1 of 2

কলিকাতায় নবকুমার – ১৭

সতেরো

রিহার্সাল শেষ হল সন্ধে সাতটায়। এই সময়ের মধ্যে ফাঁকে-ফাঁকে তিনবার চা খেয়েছে সবাই। নবকুমার একবারের বেশি খায়নি। কমলা নামের মেয়েটা, যে-কোনও অভিনেত্রী অনুপস্থিত থাকলে তার ভূমিকায় অভিনয় করে, সারাক্ষণ চুপচাপ বসেছিল। যেহেতু আজ কোনও মহিলা কামাই করেনি, তাই তার কিছু করার নেই। রিহার্সাল শেষ হওয়ার পরে সুধাকান্ত তাঁকে ডাকলেন, ‘কমলা, কাল রিহার্সাল শুরু হওয়ার একঘণ্টা আগে আসবে।’

‘কেন? পুতুলের মতো ড্যাবড্যাব করে চেয়ে থাকতে?’ কমলা বেশ রেগে ছিল।

‘এভাবে কথা বোলো না। তোমার চাকরির বিকল্প হিসেবে নিজেকে উন্নত করো, দেখবে সুযোগ আসবেই। অধৈর্য হয়ো না। তোমার ভালোর জন্যেই বলছি, ঘণ্টাখানেক আগে এসে নবকুমারের কাছে সরমা আর চামেলির চরিত্র দুটো ধীরে-ধীরে মুখস্থ করে নাও। তুমি ভালো তুললে হয়তো প্রথম শো’তেই তোমাকে নামাতে পারি।’ সুধাকান্তবাবু বললেন।

নবকুমার জিজ্ঞাসা করল, ‘আমিও কি আগে আসব?’

‘তুমি না এলে ওকে রিহার্সাল করাবে কে?’ সুধাকান্তবাবু উঠে গেলেন।

কমলা বলল, ‘তাহলে আমি এগারোটায় আসব।’

নবকুমার মাথা নাড়ল।

যাত্রাদলের ম্যানেজার তিনকড়ি গুপ্ত। চল্লিশ বছর এই লাইনে আছেন। সব নাড়িনক্ষত্র তাঁর জানা। শিল্পীরা চলে গেলে তিনকড়ি ডাকলেন, ‘এই খাতার এখানে রোজ সই করবে। এটা হাজিরা খাতা। করো।’

নবকুমার খাতার পাশে রাখা কলম তুলে পুরো নাম সই করল।

‘শোনো, তোমাকে কয়েকটা কথা বলি। যাত্রাদলের নিয়মকানুন জানা আছে?’

‘না।’

‘এখানে সর্বেসর্বা হলেন মালিক। তারপর হিরো-হিরোইন। ওদের নামে বায়না হয়। তারপর পরিচালক, নামকরা অভিনেতা-অভিনেত্রী, সবশেষে এক্সট্রারা। হিরো-হিরোইন আলাদা গাড়িতে যাত্রা করতে যাবে, সিনিয়ার অভিনেতা-অভিনেত্রী পরিচালকের জন্যে আলাদা গাড়ি থাকবে। বাকিদের যেতে হবে বাসে। খাওয়া-দাওয়া থাকার ব্যবস্থাও মর্যাদা অনুযায়ী পৃথক-পৃথক ভাগ করা থাকে। এখানে কেউ কারও দাদা-দিদি নয় যে এক্সট্রা হয়েও নায়কের গাড়িতে উঠতে পারবে। সেই চেষ্টা করার কথা ভেবো না। তোমার যা স্ট্যাটাস তার বাইরে যাবে না।’ ম্যানেজার কথাগুলো বলে একটা সিগারেট ধরালেন।

‘আমি কোন দলে?’ নবকুমার বুঝতে পারছিল না।

‘এক্সট্রা। বাসে-বাসে, নিমকি-চা টিফিন পাবে, এক পিসের বেশি মাছ পাবে না। ডরমিটারিতে শুতে পারবে। রিহার্সাল শুরুর সময়, এমনকি প্রথম দশটা শো-এর সময়ে প্রম্পটারের দরকার হয়। কিন্তু সংলাপ মুখস্থ হয়ে গেলে, কেউ আচমকা ভুল না করে ফেললে প্রম্পটারের কোনও কাজই নেই। তখন বসে-বসে মাইনে নেবে। অনেক মালিক তখন প্রম্পটারকে ছাড়িয়ে দেয়। আমাদের মালিক সেটা করেন না। করেন না আমারই পরামর্শে।’ হাসলেন তিনকড়ি গুপ্ত।

একটা লম্বা টান নিয়ে ধোঁয়া গিলে সেটা ছাড়তে-ছাড়তে বললেন, ‘বহুকাল আগের কথা। অরবিন্দ চৌধুরির নাম শুনেছ? জাঁদরেল অভিনেতা। পরপর তেরাত্তির শাজাহান, ঔরঙ্গজেব, আলিবর্দি করে গেছেন। হাঁটাচলা, সংলাপ বলা, সব আলাদা। গিরিশ ঘোষকে দেখিনি, তবে অরবিন্দ চৌধুরি যখন প্রফুল্লর ‘সাজানো বাগান শুকিয়ে গেল’ বলে চোখ বন্ধ করতেন তখন পাবলিকের গাল ভিজে যেত। তাঁর ডাক নাম ছিল পিন্টু চৌধুরি। অসাধারণ স্মরণশক্তি। একবার শুনেই ডায়লগ মুখস্থ রাখতে পারতেন। তা একবার বর্ধমানে শো। লোকে লোকারণ্য। সহ-অভিনেতা তার সংলাপ বলেছে কিন্তু পিন্টু চৌধুরি জবাব দিচ্ছেন না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে দর্শকের দিকে তাকিয়ে আছেন। লোকে উশখুশ করতে লাগল। শেষপর্যন্ত সহ-অভিনেতা তাঁর সম্বিত ফেরাতে তিনি প্রশ্ন করলেন, আমার সংলাপটা যেন কী ছিল? সহ-অভিনেতা এত নার্ভাস হয়ে গিয়েছিল তারও মনে এল না। ভেতরে তখন হইহই কাণ্ড। প্রম্পটার তো নেই, পার্ট সবার মুখস্থ বলে তাকে ছাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু খাতাটা কোথায়? দেখা গেল সেই খাতার কথা কারও মনে নেই। সেটাকে গদিতে ফেলে, অভিনয় চলছে মফস্বলে। হঠাৎ শুনলাম পিন্টু চৌধুরি সংলাপ বলছেন। যেখানে থেমেছিলেন ঠিক সেখান থেকেই। সিন শেষ করে ভেতরে এসে বললেন, মালিককে বলো, পিন্টু চৌধুরি সংলাপ ভুলে গিয়েছিল কিন্তু কেউ তাঁকে প্রম্পট করেনি। এর পরেরবার এরকম হলে আমি স্টেজ থেকে বেরিয়ে আসব।’ কথাগুলো বলে হাসতে লাগলেন তিনকড়ি।

‘উনি সত্যি ভুলে গিয়েছিলেন?’

‘দূর! পরে উনি বলেছিলেন নাটকের প্রথম শো-তে যারা-যারা স্টেজে ছিল, সে দর্শকের সামনেই হোক বা চোখের আড়ালে হোক সবাইকে শেষপর্যন্ত থাকতে হবে।’

‘একটা কথা জিজ্ঞাসা করব?’

‘বলো।’

‘আমাদের গ্রামে যাত্রা দেখেছি। এখান থেকে গিয়েছিল। তারা দর্শকদের মাঝখানে মঞ্চে গিয়ে অভিনয় করত। কোনও উইঙস ছিল না। তাহলে প্রম্পটার কোথায় দাঁড়াবে? আমি তো কাউকে প্রম্পট করতে দেখিনি।’ নবকুমার বলল।

হাসলেন তিনকড়ি। ‘এখন যাত্রারও ঘরানা বদলেছে। তিনদিক খোলা মঞ্চে যাত্রা হয়। ব্যাকসিনের পেছনে কী হচ্ছে তা দর্শকরা দেখতে পায় না। তোমাকে প্রম্পট করতে হবে ওই ব্যাকসিনের পাশে দাঁড়িয়ে। যাক গে, যা বললাম তা মনে রেখো।’

গদি থেকে বেরিয়ে আসতেই মাস্টারদার খপ্পরে পড়ল নবকুমার, ‘যেমন করেই হোক আজ শেফালি-মায়ের সঙ্গে কথা বলবে। একবার যদি নিমরাজিও হয় তাহলে আমি মালিককে নিয়ে পৌঁছে যাব। আজকে আমার রিহার্সাল কেমন দেখলে?’

‘ভালো।’

‘তিনুদা বলেছে, এখন থেকে একটার বদলে দুটো মাছ দেবে। তুমি যদি শেফালি-মাকে রাজি করাতে পারো তাহলে ওরকম অনেক মাছ নিজে কিনে খেতে পারবে। এই নাও। এটা বুক পকেটে যত্ন করে রেখে দাও।’ একটা সিঁদুর মাখানো জবা ফুলের পাপড়ি এগিয়ে ধরল মাস্টারদা।

‘কী?’

‘মায়ের পুজোর ফুল। সঙ্গে থাকলে সাফল্য পাবেই। পকেটে রাখো।’

অতএব ফুলের পাপড়ি পকেটে রাখতে হল।

মাস্টারদা বলল, ‘কাল সকালে গিয়ে খোঁজ নেব। জয় মা কালী।’ মাথার ওপর দুটো হাত জড়ো করে চোখ বন্ধ করল মাস্টারদা। নবকুমারের খেয়াল হল, মাস্টারদা যদি এখনও পর্যন্ত শো করতে গেলে একটা মাছ পায় তাহলে নিশ্চয়ই এক্সট্রাদের দলে পড়ে। আজ পাঁচটা দৃশ্য পড়া হয়েছিল। মাস্টারদা যে চরিত্রে করছে তার একটা মাত্র সংলাপ ছিল। পরে নাকি তিনটে গান আছে। বিবেকের। বিবেকরা তাহলে এক্সট্রা হয়।

চিৎপুরের ট্রাম লাইন থেকে গলিতে ঢুকতেই মাথা নীচু হয়ে গেল। দুপাশে ছাইমাখা মেয়ের দল দাঁড়িয়ে। কেউ-কেউ চটুল মন্তব্য করছে। শেফালি-মা বলেছিল, ওপাশের বড় রাস্তা দিয়ে একটা সরু গলি ওর বাড়ির গায়ে এসেছে। সেই পথ দিয়ে যাওয়া-আসা করতে। পথটাকে দেখে নিতে হবে। হাঁটছিল নবকুমার। হঠাৎ কানে এল, ‘এই যে আমির খান, তোমার রানি মুখার্জির খবর নেবে না?’

নবকুমার ব্যাপারটাকে উপেক্ষা করে হাঁটলেও মেয়েটা সামনে চলে আসায় দাঁড়াতে হল। অল্পবয়সি, প্যান্টশার্ট পরা মেয়ে। হাত নাড়ল মুখের সামনে, ‘এই যে, তুমি কালা নাকি! কানে কথা যাচ্ছে না?’

‘আ-আমাকে?’

‘তা নয় তো কাকে? যে তোমাকে পথ চিনিয়ে পৌঁছে দিয়ে এল তার খবর নিয়েছ?’

ঝট করে ইতির মুখ মনে পড়ল। সে জিজ্ঞাসা করল, ‘কেন? কী হয়েছে?’

‘এসো।’ হাত ধরে টানল মেয়েটা। দরজায় দাঁড়ানো অন্য মেয়েরা হেসে উঠল শব্দ করে। মেয়েটা তাকে সেই ঘরে নিয়ে গেল যেখানে ইতি তাকে নিয়ে গিয়েছিল। নবকুমার দেখল গায়ে চাদর জড়িয়ে শুয়ে আছে ইতি। ওকে ঢুকতে দেখে হুড়মুড়িয়ে উঠে বসল। মেয়েটা বলল, ‘বাড়ির সামনে দিয়ে চোরের মতো পালিয়ে যাচ্ছিল, ধরে নিয়ে এলাম।’

‘আ:। কেন? শুধু-শুধু বিরক্ত করা।’ গলার স্বরে অসুস্থতা স্পষ্ট।

‘কী হয়েছে তোমার?’ নবকুমার জিজ্ঞাসা করল।

‘কিছু হয়নি। তুমি যাও।’

‘কিছু না হলে এই সময়ে কেউ চাদর মুড়ি দিয়ে শোয়?’

.

.

মেয়েটা বলল, ‘কাল রাত থেকে জ্বর এসেছে। বাড়িওয়ালি ডাক্তারখানা থেকে ওষুধ এনে দিয়েছিল। তাতে কোনও কাজ হয়নি। জ্বর বলে কামাই করবে এটা তো বাড়িওয়ালি চায় না। অনেক কথার পর আজকের দিনটা ছাড়ান দিয়েছে।’

‘এরা কী মানুষ!’ না বলে পারল না নবকুমার।

মেয়েটা হাসল, ‘শোনো কথা! আমরা যে মানুষ তা তোমাকে কে বলল? আমাদের মান মর্যাদা কিছু আছে? আমরা হচ্ছি যন্ত্র। যদ্দিন চালু থাকব তদ্দিন কদর।’

হঠাৎ কবিতার কথা মনে পড়ে গেল। কবিতা বলেছিল, ওদের সমিতিতে চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে। ডাক্তার আসেন। জায়গাটা এখান থেকে দূরেও নয়। সে বলল, ‘ওঠো।’

‘উঠব মানে?’ ইতি অবাক।

‘এভাবে শুয়ে থাকলে তো অসুখ সারবে না।’

‘কী হবে সারিয়ে? আমার আর ভালো লাগছে না।’ ইতি মুখ ফেরাল। আর তার পরেই কেঁদে ফেলল। কান্নার শব্দ খুবই মৃদু, শরীর ফুলছে বেশি।

নবকুমার মেয়েটিকে জিজ্ঞাসা করল, ‘দুর্বার সমিতিতে ডাক্তার বসেন, ওকে ওখানে নিয়ে গিয়ে দেখাতে কী অসুবিধে?’

‘কে নিয়ে যাবে? বাড়িওয়ালির মাস্তান শাসিয়ে রেখেছে এ-বাড়ির কেউ দুর্বারের মেম্বার হলে ঠিকানা পালটাতে হবে।’ মেয়েটি বলল।

ইতির কান্না থেমেছিল। একটু ভেবে নবকুমার বলল, ‘দেখি কী করা যায়।’

সঙ্গে-সঙ্গে ইতি মুখ ফেরাল, ‘কিছুই করতে হবে না। চেনা নেই, জানা নেই আমার মতো একজন লাইনের মেয়ের জন্যে বিপদ ডেকে আনতে হবে না।’

‘কীসের বিপদ?’

‘হারু মাস্তানের নাম এখনও শোননি তাই বলছ।’

নবকুমার জিজ্ঞাসা করল, ‘এই বাড়ির নম্বর কত?’

‘একশো দুই-এর তিন।’ মেয়েটি জবাব দিল।

নবকুমার বেরিয়ে এল। বাইরে তখন হইচই, গান বাজছে। রিকশা, ট্যাক্সিতে চেপে খদ্দের আসছে। সে সোজা দুর্বার সমিতিতে চলে এল। নীচের তলায় লোকজন নেই। নবকুমারের মনে হল সমিতি ছুটি হয়ে গিয়েছে। তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে একটি লোক বেরিয়ে এল ওপাশের ঘর থেকে, ‘কী চাই?’

‘কেউ নেই?’

‘না। অফিস বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এখন তো আটটা বাজে।’

‘কখন খুলবে?’

‘চাই কাকে?’

‘কবিতা—।’

‘ও। নাম কী?’

‘নবকুমার।’

‘দাঁড়াও।’ লোকটা সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে গেল। তখনই নবকুমারের মনে পড়ল দুর্গার কথা। দুর্গার অসুখ কী তা নিশ্চয়ই ওরা জানতে পেরেছে এতক্ষণে। কবিতা কি এ-বাড়ির ওপরে থাকে? নইলে লোকটা ওপরে যাবে কেন?

লোকটা নেমে এল, ‘যাও, ওপরে উঠে বাঁ-দিকের ঘর। ওখানে কবিতা আর চন্দ্রিমাদি কাজ করছেন।’

ওপরে উঠে এল নবকুমার। বাঁ-দিকের দরজায় দাঁড়াতেই দেখতে পেল প্রথম দিনের দেখা ভদ্রমহিলা, যাঁর নাম চন্দ্রিমা, কাগজে কিছু লিখছেন। উলটোদিকে বসে আছে কবিতা।

কবিতা তাকে দেখে জিজ্ঞাসা করল, ‘কী ব্যাপার?’

নবকুমার বলল, ‘দুর্গার ব্যাপারে জানতে এসেছিলাম।’

কবিতা চন্দ্রিমাদির দিকে তাকাল।

চন্দ্রিমাদি বললেন, ‘তুমি খুব ভালো কাজ করেছ ওকে আমাদের কাছে নিয়ে এসে। ও আপাতত কিছুদিন আমাদের কাছেই থাকবে।’

‘ওর কি খুব মারাত্মক অসুখ করেছে?’ নবকুমার জিজ্ঞাসা করল।

‘খুব যন্ত্রণাদায়ক তো বটেই। জেনিটাল হারপিস।’ চন্দ্রিমাদি গম্ভীর গলায় বললেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *