কথাকলি কোথায় – ৮

স্বয়ম্ভু এবার চিনতে পারল পাশের লোকটাকে। এই সেই ছদ্মবেশী। একটু আগেই এক ঘুষিতে জ্ঞান হারিয়ে ছিল। মৌলবি বলল, তোকে কেটে জলে ভাসিয়ে দেব। আর ওইটাকে ভালো করে চেখে চিবিয়ে খাব। উফফফ…!

আমি থাকতে সেটা সম্ভব নয় মৌলবি সাহেব। এমনিতেই তো থানায় আপনার নামে রেপ কেস কম নেই। আপনি হয়তো জানেন না, আমার লোক সারা মসজিদ ঘিরে ফেলেছে।

.

মৌলবি হাসে। বলে, তাতে কী? কীসের ভিত্তিতে ধরবে আমাদের? আর একটু পরেই তো আপনার লাশটা গুম হয়ে যাবে। পাশের লোকটা বলে, এত কথা বলার সময় নেই। কাজ সারুন মৌলবি সাহেব।

আল্লাহ হো আকবর।

.

কথাটা বলেই দুটো তরোয়াল ওপর দিকে ওঠে নেমে আসার জন্য। কিন্তু তার আগেই পরপর দুটো গুলি চলে। মৌলবি আর তার ছদ্মবেশী চ্যালার হাত থেকে তরোয়াল লুটিয়ে পড়ে। হাতে গুলি লেগে রক্ত ঝরছে। কৌশিক আরও সিভিল ড্রেসের দুজন পুলিশকে নিয়ে ঢুকে এসেছে। কাওয়ালি থেমে গেছে গুলির শব্দে। বাইরে থেকেই একটা গুলির শব্দ হয়।

এদের নিয়ে এই ঘর থেকে বেরিয়ে যাও কৌশিক। আমি শিবাঙ্গীকে নিয়ে আসছি।

.

আবার বাইরে একটা গুলির শব্দ। সঙ্গে কেউ একজন চিৎকার করল। পুলিশের লোকই মনে হল। কৌশিক ও তার দল দুটোকে ধরে বের করে নিয়ে গেল। চিৎকার করে বলল, এই দুটোকে গাড়িতে তোলো। স্বয়ম্ভু শিবাঙ্গীকে দুহাতে তুলে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে চাতালে শোয়াল। স্বয়ম্ভু চিৎকার করল, জল দাও। পানি পানি। কাওয়ালি দলেরই একজন জল এগিয়ে দিল। মুখের ওপর কয়েকবার জল ছেটাতেই শিবাঙ্গী চোখ খুলল। কৌশিক চারপাশ খেয়াল রাখছিল। হঠাৎ দেখে দোতলা থেকে একজন তাক করেছে। সঙ্গে সঙ্গে কৌশিক গুলি চালায়। ওপরের লোকটা সরে যায়। কৌশিক সমেত আরও কয়েকজন দৌড়ে ওপরে ওঠে। শিবাঙ্গী উঠে বসেছে। তুমি ঠিক আছ শিবাঙ্গী?

কোথায় আছি?

মাজারে। তুমি ঠিক আছ?

হুম। মাথাটা ঝিমঝিম করছে।

আমাকে ধরো। উঠতে হবে শিবাঙ্গী।

শিবাঙ্গী স্বয়ম্ভুর দিকে তাকাল। জিজ্ঞেস করল, মারুফ?

কাল রাতেই এখান থেকে পাচার হয়ে গেছে। পাথর প্রতিমায় আছে। আমাদের এখুনি যেতে হবে।

শিয়োর স্যার।

.

বলেই স্বভাববশত তড়াক করে উঠে দাঁড়াতে যায় শিবাঙ্গী। কিন্তু মাথা ঘুরে চোখ অন্ধকার হয়ে স্বয়ম্ভুর কোলের ওপর পড়ে। স্বয়স্তু দুহাতে জড়িয়ে ধরে শিবাঙ্গীকে। অন্ধকার ঘোর লাগা চোখে শিবাঙ্গীর যেন আলোর বিচ্ছুরণ হল। স্বয়ম্ভুর দুটো চোখ সোজাসুজি শিবাঙ্গীর চোখে। খানিক মুহূর্ত যেন স্তব্ধ হয়ে গেল দুজনের মাঝে। যুদ্ধের মাঝে কেউ যেন লাল গোলাপ ফোটাতে চাইছে আপ্রাণ। কৌশিকের ধমকানিতে ফুলটা ফুটতে গিয়েও ফুটল না। চটক ভেঙে দুজনেই দেখল কৌশিক লোকটাকে টেনে নিয়ে আসছে। কাঁধে গুলি লেগেছে লোকটার।

বাইরে এসে স্বয়ম্ভু কৌশিকের কাঁধ চাপড়ে বলল, ভেরি ওয়েল ডান।

থ্যাংক ইউ স্যার।

শিবাঙ্গী ঘোর লাগা চোখে হাসল। স্বয়ম্ভু বলল, এক কাজ করো তুমি এদের নিয়ে সোজা বারুইপুর চালান করো। এখানকার থানাকে বিশ্বাস নেই।

স্যার, পাথর প্রতিমা?

আমি আর শিবাঙ্গী যাচ্ছি। কিন্তু এদেরকে কারও হাতে ছাড়া যাবে না। তাই তুমি যাও।

ওকে স্যার।

কৌশিকের মুখটা একটু আগেই যতটা চনমনে উজ্জ্বল ছিল এই মুহূর্তে সেটা নিভে যাওয়া ফানুস। বুঝতে পারল স্বয়ম্ভু। কিন্তু কিছু বলল না। কৌশিক যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হল। স্বয়ম্ভু অন্য একজন কনস্টেবলের কাছে গিয়ে তার ফোনটা চাইল। সে সঙ্গে সঙ্গে তার ফোনটা বাড়িয়ে দিল। স্বয়ম্ভু ফোনটা নিয়ে একটু দূরে গেল। শিবাঙ্গী রঞ্জিতের নম্বরটা একটু বলো তো।

রঞ্জিতকে কল করবেন? আমি করছি।

আমিও করতে পারি। কিন্তু করব না। নম্বরটা বলো জলদি।

.

শিবাঙ্গী নম্বর বলে। রঞ্জিত স্বয়ম্ভু বলছি, একটা কাজ কর। আমার, শিবাঙ্গীর আর কৌশিকের নম্বরটা চেক করে দ্যাখ তো ট্যাপ করা কিনা। দেখে আমায় জানা।

ট্যাপ করা?

শিবাঙ্গী অবাক।

নাইনটি পার্সেন্ট চান্স। কাল তোমায় ফোনে আমি যা যা বলেছি ওরা সব শুনেছে। সঙ্গে সঙ্গে মারুফকে সরিয়ে দিয়েছে। শুধু আমার মুখের এই বসন্তের দাগটা কালকে তোমাদের ফোনে বলিনি বলে ওরা জানতে পারেনি।

কারেক্ট স্যার।

শিবাঙ্গী উত্তেজিত। বলল, আপনার প্ল্যান অনুযায়ী একটা লোক আমার পাশে এসে বসে। আমি ভাবি আপনি এসেছেন। আপনার বলা কোড ওয়ার্ড বলি। সেও দেখলাম একদম ঠিক উত্তরই দিল।

একবারও মুখ দেখলে না?

কীভাবে দেখব স্যার? আমি যখন উঠে আপনার কথা মতো ভিতরে যাচ্ছিলাম তখন সে মাটিতে মাথা নিচু করেছিল।

ওটাই তো চালাকি।

তারপর আমি ওই ঘরটার দরজার কাছে যেতেই…

.

পরের সব কথাই বিস্তারিত বলল শিবাঙ্গী।

পুরুষোত্তম মাল।

বিড়বিড় করল স্বয়ম্ভু।

সে কে স্যার?

পরে জানবে। এই তোমরা ওই গাড়িতে এসো।

চিৎকার করে একদল পুলিশকে বলল। সেদিক থেকে উত্তরও এল। শিবাঙ্গীর হাত ধরে রীতিমতো দৌড়োতে লাগল। শিবাঙ্গী জিজ্ঞেস করল, কোথায় যাচ্ছেন স্যার? গাড়ি তো ওইদিকে?

সুফির গাড়িতে চেপেই রওনা হল স্বয়ম্ভু আর শিবাঙ্গী। পিছনে আরও একটা গাড়ি ভরতি পুলিশ। দুপুর গড়াতে চলল। কাকদ্বীপের কাছাকাছি পৌঁছোতে ফোন এল স্বয়ম্ভুর। বলুন তুহিনদা! খুব খিদে পেয়েছে। ফরেন্সিক এক্সপার্ট তুহিনশুভ্রও রসিক মানুষ। উত্তর দিল, কেন মাজারে মৌলবি কিছু খেতে দিল না?

মানে? আপনি জানলেন কী করে?

বুঝেছি। সত্যিই খিদে পেয়েছে তোমার। মাথা কাজ করছে না।

উফ, আসল কথাটা বলুন না বাপু।

নিউজ পোর্টাল খোলো দেখতে পাবে।

.

হতাশায় চোখ বন্ধ হয়ে এল স্বয়ম্ভুর। কোনো রিপোর্টার তো অপারেশনের সময় ছিল না। খবর পেল কী করে?

ভাই তোমরা স্বাধীনতার দিন ধর্মস্থানে গুলিগালা চালিয়েছ। আশেপাশের লোক জানিয়েছে। ওরা কিন্তু খবরটাকে খারাপ দিকে ঘুরিয়ে দিচ্ছে ভায়া।

বুঝেছি। কিন্তু এতে আমাদের আরও সর্বনাশ হল। ভাই সুফি, জলদি চলো ভাই।

কী হয়েছে স্যার?

শিবাঙ্গী প্রশ্ন করল। স্বয়স্তু বলল, নিউজ পোর্টালগুলো সার্চ করো তো। শিবাঙ্গী মোবাইল দেখতে লাগল। ওদিকে তুহিন বলল, শোনো যার জন্য ফোন করা, ওই ব্লাড স্যাম্পেল কথাকলিরই। স্বয়ম্ভুর মুখের পেশিগুলোতে জমে থাকা রক্তকণিকারা দুটো চোখে আর মাথার কোষে কোষে ছড়িয়ে পড়ল।

হ্যালো স্বয়ম্ভু।

থ্যাংক ইউ তুহিনদা। শহরে ফিরে কথা হবে।

তুহিনের ডাকে গম্ভীর গলায় উত্তর দিল স্বয়ম্ভু। শিবাঙ্গী ভ্রূ কুঞ্চিত করে খবর পড়ছে নিউজ পোর্টালে। এরা কি সাংবাদিক? ছি! এ তো পুরো সাম্প্রদায়িকতার দিকে ঘুরিয়ে দিচ্ছে।

দেওয়ানো হচ্ছে। ভাই সুফি….

বলুন স্যার।

এখানে তুমি কতদিন গাড়ি চালাচ্ছ?

গাড়ি আমার আব্বু চালাত। কিন্তু তেমন পয়সা হত না। হারামি মুরুব্বিগুলো খাটিয়ে পয়সা দিত না।

মুরুব্বি মানে? কারা?

এই মাজারের লোকজন। পুলিশগুলো বেশি হারামি।

রাগটা চেপে রাখতে না পেরে কথাটা বলেই জিভ কাটল সুফি। সরি স্যার, কিছু মনে করবেন না। স্বয়ম্ভুও বেশ রসিয়ে বলল, না না, তুমি নিশ্চিন্তে খিস্তি দাও। বলছি, মাজারের লোকজন কী কাজ দিত?

মাঝেমধ্যেই কিছু মেয়েদের এই পাথর প্রতিমা পৌঁছে দিতে হত।

কেন?

তখন তো কিছু বুঝতাম না স্যার। বলত ওরা নাকি সুন্দরবনে কাজের জন্য যাচ্ছে। আব্বু পরে জানতে পারে আসলে মেয়েগুলোকে পাচার করা হত।

কে করত?

তা জানি না। তবে আব্বু এটা জেনে খুব ভেঙে পড়ে। মাজারের ভাড়া খাটতে ইনকার করে। আমরা সাচ্চা মুসলমান স্যার। কোনো গুনাহ করব না।

তোমার আব্বু কী করে?

আব্বু আর নেই স্যার। কী একটা কাজ নিয়ে সুন্দরবন গিয়েছিল। সেখানেই আব্বুকে বাঘে খায়।

মানে জঙ্গলে কাজ করতে গিয়েছিল?

না স্যার। আব্বুর এক বন্ধু সুন্দরবনের একটা দোকানে কাজ জোগাড় করে দিয়েছিল।

তাহলে বাঘে কীভাবে খেল?

আব্বু নাকি জঙ্গলে ঢুকে পড়েছিল। কেন গিয়েছিল আমরা জানি না। ওসব কিছুই না। আসলে আব্বু ছিল মেয়ে পাচারের সাক্ষী। তাই সরিয়ে দিল।

তোমরা কিছু করোনি?

সুফি হেসে ফেলল। পুলিশের চোখের সামনে দিয়ে কত মেয়ে পাচার হয়ে গেল স্যার। কেউ কিচ্ছু করল না। সেখানে আমার আব্বুকে বাঘে খেল তাতে কে কী করবে বলেন তো? আমি বলেছিলাম পুলিশের কাছে যাই। কিন্তু আম্মি আমার মুখ চেপে বলল, ওরা তোকে কোতল করে দেবে সুফি। যাস না।

.

স্বয়ম্ভুর মনে হল, সুফি যেন একদলা পাঁক ছুড়ে মারল প্রশাসনের গায়ে। গা দিয়ে পচা গন্ধ বেরোচ্ছে। এমন কোনো ডিও নেই এই গন্ধ দূর করতে পারে। চোখ বন্ধ করে স্বয়ম্ভু স্পষ্ট দেখতে পায় একদল মেয়ে একগলা নদীর জল পেরিয়ে সুন্দরবন দিয়ে বাংলাদেশ চলে যাচ্ছে। তারপর বিনা বাধায় শত উর্দিধারী প্রশাসনিক গর্বিত বক্ষের পুরুষগুলো তাদের কাপড় টেনে খুলে নিচ্ছে। নদীটার এপার-ওপার জুড়ে উর্দিধারীরা অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছে।

.

গাড়িটা গোঁত্তা মেরে দাঁড়াল একটা গ্রামীণ হাসপাতালের সামনে। হৃদয়নগর গ্রামীণ হাসপাতাল। নামেই হাসপাতাল। একতলা গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্র বলাটাই ভালো। এইখানে আছে ছেলেটি? শিবাঙ্গী প্রশ্ন করল। সুফি বলল, এইখানেই তো ছেড়েছিলাম। পিছনে পুলিশ ভরতি গাড়িটাও এসে দাঁড়ায়। সকলেই হুড়মুড় করে নেমে ঢুকে পড়ে হাসপাতালে। জং ধরা টেবিলের ওপর পা তুলে বসেছিল পুরুষ রিসেপশনিস্ট। পুলিশ দেখে থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। স্বয়ম্ভু মারুফের খোঁজ করল। ছবি দেখাল। সঙ্গে সঙ্গে লোকটি বলে কিছুক্ষণ আগেই দুজন মারুফকে নিয়ে বেরিয়ে গেছে।

বেরিয়ে গেছে? কোথায়?

রিসেপশনিস্ট বলল, তা বলতে পারব না।

বলতে পারব না নাকি বলব না?

কথাটা বলেই স্বয়ম্ভুর থাবা রিসেপশনিস্টের জামা খামচে ধরে ধমকায়,

ঠিক করে বলুন, নইলে থার্ড ডিগ্রি চেনেন তো?

বিশ্বাস করুন স্যার, আমি সত্যিই কিচ্ছু জানি না।

গাড়িতে করে গেছে?

হ্যাঁ স্যার।

কী গাড়ি?

চার চাকা।

চোওওওপ। বাস, ট্যাক্সি সবই তো চার চাকা। গাড়িটা কী?

ট্যাক্সি নয় স্যার। সাদা রঙের বড়ো গাড়ি। জিপের মতো দেখতে।

কোনদিকে গেছে?

.

লোকটি আঙুল দিয়ে বিশেষ একটি দিক দেখিয়ে বলল, এই দিকে

এই দিকে কী আছে?

খেয়াঘাট।

শিট।

হারি আপ। চলো চলো চলো

তড়িঘড়ি দুটো গাড়িই ছুটল খেয়াঘাটের দিকে। একটা লঞ্চ ছাড়ছে। লঞ্চ ভরতি যাত্রী। নোঙর উঠে গেছে। ঘাটেই দাঁড়িয়ে সাদা বোলেরো। স্বয়ম্ভু আর শিবাঙ্গী নেমেই চিৎকার করে লঞ্চটাকে থামিয়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু লঞ্চটা নদীর বুকে দুলে উঠেছে। দাঁড়াবার কোনো লক্ষণ নেই দেবে ডাঙা থেকে ব্যাঘ্রের ক্ষিপ্রগতিতে স্বয়ম্ভু আর শিবাঙ্গী দৌড়ে জল ডিঙিয়ে লঞ্চটা ধরে ফেলে। লঞ্চটা যেন একটু তাড়াহুড়ো করেই মাঝনদীর দিকে চলতে শুরু করেছিল। কিন্তু তার আগেই স্বয়ম্ভু লঞ্চে উঠে পড়ে। ডান হাতে রিভলভার তাক করে বাঁ-হাত বাড়িয়ে দেয় শিবাঙ্গীর দিকে। একটা গুলি লঞ্চের ভিতর থেকে ধেয়ে আসে স্বয়ম্ভুর দিকে। গুলির শব্দে শিবাঙ্গী চিৎকার করে ওঠে। ডেকের ওপর হুমড়ি খেয়ে নিচু হয়ে যাওয়াতে সেই গুলি নদীর হাওয়া ভেদ করে অনির্দিষ্ট পথে ছুটে যায়। চোখ শিবাঙ্গীর দিকে থাকলেও দৃষ্টির পরিধির মধ্যে থাকা আচমকা আক্রমণকারীকে দেখে ফেলেছিল স্বয়ম্ভু। তাই কিছু বোঝার আগেই তারও গুলি ছুটে যায় লোকটির দিকে। কাঁধে গিয়ে লাগে। লোকটি ধারে ছিল বলে লঞ্চ থেকে জলে পড়ে যায়। লঞ্চে ততক্ষণে তুমুল শোরগোল, ঠেলাঠেলি। স্বয়ম্ভুর হাতের রিভলভার শূন্যে আরও একবার গর্জে ওঠে সবাইকে শান্ত করার উদ্দেশ্যে। শিবাঙ্গী উঠে পড়েছে।

শিবাঙ্গী মারুফকে বের করো।

বলেই সোজা লঞ্চ চালকের মাথায় রিভলভার ঠেকিয়ে স্বয়ম্ভু বলে, লঞ্চটাকে ঘাটে ভেড়া। ভেড়া বলছি। চল। ধমকে কাজ হয়। ওদিকে শিবাঙ্গী ভিড়ের মধ্যে থেকে চিনে ফেলে পায়ে ব্যান্ডেজ করা মারুফকে। কোনো পথ না পেয়ে জলে ঝাঁপ দিতে যায় মারুফ। কিন্তু শিবাঙ্গীর ঝাঁপিয়ে পড়ে মারুফের জামা খামচে ধরে ঘুরিয়ে লঞ্চের ভিতর ফেলে দেয়। কিছু লোক আশঙ্কিত হয়ে সরে যায়। শিবাঙ্গী মনের সুখে মারুফের পেটে লাখি মারে তিনখানা। তারপর বাঁ-হাতে গলার কাছের জামা ধরে টেনে তোলে। লঞ্চ ঘাটে ভেড়ে। স্বয়ম্ভু আর শিবাঙ্গী চূড়ান্ত আদরের সঙ্গে মারুফকে লঞ্চ থেকে নামিয়ে গাড়িতে তোলে। নদীর হাওয়ায় তখন স্বাধীনতার গান বাজাচ্ছে কেউ, সারে জাঁহা সে আচ্ছা…!

.

গারদের পিছনের নয় বাই ছয়ের ঘরটা আলো অন্ধকারে মাখামাখি ছিল। লোহার দরজা খুলে স্বয়ম্ভু আর শিবাঙ্গী ঢুকে আসে। এ কী, একে বসিয়ে রেখেছ কেন? স্বয়ম্ভু বলল। কনস্টেবল ছুটে এল। স্বয়ম্ভু বলল, একটা শেকল ওই ওপরের হুকে বাঁধো, আরেকটা বাঁধো ওই ঘুলঘুলির লোহার শিকে আর সেই দুটো শিকল দিয়ে এই শয়তানটার দুটো হাত বেঁধে দাঁড় করিয়ে পাও। যেমন বলা তেমন কাজ। যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাচ্ছে মারুফ। শিবাজী কড়া চোখে চেয়ে আছে মারুফের দিকে। পারলে এক্ষুনি ছিঁড়ে খায়।

দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কী দেখছ শিবাঙ্গী? যাও।

স্বয়ম্ভুর কথা শুনে শিবাসী অবাক হয়ে তাকাল। স্বয়ম্ভু বলল, তোমার কাপড় খুলতে চেয়েছিল। এবার তুমি ওর কাপড় খুলে নাও। নিজের বলা কথাই মাথার মধ্যে আঘাত করে স্বয়ম্ভুর। কানে বেজে ওঠে সোমেনের বলে যাওয়া শেষ কথাগুলো, নিজের কাপড়টা সামলে রাখবেন। বলা তো যায় না, কখন কী হয়! বসের অনুমতি পেয়েই শিবাঙ্গী বড়ো বড়ো পায়ে এগিয়ে গিয়ে ঠাস ঠাস করে মারুফের দুগালে হুটা চড় মারে। রাগে ফুঁসতে থাকে। স্বয়ম্ভু পিছন থেকে ফুট কাটে, আহা! শুধু চড়থাপ্পড় মেরে শক্তির অপচয় করবে নাকি? আরও বড়ো কিছু ভাবো। নাও ধরো। শিবাঙ্গীর হাতে একটা কাঠের লাঠি ধরিয়ে দেয় স্বয়ম্ভু। লাঠিটা ধরতেই দুটো চোখ লাল হয়ে ওঠে শিবাঙ্গীর। মনে পড়ে সেই বীভৎস রাতটার কথা। শিবাঙ্গীর শরীর ঘিরে দুটো পশুর খেলা। পিছনে হাত বেঁধে নরম বুকে হাত বুলিয়ে মনের সুখ মেটানোর নারকীয় উল্লাস। মনে পড়তেই একটা রুলের বাড়ি পড়ে মারুফের বুকে। মারুফ দাঁতে দাঁত চেপে গোঙায়। স্বয়ম্ভু প্রশ্ন করে, কে তোকে পাঠিয়েছিল বল। স্বয়ম্ভু হাজতের ঘরে একপাশ থেকে আরেক পাশে হেঁটে যায়। উত্তর দেয় না মারুফ। শিবাঙ্গী আবার লাঠি চালায়। মারুফের গলা চিরে চিৎকার বেরোতে চাইছে কিন্তু প্রবল জেদে মারুফ সেটা বেরোতে দিচ্ছে না।

চুপ থেকে লাভ নেই মারুফ হোসেন। পাণ্ডাটার নাম বল।

.

আবারও এক চক্কর হাঁটে স্বয়ম্ভু কিন্তু উত্তর পায় না। শিবাঙ্গী এবার পেটে রুলের গুঁতো দেয় গায়ের জোরে। পেট কুঁকড়ে সামনের দিকে মুখ ঝুঁকে পড়ে মারুফের। তবু উত্তর নেই। এমনকী একটাও কথা নেই। আরও পনেরো মিনিট ধরে অত্যাচার চলতে থাকে। শেষে বাধ্য হয়ে মারুফ বলে, আমরা নিজেরাই এসেছি। কেউ পাঠায়নি। এবার স্বয়ম্ভু দাঁত খিঁচিয়ে তেড়ে আসে। আমাদের গাণ্ডু পেয়েছিস শালা? কেউ পাঠায়নি। এমনি এমনি তুই কোনো সোর্স ছাড়া ডায়মন্ডহারবার গেলি তারপর সেখান থেকে খবর পেয়ে পাথর প্রতিমা? ওরা কাদের লোক বল।

যা কতক স্বয়ম্ভুও দিল। তবু মুখ খুলল না মারুফ। মুখ দিয়ে রক্ত বেরিয়ে এসেছে। সারা গায়ে দাগড়া দাগড়া কালশিটে। ভেবেছিলাম ভালো কথায় শুনবি। শুনলি যখন না তখন আমরাও এবার আঙুলটাকে ব্যাঁকাই। ফুলে আসা চোখ তুলে স্বয়ম্ভুকে দেখে মারুফ।

.

উপুড় হয়ে শুয়ে আছে বিবস্ত্র মারুফ। তার পায়ের ওপর ধেই ধেই করে নাচছে স্বয়ম্ভুর হাতে রুল। একটাই প্রশ্ন, কে পাঠিয়েছে? স্বয়ম্ভু ঘেমে-নেয়ে একশা। সাদা কুর্তিটা ভিজে সপসপ করছে। মুখের দাড়ি অনেক আগেই খুলে ফেলেছে। চোখে সুরমাটা এখনও লেগে আছে। মারুফ এখনও কোনো মুখ খুলছে না দেখে মারুফের পায়ুপথে মোটা রুলটা সজোরে ঢুকিয়ে দেয়। ৰুক চেরা আর্তনাদ করে ওঠে মারুফ। বলে ওঠে, বলছিইইইই, বলছিইই। রুল বেরিয়ে আসে। স্বয়ম্ভুর হাতের থাবার মধ্যে মুঠো করে ঢুকে যায় মারুফের চুল।

ভানু… ভানুপ্রিয়া।

স্বয়ম্ভু থমকে যায়। মনের মধ্যে এতক্ষণ সবার মতো সেও ভেবে রেখেছিল সোমেন সরকারের নাম। কিন্তু…

ভানুপ্রিয়া? সে কে? শিবাঙ্গীকে কেন হেনস্থা করল সে?

জানি না। কিচ্ছু জানি না। ম্যাডামজি যা বলেন আমরা তাই করি।

ভানুপ্রিয়া থাকে কোথায়?

কখনও কলকাতায়। কখনও লখনউ আবার কখনও বেনারস।

এখন কোথায়?

মারুফ চুপ। মুখ থেকে রক্ত আর লালা একসঙ্গে পড়ছে। কীরে বল ভানুপ্রিয়া এখন কোথায়?

স্বয়ম্ভু ধমকে ওঠে।

এখানে।

এখানে মানে? কলকাতায়?

মারুফ মাথা নাড়ে। স্বয়ম্ভু প্রশ্ন করে, কী করেন তিনি?

মারুফ হাঁপাতে থাকে।

.

ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে আসে স্বয়ম্ভু। চোখে-মুখে উদ্ভ্রান্ত ভাব। শিবাঙ্গী জিজ্ঞেস করে, কী হয়েছে স্যার? নাম বলেছে?

বলেছে।

নিজের মধ্যে ডুবে থেকে উত্তর দেয় স্বয়ম্ভু।

সোমেন সরকার?

একদিকে সোমেনের বিরুদ্ধে তারই লোকের স্বীকারোক্তি আর অন্যদিকে ওকে অপমান করেছিল যারা তার মধ্যে অন্তত একজনের ওপর নিজের মনের আক্রোশ মেটাতে পারার আনন্দ শিবাঙ্গীর ঠোঁটে উত্তেজনার হাসি ফুটিয়ে তোলে। কিন্তু স্বয়ম্ভুর উত্তর শিবাঙ্গীর সবটুকু হাসি শুষে নেয়।

ভানুপ্রিয়া। একদিকে বাইজি, অন্যদিকে পতিতাদের মাসি। অনেক বড়ো নাকি তার হাত।

কিন্তু সে আমার ওপর আক্রমণ কেন করল? তা ছাড়া স্যার, মারুফরা যখন আমায় ঘিরে ধরেছিল তখন আমায় বলেছিল কথাকলির কেস থেকে সরে যেতে।

সেটাই তো গুলিয়ে যাচ্ছে শিবাঙ্গী। সোমেন সরকার কি ভানুপ্রিয়ার কাছে মেয়ে পাচার করে?

শিবাঙ্গী বলে, সোমেন সরকার ভানুপ্রিয়ার সাহায্য নিয়ে আমাদের আটকাতে চাইছে?

এদিকে সোমেনের অনুরোধেই সরকার আমাদের নিয়োগ করেছে।

স্যার সোমেন তো কথাকলিকে খোঁজার জন্য নিয়োগ করেছিল। কিন্তু যখন দেখল কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে কেউটে বেরিয়ে আসছে তখন আমাদের সরাতে চাইছে।

তাই যদি হয় তাহলে সরকারকে বলে সেই কাজ বন্ধ করার ক্ষমতা রাখে সোমেন সরকার। আর ওর কি কম গুণ্ডা পোষা আছে? ভানুপ্রিয়ার লোক নেওয়ার প্রয়োজন কেন হল? তা ছাড়া তুমিই তো বললে, মারুফরা বলেছিল এই কেস থেকে সরে যেতে। সেটা অবশ্য আরও বড়ো কোনো নাটক হতে পারে। লোকে জানল, সোমেন গোয়েন্দা নিয়োগ করেছে। এদিকে আড়ালে আমাদের দমিয়ে দিতে চাইছে। সাপও মরল লাঠিও ভাঙল না।

স্যার তাতে করে তো ওঁর মেয়েকেই খুঁজে পাওয়া যাবে না।

.

স্বয়ম্ভু চুপ করে ভেবে বলল, কেঁচো খুঁড়তে কেউটে নাকি কালসাপ?

স্যার কালসাপ বলে কোনো সাপই হয় না। ওটা কথার ক…।

.

বলতে গিয়েই নিজে আটকে গেল শিবাঙ্গী। ঈষৎ বিস্ফারিত চোখে স্বয়ম্ভুর দিকে তাকিয়ে দেখল স্বয়ম্ভুও ওর দিকে তাকিয়ে আছে। নীরবে দু-জোড়া চোখের চাহনিতে গোপন থেকে গোপনতর কোনো রহস্যের কথা চালাচালি হল। কিন্তু কীভাবে সম্ভব স্যার? শিবাঙ্গী বলে ওঠে। দুজনেই একই সর্বনাশের আঁচ পেয়েছে।

এমন কিছু, যা আমরা, মিডিয়া কেউ জানি না। সোমেন সরকার সযত্নে তাকে গোপন সিন্দুকের ভিতর ঢুকিয়ে রেখেছে।

স্বয়ম্ভুর গলার স্বরে আঁধার মাখা রহস্যের জাল।

.

বারুইপুর সেন্ট্রাল কারেকশনাল হোম থেকে যখন শিবাঙ্গী আর স্বয়ম্ভু বেরোয় তখন রাত হয়ে গেছে। গাড়ির দিকে এগোতে এগোতে শিবাঙ্গী বলে, স্যার কালকে তো মারুফকে কোর্টে তোলা হবে। তখন যদি মারুফ ভানুপ্রিয়ার কথা বলে দেয় তাহলে তো সব কিছু সবার সামনে এসে যাবে।

কিছু তো করার নেই। এ এমন একটা কেস মোড়ের পর মোড়, অলিগলি তস্য গলি পেরিয়ে এগিয়ে চলবে। আমাদেরকেও এভাবেই এগোতে হবে। উঠে পড়ো।

.

দুজনেই গাড়িতে উঠল। সঞ্জয় স্টার্ট দিল। ভানুপ্রিয়া আর সোমেন সরকার দুজনেই সাবধান হয়ে যাবে। স্বয়ম্ভু শিবাঙ্গীর দিকে তাকিয়ে হাসল। মারুফের নার্ভাস ব্রেকডাউন। কথা বলার মতো অবস্থাতেই নেই। যেটুকু বলছে অসংলগ্ন। ডক্টর রিপোর্ট দিয়ে দেবে। যতদিন না মারুফ সুস্থ হচ্ছে ততদিন কারেকশনাল হোমের হাসপাতালে ভরতি থাকবে। আর ঠিক ততদিনই এই কেস কোর্টে উঠবে না। এবার শিবাঙ্গীর মুখ থেকে খানিকটা হলেও চিন্তার মেঘ কাটল। বলল, কিন্তু সেটা কতদিন? এর মধ্যেই ভানুপ্রিয়াকে খুঁজে বের করতে হবে। স্বয়ম্ভু বিড়বিড় করল নামটা, ভা-নু-প্ৰি-য়া! ভ-গ-বা-ন! নাকি ভূপেন? কোন নামটা লিখতে চেয়েছিল সেলিম?

সেলিম?

কান খাড়া করে স্বয়ম্ভুর বিড়বিড়ানি শুনেছে শিবাঙ্গী।

আজ সকালে খুন হয়েছে।

সামনে তাকিয়েই কোনো এক অজানা ভাবনায় ডুবে উত্তর দিল স্বয়ম্ভু। ঠিক তখনই ফাঁকা রাস্তা পেয়ে গাড়িটার গতিটা আরও বাড়াল সঞ্জয়। স্বয়ম্ভু বলল, শিবাঙ্গী প্রিয়ব্রতকে চেনো?

সময় এখন-এর রিপোর্টার তো?

ইয়েস।

হ্যাঁ দু-একবার কথা হয়েছে।

ওকে বলে দাও কিছুক্ষণের মধ্যে একটা খবর বের করতে। ডায়মন্ডহারবারের মাজার থেকে ধরা পড়ল মহিলা পুলিশকে শ্লীলতাহানি করা অপরাধী। নাম মারুফ হোসেন। পুলিশ সূত্রে খবর পাওয়া গেছে, মারুফ নাকি জেরার মুখে সব অপরাধ স্বীকার করেছে। শুধু তাই নয়, অপরাধের মাথাদেরও নাম ব্যক্ত করেছে। তদন্তের স্বার্থে সেই নামগুলো গোপন রাখা হল। দুদিনের মধ্যে তাদের গ্রেপ্তার করে সবার নাম জানানো হবে। বলে দাও প্রিয়ব্রতকে, খবরটা যেন আধঘণ্টার মধ্যে ভাইরাল হয়। আর কৌশিককে বলো, আজ রাতে অ্যালার্ট থাকতে। বিশেষ করে শেষ রাতের দিকে। যেকোনো সময় এয়ারপোর্ট কিংবা কোনো রেলস্টেশনে ছুটতে হতে পারে। অথবা, কলকাতার কাছাকাছি যে-কোনো টোল প্লাজায়।

.

কথাগুলো বলেই নিজের ঊরুর ওপর একটা চাপড় মেরে দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁট কামড়ে মাথা দোলায়। শিবাঙ্গী বুঝল স্বয়ম্ভুর মনে এই মুহূর্তে কোন কথা বুড়বুড়ি কাটছে, শালা ঘুঘু দেখেছ ফাঁদ দ্যাখোনি!

.

শিয়োর স্যার।

.

শিবাঙ্গীর গলায় একটু যেন অন্যরকম সুর! বাতাসে হালকা মেঘের আনাগোনা। স্বয়ন্তু আড়চোখে চেয়ে হাসে। বলে, এই মুহূর্তে আমি রিস্ক নিতে চাইছি না। সবে তোমার ওপর হামলা হয়েছে। ওরা আবার তোমায় টার্গেট করলে এবার রাম লক্ষ্মণ নাও এসে পড়তে পারে। রাজারাম যে স্বয়ম্ভুর গলায় নরম হলেও একটা কাঁটা সেটা ভালোই বোঝে শিবাঙ্গী। তাই শিবাঙ্গীও ঠোঁট টিপে হাসে। কিন্তু শিবাঙ্গী জানে না যে তার গোপন হাসির মর্ম স্বয়ম্ভুও বুঝে ফেলেছে। কিন্তু সে তো গোয়েন্দা। অনেক কিছু গোপন করার ক্ষমতা আছে তার। তাই স্বয়ম্ভুর হাসিটা কারও চোখে পড়ে না।

.

সোমেন সরকারের কেসটা এখন হট কেক। চায়ের দোকান থেকে মুদিখানা সর্বত্র মানুষের চোখ টিভির পর্দায়। অফিস ফেরতা লোকের মোবাইলে খবরের চ্যানেল কিংবা কোনো নিউজ পোর্টাল। টিভির সাংবাদিক একদম স্বয়ম্ভুর বলে দেওয়া কথাগুলোই রিপিট করছে। হাতের কাচের গ্লাসটা মাটিতে আছড়ে ভেঙে ফেলল সোমেন সরকার। পাশে বসেছিল ভূপেন। উঠে দাঁড়িয়ে বলল, আশ্চর্য! বাড়িতে রাগ দেখিয়ে কী হবে দাদা? শুরুতেই বলেছিলাম এসব গোয়েন্দা-ফোয়েন্দার ঝামেলাতে জড়িয়ো না। ওরা চাষার জাত। হাতে লাঙল পেলেই মাটি কোপাতে শুরু করে। আসল কাজের বেলায় অষ্টরম্ভা।

কাচ ভাঙার শব্দে মতি ছুটে এসেছে। কিন্তু এগিয়ে ভাঙা কাচ তুলতে পারছে না। সোমেন খেপে গেলে একটাও কথা বলে না। কানের দুপাশের রগ ফুলিয়ে দাঁতে দাঁত চিপে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে।

মতি, কাচগুলো তুলে নে।

.

সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে হুকুম দিল কস্তুরী। কখন পিছনের সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসেছে খেয়াল করেনি সোমেন। মতি হুকুম তামিল করতে থাকে। সোমেনের দিকে না তাকিয়ে তাকে উদ্দেশ্য করেই কস্তুরী বলে ওঠে, মতি কাল সকালে বাড়ি যাবে। ওকে দুদিনের ছুটি দিয়েছি। ওর মেয়েটা মা মা করে কেঁদে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। সোমেন কটমট করে চেয়ে কস্তুরীকে বলে, কবে থেকে সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করলে তুমি? প্রশ্নটাকে পাত্তাই দিল না কস্তুরী।

মতি সাবধানে হাত চালাবি।

মতি চুপ করে ঘাড় নাড়ে শুধু।

কাল কারও কোথাও যাওয়া হবে না।

সোমেনের কথা শুনেই মতির বুক কেঁপে ওঠে। কস্তুরী ওপরে উঠে যাচ্ছিল। ঘুরে দাঁড়াল। আটকে রাখতে পারছ কি কিছু? ধসে যাচ্ছে তো এক এক করে!

চিৎকার করে প্রতিবাদ করলে তার তরঙ্গ যতক্ষণ থাকে ততক্ষণই সেই প্রতিবাদ স্থায়ী হয়। তারপরে অন্যায়টা আরও গা ঝেড়ে ওঠে। কিন্তু গম্ভীর গলায় শান্ত প্রতিবাদ অনেকটা আসন্ন ভাঙন কিংবা সর্বনাশের মতো। গুমগুম করে অহরহ কানে বাজতে থাকে। কস্তুরী দ্বিতীয় পন্থাই অবলম্বন করল। সোমেন চিৎকার করল না। গলা চেপে চিৎকারের ভঙ্গিতে কস্তুরীর নাম ধরে ডেকে উঠল। কস্তুরী এবার সোমেনের চোখে চোখ রেখে এগিয়ে এল। বলল, আমি চাই না আর কারও কোল খালি হয়ে যাক। আমি হতে দেব না। সোমেন চুপ করে চেয়ে রইল। মতি পাশ দিয়ে ভাঙা কাচগুলো সন্তর্পণে ভিতরে নিয়ে গেল। কস্তুরী সিঁড়ির প্রথম ধাপে পা রাখতেই সোমেন বলে উঠল, কোনোদিন মা হতে পেরেছ তুমি? কস্তুরী থমকে গেল।

আঃ দাদা থাক না।

ভূপেন আশেপাশে চেয়ে কথাটা বলল। ঈশ্বর ওপরে দাঁড়িয়ে ছিল। সে চলে গেল।

চুপ কর ভূপেন।

ধমক দিল সোমেন। কস্তুরী আবারও সোমেনের চোখে চোখ রাখল। বলল, তুমিও কি বাবা হতে পেরেছ? মুখে তীব্র শ্লেষ। কথার স্বরে শব্দভেদী বাণ। সোমেন মুখ ঘুরিয়ে আবার সোফায় বসে রিমোটটা টিপে দিল। টিভিটা মূক ও বধির হয়ে গেল।

***

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *