বারো
নবকুমারের মনে হল কলিকাতার মানুষেরা বেশ ভালো।
মাস্টারদার নির্দেশমতো ট্রামে চেপে বেলগাছিয়ার ট্রাম যেখানে ডিপোতে ঢুকছে সেখানে নেমে একজন বয়স্ক মানুষকে জিজ্ঞাসা করতে তিনি বললেন, ‘তিন নম্বর মা দুর্গা লেন? ঠিক কোন বাড়ি তা বলতে পারব না, তবে তুমি সোজা এগিয়ে যাও। প্রথম ডানদিকের গলি ছেড়ে দ্বিতীয়টায় ঢুকে কাউকে জিজ্ঞাসা করলেই বাড়ি চিনতে পারবে।’
সেইমতো এগিয়েছিল নবকুমার। এখন বিকেল। ছায়া ঘন হয়েছে। তিনটে ছেলে গলির মুখে দাঁড়িয়ে গল্প করছিল। নবকুমার তাদের সামনে গিয়ে জিজ্ঞাসা করতেই ছেলেগুলো অবাক হয়ে তাকে দেখল। একজন জিজ্ঞাসা করল, ‘তিন নম্বরে কার কাছে যাবেন? মানে দুটো ফ্যামিলি আছে ও-বাড়িতে।’
নবকুমার ফাঁপড়ে পড়ল। ছুটকির বাবা-মায়ের নাম তার জানা নেই। ছুটকির নাম বলাটা কি ঠিক হবে? সঙ্গে-সঙ্গে মন্দিরার মুখ মনে আসতেই সে বলল, ‘মন্দিরাদি।’
‘অ। চলুন, আপনাকে পৌঁছে দিয়ে আসছি।’ ছেলেটি হাঁটতে শুরু করল। আর তখনই নবকুমারের মনে হল কলিকাতার মানুষেরা বেশ ভালো।
‘আপনি ওদের আত্মীয়?’ হাঁটতে-হাঁটতে ছেলেটি জানতে চাইল।
‘না-না। আমাকে আসতে বলেছিলেন ওঁরা।’
‘এতদিন বাইরে ছিল, কাল ফিরেছে। কাল এলে দেখা পেতেন না।’
‘আমি জানি।’
‘ও। অনেক আগে থেকেই আলাপ বুঝি।’
‘না। ট্রেনে আলাপ হয়েছে।’
ছেলেটা তাকাল। তারপর বলল, ‘ওই বাড়ি। বাঁ-দিকের দরজার কড়া নাড়লেই সাড়া পাবেন। ঠিক আছে, চলি। আমার নাম লালু। আবার দেখা হবে।’ ছেলেটা হেসে চলে গেল তার বন্ধুদের কাছে।
নবকুমার দরজায় কড়া নাড়ল। প্রথমবারে কোনও সাড়া পেল না। দ্বিতীয়বার শব্দ করার পর একটি মহিলা কণ্ঠ জানতে চাইল, ‘কে?’
নবকুমার ইতস্তত করে জবাব দিল, ‘আমি!’
এই সময় পাশের জানলাটা খুলে গেল। নবকুমার শুনতে পেল, ‘ওমা, তুমি!’
গলাটা যে মন্দিরার তা বুঝে ওঠার সঙ্গে-সঙ্গে দরজা খুলে এক গাল হাসল মন্দিরা, ‘এসো-এসো। কী সৌভাগ্য! ভেতরে এসো।’
নবকুমার ঘরে ঢুকলে দরজা বন্ধ করল মন্দিরা, ‘এত তাড়াতাড়ি তোমার দেখা পাব ভাবতে পারিনি। এখানে বসো।’
বেশ পুরোনো, লম্বা সোফা দেখিয়ে দিল মন্দিরা। নবকুমার সঙ্কোচে বসল সেখানে। মন্দিরা বলল, ‘দাঁড়াও। আসছি।’
সে বেরিয়ে গেলে ঘরটাকে দেখল নবকুমার। পরিষ্কার, কিন্তু ঘরে যা আছে তা বেশ পুরোনো। কিন্তু ভেতরে কারও গলার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে না কেন? ছুটকি তো বটেই, ওদের মা-বাবার তো এর মধ্যে চলে আসা উচিত। কিন্তু মন্দিরাই ফিরে এল এক গ্লাস জল নিয়ে, ‘নাও প্রথমে এটা খেয়ে নাও। মুখ শুকিয়ে আমসি হয়ে গেছে। খুব ঘুরেছ বুঝি?’
জল খেয়ে তৃপ্তি পেল নবকুমার। মনে হল, মন্দিরা খুব ভালো মানুষ। আজ পর্যন্ত কারও বাড়িতে গেলে কেউ জল এগিয়ে দেয়নি তাকে।
নবকুমার জিজ্ঞাসা করল, ‘আর সবাই কোথায়?’
‘আর সবাই মানে। ও, তুমি ছুটকির খোঁজ করছ?’ মন্দিরার চোখ ছোট হল।
‘না-না। আপনার মা-বাবা!’
‘আবার আমাকে আপনি বলছ? আপনি শুনতে আমার একদম ভালো লাগে না। তুমি বলবে। আপনি-টাপনি দূরের মানুষকে বলে। ওরা সবাই দক্ষিণেশ্বরে গিয়েছে। বসো না, এসে যাবে একটু পরে। বাড়ি খালি থাকবে, তাই আমি পাহারায় আছি।’ মন্দিরা হেসে সোফার অন্য পাশে বসল।
‘আপনারা…’
‘আবার?’
‘ও। তোমরা যখন বাইরে গিয়েছিলে তখন এই বাড়িতে অন্য কেউ ছিল?’
‘হ্যাঁ। মায়ের খুড়তুতো ভাই। বিয়ে করেনি। বুড়োকে লোকে তাই এইরকম কাজে লাগায়। আমি আজ যে যাইনি তার আর-একটা কারণ আছে।’ মন্দিরার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। ঠোঁট কামড়াল সে।
‘কী?’ নবকুমার তাকাল।
‘আমার জীবনের সব থেকে বড় ভুল আজকের দিনে করেছিলাম।’ মন্দিরা শব্দ করে শ্বাস ফেলল, ‘কী বোকা ছিলাম তখন।’
নবকুমার অস্বস্তিতে পড়ল। দু-হাতে মুখ ঢেকে ফেলেছে মন্দিরা। এবার ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। মন্দিরার কী ভুল হয়েছিল আজকের দিনে তা সে জানে না। ছুটকি বলেছিল মন্দিরা প্রেম করে বিয়ে করেছিল। ছেলেটা খারাপ ছিল। অত্যাচার করত। সেই বিয়ে ভেঙে গেছে! তাহলে আজ কি সেই বিয়ের দিন?
নবকুমার চুপ করে বসে রইল। মন্দিরা তার থেকে বয়সে অনেক বড়। ও যদি ছোট হত তাহলে অনেক সান্ত্বনার কথা শোনাতে পারত। মন্দিরা কেঁদেই চলেছে, ওর পিঠ উঠছে নামছে। নবকুমার মনে-মনে বলল, কেঁদো না মন্দিরা। যা হওয়ার তা তো হয়ে গেছে। তুমি খুব ভালো মেয়ে। খুব সুন্দর দেখতে। তুমি আবার কাউকে বিয়ে করে সুখী হতেই পারো। বিদ্যাসাগরমশাই যদি বিধবাদের বিয়ে চালু করতে পারেন তা হলে বিয়ে ভেঙে যাওয়ার পরেও মেয়েরা আবার বিয়ে করতে পারে। তুমি তাই করো মন্দিরা।
মন্দিরা চোখ মুছল। একটু-একটু করে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে হঠাৎ উঠে ভেতরে চলে গেল। নবকুমার ভাবল এবার তার চলে যাওয়া উচিত। হোক বয়সে বড় কিন্তু মন্দিরা একজন যুবতী মহিলা, খালি বাড়িতে তাই তার বেশিক্ষণ থাকা উচিত নয়।
মন্দিরা ফিরে এল চোখেমুখে জল দিয়ে। এসে বলল, ‘তোমাকে অযথা কষ্ট দিলাম।’
‘না-না। তা কেন?’
‘বা:। আমার কান্না দেখে তুমি কষ্ট পাওনি?’ মন্দিরা পাশে এসে বসল।
‘খারাপ লেগেছে। তোমার খুব দু:খ, না?’ নবকুমার কোমল গলায় জিজ্ঞাসা করল। মাথা নেড়ে হুঁ বলল মন্দিরা। তারপর বড় শ্বাস ফেলে বলল, ‘আমার কথা থাক। আমি রব চিরকাল নিস্ফলের হতাশার দলে। আজই সেইদিন যেদিন ওর হাসি, ওর কথা শুনে প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম। আর প্রেমে পড়তেই আমি এত সিরিয়াস হয়ে গিয়েছিলাম লায়লা, ক্লিওপেট্রা কিংবা রাধা হতে পারিনি। বিয়ে করলাম। ব্যস, তার পরেই একটু-একটু করে ভুল ভাঙতে লাগল। আমার বুক থেকে সব প্রেম নিষ্ঠুরভাবে তুলে নিয়ে ও খেলা করতে লাগল। শেষপর্যন্ত ছাড়াছাড়ি করতে বাধ্য হলাম। কিন্তু ও যদি ভেবে থাকে আমার হৃদয় প্রেমশূন্য করে চলে যেতে পেরেছে তাহলে ওর মতো মূর্খ কেউ নেই। যাক গে, তোমার কথা বলো নব। তুমি কোথায় উঠেছ?’
‘আমি?’ ধ্বক করে বুকে কাঁপুনি এল। সে যে সোনাগাছিতে উঠেছে একথা মন্দিরা কীভাবে নেবে? কিন্তু না বললে মিথ্যে কথা বলতে হবে। চোখ বন্ধ করে বলল, ‘মাস্টারদা আমাকে একজন বয়স্কা মহিলার বাড়িতে জায়গা করে দিয়েছে। ভদ্রমহিলা এককালে যাত্রা করতেন। চিৎপুরের কাছে।’
‘বয়স্কা? কত বয়স?’ চোখ ছোট করল মন্দিরা।
‘কী জানি? সত্তরের কাছে বলে মনে হয়।’
যেন স্বস্তি পেল মন্দিরা, ‘তাই বলো। কাজকর্মের চেষ্টা করছ?’
‘হুঁ। আজই একটা কাজ পেয়েছি।’
‘তাই?’ মন্দিরার মুখ হাসিতে ঝকঝকে, ‘কোথায়?’
‘মাস্টারদা যে যাত্রাদলে অভিনয় করেন সেখানে। প্রম্পটার। মাস্টারদা বলেছে খুব শিগগির উন্নতি হবে।’ নবকুমার হাসল।
‘যাত্রাদল। সেখানে নিশ্চয়ই অনেক মেয়ে আছে?’
‘আমি জানি না।’
‘যাত্রা যখন, তখন থাকবেই। খবরদার, তাদের সঙ্গে কাজের বাইরে কথা বলবে না। কথা দাও।’ বাঁ-হাত বাড়িয়ে দিল মন্দিরা।’
‘আশ্চর্য! কাজের বাইরে আমি কেন কথা বলব?’
‘ওরা বলাবে। মেয়েমানুষকে তুমি চেনো না। কথা দাও।’
‘ঠিক আছে, দিলাম।’
‘উঁহু! আমার হাত ছুঁয়ে বলো।’
টুক করে হাত ছুঁয়ে নবকুমার বলল, ‘ঠিক আছে। কিন্তু ওরা তো এখনও এলো না? বোধহয় দেরি হবে।’
‘তোমার কি আমার পাশে বসতে খারাপ লাগছে?’
‘না-না।’
‘তোমাকে একটা কথা বলি। ছুটকি সম্পর্কে সাবধান।’
‘কেন?’
‘আর বলো না। কী গণ্ডগোল। ওর যে বেশ কয়েকটা লাভার আছে তা জানতাম। কিন্তু তাদের সংখ্যা যে সাতজন তা কী করে জানব?’
‘সাতজন লাভার?’
‘বলছি কী! আমরা যখন ছিলাম না তখন পাড়ায় ওকে নিয়ে ওদের মধ্যে খুব মারপিট হয়ে গেছে। কাল রাত্রে বাড়ি ফিরে পাশের বাড়ির বউদির কাছে সব শুনে বাবা-মা ঠিক করল ওকে আর এখানে রাখবে না। তাই ওরা সবাই ছুটকিকে নিয়ে রানাঘাটে গিয়েছে।’ মন্দিরা বলল।
‘রানাঘাটে কেন?’
‘মামার বাড়িতে রেখে আসবে।’
‘তার মানে দক্ষিণেশ্বরে যায়নি?’
‘না। তখন তোমাকে মিছিমিছি বলেছিলাম। চট করে বাড়ির কেচ্ছা বলতে কি ইচ্ছে করে? তুমি রাগ কোরো না।’ মন্দিরা নবকুমারের হাত ধরল।
‘তাহলে ছুটকির এখন কী হবে?’
‘কী আর হবে? ওখানে থাকবে। স্কুলে ভরতি হবে। পাস করলেই ওর বিয়ে দেওয়া হবে।’ মন্দিরা বলল।
নবকুমার হাত ছাড়াতে চেষ্ট করল, ‘আজ তাহলে উঠি। বেশি রাত হয়ে গেলে রাস্তা গুলিয়ে ফেলব।’
‘আরও একটু থাকো প্লিজ।’ ঘনিষ্ঠ হল মন্দিরা।
‘তুমি, তুমি বুঝতে পারছ না!’ ছটফটিয়ে উঠল নবকুমার।
‘কী বুঝতে পারছি না?’ দু-হাত ডানার মতো মেলে নবকুমারের কাঁধ ধরল মন্দিরা, ‘আমি তোমার চেয়ে বয়সে বড় বলে সঙ্কোচ হচ্ছে?’
‘কথাটা মিথ্যে নয়। তা ছাড়া—!’
বাধা দিল মন্দিরা, ‘তাহলে রাধাকৃষ্ণের প্রেম মিথ্যে! তাই তো?’
‘মানে?’
‘রাধা তো কৃষ্ণের চেয়ে বয়সে বড় ছিলেন। সম্পর্কে তিনি কৃষ্ণের মামিমা হতেন। কই, তার জন্যে তো ওদের প্রেম আটকায়নি। অবশ্য তুমি যদি বল আমার একবার বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে বলে আমাকে পছন্দ হচ্ছে না তাহলে আলাদা কথা!’ মন্দিরা সরাসরি তাকাল। তার পরেই হেসে ফেলল সে, ‘ঠিক আছে, আজ নয়। একটু ভেবে আমাকে বলো। কেমন?’ হাত সরিয়ে নিল সে।
নবকুমার স্বস্তি পেল, ‘তাহলে আমি চলি।’
‘কবে আসবে?’
‘আসব।’
‘রবিবারে নিশ্চয়ই তোমার ছুটি। তাহলে মিনার সিনেমার সামনে ইভনিং শোয়ের আগে এসো। আমি টিকিট কেটে রাখব। দুজনে সিনেমা দেখব। আর যদি ছুটি না থাকে তাহলে এর মধ্যে জানিয়ে যেও। কেমন?’
‘ঠিক আছে।’
বাইরে বেরিয়ে হনহনিয়ে হাঁটছিল নবকুমার। গলির মোড়ে আসতেই সেই ছেলেদের একজন ডাকল, ‘এই যে, এত তাড়া কীসের। এদিকে এসো।’
