১৪
রাবেয়া খাবার সাজাচ্ছিল। তখন বেল বাজে। আবদুল সাড়া দিয়ে দরজা খুলতে গিয়েছিল। কিন্তু কোনো লোক নেই। আবদুল অবাক হয়ে বাইরে মুখ বাড়িয়ে বাঁ-দিকে তাকায়। কারণ ওদিক দিয়েই গেলেই রাস্তায় পড়া যায়। তৎক্ষণাৎ ডান দিকের অন্ধকার ভেদ করে একটা হাত আবদুলের মুখ চেপে আবদুলকে অন্ধকারে টেনে নেয়। আগন্তুকের গায়ের জোরের সঙ্গে পেরে ওঠে না আবদুল। বেশ খানিকটা অন্ধকারে পাঁচিলের আড়ালে নিয়ে গিয়ে মুখ চাপা অবস্থাতেই কানের কাছে ফিসফিস করে আগন্তুক বলে ওঠে, আমি আমি। আজ সকালে সোমেন সরকারের বাড়িতে দেখা হয়েছিল। এরপর মুখ ছাড়তেই আবদুল ঘুরে তাকায়। অন্ধকারে ভালো করে ঠাওর করতে পারে না। আগন্তুক মোবাইলের আলো জ্বেলে নিজেই নিজের মুখ দেখায়।
আপনি? এইভাবে আমায় টেনে আনার মানে কী?
স্বয়ম্ভু আবদুলকে তার ঘরের দরজার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলে, মানেটা ওই যে। আবদুল অন্ধকারের ঘোমটা থেকেই উঁকি মারে। দেখে একটা বেশ শক্তপোক্ত চেহারার লোক ওদের দরজায় এসেছে। কী যেন কথা বলছে। ভালো করে কান পেতে শোনে লোকটা তার বউকে ধমকাচ্ছে। আবদুলের খোঁজ চাইছে। শেষে বলে উকিলের কথা। স্বয়ম্ভু বলে, কোনো উকিল আসেনি। আপনাকে তুলে নিয়ে যেতে এসেছে। আবদুল আঁতকে ওঠে। স্বয়ম্ভু বলে, উকিল হয় নিজে আসে নয়তো ফোন করে ডেকে পাঠায়। খামোকা গুন্ডা পাঠাবে কেন?
আপনি এসব কী করে জানলেন?
আমি পুলিশের লোক।
এবারেও আবদুল চমকে সরে যায়।
সরে গিয়ে লাভ নেই আবদুল। তোমাকে এখনই আমার সঙ্গে যেতে হবে। নইলে এখানে থাকলে তোমার লাশ পড়ে যাবে। ঠিক করে নাও তুমি কী করবে?
আ…আমি কোথায় যাব?
ভয় নেই। জেলে পুরব না। তোমায় আমাদের শেল্টারে রাখব যাতে কেউ তোমার ক্ষতি করতে না পারে। এখন এখান থেকে চলো। নইলে বিপদ আছে। ওরা কিন্তু তোমায় খুঁজবেই।
কাঁদো কাঁদো হয়ে আবদুল বলেছিল, আমার বিবি, ছেলে!
ওদের কিচ্ছু হবে না। সময়মতো আমি সব তোমায় বলব। এখন চলো। এই পাঁচিলটা ডিঙোতে পারবে?
পারব।
***
সবার মাঝে দাঁড়িয়ে স্বয়ম্ভু বলে, আবদুলকে আমি সরিয়ে রেখেছি। পরের দিন আমিই আবদুলের বিবিকে বলি থানায় একটা মিসিং ডায়েরি করতে যাতে কারও সন্দেহ না হয়। নইলে সোমেন সরকারের লোক ঠিক বউ-বাচ্চাটার গতি করে দেবে। আর এই আবদুলই হল সুকুমারের বন্ধু। সুকুমার আপনার গোপন কথা সবটা আবদুলকে জানিয়েছিল। তাই আবদুলও সেটাকেই হাতিয়ার করবে প্ল্যান করেছিল। এবার শুভঙ্কর বলে ওঠে, কিন্তু সেই গোপন কথাটা কী? স্বয়ম্ভু বিনয়ের সুরে বলে, আর একটু অপেক্ষা করুন স্যার। অনেক কষ্টে একটা থ্রিলার স্ক্রিপ্ট লিখেছি আজ ভোর পর্যন্ত। একটু বলে নিই! এখানেও স্বয়ম্ভুর সিরিয়াস ফাজলামো। শুভঙ্কর চোখ বড়ো বড়ো করে তাকিয়ে মুখ নামিয়ে নেয়।
স্ক্রিপ্টটা নিশ্চয়ই আগে তোকে পড়ে শুনিয়েছে?
শিবাঙ্গীর কানের কাছে কৌশিক বলল। শিবাঙ্গী একবার কটমট করে চেয়ে স্বয়স্তুর কথায় মন দিল।
.
স্বয়ম্ভু বলতে শুরু করে, সুকুমারকে সরিয়েও সোমেন সরকারের ঘুম হল না। কারণ ব্ল্যাকমেইলিং থামল না। এই একই গুপ্তকথাকে শিখণ্ডী করে সোমেনের ভাই, গুণধর ভাই, মায়ের পেটের একমাত্র ভাই তার দাদাকে ব্লাকমেইল করতে শুরু করল। শুধু তাই-ই নয়, রাজনৈতিক গুন্ডাদের সঙ্গে সুকুমারের ব্যাপারে আলাপ আলোচনা পুরোটাই ভূপেন গোপনে রেকর্ড করে রাখে। কারণ, তলে তলে সেও মেয়ে পাচারচক্রের এক্কেবারে মাথায় পৌঁছোতে চাইছিল। বস হতে চাইছিল। কিন্তু বস হতে গেলে তার তো একটা ডান হাত চাই। যে তার হয়ে সবার সামনে থেকে পাচারকাণ্ডগুলো ঘটাবে। ধরা পড়লে সে পড়বে। কিন্তু বস থাকবে সক্কলের আড়ালে। সোমেন সরকার সেটা মেনে নিতে বাধ্য হন। কারণ তখনও আদ্যন্ত শয়তান হয়ে ওঠেননি তিনি। তার ওপরে ভূপেন হল মায়ের পেটের ভাই। ভাইয়ের হয়ে কাজ শুরু হয়। প্রোমোটারি বিজনেসে তখন অতটা সময় দিতে পারছিলেন না সোমেন সরকার। কারণ তখন পাশাপাশি চলছিল লোকদেখানো জনদরদি কাজ। ওই ভোটের আগে টিকিট পেয়ে যেমন কাজ করে আর কী। কিন্তু এর মধ্যে এসে পড়েন ক্রাইম জার্নালিস্ট স্বপন নন্দী। কীভাবে যেন সোমেন সরকারের পাপচক্রের হদিশ পেয়ে যান তিনি। তখন অবশ্য মেয়ে পাচার ছিল না। শিশু পাচার। প্রথমে গাঁয়েগঞ্জে অশিক্ষিত লোকেরা ছাগল-মুরগির মতো সন্তান বিয়োতো। তারপর আর তাদের ভরণপোষণের ক্ষমতা থাকত না। অগত্যা অনেক টাকায় বেচে দিত। এই অনেক টাকাটা যদিও সোমেন সরকারদের মতো লোকের কাছে হাতের ময়লা। তারা আবার সেইসব বাচ্চাগুলোকে আরও বড়ো দাঁও মেরে বাইরে পাচার করতেন। লাভের ওপর লাভ। লালে লাল হয়ে উঠলেন সোমেন আর ভূপেন। সোমেনের চোখে নেশা লেগে গেল অর্থের। স্বপন নন্দী পেছনে পড়তে খানিক থিতু হলেন তিনি। তলে তলে আরও লোক জোগাড় করতে শুরু করলেন। যার মধ্যে একজন সোমেন সরকারের মালি ভগবান দাসের বড়ো ছেলে মহেশ্বর। ভগবানই তার ছেলেকে বাবুর কাছে কাজের জন্য নিয়ে যান। তাই তো ভগবানবাবু?
.
এতক্ষণ চুপটি করে শুনছিল ভগবান। প্রশ্নটা তার দিকে ঘুরে আসতেই একটু সজাগ হল। শুধু ঘাড় নেড়ে স্বয়ম্ভুর কথায় সায় দিল।
ঠিক কী কথা বলেছিল মহেশ্বর?
ওই তো, টাকাপয়সা চেয়েছিল। ওর নামে সব লিখে দিতে বলেছিল তাই ওকে তাড়িয়ে দিয়েছি।
বাবা! আপনার তো ভুলে যাওয়া রোগ। কিন্তু কী অদ্ভুত দেখুন, সেই গুরুর দিন থেকে এই প্রশ্নটা বোধহয় আমি আপনাকে তিনবার করলাম। বা দুবার। প্রত্যেকবারই একই উত্তর পেলাম। শুধু শুরুতে বলেছিলেন মারা গেছে। পরে আবার সেটার সাফাই দিতে গিয়ে বলেছেন মহেশ্বর কুলাঙ্গার। তাই আপনার কাছে মৃত। অর্থাৎ ভোলেন না আপনি কিছুই। সবই মনে থাকে। তাই বলছি, সোমেন সরকারের শেখানো গল্প আওড়ে আর কী হবে? আসল কথাই বলুন না। জেনেবুঝে ছেলেকে দূরে সরিয়ে রেখেছেন। কারণ সোমেন সরকার আপনার ছেলেকে নিয়েছিল কারণ লুকিয়ে কাজ করার বিশ্বস্ত লোকের প্রয়োজন ছিল। মহেশ্বরের বদলে আপনাদের গোটা পরিবারের ভরণপোষণ চালান সোমেন সরকার। তাই আপনারা ছেলেকে ফেরত চাননি। আর মহেশ্বরও জানে, সে বিট্রে করলে তার পরিবার ভেসে যাবে। তাকেও শেষ করে দেওয়া হবে। তার চেয়ে এই ভালো। মোটা টাকা তো আসছে। তাই তো ভগবান দাসের নামে দুটো ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট। একটাতে মালির কাজ করে যেটুকু রোজগার হয়। আর অন্যটাতে ছেলের পাঠানো টাকা। লোকের বাগানে ফুল ফুটিয়ে কী আর সপ্তাহে দুবার করে পাঁঠার মাংস খাওয়া যায় ভগবানবাবু?
.
ভগবানের গলা শুকিয়ে আসছে। স্বয়ম্ভু জানায়, ঠাকুরপুকুর বাজারের চাচার দোকানের মাটন ছাড়া আপনি আবার কিচ্ছু খান না। তাই তো? ভগবানের মাথা নিচু। পাশে দাঁড়িয়ে ঈশ্বর মুখ ঘুরিয়ে আছে। স্বয়ম্ভু বলে, যাই হোক, শিশু পাচারে ধরা পড়ার পর সোমেন সরকার মোটা টাকার বিনিময়ে পুরণ নামের একটি পাঞ্জাবি ছেলেকে ফাঁসাল। পুরণও টাকার লোভে ইচ্ছে করেই ফাঁসল। বেঁচে গেল সোমেন সরকার। ট্র্যাক চেঞ্জ করলেন সোমেনবাবু। শিশু থেকে মেয়ে হল। চারপাশে ছেলে ছড়িয়ে দিলেন 1 ভালোবাসার নাটক করে মেয়ে তুলে এনে রেপ করে বেচে দেওয়া শুরু হল। ঠিক যেমন দক্ষিণ গোবিন্দপুরের মালা রায়। ভাগ্যিস মেয়েটা চালাকি ও সাহস করে বাদলের ফোন থেকে ফোন করে তার দাদু মৃণালকান্তিবাবুকে নইলে এত তাড়াতাড়ি এত বড়ো একটা গ্যাং ধরা পড়ত না।
এবার হিরণ্যর গলায় বিরক্তি। আমি ঠিক বুঝতে পারছি না সোমেন সরকারের জীবনী শুনে আমরা এখানে কী করব? স্বয়ম্ভু পাঁচটা মেয়েকে উদ্ধার করেছে ঠিকই, কিন্তু তাদের মধ্যে তো আর কথাকলি নেই। কথাকলি কোথায় গেল?
কথাকলি আছে হিরণ্যদা। কথাকলি এখানেই আছে।
থমথমে পরিবেশে গুনগুন শব্দ ওঠে। কী বলছে স্বয়ম্ভু? শিবাঙ্গী, অভিমন্যুও অবাক। স্বয়ম্ভু বলল, কিন্তু কথাকলি কোথায় সেটা জানার আগে আমদের জানতে হবে কথাকলি কে?
মানে? সোমেনবাবুর মেয়ে।
হিরণ্য আরও বিরক্ত হয়ে বলল। স্বয়ম্ভু মোবাইলটা কানে দিয়ে কাকে কেন বলল, নিয়ে এসো। স্বয়ম্ভু কস্তুরীর দিকে এগিয়ে গেল। সেও কস্তুরীর মতো পাশের সিঁড়িটায় বসল। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কস্তুরীর দিকে তাকাল। কারীর দুটো ভুরুর মুখের দিক দুটোয় ভাঁজ পড়ল। যেন চোখের ওপর দুটো কালো প্রশ্নচিহ্ন। চোখদুটোয় লালচে আভা। বাঁ-চোখটা দিয়ে একটা নোনতা জলের রেখা গড়িয়ে নেমে এল কস্তুরীর। স্বয়ম্ভু কস্তুরীর দিকে অকিয়েই পলা তুলে বলল, দরজাটা খুলে দাও। দুজন ঢুকে এলে আবার বন্ধ করে দেবে।
.
বেল বাজল। দরজা খুলল। বাইরে থেকে মিডিয়ার কলরব বন্যার জলের মতো থমথমে ঘরটায় ঢুকে এল। ভানুপ্রিয়াকে সঙ্গে নিয়ে পুলিশের পোশাকে ঢুকে এল রাজারাম ব্যানার্জি। মাঝে এসে পা ঠুকে স্যালুট করল। কস্তুরী উঠে দাঁড়াল। পুলিশের পোশাকে রাজারামকে দেখে শিবাঙ্গী থ সোমেন সরকারের দুই চোখ বিস্ফারিত। হাত কাঁপছে। স্বয়ম্ভু সিঁড়ি ছেড়ে মাটিতে নেমে এল। হিরণ্যর দিকে তাকিয়ে স্বয়ম্ভু বলল, কথাকলি সোমেন সরকারের মেয়ে ঠিকই। কিন্তু কস্তুরীদেবীর সন্তান নয়। কথাকলি সরকার আদপে সোমেন আর বেনারসের বাইজি ভানুপ্রিয়ার অবৈধ সন্তান। মতি মুখে আঁচল চাপা দিয়ে কস্তুরীর দিকে তাকায়। ঈশ্বরের মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই। ভগবান একটা ঘোলাটে চোখ নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। উপস্থিত বাকি সকলের মুখেই যেন বড়োসড়ো একটা তালা পড়ে গেল।
.
কস্তুরী দেবীকে অনেক ডাক্তার দেখানোর পরেও যখন সন্তানধারণের কোনো সম্ভাবনাই দেখা যায় না তখন ফ্রাস্ট্রেটেড সোমেন সরকার প্রায় দেড় মাসের বেশি সময়ের জন্য একা বেনারস চলে যান। ও হ্যাঁ, সঙ্গে ছিল তৎকালীন ছায়াসঙ্গী সুকুমার মণ্ডল। না, সন্ন্যাসী হতে যাননি সোমেন সরকার। স্ত্রীর ওপর রাগ করে বেশ্যাদের নিয়ে ফূর্তি করতে গিয়েছিলেন। া ফূর্তিই যখন করবেন তখন একটু জমিদারি চালে হলে মন্দ হয় না। তাই তিনি বেনারসে বাইজিদের ডেরায় বাসা বাঁধেন। সেখানেই আলাপ ভানুপ্রিয়ার সঙ্গে। গানে কতটা মুগ্ধ হয়েছিলেন জানি না, তবে রূপে যে মজেছিলেন সেটা বলাই বাহুল্য। তার ওপরে ভানুপ্রিয়ার জন্ম বাংলায়। নাম ছিল প্রিয়া মাইতি। কপালের ফেরে হয়ে গেছে ভানুপ্রিয়া। সোমেন সরকার যখন কলকাতায় ফেরে তার এক মাসের মধ্যেই খবর পায় ভানুপ্রিয়া গর্ভবতী। মনে মনে ভয় পেলেও একটা চাপা আনন্দ কাজ করে সোমেন সরকারের মনে। এই প্রথমবার পৃথিবীতে তার ঔরসজাত সন্তান আসতে চলেছে। অর্থাৎ তিনি প্রকৃত অর্থে পুরুষ। তার পৌরুষে কোনো খামতি নেই। ভাববেন না এসব আমার বানানো বা সোমেনবাবু বলেছেন। বাবা হওয়ার খবর পেয়ে ভানুপ্রিয়াকেই তিনি কোনো একটা আবেগের মুহূর্তে এইসব কথা শেয়ার করেছিলেন।
.
সকলের মাঝেই মুখটা নিচু করে কস্তুরী একবার সোমেনের দিকে তাকায়। সোমেনও চোরা দৃষ্টিতে কস্তুরীকে দেখে নেয়।
আমার মুখটা বড্ড ব্যথা করছে। একটানা গল্প বলে যাচ্ছি। সোমেনবাবু এবার আপনি বলুন। আর কত চুপ থাকবেন?
আমি সেদিন ঘরেই ছিলাম।
.
স্বয়ম্ভু হকচকিয়ে ঘুরে তাকাল। সোমেন চুপ রইল। মুখ খুলল কস্তুরী!
***
রাত হয়েছে। ঘরের সব কটা আলো জ্বালিয়ে বিছানা-মাদুর তোলপাড় করে, ড্রয়ার, আলমারি সবকিছু লণ্ডভণ্ড করে কস্তুরী কিছু একটা খুঁজে চলেছে আর মুখে বিড়বিড় করছে, কোথায় গেল? আমি তো এখানেই রেখেছিলাম। এই সুকুমাআআর, সুকুমাআআআআর…!
কী চাইটা কী? চিৎকার করছ কেন?
.
আলমারির পাল্লার পাশ থেকে কস্তুরী মুখ বাড়িয়ে দেখে দরজায় সোমেন এসে দাঁড়িয়েছে। বিরক্ত হয়ে সোমেন বলল, ঘরের কী হাল করেছ?
সুকুমার কোথায়? ডাকো ওকে। কতবার বলেছি আমার ওষুধপত্রে হাত দিবি না।
.
কস্তুরী ভয়ানক বিচলিত হয়ে বলল, দ্যাখো না, সাড়ে নটায় খাবার কথা। এখন পৌনে দশটা বেজে গেল। কী হবে? তুমি জানো আমার ওষুধগুলো কোথায়?
ওগুলো আমি ফেলে দিয়েছি।
ফেলে দিয়েছ?
কস্তুরী আলমারির পাল্লা খুলে রেখেই সোমেনের কাছে এল। সোমেন বিছানায় বসল।
কী হবে ওসব ছাইভস্ম খেয়ে? মা হওয়া তোমার কম্ম নয়।
কে বলেছে? ডাক্তার তো বলল এই ওষুধগুলো নিয়ম করে খেলে…
ছাই হবে। বুঝেছ? ছাই হবে। তিনবছর ধরে এত ডাক্তার, এত ওষুধ, এত টেস্ট! হল কিছু? কিসসু হবে না। চাড্ডি ট্যাবলেট খেয়ে যদি বাঁজার কোলে ছেলে আসত এদ্দিনে তিন-চারটে হয়ে যেত।
এভাবে কেন বলছ? আমি তো…
থামো। তার চেয়ে আমি যা বলছি শোনো।
.
কস্তুরী চুপ রইল অব্যক্ত সর্বনাশের আশায়। এবার কী তবে ডিভোর্সের কথা বলবে সোমেন? সোমেন পানের রসটুকু গিলে বলল, ব্যাগ গুছিয়ে নাও। এখন থেকে তোমায় বেনারসে থাকতে হবে। পান খাওয়ার নেশাটা বেনারস থেকে আমদানি করেছে সোমেন। কস্তুরী বুঝল না। মানে?
বেশি দিন নয়। খুব জোর আট-নমাসের জন্য।
কেন?
তুমি বাঁজা মেয়েমানুষ। আমি তো আর নপুংসক নই। আমার বাচ্চা আসছে আরেকজনের পেটে।
কী? কী বললে?
.
কস্তুরী তখনও শক্ত হয়েই দাঁড়িয়ে ছিল। কিছুতেই নিজেকে টলতে দেবে না। সোমেন বলল, বেনারসের নামকরা গায়িকা ভানুপ্রিয়া, ওর সঙ্গে আমার সম্পর্ক হয়। মাসখানেকের মধ্যে সে প্রেগন্যান্ট হয়ে গেছে।
তুমি কী বলছ তুমি জানো? এগুলো তুমি তোমার স্ত্রীকে বলছ?
হ্যাঁ বলছি। যা সত্যি সেগুলো না লুকিয়ে তোমায় বলছি। তোমার তো সৌভাগ্য।
গায়িকা? না বাইজি?
ওই হল। এত জেনে তোমার কী?
টলে আলমারির খোলা পাল্লায় গিয়ে ধাক্কা খেল কস্তুরী। সোমেন চমকে গিয়ে বিছানা থেকে নেমে কস্তুরীর দিকে এগিয়ে এল, কী… কী হল তোমার? কস্তুরী দুচোখে দুটো বর্ষার সরোবর নিয়ে স্বামীর দিকে তাকাল, এটা করতে পারলে তুমি?
না করার কী হয়েছে? আরে বাবা, ধরে নাও না এটা ওইটা করেছি। ওই যে আজকাল কীসব বলে… সারোগেসি।
.
কস্তুরী মাটির দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, সারোগেসি করলে মায়ের অংশটাও বাচ্চার মধ্যে থাকে। শুধু গর্ভটা অন্য মেয়ের। কিন্তু যে আসছে তার মধ্যে তো আমার কিচ্ছু নেই।
তবু একেই তোমায় নিজের সন্তান ভেবে বড়ো করতে হবে। পৃথিবীর কেউ জানবে না এ সন্তানের আসল পরিচয়। ভানুপ্রিয়ার সঙ্গে আমার কথা হয়ে গেছে।
***
চোখের জলে ভিজে গেছে কস্তুরী। বলে চলেছে, মেয়েটাকে কোলে নেওয়ার পর একদিনের জন্যে ভাবিনি এর মা কে। কথাকলি নামটাও আমিই রেখেছিলাম। ভানুপ্রিয়ারও খুব পছন্দ হয়েছিল। আমি নিজের মতো করে ওকে বড়ো করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু কলি যত বড়ো হল, তত যেন আমি শত্রু হয়ে গেলাম। মেয়ে যা চেয়েছে মেয়ের বাবা তাই ওর হাতে তুলে দিয়েছে। আমি বারণ করতাম। বলতাম, এভাবে দিয়ো না। মেয়েটা বিগড়ে যাবে। কলির সামনে ওর বাবা আমায় অপমান করত। মেয়ে তার ইচ্ছেমতন জিনিস পেয়ে যেত। কলি তাই এই ভেবেই বড়ো হয়েছে যে আমি ওর শত্রু। তবু মেয়েটাকে যত পেরেছি আগলে রেখেছি। ওর জন্মদিনে ওকে অনাথ আশ্রমে নিয়ে যেতাম। যাতে ও বোঝে ও কতটা ভাগ্যবান। ও সব পেয়ে যাচ্ছে। যারা এগুলো পাচ্ছে না, যাদের বাবা-মা নেই তারা কতটা কষ্টে থাকে। মানুষকে ভালোবাসতে হয়। কক্ষনো কাউকে ঘৃণা করতে নেই। কোনোদিন কথা আমায় সম্মান করেনি। আমি যা বলেছি নোংরা কাপড়ের মতো ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। শুধু এই লোকটার জন্য। এই লোকটা, একটা জঘন্য স্বামী। যে তার স্ত্রীকে বাঁজা বলতেও দ্বিধা করে না। এই লোকটা একটা জঘন্য বাবা যে তার মেয়েকে তিলে তিলে জাহান্নমে পাঠিয়েছে। এই লোকটার জন্য আমি কোনোদিনও ভালো মা হতে পারিনি। প্রতি মুহূর্তে মেয়ের সামনে, আড়ালে আমায় বলে গেছে মা হিসেবে আমি অযোগ্য। এই লোকটা নিজের ক্ষমতা খাটিয়ে স্কুলের মুখও বন্ধ করেছিল। মোটা টাকা ডোনেশন দিয়েছে যাতে মেয়ের কুকীর্তির জন্য পেরেন্টস কল না করা হয়। কলেজেও ডোনেশন দিয়েছে যাতে মেয়ে তার দিনের পর দিন নতুন নতুন ছেলে ধরে পার্টির নামে বেলেল্লাপনা করে বেড়াতে পারে। একটাই তো জীবন। যেমন খুশি তেমন বাঁচ কথা। কেউ তোকে বাধা দেবে না। এমনকী মাও না। আজ সেই মেয়ে কোথায় সোমেন সরকার? ফেরত দাও। এনে দাও মেয়েটাকে।
কস্তুরী হয়তো নিজেও বোঝেনি সে সিঁড়ি থেকে নেমে সোমেনের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে আজ বহু বছর পর। স্বয়ম্ভু আর শিবাঙ্গী অবাক হয়ে দেখছে এক নতুন কস্তুরীকে। না না, একটা সুপ্ত আগ্নেয়গিরিকে। কস্তুরী ফুঁসছে। ভানুপ্রিয়ার চোখেও জল আর আগুনের সহবাস।
স্বয়ম্ভু কস্তুরীর কাছে এসে দাঁড়ায়। শান্ত হোন মিসেস সরকার। শান্ত হোন। আপাতদৃষ্টিতে মেয়ে আপনার শিক্ষা নেয়নি ঠিকই। হয়তো সত্যিই বেলেল্লাপনা করেই বেড়াত। তবু কোথাও কি আপনার দেওয়া মনুষ্যত্বের শিক্ষাটা কথাকলি গ্রহণ করেনি? কাঁদতে কাঁদতে স্বয়ম্ভুর এই কথাটা কস্তুরীকে কাঁপিয়ে দেয়। স্বয়ম্ভুর দিকে তাকায় কস্তুরী। স্বয়ম্ভু আবারও সবার উদ্দেশ্যে বলতে শুরু করে, এবার আসা যাক কথাকলি কোথায় সেই প্রসঙ্গে।
ভানুপ্রিয়া ডুকরে কেঁদে ওঠে। কস্তুরী টলতে টলতে সিঁড়ির দিকে মুখ ফিরিয়ে দাঁড়ায়। স্বয়ম্ভু বলে, কাল যে পাঁচটি মেয়েকে উদ্ধার করা হয়েছে তার মধ্যে মালা রায় নামের মেয়েটি গাড়িতে আসতে আসতে একটা ঘটনা বলে।
***
মালার মুখের সঙ্গে হাত আর পা দুটোই বাঁধা। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আছে। চোখে চড়া ড্রাগের ডোজ। অনেক কষ্টে চোখ মেলে দেখে ঘরটা খালি। বাদল আর তার সঙ্গে যে ছিল সে নেই। কোনোরকমে শরীরটা ঠেলে তুলে বসতে যাবে সঙ্গে সঙ্গে বাইরে থেকে দৌড়ে ঢুকে আসে বাদল আর তার সঙ্গী। মালা আবার ঘুমিয়ে পড়ার ভান করে। দুজনের উদ্ভ্রান্তের মতো দশা। গলগল করে ঘামছে। মাথার চুল ছিড়ছে প্রায়। বাদল বলল, শালা ক্যাচাল হয়ে গেল তো।
এ তো ঘর শত্তুর বিভীষণ মাইরি।
মোবাইলে রেকর্ড করেছে সব। এবার যদি সেটা পাকামি মেরে পুলিশের কাছে দেয় তাহলে তো…
সোমেন স্যারকে জানাতেই হবে। দেরি করলে হবে না বাদল। ফোন কর।
.
বাদল সঙ্গে সঙ্গে ফোন করে। বলে, স্যার, একটা কিচাইন হয়ে গেছে…। আমরা মেয়েটাকে ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে এখানে বসেই একটু মদ খাচ্ছিলাম আর আলোচনা করছিলাম আপনার নেক্সট প্ল্যান যেগুলো বললেন কাল সেগুলো।… ওই আরও ছটা মেয়েকে তোলা হচ্ছে… রফিক খবর দিলেই ওদের নিয়ে যেতে হবে এসব… কিন্তু বুঝতেই পারিনি আড়াল থেকে আপনার মেয়ে কথাকলি সব ফোনে ভিডিয়ো কচ্ছিল। আমরা তেড়ে যেতেই সোজা গাড়ি নিয়ে ভাগলবা।… না স্যার ওরা একটু খাবার আনতে গেছে…। জানি না তো স্যার কীভাবে, কেন এল? সঙ্গে আরেকটা মেয়ে ছিল স্যার।… আপনার মেয়ে তো ঈশিতা বলে ডাকল। কী করব স্যার? এখন যদি পুলিশকে সব… ওকে স্যার। ওকে।
***
কথাকলি বাবার সব কুকীর্তি দেখে ও জেনে ফেলেছিল। সম্ভবত মেঘা নন্দীর সঙ্গে বন্ধুর পার্টিতে যখন অশান্তি হয় তখনই মেঘা কথায় কথায় জানায় যে সোমেন সরকার তার পুরোনো অফিস থেকে এইসব কুকীর্তি চালায়। কারণ স্বপন নন্দীর রিপোর্টে সেটা উল্লেখ করা ছিল। মেঘা এখনও কোমায় তাই কথা বলার উপায় নেই। ভার্দে ভিস্তার এক ওয়েটার যে কিনা কথাকলির স্কুলে এক বছরের সিনিয়র ছিল তার কাছ থেকে এই তথ্য আমরা পেয়েছি। তার বয়ান রেকর্ড করাও আছে। স্কুল থেকে খবর নিয়ে জেনেছি কথাকলি এই ছেলেটির সঙ্গে মন্দারমণি পালিয়ে গিয়েছিল। যাই হোক, কথাকলি বন্ধুর জন্মদিনের পার্টি থেকে রেগেমেগে বেরিয়ে ওর বন্ধু ঈশিতাকে নিয়ে বাবার পুরোনো অফিসে যায় এবং এই পুরো ঘটনাটা ঘটে মঙ্গলবার রাতে।
মঙ্গলবার রাতে হয়েছে জানলে কী করে?
প্রশ্নটা শুভঙ্কর করল।
মালা বলেছে স্যার।
ওই অবস্থাতেই দিনক্ষণ সব মনে ছিল মেয়েটার?
ছিল স্যার। কারণ সেদিনই ভোর রাতে মেয়েটি বাদলের সঙ্গে পালিয়ে আসে। তাই সেইদিনটা তার মনে আছে।
শুভঙ্কর আড়চোখে ডিসিপির দিকে চায়। স্বয়ম্ভুও বুঝতে পারে শুভঙ্কর এটা ইচ্ছে করেই করল। যাতে ডিসিপি, হিরণ্য এদের থেকে কোনো প্রশ্ন না আসতে পারে। স্বয়ম্ভু বলতে শুরু করল, প্রথম দিন থেকে আপনি এবং আপনারা এটাই বলে আমাদের তদন্তে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করছেন যে মেয়ের পার্টি ছিল বুধবার। এমনকী ভগবান দাসকেও শিখিয়ে পরিয়ে দেন। কারণ এখানে অনেক বড়ো একটা ঘটনা এঁরা লুকোতে চেয়েছেন।
কী সেটা?
ডিসিপি সীতাংশুর প্রশ্ন।
যে কথাকলি বাইরে কোথাও নেই। এই বাড়িতেই সে আছে।
আরে বাবা সে তো তখনও বললে স্বয়ম্ভু। কিন্তু কোথায়? ডাকো তাকে।
ডাকতেই পারি। কিন্তু সাড়া পাবেন না তার।
কেন?
কারণ সে একটা ইট, বালি, সিমেন্টের তৈরি ছোট্ট ঘরে বন্দি।
সময় নষ্ট না করে দরজা খোলো।
ভিসিপির সুর চড়ছে। স্বয়ম্ভু বলল, সেই ঘরে কোনো দরজা, জানলা কিচ্ছু নেই স্যার। ওটা একটা অন্ধকূপ। ওটাকে ভাঙতে হবে।
স্বয়ম্ভু অনেক সময় নিয়েছ। প্লিজ এক্সপ্লেইন প্রপার্লি।
.
স্বয়ম্ভু চুপ। কস্তুরী দমটাকে বন্ধ করে রেখেছে। ভানুপ্রিয়া চোখ বুজে দাঁড়িয়ে। বাকিরা বিস্ময়ের আকস্মিকতায় প্রস্তরমূর্তি হয়ে আছে। কী বলতে চলেছে স্বয়ম্ভু?
প্রথমদিন কস্তুরীদেবীকে জিজ্ঞেস করি, আপনি বলুন, আপনার মেয়ে কোথায়? কোনো আন্দাজ আছে? তিনি তার ঠাকুরঘরে কষ্টিপাথরের কৃষ্ণের মূর্তির সামনে বসে বলেন, কৃষ্ণ জানেন। ভেবেছিলাম আমরা শোকে পাথর হয়ে গেলে তো বলেই থাকি, ঠাকুর জানেন। সেটাই উনি বলছেন। এরপর আবার যখন কস্তুরীদেবীকে চার্জ করি যে আপনি ঠাকুরের সামনে দাঁড়িয়ে মিথ্যে বলছেন। কথাকলির বন্ধুর পার্টি বুধবার নয়, মঙ্গলবার ছিল। তখন তিনি বলেন, আমি যা বলার বলে দিয়েছি। সত্য খোঁজার ভার তো আপনার। হাজারটা মিথ্যের মধ্যেই সত্য আছে। খুঁজে নিন। সেদিন খটকা লাগে। সেদিনই বাড়ি গিয়ে আমার জামার পকেটে একটা চিরকুট পাই, যেখানে লেখা, কথা আছে ভগবানের কাছে। মুহূর্তে মাথার মধ্যে ভগবান দাসের মুখটা ভেসে ওঠে। কিন্তু ওর বাড়ি গিয়ে কথাকে লুকিয়ে রাখার কোনো প্রমাণ আমি পাই না। তবে তার চেয়েও আরও বড়ো জিনিস পেয়ে যাই।
***
