কথাকলি কোথায়? – অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
কথাকলি কোথায়? – অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
স্বয়ম্ভু সেনের দ্বিতীয় রহস্যকাহিনি
.
ভূমিকা
ভূতের ব্যাগার…
আমি ভূত পুষি। পুষতে হয়। নইলে সময়মতো সাপ্লাই দেব কী করে? গেঁয়ো, শহুরে, মফস্বলীয় যে যেমন চায় তাকে তেমন ভূত সাপ্লাই করি। কিছু কিছু ভূত আবার আমার ইচ্ছেমতো বানাই। এত ভূত দিই বলে কেউ কেউ আবার হাউমাউ করে আবদার করে বসেন, দাদা একটু ফিউশন ভূত দিন না! ঠিক তখনই একটা কঙ্কালের হাত চটাং করে চাঁটি মারে আমার ব্রহ্মতালুতে। ফিউশন ভূত! সে বস্তুটি আবার কী? আবদারকত্তা বলেন, যে ভূত হবে ঝিনচ্যাক আধুনিক। কিন্তু তার কর্মকাণ্ড হবে গেঁয়ো ভূতের মতো আঁশটে গন্ধ মাখা।
এরপরেই ভূতের চোদ্দগুষ্টির চরণে সাষ্টাঙ্গে পেন্নাম সেরে বলেছি, অনেক হল ভূতের কেত্তন। এবার একটু অন্য কিছুর ব্র্যাঞ্চ খোলা যাক। ভূত থাক, আমার প্রথম প্রণয়িনীর মতো। কুলীন বামুন তো, তাই অধিক প্রণয়ে বাধা নাই। যেমনি ভাবা তেমনি কাজ। আমার মনের কায়াহীনেরা ধীরে ধীরে কায়া ধরল। আলো আঁধারে রহস্যের ছায়া ফেলে বলল, এলিমেন্ট কি আর কম আছে নাকি? সমাজজুড়ে এত খুনি-হারামি-চোর-ডাকাত-আসামি, এবার তাদের নিয়ে লেখ দিকিনি। পেছনে লেলিয়ে দে একটা নতুন টিকটিকি। সরকারি টিকটিকি। সঙ্গে থাক টকটকে টিকটিকিনি। গুছিয়ে ফাঁদ অপরাধের গল্প।
সেই তখন, সেই কায়া-ছায়ার ব্রাহ্মমুহূর্তে আমার কলম ফুঁড়ে আপনা থেকেই আবির্ভূত হল নতুন রহস্যসন্ধানী। নাম রাখলাম স্বয়ম্ভু। সঙ্গে সেঁটে রইল সহকারী শিবাঙ্গী। ভূত ছেড়ে শুরু করলাম পুতের পাঁচালি।
.
জনতা জনার্দন…
ভাবলেই তো আর হল না। আইন কানুন, ডাক্তারি-মোক্তারি সবরকমই জানতে হবে। নইলে রহস্যের জাল ফেঁদেই বসে থাকতে হবে। আর সেই জাল ক্রমে আমার গোয়েন্দার গলগণ্ড হয়ে ফুলে ঝুলে থাকবে। তাই ক্যাচ কট কট ডাক্তারদাদা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও জয়দীপ গাঙ্গুলি। মোক্তারির জন্য উকিলবন্ধু সোমঋতা ও পুলিশবন্ধু উজ্জ্বল হালদার। লেখার পর আমার তিন ছাঁকনি পৌষালি-সহেলি-পহেলি যথাক্রমে আমার ভার্যা-ভগিনী-ভ্রাতৃবধূ-র জরুরি সমালোচনা ও ত্রুটি সংশোধন। মোটামুটি এঁদের কাঁধে ভর দিয়েই লেংড়ে লেংড়ে আমার বিড়ালটা এক নলেনগুড়ের সকালে ডেকে উঠেছিল ম্যাও!
পেসমেকারে প্রাণ ধরে বসেছিলাম। ভাবছিলাম, এই বুঝি পাঠককুলের সমবেত অট্টহাসিতে ছারখার হয়ে গেলাম। দুদিন বাদেই হয়তো দেখব বইমেলার মাঠে স্বয়ম্ভুর শির আর শিবাঙ্গীর ধড় এক করে ঝালমুড়ির ঠোঙা ঘুরছে পাঠকের হাতে হাতে। কিন্তু দেখলাম, আদিম কথাটিই ঠিক। জনতা জনার্দন। তাঁরাই আমায় জিতিয়ে দিল। পেসমেকার ছুড়ে ফেলে নিজের ফুসফুসে বাতাস ভরে বাঁচতে শেখাল। মাত্র কয়েক মাসেই যে পরিমাণ পাঠক স্বয়ম্ভু সেনের প্রথম রহস্য অভিযানকে মাথায় তুলে নিলেন এবং আজও, এখনও যেভাবে আমার সাধের আদরের বেড়ালটিকে সকলে কোলে নিয়ে ভাতটা, মাছটা খাইয়ে নাদুসনুদুস করে তুলছেন তাতে আমার চোখে তাঁরাই ঈশ্বর থেকে পরমেশ্বরের রূপ ধারণ করছেন ক্রমশ। এখানে অবশ্যই উল্লেখ্য বুক লুক পাবলিশিং-এর দুই তরুণ প্রকাশক রোহন ও প্রিতমের অদম্য উৎসাহ ও সৎ-নিষ্ঠভাবে কাজ করার আপ্রাণ প্রয়াস। বাতেলা নয়, তারা দুজনেই কাজের মতো কাজ করে দেখিয়েছে।
.
অমৃতকুম্ভ…
দীর্ঘ ১২ বছর পর এ বছর অর্থাৎ ২০২৫-এ মহাকুম্ভ। কোটি কোটি মানুষ পুণ্যার্জনের আশায় চলেছেন সেখানে। কিন্তু আমি আদ্যন্ত ধর্মপ্রাণ হওয়া সত্ত্বেও সেখানে যাইনি। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের থেকে ধার করে বলতেই পারি, যেতে পারি কিন্তু কেন যাব? যখন ঘরে বসেই আমার মহাকুম্ভের পুণ্যলাভ হচ্ছে। ম্যাও-এর বিপুল জনপ্রিয়তার সঙ্গে সঙ্গেই প্রায় বছরখানেক ধরে অগণিত পাঠকের প্রশ্ন, দ্বিতীয় পার্ট কবে আসবে? কোনোদিন কল্পনাও করিনি আমার লেখার জন্য এত পাঠক অপেক্ষা করে থাকবে। এটাই তো আমার কাছে পুর্ণকুম্ভের মহাফল।
.
কর্ম + ভাগ্য = ফলাফল?
আরও একটি প্রকাশনায় ভৌতিক উপন্যাসের সঙ্গেই লিখতে শুরু করেছিলাম স্বয়ম্ভু-শিবাঙ্গীর দ্বিতীয় রহস্যকাহিনি। কিন্তু আমাদের জীবনে হাজির হল বড় দুঃসময়। মর্মান্তিক ঘটনায় শহরজুড়ে আগুন জ্বলল। মন ভেঙে গেল। মুষড়ে পড়ল ইচ্ছেশক্তি। বিচার কোথায়? মুহূর্তে মনে হল, কী হবে গোয়েন্দা গল্প লিখে? প্রায় প্রতিটা রহস্যকাহিনিতেই অপরাধীর বিচার
হয়। গোয়েন্দাবিভাগ সিংহের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে খুঁড়ে বের করে আনে আসল সত্যিটা। কিন্তু বাস্তবে তো এর ঠিক উল্টোটা ঘটে চলেছে। তাহলে বিচারের বাণী আজও কি কেবল গোয়েন্দা উপন্যাসের পাতাতেই বন্দি? মিথ্যে মনে হচ্ছিল সবটুকুকে। থেমে গিয়েছিল লেখা। কেন লিখব? রোহন- প্রিতমকে জানিয়ে দিয়েছিলাম এবারের মতো স্বয়স্তুকে ছুটি দাও। এইভাবে জোর করে লেখা হয় না। ওরা ছুটি দিয়েও ছিল। কিন্তু ওরা বারবারই চাইছিল আমার লেখা একটি বই প্রকাশ করতে। কী তীব্র ভালোবাসার চাহিদা ওদের দুজনের! ফেরাতে ভীষণ খারাপ লাগছিল। শেষে ঠিক হল, পুরনো যা লেখা তাই দিয়েই হোক তবে? বেশ একটা সংকলন হবে। আমিও বাঁচলাম কদিনের জন্য। ও মা! ফিরে আবার ফোন প্রিতমের স্বয়ম্ভু সেনকে নিয়ে ছোট একটা গল্প লেখো না দাদা, যেটা পরের উপন্যাসটার প্রিল্যুড হিসেবে কাজ করবে। অনেক না বলেছি। অবশেষে আবার চেষ্টা শুরু। শুরু হল রহস্য খোঁজা। আবারও অপরাধ ও অপরাধীর অন্ধকারে ডুবিয়ে দিলাম নিজেকে। মাথায় এল নতুন ভাবনা। লিখতে গিয়ে দেখলাম, নাহ, এ কিছুতেই ছোটগল্প হবে না। রীতিমতো উপন্যাসই হয়ে চলেছে। এদিকে হাতে আর মাত্র একমাস। অফিস সেরে, দিনরাত এক করে শুরু করলাম লেখা। না, এবার আমি লিখলাম না। আমার ভিতর থেকে কেউ একজন লিখিয়ে নিল। এই, এই তাগিদটাই লেখার জন্য বড় প্রয়োজন। যেটা শেষ দুমাসে হারিয়ে ফেলেছিলাম। বুক লুকের উৎসাহেই কথাকলি হারিয়ে গেল। ফিরে এল শব্দেরা। অক্ষরের পর অক্ষর জুড়ে খুঁজতে থাকলাম কথাকলিকে। খুঁজে কি পেলাম আদৌ? সেটা আবারও সেই জনতা জনার্দনের হাতেই ছাড়লাম। তাঁরা যা বিধান দেবেন তাই-ই শিরোধার্য। আমি আমার সবটুকু দিয়েছি। নিজেদের উজাড় করে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় অসাধারণ কাজ করেছে বুক লুক। এ যেন তাঁদের অগ্নিপরীক্ষা। শিল্পী সুবিনয় দাস-এর অত্যন্ত শৈল্পিক প্রচ্ছদ আর অতি স্বল্পসময়ে বইটির অন্দরসজ্জায় চরিত্রচিত্রণ করেছেন অভিব্রত সরকার। আমার তো খুব ভালো লেগেছে। এবার বাকিটা আপনাদের মানে পাঠকবন্ধুদের হাতে…. দেখুন তো, স্বয়ম্ভু-শিবাঙ্গীর এবারের কর্মকাণ্ড আপনাদের পছন্দ হয় কিনা!
ভালো থাকবেন। বইয়ে থাকবেন।
অভিষেক চট্টোপাধ্যায়





