চোদ্দো
এখন চারধারে যেন মেলা বসে গেছে। গান বাজছে তারস্বরে, গলি উপচে পড়ছে বিচিত্র পোশাকের সুন্দরীদের ভিড়ে। মাথা নীচু করে মেয়েটার পাশে হাঁটছিল নবকুমার। এফএমে তারস্বরে গান বাজছে। একটা লোক চিৎকার করে বেলফুল বিক্রি করতে চাইছে। তাদের গ্রামের মেলায় গেলে এরকম আওয়াজ শোনা যায়। কিন্তু ওই মেয়েগুলো থাকে না।
হাঁটতে-হাঁটতে মেয়েটা জিজ্ঞাসা করল, ‘রাস্তা চিনতে পারছ?’
‘এখন কীরকম অচেনা লাগছে। আমি যখন বেরিয়েছি তখন একদম ফাঁকা ছিল।’
‘যাব্বাবা।’
একটা মোড় পার হতেই দুটো সেপাই সামনে চলে এল। একজন বলল, ‘কীরে? আমাদের সামনেই কাস্টমার পাকড়ে ঘরে নিয়ে যাচ্ছিস? পঞ্চাশ টাকা দিতে বল।’
.
.
মেয়েটা হাসল, দুলে-দুলে বলল, ‘ও আমার কাস্টমার নয়।’
‘ভ্যাট! উলটো বোল দিলে ভ্যানে তুলে নেব।’
মেয়েটা হাসল, ‘ওসব দিন চলে গেছে। অন্যায় না দেখলে পুলিশ নাক গলাবে না, তোমাদের বড়বাবু দুর্বারকে কথা দিয়েছে।’
‘যা: শালা! এর মধ্যে দুর্বার আসছে কোত্থেকে?’
‘একে চেনো?’
‘না।’
‘চিনলে প্যান্ট হলুদ হয়ে যাবে। চলো।’
সেপাইদুটোর সামনে দিয়ে নবকুমারকে নিয়ে চলে এসে মেয়েটা বলল, ‘কলকাতায় যে মিনমিন করে তাকে সবাই পায়ের তলায় রাখে। যে গলা তোলে তাকে এড়িয়ে যায়। বুঝলে? এবার চিনতে পারছ তোমার শেফালি-মায়ের বাড়ি?’
বাড়ির দরজায় গোটা পাঁচেক মেয়ে সেজেগুজে দাঁড়িয়ে। চিনতে অসুবিধে হল না। নবকুমার মাথা নাড়তে মেয়েটা বলল, ‘আমি চলি। একটা কথা শোনো, রাতবিরেতে এ-পাড়ায় একা বেরিও না। শকুনের বাচ্চাগুলো ওত পেতে থাকে।’
মেয়েটা ফিরে যাওয়ার জন্যে ঘুরতেই নবকুমার জিজ্ঞাসা করল, ‘তোমার সত্যিকারের নাম কী?’
মেয়েটা নবকুমারের দিকে তাকিয়ে হাসল, ‘কী দরকার তোমার?’
নবকুমার জবাব দিতে পারল না। মাটির দিকে তাকাল।
মেয়েটা বলল, ‘সত্যিকারের নামটা এখন আর কাউকে বলি না। হয়তো একসময় নিজেই ভুলে যাব। আচ্ছা, তোমাকেই বলে রাখি। পাঁচ-পাঁচটা মেয়ে হওয়ার পর হাল ছেড়ে দিয়ে বাবা নাম রেখেছিল, ইতি। মা ডাকত ইতু বলে। চললাম।’
কাদাগোলা ঢেউয়ের মধ্যে রাজহাঁসের মতো সাঁতরে ইতি চোখের আড়ালে চলে গেল। হঠাৎ নবকুমারের মাথায় প্রশ্ন এল। ইতির আর চার বোন এখন কোথায়? তাদের সঙ্গে কি ইতির সম্পর্ক আছে? আর মা-বাবা? তারা যদি বেঁচে থাকে তাহলে ইতি এখানে কেন থাকবে?
‘এই যে ছেলে? এখানে দাঁড়িয়ে আছ? যে-কোনও সময় পুলিশ ভ্যানে তুলবে। চলো, ভেতরে চলো।’ নাকের ডগায় এসে মুক্তো ঝাঁঝিয়ে উঠতেই নবকুমারের হুঁশ ফিরল।
সে দেখল মুক্তোর এক হাতে বাজারের ব্যাগ, অন্যহাতে কাগজে মোড়া মাটির ভাঁড়। দরজার সামনে পৌঁছে মুক্তো চেঁচাল, ‘এই, সর, সর। দরজা জুড়ে দোকান দিয়েছে সব। অ্যাই ছোঁড়া, পেছন-পেছন এসো।’
নবকুমার মুক্তোকে অনুসরণ করল। ভেতরের চাতাল পেরিয়ে সিঁড়িতে পা রাখতেই রেলিং ধরে দাঁড়ানো মেয়েদের একজন ফুট কাটল, ‘এ যে শেয়াল আর মুনিয়ার ছানা।’
সঙ্গে-সঙ্গে হই-হই করে হেসে উঠল মেয়েগুলো। মুক্তো রণমূর্তি ধরল, ‘কে? কে? কার এত হিম্মত? কোন মাগি? জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলব আমি। আমি মুক্তোমালা। এখানেই কামাচ্ছি কিন্তু বাবু ধরিনি, হ্যাঁ!’
কেউ কথা বলল না। মুক্তো মুখ ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে সবাইকে দেখল। তারপর বিড়বিড় করতে-করতে ওপরে উঠল। সে যখন চোখের আড়ালে চলে যাচ্ছে, তখন আর-একজন বলল, ‘ধরবে কী করে? পোড়া গাছে কোনও পাখি বসে?’
কথাটা স্পষ্ট শুনতে পেল নবকুমার। সে মুখ নীচু করে মুক্তোকে অনুসরণ করে শেফালি-মায়ের এলাকায় চলে আসতেই মুক্তো বলল, ‘এখানে একটু দাঁড়াও।’
পাশের দরজা দিয়ে মুক্তো ভেতরে ঢুকে গেল। নবকুমার ধন্দে পড়ল। বাড়ির সামনের রাস্তায় এসময় দাঁড়িয়ে থাকা কি অন্যায় হয়েছে? মুক্তোর মুখে সেটা শুনে শেফালি-মা যদি রেগে যান তাহলে নিশ্চয়ই এই বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলবেন তাকে। শেফালি-মা বেশ ভালো। কিন্তু ওঁর মধ্যে একটা কঠিন ব্যাপারও আছে। এ-বাড়ি ছেড়ে তখন যাত্রার গদিতে গিয়ে থাকতে হবে। সে থাকা কেমন হবে কে জানে!
‘অ্যাই, এসো।’ মুক্তো পরদা সরিয়ে ডাকল।
শেফালি-মায়ের গলা ভেসে এল, ‘ও কী রকমের ডাকা মুক্তো। কোনও ভদ্রছেলেকে কেউ অ্যাই বলে ডাকে?’
মুক্তো ঘাড় শক্ত করে বলল, ‘মাথায় আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে ওরা। তুমি একে জিজ্ঞাসা করে দ্যাখো।’
‘আমি কি অবিশ্বাস করেছি?’ শেফালি-মা বিছানার ওপর বাবু হয়ে বসে বললেন। তাঁর সামনে একটা বই খোলা।
‘তাহলে একটা বিহিত করতেই হবে।’ মুক্তোর গলায় জেদ।
‘কে বলেছে কথাটা?’
‘ধরতে পারলে তো তখনই টুঁটি চেপে ধরতাম। মুখ দেখে তো বোঝা যায় না। সবক’টা মেয়ে হেলেসাপের বাচ্চা।’
‘এত সাপ থাকতে হেলে কেন?’ বলে শেফালি-মা নবকুমারের দিকে তাকালেন, ‘ও ছেলে, তুমি তো গ্রামের মানুষ, হেলে সাপ দেখেছ?’
মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল নবকুমার।
‘খুব বিষধর সাপ?’ শেফালি-মা জিজ্ঞাসা করলেন।
‘না। হেলে সাপের বিষ থাকে না। কামড়ালে একটু ঘা হয়।’
নবকুমারের কথা শেষ হতেই মুক্তো বলল, ‘তবে আর বলছি কী। বিষ নেই তার মেজাজ কী! এই মেয়েগুলো সেইরকম।’
‘তা যদি বলো, ওদের পাত্তা দেওয়ার দরকার কী? মুখের সামনে দাঁড়িয়ে তো বলে না।’
মুক্তো মুখ ঘোরাল, ‘তুমি যদি এই কথা বলো তাহলে তো আর আমার এখানে থাকা চলে না। হ্যাঁ, বুঝতাম কালনাগিনী, ছোবল মারছে, তা-ও একটা সম্মান ছিল! কিন্তু কেঁচোগুলো ফণা তুললে যদি মুখ বুজে সইতে হয় তাহলে আমার দেশে চলে যাওয়াই ভালো।’
শেফালি-মা সোজা হয়ে বসলেন, ‘বেশ তো। আমি কাউকে জোর করে এখানে আটকে রাখিনি। নোংরা জলে হাঁটতে গেলে পায়ে নোংরা লাগবেই। সেটা ভালো জলে ধুয়ে নিলেই তো হয়। কিন্তু যে পায়ে লাগা নোংরা জল যেচে মুখে মাখে তার এখানে থাকা উচিত নয়।’
মুক্তোর গলার স্বর বদলে গেল, ‘আমি যেচে মুখে মেখেছি?’
‘তা নয় তো কী। কে কী বলল আর তিড়িং-বিড়িং নাচ শুরু হয়ে গেল। তার ওপরে এই ছেলেটাকে পেছন-পেছন সাক্ষী দিতে নিয়ে এলি?’
‘ওমা! আমি না নিয়ে এলে তো থানায় ধরে নিয়ে যেত!’ মুক্তো গালে হাত রাখল।
অবাক হয়ে তাকালেন শেফালি-মা।
‘মুদির দোকানে গিয়েছিলাম। জিনিস কিনে ফিরছি, হঠাৎ দেখি এটি রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে হাঁ করে তাকিয়ে আছে। চারপাশের দরজায়-দরজায় মেয়েমানুষের ভিড়, দালালগুলো চক্কর মারছে। ভ্যান এলেই খপ করে তুলে নিত। আমিই তো ডেকে বাড়িতে ঢোকালাম।’ মুক্তো গড়গড় করে বলে গেল।
‘তুমি এই সময়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কী করেছিলে?’ শেফালি-মা প্রশ্ন করলেন।
‘বাড়িতে কী করে ঢুকব বুঝতে পারছিলাম না।’
‘কেন?’
‘দরজাজুড়ে সবাই দাঁড়িয়েছিল।’
‘হুঁ।’ একটু ভেবে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তা আজ কি রিহার্সাল হয়েছিল?’
‘হ্যাঁ।’
‘তুমি প্রম্পট করেছ?’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ।’
‘সেটা শেষ হল এখন?’
‘না। বিকেলেই হয়ে গেছে। মালিক বলেছেন কাল দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত হবে।’
‘বিকেলে যখন শেষ হয়েই গেল তখন ফেরোনি কেন? সেসময় বাড়ির দরজায় এত ভিড় হয় না। কোথায় ছিলে এতক্ষণ?’ শেফালি-মা তাকালেন, ‘গদিতেই?’
‘না। পাইকপাড়ায় গিয়েছিলাম ট্রামে চড়ে।’
‘সে কী? তুমি সেখানে চিনে গেলে? কে থাকে সেখানে?’
‘আসার সময় ট্রেনে আলাপ হয়েছিল। আমাকে বারবার যেতে বলেছিল। ভাবলাম, কাল থেকে তো আর সময় পাব না, তাই—।’
‘তা তারা জিজ্ঞাসা করেনি কোথায় উঠেছ?’
‘হ্যাঁ। বলেছি, যাত্রার গদির কাছেই।’
‘তোমার মালিককে কি বলেছ এখানে থাকার কথা?’
‘মাস্টারদা বলেছে। ওঁর আপত্তি নেই।’
‘বেশি টাকা দেবে?’
‘হ্যাঁ।’
‘শোনো বাবা, রিহার্সাল শেষ হতে যদি রাত হয় তাহলে ওই পথে আর আসবে না। তুমি গাঁয়ের ছেলে, পুলিশ ধরে নিয়ে গেলে বিপদে পড়বে। আর সঙ্গে পাঁচ টাকার বেশি রাখবে না। কাল যখন বেরুবে, তখন মুক্তো তোমাকে খিড়কিপথটা দেখিয়ে দেবে। ওটা সোজা গিয়ে পড়েছে সেন্ট্রাল অ্যাভিন্যুতে। ওটা ময়লা ফেলার রাস্তা বলে ভদ্রলোকেরা ব্যবহার করে না, তাই পুলিশও ওদিকে মাড়ায় না। বুঝলে?’
মাথা নাড়ল নবকুমার।
‘বিকেলে কিছু খেয়েছ?’
মিথ্যে কথা বলতে পারল না নবকুমার। শেফালি-মা বললেন, ‘মুক্তো, তাড়াতাড়ি নবকুমারকে ভাত দিয়ে দে। খেয়ে শুয়ে পড়ুক।’
মুক্তো বেরিয়ে যাচ্ছিল। শেফালি-মা আবার তাকে ডাকলেন, ‘শোন মুক্তো। যে মেয়ে তোকে পিনিক দিয়েছে সে কোন ঘরে থাকে তা জানতে পারলে আমাকে বলিস। আমি বেয়াদপি সহ্য করি না।’
এতক্ষণে মুক্তোর মুখ সহজ হল। মাথা নেড়ে বেরিয়ে গেল সে।
নবকুমার বলল, ‘আমি যাই?’
‘হ্যাঁ। যাও। ঘরে গিয়ে এখন কী করবে?’
‘বসে থাকব।’
‘আচ্ছা, তোমার মনে কৌতূহল হচ্ছে না এই পাড়ার মেয়েদের দেখে?’
‘কষ্ট হচ্ছে। কেন যে ওরা—?’ নবকুমার থেমে গেল।
‘দুর্বার সমিতিতে গিয়ে কেমন লাগল?’
নবকুমার তাকাল, ‘খুব ভালো। ওখানে যারা ছিল তাদের সঙ্গে এই দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েদের কোনও মিল নেই।’
‘এখানে ওরা পেশার খাতিরে ফস্টিনস্টি করে, গান গায়, চেঁচায়। লোক যেমন কলকারখানায় গিয়ে কাজ করে, যাত্রা দলে অভিনয় করে, তেমনই। কিন্তু বাড়ি ফিরে তো অভিনেতা যাত্রার সংলাপ বলে না। তখন তাদের আসল চেহারা দেখা যায়। দুর্বারে এলাকার যেসব মেয়েকে দেখেছ সেটা ওদের আসল চেহারা। দরজায় এদের দেখে কখনও ভেব না, এরা খুব আনন্দে আছে। পুলিশ, মাস্তান, আর বেশিরভাগ বাড়িওয়ালির দাবি মিটিয়ে শরীর বিক্রি করে ওদের যা থাকে তা এত সামান্য যে, ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে ছিল এতকাল। দুর্বার হওয়ার পরে ওরা বাঁচার স্বপ্ন দেখছে। এদের জন্যে তুমি কষ্ট পাচ্ছ, ঠিক আছে, কিন্তু কখনও এদের ঘেন্না কোরো না। যাও, হাত-মুখ ধুয়ে এই বইটা পড়ো। মুক্তো খাবার দিলে খেয়ে শুয়ে পড়বে।’ শেফালি-মা একটা মলাট দেওয়া বই দিলেন।
ঘরে ঢুকে আলো জ্বেলে বিছানায় বসল নবকুমার। হঠাৎ গ্রামের কথা মনে এল। মা-বাবা নিশ্চয়ই খুব ভাবছে! কালই একটা চিঠি দিতে হবে। বইটা খুলল সে।
পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ। লেখকের নাম অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত।
