৫
লোকে বলে সিনেমায় নাকি এমন হয়। কিন্তু এটাই আমার জীবন। কথাকলি আমায় ভাসিয়ে দিয়ে গেল। স্কুল থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার পর আমার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। বাবার হার্ট অ্যাটাক। এক বছরের মাথায় বাবা চলে গেল। আমায় কাজে লেগে পড়তে হল ছোটোভাই আর মাকে বাঁচিয়ে রাখতে।
.
এতক্ষণ চুপচাপ নিখিলের জীবনকাহিনি শুনছিল স্বয়ম্ভু আর শিবাঙ্গী। স্বয়ম্ভু বলল, কথাকলির সঙ্গে আর দেখা করোনি?
হোয়াটসঅ্যাপ করেছিলাম। ফোন করেছিলাম। উত্তর আসেনি।
এই রাগেই তুমি কথাকলিকে সরিয়ে দিলে?
সরাসরি জিজ্ঞাসা করল স্বয়ম্ভু। নিখিল ফিক করে হেসে জবাব দিল, সেটা করার যদি সাহসই থাকত স্যার তাহলে এদ্দিনে আমি অনেক কিছুই করে ফেলতাম। কিন্তু আমি বড্ড ভীতু স্যার। ভয় করে। আসলে পয়সা আর ক্ষমতার কাছে ট্যালেন্ট সবসময়েই হেরে গেছে।
এখন তুমি যেতে পারো। তবে মনে রেখো, স্টেশন লিভ করবে না।
.
নিখিল চলে যাওয়ার পরেই স্বয়ম্ভুর মোবাইলে ঠাকুরপুকুর থানার ওসি অভীক মুখার্জি। স্যার এখানে আবারও একটা নিরুদ্দেশের ইন্সিডেন্ট ঘটেছে এবং এর সঙ্গেও সোমেন সরকার জড়িত। স্বয়ম্ভু চুপ। অভীক বাকিটা বলে পেল। ফোনটা রেখে শিবাঙ্গীকে ঘটনাটা বলল স্বয়ম্ভু। আবদুল উধাও। ওর বউ রাবেয়া আর ছেলে মতিউর থানায় ডায়েরি করেছে। শিবাঙ্গী বলল, এর সঙ্গে সোমেন সরকার কীভাবে জড়িত? সেটাও স্বয়স্তু খোলসা করে বলল। ওদের দুজনের কথা কান খাড়া করে শুনল পঞ্চসায়র পুলিশ স্টেশনের ওসি বিবেক সাহা। শিবাঙ্গী হিসেব করল, প্রথমে ঈশিতা, তারপর মেঘা নন্দী আর স্বপন নন্দী। এখন আবদুল। সোমেনকে ডেকে চার্জ করুন স্যার। এমন চাপ দিন যে…
যে স্বয়ম্ভু সেনের চাকরিটাও চলে যাক। এই চাইছ তো? শিবাঙ্গীর কথার ওপর দিয়েই স্বয়ন্তু কথাটা বলে উঠল। হকচকিয়ে গেল শিবাঙ্গী। ইশশ! ভয়ানক গণ্ডগোলের কিছু বলে ফেলেছে কি?
আরে বাবা সোমেন সরকার কোনো আম আদমি নয় শিবাঙ্গী। দুম করে ওঁকে ডাকার পারমিশনও পাওয়া যাবে না। আর সেটা পাওয়া গেলেও সব সিম্প্যাথি সোমেনের দিকে আরও বেশি করে চলে যাবে।
এই কথাটার খটকা লাগল শিবাঙ্গীর। সোমেনের দিকে এক ফোঁটাও কি আপনি চান না না?
নিশ্চয়ই চাই। অমন একজন ভালোমানুষ কী সাফার করছেন বলে তো। চলো এখন। অন্য অনেক কাজ আছে।
শিবাঙ্গী কিছুই বুঝল না। মুহূর্তের মধ্যে দুটো স্বয়ম্ভু সেন চোখের সামনে চলকে উঠল। ওসিকে টাটা করে বাইরে বেরিয়ে গাড়ির কাছে এসে স্ব বেশ কড়া গলায় বলল, কী হয়েছে শিবাঙ্গী? বাড়িতে কোনো প্রবলেম?
না তো স্যার।
তাহলে বুদ্ধিটা কোথায় রেখে এসেছ?
কেন স্যার?
কথা বলার সময় একটুও খেয়াল রাখবে না আমাদের আশেপাশে সামনে কে আছে। এই ওসি বিবেক সাহা আর তার কনস্টেবল কিলবিল করছে চারপাশে। যারা এই কেসের বিন্দুবিসর্গে নেই। তাদের সামনে তুমি জিজ্ঞেস করছ এম.এল.এ সোমেন সরকারকে কেন সিম্প্যাথি দেখাতে চাইছি না? খবরটা যেতে বেশি সময় লাগবে না সোমেন সরকারের কানে।
.
বেশ ধমকের সুরেই একনিশ্বাসে গোদা ভাষায় ঝেড়ে দিল শিবাঙ্গীকে। বেচারি জিভ কাটার পর্যায়তেও নেই। সত্যি এমন ভুল কাজ ও কীভাবে করছিল? এক্সট্রিমলি সরি স্যার। আমি এক্সাইটমেন্টে বলে ফেলেছি। প্লিজ, অ্যাম রিয়েলি সরি। পালটা পাটকেল ছুড়ে দিল স্বয়ম্ভু, এত এক্সাইটমেন্ট কীসের? কোনো রাজপুত্তুরকে মনে ধরেছে নাকি?
শিবাঙ্গীর মুখটা সঙ্গে সঙ্গে হাঁ হয়ে গেল। আপনি কী করে জানলেন? স্বয়ম্ভু সবে গাড়িতে উঠতে যাবে। শিবাঙ্গীর রিপ্লাই শুনে চোখ পাকিয়ে থেমে গেল, মানে? সত্যি নাকি? গাড়ির দরজাটা খুলেও বন্ধ করে দিল স্বয়ম্ভু। শিবাঙ্গী বলল, আপনি কী করে জানলেন বলুন।
আমি তো জাস্ট একটা ঢিল ছুড়লাম। কাকে মনে ধরল?
ধুস, মনে কেন ধরবে? তবে চোখে ধরেছে। ছেলেটি সত্যিই রাজপুত্র।
.
রাজপুত্র শব্দটার ওপর একটু বেশিই জোর দিল শিবাঙ্গী। স্বয়ম্ভু প্রশ্ন করল, কোথায় থাকে?
আমাদের বাড়ির থেকে খানিকটা দূরে। একটা বাড়িতে ভাড়া এসেছে। কী নাম?
নাআআআ … রাজারাম।
বাআআআআবা! একেবারে রামচন্দ্র?
কিন্তু সন্দেহজনক।
স্বয়ম্ভুর ভুরুটা নেচে ওঠে। কেন?
বুঝতে পারছি না। ছেলেটা আমায় ফলো করছে কিনা।
এতে সন্দেহের কী আছে? ফলো করাটাই তো স্বাভাবিক।
কবিতা লেখা চিঠির কথাটা ভুলে যাচ্ছেন স্যার। রামের ছদ্মবেশে রাবণ এল কিনা সেটাই ভাবাচ্ছে।
পুলিশে কাজ করে তুমি সবাইকেই সন্দেহ করছ। ভালোও তো হতে পারে।
একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ভালো হলেই ভালো। স্বয়ন্তু কয়েক পলক স্থিরদৃষ্টিতে শিবাঙ্গীর দিকে চেয়ে দুম করে গাড়ির পাল্লা খুলে গাড়িতে উঠে পড়ল। অন্য সময় হলে উঠে এসো বলত। কিন্তু এখন সেটাও বলল না। স্বয়ম্ভুর ব্যবহারটা একটু অন্যরকম লাগাতে শিবাঙ্গীর নাকের ওপরের চামড়াটা কুঁচকে গেল।
.
কস্তুরীর কল লিস্ট এসে গেছে। স্বয়ম্ভু লালবাজারে নিজের ঘরে এসে বসতেই সাব ইন্সপেক্টর কৌশিক পুরকাইত কল লিস্টটা নিয়ে এল। চোখের ইশারায় প্রশ্ন করল স্বয়ম্ভু। কৌশিক জানাল, গত সাতদিনে একবারও ঈশিতা বা তার মায়ের নম্বরে ফোন যায়নি কস্তুরী সরকারের ফোন থেকে। দুটো হাত একসঙ্গে জড়ো করে কনুই দুটো টেবিলের ওপরে রাখল। দুটো হাতজড়ো করা মুঠিটা ঠোঁটের ওপর ঠেকিয়ে লক্ষ্যহীন দৃষ্টি নিক্ষেপ করল সামনের দেয়ালের দিকে। মাথার মধ্যে অনেক কিছু একসঙ্গে চলছে। এই সময় ঘরে ঢুকে এল শিবাঙ্গী। স্বয়ম্ভু একইভাবে বসে রইল। বসার জন্য চেয়ার টানে শিবাঙ্গী। খুব কর্কশ একটা শব্দ হয়। স্বয়ম্ভুর ভাবনায় ভাঙন ধরে।
ঠাকুরের সামনে বসে কস্তুরী সরকার মিথ্যে বলল!
অবাক চোখে স্বয়ম্ভু শিবাঙ্গীর দিকে তাকিয়ে কথাটা বলে উঠল। হঠাৎ এক চঞ্চলতা গ্রাস করল স্বয়ম্ভুকে। কৌশিককে জিজ্ঞাসা করল, শুভঙ্কর স্যার আছেন?
মিনিট কুড়ি আগে তো দেখেছিলাম।
কথাটা শুনেই স্বয়ম্ভু চেয়ার ছেড়ে উঠে সোজা হাঁটা দিল।
.
নিজের চেম্বারে গম্ভীর মুখে কানে ফোন ধরে বসে শুভঙ্কর কাঞ্জিলাল। কাউকে কিছু বোঝানোর চেষ্টা করেই চলেছে। কিন্তু নিজেদের চেষ্টার কথা অপরপক্ষকে বোঝাতে গিয়ে প্রতিবার অর্ধেক কথা বলে থেমে যাচ্ছে। কারণ ফোনের ওপারে মেশিনগান ছুটছে হু-হু করে। এমনই এক যুদ্ধবিধ্বস্ত ক্ষেত্রে প্রবেশ ঘটল স্বয়ম্ভুর। চোখের ইশারায় বসতে বলল শুভঙ্কর কাঞ্জিলাল। অনেক দিন হল শুভঙ্করকে দেখছে স্বয়ম্ভু। তাঁর মুখের বলিরেখাগুলো কখন কোন পরিস্থিতিতে কীরকম নকশা আঁকে সেটা সে ভালো করেই বোঝে। ঢোঁক গেলে সে। ভালোই বোঝে, কোনো একটা বাড় কিংবা ঝড়ের ঝাপটা আসতে চলেছে ওর দিকে। শুভঙ্কর মোবাইলটা কান থেকে টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখতে রাখতে ভীষণ শাস্ত আর উৎফুল্ল কণ্ঠে বলে, কনগ্র্যাচুলেশনস স্বয়ম্ভু! কানের কাছে যেন বোমা ফাটল। স্বয়ম্ভু ও বোকা হয়ে বলে উঠল, স্যার!
অবাক হচ্ছ কেন? শুভেচ্ছা জানালাম তোমায়। বলো, মেয়েটাকে কোথায় রেখেছ? সেফ কাস্টডিতে আছে তো?
মানে স্যার কোন মেয়ে? কীসের কাস্টডি?
শুভঙ্কর চোখের পাতাগুলো নিমেষে কয়েকবার পটপট করে ফেলে বলে, আরে এম.এল.এ সোমেন সরকারের মেয়ে কথাকলি সরকার। ওকে খুঁজে এনেছ আর সে-কথাই তো তুমি জানাতে এসেছ তাই তো? চলো আমি নিজে যাব একবার।
উফফ কী চাটন মাইরি! মনে মনে ভাবল স্বয়ম্ভু। জানি না স্যার এই ভুল খবরটা আপনাকে কে দিল। কাঞ্জিলালবাবুর চোখে এখন কোনো ভাষা নেই। যেন ভাজা মাছটা উলটে খায় না। আর কাউকে খেতেও দেয় না। স্বয়ম্ভু বলে, এখনও আমরা কোনো ট্রেস পাইনি স্যার।
ঘটা করে এটাই জানাতে এলে? জানো আমায় কী কী শুনতে হচ্ছে? এক্ষুনি মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তর থেকে কল এসেছিল। যাঁদের বাড়ির মেয়ে চুরি গেছে তুমি তাদের বাড়ির লোককে জেরা করে জেরবার করে দিচ্ছ। ওদেরকেই সন্দেহ করে আসছ। আর বাইরে লবডঙ্কা? তোমার কী মনে হয়, সোমেন সরকার নিজেই নিজের মেয়েকে লুকিয়ে রেখে শহর জুড়ে নাটক করছে?
স্যার, আমাদের চোখে সবাই সন্দেহভাজন। সেখানে বাইরের লোক ভিতরের লোক বলে কিছু নেই।
জ্ঞান দিয়ো না স্বয়ম্ভু। তুমি আর সোমেন সরকারের বাড়ির কাউকে জেরা করবে না। মেয়েটা একটা পার্টিতে গিয়েছিল। সে সেখান থেকেই মিসিং।
সারা শহর এই গল্পটাই জানে স্যার।
গল্প?
ভেড়ে উঠল শুভঙ্কর।
সোমেন সরকার ও তার বাড়ির লোকজন সবাই বলেছেন কথাকলি বুধবার থেকে মিসিং। বাট কথাকলি বুধবার কোনো পার্টিতেই যায়নি। মঙ্গলবার ছিল পার্টি। ভার্দে ভিস্তার সিসিটিভিতে সেটা দেখাও গেছে। মেয়েটা কি সত্যিই সেদিন বাড়িতে এসেছিল? মালির কথা অনুযায়ী সে তাকে বুধবার সকালে দেখেছে। তারপর আর দেখা যায়নি। এদিকে মেয়েটির কাকা মেয়েটিকে ঠিক যে পোশাক পরে বুধবার পার্টিতে যেতে দেখেছেন ঠিক সেই একই পোশাক পরে একটা বড়োলোকের মেয়ে, বিশেষ করে মন্ত্রীর মেয়ে মঙ্গলবারও পার্টিতে গেছিল? এদিকে তার ওয়্যারড্রব ঠানা দামি দামি সব জামা! পার্টিতে একটি মেয়ের সঙ্গে কথাকলি বাগবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ে। সেই মেয়েটি এখন কোমায় আর তার বাবা স্বপন নন্দী, যে কিনা আজ থেকে সাত-আট বছর আগে এই সোমেন সরকারের শিশু পাচারের কেস নিয়ে লেখালিখি করেছে, সেই স্বপন নন্দী মৃত। একটা ট্রাক এসে তাঁর গাড়ি পিষে দিয়ে চলে গেছে।
তুমি জোর করে দুয়ে দুয়ে চার করছ।
করছি না স্যার। হয়ে যাচ্ছে। কথাকলির সঙ্গে স্বপন নন্দীর মেয়ের বাগড়াটাও সোমেন সরকার কেন্দ্রিক। তারপরেই বাপ-মেয়ের অ্যাক্সিডেন্ট। আরও ইনফরমেশন দিই আপনাকে। ওই অশান্তি যখন চরমে পৌঁছোয় তখন ঈশিতা নামের আরেকটি মেয়ে যে কিনা কথাকলির বন্ধু, সে-কথাকে সেইখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যায়। এটা সিসিটিভিতে দেখাও গেছে। ওখানকার ওয়েটারের বয়ানেও তার প্রমাণ মিলেছে। সেই ঈশিতা আর তার পরিবার মিসিং। ফোন প্রথমে সুইচড অফ। এখন নেটওয়ার্ক সীমা কে বাহার। অথচ সোমেন সরকার ও তাঁর স্ত্রী কস্তুরী সরকারের বয়ান অনুযায়ী তাঁরা নাকি মেয়ে বাড়ি আসছে না বলে ঈশিতাকে বৃহস্পতিবার রাতে ফোন করেন। ঈশিতা নাকি বলেছে, ও পার্টিতে যায়নি। অথচ আমাদের কাছে প্রমাণ আছে ঈশিতা পার্টিতে গেছে। আমার সন্দেহ হতে কস্তুরীদেবীর কল লিস্ট বের করে দেখি সেখান থেকে কোনো কলই যায়নি ঈশিতা বা ওর মায়ের নম্বরে। তার মানে কস্তুরী বা সোমেন সরকার আমাদের মিথ্যে বলেছে। আর নয় তো ঈশিতা ওদের মিথ্যে বলেছে। যেই মিথ্যে বলুক, প্রশ্ন হল বলল কেন? ঈশিতার প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন হঠাৎ বুধবার সকালে নাকি সপরিবারে তারা পাহাড়ে বেড়াতে গেছে। তাও আবার কীসে চড়ে? না কথাকলির গাড়িতে চড়ে। আরও অদ্ভুত কী জানেন স্যার, যে গাড়িটা ওদের নিতে এসেছিল সেটা ওদের গেটের থেকে বেশ অনেকটা দূরে দাঁড়িয়ে ছিল যাতে সিসিটিভিতে ধরা না পড়ে। কেন? গেটকিপার জানিয়েছে, গাড়িটা ছিল নীল রঙের ব্যালেনো। সেম গাড়ি কথাকলির। কথাকলির গাড়ির কোনো ট্রেস পাচ্ছে না পুলিশ। আমি কস্তুরীদেবীর সঙ্গে কথা বলতে বাড়িতে গেলাম। কিন্তু আমায় কথা বলতেই দিল না। স্যার, আপনি বলুন, সোমেন সরকার আর তার বাড়ির লোককে কীভাবে সন্দেহের ঊর্ধ্বে রাখি? আর এখন যখন আপনার মাধ্যমে আমাকে আটকাবার চেষ্টা হচ্ছে তখন তো আরও সন্দেহ হচ্ছে।
.
কিছুক্ষণের জন্য চুপ করে থাকে শুভঙ্কর কাঞ্জিলাল। তারপর বলে, আমি কিছু জানি না স্বয়ম্ভু। সোমেন সরকার বা তাদের বাড়ির কাউকে কোনোভাবে আর বিরক্ত করা যাবে না। ওনার স্ত্রীর ভীষণ শরীর খারাপ তুমি বাইরে থেকে যা পারো করো।
স্যার…
শুভঙ্কর হাত তুলে স্বয়ম্ভুকে থামিয়ে দেয়। স্বয়স্তুও থমকে যায়। মাথা নিচু করে বসে শান্ত গলায় বলে, বাইরে থেকে কাজের একটা পারমিশন লাগবে স্যার। আমি সোমেন সরকারের কল লিস্ট এবং অল কল রেকর্ডিং চেক করতে চাই।
লিস্ট চেক করতে পারো। কিন্তু রেকর্ডিং চেক করার পারমিশন দিতে পারব না।
স্যার, এভাবে তো এগোনোই যাবে না।
যতটুকু পারবে এগোবে।
তাতে যদি মেয়েটা উদ্ধার না হয় তখন পাবলিক, মিডিয়া সারা শহর বলবে পুলিশ, ডিটেকটিভ অযোগ্য।
পাবলিক পুলিশকে অযোগ্য বলবে। আবার নিজেরা বিপদে পড়লে আমাদের কাছেই আসবে। তখন দক্ষতার সঙ্গে প্রবলেম সলভ করে দিলে আবার ওরাই আমাদের মাথায় তুলে নাচবে। ম্যাও কেসটাতে তো যথেষ্ট নাম সম্মান ভালোবাসা সব পেয়েছ। পরে আবার কেস পাবে। আবার মিডিয়া স্বয়ম্ভু সেনের নামে জয়ধ্বনি দেবে।
কেসটা ছেড়ে দিতে বলছেন?
একদম নয়। তদন্ত করে ফাটিয়ে দাও। সারা শহর দাপিয়ে বেড়াও। যাকে হোক থানায় তুলে জেরা করো। কিন্তু সোমেন সরকারের ফ্যামিলি মেম্বারদের আর ডিস্টার্ব কোরো না। আমি চাই না, আমার টিম তোমায় হারাক।
অনেক কিছু বলতে গিয়েও কথাগুলো জিভের ডগায় একটা মণ্ড পাকিয়ে শক্ত হয়ে ঝুলে রইল। শুভঙ্কর বলল, একটা কথা মাথায় রেখো স্বয়ম্ভু, আমাদেরও একটা সীমারেখা আছে। আমরাও কোথাও না কোথাও আমাদের ওপরমহলের দাস।
আমরা পাবলিক সার্ভেন্ট স্যার। আসছি।
চোয়াল শক্ত করে জয়েন্ট সিপির ঘর ছাড়ল স্বয়ম্ভু।
.
একমাথা আগুন নিয়ে ঘরে ঢুকেই থমকে গেল স্বয়ম্ভু। যে লোকটি সোমেন সরকারের মালির খোঁজ করছিল চায়ের দোকানে এই মুহূর্তে সে বসে আছে। স্বয়ম্ভুকে দেখামাত্রই উঠে দাঁড়াল।
কী ব্যাপার রতন?
খবর আছে স্যার।
স্বয়ম্ভু দ্রুত পায়ে নিজের চেয়ারের দিকে এগোতে এগোতে বলল, সে তো বুঝতেই পারছি। বলে ফ্যালো।
সোমেন সরকারের মালি ভগবান দাস, ওর বউয়ের তো ক্যান্সার নয়। স্বয়ম্ভু অবাক। শিবাঙ্গী ইতোমধ্যে শুনে ফেলেছে বলে মুখের ভাবে কোনো পরিবর্তন হল না।
তাহলে?
আলসার। আর ওর বড়ো ছেলেও জীবিত। তবে কোভিডের সময় থেকে নিখোঁজ। আশেপাশের কেউ দেখেনি ছেলেকে।
ওই বুড়ো মালিটাও বেমালুম মিথ্যে বলল?
না স্যার। তা নাও হতে পারে। ভগবানের অ্যালজাইমার না অ্যামনেশিয়া কিছু একটা আছে। খালি ভুলে যায়। ওর বউ তো বলল লোকজন ঠিকই চিনতে পারে। নামও মনে রাখতে পারে। শুধু দিনক্ষণ, তারিখ, জায়গা ভুলে যায়।
ছেলে কেন নিরুদ্দেশ, বলল কিছু?
বলল বাপের সঙ্গে টাকাপয়সা নিয়ে কোনো ঝামেলা। সম্পত্তি সংক্রান্ত কেস স্যার। কোনো ফোন নম্বরও নেই। আর ভগবান দাস আজকের নয়, প্রায় বিশ বচ্ছর সোমেনের বাড়ির বাগান করে।
.
স্বয়ম্ভুর চোখে-কানে চলকে উঠল সোমেন আর মালি ভগবান দাসের কথাগুলো। দুজনেই বলেছে বারো বছর ভগবান কাজ করে। ভগবানের মতো সোমেন সরকারেরও কি ভুলে যাওয়া রোগ নাকি? আচ্ছা, রতন। তুমি এখন যাও। নজর রেখো।
একদম স্যার। আসি।
.
রতন চলে যেতেই শিবাঙ্গী বলে উঠল, স্যার, ভগবানকে পাখি পড়ার মতো করে শিখিয়ে দেওয়া হয়েছিল। নইলে সোমেন কেন বলবে ভগবান বারো বছর এ বাড়িতে?
ঠিক শিবাঙ্গী। এই জন্যেই শুভঙ্কর স্যার বললেন, বাড়ির কাউকে ডিস্টার্ব না করে বাইরে থেকে তদন্ত চালাতে।
মানে?
মানে হল সোমেন সরকারের ফ্যামিলির কাউকে আর জেরা করা যাবে না। মন্ত্রীর ঘর থেকে নির্দেশ এসেছে।
কথাটা শুনে শিবাঙ্গী শূন্যদৃষ্টিতে জানলার বাইরে চেয়ে রইল। তারপর নিজের মনেই আওড়াতে থাকল, আলসার হল ক্যান্সার, হারিয়ে যাওয়া ছেলে হল মৃত, বিশ হয়ে গেল বারো! সবটাই স্ক্রিপ্টেড। কেন? কথাকলি তো একমাত্র সন্তান! ওর বাড়ির লোক কি ওকে ফিরে পেতে চায় না? শিবাঙ্গীর মনে বিড়বিড় করে ওঠা প্রশ্নগুলো স্বয়ম্ভুর মনের বন্ধ ঘরটাতে বারবার ঘা দিতে থাকে। স্বয়ম্ভুও বলে ওঠে, ওরা চাইছে কথাকলির কেসে বাড়ির কেউ যেন মুখ না খোলে। কিন্তু বাড়ির লোকে মুখ না খুললে এই কেস একটা ফালতু নেভার এন্ডিং রহস্যই থেকে যাবে। আর লালবাজার হয়ে যাবে অকর্মণ্যদের আঁতুড়ঘর। টেবিলের ওপর ঘুষি মেরে উঠে দাঁড়াল স্বয়ম্ভু। দুপাশে মাথা ঝাঁকাচ্ছে। কিচ্ছু ভাল্লাগছে না। জানলার পাশে গিয়ে দাঁড়াল স্বয়ম্ভু। বাইরে শহরের ভরদুপুরের আকাশটা বড্ড ঘোলাটে লাগছে। হঠাৎ পাশের ঘর থেকে ঝনঝন করে বেজে উঠল কারও একটা মোবাইল, ওম জয় জগদীশ হরে। কান মাথা ঝাঁ-ঝাঁ করে উঠল স্বয়ম্ভুর। বিরক্ত হয়ে বলে উঠল, উফফফ এটা কার? এই টেনশনের মধ্যেও শিবাঙ্গীর ঠোঁট ফুঁড়ে হাসি বেরিয়ে এল। বলল, শুভাগতর। নতুন ফোন নিয়েছে না। রিংটোনও পালটেছে।
হু! ভক্তির পরাকাষ্ঠা। ফোনেও আরতি হচ্ছে।
স্বয়ম্ভুর ফোনে টুং করে নোটিফিকেশন। মুখটা ব্যাজার করে আড়চোখে টেবিলে রাখা ফোনটাকে দেখে চোখ ফিরিয়ে নিতে গিয়েও ঘুরে তাকাল। ঠাকুরপুকুর থানার ওসি অভীক মুখার্জি কিছু ছবি পাঠিয়েছে। মোবাইলটা হাতে তুলে নোটিফিকেশনে ট্যাপ করতে না করতেই অভীকের ফোন।
হ্যাঁ অভীকবাবু বলুন।
এখুনি হোয়াটসঅ্যাপ চেক করুন। আমি ছবি পাঠিয়েছি।
হ্যাঁ সেটাই তো দেখতে গেছিলাম। কিন্তু আপনার ফোন চলে এল। বিষয় কী?
আজ সকালে ঝালংয়ের জলঢাকা রিভারে একটা নীল রঙের ব্যালেনো ভেসে উঠেছে।
হোয়াট?
হ্যাঁ স্যার। এ কদিন নর্থ বেঙ্গলে প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে। মেঘে চারপাশ কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না প্রায়। আজ সকালে একটু পরিষ্কার হতেই স্থানীয়রা পাহাড়ের ওপর থেকে দেখে। গাড়িটাকে উদ্ধার করেছে ওখানকার পুলিশ। তবে স্যার নম্বরটা মিলছে না। মনে হচ্ছে ফলস নম্বর প্লেট।
কোনো বডি পাওয়া গেছে?
না স্যার। মানুষের কোনো ক্ষতির কথা জানা যায়নি। এখনও তল্লাশি চলছে। মনে হচ্ছে ড্রাইভার জলের তোড়ে ভেসে গেছে।
ভেসে আর যাবেটা কোথায়? মারা গেলে ভেসে তো উঠবেই। যদি না পালায়।
স্যার অত উঁচু থেকে পড়ে কেউ কি বেঁচে থাকবে?
অত উঁচু থেকে গাড়ি পড়েছে মানেই যে ড্রাইভার পড়েছে এমনটা তো নাও হতে পারে। কেউ প্রমাণ লোপাটের জন্য গাড়িটাকে ঠেলেও তো নিচে ফেলে দিতে পারে।
হ্যাঁ স্যার। তা পারে।
আমার মন বলছে গাড়িটা খালিই ছিল। ঈশিতা আর তার পরিবার বেঁচে আছে। আর তারা আর এ দেশে নেই।
তাহলে?
ভুটানে পাচার হয়ে গেছে। ভারতের শেষ গ্রাম হল বিন্দু। সেখান থেকে ব্রিজ পার হলেই ভুটান। আচ্ছা অভীকবাবু, স্থানীয়রা কোনো শব্দ পায়নি কখনও?
জিজ্ঞেস করেছি স্যার। সেরকম কেউ কিছু নাকি ইনফরমেশন দেয়নি। কারণ এত বৃষ্টি হচ্ছে যখন তখন ধস নামছে। হয়তো সব সেরকমই ভেবেছে।
বুঝলাম, কিন্তু একবার ওদের খবর নিতে বলুন যে এ-রকম ধস নামার শব্দ শেষ কবে পেয়েছে। কারণ যতটুকু জানি পাহাড়ে এখনও বড়োসড়ো কোনো ধস নেমে দুর্ঘটনা ঘটেনি।
ওকে স্যার। আমি জানাচ্ছি।
ফোনটা কাটতেই উত্তেজিত হয়ে শিবাঙ্গীর প্রশ্ন, গাড়িটা পাওয়া গেছে? হোয়াটসঅ্যাপের ছবিগুলো দুজনেই দেখে। হুবহু কথাকলির গাড়ি।
শিবাঙ্গী, ইমিডিয়েট তুমি জলঢাকা পুলিশ স্টেশনের সঙ্গে কন্ট্যাক্ট করো। গাড়িটার চেসিস নম্বর আর ইঞ্জিন নম্বরটা চেক করতে বলো। কার নামে রেজিস্ট্রেশন আছে গাড়ির? নম্বর প্লেট পালটাতে পারে। এগুলো তো আর পালটাবে না। আমায় একটু বেরোতে হবে।
ওকে স্যার। বাট স্যার, আমরা কেউ যাব না নর্থ বেঙ্গলে?
লাভ নেই। নিজের চোখেই তো দেখলে গাড়িটার কী অবস্থা। তার ওপর জলঢাকার জল আর তুমুল বৃষ্টি। সব ধুয়ে মুছে সাফ।
.
সন্ধে নেমেছে। ট্রেনের দূরাগত হুইসল শোনা যাচ্ছে ঘন ঘন। ল্যাম্পপোস্টের আলোগুলো ঘাড় কাত করে প্যাট প্যাট করে পিচঢালা গলিটার ওপর সতর্ক দৃষ্টি রেখেছে। সেই দৃষ্টিপথ ধরেই ধীর পায়ে হেঁটে যাচ্ছে বৃদ্ধ মানুষটা। লম্বা, রোগা। গায়ে ঢোলা ছাই রঙের পাঞ্জাবি ও সাদা ধুতি। কালচে ময়লা পায়ে পুরোনো চামড়ার চটি। কাঁধে ঝুলছে কাপড়ের পুরোনো ঝোলা ব্যাগ। স্টিল ব্যান্ডের ঘড়িটা বাঁ-হাতের কবজির নিচে গলে পড়ছে। চুলগুলো সাদা হলেও টাকের দেখা এখনও নেই। ডিপ মেরুন রঙের চৌকো ফ্রেমের চশমায় ঢাকা চোখ। এলোপাথাড়ি ফুলঝাড়ু কাটলে ঝাড়ুর ফুলগুলো যেমন খোঁচা হয়ে থাকে গোঁফটা অনেকটা সেরকমই। ওপরের ঠোঁটটা প্রায় ঢেকে ফেলেছে। চার-পাঁচ পা চলছে আর একটু করে দাঁড়াচ্ছে। শ্বাসের কষ্ট আছে তাই একভাবে চলতে পারছে না। সেই ফাঁকে শহরের অলিগলিতে একটু চোখ চালিয়ে নিচ্ছে। আবার হাঁটছে। হাতে ধরা একটা কাগজ দেখে বাড়ির নম্বরগুলো মেলাচ্ছে। একটা পান-বিড়ির দোকানে জিজ্ঞেস করল সাতাশ নম্বর বাড়িটা কোথায়। লোকটি দেখিয়ে দিল, এই তো পাশেই। বৃদ্ধ লোকটি এগিয়ে গেল। দোতলা বাড়ি। রাস্তার ওপর থেকে একটা সরু গলি ঢুকে গেছে বাড়ির মেন গেটের দিকে। লোকটি সেদিকেই যাচ্ছিল। হঠাৎ কোথা থেকে কালো পোশাক পরা গাঁট্টাগোট্টা একটি লোক বীর হনুমানের মতো পথ আটকে দাঁড়াল।
কোথায় যাবেন মেসোমশাই?
এটা সাতাশ নম্বর বাড়ি তো?
হ্যাঁ। কাকে চাই?
তুমি কে ভাই?
আপনি কে সেটা আগে বলুন।
বৃদ্ধ মানুষটি ছেলেটিকে ভালো করে মেপে নিয়ে বলল, এটা স্বপন নন্দীর বাড়ি তো?
হ্যাঁ।
আমি স্বপনের মামা।
মামা?
ঠিক মামা নই। মামার বাল্যবন্ধু। ওদের ফ্যামিলি ফ্রেন্ড।
কিন্তু স্বপন তো নেই।
জানি বাবা! সেইজন্যেই এসেছি।
কী নাম আপনার?
অখিলবন্ধু ঘোষাল।
আইকার্ড আছে?
বৃদ্ধ লোকটি চশমার ফাঁক দিয়ে প্যাট প্যাট করে চেয়ে বলল, আইকার্ড! আমার ভাগনের বাড়িতে আসতে আইকার্ড লাগবে? এমন তো বাপের জন্মে ভাবিনি বাবা! তা তোমরা কি পুলিশের লোক?
ছেলেটি এবার ভুরু কুঁচকে বলল, সে জেনে আপনার কী?
আমি কে জেনে তোমারই বা কী? একেই হেঁপো রুগি। চার পা চলতে পাঁচবার দাঁড়াতে হয়। কোথায় একটু বসতে দেবে তা না রাস্তায় দাঁড় করিয়ে জেরা করছ? এদিকে পুলিশের লোকও নয়। তালে কে তুমি?
.
ছেলেটি বুঝল বুড়োর তেজ আছে ভালোই। আপাদমস্তক বয়স্ক লোকটাকে মেপে বলল, ঠিক আছে যান।
.
অখিলবন্ধু দরজায় বেল দিল। ছেলেটি কিন্তু পিছু ছাড়ল না। দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল।
দরজা খুলল একটি মেয়ে। বোধহয় এই বাড়িতেই কাজ করে। অখিলবন্ধু আবারও একই কথাগুলো রিপিট করল। মেয়েটি ভিতরে নিয়ে গিয়ে বসাল। কিছুক্ষণ পরে স্বপনের সদ্য বিধবা বউ বসার ঘরে এল। সাদা রঙের শাড়ি। সিঁথিতে এখনও লালচে আভা। ততোধিক চোখের সাদা অংশটা রক্তিম। কেঁদে কেঁদে যে চোখের নিচটা ফুলে গেছে সেটা বোঝাই যাচ্ছে।
আপনাকে তো ঠিক চিনতে পারলাম না।
চেনার কথাও নয় বউমা। আমার নাম অখিলবন্ধু ঘোষাল। স্বপনের মামার বাল্যকালের বন্ধু। স্বপনের মামার বাড়ির সম্পত্তিগত কারণে আমার আসা। স্বপনের মামাই আমায় এই দায়িত্ব দিয়েছেন।
কী বিষয় বলুন।
বাইরের কয়েকজন মহিলা বাড়িতে উপস্থিত রয়েছে দেখে অখিলবন্ধু আস্তে আস্তে বলল, একটু আলাদা কথা বললে ভালো হয়।
ঠিক আছে। আপনি ঘরে আসুন।
.
মহিলাটি একটু দ্বিধা নিয়েই অখিলবন্ধুকে ভিতরের ঘরে নিয়ে গেল। ঘরে ঢুকেই অখিল দরজাটি বন্ধ করে দিল। চমকে উঠল স্বপন নন্দীর স্ত্রী। এ কী দরজা বন্ধ করছেন কেন? অখিল ঘুরে তাকিয়ে বলল, সাবধানের মার নেই।
মানে?
আমি এসে বললাম স্বপনের মামার বন্ধু আর আপনি বিশ্বাস করে নিলেন? একবারও জিজ্ঞেস করলেন না মামার নামটা!
অখিলের গলা পালটে গেছে। শরীরের চলনবলনেও তরতাজা যুবকের ইঙ্গিত।
কে আপনি?
অখিলবন্ধু ঘোষাল নই।
পকেট থেকে আইকার্ড বের করে স্বপনের বউয়ের সামনে ধরে নিজের পরিচয় দেয় স্বয়ম্ভু সেন। স্বপনের স্ত্রী বিড়বিড় করে বলে ওঠে, আপনি গোয়েন্দা স্বয়ম্ভু সেন?
নিজের গোঁফটা একবার টেনে খুলে স্বয়ম্ভু বলে, স্বপনবাবুকে যখন বাড়িতে নিয়ে আসা হয় তখনও এসেছিলাম। গোঁফটা আবার লাগিয়ে নিয়ে স্বয়ম্ভু বলে, আমি জানতাম আপনাদের বাড়ির ওপর নজর রাখা হচ্ছে। আর সেটা পুলিশ নয়। সোমেন সরকারের সাঙ্গোপাঙ্গ। তাই তো?
.
ভয়ার্ত চোখ তুলে স্বয়ম্ভুর দিকে তাকায় মহিলা। কীসের মধ্যে দিয়ে যে যাচ্ছি সে শুধু আমিই জানি। ওদিকে আমার মেয়েটা মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। দেখতে গেলে নাকি পুলিশের পারমিশন লাগবে বলছে।
ওই ব্যবস্থাটা আমিই করেছি।
আপনি?
ইয়েস। আপনার কী মনে হয়, স্বপনবাবুর দুর্ঘটনাটা কি স্বাভাবিক?
প্রথমে সেটাই মনে হয়েছিল। কিন্তু পরে যখন আমাদের পারমিশন
ছাড়াই তড়িঘড়ি ওকে দাহ করে দেওয়ার ব্যবস্থা হল, দিনকালের সম্পাদকও কিচ্ছু করলেন না। বরং আমায় বোঝালেন এখন মেয়েটাকে বাঁচানোতে ফোকাস করুন। যে চলে গেছে তাকে নিয়ে আর ভেবে কী করবেন? তখনই বুঝেছিলাম, এটা খুন। কিন্তু ওরা আমার মেয়েটাকে কেন…
.
কেঁদে ফেলে স্বপনের স্ত্রী।
আমি পরে সব বলব। এখন সময় নেই। স্বপন নন্দীর খুন, মেঘা নন্দীকে চুপ করাতে কোমায় পাঠিয়ে দেওয়া এসবের কিনারা আমি করবই। শুধু আপনার সাহায্য চাই।
কী সাহায্য?
স্বপনবাবু আজ থেকে আট বছর আগে সোমেন সরকারকে নিয়ে ধারাবাহিকভাবে খবর করেছিলেন। শিশু পাচারের খবর। সেই খবরের কাগজগুলো আমার চাই। দিনকালের অফিসে গেলে ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে যেত। তাই বাধ্য হয়ে এই সময়ে আপনাকে বিরক্ত করতে বাধ্য হচ্ছি।
বড্ড দেরি করে ফেলেছেন। ওকে যখন নিয়ে আসা হল বাড়িতে তখন সবাই নিচেই ব্যস্ত ছিল। আমার তো কোনো হুঁশই ছিল না। সন্ধেবেলা সব মিটিয়ে যখন ওর স্টাডিরুমে ঢুকি তখন মুহূর্তের জন্য বুকটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে। ও খুব গোছানো ছিল। একটা বই এদিক থেকে ওদিক হলে ও ভীষণ রেগে যেত। সেখানে ওর বই, ফাইল সব ওলটপালট। ও ওর নিজের সব প্রকাশিত লেখা ফাইলবন্দি করে রাখত। মেঘা মাঝেমধ্যে ওই ফাইলগুলো নিয়ে পড়ত। ও তো বড্ড বাবার ন্যাওটা ছিল।
.
স্বয়ম্ভু উত্তেজিত হয়ে প্রশ্ন করে, লেখার ফাইলগুলো কোথায়?
কিছু আছে। কিছু নেই। বিশেষ করে সোমেন সরকারের বিরুদ্ধে লেখাগুলোই উধাও। ঠিক সেই মুহূর্ত থেকে আরও বেশি করে বুঝতে পারি ওর চলে যাওয়াটা অস্বাভাবিক।
ওরা তো বাইরেও পাহারা দিচ্ছে। আপনি জানেন?
জানি। তবে দিনকালের এডিটর নিজে ফোন করে আমায় বলেছে উনি নাকি পাহারায় রেখেছেন। কিন্তু আমি জানি ওরা আনন্দময়দার লোক নয়। ওরা সোমেন সরকারের চ্যালা। মানুষটাই চলে গেছে স্বয়ম্ভুবাবু। আর কিছু চাই না। শুধু আমার মেয়েটা বেঁচে যাক।
মহিলা হাতজোড় করে বলে, আপনি আর আসবেন না। আর এমন কিছু করবেন না যাতে আমি আমার মেয়েটাকেও হারাই। এসবের থেকে মুক্তি চাই। প্লিজ…! হাতজোড় করে কেঁদে ফেলে মিসেস স্বপন নন্দী।
মাথার ভিতর তীব্র ভাঙচুর। স্বয়ম্ভু কূল হারাচ্ছে ধীরে ধীরে। এত মেক আপ, এত অভিনয়, সব বৃথা! বাধ্য হয় হাতজোড় করে ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে। কিন্তু কী মনে হওয়াতে আবার থমকায়। ম্যাডাম একটা রিকোয়েস্ট! মহিলা চোখ ভরা জল নিয়ে তাকায়। স্বয়ম্ভু বলে, এতদূর যখন এসেইছি আমি একবার স্বপনবাবুর ঘরটা ঘুরে দেখতে চাই। প্লিজ। ইটস মাই রিকোয়েস্ট।
.
দোতলার স্টাডিরুমের আলোটা জ্বলে ওঠে। দেয়াল জুড়ে অজস্র বই। ঠিক তার মাঝখানে ছোটো একটা টেবিল। স্টাডি ল্যাম্পটা ঘাড় কাত করে টেবিলের ওপর এমনভাবে ঝুঁকে আছে মনে হচ্ছে কেউ যেন খানিক আগে আলো জ্বালিয়ে কাজ করছিল। স্বয়ম্ভু বই ঘটিল, ফাইল দেখল। অজস্র বইয়ের খাঁজে খাঁজে চোখ চালিয়ে নিল শ্যেনদৃষ্টিতে। স্বয়ম্ভু প্রশ্ন করে, সেদিনের পর এই ঘর পরিষ্কার করেছেন কী?
সুতপা ঝাঁট দিয়ে মুছেছে
চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। কোনো চিহ্নই তাহলে আর নেই। এই পাহাড়প্রমাণ বইয়ের মধ্যে থেকে কোনো সূত্র বের করা খড়ের গাদায় সূচ খোঁজার মতো। তবু যে কটা ফাইল আছে সব কটা ঘেঁটে দেখতে থাকে। সেই সময় শিবাঙ্গীর ফোন।
বলো।
জলঢাকা পুলিশ স্টেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। ওরা চেসিস নম্বর আর ইঞ্জিনের নম্বরটা বের করছে।
হুম। কোনো মিডিয়ায় খবর হয়েছে কি?
এখনও পর্যন্ত না। ও আরেকটা কথা স্যার। কিছু অনলাইন পোর্টাল স্বপন নন্দীর খবরটা করেছে। মেঘার কথাও লিখেছে। সেখান থেকেই মেঘার ফেসবুক লিঙ্ক পেলাম। দেখলাম, মেঘা ওর বাবার বেশ কিছু লেখা স্ক্যান করে ফেসবুকে দিয়েছে। যেগুলো দিনকালে বেরিয়েছিল। একটা ফোল্ডারই আছে বাবার লেখা নামের। বেশ অবসেসড ছিল বাবার লেখার প্রতি।
শিবাঙ্গীর কথা শুনে স্বয়ম্ভুর শিরদাঁড়া দিয়ে একটা গরম স্রোত ব্রহ্মতালুর দিকে উঠতে শুরু করেছে। ঝট করে প্রশ্ন করে স্বয়ম্ভু, ওগুলো ঘেঁটে ভালো করে দেখো তো সোমেন সরকারকে নিয়ে কোনো লেখা আছে কিনা।
দেখেছি স্যার। সেসব ব্যাপারে কিছু নেই।
আচ্ছা। রাখছি এখন
ফোনটা কেটেই স্বয়ম্ভু প্রশ্ন করে, আচ্ছা মিসেস…!
মধুজা।
রাইট। বলছি আপনার মেয়ের ফোনটা কোথায়?
আমার কাছে। আলমারিতে তোলা।
আর মেয়ের কোনো ল্যাপটপ, হার্ড ডিস্ক কিছু আছে?
আছে। ওর ঘরে। কিন্তু সেগুলো কী হবে?
যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখো তাই। পাইলেও পাইতে পারো অমূল্য রতন।
.
গাছতলার মোড়ে অটো থেকে নেমে ভাড়া মেটাতে মেটাতে আড়চোখে শিবাঙ্গী খেয়াল করল এতক্ষণ ধরে যে বাইকটা অটোর পিছনে পিছনে আসছিল সেটা গাছতলার বাজার পেরিয়ে গলিতে ঢুকে গেল। সেই চিঠিটা আসার পর থেকে শিবাঙ্গীর মনে সবসময়ের জন্য একটা সন্দেহ ঢুকে গেছে। কেউ যেন তাকে ফলো করছে। নিজের মনকে প্রবোধ দিয়ে রাস্তা পেরিয়ে ও নিজেও বাজারের দিকে ঢুকে গেল। হাঁটতে হাঁটতে ডানদিকের গলিতে বাঁক নিলেই বাজারটা শেষ। কয়েক হাত অন্তর ল্যাম্পপোস্টের আলো। বেশ কিছুটা এগোলে আবার বাঁ-হাতে বাঁক। ডান হাতে শান্তি সমিতির খেলার মাঠ। ঠিক সেই জায়গাটাতে আসতেই আবার বাইকের আওয়াজটা পেল শিবাঙ্গী। পিছনেই আছে। নাহ! ভুল কিছু ভাবেনি এবার। বাইক কখনও মানুষের হাঁটার গতিবেগে চলে না। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে বাইকটা শিবাঙ্গীকেই ফলো করছে। এরা তার মানে ওর বাড়িটাও চেনে। কিন্তু ওদিকে গেলে বাবা-মায়ের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। বাইক আরোহীদুটোকে গুলিয়ে দেওয়ার জন্য দুম করে বাঁ-দিকের রাস্তাটা ধরে শিবাঙ্গী। অথচ ওর ডান দিকে যাওয়ার কথা। এ পাশে বেশ কিছু দোকানপাট আছে। রাত পর্যন্ত খোলাও থাকে। পিঠের ব্যাগটাকে বুকের সামনে নিয়ে চলে এল। ওটার ভিতরেই রিভলবার রাখা। ইউনিফর্ম পরা নেই বলে সেটাকে আর কোমরে রাখতে পারেনি। বেশ কয়েক পা এগিয়ে দেখল কীভাবে যেন দোকানগুলো আজ তাড়াতাড়ি বন্ধ হয়ে গেছে। ঠিক তখনই মনে পড়ল আজ রবিবার দুপুরের পর এ চত্বরে দোকান আর খোলে না। পুলিশ হলেও বুকটা ঢিবঢিব করছে শিবাঙ্গীর। হাঁটার গতি বাড়াল। কোনদিকে চলা প্রয়োজন সেই বোধটা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ বাইক দুটো এক্কেবারে গায়ের কাছে এসে পড়ল।
ও ম্যাডাম, চুলকে দেব নাকিইইই?
বাইক থেকে একটি ছেলে আওয়াজ দিল। এরপর অন্য আরেকটার গলা, স্যালিকলে কাজ হচ্ছে না? দুজনেই হেসে উঠল। শিবাঙ্গী ব্যাগটাকে চেপে ধরে জোর পায়ে এগিয়ে চলেছে। কোনো পাত্তাই দিচ্ছে না। আবারও সেই চিঠির শেষ লাইনটা মনে চলকে ওঠে, নেশার পিছে ছুটলে বৃথা পুড়বে জেনো মুখ। ওরা ওর মুখ পোড়াবার আগেই রিভলবারটা বের করে ঘুরে দাঁড়াতে হবে শিবাঙ্গীকে। আস্তে আস্তে ব্যাগের চেনটা খুলছে শিবাঙ্গী। দুম করে একটা হাত শিবাঙ্গীর পিঠের ব্যাগটা টেনে ধরল। শিবাঙ্গী বাধ্য হল দাঁড়িয়ে পড়তে। গর্জে উঠল শিবাঙ্গী, কী অসভ্যতা হচ্ছে? ব্যাগটা ছাড়ো।
ছাড়ব বলে তো ধরিনি মামনি।
ব্যাগটা একদিকে শিবাঙ্গীর মুষ্টিতে ধরা। অন্যদিকে বাইকের পিছনে যে ছেলেটি বসে তার হাতের মুঠোয় ব্যাগের কিছুটা। শিবাঙ্গীকে ঘিরে বাইকটা গোল করে ঘুরছে।
ব্যাগটা ছাড় নইলে ফল ভালো হবে না।
ওওও মাআআ! পুলিশ দিদিমণি আবার বকছে আমাদের। হাহাহাহাহা!
আজ তোমায় না চুলকে আমরা যাব না মামনি। চুলকুনি তোমার খুব বেড়েছে। ওই হারামিটার পোঁদে পোঁদে ঘুরে এম.এল.এ-র মেয়েকে উদ্ধার করবে?
রাস্তা থেকে সরে যা নইলে খাল খিঁচে নেব।
একচুলও সরব না। কী করবি কর।
ছেলেগুলো বনবন করে ঘুরেই চলেছে। শিবাঙ্গীর মাথাটা অল্প অল্প টাল খাচ্ছে।
গাঁড় খুলে হাতে ধরিয়ে দেব রে মাগি।
কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে শিবাঙ্গীর হাত-পায়ের শিরা উপশিরা বেয়ে ফোর ফরটি ভোল্টে তড়িৎ ছুটে যায়। ব্রেনে আঘাত করতে এক সেকেন্ডেরও কম সময় লাগে। প্রতিবর্ত ক্রিয়ায় শিবাঙ্গীর ডান পা-টা সোজা গিয়ে পড়ে বাইক চালকের হাঁটুর ওপর। বাইকসমেত ছিটকে পড়ে দুজনেই। ব্যাগটা চলে আসে শিবাঙ্গীর হাতে। পালটা আক্রমণ করতে বাইকের পিছনে বসা ছেলেটি সবার আগে উঠে ঘুষি চালায়। কিন্তু তার আগেই তার দু-পায়ের ফাঁকে শিবাঙ্গীর আরও একটা লাথি গিয়ে আঘাত করে। শরীরটা কুঁচকে রাস্তায় বসে পড়ে। ততক্ষণে বাইকচালক ছেলেটি উঠে ঘুষি পাকিয়ে লাফ দিয়ে পড়ে শিবাঙ্গীর বুকের ওপর। শিবাঙ্গী সমেত রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে ছেলেটি। কিন্তু শিবাঙ্গীর বুকের ওপর চেপে মুখ লক্ষ্য করে সপাটে একটা ঘুষি চালায় ছেলেটি। শিবাঙ্গীর মাথাটা ডান দিকে বেঁকে যায়। আবারও একটা ঘুষি পড়তে শিবাঙ্গীও ডান পা-টা তুলে হাঁটু দিয়ে ছেলেটির মেরুদণ্ড বরাবর উলটো করে লাথি মারে। ছেলেটি ডিগবাজি খেয়ে দু-ধাপ গড়িয়ে যায়। শিবাঙ্গী উঠে দাঁড়াতেই আরেকটি ছেলে সোজা পেটে লাথি মারে শিবাঙ্গীর। পড়ে না। শুধু কয়েক পা পিছিয়ে যায়। পলকের মধ্যে নিজের শরীরটাকে ডান পায়ের ওপর ভর করে শাঁ করে ঘুরে বাঁ-পা দিয়ে ব্যাকফুটে সজোরে লাথি মারে। ছেলেটির মুখে গিয়ে সেই লাথি পড়তেই মুখ ঘুরিয়ে মাটিতে পড়ে। ঠোঁটের কোণ ফেটে যায়। আরও বারকয়েক এমনই ধস্তাধস্তি চলার পরে একটি ছেলে শিবাঙ্গীর শার্টের হাতাটা টেনে ছিঁড়ে দেয়। সেদিকে নজর দিতে গিয়ে আরেকটা ছেলে শিবাঙ্গীর দুটো হাত পিছন দিকে টেনে নিজের দুটো হাতের মধ্যে পেঁচিয়ে ধরে রাখে। শিবাঙ্গী শরীরটাকে গায়ের জোরে ঝাঁকিয়েও ছাড়াতে পারে না। অন্যটা রক্তঝরা ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে রাস্তার মধ্যেই শিবাঙ্গীর বুকের ওপর নির্লজ্জের মতো হাত বোলাতে থাকে। শিবাঙ্গী লজ্জায় রাগে চিৎকার করতে থাকে। পিছনের ছেলেটিও হাত দুটো ধরে জিভ বার করে শিবাঙ্গীর কানে বোলাতে থাকে। ঘেন্নায় গা গুলিয়ে উঠতে থাকে শিবাঙ্গীর। অপমানে কেঁদে ফেলে। কিন্তু কোনো তৃতীয় ব্যক্তি এ তল্লাট মাড়ায় না। ছেলেটি বুকে হাত বোলাতে বোলাতে শিবাঙ্গীর শার্টের বোতাম খুলতে থাকে একটা একটা করে। ঠিক সেই মুহূর্তে একটা লাঠির ঘা এসে জানোয়ারটার মাথার পিছনে পড়ে। আর্তনাদ করে ওঠে ছেলেটি। শিবাঙ্গীকে যে ধরে রেখেছিল সেও কিছুক্ষণের জন্য ব্যোমকে যায়। মাথায় হাত দিয়ে ছেলেটি মাটিতে বসে পড়তেই শিবাঙ্গী দেখে সেই ফরসা রাজপুত্রের মতো ছেলেটি একটা লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে। রাজারাম ব্যানার্জি। এই নীরব মুহূর্তটাকেই কাজে লাগায় শিবাঙ্গী। ডান পায়ের বুট দিয়ে পিছনে হাত ধরে থাকা ছেলেটির হাঁটুতে আবার মারে। খট করে একটা শব্দ হয় ছেলেটির পায়ে। যন্ত্রণায় টলে যায়। ঘুরিয়ে আরও একটার পর একটা ঘা দিতে থাকে শিবাঙ্গী। ওদিকে রাজারামও আরেকটির দফারফা করে ছাড়ে একের পর এক লাঠির ঘায়ে। ওদিকে শিবাঙ্গীকে ঘুরিয়ে বাইকচালক সর্বশক্তি এক করে ঘুষি চালায়। শিবাঙ্গী বেশ খানিকটা দূরে ছিটকে যেতে একটি ছেলে চিৎকার করে বলে, মারুফ স্টার্ট দে। কোনোরকমে বাইকটা তুলে স্টার্ট দেয় বাইকচালক মারুফ। ফাঁক বেয়ে অন্যটিও সেই বাইকে কোনোরকমে চেপে বসে দুজনেই ভোঁ-ভা। রাজারাম লাঠি তুলে ধাওয়া করে দাঁড়িয়ে পড়ে। বাইকের পিছনে দৌড়োনোটা বোকামো।
.
ঠাকুরঘরে খাবার এনেছিস কেন?
রাগ দেখিয়েই কথাটা বাড়ির রাঁধুনি মতিকে শোনাল কস্তুরী। মতি নরম সুরে বলল, গেল বুধবার থেকে কিচ্ছুটি দাঁতে কাটোনি। মাঝেমধ্যে কয়েকটা ফল ছাড়া। এভাবে চললে তো তুমি বিছানা নেবে বউদি।
খাবারটা নিয়ে যা।
এমন কোরো না গো। আমার কথাটাও ভাবো একটু।
কস্তুরী অবাক হয়ে কৃষ্ণের মূর্তির দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে মতির দিকে তাকাল। তোর আবার কী হল?
মেয়েটা ফোন করেছিল। খালি কাঁদছে। বলছে কবে বাড়ি আসবে। ন বছরের মেয়েটা মাকে ছাড়া একদিনের জন্যেও থাকেনি। সেখানে বুধ, বিদ্যুত, শুক্কুর, শনি গিয়ে আজ রোব।
.
হাতের কর গুণে গুণে বলল মতি। আজ পাঁচদিন হয়ে গেল। বদ্দাবাবু বাড়ি যেতে দেয়নি। বাইরে বেরোলেই নাকি পুলিশ ধরে উলটোপালটা জেরা করবে। ঈশ্বরও বাড়ি যেতে পাচ্ছে না। কেবল ভগবানদা বাড়ি যায়। ভুলে যাওয়া রোগ তো। তাই ওকে নিয়ে নাকি টেনশন নেই। আমরা ছাপোষা মানুষ। আমরা এসবের কী জানি বলো তো? আমাদের ধরেবেঁধে রেখেছে কেন বদ্দাবাবু? সেদিন ওই গোয়েন্দাটাকেও তো তোমার কাছে আসতে দিলে না। বললে তোমার নাকি শরীর খারাপ।
কস্তুরী নির্বাক। শুধু দুচোখের মাঝে বিস্ময়ের ভাঁজ ফেলে আবারও কৃষ্ণের দিকে তাকাল। ওরা ভয় পাচ্ছে মতি। মতি কান বাড়িয়ে শোনার চেষ্টা করল কস্তুরীর কথা। কী বিড়বিড় করছ?
কিচ্ছু না। আমি খেলেও তোকে ওরা বাড়ি যেতে দেবে না রে
সে কী! তাহলে আমার মেয়েটা!
কাঁদো কাঁদো হয়ে এল মতির গলা। মুখের পেশিগুলো চোখের কোল ঠেলে নড়ে উঠল।
তুমি বদ্দাকে বোঝাও না বউদি। কলিদিদি ঠিক ফিরে আসবে। কলিদিদি কত ইস্মার্ট। ওর ক্ষতি কে করবে? তুমি তো দিনরাত ঠাকুরকে ডাকছ। মায়ের ডাক বিফলে যায় না গো।
.
কস্তুরী অঝোরে কেঁদে লুটিয়ে পড়ে মতির বুকে। মতিও দুহাতে জড়িয়ে ধরে অসহায় কস্তুরীকে। কেঁদো না বউদি। মায়ের চোখের জল সন্তানের ক্ষতি করে। মনে জোর রাখো। এক মায়ের কান্না ঠাকুর ঠিক শুনবে। নিজের মেয়ের মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠতে মতিও অঝোরে কেঁদে ফেলে।
আমি মা নই। আমার মা হওয়ার কোনো যোগ্যতা নেই। আমি মা নই। কস্তুরী যেন প্রতি মুহূর্তে ভেঙেচুরে যাচ্ছে।
কী যে বলো। তুমি কত সুন্দর করে কলিপিসির খেয়াল রাখতে সে কি আমরা দেখিনি গো? কলিদিদি তোমার শত্রুর ভাষত সে তো…
বলতে গিয়েও থেমে গেল মতি। ঠাকুরঘরের দরজায় ঈশ্বর এসে দাঁড়িয়েছে। মতি যেন নিজে থেকেই কৈফিয়ত দিয়ে উঠল, খাওয়াতে এসেছিলাম। না খেলে কী করে চলবে বলো দিকি।
মতির কথার ধরন পালটে যেতে কস্তুরীর সন্দেহ হয়। সেও একবার মতির মুখের দিকে তাকিয়ে দরজার বাইরে তাকাল। অশ্রুতে টইটুম্বুর শোকবিহ্বল চোখ দুটোতে হঠাৎ করেই আগুন জ্বলে উঠল। মাটি ছেড়ে আঁচল সামলে উঠে দাঁড়িয়ে ঈশ্বরের দিকে এগিয়ে গেল কস্তুরী। ঈশ্বরের চোখের দিকে চেয়ে দাঁতে দাঁত চিপে বলল, নজর রাখতে এসেছিস? নজর? শান্ত গলায় ঈশ্বরের উত্তর, দাদা বলল খেয়ে নিতে।
তোর দাদাকে গিয়ে বল গাণ্ডেপিণ্ডে গিলতে।
বলেই মুখের ওপর দড়াম শব্দে ঠাকুরঘরের দরজাটা বন্ধ করে দিল। মতির বুকটা ভয়ে ভারী হয়ে এল। কস্তুরীর এমন বজ্রগম্ভীর রূপ এর আগে কেউ কখনও দেখেনি। সবসময় সবাই যা বলেছে মাথা পেতে মেনে নিয়েছে। কিন্তু আজ…
.
কাপড়ের মধ্যে বরফ বেঁধে শিবাঙ্গীর হাতে সদ্য পড়া কালশিটের ওপর থুপে থুপে রাখছে রাজারাম। জ্বালা করে উঠছে হাতটা। মুচড়ে ধরেছিল শয়তানটা। বেশ যন্ত্রণা হচ্ছে। টুপটাপ জল পড়ছে শিবাঙ্গীর চোখ থেকে। রাজারাম বলল, থানায় যেতে গিয়ে দেরি হয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে যদি বরফটা দেওয়া যেত… লাগছে না খুব? জল গড়িয়ে চোখের কোলটা পিচ্ছিল করে তুলেছে শিবাঙ্গীর। যত না শরীরের ব্যথার, তার চেয়ে বেশি সম্মানে আঘাত লাগার ব্যথায় ডুকরে উঠছে শিবাঙ্গী। তাই কোথায় লাগছে শিবাঙ্গী কীভাবে বলবে রাজারামকে? বরফ মালিশ করতে করতে চোখ তুলে শিবাঙ্গীর দিকে একদৃষ্টে চেয়ে আছে রাজারাম।
পুলিশরাও তাহলে কাঁদে।
লাল টকটকে চোখটা তুলে রাজারামের মুখের দিকে তাকাল শিবাঙ্গী। পুলিশরা কি মানুষ হয় না? তাদের শরীর নেই? তাদের ব্যথা লাগে না? নাকি তাদের আত্মসম্মান বলে কিচ্ছু নেই?
আপনি কি হিস্ট্রির স্টুডেন্ট ছিলেন?
এই অবস্থাতেও ভুরু বেঁকিয়ে শিবাঙ্গী বলে, কেন?
না একটা ছোট্ট প্রশ্নের এত বড়ো উত্তর দিলেন কিনা!
শিবাঙ্গী হাত সরিয়ে বলে উঠল, আমায় আপনার বাড়ি না আনলেই পারতেন। শুধু শুধু ঝামেলায় জড়ালেন।
এ কি রেগে গেলেন নাকি? আমি তো জাস্ট…
মজা করছিলেন। তাই তো?
না। আপনার মনটাকে একটু হালকা করার চেষ্টা করছিলাম। আচ্ছা, আপনার বাবা-মা যদি এই অবস্থায় আপনাকে দেখত ভালো হত কি? যাক গে, আরেকটু বরফ লাগালে ব্যথাটা সেরে যেত। কালশিটেটাও মিলিয়ে যেত।
এ কালশিটে মেলাবে না রাজারামবাবু।
প্লিজ ডোন্ট সে বাবু। অনলি রাজারাম। চাইলে রঘুপতি রাঘব অ্যাড করে নিতে পারেন।
খুব শখ না ভগবান হওয়ার?
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে রাজারাম বলল, বুঝলাম, পুলিশরা মনুষ্য প্রজাতির হইলেও তাহারা রামগরুড়ের ছানা উপপ্রজাতির অন্তর্ভুক্ত! সরি।
.
এবার বেশ লজ্জায় পড়ল শিবাঙ্গী। বেশ কিছুক্ষণ ধরেই খুব রূঢ় আচরণ করছে রাজারামের সঙ্গে। যেটা এক্কেবারেই উচিত নয়। আজ ঠিক সময়ে এই ছেলেটি না এসে পড়লে শিবাঙ্গীর যে কী ভয়ানক পরিস্থিতি করে ছাড়ত ছেলে দুটো তা ভাবলেই শিউরে উঠছে।
অ্যাম সরি। আসলে আমার মাথার ঠিক নেই। আজ আপনি না এলে কী যে হত! থ্যাংক ইউ সো মাচ রাজারাম।
.
চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে মাথাটাকে ঈষৎ হেলিয়ে শিবাঙ্গীর কথাগুলো শুনল রাজারাম। তারপর বলল, এবার কিন্তু আপনি আমায় ভগবান বানিয়ে দিচ্ছেন।
ফিক করে হেসে ফেলল শিবাঙ্গী। সঙ্গে সঙ্গে হাতে তালি দিয়ে রাজারাম বলে উঠল, এই তো, এটাই তো চাইছিলাম। এই হাসিটাই দরকার ছিল। তা না তখন থেকে খালি ফ্যাচ ফ্যাচ ফ্যাচ ফ্যাচ! আবার চেয়ারে বসে মুখটাকে শিবাঙ্গীর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে উঠল, কীসের দুঃখ আপনার? ওই কটা লোক আপনার শরীরে হাত দিয়েছে বলে আপনার সম্মান ধুলোয় লুটিয়ে গেল? এত ঠুনকো সম্মান নাকি? এসব ভাববেন না ম্যাডাম। ওই জানোয়ারগুলোকে খুঁজে বের করে উপযুক্ত শাস্তি দিন। চলুন, অনেক রাত স্থল। আপনাকে বাড়ি ছেড়ে দিয়ে আসি।
আপনি যাবেন?
আপনি কি অন্য কাউকে ডাকবেন নিয়ে যাওয়ার জন্য?
সেরকম কেউ নেই।
তাহলে অগত্যা আমাকেই…
আপনার শার্টটা তো আমার গায়েই রয়ে গেল।
একটা নতুন কিনে দেবেন। ব্র্যান্ডেড।
ব্র্যান্ডেড শার্ট ছাড়া পরেন না বুঝি?
রাজারাম আলতো হাসে। বলে, সামান্য একটা নেমপ্লেট ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানিতে কাজ করি। বাড়িভাড়া দিয়ে খেয়েদেয়ে ব্র্যান্ডেড শার্ট আর কীভাবে পরি বলুন? কিন্তু কারও থেকে যখন ফোকোটে কিছু পাওয়ার থাকে তখন আমি টাটা বিড়লা।
.
শিবাঙ্গী খেয়াল করল গায়ের ব্যথাটা আর তেমন জানান দিচ্ছে না। রাজারামের সঙ্গে বাড়ির দিকে বেরিয়ে পড়ল। রাজারাম বাড়ির সামনে থেকেই ফিরে আসতে চেয়েছিল। শিবাঙ্গীই ভদ্রতা করে বলল, এক কাপ চা অন্তত খেয়ে যান।
দেখুন পুলিশ মেয়েকে একজন বাড়ি বয়ে পৌঁছে দিচ্ছে, বয়স্ক বাবা- মায়ের জন্য কিন্তু এটা যথেষ্ট শকিং। তাই আজ কী ঘটেছে তাদেরকে জানাবেন না।
আর আমার গায়ের শার্টটা? মা তো ঠিক বুঝতে পারবে।
বলবেন খোঁচা লেগে আপনারটা ছিঁড়ে গিয়েছিল বলে একটা কিনে নিয়েছেন। যদিও এটা পুরোনো।
নিজের হাতে ধরা শিবাঙ্গীর ছেঁড়া শার্টের প্যাকেটটা দেখিয়ে রাজারাম বলল, আর এই শার্টটা বরং আমার কাছেই থাক।
এ মা! এটা রেখে আপনি কী করবেন?
আমার বীরত্বের চিহ্ন।
কথাটা বেশ গলা ফুলিয়ে বলতেই শিবাঙ্গী আর রাজারাম দুজনেই হেসে ফেলল।
.
