কথাকলি কোথায় – ১৫

১৫

সেদিন ভগবানের বাড়ি থেকে বৃদ্ধ রাজমিস্ত্রি নিরঞ্জন বেরিয়ে যাওয়ার পরেই স্বয়ম্ভুও দ্রুত পায়ে বেরিয়ে যায়। খানিকটা গিয়ে রাস্তার মধ্যেই পাকড়াও করে নিরঞ্জনকে। জিজ্ঞেস করে, আপনি ভগবান দাসকে কার মেয়ে হারিয়ে যাওয়ার কথা বলছিলেন? নিরঞ্জন বলল, আমাদের এম.এল.এ সাহেব, সোমেন সরকার। কৃষ্ণ পুজোর আগের দিনই মেয়েটা হারিয়ে গেল না, সে-কথাই বলছি।

কৃষ্ণ পুজো?

হ্যাঁ। বাবা সে-কথা আর বলবেন না। তখন মাঝরাত। ওষুধ খেয়ে ঘুমোচ্ছি। হঠাৎ ভূপেনবাবু এসে হাজির। বললেন তাঁর দাদা নাকি এক্ষুনি ডেকেছেন। সোমেনবাবুর স্ত্রী নাকি পরশু দিনই নতুন কৃষ্ণঠাকুর প্রতিষ্ঠা করবেন। তার জন্য একটা বেদির দরকার। আজ রাতেই বানিয়ে দিতে হবে। নইলে কাল সিমেন্ট শুকোবে না। সাজানোও যাবে না।

কবে? কোনদিন রাতে?

স্বয়ম্ভু প্রশ্ন করে।

ওই তো, গত মঙ্গলবার। তারপর বিদ্যুতবারই শুনি সোমেনবাবুর মেয়ে নিখোঁজ। কী কাণ্ড বলুন দিকি।

মানে আপনি মঙ্গলবার মাঝরাতে সোমেনবাবুর বাড়ি গিয়ে ঠাকুরঘরে

বেদি বানালেন?

হ্যাঁ।

ইট, বালি, সিমেন্ট পেলেন কোথায়?

ও মা! আমার নিজেরই তো দোকান আছে সিমেন্টের। ইট, বালি সবই আমার ঘরের পাশের গোডাউনে রাখা থাকে। ভূপেনবাবুই ওদের দুজন ছেলেকে দিয়ে ওনার গাড়ির ডিকিতে তুলে দিলেন।

গাড়ির ডিকিতে ধরে গেল সব?

না না, উনি তিনবার আসা যাওয়া করলেন।

কাজ শেষ হল কখন?

তা ভোর রাত হয়ে গেসল। আসলে মাঝে ওই ঘণ্টাখানেকের জন্য আমায় ঠাকুরঘর থেকে বেরিয়ে যেতে হয়েছিল। নিচে বসেছিলাম।

কেন?

পুরোনো যে ঠাকুরের মূর্তি ছিল ওটা নাকি সবার চোখের আড়ালে ওই বেদির মধ্যে গেঁথে দিতে হবে। আর সেটা বাড়ির মালিক আর মালকিনকেই করতে হবে। কেউ দেখলে চলবে না। তা কেমন করে ইটের পরে ইট গেঁথে সিমেন্ট লাগায় সেটা দেখিয়ে দিলাম। কারণ মাঝখানটা তো ওদের দুজনকেই কত্তে হবে। আমি তো নিচে সোফায় বসে ঘুমিয়েই পড়েছিলাম। ভূপেনবাবুই ডেকে দিলেন। তারপর গিয়ে বাকিটা আমি করে দিলাম।

***

এতটা বলে স্বয়ম্ভু শ্বাস নেয় দুবার। তারপর বলে, আমার মন ভয়ানক কিছুর সংকেত পায়। ভানুপ্রিয়াকে যখন কথার ছবি দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কথাকলিকে চেনেন? তিনি তখন কেঁদে ফেললেন। বললাম, আপনি জানেন এই মেয়েটা কোথায়? তখন উনি গীতগোবিন্দের থেকে দুটো লাইন গান। স্মরগরল খণ্ডনং মম শিরসি মণ্ডনং, দেহি পদপল্লবমুদারম। তারপর ভানুপ্রিয়া বললেন, যা এবার খুঁজে বের করে নে। কস্তুরীদেবী বললেন কৃষ্ণ জানেন আর ভানুপ্রিয়া বললেন, দেহি পদপল্লবমুদারম। অর্থাৎ আমার মাথায় তোমার পা রাখো। মানে কৃষ্ণের পা কথাকলির মাথায়।

.

ওহ শিট!

আঁতকে উঠল শিবাঙ্গী।

তুমি কী বলছ জানো?

সীতাংশু তেড়ে উঠল।

মানেটা কী?

শুভঙ্কর আঁতকে ওঠে।

.

কস্তুরী হাউ হাউ করে কাঁদতে কাঁদতে সিঁড়িতে লুটিয়ে পড়ল। সারা বাড়িময় সে কান্নার হাহাকার দেয়ালগুলো ফাটিয়ে দিতে চাইল। ভানুপ্রিয়াও অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে এগিয়ে এল সোমেনের দিকে। বলল, বাবা হতে চেয়েছিলে সোমেন সরকার। নিঃসন্তান স্ত্রীর হাতে আমার নাড়ি ছেঁড়া ধন তুলে দিতে অনুরোধ করেছিলে। বলেছিলে মাথায় করে রাখব। আমারও লোড হয়েছিল। মেয়েটা একটা সুন্দর পরিবেশ পাবে। বাপ-মায়ের পরিচয় পাবে। ওকে অন্তত পতিতালয়ের ভাত খেতে হবে না। ভুল করেছিলাম। আর দরকার নেই তার। আমি আমার মেয়েকে বেশ্যালয়ের ভাতই খাওয়াব। তবু তো সে বেঁচে থাকবে। সোমেনের মুখের সামনে দুহাত বাড়িয়ে দেয় ভানুপ্রিয়া। ফিরিয়ে দাও। ফিরিয়ে দাও আমার মেয়েটাকে। ফিরিয়ে দেএএএ হারামির বাচ্চা, আমার মেয়েটাকে ফিরিয়ে দেএএএএ!

.

সোমেন সরকার ডান হাত দিয়ে বাঁ-দিকের বুকটা চেপে ধরে দরদর করে ঘামতে থাকে। ঝাপসা হয়ে আসে চোখ। ফিরে ফিরে আসছে সেই অভিশপ্ত দিনটা।

.

প্রায় হুমড়ি খেয়ে ভিতরে ঢুকে এল সোমেন। কস্তুরী আবার দরজাটা বন্ধ করে দিল।

কলি কোথায়? বাড়ি ফেরেনি?

উত্তেজিত অথচ নিচু গলায় প্রশ্ন করল সোমেন। কস্তুরী চোখ তুলে তাকাল না। সোমেন আবার প্রশ্ন করল, কলি কোথায় কস্তুরী? রাত হয়েছে তো। বাড়ি ফেরেনি এখনও? কস্তুরী এবারেও নির্বাক। মাটির দিকে একদৃষ্টে চেয়ে আছে। দাঁতে দাঁত চিপে আবারই একই প্রশ্ন আওড়াল সোমেন, কলি কোথায়? উত্তর দাও। শেষটায় ধমকে উঠতে কস্তুরী কেঁপে উঠল। লাল চোখ দুটো তুলে স্বামীর দিকে চাইল।

ওর ঘরে।

.

সোমেন বড়ো বড়ো পা ফেলে সিঁড়ির দিকে এগোতে থাকে। কস্তুরী বলে ওঠে, মেয়ের কাছেও মুখোশটা খুলে গেল তো? একপলক থমকে দাঁড়িয়ে সোজা সিঁড়ি দিয়ে উঠতে শুরু করল। গলা উঁচু করে কস্তুরী বলল, কথা জেনে গেছে তার বাবা একজন মেয়ে পাচারকারী। যে মাকে সে দেখতে পারত না আজ সেই মায়ের কোলে এসে আছাড়িপিছাড়ি খেয়েছে। চিনতে পেরেছে তার মাকে। আর হাড়ে হাড়ে চিনেছে বাবাকে।

ওপরে উঠে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলে, তুমি শান্তি পেয়েছ তো? এবার আমি আমার শাস্তির ব্যবস্থা করি। কথাটা কস্তুরীর বুকে এসে বেঁধে। কস্তুরীও রীতিমতো ছুটতে থাকে মেয়ের ঘর লক্ষ্য করে।

.

সোমেন মেয়ের ঘরে ঢোকে। ঘর খালি। জানে মেয়ে কোথায় থাকতে পারে। প্রথমে দরজাটা লক করে দেয়। ঘরের ভিতর কথার গানের ঘর। এরপর সেখানে দরজা খুলে ঢুকতেই দেখে মেয়ে তার সিস্টেমে কী যেন করছে। একটা ইউএসবি কেবল দিয়ে সিস্টেমের সঙ্গে ফোনটা কানেক্ট করা। কথা উঠে দাঁড়ায়। রীতিমতো ধমকে বলে, কেন এসেছ এ ঘরে?

বাহ! তুমি আমার ঘরে ঢুকতে পারো আর আমি তোমার ঘরে আসতে পারি না?

তোমার ঘর নাকি গোপন পাপের ঘর?

কথা, লিমিট ক্রস কোরো না।

আমি জানি আমার কতটা লিমিট। বেরিয়ে যাও ঘর থেকে।

সোমেন ঠাটিয়ে একটা চড় মারল মেয়েকে।

.

ওদিকে কস্তুরী মেয়ের ঘরে ঢুকতে গিয়েও পারল না। ভিতর থেকে লক করা। দরজা ধাক্কাতে থাকে অনবরত।

.

সোমেন দেখে সিস্টেমে সবুজ একটা রেখা ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। কিছু একটা আপলোড হচ্ছে। কোনো কথা না বলে সবার আগে মোবাইলটা ধরে টান মারতে যায়। কথাকলি গায়ের জোরে বাবাকে আটকায়। সোমেনের সঙ্গে রীতিমতো হাতাহাতি বেঁধে যায়। কথাকলি চিৎকার করতে থাকে, আজ তোমার জন্য বন্ধুদের সামনে আমায় অপমানিত হতে হয়েছে। মেঘা বলেছে আমি নাকি মেয়ে পাচারকারীর মেয়ে।

ফোনটা আগে খোলো কথা।

কক্ষনো না। মেঘার বাবা তোমার সম্পর্কে যা যা লিখেছিল আমি সব প্রমাণ করব।

কথার গালে আবার একটা চড় পড়ল। মুখ থুবড়ে মিক্সারের ওপর গিয়ে পড়ল কথাকলি। ঢং করে একটা শব্দ করে উঠল সিস্টেমটা। সবুজ রেখাটা থেমে গেল। সোমেন টান মেরে মোবাইলটা খুলে আছাড় মেরে ভেঙে ফেলল। ফোনের পার্টস খুলে এদিক-ওদিক ছিটকে গেল। তারপর পা দিয়ে পিষে দিল। কথাকলি হাসছে। সোমেন অবাক। হাসছ কেন?

ঈশিতা আমার সঙ্গে ছিল। ও নিজের চোখে সব দেখেছে। এতক্ষণে হয়তো সবাইকে সব কিছু বলে দিয়েছে। আমার ফোন ভেঙে ভেবেছ আটকাবে? পারবে না। তোমায় আমার বাবা বলতে ঘেন্না করছে। আমি সবাইকে বলে দেব আমার বাবা আমারই মতো মেয়েদের পাচার করে দেয়। সোমেনের মাথায় আগুন ছুটে যাচ্ছে। এতকালের তৈরি করা প্রাসাদ এবার ভেঙে পড়বেই। হিংস্র বাঘের মতো কথাকলির গলা টিপে ধরে সোমেন। মিক্সারের ওপর কথার মুখটা ঠুকে যায়। ঠোঁট কেটে রক্ত বেরিয়ে আসে। তবু কথাকলি চিৎকার করতে থাকে, আমি বলব। সবাইকে বলব। আমি চাই না তোমার মতো শয়তান বাবাকে। কথার মাথাটা আবার মিক্সারের ওপর ফেলে গলা চেপে ধরে সোমেন সরকার। কথাকলি ছটফট করতে থাকে। দাঁতে দাঁত চেপে সোমেন বলতে থাকে, এই গলা দিয়ে আর একটা আওয়াজ বেরোবে না। বেশি কথা বলার আগে আজ এখানেই শেষ করে দেব তোকে। কথার মাথাটা মিক্সারের সুইচগুলোর ওপর দিয়ে ঘষটে দেয় গায়ের জোরে। একটা সুইচ খুলে ছিটকে আসে। মাথা ধরে উঠতে যায় কথাকলি। বাবা আবার দুহাতে গলা চেপে ধরে। কথাকলির শরীরটা ধনুকের মতো পিঠের দিকে বেঁকে থাকে বেশ খানিকক্ষণ। পা-দুটো ঝটকাতে থাকে। সোমেনের চোখ দুটো ঠিকরে বেরিয়ে আসছে মেয়েটাকে গিলে খাওয়ার জন্য। কখন যে কথাকলির দুটো পা মাটিতে আছড়াতে আছড়াতে থেমে গেছে খেয়াল করেনি সোমেন। শরীরের নীল শিরাগুলো সাদা চামড়া ভেদ করে ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে সোমেন সরকারের। দুটো হাতের চাপে কথাকলির গলার নলিটা যখন ভেঙে ভিতরে ঢুকে গেছে তখন খেয়াল হয়েছে মেয়েটা তার আর কোনো বাধা দিচ্ছে না।

মুহূর্তে দুহাত সরিয়ে নেয় সোমেন। কথাকলির চোখ দুটো বেরিয়ে আসতে গিয়েও আটকে গেছে। সোমেনের শরীরের ভারটা কথাকলির ওপর থেকে সরে যেতেই নিথর শরীরটা মাটিতে হাঁটু মুড়ে লুটিয়ে পড়ে। ঘাড়টা সামনের দিকে গুঁজে পড়ে থাকে। সোমেন নির্বাক। নিস্তেজ। এ কী করে ফেলল সে নিজের হাতে? এক পাপ ঢাকতে গিয়ে আরও পাপ, সেই আরও পাপ গোপন করতে গিয়ে জীবনের চরম পাপ।

.

টলতে টলতে সাউন্ডের ঘর ছেড়ে বেরোতেই কস্তুরীর গলার আওয়াজ কানে আসে। গায়ের জোরে দরজা ধাক্কাচ্ছে। সোমেন দরজা খোলে। চোখ দুটো তার ভাষাহীন। যেন কোনো মোহের ঘোরে রয়েছে। কস্তুরী ঘরে ঢুকে মেয়েকে না পেয়ে সাউন্ড রুমে ঢুকে মেয়েকে অস্বাভাবিকভাবে পড়ে থাকতে দেখে চিৎকার করে ডেকে ওঠে। কোলে তুলে নেয় মেয়ের মাথাটা। বুক চাপড়ে হাউ হাউ করে কেঁদে ওঠে।

.

একটু পরেই ভূপেন ছুটে আসে। সাউন্ড রুমে ঢুকে দেখে কস্তুরী মৃত মেয়ের মাথাটা কোলে নিয়ে বসে আছে। টলতে টলতে ঢুকে আসে সোমেন। এ আমি কী করলাম ভূপেন? নিজে হাতে আমি…! কেঁদে ফেলল সোমেন। ভূপেন দাদাকে টেনে সাউন্ডপ্রুফ ঘরটায় ঢুকিয়ে দিল। সোমেন মাটিতে বসে পড়ল। ভূপেন দাদার পাশে বসে বলল, কিচ্ছু করোনি দাদা। কথাকলি বন্ধুর সঙ্গে পার্টিতে গিয়েছিল। তারপর আর ফেরেনি। একদিন কেটে যাওয়ার পরে পুলিশে খবর দেবে। তারপর তারা মেয়েটাকে খুঁজে বের করুক। কদিন বাদে না পেয়ে নিজেরাই হাল ছেড়ে দেবে।

কিন্তু কথাকলিকে নিয়ে কী করব?

সোমেন প্রশ্ন করে। কস্তুরী মাথা ঝুঁকিয়ে মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে বসে আছে। ভূপেন বলে, নিরঞ্জনকে ডেকে পাঠাও। ইট-সিমেন্ট দিয়ে তৈরি করো নতুন বেদি। বউদি নতুন কৃষ্ণমূর্তি প্রতিষ্ঠা করবে। পরশুদিনই। তাই আজ রাতেই একটা বেদি তৈরি করতে হবে।

তাতে কী হবে?

কথাকলির কৃষ্ণপ্রাপ্তি। তারপর তোমরা কটা দিন খুব দুঃখে থাকবে। তারপর আস্তে আস্তে ভুলে যাবে।

তোমরা দুজনেই আস্ত জানোয়ার হয়ে গেছ ঠাকুরপো। তোমরা এক একটা নরপিশাচ। আমি আমার মেয়েকে কোত্থাও যেতে দেব না। কোথাও না। ওর মাকে খবর দেব আমি। ভানুপ্রিয়া আসবে মেয়ের কাছে।

বাড়াবাড়ি কোরো না বউদি। এতে তোমাদেরই বিপদ বাড়বে। আর তা ছাড়া তোমার মেয়ে তোমার কাছেই থাকছে। একমাত্র তুমি আর দাদা জানবে তোমাদের কথাকলি আজীবন তোমাদের কাছেই আছে। ঠাকুরঘরে ঢুকে বেদিটা ছুঁলেই অেমরা কথাকে ছুঁতে পারবে। এটা কী কম ভাগ্যের বলো তো? সাপও মরবে লাঠিও ভাঙবে না।

ভূপেন একটা ক্রুর হাসিতে কস্তুরীর দিকে চেয়ে রইল।

.

ঝাপসা চোখ। চেতনা অবলুপ্ত হতে বসেছে। তারই মধ্যে স্বয়ম্ভুর কথাগুলো কানে যাচ্ছে সোমেনের। স্বয়ম্ভু বলছে, ভূপেন অতি ধুরন্ধর। যখন দেখল সোমেন গোয়েন্দা লাগিয়ে কেসটাকে ঘেঁটে ফেলছে। অতীত উঠে আসছে তখন নিজেই মারুফ আর সঈদুলকে পাঠায় শিবাঙ্গীকে শ্লীলতাহানি করে ভয় দেখাতে। এর আগেও কবিতায় হুমকি পাঠিয়েছে। কিন্তু মারুফরা যদি ধরা পড়ে আর পুলিশের জেরার মুখে সত্যি কথা বলতে হয় তাহলে তারা কার নামে বলবে? ভূপেন শিখিয়ে দেয় ভানুপ্রিয়ার নাম বলতে। মারুফ বা সঈদুল কস্মিনকালেও ভানুপ্রিয়ার পরিচিত নয়। মারুফের কল লিস্টে ইনকামিং আউটগোয়িং কোথাওই ভানুপ্রিয়ার নম্বর পাওয়া যায়নি। মারুফের বয়ান অনুযায়ী ভানুপ্রিয়া নাকি ফোন করত না। নানারকম লোক মারফত খবর পাঠাত। ভাগ্য ভালো বলেনি পায়রার ঠোঁটে চিঠি লিখে পাঠাত।

সীতাংশু জিজ্ঞেস করে, খামোখা ভানুপ্রিয়ার নাম কেন নিল? অন্য যে কারও নাম নিতে পারত।

স্যার, ভূপেনের মাথায় অজস্র প্ল্যানের জাল বিছানো। প্রথমত, পুলিশকে একটা অজানা নাম বলে ঘোল খাইয়ে আরও সময় নষ্ট করা। পুলিশ ভানুপ্রিয়াকে ধরবার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়বে। কিন্তু কোনো কূলকিনারা পাবে না। কারণ তার ফোন নম্বর কারও কাছে নেই। সেই ফাঁকে আরাম করে মেয়েগুলোকে পাচার করতে পারবে ভূপেন। দ্বিতীয়ত, ধরা যাক পুলিশ ভানুপ্রিয়াকে ধরে ফেলল। তখন কার ক্ষতি? সোমেন সরকারের। বেরিয়ে আসবে তার গোপন কেচ্ছা। টলে যাবে আসন। মেয়েটা তো মারা গেছেই। এত বড়ো সম্পত্তির ওয়ারিশ কেউ নেই। তার ওপর ভানুপ্রিয়া যদি পুলিশের কাছে মুখ খোলে তাহলে সোমেনের হাজতবাস আটকায় কে? সেক্ষেত্রে অন্য কারও নাম বললে এই ক্ষতিটা হত না। তবে এখানে ভূপেন বুঝতে পারেনি ভানুপ্রিয়াকে আমরা এত তাড়াতাড়ি ধরে ফেলব। কারণ ভানুপ্রিয়া সেদিন যদি পালাবার চেষ্টা না করতেন তাহলে এখনও আমরা ভানুপ্রিয়াকে খুঁজে যেতাম। আপনি পালাচ্ছিলেন কেন ভানুপ্রিয়া?

ভানুপ্রিয়া কিছু বলার আগেই কস্তুরী বলে ওঠে, আমি বলেছিলাম পালাতে। ভূপেন আর সোমেনকে কথা বলতে শুনি। ওরা ভানুকে মেরে ফেলার প্ল্যান করছিল। সুকুমার, ভানুপ্রিয়া, কথাকলি সবাই শেষ হলে ওদের আর ভয়ের কিছু থাকবে না।

তার মানে মিসেস সরকারের সঙ্গে ভানুপ্রিয়ার কন্ট্যাক্ট ছিল?

শুভঙ্কর বলে ওঠে। কস্তুরী উত্তর দেয়, হ্যাঁ ছিল। খুব কম কথা হত। ও-ও তো মা। ওর মেয়ে কেমন দেখতে হল? কত বড়ো হল? সেসব তো ওরও জানতে ইচ্ছে করত। তাই লুকিয়ে ওর সঙ্গে কন্ট্যাক্ট রাখতাম।

সোমেনবাবু যোগাযোগ রাখতে দিতেন?

স্বয়ম্ভু জানতে চায়।

মাথা ঘামাত না। মেয়েটা খুন হওয়ার পর ভূপেন আমার ফোন চেক করে ভানুপ্রিয়ার নম্বর ডিলিট করে দেয়। আর সবসময় ফোনের থেকে আমায় দূরে রেখে দিত। তাই প্রথম দিন আপনারা বলার পর ঈশ্বর ফোন এনে দেয়।

তাই ঈশ্বরের ফোন থেকেই মেয়ের এই সর্বনাশের কথাটা ভানুপ্রিয়াকে আপনি জানান তাই তো?

হ্যাঁ স্যার।

এতক্ষণে প্রথমবার কথা বলে ঈশ্বর। স্বয়ম্ভু আর বাকিদের চোখ এবার ঈশ্বরের ওপর। সে জানায়, এ বাড়িতে সবাই আমায় বউদির ওপর নজর রাখতে রেখেছিল। ঘর থেকে বেরোলেও বউদিকে পারমিশন নিতে হত। আমার খুব খারাপ লাগত। প্রতি বছর জন্মদিনে একমাত্র বউদি আমায় নিজে হাতে পায়েস করে খাওয়ায়, উপহার দেয়। পুজোয় আমায় কীরকম জামা মানাবে সেটাও বউদি খেয়াল রাখে। এই মানুষটাকে কীভাবে বিপদে ফেলব স্যার? তাই আমার ফোন থেকেই বউদি ভানুপ্রিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করে। আবার ভানুপ্রিয়ার কিছু বলার থাকলে আমায় বলতেন। আমি বউদির সঙ্গে কথা বলিয়ে দিতাম।

দৈত্যকূলে প্রহ্লাদ তুমি। ভানুপ্রিয়ার কললিস্টে তোমার নম্বর দেখেই আমার মনে হয়েছিল।

.

মিনিস্ট্রি থেকে আসা একজন প্রশ্ন করে, সোমেন তো ভূপেনের কথা পুলিশের কাছে বলে দিতেই পারত।

যদি তাই হত, তাতে ভূপেনের কী? ভূপেনকে এই অন্ধকার জগতে কেউ নামে চেনে না। কারণ সে সর্বদা একটি মাস্ক ব্যবহার করে এবং নামটাও বস। আর বসের সব কাজ তো সোমেন সরকার করেছে। সর্বত্র তার ফোন নম্বর। সোমেন সরকারের গাড়ি চেপেই ভানুপ্রিয়াকে ফলো করেছিল ভূপেন।

কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে সোমেনের মনে পড়ে গতকাল কস্তুরীর সঙ্গে কথা বলে মেয়ের ঘর থেকে বেরোবার পরে সোমেন যখন বেরোল তখনই দেখল ভূপেন দরজার পাশে দাঁড়িয়ে। মুখে কোনো কথা বলেনি। শুধু আঙুলের ভাঁজে সোমেনের গাড়ির চাবিটা তুলে দেখিয়েছিল। অর্থাৎ সে তার গাড়িটা নিয়ে বেরোচ্ছে।

স্বয়ম্ভু ঝংকার দিয়ে বলে উঠল, এমনকী ভোলাভালা ভগবান দাসের আইডি ইউজ করে ভূপেন তার ফোন নম্বর ব্যবহার করে মানে যেটা বস ব্যবহার করে আর কী। আমরা তো ভগবান দাসের লোকেশন ট্র্যাক করেই ঘাটবাওড়ে পৌঁছোই। অথচ ভগবান দাসের টিকিটিও নেই।

ভগবান জুলজুল করে তাকিয়ে আছে। কী বলবে কিচ্ছু বুঝতে পারছে না।

অনেকক্ষণ থেকে শিবাঙ্গীর মনে একটা প্রশ্ন বুড়বুড়ি কাটছিল। এবার সেটা করেই ফেলল, স্যার, তার মানে সঈদুলকেও ভূপেনই…?

নিজে না হলেও লোক লাগিয়েছিল। মারুফকেও মারতে পারত বাট তার আগেই আমরা পৌঁছে যাই। তা ছাড়া মারুফ ভূপেনের দলে অনেক দিনের। অনেক আটঘাট ও জানে। সহ্যশক্তিও প্রচুর। তাই চট করে হয়তো সরিয়ে দিতে চায়নি।

আরও একটা কথা আপনাদের জানার দরকার।

ভানুপ্রিয়া বলে ওঠে। ঈশিতা আর তার বাবা-মা আমার হেফাজতে সুরক্ষিত আছে।

বিন্ধ্যাচলে?

সন্দিগ্ধ মনে প্রশ্ন করে স্বয়ম্ভু। ভানু বলে, হ্যাঁ। ওরা ভালো আছে। নইলে এই হারামিগুলো ওদের মেরে ফেলত। তাই কস্তুরীই আমায় বলে। ভাবলাম মেয়েটাকে তো রক্ষা করতে পারলাম না, অন্তত মেয়ের বন্ধুটাকে বাঁচাই। কেঁদে ফেলে ভানুপ্রিয়া।

কস্তুরী বলল, ভূপেন ঈশ্বরকে দিয়ে গাড়িটাকে পাহাড়ে পাঠিয়ে নদীর বুকে ফেলে দেওয়ার প্ল্যান করেছিল। ঈশ্বর সেটা আমায় জানায়। তখনই আমি ঈশ্বরকে বলি তুই নিজে যাবি না। অন্য ড্রাইভার ঠিক করে দে। যে আমাদের বিশ্বস্ত। সবার আগে ঈশিতা আর তার বাবা-মাকে তুলবে। তারপর কোনো একটা জায়গায় গিয়ে ওদের ছেড়ে দিতে হবে। যেখান থেকে ভানুপ্রিয়া গাড়ি পাঠিয়ে ওদেরকে বেনারস নিয়ে চলে যাবে। আর ভূপেনের কথা মতো এই গাড়িটা পাহাড়ে চলে যাবে।

ভূপেন রাজি হল আপনাদের লোক দিয়ে পাঠাতে?

ভূপেন তো জানত না যে ঈশ্বর আমার কথা মতো কাজ করে। তাই সুবিধেই হয়।

সন্তান শোক বুকে চেপে এত প্ল্যান আপনারা কীভাবে…

.

কথাটা অর্ধসমাপ্তই রাখল শুভঙ্কর। ভানুপ্রিয়া বলল, আমি পতিতা। কোনোদিন কারও বউ হতে পারব না। আর কস্তুরী সো কলড ভদ্দরলোকের বউ। যে শুধু স্ত্রী হয়েই রয়ে গেল। মানুষের সম্মান পেল না। কিন্তু আমরা দুজনেই তো মা স্যার। নিজেদের সন্তানকে রক্ষা করতে পারিনি বলে আরেকটা সন্তানকে জেনেশুনে বিপদে কী করে ছেড়ে দিই?

সোমেনবাবু গল্পটাকে সাজালেন, কথাকলির ফোনটাকে আছড়ে ভাঙলেন কিন্তু একবারও দেখেননি ফোনের ক্যামেরা আর চিপটা খুলে মেশিনের নিচে চলে গেছিল। আমি দুদিন সাউন্ড রুম চেক করি। তখনই ওগুলো পাই। সঙ্গে পাই মিক্সারের ভাঙা সুইচ এবং তাতে লেগে থাকা রক্ত মিক্সারের মধ্যেই কথাকলির চুল লেগে ছিল। সেটাও পরিষ্কার করেননি সোমেনবাবু। কথাকলির ব্যবহার করা চিরুনি থেকে কালেক্ট করা ডি এন এ স্যাম্পেল আর মিক্সারের সুইচে পাওয়া ব্লাডের ডি এন এ হান্ড্রেড পার্সেন্ট ম্যাচ করেছে। তাই ওই সাউন্ডপ্রুফ ঘরেই যে কথাকলিকে হত্যা করা হয়েছিল সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। খুনের পর সাউন্ড রুম থেকে কথাকলিকে টেনে বের করা হয়। মাটিতে যাতে পুলিশ কোনো প্রমাণ না পায় তাই ভালো করে মুছে নতুন কার্পেট বিছিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু কার্পেটের গা থেকে প্রাইজ ট্যাগটা খুলতে ভুলে যান। প্রথমদিন এসে সাউন্ড রুমে ঢোকার মুখেই আমার চোখে পড়ে।

.

ঘর্মাক্ত মুখে সোমেন একবার মুখ তুলে স্বয়ম্ভুর দিকে তাকায়। কিন্তু স্বয়ম্ভু দেখে না। সে বলেই চলে, সোমেনবাবু ভুলে গেছিলেন বা হয়তো জানতেনই না ফোনের লাস্ট লোকেশন বলে একটা জিনিস হয় যেটা মঙ্গলবার রাত এগারোটা ছেচল্লিশ মিনিটে এই বাড়িতেই শো করছে। এরপর আর কোথাও কোনো লোকেশন নেই। এটা আগেই জেনেছিলাম। কিন্তু এটা নিয়ে মুড করিনি। অপেক্ষা করছিলাম লোকেশনটাকে জাস্টিফাই করার জন্য শক্তপোক্ত প্রমাণের। এখন তো সবই পরিষ্কার। সোমেনবাবু কিন্তু এতক্ষণে একবারও কোনো কথা ভিনাই করেননি। এটা একটা বড়ো গুণ। কী সোমেনবাবু? আমি সব ঠিক বলেছি.. এ কী! সোমেনবাবু, আপনি ঘামছেন কেন? কী হয়েছে? এই জল নিয়ে এসো।

এতক্ষণের সভা যেন এই প্রথম নড়েচড়ে উঠল। ঈশ্বর দ্রুত এক গ্লাস জল আনল। সোমেনকে খাওয়ানো হল। কস্তুরী বা ভানুপ্রিয়া কেউই এগিয়ে এল না। শুভঙ্কর বলল, ইমিডিয়েট অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করো। রাজারাম বলল, ইয়েস স্যার। ফোন করল। সোমেন সরকারের গলা ততক্ষণে শুকোতে শুরু করেছে। বারবার জীবনের পিপাসায় লকলকে জিভটা বেরিয়ে আসছে। জল দিচ্ছে তবু যেন তৃষ্ণা মিটছে না।

.

মিনিট দশেকের মধ্যে অ্যাম্বুলেন্স হাজির। সোমেনকে নিয়ে অ্যাম্বুলেন্স ছুটে গেল আর্তনাদ করতে করতে।

.

বেদির ওপর থেকে কৃষ্ণের মূর্তি নেমে এল। নেমে এল শ্বেত পাথরের সিংহাসন। লাল কাপড়টা তুলতে গিয়ে দেখা গেল বেদির সিমেন্টের সঙ্গে কামড়ে বসে গেছে। কাঁচা অবস্থায় তাড়াহুড়ো করে কাপড়টা ঢাকা হয়েছিল। শাবলের ঘা পড়ল সিমেন্টের বেদিতে। হয়তো নড়ে উঠল স্বর্গ যার নিচে ঘুমিয়ে আছে পাতাল। তারপর একে একে ছেনি, হাতুড়ি। প্রথমে মাথা, ধীরে ধীরে নাক, মুখ গলা হয়ে গোটা শরীরটা হাঁটু মুড়ে কুণ্ডলী পাকিয়ে শোয়ানো। ঠিক যেমন করে প্রসূতি প্রসব করে তাঁর সন্তানকে, তেমনি করে বেরিয়ে এল কথাকলির বীভৎস শরীরটা। ফ্যাকাশে শরীর ফুলে মাংস খুলে এসেছে। নাক-কান দিয়ে হলুদ তরল বেরোচ্ছে। অজস্র ম্যাগট জন্মেছে মেয়েটার সর্বাঙ্গে। যেখানে ধূপধুনোর সুবাস থাকার কথা সেখানে এখন মানুষ পচা তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। তবু, কস্তুরী জলভরা বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে আছে। ওর মনে হচ্ছে, গর্ভের মধ্যে শিশু যেমন শুয়ে থাকে কুণ্ডলী পাকিয়ে তেমনই শুয়ে আছে কথাকলি। যশোদা আর দেবকী ভাগ্যবান ছিলেন। কেউ তাদের সামনে দিয়ে কাপড়ে মুড়ে তাদের সন্তানের পচাগলা শরীরটা নিয়ে যায়নি। ভেঙে ছত্রখান ঠাকুরঘরটায় কৃষ্ণমূর্তি পড়ে রইল এক পাশে। তাকে আগলে বসে উদাস চোখে বসে রইল কস্তুরী। নাকে তার কোনো গন্ধই যাচ্ছে না। ভানুপ্রিয়া নাক-মুখ চেপে কাঁদতে কাঁদতে লুটিয়ে পড়ল ঠাকুরঘরের দোরগোড়ায়।

.

পাপপুরী থেকে বেরিয়ে আসার আগে ভগবান দাসের কাছে গিয়ে দাঁড়ায় স্বয়ম্ভু। বলল, সপ্তাহে দুদিন পাঁঠার মাংসটা আর খাওয়া হবে না আপনার। রিসেন্টলি আরও একজনকে খুন করেছে মহেশ্বর। সেলিম। বড়ো ছেলের আশা ছেড়ে দিন।

ভগবান হাতজোড় করে প্রণাম জানায়। স্বয়ম্ভু বাইরের দিকে এগোতে থাকে। শিবাঙ্গী ডাকে, স্যার। স্বয়ম্ভু ঘুরে তাকায়। মহেশ্বর খুন করেছে বুঝলেন কী করে? শিবাঙ্গী প্রশ্ন করে।

সেলিমের জানলায় রক্তমাখা হাতের ছাপ যেখানে অনামিকা ছোটো। আমার বাড়িতে ধুলোমাখা হাতে কাচের গ্লাসে জল খেয়েছে। সেখানেও হাতের ছাপে অনামিকা ছোটো। তা ছাড়াও মা বলেছিল, লাস্ট দিন ওর ডান হাতে ব্যথা ছিল। আসলে আগের দিন সেলিমের ছোড়া একটা গুলি লাগে মহেশ্বরের ডান হাতে। তখনই আমি শিয়োর হই। বাকিটা তো নিজেরাই দেখলে চোখে। শুধু একটা কথাই বুঝলাম না। সেলিম আমায় কেন নিজের মুখে ভূপেনের নাম বলল না? বারবার বলল জানি না। জানি না। এদিকে মৃত্যুর আগে নিজের রক্ত দিয়ে লিখে গেল ভ! কে জানে, হয়তো সেলিম বুঝতে পেরেছিল ওর ওপর কেউ নজর রাখছে। তাই নিজের মুখে বলতে চাইনি। যাই হোক, আর কোনো প্রশ্ন?

স্বয়ম্ভু শিবাঙ্গীর মুখের সামনে চোখ নামিয়ে শেষ প্রশ্নটা করে। শিবাঙ্গী লাজুক চোখ তুলে তাকিয়ে ভালোই বুঝতে পারে স্বয়ম্ভু বুঝে ফেলেছে সে এখন কোন প্রশ্ন করতে চলেছে। পাশেই রাজারাম আর কৌশিক দাঁড়িয়ে কৌতূহলী মুখে।

আপনি খুব ভালোই জানেন আমি কী বলব। এটা কী ঠিক করলেন? আমার সঙ্গেও গোয়েন্দা-গোয়েন্দা খেললেন?

ইয়েস। থ্রিলারের এটাই তো মজা। রহস্যের মধ্যে রহস্য। আমার সিক্সথ সেন্স বলছিল তুমিই ওদের সফট টার্গেট। তাই হুমকি লেখা কবিতাটা তুমিই প্রথম পেয়েছিলে। ঠিক সেদিনই রাজারামকে প্ল্যানটা বলে ওকে তোমার পাড়ার পাশেই ঘাঁটি গাড়তে বলি। রাজারাম আমাদের টিমের নিউ জয়েনি অ্যান্ড হি হ্যাজ ডান অ্যান এক্সেলেন্ট জব।

থ্যাংক ইউ সো মাচ স্যার।

স্বয়ম্ভু রাজারামের কাঁধ চাপড়ে দিল। রাজারাম শিবাঙ্গীকে বলল, স্যার আমায় গতকালকের ব্যাপারে আগে থেকেই বলে রেখেছিলেন। এমনকী স্যারের মাকে বলেছিলেন ছাদের দরজাটা খুলে রাখতে যাতে আমরা চুপিচুপি ঢুকতে পারি। ভাগ্যিস। নইলে আমি কিছুই করতে পারতাম না।

একটা লোক একাই একসঙ্গে কতগুলো মানুষের জীবন বাঁচিয়ে দিল অবলীলায়। কাউকে তেমন করে কিছু বুঝতেই দিল না।

রঘুপতি রাঘব রাজারাম, পতিত পাবন সীতারাম, ঈশ্বর আল্লা তেরো নাম… সবকো সম্মতি দে ভগবান।

গানটা গাইতে গাইতে সানগ্লাসটা চোখে এঁটে সোমেন সরকারের অন্ধকার বাড়ি থেকে বাইরের অফুরান আলোর দিকে এগিয়ে চলল স্বয়ম্ভু।

শিবাঙ্গী হাসল রাজারামের দিকে তাকিয়ে। রাজারাম সোয়্যাগ করল। কৌশিক প্যাটপ্যাট করে চেয়ে দেখল, ওর আরও একজন প্রতিদ্বন্দ্বী এসে জুটল যে আবার স্বয়ম্ভুর প্যায়ারের। বেচারার কপালটাই মন্দ।

.

অজস্র ক্যামেরার ফ্ল্যাশ আজ স্বয়ম্ভুকে আলোয় ঝলসে দিচ্ছে। এর মধ্যেই মোদ্দাকথাটুকু জেনে ফেলেছে মিডিয়া। পাশের কোনো কোনো সাংবাদিক লাইভ টেলিকাস্টে বলছে, দুষ্কৃতিদের চক্রান্তে পর্নস্টার স্বয়ম্ভু সেন আজ নিজেকে রকস্টার করে তুললেন। প্রমাণ করলেন, মন্ত্রীই হোন বা আম আদমি, অপরাধীরা অপরাধীই হয়। কলকাতায় আজও অপরাধীরা ধরা পড়ে। আজও তাদের শাস্তি হয়। শুধুমাত্র এই স্বয়ম্ভু সেনের মতো কিছু মানুষ আছেন বলেই।

একটু ভুল হচ্ছে আপনাদের।

ঘুরে দাঁড়াল স্বয়ম্ভু। মুহূর্তে ক্যামেরা, বুম, মাইক, মোবাইল সব স্বয়ম্ভুর দিকে। স্বয়ম্ভু বুক ফুলিয়ে বলল, স্বয়ম্ভু সেন একা কিছু প্রমাণ করেনি। শিবাঙ্গী বসু, রাজারাম ব্যানার্জি, কৌশিক পুরকাইতের মতো সাব ইন্সপেক্টররা যদি আমার টিমে না থাকতেন তাহলে আমি কিচ্ছু করতে পারতাম না। ধন্যবাদ। কথাটা বলেই স্বয়ম্ভু মেরুদণ্ড সোজা রেখে এগিয়ে চলল, সামনের দিকে।

ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়েই শিবাঙ্গী ভাবল, আলোর পুরুষ হয়তো এমনই হয়। যেখান দিয়ে হেঁটে যায় সেখানকার ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র তৃণগুলোকেও আলোয় আলোয় জাগিয়ে দিয়ে যায়।

***

3 Comments

Please upload Moyna Bolo Krishnaradhe by Abhishek Chattopaadhyaay

এই সিরিজের পরের গল্পো টা তাড়াতাড়ি দিন প্লিজ

“ময়না বলো কৃষ্ণ রাধে” বইটিও আপলোড করবেন প্লিজ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *