৪
বিশাল মাঠ ঘিরে প্রবল উত্তেজনা। ফেটে পড়ছে গ্যালারি। শিরায় শিরায় তুমুল উত্তেজনা। কেউ কেউ সুপ্রকাশের পক্ষে। এবার পাঁচশো মিটার দৌড়ে নিখিলকে টপকাতেই হবে। আর অর্ধেকের উল্লাস নিখিল মণ্ডলের নাম নিয়ে। দুরন্ত ঘোড়ার মতো ছুটছে নিখিল। গলার শিরগুলো ফুলে উঠেছে। গালদুটো ওপর নিচে টোল খাচ্ছে। পায়ে যেন বিশটা অশ্বখুর বেঁধে দিয়েছে কেউ। নিজের গণ্ডির মধ্যেই বিশাল মাঠটাতে পাক খাচ্ছে।
স্পিড দেখেছিস? নিখিলদা পড়াশুনায় যাই হোক, খেলাধুলোয় কিন্তু তুখোড়।
কথাটা বলল কথাকলির বন্ধু মহাশ্বেতা। কথাকলি পপকর্ন খেতে খেতে আড়চোখে চাইল সদ্য ভাষণ দেওয়া বন্ধুটির দিকে।
তৃপ্তি মিস তো বলছিলেন, স্কুল থেকে নাকি স্টেট চ্যাম্পিয়নশিপে পার্টিসিপেট করবে নিখিলদা।
উক্তিটি ত্রিপর্ণার। কথাকলির আরেক বন্ধু
ওই দ্যাখ ওই দ্যাখ, সুপ্রকাশদা ধরে ফেলেছে নিখিলদাকে।
রাজন্যার কথা শুনে ঠোঁটের কাছে পপকর্ন এসে থমকে রইল কথাকলির। চোখ দুটোকে আরও সজাগ করে নিখিল আর সুপ্রকাশের পাশাপাশি দৌড় দেখছে। টেনশনে মহাশ্বেতা। স্পোর্টস শুরু হওয়ার আগেই ত্রিপর্ণার সঙ্গে বাজি ধরেছে সে। তার ঘোড়া নিখিল। আর ত্রিপর্ণা বাজি লাগিয়েছে সুপ্রকাশের ওপর। বাজির মূল্য পাঁচ হাজার টাকা। বেশ কিছুক্ষণ একদম টানটান ছোটার লড়াই চলল নিখিল আর সুপ্রকাশের। কিন্তু শেষমেশ দৌড়ের অন্তিম ফিতেটা সবার আগে নিখিলেরই বুক ছুঁয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। লাফিয়ে উঠল গ্যালারি। মহাশ্বেতা প্রবল উল্লাসে এমন হাত ছুড়ল যে কথাকলির পপকর্ন হাওয়ায় উড়ে মাটিতে লুটোল।
ইডিয়ট। সবসময় বাড়াবাড়ি।
কটমট করে চেয়ে খেঁকিয়ে উঠল কথাকলি। অন্তত দশবার সরি বলল মহাশ্বেতা।
খেলা শেষে সবাই যখন স্টেডিয়ামের সিঁড়ি দিয়ে নেমে করিডোর দিয়ে বেরোচ্ছে তখন রাজন্যা কথাকলিকে বলল, কতবার বললাম তুইও স্পোর্টসে নাম দে। দিলি না কেন রে? মিতা মিস কত করে বললেন তোকে।
পাগল নাকি। আমি নাম দিলে কিছু না কিছু স্ট্যান্ড করতামই। তখন লোকে বলত কথাকলি ওর বাপের জন্য ফার্স্ট হয়েছে।
কেন?
মহাশ্বেতা জানতে চাইল।
আমার বাবা এই স্কুলে কত টাকা ডোনেশন দেয় জানিস? কল্পনাতেও আনতে পারবি না। আর সবাই এটা জানে। আমি জিতলেই বলবে, কথাকলি তো সোমেন সরকারের মেয়ে তাই ওকে ফার্স্ট করেছে।
তা কেন বলবে? স্পোর্টস কি লোকের চোখের আড়ালে হচ্ছে নাকি? সবাই তো দেখল কে দৌড়ে জিতল।
থাম তো, যা বুঝিস না তা নিয়ে ভ্যাকভ্যাক করিস না। এই দৌড়ে ছুটে আমি আমার চেহারা খারাপ করে মরি আর কি! হত কোনো বিউটি কনটেস্ট বা মডেলিংয়ের কিছু। ভেবে দেখতাম। নিদেনপক্ষে যদি একটা মিউজিক্যাল কনসার্টও হত আমি নাম দিতাম।
আজ অবধি তো একটা গানও শোনালি না কথাকলি।
আমি যা গান গাই ওসব তোরা বুঝবি না রে। এ তো রবীন্দ্রসংগীত নয়।
কথাকলির আড়ালে রাজন্যা ত্রিপর্ণার দিকে চেয়ে মুখ টিপে হাসল। হঠাৎ হইহই। এক দঙ্গল ছেলে নিখিলকে মাথায় নিয়ে নাচাতে নাচাতে আসছে। করিডোরে এতটুকুও জায়গা নেই পাশ কাটিয়ে যাওয়ার। নিখিলের মুখে হাসি ঝরে ঝরে পড়ছে। কথাকলি আর তার বন্ধুদের ঠেলে দিয়ে উল্লসিত দঙ্গল এগিয়ে চলেছে। কথাকলি প্রায় দেয়ালে পিষে যায় এমন হাল। নিখিলের ফরসা মুখটা ঘেমে লাল হয়ে গেছে। গায়ের জামাটা ভিজে শরীরের সঙ্গে লেগে আছে। হাফ প্যান্ট থেকে হালকা কার্লি লোমে ঢাকা লম্বা পা দুটো বেরিয়ে ঝুলছে। বাহুর পেশি আর উত্থিত শিরাগুলো বেয়ে ঘামের রেখা গড়িয়ে পড়ছে। মাথার চুল ভিজে সপসপ করছে। যেন সদ্য কোনো সরোবর থেকে স্নান সেরে উঠে এসেছে।
এই কথা দাঁড়িয়ে দেখছিস কী? আয়।
মহাশ্বেতা হাত ধরে ঝাঁকুনি দিতে কথাকলির খেয়াল হল ভিড়টা আর নেই। অনেকটা দূরে চলে গেছে। কথাকলি দূরাগত জয়োল্লাসের দিকে চেয়েই বলল, ছেলেটাকে দেখে বোঝাই যেত না বল, ও যে এত ভালো দৌড়োতে পারে।
সারা কলেজ বোঝে এবং জানে। কেবল তুই ছাড়া। এই প্রথম স্পোর্টসের দিন স্কুলে এলি কিনা তাই প্রথমবার জানলি।
বন্ধুর কথাগুলো কথাকলির গায়ে যেন কামড় দিল। ঝট করে বন্ধুর দিকে মুখ ঘুরিয়ে বলে উঠল, হ্যাঁ রে মহাশ্বেতা, তুই আমার বন্ধু না শত্রু রে? সবসময় ঠেস মেরে কথা বলিস কেন?
ও মা! ঠেস কোথায় মারলাম? আরে দাঁড়া… এই কথা….
.
কথাকলি আর কোনো উত্তরের অপেক্ষা না করেই নিজের চালে হেঁটে গেল। বাইরে গিয়ে গাড়িতে উঠতে যাবে অমনি দেখে খানিকটা দূরে ওদেরই একটা স্কুল স্টুডেন্ট রাস্তার একটা কুকুরের বাচ্চাকে ঢিল ছুঁড়ছে। বাচ্চা কুকুরটা কুঁই কুঁই করে কেঁদে উঠছে। ঝড়ের বেগে তেড়ে গেল কথাকলি
এই এই এই ছেলেটা। ঢিল ছুঁড়ছ কীসের জন্য? ও তোমার কী ক্ষতি করেছে?
কথাকলির উচ্চস্বর কানে যেতেই আশেপাশের সকলেই ঘুরে তাকাল। সেই ছেলেটিও পালটা তর্ক জুড়ল, তোমার কী? এটা তোমার পোষা নাকি?
আমার পোষা হোক না হোক, একটা অবলা প্রাণীকে এইভাবে মারবে?
বেশ করেছি।
আর কোনো কথা নয়, কথাকলি এদিক-ওদিক দেখে ছেলেটির ছোড়া ঢিলটা তুলেই তার দিকে তাক করে মারল। যথারীতি ছেলেটি সরে গেল। গেটের দারোয়ান ছুটে এসে ব্যাপারটা সামলাল। অনেকেই কথাকলির বাবাকে চেনে তাই বেশিরভাগ ভোটটা কথার দিকেই গেল। নিখিল সেই সময় কাঁধে কিটস ব্যাগটা নিয়ে বেরোচ্ছিল। ব্যাপারটা দূর থেকেই দেখল। নিখিল কথাকলিকে ভালোই চেনে। ওর বাবা যে এই স্কুলে মোটা টাকা ডোনেশন দেয় সেটাও জানে। ঠিক এই কারণেই যে কথাকলি নামের মেয়েটির অহংকারের শেষ নেই সে খবরও রাখে। কিন্তু আজকের ঘটনাটি কথার প্রতি নিখিলের মনকে খানিক আর্দ্রই করে দিল।
এর ঠিক দুদিন বাদে স্কুলের করিডোরেই নিখিল আর কথাকলি মুখোমুখি। টিফিন সেরে ক্লাসের পথে সকলেই। নিখিল মুখটা সরিয়েই নিচ্ছিল। কিন্তু কথাকলিই এক গাল হেসে সকলের সামনে হেইইই ডুড়, দারুণ খেলেছ সেদিন। তুমি তো লম্বা রেসের ঘোড়া। নিখিল দাঁড়িয়ে পড়ে। হাসতে বাধ্য হয়। অন্যান্য ছেলেমেয়েদের মধ্যে কেউ কেউ নিজেদের মধ্যে আলোচনা করল, ন্যাকামো দেখেছিস? সিনিয়রদের সম্মানও করতে পারে না মেয়েটা।
বাপের কেনা স্কুল হলে এমনই হয়।
.
নিখিল ধন্যবাদ জানাল। সব জায়গায় তুমি এভাবেই দৌড়োও?
মানে?
নিখিল বুঝল না। কিন্তু কথাকলির সাঙ্গোপাঙ্গরা ভালোই বুঝল তাদের কথাকলির কথার মানে।
বোর্ড এক্সাম পাস করেই তো ইলেভেনে উঠেছ নাকি?
নিখিল কী জবাব দেবে বুঝতে পারল না। এতগুলো ছেলেপিলের মাঝে দাঁড় করিয়ে জুনিয়র মেয়েটা কি ওকে চাটছে নাকি?
মনে তো হয়।
তাহলে? এইটুকু কথার মানে বুঝলে না?
কথার বন্ধুরা মুখ টিপে হাসল। নিখিল বলল, সব মানে স্কুলে বুঝতে নেই। একটা ভুরু তুলে কথাকলি বলল, তাই নাকি? মুখটা নিখিলের কাছে নিয়ে গিয়ে বলল, কোথায় বুঝতে চাও? রাজন্যা কথার পিঠে পটাস করে চাঁটি মারল। নিখিল বলল, ক্লাস আছে। যেতে হবে। টাটা। নিখিল ভাবল ওই বুঝি স্মার্ট। কিন্তু এই মেয়ে যে আরও এক কাঠি সরেস সেটা বোঝেনি। যাওয়ার আগে টকাস করে চোখটা মেরে দিয়ে কথাকলি চলে গেল। বরং নিখিলের পা-দুটোই এক জায়গায় আটকে রইল।
কী রে, ক্লাস টেন এসে ইলেভেনকে চেটে দিয়ে চলে গেল?
কোথা থেকে উড়ে এসে কাটা ঘায়ে নুন ছেটাল রোহন। দেখাদেখি বাকিরাও নিখিলকে নিয়ে খিল্লি জুড়ে দিল। সেদিন সারাদিন নিখিলকে কম অত্যাচার সহ্য করতে হয়নি। অফ পিরিয়ডে যেখান থেকে সেখান থেকে কাগজের ড্যালা উড়ে এসে গায়ে পড়ছে। হোয়াটসঅ্যাপে খিস্তির পর খিস্তি উড়ে আসছে। যারা এসব লিখছে তারাই আবার খিলখিল করে হাসছে। বাধ্য হয়ে নিখিল সেদিন লাস্ট ক্লাসটা বাঙ্ক করল। রীতিমতো পালিয়ে গেল।
পরের দিন থেকে খুব সাবধানে হাঁটাচলা করেছে স্কুলের মধ্যে যেন কোনোভাবেই ওই বজ্জাত মেয়েটির সঙ্গে চোখাচোখি না হয়। একবার দুবার এমনও হয়েছে কথাকলি নাম ধরে ডেকেছে। ডাক শুনেই সুরসুর করে অন্য সিঁড়ি দিয়ে নেমে নিখিল পগারপার। কথাকলি দিব্যি বুঝল ছেলেটি এত সহজে ধরা দেবে না। তাই একদিন তক্কে তক্কে থাকল নিখিল কখন বাথরুমে ঢোকে। সেদিন স্কুলে এসে ক্লাস করল না কথাকলি। পেট ব্যথার নাম করে পড়ে রইল ক্লাসের বাইরে। টিচাররা সরে যেতেই উঠে গিয়ে সোজা ছেলেদের বাথরুমের পাশে। মহাশ্বেতা, রাজন্যা, ত্ৰিপর্ণা পইপই বারণ করেছিল কথাকে, বেশি বাড়াবাড়ি করিস না কথা। কেস খেলে আর রক্ষে থাকবে না। কে শোনে কার কথা? বাপের স্কুল আর বাপের বাড়ি দুটোই এক।
.
ক্লাস চলছে পুরোদমে। সারা স্কুল চুপচাপ। তিনটে ক্লাসের পর চতুর্থ ক্লাসের সময় নিখিল বাথরুমের দিকে এল। ভিতরে ঢুকল। প্রস্রাব করে প্যান্টের জিপটা আটকে পিছন ঘুরতেই চমকে গেল। বাথরুমের মধ্যে কোমরে হাত দিয়ে কথাকলি দাঁড়িয়ে।
এ কী! তুমি? এটা তো ছেলেদের বাথরুম।
নিখিলের কথা শেষ হতে না হতেই কথাকলি নিখিলকে দুহাতে জড়িয়ে বলে উঠল, আমার তোমায় খুব ভালো লেগেছে। তুমি আমায় দেখে পালা ও কেন?
তুমি কি পাগল? জেন্টস টয়লেটে ঢুকে….ইশশশ… যাও এক্ষুনি কেউ এসে পড়বে। ছাড়ো।
ছাড়ব না। আগে বলো তোমারও আমায় ভালো লেগেছে।
ছাড়ো প্লিজ ছাড়ো।
.
বদনামের ভয়ে নিখিলের প্রাণ বেরিয়ে যায় আর কী! গায়ের জোরেও কথাকলির দুহাত ছাড়াতে পারল না নিখিল।
আগে আমায় একটা চুমু খাও।
নিখিলের বিপি হাই হতে শুরু করেছে। ঘেমে-নেয়ে একশা। এসব কী হচ্ছে কথাকলি? ছাড়ো। এবার গলার জোর দেখাল নিখিল। হাসি হাসি মুখটা পালটে গেল কথাকলির। সেও গম্ভীর হয়ে বলল, সোমেন সরকারের মেয়েকে ফেরাচ্ছ? এত সাহস তোমার? আমি কিন্তু এক্ষুনি চিৎকার করে লোক জড়ো করে বলব তুমি আমায় জোর করে এই বাথরুমে নিয়ে এসেছ। নিখিলের প্রাণপাখিটা বুকে নয়, একেবারে ব্রহ্মতালু ফুঁড়ে বেরোবার উপক্রম। ঠিক সেই সময় বাইরের দরজায় ধাক্কা। নিখিল টলে গেল। কিন্তু কথাকলি বুঝল এ ডাক সাবধান হওয়ার। বাইরে রাজন্যাকে দাঁড় করিয়ে এসেছে। কথাকলির চাপে রাজন্যাও ক্লাস বাঙ্ক করেছে। ধরা পড়লে বলবে বন্ধুর শরীর খারাপ তাই ওর কাছে ছিল। খুব কঠিন মুখে ডান হাতে একটা টুসকি মেরে নিখিলের দিকে আঙুল উঁচিয়ে নির্বাক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে গেল কথাকলি। বাথরুমে দাঁড়িয়েই হাঁপাতে লাগল নিখিল। উফফ! কী সাংঘাতিক মেয়ে রে বাবা! বড়োলোকের বখে যাওয়া মেয়ে। কথাটা ভাবতেই সামনের আয়নাটায় নিজের প্রতিবিম্বের ওপর চোখ পড়ে নিখিলের। নিজেকে দেখে। এই প্রথম কোনো মেয়ে ওকে জড়িয়ে ধরল। সরাসরি বলল, নিখিলকে ওর পছন্দ হয়েছে। সত্যিই কি বড়োলোকের বখে যাওয়া মেয়ে? নাকি বড্ড বেশি সরল! মনের কথাটা না লুকিয়ে এক্কেবারে সরাসরি বলে দিয়েছে। দমাস করে দরজা ঠেলে মপ হাতে ঢুকে আসে বাথরুম পরিষ্কারের লোক। তখনকার মতো চটক ভেঙে যায় নিখিলের। কিন্তু আবেশটা লেগেই থাকে। মধ্যরাতে ঘুমের ঘোরে সাড়ে সাত বছরের ছোটো ভাই পাশ ফিরতে গিয়ে একটা হাত আর পা নিখিলের গায়ের ওপর তুলে দেয়। ঘুমন্ত ভাইয়ের মুখের দিকে চেয়ে মুচকি হাসে। তারপর হাতটা নিজের গায়ের ওপর থেকে তুলতে গিয়েও আবার বুকের ওপর রেখে দেয়। নিখিলের জীবনে তার ভাই স্বপ্নীল অনেকটা জায়গা জুড়ে আছে। কত আবদার তার দাদার কাছে। যত ফিচকুটি সব দাদার সঙ্গেই। মানুষ মানুষকে তখনই জড়িয়ে ধরে যখন সে তাকে নির্দ্বিধায় বিশ্বাস করে, ভালোবাসে। তাহলে কি কথাকলির বলা কথাগুলো সত্যি? অমন বড়োলোকের মেয়ের কি সত্যিই এই ছাপোষা হ্যালাব্যালা নিখিলকে ভালো লাগে? অন্ধকার ঘরটায় হঠাৎই চিলতে আলো চলকে উঠল। ঘাড় ফিরিয়ে মাথার কাছে রাখা মোবাইলটা দেখল নিখিল এত রাতে হোয়াটসঅ্যাপ? অচেনা নম্বর। মেসেজ ট্যাপ করতেই লেখা, ঘুমোচ্ছ না দৌড়োচ্ছ? নিখিলের বুকের ভিতর ছলাৎ। কথাকলি? ওর নম্বর জোগাড় করে মেসেজ করছে?
.
কী করলি? উত্তর দিলি?
স্কুলের মাঠে দৌড়োনোর জন্য ওয়ার্ম আপ করতে করতেই প্রশ্নটা করল বিশ্বরূপ। নিখিল বলল, একবার ভাবলাম দিই। তারপর ভাবলাম নাহ! মাথায় চেপে বসবে।
সাবধান ভাই। কোন বাপের মেয়ে জানিস তো?
এম.এল.এ।
বিশ্বরূপ গলা চেপে নিখিলের কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে বলল, শিশু পাচার কেলেঙ্কারি!
অ্যাঁ! মানে?
আঁতকে উঠল নিখিল।
আজ থেকে বছর চারেক আগে একটা বড়ো কেস হয়েছিল সোমেন সরকারকে নিয়ে। শিশু পাচার করে নাকি?
ধুস! আসল অপরাধী তো সেখানে ধরা পড়ে গেছে।
বাল জানিস তুই। মন্ত্রীরা মোটা টাকা দিয়ে গরিব লোকগুলোকে লেলিয়ে দেয়। বাবাই তো বলছিল। আসলে যে ধরা পড়েছে তার পরিবারকে নাকি কয়েক লাখ টাকা দিয়েছে এই সোমেন সরকার। মন্ত্রীর হয়ে সে জেল খাটছে। সব আই ওয়াশ ভাই।
.
নিখিল আনমনা হয়ে গেল। কোনটা ঠিক কোনটা ভুল সব গুলিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বরূপ ঠ্যালা দিল। বলল, হেব্বি একটা লিঙ্ক পেয়েছি। শেয়ার করেছি তোকে। দেখিস। একা দেখবি। কথাগুলো যে কোনো নিষিদ্ধ কেস সংক্রান্ত সে ভালোই বুঝল নিখিল।
.
বিশ্বরূপের পাঠানো ভিডিয়ো জুড়ে নারী-পুরুষের প্রমত্তলীলা। কামসূত্র সিনেমা থেকে কিছু দৃশ্য কেটে বানানো একটি ভিডিয়ো। যেখানে রেখা প্রথমে নৃত্যের মাধ্যমে বোঝাচ্ছে নারী-পুরুষের রতিক্রিয়া। পরে রাজার সঙ্গে রানির সঙ্গিনীর অবৈধ শারীরিক খেলা। প্রেমে অবৈধ বলে কিছু নেই। প্রেমের সঙ্গে একাঙ্গী হয়ে মিশে আছে রমণ, মর্দন। উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে নিখিলের শরীর। কখন যেন কামসূত্রের রাজার মধ্যে নিখিল নিজেকেই দেখতে শুরু করেছে। সঙ্গিনী কথাকলি। ডুবে যাচ্ছে নিখিল। ডুবতে ভালো লাগছে ওর। ঠিক সেই সময়েই ভিডিয়োর ওপর ফুটে ওঠে কথাকলির হোয়াটসঅ্যাপ ভিডিয়ো থামিয়ে মেসেজ ট্যাপ করতেই লেখা, এই যে দৌড়বাজ। আমার লগে দৌড়াইবা? তোলপাড় হয়ে যায় নিখিলের অন্তরাত্মা।
.
পরের দিন স্কুলে টিফিনের সময় কথাকলি তার সাঙ্গোপাঙ্গদের নিয়ে খুব হাসি মশকরা করছে। হঠাৎ খেয়াল করে দূরে নিখিল একদৃষ্টে ওকে দেখছে। তারপর কোনো কথা না বলে আড়ালে চলে গেল। কথাকলি ছুটে এল নিখিলকে ধরতে। নিখিল ছাত্রছাত্রীদের ভিড় টপকে স্কুলের পিছনের দিকে চলেছে। যেতে যেতে পিছন ফিরে একঝলক কথাকলিকে দেখে নিল। কথাকলিও বুঝল ভ্যাবলাকান্ত ইশারাও জানে। সেও দৌড়ল।
.
মেসেজ করো কেন?
ভালো লাগে তাই
স্পোর্টসে ইন্টারেস্ট আছে বলে তো মনে হয় না।
রাইট।
তাহলে দৌড়োতে চাও কেন?
.
কথাকলি চোখ পাকিয়ে তাকিয়েই খিলখিল করে হেসে উঠল। হেসেই চলেছে নিখিলের কাণ্ড দেখে। আচমকা নিখিল কথাকলিকে নিজের বুকের কাছে টেনে ধরল। বুকে তার তুফান উঠল। একগুচ্ছ ঝলমলে আলো একটু আগেই যে মুখে খেলে বেড়াচ্ছিল মুহূর্তে তার রং রূপ বদলে গেল। খন হল মেঘ। কথাকলির সদ্য যৌবনের গন্ধমাখা বুক দুটো বেহায়ার মতো স্পর্শ করে আছে নিখিলের বুক। কথাকলি ফিসফিসে ঘন স্বরে বলল, দৌড়োতে গেলে পালাতে হবে। সাহস আছে? এরপর কিছুক্ষণ একে অপরের চোখের দিকে চেয়ে রইল।
.
আগুনে পুড়বে জেনেও পতঙ্গ প্রজ্বলিত হুতাশনের অভিসারী হয়। সকল বাঁধ ভেঙে দেওয়ার উল্লাস যেন নিশির ডাকের মতো হাতছানি দেয়। কানের কাছে সমুদ্রের প্রবল গর্জন। দামি হোটেলের সাগরমুখী বারান্দায় দাঁড়িয়েই কথাকলি নিখিলের হাতটাকে নিজের স্তনের ওপর রাখল। কেঁপে উঠল নিখিল। নিশ্বাস পড়তে থাকল ঘন ঘন। আরও অনেকটা কথাকলির কাছে সরে এল নিখিল। ঠোঁটের মধ্যে ঠোঁট ডুবে গেল।
.
নরম বিছানায় উন্মত্ত যৌবনের খেলার মাঝেই রণে ভঙ্গ দিল নিখিল। কথাকলির শরীর ছেড়ে উঠে বসল। না না, এ ঠিক হচ্ছে না। যদি একটা অঘটন ঘটে যায় তখন? কথাকলিও নিখিলের শরীর ছুঁয়ে উঠে বসল। সাপিনীর মতো হিসহিসে গলায় বলল, কেবলুরাম একটা। খালি পায়ে দৌড়োতে যদি এতই ভয় স্নিকার আনোনি কেন? নিখিল ফ্যালফ্যাল করে কথাকলির দিকে তাকিয়ে রইল। নেশাতুর চোখে একটা কন্ডোমের ছোটো প্যাকেট নিখিলের মুখের সামনে ধরল কথাকলি। একের পর এক দুঃসাহসিকতার সীমা অতিক্রম করে এগিয়ে চলেছে কথাকলি। যা নিখিলের কল্পনারও অতীত।
.
সম্ভোগে আবেগে মাখামাখি সেই এক রাত। চোখের পাতায় ঘুমের মতো লেগে রইল নিখিলের। বিপত্তি ঘটল পরের দিন সকালে। গত রাতের উষ্ণতাটুকু জিইয়ে রাখতে একে অপরকে জড়িয়ে বালুকাবেলায় বসেছিল। উতল বাতাস এলোমেলো করে দিয়ে যাচ্ছে কথাকলি আর নিখিলের ইহকাল। প্রেমের দু-একটি কথা সুরের মূর্ছনার মতো নিখিলের ঠোঁটে বাজছে। সেই সুরে তাল দিয়ে চলেছে কথাকলির আলাপ। জলভেজা সকালের সোনালি আলোটুকু ওদের ঘিরে খেলে যাচ্ছে অবিরত। সেই আলোতেই একটা ছায়া এসে দাঁড়াল ওদের ঠিক পিছনে। গম্ভীর স্বরে ডাকল, কথাকলি! দুজনেই ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকাল। মনে হল সমুদ্রটা কারও জোর ধমকে থেমে গেছে। কানের পর্দায় আর সাগরের মুখরিত কলতান নেই।
স্যার আপনি?
কথাটা বলে দুজনেই উঠে দাঁড়াল। মোটা গোঁফওয়ালা লোকটা কথাকলি আর নিখিলকে ভালো করে মেপে নিল।
স্কুলের প্রিন্সিপালের ঠান্ডা ঘরটা অনেকক্ষণ বেশ চুপচাপ। থমথমে। কথাকলি সাহসী। কিন্তু প্রিন্সিপালের সামনের চেয়ারে বসে পাশে বাবা সোমেন সরকারকে নিয়ে হাত-পা এই ঘরটার চেয়েও ঠান্ডা হয়ে গেছে। প্রিন্সিপাল চিত্রলেখা চক্রবর্তী একটু আগেই হোটেলের বিলটা ধরিয়ে দিয়েছে সোমেন সরকারের হাতে। গলা ঝেড়ে মেয়ের দিকে বিরক্তির দৃষ্টিতে তাকাল সোমেন। তারপর চিত্রলেখাকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞেস করল, কথাকলিকে যা শিক্ষা দেওয়ার আমি তো দেবই। আমি শুধু আপনাদের ডিসিশনটা জানতে চাইছি। আপনাদের স্কুলে কাকে বেশি প্রয়োজন? একজন মেরিটোরিয়াস স্টুডেন্ট নাকি একজন ভালো দৌড়বাজ? দুজন একসঙ্গে এক ছাদের নিচে আর থাকতে পারবে না। অন্তত আমি আমার মেয়েকে অ্যালাও করব না।
না না মিস্টার সরকার। একটা ভালো স্কুলের নাম হয় মেরিটোরিয়াস স্টুডেন্টের জন্যই। তাই কথাকলিকে আমরা কোনোভাবেই ছাড়ছি না। স্পোর্টসম্যান খুঁজলে অনেক পাওয়া যাবে।
থ্যাংক ইউ ম্যাডাম।
.
সোমেন সরকার প্রিন্সিপালের ঘর থেকে বেরিয়েই থমকে গেল। বাইরের করিডোরে নিখিল মুখ কালো করে দাঁড়িয়ে। কথাকলি জুলজুল করে নিখিলের দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিল। সোমেন সরকার নিখিলের দিকে এগিয়ে গেল। ছেলেটার মাথায় হাত বোলাল। কথাকলি অবাক হয়ে বাবার কাণ্ড দেখল। নিখিলের হৃদপিণ্ডটা হাতে চলে আসার জোগাড়। দাঁত চেপে সোমেন সরকার বলল, এখন শুধু স্কুল ছাড়া করলাম। কথাকলির দিকে এরপর চোখ তুলে তাকালে ভিটেমাটি ছাড়া করব। নিখিলের গালে দুটো আদুরে চাপ্পর মেরে মেয়েকে নিয়ে চলে গেল। কথার দিকে চোখ তুলে তাকাতে বারণ করেছে, তবুও শেষবারের মতো কথাকলির দিকে চোখ তুলে তাকাল নিখিল। ও দেখতে পেল কথাকলি কীভাবে তার মোহিনী মায়ায় নিখিলের সবটুকু শুষে নিয়ে চলে গেল। একটা কথাও সে বলল না।
***
