দশ
নবকুমার মাস্টারদার দিকে তাকাল। কী জবাব দেওয়া উচিত? মাস্টারদা যেখানে যাওয়ার কথা বলছে সেই জায়গাটা সে দেখেনি। শেফালি-মা যা বলছেন সেটা শুনলে তার ভালোই হবে। কিন্তু শেফালি-মা তার দিকে তাকিয়ে আছেন। অতএব কথা বলতে হল, ‘আপনারা আমার চেয়ে অনেক বেশি এখানকার কথা জানেন। যা করলে ভালো হয় তাই করুন।’
মাস্টারদা বলল, ‘আপনার এখানে থাকাটা ওর পক্ষে সৌভাগ্য। কিন্তু মুশকিল হল, এই পাড়াটা যে খারাপ তা সবাই জানে। ওর উঠতি বয়স। বিভ্রম হলে আর কিছু করা যাবে না। তা ছাড়া, গ্রাম থেকে ওর বাবা বা আত্মীয়রা এলে তো তাদের এই বাড়িতে নিয়ে আসা যাবে না।’
‘তাঁরা কি এখনই আসবেন?’ শেফালি-মা জিজ্ঞাসা করলেন।
‘তা অবশ্য নয়—।’
‘মাস্টার। তুমি যখন নবকুমারকে রাত্রে আমার বাড়িতে নিয়ে এসেছিলে তখন এসব চিন্তা করনি কেন? আর নিয়ে আসার পর অবশ্য অনেক ঘণ্টা কেটে গেছে, এর মধ্যে ওর কোন ক্ষতিটা হয়েছে? ওকে আমি চিনি না জানি না। ওর ভালোমন্দের দায়িত্ব আমি নেওয়ার কে? কিন্তু ছেলেটা, সরল, সহজ। এই কলকাতার নোংরা জল যতদিন ওর মনে না চাপছে ততদিন ও ভালো থাকবে। সেটা তোমার যাত্রার ওদিকে থাকলে হবে না।’ শেফালি-মা কথাগুলো বলে হাত নাড়লেন। যার অর্থ এবার তোমরা এখান থেকে চলে যাও।
মাস্টারদা বলল, ‘শেফালি-মা, আমি মিনিটদশেকের মধ্যে আপনাকে জানাচ্ছি।…’চলো, নবকুমার! ওই ঘরে গিয়ে একটু বসি।’
ঘরটা কাল রাতের মতোই রয়েছে। শুধু ব্যবহৃত বিছানা আবার ঠিকঠাক করে রাখা হয়েছে। মাস্টারদা বলল, ‘কী করা যায় বলো তো?’
‘তুমি যা বলবে!’ নবকুমার বলল।
‘ধ্যাৎ! সেটাই তো হয়েছে মুশকিল। শেফালি-মা যা বলল সেটা করলে তোমার লাভ। সারা সকাল এই ঘরে আরামসে কাটিয়ে স্নান সেরে ভালোমন্দ খেয়ে গদিতে যেতে পারবে। দশটার মধ্যে রিহার্সাল শেষ হয়ে যায়। তখন বাড়ি এসে ঘুম। এই যে ঘরটা, ভদ্রপাড়ায় যাও, তিনহাজার টাকা মাসে ভাড়া চাইবে। এই পাড়ায় অন্তত দু-হাজার। কিন্তু বাড়ির এই দিকটায় শেফালি-মা নিজে থাকে বলেই ঘরটা মেয়েমানুষদের ভাড়া দিচ্ছে না।’ মাস্টারদা বলল।
‘আমাকে অত টাকা দিতে হবে নাকি?’
‘ধ্যাৎ! তুমি শেফালি-মায়ের সুনজরে পড়ে গেছ চাঁদু, তোমার কাছে ভাড়া চাইবে না। জানে চাইলে দিতে পারবে না।’ মাস্টারদা হাসল, ‘গদিতে শুতে-শুতে বারোটা বেজে যাবে রোজ। আবার কোনও বাইরে যাত্রা থাকলে ঘুমের বারোটা বেজে যাবে সে রাতে, এটাও ঠিক।’
‘তাহলে আমি কী করব?’
‘দ্যাখো বাবা নবকুমার, পঙ্কেই পদ্ম ফোঁটে। সেই পদ্মে পঙ্কের দাগ লাগে না। তুমি যদি জলে নেমে বেণী না ভিজিয়ে থাকতে পারো তাহলে শেফালি-মা যা বলছেন সেটা স্বর্গের সমান। কিন্তু ভাই, তুমি কি এখানকার মেয়েমানুষদের থেকে দূরে থাকতে পারবে?’
‘কেন পারব না? তাদের সঙ্গে কথা না বললেই হল।’
মাস্টারদা হাসল, ‘কাছে যাওয়ার জন্যে কথার কোন দরকার হে! ওরা এমন সম্মোহন শক্তি প্রয়োগ করবে যে তুমি কামাখ্যার মন্দিরের পাঁঠা হয়ে যাবে।’
‘না। অসম্ভব। ওসব আমি হব না।’ বেশ জোরে কথাগুলো বলল নবকুমার।
ঠিক তখনই মুক্তো এসে দাঁড়াল দরজায়, ‘অনেক বেলা হয়েছে। এবার স্নান করে নাও। ভাত দিয়ে যাব।’
‘বা:। ভাত হয়ে গেছে বুঝি?’ মাস্টারদা উৎসাহিত।’
‘তোমার এত আহ্লাদের কী আছে? ভাত এর জন্যে হয়েছে।’ মুক্তো বলে গেল।
‘যাচ্চলে। আমি তোমাকে এখানে নিয়ে এলাম, আর আমিই পর হয়ে গেলাম। সকাল থেকে দুটো বিস্কুট আর চা ছাড়া কিছু খাইনি।’ মাস্টারদা বলল।
নবকুমারের খুব খারাপ লাগল। সে বলল, ‘তুমি ভেবো না। আমাকে যা দেবে তা দুজনে ভাগ করে খেয়ে নেব।’
‘তোমার কম পড়ে যাবে না?’ চোখ মিটমিট করল মাস্টারদা।
হাসল নবকুমার, ‘না।’
.
স্নান করতে গিয়ে নবকুমার আবিষ্কার করল কলে জল নেই। পাশে একটা বাঁধানো গর্তে জল ধরা রয়েছে। জলের নীচে কালো শ্যাওলা ভাসছে। চোখ বন্ধ করে মগে জল তুলে স্নান সেরে নিল নবকুমার। চৌবাচ্চার বাকি জল এখন ঘোলা হয়ে গেছে। একেবারে তলায় জল বেরিয়ে যাওয়ার নলটার মুখে ন্যাকড়া গোঁজা দেখে সেটা টেনে খুলে দিতেই হুড়হুড় করে জল বেরিয়ে বাথরুম ভাসিয়ে দিল। জল নেমে যাচ্ছে ঝাঁঝরি দিয়ে কিন্তু চৌবাচ্চা পরিষ্কার হয়ে গেল। আবার ন্যাকড়া গুঁজে পরিষ্কার হয়ে বেরিয়ে এল নবকুমার।
মাস্টারদা বলল, ‘তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও। মালিকের সঙ্গে দেখা করিয়ে দেব।’
ঘরের কোণে টেবিলের ওপর থাকা বাটির ওপর আর-একটা থালা চাপা দিয়ে ইতিমধ্যে মুক্তো চলে গেছে। নবকুমার হেসে বলল, ‘বা:, দুটো থালা দিয়েছে।’
‘ওটা আমার জন্যে নয়, খাবার ঢাকা দেওয়ার জন্যে। চলো।’
ভাত, ডাল, তরকারি আর ছোট মাছের ঝাল। ছোট মাছ বলেই চারটে দিয়েছে।
খেতে-খেতে মাস্টারদা বলল, ‘তুমি গাঁয়ের ছেলে বলে বেশি ভাত দিয়েছে। পাইস হোটেলে খেলে এক্সট্রা তিন বাটির দাম দিতে হত।’
‘সেখানে এই খাবারের দাম কত লাগবে?’ নবকুমার খেতে-খেতে জিজ্ঞাসা করল।
‘তা ধরো, পঁচিশ-ছাব্বিশ। তবে এমন রান্না পাবে না।’
খাওয়া শেষ হওয়ার পর দেখা গেল এক গ্লাস জল রয়েছে। মাস্টারদা বলল, ‘তুমি জলটা খেয়ে নাও। আমি পরে খাব। যাই হাত-মুখ ধুয়ে আসি।’
বাথরুমে চলে গেল মাস্টারদা। তার পরেই বেরিয়ে এল, ‘কলে জল নেই। চৌবাচ্চাও খালি, হাত-মুখ ধোব কী করে?’
নবকুমার ঘরের কোণের দিকে আঙুল তুলল, ‘ওই কুঁজোতে জল আছে।’
‘বাঁচালে।’ কুঁজো নিয়ে বাথরুমে ঢুকে গেল মাস্টারদা।
এই সময় মুক্তো এল দরজায়, ‘খাওয়া হল? রান্না কীরকম?’
‘ভালো।’ মাথা নাড়ল নবকুমার।
‘ভালো তো লাগবেই। গাঁয়ে নিশ্চয়ই এমন রান্না হয় না। যাকগে, আজ ঘাড়ের ওপর এসে পড়েছে বলে দুজনের খাবার দিয়েছি। এই শেষ!’
‘নিশ্চয়ই। আচ্ছা কলে জল পড়ে কখন?’
‘তিনবার জল দেয়। কেন? চৌবাচ্চায় জল নেই?’
‘ছিল। খুব কাদা, মুখে দেওয়া যায় না।’
‘বাব্বা! গাঁয়ের পুকুর বুঝি সোনাবাঁধানো।’ মুখ বাড়িয়ে কুঁজো খুঁজল মুক্তো। দেখতে না পেয়ে জিজ্ঞাসা করল। ‘কুঁজোটা কোথায় গেল?’
‘এই যে এখানে।’ কুঁজো হাতে নিয়ে মাস্টারদা বাথরুম থেকে বেরিয়ে এল।
‘লোকে বলে এমনিতে হয় না অমনি জড়িয়ে। ওটা খালি করে ফেলেছ নাকি?’
‘না-না আছে। অল্প আছে।’ মাস্টারদা বলল।
‘ওতেই কাজ চালিয়ে নাও। আমি পরে ভরে দেব।’ মুক্তো চলে যাচ্ছিল, মনে পড়ে যেতে ঘুরে দাঁড়াল, ‘এই যে ছেলে, মা বলেছে সন্ধের পরে দেখা করতে।’
.
মিনিটদেড়েক হাঁটলেই খারাপ পাড়া শেষ। খারাপ পাড়া মানে যে-পাড়ার বাড়িগুলোর দরজায়-দরজায় মেয়েরা সেজেগুজে দাঁড়িয়ে থাকে। এখন যে-রাস্তা দিয়ে ওরা হাঁটছে, সেটা মানুষ, গাড়ি রিকশায় গিজগিজ করছে। গোটা চারেক অল্পবয়সি মেয়ে শব্দ করে হাসতে-হাসতে চলে গেল, এদের মুখে রং নেই বটে কিন্তু খুব চপল বলে মনে হল। নবকুমার জিজ্ঞাসা করল, ‘এরা কি ওরাই?’
‘ওরাই মানে?’
‘বাড়ির দরজায় রং মেখে যারা দাঁড়ায় তারা বাইরে এলে রং মুছে ফেলে?’
‘ভ্যাট।’ চিৎকার করে উঠল মাস্টারদা, ‘তোমার কি চোখ খারাপ? এরা সব ভদ্রঘরের মেয়ে। রবি ঠাকুরের কলেজে পড়ে। এই আর একটু গেলেই জোড়াসাঁকো।’
‘জোড়াসাঁকো?’ চমকে উঠল নবকুমার, ‘রবীন্দ্রনাথ যেখানে থাকতেন?’
‘হ্যাঁ।’
‘এই খারাপ পাড়ার পাশে উনি থাকতেন?’
‘হ্যাঁ রে বাবা, তাই।’
স্কুলের বাংলা মাস্টার রবীন্দ্রনাথের গল্প বলতেন। একটা কবিতা এখনও মুখস্থ আছে নবকুমারের। ‘আজি এ প্রভাতে রবির কর, কেমনে পশিল প্রাণের পর।’ সেই রবীন্দ্রনাথ যখন এখানে থাকতেন তখন তার থাকায় দোষ কোথায়।
‘আমরা এসে গেছি।’ মাস্টারদার কথায় চোখ তুলল নবকুমার। রাস্তার দুপাশে বড়-বড় হোর্ডিং, সত্য অপেরার নিবেদন ‘শূন্য মায়ের বুক’, অম্বর যাত্রা পার্টির সাহসী প্রযোজনা, ‘নবীনা হান্টারওয়ালি’ নামভূমিকায় মিস কাকলি। একটার-পর-একটা যাত্রার হোর্ডিং। চেনা নাম দেখতে পেল সে, ‘বউমা বনাম শাশুড়ি।’ এই যাত্রাপালাটি গতবার মেলায় গিয়েছিল। আশেপাশের সব গ্রামের বউ মেয়ে শাশুড়িরা দেখতে গিয়েছিল ঝেঁটিয়ে।
মাস্টারদা বলল, ‘এসো। শোনো, মালিককে দেখা হওয়া মাত্র প্রণাম করবে। খুব রাশভারী মানুষ। পান থেকে চুন খসলেই ছাঁটাই।’
নবকুমার মাথা নাড়ল।
এখন দুপুর। মাস্টারদা যে ঘরে তাকে নিয়ে ঢুকল সেখানে আট-দশজন লোক গুলতানি মারছে। তাদের মধ্যে তিনজন মহিলাও আছেন। তাদের কেউ সুন্দরী তো ননই, বয়সও চল্লিশের বেশি। মাস্টারদা একজনকে জিজ্ঞাসা করল, ‘মালিক আসেনি?’
‘তিনটে থেকে রিহার্সাল। এইমাত্র এসে ঘরে ঢুকেছে।’ লোকটা জবাব দিল।
‘অ।’ মাস্টারদা বলল, ‘একটু বলো না, একজনকে নিয়ে এসেছি, দেখা করব।’
.
.
‘এখন যেও-না। মেজাজ খারাপ আছে। হিরোইন আজ রিহার্সাল দিতে পারবে না শুনে গুম হয়ে গেছে। বরং বাকিদের নিয়ে রিহার্সাল হয়ে যাওয়ার পর দেখা করো।’
‘অ। তাই হবে। ভালো বলেছ।’ মাস্টারদা মাথা নাড়তেই একজন মহিলা উঠে এসে সামনে দাঁড়ালেন, ‘এই যে বিবেকবাবু, আমাকে ল্যাং মারার চেষ্টা করলে লাভ হবে না।’
‘এ কী কথা! ছি-ছি-ছি। আমি একটা সামান্য মানুষ! আপনাকে ল্যাং মারার মতো ঔদ্ধত্য হবে আমার? তার চেয়ে থুতু ফেলে ডুবে মরাও ভালো।’ মাস্টারদা বলল।
‘ইস! বিনয়ের আমলকি। চুষে-চুষে খাব! গতবার আমার ডায়ালগ শেষ হওয়ার আগেই তুমি চিৎকার করে গান ধরতে। আমি আর হাততালি পেতাম না। ওটা ল্যাং মারা নয়? আর এবারও আমার সিনের শেষে তোমার গান। গান তো নয়, মেশিন গান। কানের পরদা ফেটে যায়। এটি কে?’ মহিলা নবকুমারের দিকে তাকাল।
‘প্রম্পটার। নতুন।’
‘এ তো বাচ্চা ছেলে! নাম কী?’ মহিলা এগিয়ে এলেন।
‘নবকুমার।’
হেসে শরীরে অনেক ঢেউ তুললেন মহিলা, ‘কোত্থেকে এসেছ?’
মাস্টারদা জবাব দিলেন, ‘আমার পাশের গ্রামে বাড়ি।’
‘অ।’ হাসি থামছিল না, ‘তা এসে কোন কপালকুণ্ডলার দেখা পেলে?’
‘না।’ মাথা নাড়ল নবকুমার। মহিলা এত হাসছেন কেন সে বুঝতে পারছিল না।
‘আগে প্রম্পট করেছ?’
‘কত করেছে। গ্রামের যাত্রায় ও একচেটিয়া প্রম্পট করত।’ মাস্টারদা বলল।
‘ইস। মাস্টার! এ কাকে নিয়ে এলে গো! এ তো কচি মুরগি। যাত্রায় নিয়ে এলে ওকে, সবাই তো চিবিয়ে খাবে।’ মুখে চুকচুক শব্দ করলেন মহিলা।
মাস্টারদা বলল, ‘নবকুমার, ইনি নিরুপমাদি। আমাদের সব পালায় মায়ের ভূমিকায় অভিনয় করেন। ফাটাফাটি অভিনয়।’
‘ফাটাফাটি!’ হা-হা করে হেসে উঠলেন নিরুপমা, ‘ফাটা এবং ফাটি দুটোই। মাস্টার, নেহাত তুমি নেংটির মতো দেখতে নইলে তোমাকেই নিয়ে করতাম।’
এই সময় একজন দৌড়ে এল, ‘বড়বাবু আসছেন।’
সঙ্গে-সঙ্গে পরিবেশটার চেহারা পালটে গেল। নিরুপমাও গম্ভীর হয়ে ঘরে ঢুকে তাঁর জায়গায় বসলেন। বাকিরা খাতায় চোখ রাখল। নবকুমার দেখল একজন বয়স্ক ভারী চেহারার মানুষ, পরনে ধুতি-পাঞ্জাবি, গলায় সোনার চেন, পাম্প শু-তে মচমচ শব্দ করতে-করতে এদিকে এগিয়ে আসছেন।
