘অ্যাঁ? ও হ্যাঁ। চন্দ্রিমা ফোন করেছিল। তোমার খুব প্রশংসা করছিল। তুমি নাকি আর একটি অসুস্থ মেয়ের কথা ওদের বলেছ। সেটা শোনার পর আমার মনে হল, তোমাকে কয়েকটা কথা বলা দরকার। তুমি গাঁয়ের ছেলে। চাকরির সন্ধানে কলকাতায় এসে যাত্রার দলে প্রম্পটারের চাকরি পেয়ে গেছ। তোমাকে তো আরও ওপরে উঠতে হবে। নিজের ভবিষ্যতের কথা ভেবে ঠিকঠাক পথে এগোতে হবে। প্রম্পটারের চাকরিতে যে মাইনে পাবে তা যদি জমাতে পারো, তাহলে দু-তিন বছরের পরে ব্যাবসায় নামতে পারবে। কিন্তু মানুষের উপকার করার ইচ্ছে যদি তোমার মনে থাকে তাহলে ভালো করে ভাবো। উপকার করার ইচ্ছে নেশার মতো। যে মানুষ এই নেশায় মেতেছে, সে নিজের কথা, ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে না। তুমি কোন পথে যাবে তা তোমাকেই ঠিক করতে হবে।’ শেফালি-মা হাসলেন, ‘ওই চেয়ারটায় বসো।’

নবকুমার বলল, ‘আমি কিছু করব বলে ভাবিনি। ওদের বিপদ দেখে মনে হয়েছিল, দুর্বার সমিতিতে বললে কাজ হবে। আমি গ্রামের খুব গরিব পরিবারের ছেলে। আমার দিকে সবাই তাকিয়ে আছে। তাই ইচ্ছে হলেও আমি এমন কোনও কাজ করতে পারব না যা আমার বাবা-মাকে বিপদে ফেলে।’

‘এটাই তো তোমার কর্তব্য হওয়া উচিত। এই যে দুর্গা, ওর কী দোষ বলো? পেটের জন্যে শরীর বিক্রি করছে সে। ক্যানিং-এর একটা গ্রামে ওর বাবা বিয়ে দিয়েছিলেন যার সঙ্গে, সে পণের টাকা না পেয়ে অত্যাচার করত। শেষপর্যন্ত বউকে দিয়ে রোজগার করাতে নিয়ে এল হাওড়ায়। ইটভাটার চাকরিতে ঢুকিয়ে দিল। হপ্তার শেষে মাইনে নিয়ে যেত লোকটা। দুর্গা থাকত অন্য কামিনদের সঙ্গে বস্তিতে। কিন্তু দ্বিতীয় সপ্তাহে হেড মিস্ত্রি ওকে ডেকে পাঠিয়ে শরীর ভোগ করল। এটাই নাকি দস্তুর। না রাজি হলে কাজ চলে যাবে। তাই রোজ শরীর দিতে হত যে মিস্ত্রির কাছে সে কাজ করছিল, তাকে। শেষপর্যন্ত মেয়েটা ঠিক করে, শরীর যদি দিতেই হয় তাহলে বিনা পয়সায় দেব না, তার বিনিময়ে টাকা নেব। ওকে কি দোষ দেওয়া যায়! ওর নির্লজ্জ স্বামী এখানেও আসে, ওর কাছ থেকে টাকা নিয়ে যায়। কিন্তু আমাদের সমাজের তথাকথিত ভদ্রলোকদের বিষ শরীরে নিতে বাধ্য হচ্ছে এরা। সেই লোকটার তো কোনও শাস্তি হচ্ছে না।’ শেফালি-মা বেশ উত্তেজিত, ‘আমার তো মাঝে-মাঝে ইচ্ছে হয় এই লোকগুলোর বাড়িতে গিয়ে মুখোশ খুলে দিয়ে আসতে।’

কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে শেফালি-মা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘বাড়িতে চিঠি দিয়েছ?’

‘হ্যাঁ।’ নবকুমার ইতস্তত করল, ‘আপনাকে একটা কথা বলতে পারি?’

‘নিশ্চয়ই। বলো।’

‘আপনি তো বিখ্যাত অভিনেত্রী ছিলেন। অভিনয় ছেড়ে দিলেন কেন?’

‘মন চাইল না। যে মানুষটাকে ঘিরে বাঁচার স্বপ্ন দেখতাম সে হঠাৎ চলে গেল। কথা বলতেই ইচ্ছে করত না। সেই জন্যেই তো ভদ্রলোকদের পাড়া ছেড়ে চলে এলাম সোনাগাছিতে। এখানে এসে কেউ আমাকে বিরক্ত করবে না। হলও তাই। বাড়িটা সস্তায় কিনেছিলেন উনি। মুক্তো তো অনেককাল সঙ্গে আছে। তা হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন করলে?’

‘সবাই চায় আপনি আবার অভিনয় করুন।’

‘সবার মনের খবর কী করে জানলে তুমি? এই তো সবে এসেছ!’

‘সত্যি কথা বলব?’

‘সত্যিটাই আমি শুনতে চাই নবকুমার।’

‘আপনি অভিনয় করতে রাজি হলে আমার খুব উপকার হয়।’

‘কীরকম?’ মুখ গম্ভীর হয়ে গেল শেফালি-মায়ের।’

‘আমার মাইনে অনেক বাড়িয়ে দেবেন যাত্রা মালিক।’

‘কেন? আমার অভিনয়ের সঙ্গে তোমার মাইনে বাড়ার কী সম্পর্ক?’

‘আমার কথা শুনে আপনি যদি রাজি হন—তাই!’

গম্ভীর মুখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে শেফালি-মা বললেন, ‘যাও, খেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়ো। কাল সকালে আমার সঙ্গে দেখা করবে। যাও।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *