আর-এক জন্ম অন্য মৃত্যু

আর-এক জন্ম অন্য মৃত্যু

দেশলাইয়ের কাঠির মতন ওর হাসি ফস্ করে জ্বলে উঠেছিল প্রথমে, ক’ পলকেই বারুদ ফুরলো। তারপর দুর্বল ম্লান একটু শিখা যেমন কাঠির গা বেয়ে অত্যন্ত অনিশ্চিতভাবে এগুতে থাকে, স্নানতর হয়, পুড়ে পুড়ে কালো হয়ে কুঁকড়ে শেষে চোখের পলকে নিভে যায়— ওর হাসিও তেমনি প্রথমে ধ্বনি ও আতশজ্বলা উজ্জ্বলতা হারাল, নিঃশব্দ হল, হালকা হয়ে মুখে মাখানো থাকল ক্রমে মৃদু ক্ষীণ হয়ে শেষে অদৃশ্য হয়ে গেল। যেন কাঠির মতনই সে পুড়ে শেষ হল। দু’ একটি মুহূর্ত তবু তার হাসির রূপটা আমার মানসিক অস্তিত্বে বেঁচে থাকল, সুগন্ধ নিঃশেষ হয়ে গেলেও ঘ্রাণের সেই অতি ক্ষীণ অনুভূতির মতন। …ওকে দেখছিলাম। এখন আর কিছুই নেই, হাস্যধ্বনি উজ্জ্বলতা আভা রেশ কিছু নয়।…মনে হচ্ছে, আর-এক নতুন মানুষের সামনে বসে আছি ; এইমাত্র ও এসেছে, মুখোমুখি বসেছে। ওর মুখ কাঠ-খোদাই পুতুলের মতন। কি কাঠ জানি না, বাদামির সঙ্গে ঈষৎ কমলার মিশেল ; ঘাম-তেলের মতন নরম করে আঠা মাখানো, মেঘলাভাব দিনে দুপুরের রঙ যেন।…জানি না, খোদাই কাজটুকু কে করেছিল। তবে কারিগরের অযত্ন অন্যমনস্কতা নেই। ওর মুখের গড়নটি লম্বা ছাঁদের ; কপাল থেকে গাল, গাল থেকে চিবুকে মিহি-বঙ্কিম ঢল ফুটেছে। মসৃণ কপাল যেন ছাঁচ-তোলা, বলয়াকৃতি। ছড়ানো ভুরু ঘনতা থাকলে হয়তো আরও সুন্দর হত। চোখের জমিটা মোমের মতন সাদা। পাণ্ডুর প্রাণহীন। নিকষ কালো চোখের তারা। ওষ্ঠের রেখায় ভীরুতা, অধরে কামনা-পীড়া। আশ্চর্য, ওর সুছাদ নাকের স্ফীত প্রান্তটি বুঝি কান্নার উচ্ছ্বাসেই জীবন্ত হয়। ওই পুতুলটির চিবুকের ডৌলে কেমন করে বাল্যের শুচিতা থেকে গেল আজও, আমি বুঝতে পারি না। …দেশলাইয়ের কাঠির মতন পুড়ে পুড়ে ও যখন নিষ্প্রাণ, নিঃশেষ— তখন আমি তাকে দেখছিলাম, কাঠের পুতুলের মতন সে সামনে বসে ছিল। খোলা জানলার পরদা হাওয়ায় উড়িয়ে শীতের অন্ধকার ঘরে আসছিল ; কুয়াশাও। বাতি জ্বালার কথা আমার মনে হয়নি, আগ্রহ অনুভব করিনি।…ওর জীবনের কথা আমি ভাবছিলাম। শেষ রাতের তারারা ডুবেছে, আকাশ ফরসা হয়ে আসছে— এই রকম কোনো সময় হয়তো ও জন্মেছিল। আমি আবার করে ওকে জীবন পেতে দেখেছি। ওর নবজন্ম। সে এক সুন্দর গোধূলির মুহূর্ত সৃষ্টি হয়েছিল। জগৎ তখন ওর কাছে মধুর মনোরম, শুদ্ধ ও সুন্দর ছিল।…আমি জানি ওর মৃত্যু আমি দেখব। এ আমার নিয়তি। সেই দেখা ওর আর আমার শেষ দেখা। …শীতের অন্ধকার ধোঁয়ার মতন এখন এখানে পুঞ্জীকৃত। অতি অস্পষ্ট রেখার আঁচড়ে ফুটে-ওঠা রহস্যমূর্তির মতন ও বসে আছে। অল্প কয়েকটি মুহূর্তের পর আমার চোখ ওকে হারাবে। অন্ধকার ওর অস্তিত্বকে গ্রাস করবে, আমি আর ও একটি দুস্তর ব্যবধানে পৃথক হয়ে যাবো। সে অন্ধকার শীতের অন্ধকার থেকেও ঘন, মেঘের পরদার চেয়েও গাঢ়।…আমি সময়ের কাঁটা দেখছি না, অন্য কাঁটা দেখছি : আর কয়েক মুহূর্ত পরেই কাঁটা দুটো গায়ে গায়ে মিশে যাবে। সেই মুহূর্তটি আমাদের শেষ…। সব শেষই বুঝি অদ্ভুত এক প্রতিধ্বনি তুলে শুরুকে ছুঁতে যায়। আমার মনেও এক প্রতিধ্বনি অতীতের তেপান্তরে ওকে অন্বেষণ করছিল। মনে হল ওর শুরু আমার কাছে ধরা দিয়েছে। সেই গোধূলি…জগৎ যখন ওর কাছে শান্ত মধুর মনোরম, শুদ্ধ ও সুন্দর। অশোকার সে-দিন নবজন্ম :

“ইস্‌…দেখেছ বাইরেটা একবার!”

“দেখেছি।”

“কী রকম গোধূলি…! এই, এসো না একবার…উঠে এসে জানলার কাছটায় দাঁড়াও।…দেখছ?”

“চৈত্র মাস…”

“চৈত্র মাস বলেই কি এমন সুন্দর গোধূলি হয়েছে?”

“জানি না। হয়তো তাই…আকাশটা যেন ফেটে পড়ছে, সূর্যও টকটকে আবীর- এখানকার ধুলো লাল, বাতাস…”

“বাতাসটা আজ কেমন উল্টোপাল্টা…বসন্ত-বসন্ত লাগছে…”

“হাসির কী, বসন্তকালই তো!”

“…বসন্ত জাগ্রত দ্বারে…বাব্বা, এই শেষ সময় বসন্ত জাগল !”

“হয়তো আগেই জেগেছে, তোমার চোখে ধরা পড়ে নি।”

“বাজে কথা। আমি অন্ধ নাকি…এর আগে কোনোদিন এমন সুন্দর দেখলাম না…”

“নাই-বা দেখলে। অন্য কেউ দেখেছে; তাদের পালা ছিল। আজ তোমার পালা।”

ধ্যুত, আমার আবার কি! মেঘ বৃষ্টি বসন্ত গোধূলি পূর্ণিমা এ-সব কি কারও একার জন্যে হয়!”

“হয়।”

“তুমি কথার জোরে নয়-কে হয় করো।”

“বেশ, আমি চুপ করছি, তুমিই বলো। …তার আগে তোমার আলগা আঁচলটাকে একটু সামলাও, আমার চোখ গেল…।”

“বাব্বা! তা তুমি আমার এ-পাশটায় এসে দাঁড়াও না…আবার হাওয়া এসে আঁচলে পাল তুলে দেবে…না হয় ঝাপটাই দেবে তোমার চোখে…কতক্ষণ আর আটকে রাখব। যা হাওয়া আজ।”

“ওলোট-পালট…”

“বটেই তো, কিন্তু কী মিষ্টি…”

“গোধূলি…”

“বোলো না বোলো না…অপূর্ব…আমি এমন আর দেখিনি কখনো।”

“আকাশটা একবার দেখো।”

“দেখছি তো…তখন থেকেই দেখছি…। সেই যে কী যেন একটা গোলাপ আছে…ঠিক লাল নয় লালের মতনই, একটু কালচে ঘেঁষা…ভীষণ গাঢ়…রক্ত শুকিয়ে এলে যেমন হয়…অনেকটা যেন…”

“তুলনার জন্যে বড় বেশি দূর যাচ্ছ। খুব ছুটছে মনের পক্ষিরাজ।”

“যাঃ! ঠাট্টা হচ্ছে!”

“ঠাট্টা! সত্যি ঠাট্টা নয়।…ওই দেখ সূর্য ডুবে যাচ্ছে।”

“আ—আ হা…মরি মরি…কী সুন্দর। চুপ, এখন আর কথা বোলো না।”

“অশোকা!”

“কী?”

“এবার একটু কথা বলি, কী বলো!…”

“কী দেখছ?”

“ওই গাছটা…”

‘শিরীষ?”

“হুঁ…, কৃষ্ণচূড়া। সবই দেখছি…দেবদারু আম নিম…গাছপালার ঝোপ মাঠ…”

“অন্ধকার হয়ে আসছে।”

“দূরের পাহাড়টা এখন ঠিক যেন মেঘ। না?”

“অবিকল।”

“…আচ্ছা, আমি তো গাছ হতে পারতাম?”

“জানি না।”

“এক-একটা সময় এই রকম সব কথা মনে হয়, কেন বলতে পার?…সত্যি, মনে হওয়ার হয়তো মাথা-মুন্ডু নেই, তবু হয়। খানিক আগে কেমন একটা চিক্‌কাটা সোনা-সোনা মেঘ হয়েছিল, দেখেছিলে? আমার মনে হচ্ছিল আমি যদি ওই মেঘটাই হতাম। কিংবা ধরো না, ঝাঁক বেঁধে কলকলিয়ে ডাক দিয়ে দিয়ে যে পাখিগুলো উড়ে গেল, ওদেরই একটা হতে পারতাম…! বেশ হত!”

“মানুষ হয়ে জন্মেছ বলে তোমার দুঃখ হচ্ছে?”

“না, তা নয়…তবে মানুষ হয়েই বা কী আলাদা ঐশ্বর্য আমরা পাই? একটা পাখি বা মাছ হওয়া মন্দ কিসের? বরং…”

“তোমার চুলগুলো একটু ঠিক করো…আমি মুখ দেখতে পাচ্ছি না।”

“দরকার নেই দেখে, গা ঘেঁষে রয়েছ, আবার মুখ কেন?”

“গা কথা বলে না, গায়ের রূপ একই; মুখ কথা বলে, মুখের রূপ অনেক।”

“আমার মুখের রূপ-টুপ নেই—।”

“দেখছি তাই, খানিক আগে খুশিতে ভরা ছিল, তারপর দেখলাম তন্ময়, এখন দেখছি উদাস…।”

“তুমি বুঝি এই সবই দেখছ?”

“কী করব বলো, পাখি মাছ গাছ মেঘ এরা যে কথা বলে না। তারা যদি তোমার মতন খুশিটুকু জানাতে পারত!”

“তাতে কী! আমার শুধু ভাল লাগে, ওরা যে ভাল লাগায়; আমার কেবল হবার ইচ্ছে, ওরা যে হয়েছে।”

“…আজ কী হল তোমার? এত কাব্য—কল্পনা—?”

“কল্পনা…তুমি কল্পনা ভাবলে স-ব!…অবশ্য কল্পনা ছাড়া আর কি-ই বা! আমি সত্যি সত্যি মেঘ বা মাছ হতে যাচ্ছি না। তবে কল্পনাই বলো আর যা-ই বলো, কেমন যেন লাগে এ-সব কথা ভাবলে! না—?”

“লাগাই স্বাভাবিক। বোধ হয় সব সৌন্দর্য এবং আনন্দের কাছে আমরা কাঙালপনা করি…। আমি তুমি বসন্ত হতে পারি না, মেঘ নয় গাছ নয়, পাখি ফুল— কোনোটাই নয়। কে জানে এই অভাব অক্ষমতা না থাকলে বাস্তবিক ওদের ভাল লাগত কি লাগত না। বোধ হয় লাগত না।”

“এবার নিজে যে দার্শনিকতা করছ! আমি অত বুঝি না। দরকার কী বোঝার! ভাল লাগার তলায় কত রকম অঙ্ক আছে তা জেনে আমার লাভ নেই।”

“সেই ভাল।…মুখ থেকে তোমার ওই চুলের জাল সরিয়ে নাও তো। ফটোগ্রাফি আমার ভাল লাগে না— জীবন্ত মুখটাই দেখতে চাই।”

“আমার মাথার এই চুলের জঙ্গল একদিন কচ কচ করে কেটে ফেলব।”

“কী সর্বনাশ।”

“বড্ড জ্বালায়!”

“রূপের জ্বালা, ঐশ্বর্যের জ্বালা…। যাদের নেই তাদের—”

“আঃ, থামো। বড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কথা বলো তুমি!… ইস্, কপালটা কী রকম ধুলো-ধুলো হয়ে গেল দেখেছ! বড্ড ধুলো উড়ছে তো!”

“অন্ধকার হয়ে গেছে— জানলার কাছে দাঁড়িয়ে আর লাভ নেই—!…”

“চলো বসি—।”

“চলো—।”

“বাতিটা জ্বেলে দি।”

“থাক না; খানিক পরে চাঁদ উঠবে—”

“খানিক নয়— বেশ কিছু পরে।”

“তাই উঠুক।”

“অতক্ষণ থাকবে তুমি?”

“থাকব।”

“তোমার মা…?”

“মা জানে, মামাও শুনেছে।…বাব্বা, কৌতূহল মিটলো তোমার। কী যে মানুষ তুমি!”

অন্ধকারেই আমরা বসে ছিলাম। চাঁদ ওঠার প্রতীক্ষা নিয়ে নয়। যখন খুশি উঠবে, না উঠলেও আমাদের হা-হুতাশ নেই। গাঢ় বুনোট আঁধার আমাদের সত্তাকে আরও নিকট নিবিড় করছিল। কখনও কখনও এমনই হয়, হারিয়ে যাওয়ার আনন্দে আমাদের মন ভিজে ওঠে। অন্ধকারেই এই নিবিড়তা ক্রিয়াশীল, আলোয় নয়। আলো স্বতন্ত্র রেখায় অশোকার মূর্তি গড়বে, আমাকে আমার মূর্তি দেবে। শরীরকে আলোয় মোছা যায় না। আমরা নিজেদের স্বতন্ত্র অস্তিত্বকে তখন হারাতে চাইছিলাম। অন্ধকার আমাদের সাহায্য করছিল, ঘরের এবং বাইরের অটুট নীরবতা করুণা করছিল আমাদের। নিঃশব্দ মৃদু সান্ধ্য-বাতাস আমার এবং অশোকার নিশ্বাসকে একাকার করেছে। অশোকার মনে আজ সহস্র অলঙ্কার। এই ঘর তার কাছে বেড়া ভেঙে সময় এবং ভবিষ্যতের সীমাহীনতায় মিলিয়ে গেছে।…তবু চাঁদ উঠল। মিহি ভীরু একটু আলো। মনে হচ্ছিল, অনেক দূরে আলো হাতে দাঁড়িয়ে কে যেন আমাদের অপেক্ষা করছে।

“অশোকা?”

“উ—!”

“চাঁদ উঠল। আমি ভেবেছিলাম আরও পরে উঠবে!”

“উঠুক…ভালই তো!”

“তোমার কাছে আজ সবই ভাল।”

“সত্যি।”

“কোনো কিছুই খারাপ লাগে নি?”

“কী জানি মনে পড়ছে না।”

“তোমার মামাকে?”

“উঁহু। মামাকে আজ কেমন যেন লাগছিল। কী জানি কেন মনে হচ্ছিল, মামা আমাদের সামান্য যা-কিছু নিয়েছে, ভালই করেছে। দরকার ছিল বলেই নিয়েছে। আমাদের কাছে চাইলে হয়তো আমরা দিতাম না। স্বার্থে লাগত।”

“তাঁর দুর্ব্যবহারে তুমি…”

“অতিষ্ঠ হয়েছিলাম। এখন উলটো কথাই মনে হয়। মামা সংসারের ঝড়-ঝাপটা এত বেশি খেয়েছে— এখনও তো খাচ্ছে— তাতে ও-রকম হয়ই। মামির অসুখের সময় মামা গালাগালি দিত, অথচ সেই মামাই মামির বিছানার পাশে বসে রাত জাগত, কাশির রক্ত নিজের হাতে কেচে কেচে ধুত।…কত সময় দেখেছি— মামির শুকনো রক্তের দাগের দিকে মামা তন্ময় হয়ে চেয়ে আছে। যেন ওটা মামারই রক্ত।… আজ মা-কে খুব অবাক করে দিয়েছি।”

“আমাকেও কম করো নি।”

“তোমাকে আমি ধরি না।”

“সে কী!”

“তুমি মশাই আমার হিসেবের বাইরে।”

“হুঁ, তবে এক্কেবারে নয়; আমি এক, তুমি আমার পাশের শূন্য—,… হাসছ যে বড়, বুঝেছ?”

“বুঝেছি। কিন্তু আমি হাসছি তুমি কি করে বুঝলে?”

“আহা, তাও যদি না হাতখানা আমার হাতে থাকত।”

“তুলে নেব?”

“অত সহজে সব কি তুলে নেওয়া যায়!”

“..তোমার মা-কে অবাক করে দেবার কথা বলো, শুনি—।”

“বলতেই যাচ্ছিলাম, বাধা দিলে মাঝখানে।”

“আর দেব না। বলো।”

“মার ধারণা ছিল আমি আমাদের পুরনো কথা কিছু জানি না। আমি জানতাম। দুপুরে মা শুয়ে ছিল নিজের ঘরে, আমি কল্যাণ-কাকার কথা তুললাম। মা চমকে বিছানায় উঠে বসল। আমার কেমন কান্না পাচ্ছিল।…মাকে বললাম, সাতাশ বছর বয়সের মধ্যে বাবা যদি পাগলামি করে তিনটে বিয়ে করে বসে…তুমি উনিশ বছর বয়সে কল্যাণ-কাকার কাছে আশ্রয় নিয়ে অন্যায় তো কিছু করোনি। বাঁচার জন্যে কারুর ওপর ভালবাসা— নির্ভরতা দরকার। নয় কি, তুমি বলো?”

“অশোকা!”

“কী?”

“কথাটা তুমি তোমার মাকে না বললে পারতে, আমাকেও।”

“পারতাম না। আমার মা, আমি—আমার মানুষ। সীসের মূর্তির মতন আমার মা চোখের সামনে সাজানো থাকবে— আমি তন্নতন্ন করে খুঁজেও আমার মা-র মনের তল পাব না— এ কি হয় নাকি? আজ আমার আর মা-র সম্পর্ক সহজ হয়ে গেছে।…মা-র কষ্ট আমি বুঝতে পারছি, এই কষ্ট না বুঝলে মা-র কতটুকু বুঝতে পারতাম।…”

“তোমার মাথায় আজ পোকা নড়ে উঠেছে। …চলো এবার একটু বাইরে যাই। কদমতলা দিয়ে হেঁটে ঝিল পর্যন্ত বেড়িয়ে আসি।”

“চলো।”

কদমতলার কাছে অন্ধ গরুটা দাঁড়িয়ে ছিল। ছায়ার চাঁদোয়ার তলায় লাল মাটি ঘুমিয়ে পড়েছে কালোর চাদর টেনে। পাতার জাফরি কমে গেল। এবার কাঁকরে পথ। মনোহর তেলি কেরোসিন বাতি জ্বালিয়ে দোঁহা পড়ছিল: ‘যতদিন মাটির তলায় বীজ ছিলাম কেউ আমার দিকে নজর দেয়নি, আজ গাছ হয়ে মাথা তুলেছি গরু ছাগল আমায় মুড়িয়ে খেতে আসছে, ছেলেরা পাতা ছিঁড়ে পরখ করেছে আমি বিষ না মধু, বড়রা দেখছে আমার গা-গতরে ক’ মন কাঠ হবে বেচার মতন।’ অশোকাকে আমি দেখছিলাম। মিহি মোলায়েম আলো আমাদের আলাদা করেছে। অশোকাকে আমি দেখছি। বার বার, নিমেষহারা হয়ে। অশোকাকে এমন করে আগে কখনও দেখিনি। আগে অশোকা এমন ছিল না। আজ সে নতুন, নতুন মানুষ। তার শরীর, তার হাঁটার ছন্দ, তার মুগ্ধ শান্ত অভিভূত চোখ এই জ্যোৎস্না মাটি পথ বাতাস সমস্ত কিছুর মধ্যে ছড়িয়ে গেছে। অশোকার সেই ভীরুতা, দ্বিধা, শঙ্কা, বিরক্তি, ঔদাস্য, ক্লান্তি— আজ কোথায় হারিয়ে গেল? কোথায়? মনে হচ্ছে যেন, ওর জন্যেই এত আয়োজন— এই আলোটুকু, এই পথটুকু, চৈত্রের বাতাসটুকু! অবাক লাগছিল আমার, অশোকা এত জীবন্ত কী করে হল, এত আনন্দ তার কাছে কে এনে দিল—!

“আমি অনেক কথা বলেছি আজ, এবার তুমি বলো।”

“আমি! কী বলব?”

“যা খুশি তোমার। একটা গল্প বলো।”

“গল্প?”

“বলো—”

অশোকা গল্প শুনবে, কী গল্প বলি? অশোকার গল্প শোনার খুবই ইচ্ছে, কোন্ গল্প বলি? অশোকাকে দেখছিলাম। সে আমার গায়ের পাশে ঘন হয়ে গেছে। আমরা কি এখানে মিশে যেতে পারি? এখানে আলো আছে।

“কই বলো—”

“বলতেই হবে?”

“বাঃ, তবে কী?”

“দাঁড়াও একটু ভেবেনি।”

আমার হাত ওর হাতে জড়িয়ে নিল অশোকা। ওর মাথা আমার কাঁধে যেন আদর করে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। গল্প বলতে হবে অশোকাকে। কোন্ গল্প বলি। মনোহর তেলির দোঁহার গুঞ্জন কানে ভেসে এল। ছড়িয়ে ছাপিয়ে ভ্রমরের মতন গুনগুন করতে লাগল; যতদিন আমি বীজ ছিলাম কেউ আমার দিকে নজর দেয়নি, আজ গাছ হয়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছি…

“খুব ছোট একটা গল্প বলতে পারি।”

“এক নিশ্বাসের?”

“জানি না, সে হিসেব তুমি করো।”

“বেশ বলো—”

“একটি মেয়েকে নিয়ে গল্প।”

“কোথাকার?”

“এখানকার।”

“এই শহরের—?”

“ও-সব কথা আমায় জিজ্ঞেস কোরো না।…এই শহরেরও হতে পারে অন্য জায়গারও হতে পারে। …যা বলছিলাম, সব মানুষের মতনই এই মেয়েটির একটি জন্ম-সময় আছে, দিন আছে, মাস বছর আছে। তার বাবা ছিল মা ছিল, অন্য পাঁচটা আত্মীয়জন যেমন থাকে মানুষের, তারও তেমনই ছিল সব।…ধীরে ধীরে এই মেয়ে বড় হয়ে উঠছিল। তার শৈশব শেষ হল, সে কিশোরী হয়ে উঠল; কিশোরকালও ফুরিয়ে এল…”

“কী নাম মেয়েটার?”

“কথার মধ্যে বাধা দিও না। আমার এ-গল্পে মেয়েটির নাম খুব দরকারি নয়। যা বলছিলাম, কিশোরী মেয়েটিও বড় হয়ে উঠল দিনে দিনে। সে এখন যুবতী, তার শরীর মন ক্ৰমে একটা গড়ন পেয়েছে। যেমন করে গর্ভের শিশুর গড়ন পায়, তরল ভাসমান প্রাণ আস্তে আস্তে আকার অবয়ব পায়, ইন্দ্রিয়ময় হয়ে ওঠে— তেমনই।…”

“এ আবার কী ধরনের গল্প? গড়ন পেয়েছে— কিসের গড়ন, কেমন তার চেহারা—”

“অশোকা, আবার তুমি আমার গল্পের মধ্যে বাধা দিচ্ছ। তোমার বুদ্ধির কষ্টিপাথরটি এ-গল্পের গায়ে ছুঁইয়ো না। আগে আমি শেষ করি— আসল-নকল বিচারটা পরেই কোরো।”

“খুব যেন অধৈর্য হয়ে পড়েছ।…চটছ নাকি? আচ্ছা বল, আর একটিও কথা বলব না।”

“মেয়েটির তখন দু’কূল ভরা বয়েস, হঠাৎ কী খেয়াল হল তার, একদিন শেষ রাত্রে ঘুম একটু ফিকে হয়ে আসতেই বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল বাইরে বেরিয়ে এল। তখনও সূর্য ওঠেনি, পাখিদের ঘুম ভেঙেছে সবে, ফরসা ভাব, শুকতারা ডুবছে। মেয়েটি আনমনে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির সীমানা পেরিয়ে মাঠে এসে পড়ল। শিশির-ভেজা মাটি, সকালের গন্ধ, ঠাণ্ডা বাতাস, গাছের পাতা দোল খাচ্ছিল মৃদু মৃদু, অনেকটা দূরে ফাঁকায় একটা বাগান-ঘেরা বাড়ি, মাথাটা দেখা যাচ্ছিল আবছা।…কী খেয়াল হল, হাঁটতে শুরু করল ও।…প্রথমে তার জানা ছিল না, কোথায় যাচ্ছে— পরে বুঝল, বাড়িটার দিকেই সে হাঁটছে। হাঁটতে হাঁটতে—”

“অত সকালে একা একাই সে মাঠ ভেঙে যাচ্ছিল! বাড়িটা কি আগে সে কখনও দেখেনি?”

“তুমি একেবারে খাঁটি বাঙালি সাহিত্য-সমালোচক, যুবতী কুমারী মেয়েকে একা একা সকালে পথ হাঁটতেও দেবে না? কোথায় যাচ্ছে না জানলে তোমার স্বস্তি নেই। …কিন্তু কী করব, মেয়েটি একা একাই যাচ্ছিল— আর যে-বাড়িতে যাচ্ছিল সে-বাড়ি আগে সে দেখেনি।”

“কী ছিরি তোমার গল্পের। এতকাল মেয়েটা যে-জায়গায় মানুষ তার আশপাশের খবর জানে না! বাড়িটা আগে দেখেনি কখনও…তাই কি হয় নাকি—?”

“দোহাই তোমার, অন্তত এ-গল্পের খাতিরে হতে দাও। ধরো না কেন, মেয়েটির ওই রকমই স্বভাব ছিল। সে কখনও চারপাশে তাকায়নি, কিছু দেখেনি, সংসারের সীমানায় তাকে আগল দিয়ে রাখা হয়েছিল। আর এতে তার কোনো দুঃখকষ্ট ছিল না। সংসারের আর পাঁচজনের সঙ্গে সে সমানে খেয়েছে পরেছে হেসেছে ঘুমিয়েছে।”

“বেশ, বলো— তারপর কী হল? মেয়েটি বাড়ির কাছে গিয়ে পৌঁছল তো?”

“হ্যাঁ, পৌঁছল; ফটক খোলাই ছিল। একটু ইতস্তত করে সে ঢুকে পড়ল।…বাড়িটা আশ্চর্য সুন্দর; অনেক ঘর, সব ঘরেরই দরজা জানলা খোলা, হাওয়া চারপাশে লুটোপুটি খাচ্ছে, পরদাগুলো আলুথালু হয়ে উড়ছে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন আসবাব দিয়ে সাজানো ঘর, কেউ যেন ধূপ জ্বেলে দিয়ে গিয়েছিল ঘরে ঘরে— মিষ্টি আচ্ছন্ন গন্ধ, সমস্ত বাড়িখানা নিশ্চুপ স্তব্ধ। বাড়িটির প্রত্যেকটি ইঁট কাঠ আসবাব জীবন্ত, অথচ কোথাও একটু সাড়া নেই। মেয়েটি এক এক করে সব ঘর ঘুরে আবার নিচে এসে দাঁড়াল। অবাক হচ্ছিল ও, এ-বাড়িতে মানুষ নেই কেন— কোথায় গেল এরা? কার বাড়ি? কে মালিক এমন সুন্দর বাড়ির?… ভাবতে ভাবতে মেয়েটি যখন ফটকের কাছে এসেছে, হঠাৎ…”

“কী হঠাৎ?”

“হঠাৎ কে যেন তার কানের পাশে ফিসফিস করে বলল, “চলে যাচ্ছ। এ-বাড়িটা যে তোমারই…”, নিশ্বাসের মতন একটু অদ্ভুত হাসি ছিল সেই স্বরের মধ্যে। মেয়েটি চমকে উঠল। তাকাল আশপাশে, কাউকে দেখতে পেল না।…ফটক ছেড়ে অনেকটা এগিয়ে এল ও। অন্যমনস্ক। সূর্য উঠে গেছে। তন্ময় হয়ে পথ হাঁটছিল মেয়েটি। নিজেদের বাড়ির কাছে এসে পড়ল। এবার একবার দাঁড়াল। থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে পিছু ফিরে চাইল। সেই আশ্চর্য সুন্দর বাড়ি রোদের মধ্যে কোথায় হারিয়ে গেছে। অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকেও সেই বাড়ি আর খুঁজে পেল না।…কিন্তু…”

“কী কিন্তু?”

“কিন্তু কী আশ্চর্য, যে-বাড়িতে এতকাল সে কাটিয়েছে, সেই বাড়িও তার নিজের মনে হল না।”

“তবে?”

“তবে আর কি! পুরনো বাড়িতে পা দিয়ে মেয়েটি ভাবল তার একটা আলাদা, সুন্দর অদ্ভুত বাড়ি আছে, শী ঘ্রি একদিন সে তার নতুন বাড়িতে চলে যাবে।”

“তারপর—?”

“তারপর আর কি, নতুনের আনন্দে নিজের করে পাওয়ার সুখে তার কাছে পুরনো বাড়ির মানুষগুলোর চেহারা বদলে গেল। মামার দুর্ব্যবহার ক্ষমা করে মামার ভালবাসাকে সে আবিষ্কার করল, মা-র খাদটুকু পুড়িয়ে মাকে সে সোনা করল…। সেই মেয়ের চোখে রোজকার গোধুলি নতুন হয়ে দেখা দিল, বিশ্ব তার কাছে এত আপন হয়ে উঠল যে, বেচারির মাছ কি পাখি হতেও ইচ্ছে করছিল…। ও কি, অশোকা,…তুমি কাঁদছ?”

“চোখে জল আসছে, কেমন একটা কান্না পাচ্ছে…। এ-গল্প যেন কেমন—।”

“এ-গল্প বীজ থেকে গাছ হওয়ার। যতদিন বীজ মাটির মধ্যে ছিল কেউ দেখেনি, বীজ যখন গাছ হয়ে মাটির ওপর মাথা ঠেলে দাঁড়াল তখন সে অন্য প্রাণ। তার নতুন করে জন্ম হয়েছে।”

“আমার একারই কি এই নতুন জন্ম?”

“আমি ঠিক জানি না। বোধ হয় সব মানুষেরই হয়।”

মনোহর তেলির দোঁহার প্রথম কলিটিতেই যদি গান শেষ হত, কথা ফুরত! কিন্তু তা ফুরোয়নি। গাছ হওয়ার পরও কথা ছিল; ‘আজ গাছ হয়ে মাথা তুলেছি গরু ছাগল আমায় মুড়িয়ে খেতে আসছে, ছেলেরা পাতা ছিঁড়ে পরখ করছে আমি বিষ না মধু, বড়রা দেখছে ভবিষ্যতে আমার গা থেকে ক’ মন কাঠ হবে বিক্রির।”

“অশোকা।”

“ইস্, এমন করে ডাকলে— আমি চমকে উঠেছি। কী শক্ত করে আঁকড়ে ধরেছ হাত!”

“কিছু না, চলো— ফিরি। আর ভাল লাগছে না।”

আমি অনেককে বলতে শুনেছি, কোনো এক সুন্দর দয়াময় পুরুষ এ জগৎসংসার সৃষ্টি করেছেন। অশোকাও বলত, ভগবানের হাতের নিখুঁত কাজ ছাড়া এমন কি হয়! আমি জানি না, আমি কখনও কোনো দয়াময় পুরুষের কথা ভাবিনি। বরং আমি অন্য কথা বহুবার ভেবেছি। যার কথা আমি ভাবতাম জটিল জন্মসূত্রে আমি তার সঙ্গে জড়িত। …মাঝে মাঝে আজও আমি খুব অবাক হয়ে ভাবি, মানুষ কেন মনে করে না, অনাচারী কলুষ নিষ্ঠুর এক হীন ষড়যন্ত্র থেকে এই জগৎ-সংসারের জন্ম হয়েছে। আমরা পাপ থেকে জাত। আমাদের আদি এবং অন্তে এই পাপ ছাড়া কী আছে? ক্ষয়, মৃত্যু, আশাভঙ্গ, ব্যর্থতা, শোক— বংশপরম্পরায় পাপ আরও যে কত শাখা-প্রশাখায় বিস্তৃত। সহস্র পুত্রের পিতা এই আদি পুরুষ।…স্বেচ্ছায় কিনা জানি না, কিন্তু বুঝতে পেরেছিলাম আমি আমার পুরুষানুক্রমে রক্তের ঋণ শোধ করছিলাম।…অশোকাকে আমি দূষিত করছিলাম দিনে দিনে। ও আমায় পরিপূর্ণভাবে বিশ্বাস করত, তার ধারণা ছিল এ-সংসারে আমি তার সবচেয়ে বড় বন্ধু, ভাবত আমার ভালবাসা তার ভালবাসার মত নিখাদ। …আমার মনে পড়ছে না, কখনও কোনো কারণে ও আমায় সন্দেহ করেছে। অবশ্য করার মত কারণ রাখিনি। জন্মগত কিংবা বলা যায় বংশগতভাবে, আমরা আমাদের ছলাকলা ভাল করেই জানতাম। কখনও কখনও এই ছলাকলা নিজের কাছেই সত্য বলে মনে হত। মনে হত, আর ভয় হত।

“অশোকা?”

“কী?”

“কাল তুমি চলে যাবার পর আমার কী মনে হচ্ছিল জানো?”

“তোমার তো রোজই ওই এক কথা। আমি সব বুঝি মশাই।”

“বিশ্বাস না করলে আর কী করব বলো…।”

“ইস্…মুখ যে অমনি মেঘলা হয়ে উঠল। একটুতেই এত লাগে তোমার। উঁহু, মেয়েদের মতন অত অভিমানী হলে পুরুষ মানুষদের চলে না। …কই দেখি, মুখটা তোল; তাকাও না আমার দিকে—তাকাও—। বাব্বা…আচ্ছা এই নাও…জরিমানা দিলাম।”

“এমনি করে তুমি আমায় আর কত কাল ভুলিয়ে রাখবে?”

“ছি, ও-কথা বলো না। …তোমাকে ভুলিয়ে রাখা আমার কাজ নয়; ও-সবে আমার বরাবরের ঘেন্না।”

“কিন্তু আমার যে আর ভাল লাগে না। যতক্ষণ তুমি থাক…বেশ থাকি— তুমি চলে গেলে আর যেন আগ্রহ পাই না।”

“মা বলছিল, চাকরি ছেড়ে দে। ছেড়ে দিতাম। মামার জন্যে পারি না। মামি মারা যাবার পর মামা কেমন হয়ে গেছে দেখেছ। বাচ্চুকেও ওই একই রোগে ধরেছে। আমি চাকরি ছাড়লে সংসারই চলবে না— তো বাচ্চুর খরচ।”

“ও, ভাল কথা, তোমার জন্যে পঞ্চাশটা টাকা রেখেছি ওই ড্রয়ারের মধ্যে, যাবার সময় নিয়ে যেয়ো।”

“কত আর দেবে তুমি এ-ভাবে, আর দিও না।”

“কেন?”

“নাঃ, ভাল লাগে না।”

“আমি কি রাস্তার মানুষকে দাতব্য করছি?”

“করছ। আমার জন্যে হলে নিতে বাধত না; কিন্তু এ-টাকা যে আমার মা, মামা, বাচ্চুরাও খায়। ব্যাপারটা কেমন বেচাকেনার মতন নয় কি?’ ওরা এর পর তোমার কেনা হয়ে যাবে, এখনই তো ওরা…”

“আঃ, যেতে দাও ও-সব কথা। বাজে যত…।”

আসলে এগুলোই আমার কাজের। অশোকাদের সমস্ত পরিবারকে আমি জড়াচ্ছিলাম। চার পাশ থেকে ওদের আটকে ফেলা। বাস্তবিকই আমি কিনে নিচ্ছিলাম। আমাদের কোনো এক পূর্বপুরুষ মোহরের থলি মুঠোয় করে গাধার পিঠে চড়ে দুর্ভিক্ষের সময় মানুষের আত্মা কিনতে বেরিয়েছিলেন। শুনেছি প্রায় সব আত্মাই তিনি কিনে নিতে পেরেছিলেন। আমরা জানি মানুষের শরীরের মাংস কিনতে নেই— তার আত্মাকেই কিনে নিতে হয়। সেটাই একমাত্র খরিদ।

“তোমার যে জ্বর হয়েছে দেখছি।”

“তেমন কিছু না, কাল একটু ঠাণ্ডা লেগেছে। তুমি বরং অশোকা…”

“না লাগাই আশ্চর্য! কী দরকার ছিল তোমার রাস্তার মাঝখানে গায়ের শালটা আমায় দাতব্য করার?”

“তোমার যে শীত করছিল। তা ছাড়া তোমার গায়ে আমি যে জড়িয়ে থাকব চাদর হয়ে— এও কি কম সুখ!…”

“রসিকতা রাখো। ভাল লাগে না এ-সব আমার।”

“আমার কোন্‌টা যে তোমার ভাল লাগে অশোকা— আমি বুঝতেই পারি না।”

“থাক বুঝতে হবে না। দুর ছাই— আমি আবার সঙ্গে করে শালটা আনলাম না আজ।”

“ভালই করেছ। ওটা তোমার গায়ে থাক।”

“পরের কথা পরে, এখন আমি কী দিয়ে তোমায় ঢাকা দি?”

“…বলব?”

“বলো।”

“তুমি নিজেকে দিয়েই…”

“যাঃ—অসভ্য।”

সভ্যতাকে আমরা চিনি। বহু বছর ধরে এই সভ্যতাকে দেখে আসছি আমরা। পৃথিবী যখন অসভ্য ছিল, আমরা কম শিকার পেতাম। সভ্যতা যত বাড়ছে আমাদের শিকার সুলভ হচ্ছে।…অশোকার মা যেচে আমার বাড়িতে এসেছিলেন। মেয়ের জন্যে দুর্ভাবনার অন্ত নেই। বলেছিলেন বিয়েটা তুমি করে ফেল, বুঝলে! নয়তো ও-মেয়েও আর বাঁচবে না। ওর মামা মরছে মরুক, বাচ্চু মরবে— মরুক গে— অশোকাকে তুমি বাঁচাও। সংসারের ঘানি টেনে আর দু দুটো যক্ষ্মা রুগীর পাশে পাশে থেকে ওটাও মরবে নাকি! কিসের দায় তার।…বিয়ের পর অশোকা এ-বাড়ি চলে এলে আমি বাঁচি। কী ভয়ে ভয়ে যে এখন আছি, বাবা!…অশোকা চলে এলে তার মা-ও আসবেন। ও-বাড়িতে বাঁচা যায় না।

“ব্যাপার কী, কাল যে এলে না।”

“পারলাম না।”

“কেন, আটকাল কোথায়?”

“স্কুলের সেক্রেটারির বাড়িতে ডাক পড়েছিল।”

“হঠাৎ—”

“হঠাৎ নয়—, পড়ব-পড়ব করছিল। আমার নামে খুব লোকনিন্দে রটেছে। আমি নাকি খারাপ চরিত্রের মেয়ে…”

“তোমার মুখের ওপর এইসব কথা বলল লোকটা?”

“বলল। অনেক বয়েস হয়েছে কিনা— বাপের বয়সী— কাজেই মুখে কিছু আটকাল না।”

“আশ্চর্য—! তা তুমি কী বললে?”

“স্বীকার করে নিলুম। বললুম, যে ভদ্রলোকের বাড়িতে আমি রোজ যাই, তিনি আমার স্বামী। বিয়ে হয়নি, হবে শী ঘ্রি। সংসারে আমার পোষ্য তিনজন, তার মধ্যে দু’জন খুব খারাপ অসুখে ভুগছে। আমি ছাড়া তাদের গতি নেই। এক দায়িত্ব এড়িয়ে অন্য দায়িত্ব কি করে কাঁধে নি। বিয়েটা তাই পিছিয়ে যাচ্ছে।”

“এত কথা ওকে বলার কী দরকার ছিল।”

“অবস্থাটা যাতে বোঝেন ভদ্রলোক।”

“বুঝলেন?”

“না।”

“তবে?”

“চাকরিটা বোধ হয় গেল।”

মানুষের মত মূর্খ জীব আর নেই। সামান্য দূরদৃষ্টি এদের কেন যে থাকে না— প্রায়ই আমি ভাবি। ফাঁদে পড়ার পরও যারা অনর্থক ছুটোছুটি করে, ফাঁদ কেটে পালাতে চায়— তারা শেষ পর্যন্ত কী পায়! কিছুই নয়। শুধুমাত্র নিজেকে আরও অস্থির, ক্লান্ত, বিক্ষত করা ছাড়া তাদের কোনো লাভ হয় না। তবু এই মূর্খরা আমাদের সুন্দর করে পাতা শক্ত জাল ছিঁড়ে পালাবার জন্যে মরিয়া হয়ে ওঠে। অশোকাকে দেখছিলাম মরিয়া হয়ে লড়ছে।

“বসন্তর টিকে দিয়ে বেড়ানো ঠিকে কাজটাও ফুরলো।”

“তাই নাকি?”

“হ্যাঁ, পরশু থেকেই শেষ।”

“তবে—”

“তবে আর কী—দেখি! শ্রীপতি দর্জির সঙ্গে কথা হচ্ছিল; সেলাইয়ের কিছু কাজ দিতে পারে—”

“ক’ টাকা হবে তাতে তোমার?”

“যতটা হয়— তারপর তো তুমি আছ।”

হ্যাঁ, আমি ছিলাম এবং থাকব। অশোকার জন্যে আমায় আরও কিছু সময় থাকতে হবে। শুনেছি, আমাদের ন্যায়শাস্ত্রে লেখা আছে মানুষকে যখন অন্ধ করতে হয়— তখন এক চোখ নয়, দু’চোখই কানা করে দিতে হয়। অল্প পাপীদের কাছে বিবেকের টান ভয়ঙ্কর। পুরো পাপীরা নিশ্চিন্ত। তাদের দু’চোখই কানা।

“শ্রীপতির চালচলন খুব খারাপ।”

“মদ-ফদ খায় শুনেছি।”

“কাল রাত্তির ন’টার পর আমাদের বাসায় গেছে আমার পাওনা টাকা দিতে। ভরভর করছে মদের গন্ধ। পাঁচটা টাকা বেশি দিয়েই, এমন মাতলামি শুরু করল! পাজি লোক একটা—!”

“শয়তান।”

“আমারও তাই মনে হল।…ওর কাজ-টাজ আর আমি করে দেব না। কত আর নিচে নামা যায় বল।”

“আমারও এ-সব পছন্দ নয়, অশোকা। দর্জি মুচি ঝি…কত আর নামবে তুমি!”

বঁড়শিতে গাঁথা মাছ একটাকে ডাঙায় তোলার মধ্যে মজা নেই। পৃথিবীতে আমাদের জন্যে কিছু মজা থাকা দরকার। লখিন্দরকে বিয়ের আগেও আমরা দংশন করতে পারতাম। তবু বাসর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। কেন? মজার জন্যে। বেহুলাকে স্বামীর পাশে ঘুমুতে না দিলে মজা জমত না। এক পা আগে পরে নিয়েই তো নিয়তির খেলা।

“সুরেশবাবুর স্ত্রী কী বললেন, জান?”

“কী?”

“ঘুরিয়ে ফিরিয়ে জানিয়ে দিলেন, আমাকে আর রাখবেন না।”

“কেন?”

“আমাদের বাড়িতে যে-রোগ সেটা বড় ছোঁয়াচে। আমার শাড়ি জামা হাঁচি কাশির সঙ্গে নাকি রোগটা তাঁর বাড়িতে ছড়াতে পারে। …ওঁর ছোট মেয়েটা—ডলি ক’দিন ধরে খুব কাশছে।”

“—অশোকা—?”

“বলো।”

“এ-ভাবে আর কতদিন চালাবে?”

“আর নয়।…এখন তাই ভাবি। মামা কাল আমার হাত জড়িয়ে ধরে যখন কাঁদছিল তখনই বুঝতে পেরেছি, এ-ভাবে আর চলবে না। বাচ্চুটা ক’দিন থেকে আর কথা বলতেই পারছে না, এত দুর্বল। মা তো প্রায়ই কল্যাণকাকাকে চিঠি লিখছে আজকাল। মাঝে মাঝে টাকা আসতে দেখি মার নামে।”

“উপায় কী অশোকা—!”

“না, উপায় আর নেই। সবই বুঝতে পারি।…আগে এতটা হবে আমি ভাবিনি। একসময়ে কল্যাণকাকা মার লুকনো জিনিস ছিল, আমিই টেনে বের করলাম। এখন আর মা-র লজ্জা নেই। মামি মারা গেল, মামাকে প্রায় সর্বস্বান্ত দেখাচ্ছিল, রোগের সেবা করে করে অসম্ভব ক্লান্ত রুগ্ন— মামাকে সে-সময় সংসার টানার ভার থেকে একটু আরাম দিতে চেয়েছিলাম— মামা বরাবরের মতন ভার ছেড়ে দিল। …বাচ্চু…না, তার আর দোষ কিসের?…এমন করে চার পাশ থেকে আমি জড়িয়ে পড়ব ভাবিনি। আমার কপাল…।”

অশোকা এতদিন পরে কপালের কথা ভাবছে। আমি অবাক হয়ে ভাবি, ও কেন আমাদের কথা ভাবে না— আমরা যারা কপাল তৈরি করেছি। জীবনের ব্যর্থতাকে আমরা তাসের মত ভেঁজেভুজে ছড়িয়ে দি। মানুষ চিরকাল ভাবে যে, বাজি-মাতের গোলাম টেক্কা টানছে, কিন্তু আসলে তারা খেলা-হারের ফক্কা তাস টেনে নিচ্ছে। আমাদের এই জাদুর খেলা ওরা যদি বুঝত।…

“মৃণালকে তুমি চেন, অশোকা?”

“নতুন যে ডাক্তার হয়ে এসেছে এখানে, ডিসপেনসারি খুলেছে?”

“হ্যাঁ, আমার জানাশুনো। ওর সঙ্গে দেখা করো। খুব দেরি কোরো না যেন, আজকালের মধ্যেই যেও।”

“হঠাৎ তার কাছে পাঠাচ্ছ যে—?”

“ওর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। হয়তো তোমার কোনো উপকারে আসতে পারে।”

“চাকরি জুটিয়ে দেবে?”

“তাও দিতে পারে।…হাসছ যে?”

“এমনি। কিছু না। …যাকগে, তোমার ডাক্তার বন্ধু চাকরি জুটিয়ে না দিলেও ওষুধপত্রটা অন্তত ধারে দিতে পারবে। ফণি ডাক্তার তো আমায় দেখলেই মুখ ঘুরিয়ে নেয়। দোষ কি তার— প্রায় আশি টাকা পায় এখনও।”

“আমায় তো বল নি।”

“না, আর কত বলব।”

অশোকাকে শেষ কথাটা বলতে আসতে হবে জানতাম। আমার ছকের মধ্যে সে অনেক দিন হল বাঁধা পড়ে গেছে। এই নিষ্ঠুর গোলকধাঁধায় সে ঘুরবে আর ঘুরবে, প্রতিবার তার মনে হবে এবার বাইরে যাওয়ার পথ একটা পেয়েছে। অথচ প্রতিবারই শেষ পর্যন্ত ছুটে গিয়ে দেখবে তার পথ বন্ধ। আবার ফিরবে, আবার ঘুরবে, আবার ছুটে যাবে, ফিরে আসবে আবার। অশোকাও এল।

“এই যে, এসো অশোকা—, অনেক দিন পরে..”

‘—অ-নে-ক দিন। সত্যি আজকাল আর পারি না। সারাদিন দুপুর রাত…”

“রাতেও থাকতে হয়?”

“না। তবে আটটা ন’টা পর্যন্ত তো বটেই, যতক্ষণ বাচ্চাগুলো না ঘুমোয়।”

“মৃণাল ডাক্তার তোমায় খুবই বেঁধে ফেলেছে তা হলে।”

“হ্যাঁ। তোমার বন্ধুর বাড়িতে থাকতে এবার আমার ভয় হচ্ছে।”

“কেন, দুর্ব্যবহার করছে নাকি কিছু?”

“দূর্ব্যবহার! না, দুর্ব্যবহার আর কি…রান্নাঘর থেকে একদিন শোওয়ার ঘর পর্যন্ত হাত ধরে নিয়ে গিয়েছিল।”

“ছি ছি অশোকা, কী যা-তা বলছ! মৃণালের দুটি ছেলেমেয়ে আছে।”

“বউ তো নেই।”

“তাতে তোমার কী এল গেল।”

“আমার কিছু আসছে— কিছু যাচ্ছে। মাইনে যখন দেন ভদ্রলোক আমার হাত বাড়াতে ভয় হয় না, কিন্তু তার ওপরও যখন কিছু দেন ভয় হয়। তুমি ছাড়া ওটা আর কারুর কাছ থেকে নিতে চাইনি। অথচ এখন আমার হাত আমাতে নেই। অন্য কারুর হয়ে গেছে। শোনো, আমি অনেক ভেবেছি। আর আমি পারছি না। মা যেখানে খুশি চলে যাক, বাচ্চুটা মরবেই, মামা হাসপাতালের দরজায় গিয়ে ধরনা দিক। আমি কিছু জানি না।…এবারে নিজের জন্যে একটু স্বস্তি শান্তি আমার দরকার।…এখন বলো, কবে আমি আসব?”

অশোকার দিকে, পুরো, ভরা-চোখ তুলে তাকালাম। দেখলাম, যা চেয়েছিলাম অবিকল তেমনটি হয়েছে সে। ঘা খাওয়া, মার খাওয়া, ক্লান্ত, ব্যর্থ, অবিশ্বাসী, ভীরু স্বার্থপর সেই মানুষ। হেরে গিয়েছে অশোকা। তার চোখে করুণ আবেদন ভিক্ষুকের সেই দাও-দাও হাত বাড়ানো। কী আশ্চর্য, অশোকার বয়স কত বেড়ে গেছে। মনে হচ্ছিল, প্রৌঢ়ত্বের সীমায় এসে দাঁড়িয়েছে। কোনো মাধুর্য নেই কোথাও, অত্যন্ত পরিশ্রান্ত, শুষ্ক, অসুস্থ। অতি কষ্টে যেন, প্রাণান্ত পরিশ্রম করে বুকের মধ্যে একটি নিশ্বাস নিচ্ছে এবং ফুসফুসটাকে কোনো রকম সান্ত্বনা দিয়ে বিদায় করে দিচ্ছে। অশোকার জন্যে আমার দুঃখ হচ্ছিল, হয়তো অন্তরে হাহাকার করে উঠতে চাইছিলাম, কিন্তু আমার সাধ্য ছিল না পিতৃপুরুষের সঙ্গে শঠতা করি। অশোকার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে শেষে বললাম, “এখন এ-সব কথা না তোলাই ভাল অশোকা, অনেক দেরি হয়ে গেছে। তোমায় রোগে ধরেছে, বুড়োটে হয়ে গেছ তুমি। আয়নায় একবার নিজেকে দেখ, আমি বাড়িয়ে বলছি না।” অশোকা বিশ্বাস করল না। সে আমায় ভালবাসে, এবং বিশ্বাস করে আমি তাকে ভালবাসি। আমার সততা সহানুভূতি একনিষ্ঠতায় তার তিলমাত্র সন্দেহ ছিল না। সে অবিশ্বাসের হাসি হাসল। দমকা হাসি। উড়িয়ে দেওয়া হাসি। কিন্তু অশোকা আমার মুখের দিকে চেয়ে চেয়ে একসময় বুঝতে পারল, বিশ্বাস করল। তার ফস্ করে জ্বলে ওঠা হাসির বারুদ ফুরলো। তারপর দুর্বল ম্লান হয়ে কাঁপতে কাঁপতে ম্লানতর হল। শেষে নিভে গেল। পোড়া কাঠির মতন পুড়ে গেল অশোকা।

মনোহর তেলির দোঁহার গানটি আমার কানে ভাসছিল। অন্ধকার হয়ে গেছে। কুয়াশা ঘন হয়ে ছড়িয়ে রয়েছে। অশোকা হারিয়ে গেল।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *