১৩
আরেকটু হলেই মুখ থুবড়ে পড়ত স্বয়ম্ভু। শিবাঙ্গী ধরে ফেলে। আগাছার সরু ডালটা অন্ধকারে পায়ে জড়িয়ে গিয়েছিল স্বয়ম্ভুর। এই জন্য বাড়ির পিছনে কোনো পাহারা নেই। যা অবস্থা তাতে মানুষ কেন, পোকামাকড়েরাও হাঁটতে চলতে ঠোক্কর খাবে। মুখের সঙ্গে লেপটে যাওয়া মাকড়সার জাল ছাড়াতে ছাড়াতে শিবাঙ্গী বলল।
আমাদের জন্য ভালোই হল। অ্যাটলিস্ট একটা দিক ক্লিয়ার পাওয়া গেল।
তবু, একটু বেশিই রিস্ক হয়ে গেল স্যার। এই ভাঙাচোরা বাড়ি সেখানে আপনি কার্নিশ বেয়ে উঠবেন? পড়ে গেলে?
অন্ধকারেও স্বয়ম্ভুর চোখের মণি দুটো উজ্জ্বল। তুমি তো আছ। ধরে নেবে।
বাহান্ন কিলো ধরবে পঁয়ষট্টি কিলোকে?
কী করে জানলে আমার সিক্সটি ফাইভ?
দুজনে কথা বলতে বলতেই এগোচ্ছে।
আন্দাজ।
গ্রেট। আমরা বাড়িটার পিছনে এসে গেছি।
সে তো গেছি। কিন্তু কোনো জলের পাইপও তো দেখতে পাচ্ছি না।
দেয়াল বেয়ে উঠে যাও।
আমি স্পাইডারম্যান নই স্যার।
তাহলে গাছের ডাল বেয়ে সোজা ওই জানলাটায় টুপ করে টপকে যাব।
স্বয়ম্ভু আর শিবাঙ্গীর সঙ্গে বেশ কয়েকজন পুলিশের সশস্ত্র লোক নিজেদের মতো জায়গা করে নিয়েছে। হঠাৎ শিবাঙ্গী চমকে ওঠে। দেখে সরু মতন কী যেন একটা ওপর থেকে নেমে আসছে। স্যার, ওই দেখুন। এপাশে নিশ্চয়ই কেউ নামবার চেষ্টা করছে। স্বয়ম্ভু তাকায়। বলে ওঠে, গ্রেট। উনি নেমে গেলে ওটা ধরেই আমি উঠে যাব। শিবাঙ্গী বুঝতেই পারছে না যে ওরা একটা মেয়ে পাচার আটকাতে এসেছে নাকি শখ করে রাতের বেলা অ্যাডভেঞ্চারে এসেছে। স্বয়ম্ভু সেন আজ ফাজলামির শুভে অথচ দুপা বাড়ালেই মৃত্যু। হনহন করে স্বয়ম্ভু সেন সেই নেমে আসা সক মতন কিছু একটার দিকে ধেয়ে গেল। কিন্তু সেটা দিয়ে কেউ নেমে এল না। তারপর ওপরের দিকে একবার তাকাল।
.
বাদল দরজাটা খুলে ঢুকতে গিয়ে দেখে ভিতর থেকে দরজাটা বন্ধ লক্ষ্মী, দরজা বন্ধ কেন? খোলো।
খুলছি। আর একটু।
একটা শাড়ি পরতে এতক্ষণ?
বাদলের সন্দেহ হয়। কিন্তু লক্ষ্মী উত্তর দেয়, শায়ার দড়িতে গিট পড়ে গেছে। বাদলের ঠোঁটে শয়তানি হাসি। বলে, আমি শায়ার দড়ি খুলতে ওস্তাদ। দরজাটা খোলো। তাড়া আছে।
ধ্যাৎ, লজ্জা করে না বুঝি। একটু দাঁড়ান না। শহরে যাব। ভালো করে শাড়ি না পরলে লোকে কাজ দেবে না।
.
নিকষ অন্ধকারে স্বয়ম্ভু ঝুলছে। ক্ষণিকের জন্য হাত ফসকালে মরুক না মরুক, কোমরটা চিরকালের জন্য চুরমুড়িয়ে যাবে। বাড়িটার গা থেকে পলেস্তারা খসে গিয়ে শাপে বর হয়েছে। ইটের খাঁজে খাঁজে পা রেখে উঠতে পারছে। আরেকটু গেলেই জানলাটা পেয়ে যাবে। ওদিক থেকে অভিমন্যু এপাশের স্টেটাস জেনে নিচ্ছে শিবাঙ্গীর কাছ থেকে। স্বয়ম্ভু জানলা টপকে উঠে গেল। শিবাঙ্গী এয়ারড্রপে জানাল, স্যার এবার আমি উঠব। ওপাশ থেকে অভিমন্যু আর এপাশ থেকে স্বয়স্তু দুজনেই থমকে গেছে। অভিমন্যু বলল, অযথা রিস্ক নিয়ো না। ভিতরে রিক্তা আর স্বয়ম্ভু আছে তো।
ভিতরে ডেঞ্জারাস বসও আছে স্যার। দুজন ইজ নট এনাফ। প্লিজ।
এবার স্বয়ম্ভু বলল, সাবধানে এসো শিবাঙ্গী। আমি আছি। কিচ্ছু হবে না।
থ্যাংক ইউ স্যার।
রণে বনে জলে জঙ্গলে এই ভরসা আর বিশ্বাসটুকুই মানুষ চায়। শিবাঙ্গী দুহাতে আঁকড়ে ধরে ঝুলন্ত কাপড়টা। মনে করে নেয় স্বয়স্তু কোথায় প্রথম পা-টা রেখেছিল। সেই মতোই ভাঙা দেয়ালের ফাঁকে বাঁ পায়ে ভর দিয়ে ডান পা-টা ওপরের দিকে তুলে দেয়।
.
ওদিকে দরজা ধাক্কাতে শুরু করেছে বাদল। বাদলের ধাক্কা শুনে আরও দুজন এসে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়েছে দরজাটার দিকে। লক্ষ্মী বলেই চলেছে আর একটু। এখুনি খুলছি। স্বয়ম্ভু আর বাকি মেয়েরা গায়ের জোরে দড়ির সঙ্গে লাগানো শাড়ি আর চুড়িদারগুলো ওপরের দিকে টানতে থাকে। মেয়েগুলো আজ লজ্জাহীন। কারও পরনে শুধু ব্রা আর সালোয়ার, আর কারও ব্লাউজ সঙ্গে পেটিকোট। ধাক্কা দিতে দিতে দরজা ভেঙে ফেলবে এবার। শব্দ শুনে বস ছুটে আসে।
কী হচ্ছে এসব?
স্যার লক্ষ্মী দরজা খুলছে না।
কী যেন ভাবে বস। মুহূর্তে হুকুম ছোড়ে, দরজা ভেঙে ফেলো। দুজনে দিলে মাত্র দুবার ধাক্কা দেওয়াতেই দরজা ভেঙে গেল। হুমড়ি খেয়ে ঘরের মধ্যে ঢুকে এল বাদল আর তার সহকারী। এক্কেবারে রিক্তা অর্থাৎ লক্ষ্মীর হতে ধরা বন্দুকের নলের মুখে দুজন। শিবাঙ্গী উঠে পড়েছে। এয়ারপে বলে দেয়, অন অ্যাকশন স্যার। শুনেই অভিমন্যুও ঘুটি সাজাতে শুরু করে।
.
পাঁচ-ছ জনের পিছনে দাঁড়িয়ে ছিল বস। সুযোগ বুঝে নিজেকে লুকিয়ে সিঁড়ির দিকে চলে যায়। স্বয়ন্তু চিৎকার করে ওঠে, এক পাও কেউ নড়লে বোপড়ি উড়িয়ে দেব। শিবাঙ্গী, রিক্তা মেয়েগুলোকে বের করো। বাদল সনাকি মেরে রিভলভার বের করতে যায়। তখনই শিবাঙ্গী সপাটে লাথি চালায়। ছিটকে পড়ে বাদল। পাঁচজন মেয়েকে সামলে নিয়ে শিবাঙ্গী আর রিক্তা ঘর থেকে বেরোতে থাকে। দুষ্কৃতিরা দুহাত তুলে দাঁড়িয়ে থাকে। স্বয়ম্ভু রিভলভার তাক করে একটু একটু করে সরছে আর বলছে রিভলভারগুলো রাখ। মাটিতে রাখ। নইলে লাশ পড়ে যাবে শালা। রাখ বলছি। একে অপরের দিকে মুখ চাওয়াচাওয়ি করে এক এক করে রিভলভার মাটিতে রাখতে থাকে ছেলেগুলো। রিক্তা কুড়িয়ে নেয়। বাইরের বড়ো ঘরটার বেরিয়ে এসেছে মেয়েগুলো। সেই সময়েই বাইরে থেকে গুলির শব্দ। এয়ারপে খবর আসে নিচেও সবাই ঝাঁপিয়ে পড়েছে। অভিমন্যু মাইক নিয়ে ঘোষণা করছে, যারা যারা ভিতরে আছেন বেরিয়ে আসুন। পুলিশ কিন্তু সারা বাড়িটা ঘিরে ফেলেছে। কেউ পালাবার চেষ্টা করবেন না।
বাইরের বারান্দায় মেয়েগুলোকে নিয়ে বেরিয়ে আসে রিক্তা আর শিবাঙ্গী। পিছোতে পিছোতে দরজার বাইরে পা রাখা মাত্র রিক্তার ঘাড়ে একটা আঘাত নেমে আসে। রিক্তা চিৎকার করে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গে স্বয়ম্ভু ঘুরে তাকায়। সেই সুযোগে বাদল ও তার চার সহকারী ঝাঁপিয়ে পড়ে স্বয়ম্ভু, শিবাঙ্গী আর মেয়েগুলোর ওপর। শিবাঙ্গী সপাটে হাঁটু দিয়ে ছেলেটার দুপায়ের ফাঁকে মারতেই ছেলেটি যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যায়। এরপর মারের পর মার চালাতে থাকে। নাক, কান ফাটিয়ে দেয় শিবাঙ্গী। তারপর ছেলেটাকে ধরে রেলিংয়ের বাইরে ফেলে দেয়।
আচমকা একটা ঘুষি এসে পড়ে স্বয়ম্ভুর মুখে। স্বয়ম্ভু একটু টলে গিয়ে পালটা চালায়। পরপর দুটো। বাদলের গাল থেকে রক্ত বেরিয়ে আসে। চোখের নিমেষে স্বয়ম্ভুর লাথি বাদলের পেটে। কুঁকড়ে বসে পড়তে যায়। সেই সুযোগে স্বয়ম্ভু বাদলের মুখে লাথি চালিয়ে কোণঠাসা করে দেয়। বাদল লুটিয়ে পড়ে। কিন্তু খুব ভুল জায়গায় বাদল পড়ে। সেইখানে মাটিতে পড়েছিল একটা কাঠের বাটামের মতো। চোখের নিমেষে সেটা তুলে স্বয়ম্ভুকে ঘুরিয়ে মারে। মুহূর্তের জন্য চোখে অন্ধকার দেখে স্বয়ম্ভু। লাফ মেরে বাদল উঠে স্বয়ম্ভুর মুখে আবার ঘুষি চালায়। একেই আগের মার তার ওপর আবার ঘুষি। স্বয়ম্ভু মাটিতে পড়ে যায়। বাদল স্বয়ম্ভুর বুকের ওপর চেপে বসে রিভলভারটা স্বয়ম্ভুর দিকেই তাক করতে চেষ্টা করে। স্বয়ম্ভু গায়ের জোরে সেটা আটকাতে থাকে। দুজন পুরুষের শক্তির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে রিভলভারের নল ঘুরতে থাকে। শিবাঙ্গী লক্ষ করে যেকোনো মুহূর্তে গুলি চলতে পারে। স্বয়ম্ভুও ইঞ্জিওরড হতে পারে। তাই দুজনের মাঝখান থেকে রিভলভারটাক সরাতে হবে। সবেমাত্র গুলি করতে যায় ছেলেটার হাত লক্ষ্য করে ঠিক তখনই মেয়েগুলো চিৎকার করে ওঠে। শিবাঙ্গী দেখে এক মুসলমান রিক্তাকে গলা পেঁচিয়ে ধরে রেখেছে। ছেড়ে দে মেয়েগুলোকে। নইলে এর জান নিয়ে নেব। ফ্যান্স বন্দুক। ফেলে দে। নিচে আবার গুলি চলে। ধস্তাধস্তির শব্দ আসছে। শিবাঙ্গী রিভলভার ফেলতে বাধ্য হয়। স্বয়ম্ভু কোনোরকমে রিভলবার ধরা হাতটাকে ওপরের দিকে করতেই একটা গুলি ছুটে যায়। সেকেন্ডের ভগ্নাংশে বাদল হকচকিয়ে যায়। সেটারই সুযোগ নিয়ে বাদলকে উলটে ফেলে তার ঘাড়ের ওপর চেপে বসে স্বয়ম্ভু। এলো পাতাড়ি ঘুষি চালাতে থাকে। নিমেষের মধ্যে মুখ ফেটে রক্ত বেরোতে থাকে। পরক্ষণেই নিস্তেজ।
বারান্দায় কয়েকজন পুলিশ উঠে আসে। কিন্তু শিবাঙ্গী আর রিক্তার অবস্থা দেখে কিচ্ছু করতে পারে না। বাদলের চ্যালার মধ্যে একটা চ্যালা পাঁচজন মেয়ের মধ্যে একজনকে ধরে ফেলে। টান মেরে ব্রা খুলে নগ্ন করে দেয়। স্বয়ম্ভু বেরিয়ে আসে। শেখ করিম রিক্তার মাথায় বন্দুক ধরে রেখেছে। তাই স্বয়ম্ভুও অসহায়। এদিকে ছেলেটি মেয়েটিকে টানতে টানতে নিয়ে যেতে থাকে। সবাই ঠুটো জগন্নাথের মতো দাঁড়িয়ে দেখে। রিক্তা চিৎকার করে বলে ওঠে, আমার কথা ভাববেন না স্যার। ওদের বাঁচান। ইচ্ছে করেই হাত-পা ঝটকে ওঠে রিক্তা। শেখ করিম বলে ওঠে, এই বন্দুক চলে যাবে কিন্তু। বেশি ঝটকাস না। রিক্তার পা লেগে একটা রিভলভার মাটিতে ছিটকে মালার পায়ের কাছে গিয়ে থমকে যায়। হইচইয়ের মধ্যে কেউ খেয়াল করে না। নিমেষের মধ্যে মালা সেই বন্ধুকটা তুলে আনতাবড়ি গুলি চালিয়ে দেয়। নিজেও চমকে ওঠে। এতে হয় কী, ক্ষণিকের জন্য শেখ করিমের বাঁধন আলগা হয়ে যায়। রিক্তা কনুই দিয়ে শেখ করিমের নাকে মারে। তারপর ঘুরে দমাদ্দম চালাতে থাকে। হাতে বন্দুক তুলে নিয়ে শেখ করিমের পায়ে আর হাতে গুলি করে। আর্তনাদ করে ওঠে করিম। স্বয়ম্ভুর গুলিতে আহত হয় বাদলের চ্যালা। অর্ধনগ্ন মেয়েটি তখন বুকের ওপর হাত চেপে হাউহাউ করে কাঁদছে। স্বয়ম্ভু নিজের শার্টটা খুলে ছুড়ে দেয়। হঠাৎ আরও চারজন উড়ন্ত মাকড়সার মত ঝাঁপিয়ে পড়ে। পুলিশের বন্দুক থেকে গুলি ছোটে। স্বয়ম্ভু আর শিবাঙ্গীর হাত-পা একসঙ্গে চলতে থাকে। দুটো ছেলের বুকে গুলি লাগে। স্বয়ম্ভুর হাতের প্রসাদ খেয়ে একটা দোতলার ভাঙা রেলিং টপকে নিচে পড়ে যায়। নিচে দুজন পুলিশ স্পট ডেড। অভিমন্যু দোতলায় উঠে আসে কয়েকজন পুলিশ কনস্টেবল নিয়ে। এই মেয়েগুলোকে নিয়ে যা। কম্যান্ড করে। রিক্তা আর শিবাঙ্গী শেখ করিমকে টানতে টানতে নিয়ে আসছে। ঠিক সেই সময় মাইকে একটা মহিলার গলা শোনা যায়। মহিলাটি কাঁদতে কাঁদতে বলছে, ভোলা, ভোলা কোথায় তুই? এ আমাদের মেরে ফেলবে। ভোলা। যে তাণ্ডব চলছিল বাড়িটা জুড়ে সেটা হঠাৎই থেমে গেল। এক্কেবারে থমথমে। স্বয়ম্ভু বলে উঠল, মা? পরক্ষণেই শিবাঙ্গী চিনতে পারল তার মায়ের গলা। হাউ হাউ করে কাঁদছে আর বলছে, শিবু রে, এরা তোর বাবার মাথা ফাটিয়ে ফেলে রেখে দিয়েছে। তুই কোথায়? স্বয়ম্ভু চিৎকার করে উঠল রেলিং ধরে। বুঝতেই পারল নিচের অন্ধকারে কোথা থেকে আওয়াজটা আসছে। তারপরেই আরেকটা পুরুষকণ্ঠ ভেসে এল, স্বয়ম্ভু সেন, শিবাঙ্গী বসু… হিরো আর হিরোইন। শেখ করিম আর আমাদের লোকদের ছেড়ে দিন। সঙ্গে ওই পাঁচটা মেয়ে। নইলে ওদিকে অসহায় নিষ্পাপ তিনজন বৃদ্ধ, বৃদ্ধার লাশ পড়ে যাবে।
সাহস থাকলে সামনে আসুন। আড়াল থেকে ল্যাজ নাড়ছেন লজ্জা করছে না?
বেশ তো। আপনারা নিচে আসুন। আমিও সামনে আসছি।
এই কথাটা বলার সময় স্বয়ম্ভু চোখ বন্ধ করে গলাটা শুনল। অজস্র বজ্রপাত হল মস্তিষ্কের কোষে কোষে। চোখ খুলল যখন, তখন মনের মধ্যে চলা বিশাল একটা প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেছে সে। ছুটে নিচে নামল সবাই মিলে। শেখ করিম ও তাদের চ্যালাদের ধরে নিচে নামানো হল। বাড়িটার উঠোনে নেমে দাঁড়াল সবাই। গাড়িগুলোকে অভিমন্যু অনেকক্ষণ ডেকে নিয়েছিল বলে এখানে চলে এসেছে। অভিমন্যুর নির্দেশে জ্বলে উঠল ছয়টা গাড়ির হেডলাইট। তারই মধ্যে একটা মানুষের সিল্যুট। এগিয়ে এল সামনে। মুখে মাস্ক। কী হল ছেড়ে দিন ওদের।
কানে শুনে আমি সব বুঝতে পারি ঠিকই। মানুষও চিনতে পারি। কিন্তু চোখে দেখে যাচাই না করলে বিশ্বাস করি না।
বেশ।
আগন্তুক ট্যাবটা স্বয়ম্ভুদের দিকে ঘুরিয়ে দিল। সুচিত্রা, অপর্ণা কাঁদছে। তাদের কে যেন বেঁধে রেখেছে। তারপরেই ওপারের মোবাইল ক্যামেরাটা ঘুরে গেল। শিবাঙ্গীর বাবা রক্তাক্ত মাথা চেপে মাটিতে বসে। বিচলিত হয়ে ওঠে শিবাঙ্গী। স্বয়ম্ভু দাঁতে দাঁত চেপে হাতটা শক্ত করে মুঠো করে। স্বয়স্তু এখান থেকেই চিৎকার করল, মা, মাসি। তোমরা চিন্তা কোরো না। তোমাদের কিচ্ছু হবে না। যে জানোয়ারটা বয়স্ক মানুষদের এ-রকম হাল করেছে সে যদি সত্যিকারের পুরুষ হয় তাহলে মুখটা দেখাক। টক করে ক্যামেরাটা নড়ে উঠল। মাস্ক পরা আগন্তুক মাইকটাকে ফোনের স্পিকারের কছে ধরে আছে। সেটার মাধ্যমেই একটা আওয়াজ ভেসে এল, নতুন করে কী দেখবেন স্বয়ম্ভুবাবু? আমাকে ধরবেন বলে আমার ছবি আঁকিয়ে চারপাশে
তো ছড়িয়েই দিয়েছেন। দেখুন, আমি নিজেই ধরা দিলাম। কথাটা বলেই মোবাইলটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল ছেলেটি। বলল, কারণ আমি শুধু পুরুষই নই, পুরুষোত্তম।
আসল নাম মহেশ্বর দাস। বাবা ভগবান দাস।
স্বয়ম্ভু বলে কথাগুলো। মহেশ্বর হাসে। অনেক খবরই রাখেন দেখছি। অবশ্য গোয়েন্দা বলে কথা। একটা কথা কী জানেন, গোয়েন্দাদের কোনো পার্সোনাল লাইফ থাকতে নেই। আপনজন থাকতে নেই। তাহলে পিছুটান বাড়ে। তাই তো আপনার আর আপনার লেজুড় সঙ্গিনীটির রাস্তা পরিষ্কার করে দিচ্ছি। দশ মিনিটের মধ্যে সরিয়ে দেব।
শিবাঙ্গী চিৎকার করে ওঠে, খবরদার, ওদের গায়ে একটা আঁচড়ও যেন না লাগে।
বেশ। আমি আবার মেয়েদের রিকোয়েস্ট ফেলতে পারি না। আপনারা ওদের ছেড়ে দিন। আমিও ভিডিয়ো অন রেখেই ওদের ছেড়ে দেব। এক্কেবারে।
অভিমন্যু স্বয়ম্ভুর কানের কাছে ফিসফিস করে, স্বয়ম্ভু, পাঁচটা মেয়েকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের মা, আত্মীয়স্বজন…
কথাটা ফুরোবার আগেই স্বয়স্তুও সোজাসুজি ভিডিয়োটার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, পাঁচটা নয় অভিমন্যুদা। পাঁচশোটা। তারপর পাঁচ হাজারটা। এদের খিদে অপরিসীম।
তাহলে মাসিমা …
ওদের কিচ্ছু হবে না।
কথাটা শেষ করেই চিৎকার করে স্বয়ম্ভু, এখান থেকে কেউ ছাড়া পাবে না। মহেশ্বর প্রথমটায় একটু থমকে গেল। তারপরেই বলল, তাহলে নিজের চোখেই মা-মাসিমাদের মৃত্যু দেখুন। কীভাবে তড়পে তড়পে মারি।
শিবাঙ্গীর বুকফাটা কান্না আসছে। কিন্তু মেয়েমানুষের কাঁদবার ছাড়পত্র থাকলেও পুলিশের নেই। সেই চাপা কান্নাই চিৎকার হয়ে যায়, কাপুরুষ। নপুংসক। লজ্জা করে না। সত্যিকারের পুরুষমানুষ হলে সামনে এসে লড়ে দেখা হারামি। আড়াল থেকে অসহায় বয়স্ক মানুষদের মারছিস কেন?
শোন মাগি, যতই বাঁড়া আমার পুরুষত্বে খোঁচা দিস, ওদের না ছাড়লে এখানেই তোদের গুষ্টির ষষ্ঠীপুজো করে দেব। এক থেকে দশ গুণব। তার মধ্যে না ছাড়লে খালাস।
.
মোবাইল ক্যামেরার সামনে রিভলভার তুলে ধরে। স্বয়ম্ভু নিশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে থাকে। শিবাঙ্গী বুঝতে পারে না সে কোনদিকে যাবে। একদিকে কর্তব্য, অন্যদিকে বাবা-মা-মাসি। মহেশ্বর চার পর্যন্ত গুণে ফেলেছে। নম্বরগুলো আওড়াতে আওড়াতে রিভলভার হাতে দড়ি দিয়ে শক্ত করে বাঁধা সুচিত্রা আর অপর্ণার চারপাশে ঘুরছে। মোবাইলটা সামনেই কোনো কিছুকে স্ট্যান্ড বানিয়ে রেখেছে। রেলা নিয়ে বস বলে ওঠে, স্বয়ম্ভুবাবু, রিস্কটা একটু বেশিই হয়ে যাচ্ছে। ওদের ছেড়ে দিন।
ছয়… সাত…
স্যার?
শিবাঙ্গীর গলা থেকে একটা প্রশ্ন উড়ে আসে। স্বয়ন্তু তাকায় শিবাঙ্গীর দিকে। মেয়েটার চোখে-মুখে কী ভয়ানক আকুতি। কী করব স্যার? বলুন কিছু। শিবাঙ্গী কাঁদছে। অঝোরে। পুলিশকে অনেক মায়াই কাটাতে হয়। স্বয়ম্ভু পুরুষ বলে কী একটু বেশিই শক্ত? শিবাঙ্গী কোমলপ্রাণা। এখনও বীভৎস মৃতদেহ দেখলে বমি করে ফেলে। চোখ ভারী হয়ে আসে।
আট… নয়…
.
স্বয়ম্ভু ভিডিয়োটার দিকে তাকায়। মহেশ্বর সুচিত্রার কপালে বন্দুক ঠেকিয়ে ফেলেছে। দশ বলার সঙ্গে সঙ্গে হয়তো মায়ের মাথাটা এফোঁড়- ওফোঁড় করে ছুটে যাবে গুলি। ছেলেকে পুলিশ বানাবার খেসারত দিতে হবে সুচিত্রাকে। অপর্ণারও একই অবস্থা। মহেশ্বর দশ বলল এবং সঙ্গে সঙ্গে গুলি চলল। মহেশ্বর টলে গেল এবং কিছু রক্তের ছিটের সঙ্গে হাত থেকে রিভলভারটাও ছিটকে গেল। শিবাঙ্গী চিৎকার করে উঠল, নাআআআআআ! স্বয়ম্ভু এতক্ষণে শ্বাস ছাড়ল। মাস্ক পরা বস শুধু গুলির আওয়াজ পেয়েই হো-হো করে হাসতে শুরু করেছে। কেল্লাফতে। অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছে দুর্মতি আগন্তুক। হঠাৎ এপাশে স্বয়ম্ভু হাসতে শুরু করে। হা-হা করেই হাসতে থাকে। দুর্মতি ঘাবড়ে গিয়ে হাসির বেগ কমাতে থাকে। ওদিকে শিবাঙ্গীর বাড়িতে তিনজন পুলিশ ঢুকে এসেছে। সঙ্গে আরও একটি ছেলে ক্যামেরার সামনে এসে মুখ দেখায়। চমকে ওঠে শিবাঙ্গী। স্বয়ন্তু চিৎকার করে বলে ওঠে, ওয়েল ডান রাজারাম। ব্র্যাভো! ফোনের ওপাশে রাজারাম থাম্বস আপ দেখায়।
.
দুর্মতি আগন্তুক ঘাবড়ে গিয়ে ট্যাবটাকে নিজের দিকে ফিরিয়ে সব কাণ্ড প্রত্যক্ষ করতে থাকে। শিবাঙ্গী অবাক চোখে স্বয়ম্ভুর দিকে চেয়ে দেখে রাজারামের সঙ্গে স্বয়ম্ভুর যোগাযোগ আছে? স্বয়ম্ভু শিবাঙ্গীর দিকে তাকিয়ে বাঁ-চোখ মারে। সেই ফাঁকে মাস্ক পরা বস পালাতে উদ্যত হলে স্বয়ম্ভু রিভলভার তাক করে বলে, পালাবার পথ নেই মিস্টার ভূপেন সরকার। নামটা চারপাশে যেন প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। নিজের নাম স্বয়ম্ভুর মুখে শুনে পালাতে গিয়েও থমকে দাঁড়াল। অভিমন্যু, শিবাঙ্গী, স্বয়ম্ভু তিনজনেই রিভলভার তাক করে ভূপেনের দিকে এগিয়ে গেল।
মাস্কটা নিজেই খুলবেন নাকি আমরা টেনে খুলে দেব?
ভূপেন ধীরে ধীরে মুখ নামিয়ে ঘুরে তাকায়। মাস্কটা সরায়। ঘর্মাক্ত মুখ তুলে চোয়াল চেপে স্বয়ম্ভুর দিকে তাকায়। স্বয়ম্ভু বলে, শুয়োরের বাচ্চাগুলোকেও তোর থেকে সুন্দর দেখতে।
দেহি পদপল্লবমুদারম
সোমেন সরকারের বাড়ির বাগান সংলগ্ন অংশটায় গাড়িতে গাড়িতে ছয়লাপ। বাইরে মিডিয়ার ভিড়। সাংবাদিকদের জ্বলন্ত ভাষণ একদম লাইভ টেলিকাস্ট হচ্ছে চ্যানেলে চ্যানেলে।
কলকাতার গোয়েন্দা বিভাগ এক সাংঘাতিক রহস্যের কিনারায় এনে ফেলেছে সমগ্র কলকাতাবাসীকে। গতকাল রাতে বনগাঁর কাছে ঘাটবাশুড় নামে একটি জায়গা থেকে হাতেনাতে ধরে মেয়েপাচার চক্রের বসকে। কে এই বস? জানেন কী? শুনলে চমকে যাবেন। বেহালা পূর্ব বিধানসভার এম.এল.এ সোমেন. সরকারের নিজের ছোটো ভাই ভূপেন সরকার। হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন। আরেকটু হলেই পাঁচটি মেয়ে পাচার হয়ে যাচ্ছিল বাংলাদেশে। সেখান থেকে দুবাই। ভূপেনের সঙ্গে ধরা পড়েছে বাংলাদেশ মেয়ে পাচারচক্রের মাথা শেখ করিম। আর এই সবটুকুর কৃতিত্ব জয়েন্ট সিপি শুভঙ্কর কাঞ্জিলাল দিয়েছেন গোয়েন্দা স্বয়ম্ভু সেনকে। তাঁর তত্ত্বাবধানে ও চূড়ান্ত দক্ষতায় এই জঘন্য অপরাধের কিনারা করা সম্ভব হয়েছে। অথচ দুদিন আগেই লালবাজারে প্রেস মিট করে জানানো হয় যে সোমেন সরকারের কেসের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হল স্বয়ম্ভু সেনকে। কারণ কোনো একটি পর্ন সাইটে নাকি তিনি নগ্ন ভিডিয়ো বানিয়ে অর্থোপার্জন করেন। তাহলে কি সেটা আই ওয়াশ ছিল? নাকি এর পেছনেও ছিল অন্য গল্প? তার থেকেও বড়ো প্রশ্ন, এসবের মধ্যে আজ প্রায় বারোদিন হতে চলল সোমেন সরকারের মেয়ে নিখোঁজ। তাকে কী পাওয়া গেছে? লোকে বলছে নিজের কাকাই নাকি তাকে পয়সার লোভে বিক্রি করে দিয়েছে। এটা কি সত্যি? নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোনো রহস্য? কথাকলি কোথায়? দুঃখের বিষয়, এই মুহূর্তে আমরা কিচ্ছু জানাতে পারছি না কারণ আপনারা দেখতেই পাচ্ছেন এম.এল.এ-র বাড়ির দরজা বন্ধ। সোমেন সরকারের বাড়িতে প্রশাসনের যত হোমরাচোমরা, যেমন সিপি, ডিসিপি, মিনিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টের লোকজন সবাই এসেছেন। এসেছেন স্বয়ম্ভু সেন ও তাঁর সহকারী শিবাঙ্গী বসু। রয়েছেন বনগাঁ ডিস্ট্রিক্টের…
টিভির সাউন্ডটা কমিয়ে দিল স্বয়ম্ভু। দরজা বন্ধ। সোমেন সরকারের বাড়ির নিচের বড়ো ডাইনিংয়ে যত লোক রয়েছে তাতে সেটা গমগম করা উচিত ছিল। কিন্তু এখন সেটা থমথম করছে। সোমেন সরকার নিজের সোফায় মুখটা আধো নিচু করে বসে। কস্তুরী বসেছে তাঁর থেকে হাত দশেক দূরে সিঁড়ির ওপর। রেলিংয়ে মাথা ঠেকানো। পাশে বাড়ির কাজের মেয়ে মতি। ওয়াইন কালারের ফ্রিজটার কাছে দাঁড়িয়ে আছে ঈশ্বর। ছেলের পাশে ভগবান দাস মাটিতে হাঁটু মুড়ে বসে। এ ছাড়া জয়েন্ট সিপি, ডিসিপি, মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তর থেকে প্রতিনিধিরা, পুলিশ ফোর্সের বেশ কিছু লোক, অভিমন্যু, হিরণ্য দাশগুপ্ত যাকে বলে এক্কেবারে চাঁদের হাট। স্বয়ম্ভু কথা শুরুর আগেই ডিসিপি সীতাংশু ভড় বলে উঠল, কেসটা আরও ক্লোজ ডোর হওয়ার জন্য বলেছিলাম শুভঙ্কর। শুভঙ্কর কাঞ্জিলালকে জবাব দেওয়ার সুযোগ দিল না স্বয়ম্ভু। বলতে শুরু করল, ডোর ক্লোজই আছে স্যার। এর থেকেও ক্লোজ ডোর করলে বাইরের মিডিয়া আমাদের রেহাই দেবে না। আমায় তো পর্ন স্টার বানিয়েই দিয়েছে। আর তাতে আমার ডিপার্টমেন্ট আমার হয়ে এমন কিছু বলেনি বা করেনি যাতে সাধারণ মানুষ নিজে থেকে বলতে পারে যে যেটা হয়েছে সেটা ষড়যন্ত্র। আমার তো ইচ্ছে ছিল এই দরজাটা খুলেই মিডিয়ার সামনে রহস্য উন্মোচন করার। কিন্তু আপনাদের সম্মানটা বড়ো দামি স্যার।
শেষ কথার খোঁচাটা বেশ জোরেই সীতাংশুর বুকে গিয়ে খোঁচা দিল।
এই কেস শিবাঙ্গী বসুর শ্লীলতাহানি করেছে। এই কেস জনসমক্ষে আমায় উলঙ্গ করেছে। তার হিসেব না মিটিয়ে আমি তো থামব না স্যার।
.
স্বয়ম্ভুর চোখের দিকে তাকাতে পারল না ডিসিপি। যাই হোক, এবার আসল কেসে ঢোকা যাক। বলে স্বয়ম্ভু হাত ঝাড়তে ঝাড়তে মাঝখানের অংশটায় হাঁটতে শুরু করল দেয়ালে ঝোলানো কস্তুরী, সোমেন আর কথাকলির ছবির দিকে তাকিয়ে। আমি প্রথম যেদিন এই বাড়িতে পা রাখি সেদিনই ছবিটা চোখে পড়েছিল। বাবা তার মেয়েকে জড়িয়ে আছে। কথাকলি উচ্ছ্বল ঝরনার মতো হাসছে। পাশে তার মা দাঁড়িয়ে কিন্তু মেয়ে আর স্বামীকে নিয়েও তাঁর মুখে হাসি নেই। যেটুকু আছে সেটা মেকি কেন? এইটা আমার প্রথম দিনের খটকা। এটা মামুলি একটা জিনিস বলেই উড়িয়ে দিয়েছিলাম। মনে হয়েছিল কস্তুরীদেবী হয়তো ইন্ট্রোভার্ট। দেখলাম সত্যিই উনি কথা একদম কম বলেন। অবশ্য মেয়ের নিখোঁজ হওয়ার শোকটাও ছিল। কিন্তু ভাবিনি, এই ছবির আড়ালে এমন গুপ্তকথা রয়েছে। আচ্ছা সোমেনবাবু, সুকুমার আপনাদের বাড়িতে কতদিন কাজ করেছে?
নামটা শুনেই চমকে ওঠে সোমেন সরকার। কস্তুরীও সিঁড়ির রেলিং থেকে মাথাটা তুলে স্বয়ম্ভুর দিকে তাকায়।
সুকুমার?
নামটা বিড়বিড় করে সোমেন।
হ্যাঁ হ্যাঁ সুকুমার মণ্ডল। আপনার ছায়াসঙ্গী ছিল তো একসময়ের চিনতে পারছেন না?
হ্যাঁ পেরেছি। কতদিন কাজ করত আপনার কাছে?
বহু বছর।
সুকুমার কোথায় এখন?
আজ থেকে পনেরো বছর আগে রোড অ্যাক্সিডেন্টে সুকুমার মারা যায়।
রোড অ্যাক্সিডেন্ট! কীভাবে হয়?
রাতে বাড়ি ফিরছিল। তখন একটা লরি এসে মেরে দিয়ে বেরিয়ে যায়।
সঙ্গে সঙ্গে স্বয়ম্ভু বলে, তারপর লরিটাকে আর পাওয়াই গেল না। পাওয়া গেল না ড্রাইভারকেও।
তখন তো আর এত সিসিটিভি ছিল না। থাকলে হয়তো…
থাকলেও কী কিছু হত সোমেনবাবু? এলাকার পুলিশকে হাত করে কিছুক্ষণের জন্য সিসিটিভি অফ করে সেই সময় অ্যাক্সিডেন্ট ঘটালে কীভাবে আর অপরাধীকে ধরা যায় বলুন তো?
মানে?
সোমেন সরাসরি স্বয়ম্ভুর দিকে তাকায়। স্বয়ম্ভু চোখের কোণে তীক্ষ্ণ হাসি নিয়ে বলে, পনেরো বছর আগের একটা দুর্ঘটনার স্ক্রিপ্ট পনেরো বছর পরেও সুন্দরভাবে চালিয়ে দেওয়া যায়। সুকুমার মণ্ডল আর স্বপন নন্দী, দুজনের মৃত্যুর নাটকটা হুবহু এক।
গল্প বানাচ্ছেন নাকি?
সোমেন হালকা সুরে তড়পায়। স্বয়ম্ভু হাসে। বলে, গল্প তো আপনি আর আপনার ভাই মিলে বানিয়েছেন এতকাল। আজকে আর সেই গল্প চলবে না এম.এল.এ সাহেব। আজ শুনব গল্পের মধ্যে যে আসল কাহিনি লুকিয়ে আছে, এখন ওই কী যেন বলে…
বিহাইন্ড দ্য সিন।
শিবাঙ্গী ধরিয়ে দিল।
রাইট। বিহাইন্ড দ্য সিন। আজ সেটা শুনব। আপনার জীবনের গোপন থেকে গোপনতর কথা জানত সুকুমার। আরও একজন জানত সেটা পরে আসছি। আপনি যা বলতেন সুকুমার তাই করত। আপনার খিদমত খাটত। পার্টির সব কাজ আপনার হয়ে ওই করে দিত। তার বদলে সে হাজার চারেক টাকা পেত হাতখরচা। কিছুটা কাঁথিতে তার বাড়িতে পাঠাত। আর কিছুটা নিজে হাতে রাখত। কিন্তু এইটুকু টাকায় সংসার চলত না। বেচারা বিয়ে করতে চেয়েছিল। বাড়ি থেকে চাপও দিচ্ছিল। অনেক ভেবেচিন্তে আপনার কাছে এসে টাকা বাড়াবার কথা বলল। কিন্তু আপনি বাড়ালেন না। অথচ তাকে শেষ পাঁচবছর ধরে বলে এসেছিলেন টাকা বাড়াব টাকা বাড়াব। সে বেচারা সেই আশাতেই বুক বেঁধেছিল। মাকেও বলে দিয়েছিল মেয়ে দেখার জন্য। তার মা মেয়ে দেখে তাকে জানায়। কিন্তু তখনও একটা টাকাও বাড়ান না আপনি। উলটে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করার হুমকি দেন। আর ঠিক তখনই রেগে গিয়ে সুকুমার বলে, আপনার গোপন কথাটা ও সারা পৃথিবীকে জানিয়ে দেবে। ব্যাস, আপনারও মাথায় খুন চেপে যায়। একদিকে আপনি জননেতা হওয়ার চেষ্টা করছেন। পার্টি আপনাকে মাথায় তুলে নাচছে। সেই সময় সুকুমার যদি আপনার লুকিয়ে রাখা কথাটা সব্বাইকে জানিয়ে দেয় তাহলে তো ঘোর সর্বনাশ। তখন আপনি স্থির করলেন, নাহ! নেতা হতে গেলে সবার আগে পথের কাঁটাগুলোকে সরাতে হবে। প্রতিটা দলেরই কিছু রাজনৈতিক গুন্ডা থাকে। আপনি তাদেরই সাহায্য নিলেন। সুকুমার চিরকালের মতো আপনার পথ থেকে সরে গেল।
.
কী প্রমাণ আছে আপনার কাছে?
মেজাজ দেখিয়ে ওঠে সোমেন সরকার।
দাঁড়ান তো বেশি মেজাজ দেখাবেন না। এটার কোনো প্রমাণ থাকুক বা না থাকুক তাতে আপনার জেল যাওয়া কেউ আটকাতে পারবে না। আপনার ফোন কলস, লোকেশন, লোকজনের সঙ্গে সাক্ষাত সব আমাদের হাতে। তাও এসব বলছি যাতে আমাদের মহামান্য সরকারের কাছে আপনার আদ্যপান্ত সবটুকুর খবর পৌঁছোয়। আবদুলের কাছ থেকে এক লক্ষ টাকা নিয়েছিলেন বেআইনিভাবে তার পড়শি ভবতোষ মান্নার জমিটা হাতিয়ে দেবেন বলে। কিন্তু তার মধ্যেই আপনার মেয়ে নিখোঁজ হয়ে যায়। তাই ওদিকে নজর দিতে পারেন না। কিন্তু আবদুল বাড়ি বয়ে এসে আপনাকে অড়া দিয়ে যায়। কারণ তাকে দেওয়া কথা অনুযায়ী কোনো উকিল আপনি দেননি। পরে আপনি সন্ধেবেলায় আবদুলকে খোঁজ করতে একজনকে পাঠান উকিলবাবু কথা বলবেন বলে। কিন্তু আপনার লোক আবদুলকে খুঁজে পায় না। তখন যদি খুঁজে পেত তাহলে আবদুলও হয়তো সুকুমারের মতো নিখোঁজ হয়ে যেত। আর আমি যদি না দেখতে পেতাম যে আপনার লোক বাইকে চেপে আমাদের গাড়িকে ফলো করছে তাহলে তো আবদুলের কবরে এতক্ষণে মাটি পড়ে গেছে।
সোমেন সরকার চুপ।
***
