এগারো
ঘরের একপাশে আধা-আরামচেয়ারে বসে যাত্রাপার্টির মালিক বললেন, ‘শুরু হোক। কমলা কোথায়?’ ভদ্রলোক চারপাশে তাকাতেই রোগা ফরসা একটি মেয়ে এগিয়ে এল।
‘কমলা, তুমি বর্ণালীর প্রক্সি দাও আজ। মন দিয়ে দেবে।’
‘বড়বাবু!’ কমলা নীচু স্বরে বলল।
বড়বাবু মুখ তুললেন। কোনও প্রশ্ন করলেন না।
‘গত বছর আমি শুধু প্রক্সি দিয়ে গেছি।’
‘তো?’ বড়বাবু জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তার জন্যে তুমি টাকা পাওনি?’
মাথা নাড়ল কমলা, ‘ঠিক আছে।’
বড়বাবু হাঁকলেন, ‘সুধাকান্তবাবু, এবার শুরু করান। আপনি ডিরেক্টর, আপনি উদ্যোগী না হলে তো ষষ্ঠীর আগে পালা তৈরিই হবে না।’
‘সবাইকে একসঙ্গে না পেলে রিহার্সালে বড় মুশকিল হয় বড়বাবু।’ লম্বাচুল এক প্রবীণ কথাগুলো বললেন।
‘হিরোইন যদি খবর পাঠান, তিনি অসুস্থ বলে আসতে পারছেন না তাহলে আমি কী করতে পারি? আর কে আসেনি?’ বড়বাবু জিজ্ঞাসা করলেন।
‘হিরো এখনও এসে পৌঁছয়নি। ফোন করেছিল। জ্যামে আটকে আছে।’
‘হুম। আর?’
‘প্রম্পটার। একজন ভালো প্রম্পটার দরকার।’
বড়বাবু চোখ তুলে মানুষগুলোর ভিড়ে কাউকে খুঁজে না পেয়ে বললেন, ‘মাস্টার আসেনি?’
সঙ্গে-সঙ্গে একটা হাত ওপরে তুলে মাস্টারদা একটু ঝুঁকে এগিয়ে গেল ভিড় ঠেলে, ‘আমি অনেকক্ষণ আগে এসেছি বড়বাবু।’
‘তুমি যেন কী বলেছিলে! কাকে নিয়ে এসেছ প্রম্পটের জন্যে?’
‘হ্যাঁ, বড়বাবু।’
‘কোথায় সে?’
মাস্টারদা হাত নেড়ে নবকুমারকে কাছে আসতে বলল। এত মানুষ যাদের সবাই যাত্রাদলের শিল্পী, তার ওপর বাঘের মতো আচরণ বড়বাবুর, নবকুমারের পা ঝিমঝিম করছিল। সে কোনওরকমে মাস্টারের পাশে এসে দাঁড়াল।
‘এ তো বাচ্ছা ছেলে! এ কী করে পারবে? যত্তসব।’
‘আপনি একটু কথা বলে দেখুন বড়বাবু।’ মাস্টার মিনমিন করে বলল।
‘পড়াশুনা করেছ?’ বড়বাবু হুঙ্কার দিলেন।
নি:শব্দে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল নবকুমার।
‘কোন ক্লাস পর্যন্ত?’
‘বিএ পাশ করেছি।’ নবকুমার মেঝের দিকে তাকিয়ে জবাব দিল।
‘অ্যাঁ? আচ্ছা! নাম কী?’
‘নবকুমার।’
সঙ্গে-সঙ্গে একটু অস্ফুট হাসির আওয়াজ উঠেই মিলিয়ে গেল। বড়বাবু জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কখনও প্রম্পট করেছ?’
‘করেছি। স্কুলে, কলেজে।’
‘কোথাকার।’
‘গ্রামের।’
বড়বাবু হাঁকলেন, ‘সুধাকান্তবাবু, ওকে খাতাটা দিন। হিরো-হিরোইন ছাড়া যে-কোনও একটা সিন ধরুন।’
সুধাকান্তবাবু বললেন, ‘এসো। এই সিনটা তুমি প্রম্পট করবে। তার আগে আমি সিনটা পড়ে শোনাচ্ছি। অনিল, শ্যামল আর নিরুপমা, তোমরা আছ এই সিনে।’ সুধাকান্ত দৃশ্যটি পড়ে শোনালেন। আবেগে তাঁর কণ্ঠস্বর উঠছিল নামছিল। এক ছেলে অসহায় মাকে ত্যাগ করে ঘরজামাই হতে যাচ্ছে, শ্বশুর তাকে এ-ব্যাপারে উৎসাহ দিচ্ছে। মিনিটতিনেকের দৃশ্য। পড়া হয়ে গেলে সুধাকান্তবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমাদের কারও কোনও প্রশ্ন আছে?’ তিনজনেই মাথা নেড়ে না বলল।
সুধাকান্তবাবু খাতাটা নবকুমারের হাতে দিয়ে বললেন, ‘বসো। সংলাপ মুখস্থ না হওয়া পর্যন্ত আমরা বসে-বসে বলি। শুরু করো।’
নবকুমার পড়ল, ‘স্নেহ সর্বদা নিম্নগামী। কী আছে আপনার? ওই স্নেহ ছাড়া? তাই দিয়ে আপনার ছেলের উজ্জ্বল ভবিষ্যতকে অন্ধকারময় করে দিতে চান?’
অনিলবাবু বয়স্ক মানুষ, শ্বশুরের ভূমিকায় অভিনয় করছেন। বললেন, ‘একটু ধীরে বল ভাই। এই প্রথম সংলাপগুলো শুনছি। কানে বসাতে হবে।’
নবকুমার পড়ল, ‘স্নেহ সর্বদা নিম্নগামী। কী আছে আপনার?’
অনিলবাবু হাসলেন শব্দ করে, ‘স্নেহ? স্নেহ সর্বদাই নিম্নগামী? কী আছে আপনার? ওই স্নেহ ছাড়া?’
নবকুমার তাড়াতাড়ি পড়ল, ‘তাই দিয়ে আপনার ছেলের উজ্জ্বল ভবিষ্যতকে—।’
সঙ্গে-সঙ্গে অনিলবাবু বললেন, ‘তা-ই দিয়ে আপনার ছেলের উজ্জ্বল ভবিষ্যতকে অন্ধকারময় করে দিতে চান?’ বলে তাকালেন নবকুমারের দিকে, ‘কী হে, ঠিক আছে?’
নবকুমার ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ বলে নিরুপমার সংলাপে গেল।
গোটাতিনেক সংলাপ বলার পর নিরুপমা সুধাকান্তবাবুকে বললেন, ‘বা:! এই ছেলে দেখছি বেশ মেপে-মেপে প্রম্পট করে তো!’
সুধাকান্তবাবু মাথা নাড়লেন, ‘একবার পড়েই ও স্ক্যান করতে পারছে। খুব ভালো!’
বিকেল চারটে পর্যন্ত পড়া হল। নবকুমারের খুব ভালো লাগছিল পড়তে। চারটের সময় বড়বাবু বললেন, ‘ঠিক আছে, আজ এই পর্যন্ত। কাল দুপুর একটা থেকে ন’টা পর্যন্ত টানা রিহার্সাল। মনে রাখবেন, এখন কামাই করলে নিজেরই ক্ষতি করবেন, নাটক ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।’ বড়বাবু উঠলেন, ‘মাস্টার, পাঁচ মিনিট পরে ছেলেটিকে আমার ঘরে নিয়ে এসো।’ জুতোয় শব্দ করে চলে গেলেন বড়বাবু।
সুধাকান্তবাবু বললেন, ‘শোনো নবকুমার, তোমার গলার স্বর মন্দ নয়। পড়েছ ঠিকই। কিন্তু একটা ব্যাপারে তোমাকে সতর্ক থাকতে হবে।’
নবকুমার তাকাল। সুধাকান্তবাবু বললেন, ‘তুমি প্রম্পটার। অভিনেতা নও। অভিনেতাকে সংলাপ ধরিয়ে দেওয়াই তোমার কাজ, যাতে নাটক আটকে না যায়! তাই প্রম্পট করার সময় কখনই অভিনয় করবে না। তুমি অভিনয় করলে অভিনেতা নিজের প্যার্টান ভুলে তোমার গলায় সংলাপ বলে ফেলতে পারেন। তা ছাড়া, তোমার অভিনয়ের ধরন তাঁকে বিভ্রান্ত করতে পারে। তুমি সংলাপ বলবে একেবারে গোটা-গোটা। একটু সড়গড় হলে মুখটা ধরিয়ে দেবে এবং লক্ষ রাখবে অভিনেতার কখন সংলাপ শোনা প্রয়োজন। বুঝলে?’
মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল নবকুমার।
অভিনেতা-অভিনেত্রীরা চলে গেলেন। নবকুমারকে মাস্টারদা বলল, ‘মনে হচ্ছে তুমি পাশ করে গেছ। কিন্তু আসল রায় দেবেন বড়বাবু। কিন্তু বলো তো চাঁদু, ওইরকম ঠিকঠাক পড়লে কী করে? বাড়িতে প্র্যাকটিস করেছ?’
‘দূর।’ হাসল নবকুমার, ‘স্কুলে নাটক করেছি কয়েকবার। আপনিও বলে দেননি আমাকে এখানে এসে কী করতে হবে। তাহলে প্র্যাকটিস করে আসার চেষ্টা করতাম। পড়তে হয় পড়েছি, ব্যস!’ নবকুমার বলল।
‘কী করে বলব? বড়বাবু যে সত্যি-সত্যি তোমাকে সবার সামনে পড়তে বলবেন তা ঘুণাক্ষরে আন্দাজ করতে পারিনি। চলো। পাঁচ মিনিট হয়ে গিয়েছে।’
.
.
বড়বাবু বসেছিলেন তাঁর বড় চেয়ারে। মুখে চুরুট। ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, ‘শোনো হে ছোকরা, তোমার প্রম্পট খারাপ লাগেনি। তবে সুধাকান্তবাবুর কাছে অনেক কিছু শিখতে হবে। তুমি কবে এসেছ কলকাতায়?’
‘গতরাত্রে।’
‘হুঁ। তুমি এক রাত্রেই যদি এই ফর্মা দেখাও তাহলে বলব তুমি প্রম্পটার হয়ে জীবন কাটাতে আসনি। তাই যদ্দিন অন্য কাজ না পাচ্ছ তদ্দিন করো। দু-বেলা এখানে খাবে, রিহার্সালের সময় চা পাবে। রাত্রে রিহার্সালের ঘরেই শুয়ে পড়বে। কলকাতায় খাওয়া থাকার খরচ অনেক। সেসব তোমার লাগছে না। তাই মাস গেলে হাতে তিনশো টাকা পাবে। আবার ষষ্ঠী থেকে জষ্টী যখন দল প্যান্ডেলে-প্যান্ডেলে ঘুরবে তখন তুমিও, অন্যেরা যা-যা পায় তাই পাবে। ঠিক আছে?’ বড়বাবু চুরুট মুখে দিলেন।
নবকুমার মাস্টারদার দিকে তাকাল। মাস্টারদা মিনমিন করল, ‘একটা নিবেদন আছে বড়বাবু। যদি অনুমতি দেন তাহলে বলতে পারি।’
‘আবার কী হল?’
‘না, মানে, ও যদি এখানে না থাকে, না খায় তাহলে—!’
‘অ। তুমিই সকালে বললে ওর খাওয়া থাকার জায়গা নেই। তা এর মধ্যেই সেটা জুটিয়ে ফেলেছ। ভালো। ঠিক আছে। তেরোশো টাকা মাসে পাবে। কামাই করা চলবে না। মাসে একদিন কামাই করলে মাইনে কাটব। একদিনের বেশি হলে এ-মুখো হয়ো না।’ ধোঁয়া ছাড়লেন বড়বাবু, ‘কাল সাড়ে বারোটায় চলে আসবে তুমি।’
‘যদি আরও দুশো টাকা বাড়িয়ে দেন। বাড়িতে পাঠাতে হবে তো ওকে!’
‘নো! একেবারে গ্রাম্য ছেলে, নো পাস্ট এক্সপেরিয়েন্স। দেড়হাজার টাকা কি মুখের কথা? দেশে টাকা পাঠাবে? যেখানে থাকবে খাবে সেখানে টাকা দিতে হবে না?’
নবকুমার মাথা নাড়ল, ‘না।’
‘ও বাব্বা। আত্মীয়ের বাড়ি নাকি? এই বাজারে আত্মীয়রা তো এত উদার হয় না।’ মাস্টারদা কিছু বলতে যাচ্ছিল, আঙুল নেড়ে তাকে থামিয়ে দিলেন বড়বাবু, ‘তুমি কেন কথা বলছ? যার সমস্যা সে-ই কথা বলুক।’
‘না, উনি আমার আত্মীয় নন। টাকাপয়সার কথা বলেননি।’
‘কোথায় থাকেন তিনি?’
‘আজ্ঞে, সোনাগাছিতে।’
চোখ ছোট হয়ে গেল বড়বাবুর, ‘একরাত্তিরেই তুমি সোনাগাছি চিনে ফেললে? না-না? তাহলে তোমাকে রাখা যাবে না। ওখানে থেকে যত বদ স্বভাব রপ্ত করবে আর সেগুলো দলে ছড়াবে, ও চলবে না।’
নবকুমার বেশ জোরে বলল, ‘আমার জ্ঞান থাকা পর্যন্ত কেউ আমাকে দিয়ে কোনও বদ কাজ করাতে পারবে না।’
‘তাই নাকি? কে তোমাকে ওখানে নিয়ে গেল? মাস্টার নিশ্চয়ই?’
মাস্টারদা বলল, ‘গদি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। থাকার জায়গা নেই, হোটেলে ওঠার পয়সা নেই, হঠাৎ শেফালি-মায়ের কথা মনে পড়ল। উনি তো একসময় যাত্রার রানি ছিলেন। বাড়িওয়ালি হয়ে সোনাগাছিতে আছেন বটে, কিন্তু কখনই নিজেকে ওই পাপ ব্যাবসায় জড়াননি। তাই ওঁর কাছে নিয়ে গিয়েছিলাম।’
কথাগুলো শুনে একটু অন্যমনস্ক হয়ে গেলেন বড়বাবু। তারপর বললেন, ‘শুনেছি এখন একাই থাকেন। কারও সঙ্গে দেখা করেন না। কোথাও যান না।’
‘ঠিক।’ বলল মাস্টারদা, ‘আমাদের সঙ্গে হঠাৎই দেখা করে ফেলেছেন।’
‘শরীর কেমন আছে? হাঁটা-চলা করতে পারেন? গলার স্বর?’
‘কী বলব বড়বাবু, দেখলে আগের থেকে তফাত করাই যায় না। একটু মোটা হয়েছেন কিন্তু বাকিটা আগের মতন। তবে আর তো যাত্রার লাইনে ফিরবেন না উনি।’
‘সেটা সবাই জানে। তুমি নতুন কী বলছ!’ বড়বাবু বললেন, ‘শোনো নবকুমার, তুমি দেড় হাজারই পাবে। এক কথায় বাড়িয়ে দিলাম দুশো। কিন্তু আর-একটা কাজ যদি করতে পারো তাহলে তোমার মাইনে ডবল করে দেব। তিন হাজার।’
‘পারবে, পারবে, নিশ্চয়ই পারবে। আপনি আদেশ করুন বড়বাবু।’ মাস্টারদা বলল।
‘আ:। তুমি থামো তো! হ্যাঁ, সময় নাও, একটু-একটু করে বলে যদি ওঁকে যাত্রায় অভিনয় করতে রাজি করাতে পারো তাহলে কেল্লা ফতে হয়ে যাবে। এখনও গাঁ-গঞ্জে শেফালিদেবীর নাম পোস্টারে পড়লে পাবলিক পাগল হয়ে যাবে। কিন্তু খবরদার, এখনই তাঁকে আমার কথা বলতে যেও না। বুঝলে?’
‘ঠিক আছে।’
বাইরে বেরিয়ে এসে মাস্টারদা বলল, ‘তোমার কপাল দেখছি সোনা দিয়ে বাঁধানো। এক কথায় দেড়হাজার মাইনে হয়ে গেল। খাওয়াতে হবে।’
‘খাওয়াব।’ মাথা নাড়ল নবকুমার।
‘তুমি চলে যেতে পারবে তো? আমার অন্য কাজ আছে।’ মাস্টারদা বলল।
‘পারব। কিন্তু মাস্টারদা, বেলগাছিয়ায় কী করে যাব বলে দাও।’
‘বেলগাছিয়া? কোনখানে যাবে?’ মাস্টারদা নবকুমারের দিকে অবাক হয়ে তাকাল।
‘তিন মা দুর্গা লেন।’ নবকুমার বলল।
