৭
একদিন ছুটি হয়েছে কলেজ। ছেলেমেয়েরা কলেজের সামনেই একে অপরের সঙ্গে দেখা করছে, গল্প করছে, কেউ কারও জন্য অপেক্ষা করছে, কেউ বা দেরি হওয়ার জন্য মোবাইলে কোনো বন্ধুকে গালাগাল দিচ্ছে। এদেরই মাঝে এক বয়স্ক লম্বা রোগা ভদ্রলোক হাতে একটা কাগজ নিয়ে বেশ অনেকক্ষণ থেকে ছেলেমেয়েদের কাছে গিয়ে কী যেন বলছে। কিন্তু প্রত্যেকেই সরিয়ে দিচ্ছে।
শ্রীতমা তার বন্ধুর সঙ্গে দাঁড়িয়ে আইসক্রিম খাচ্ছিল। সেও লোকটিকে দুয়েকবার দেখল। বয়স্ক লোকটি শ্রীতমাদের কাছেও এল। বলল, তার মেয়ের খুব অসুখ। নিশ্বাসের কষ্ট। হসপিটাল থেকে এই ওষুধগুলো লিখে দিয়েছে। অনেক দাম। কিনতে পারছে না। অন্তত একটাও যদি কেউ কিনে দেয়। শ্রীতমা এবং বাকিরা হাতজোড় করল। সেই সময়েই কথাকলি তার তাঁবেদারদের নিয়ে হাসতে হাসতে যাচ্ছিল সেখান দিয়ে। লোকটি তাদের কাছেও প্রেসক্রিপশন দেখিয়ে একই কথা বলে। তানিয়া বলে ওঠে, অনেক জায়গায় বিনা পয়সায় ওষুধ দেওয়া হয়। খোঁজ করুন পেয়ে যাবেন। বয়স্ক লোকটি নাছোড়। মুখটা কাঁদো কাঁদো। অনেক খুঁজেছি। অবস্থা খুব খারাপের দিকে যাচ্ছে। একটা ইনহেলার কিনে দাও না মা। ভগবান অনেক ভালো করবেন।
থামুন তো। আপনাদের মতো একজনকে যেই হেল্প করব অমনি দশজন এসে হাজির হবেন। যান এখান থেকে প্লিজ। কথা চ। কী দেখছিস হাঁ করে? চল চল।
.
কথাকলি সুজানের কথায় পাত্তা দিল না। বলল, দাঁড়া। কথাকলি অনেকক্ষণ ধরে লোকটির দিকে তাকিয়ে ছিল। এবার বলল, এই ওষুধ আপনার জন্য চাই তো? মেয়ের জন্য নয়। বয়স্ক লোকটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। প্রেসক্রিপশনে কারও নাম নেই। কিন্তু কথাকলি এতক্ষণ ধরে লোকটার কথা বলা ফলো করছিল। লোকটি অসম্ভব হাঁপাচ্ছে। কথা বলল, আপনার তো শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। বয়স্ক লোকটি বলল, সকাল থেকে একভাবে হেঁটে চলেছি মা। আর পারছি না। বাড়িতে বউটা কোমর ভেঙে বিছানায়। এখন আমার কিছু হয়ে গেলে তাকে দেখার কেউ নেই। আমার জন্য ওষুধের কথা যাকেই বলছি সেই বলছে, পুরুষমানুষ ভিক্ষে করছেন কেন? খেটে খান। সুস্থ হয়ে যাবেন। তাদের কী করে বোঝাই মা আমার শরীরের অবস্থা? কথাকলি বলল, আসুন আমার সঙ্গে। বলেই সামনের ওষুধের দোকানে নিয়ে গেল। লোকটি লজ্জায় একটাই ওষুধ চাইছিল। কিন্তু কথাকলি প্রেসক্রিপশনের সব কটা ইনহেলার সমেত যা যা ওষুধ আছে বেশি করে কিনে দিল। দোকানের বাইরে এসে আরও দুশো টাকা খুচরো লোকটার হাতে গুঁজে দিয়ে বলল, অটো করে বাড়ি চলে যান। হাঁটবেন না। লোকটি বলল, না মা। অটো করে গেলে বেশি খরচা। তাছাড়া এখানে অটো পাওয়াও যায় না। আমি বাসে করে চলে যাব। ভগবান তোমার মঙ্গল করুক। লোকটি হাঁপাতে হাঁপাতে বাসস্ট্যান্ডের দিকে চলে গেল।
.
তানিয়া বলল, কথা তুই একটা গাধা। লোকটা জাস্ট অ্যাক্টিং করে তোর থেকে ওষুধগুলো বাগিয়ে কেটে পড়ল। তুই আবার তাকে টাকা দিলি। কথাকলি বলল, শোন তানিয়া, এইটা যদি লোকটা অভিনয় করে থাকে তাহলে মনে কর আমি ওর অভিনয়ের প্রাইজ দিয়েছি। অস্কার উইনিং অ্যাক্টিং। কিন্তু আমি জানি, এটা কোনোভাবে অ্যাক্টিং নয়। বেচারা! যাক গে, চল লেট হয়ে যাচ্ছে। কথাকলি যে কতটা বোকামি করল সেটা বোঝাতে বোঝাতে তার বন্ধুরা তাকে জাহান্নমের পথে নিয়ে চলল।
***
সেদিন আমার হাতের আইসক্রিমটা হাতেই গলে গিয়েছিল। নতুন এক কথাকলিকে দেখেছিলাম। মনে হয়েছিল, বাইরে যতই সে জঘন্য দুশ্চরিত্র হোক, ভিতরে এখনও হয়তো কোথাও হিউম্যানিটি বেঁচে আছে।
.
শিবাঙ্গী অবাক হয়ে শুনল শ্রীতমার কথাগুলো। কিছু বলতে পারল না। শ্রীতমা আরও বলল, পয়সা তো অনেকেরই থাকে, ওর মতো না হলেও আমি গরিব নই। কিন্তু আমিও সেদিন লোকটাকে সাহায্য করিনি। কথাকলি করেছিল। ওকে আমি পছন্দ না করলেও আমি মন থেকে চাই, ও ফিরে আসুক। ভালো মেয়ে হয়ে যাক। আসি আমি।
বিকেলের পড়ন্ত রোদ্দুর গায়ে মেখে শ্রীতমা নামের ভালো মেয়েটা ঘরে ফিরে চলল। কিন্তু জাহান্নামের নষ্ট মেয়েটা হঠাৎ করেই শিবাঙ্গীর চোখে গোপন আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠল।
.
সন্ধের অন্ধকার মাথায় নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে দুম করে এক জায়গায় গাড়ি থামাতে বলল স্বয়ম্ভু। গাড়ি সাইড করল সঞ্জয়। রাস্তার পাশেই গরম গরম চপ ভাজছে। আলু, ক্যাপসিকাম, লঙ্কা, ডিম কতরকমের চপ। জিভে জল এল স্বয়ম্ভুর। সুচিত্রাও এগুলো খেতে খুব ভালোবাসে। আরও একজন ভালোবাসে, শিবাঙ্গী। আজ বড্ড কড়া আচরণ করে ফেলেছে বেচারির সঙ্গে।
তিনটে আলু, তিনটে ক্যাপসিকাম আর তিনটে ডিমের চপ দাও তো। তিনটে জায়গায় ভাগ করে দাও।
বলেই প্যান্টের পিছন পকেট থেকে মানিব্যাগটা বের করল স্বয়ম্ভু। হঠাৎ একটা ডাক, ও ভোলাদা! এই নামটা শুনলেই কান দুটো গরম তেলেভাজার মতো ফুলে ওঠে। কিন্তু এলাকার লোক ভোলাকে তো ভোলাই বলবে। পিছন ফিরে দেখল ইস্ত্রি দোকানের ছেলেটা। কী হয়েছে?
মন্ত্রীদের চপ খাওয়াবে নাকি?
ক্যা?
মুখটা ভেটকে বিস্ময় প্রকাশ করল স্বয়ম্ভু ওরফে ভোলা। ছেলেটি বলল, আরে ওই সোমেন সরকার গো, দলবল নিয়ে তো তোমার বাড়িতে এসেছে দেখলাম।
হোয়াট! ফাক! সঞ্জয় চলো।
.
বলেই গাড়িতে চাপল স্বয়ম্ভু।
ও দাদা চপটাআআআআ?
চপওয়ালা হেঁকেই সারা। ঝড়ের গতিতে ছুটে গেল গাড়ি।
.
বাড়ির সামনে ভরতি পুলিশি প্রহরা। সঙ্গে সোমেনের খাস লোক। সঞ্জয়ও অবাক। মন্ত্রী স্বয়ম্ভুর বাড়ি এসেছে মানে নির্ঘাত কোনো ধান্দায়। স্বয়ম্ভু সোজা নিজের বাড়িতে ঢুকে গেল। সোমেন তখন বাইরের ঘরে চায়ের কাপে আয়েশ করে চুমুক দিচ্ছে আর সুচিত্রার প্রশংসা করছে। সুচিত্রা মুখে একটা মেকি হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে। মাকে সুস্থ শরীরে দেখে খানিক স্বস্তি পেল স্বয়ম্ভু। ঘরে ঢুকল। সোমেন একমুখ হাসি নিয়ে বলে উঠল, ওই তো আপনার গোয়েন্দাপুত্র এসে গেছে। আসুন স্বয়ম্ভুবাবু। এতদিন আমার বাড়িতে যাচ্ছেন অথচ একবারও বলেননি তো যে মাসিমা এত ভালো দুধ চা বানান।
আপনি আমার বাড়িতে হঠাৎ?
স্বয়ম্ভু যতটা সম্ভব স্বাভাবিক স্বরেই প্রশ্নটা করার চেষ্টা করল। আরও বেশি স্বাভাবিক স্বরে বেশ খুশি খুশি মেজাজে সোমেন উত্তর দিল, ওমা! আপনিও তো হঠাৎ করেই আমার বাড়িতে যান। তাই আমিও হঠাৎ করেই চলে এলাম। আসলে কী জানেন তো স্বয়ম্ভুবাবু, আপনি সারাদিন এত হিল্লিদিল্লি করছেন তাই আপনাকে আর ফোন করে বিরক্ত করিনি। একেবারে সোজা আপনার বাড়িতে চলে এসেছি, আমার মেয়েটার খবর নিতে। আমার মেয়েটা কোথায় গেল স্বয়ম্ভুবাবু? জলজ্যান্ত মেয়েটা গাড়ি সমেত উবে গেল। এটা হতে পারে?
আমি যে আপনার বাড়িতে গেছি সে খবর ভূপেনবাবু জানালেন আপনাকে আর আপনার মেয়ের গাড়িটা যে নকল নম্বর প্লেট সমেত উদ্ধার হয়েছে সেটা বলেননি।
বলেছে। সেখানেই তো ভয়। মেয়েটা তো পালায়নি তাহলে। তাকে কেউ কিডন্যাপ করেছে। নইলে গাড়ির নম্বর বদলাবে কেন? নিশ্চয়ই চালকের কোনো অসৎ উদ্দেশ্য ছিল।
সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহই নেই। পুরো কাজটাই আগাগোড়া অসৎ।
খোঁচাটা বুঝেও রিঅ্যাক্ট করল না সোমেন। বলল, শুনছি তো কথার বন্ধু ইশিতা সেও নাকি উধাও হয়ে গেছে পরিবার সমেত। আচ্ছা, ওরা আমার মেয়েকে সরিয়ে নিয়ে যায়নি তো?
কেন? ওরা কেন সরাবে?
অর্থ অনর্থের মূল স্বয়ম্ভুবাবু। অর্থের লোভ যে কী সাংঘাতিক!
আপনি যেটা মিন করতে চাইছেন সেটা যদি সত্যি হত তাহলে এতক্ষণে মুক্তিপণ চেয়ে ফোন আসত। সেসব তো আসেনি।
না তা আসেনি।
অর্থাৎ এই গল্পটাও টিকল না।
গল্প!
সোমেনের গলায় এবার সন্দেহের সুর।
জীবনের প্রতিটা পর্বে যা ঘটে বা ঘটে চলেছে তার সবটাই কারও না কারও সাজানো গল্প সোমেনবাবু।
সোমেন কষ্ট করেই হাসল। বলল, ভালো কথা বলেন আপনি।
ষড়যন্ত্রের জালের চেয়েও মারাত্মক গোয়েন্দাদের কথার জাল। সাবধানে পা ফেলবেন।
দেখেছেন মাসিমা, আপনার ছেলে নিজের বাড়ির অতিথিকে কেমন ভয় দেখাচ্ছে। এটা কি ঠিক বলুন তো?
আহ্লাদি মুখে কথাগুলো বলল সোমেন।
মা। তুমি ঘরে যাও।
স্বয়ম্ভু হুকুমই করল। সঙ্গে সঙ্গে সোমেনও সেই তালে তাল ঠুকল। হ্যাঁ হ্যাঁ মাসিমা, আপনি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছেন। যান। ঘরে গিয়ে রেস্ট করুন। সুচিত্রা যেতে যেতে ছেলের মুখের দিকে করুণ চোখে ফিরে তাকাল। স্বয়ম্ভুর চলে যাওয়ার জন্য চোখের ইশারা করল। সুচিত্রা ঘরে অদৃশ্য হল।
.
আসলে স্বয়ম্ভুবাবু…
বলতে বলতে সোমেন দু-পা এগোতে গেল স্বয়ম্ভুর দিকে। তার আগেই স্বয়ম্ভু তিন পা সোমেন সরকারের দিকে এগিয়ে এসে চোখে চোখ রেখে বলে, ছবিগুলো দেখেই এসেছেন তো? সোমেনের মুখ থেকে হাসিটা স্বয়ম্ভু যেন অদৃশ্য মন্ত্রবলে নিমেষে ছিনিয়ে নিল। সোমেনও হতভম্ব হয়ে কিছুক্ষণ স্বয়ম্ভুর চোখে চোখ রেখে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর বলল, আমি কথা দিচ্ছি আপনাকে, আমার মেয়েটা ফিরে এলে মুখ্যমন্ত্রীকে বলে আপনাকে একটা পদ্মশ্রী পাইয়ে দেব।
পদ্মফুল ঘাসফুল কিচ্ছু লাগবে না আমার। আপনি শুধু এইটুকু দেখুন যাতে আমার তদন্ত পথে কেউ কোনো বাধা সৃষ্টি না করতে পারে। বাঁধা তো তারাই দেয় যারা অন্যায় করেছে।
কথা দিলাম, আমার মেয়েকে খোঁজার পথে কেউ আপনাকে একচুলও বাধা দেবে না। শুধু অযথা কিছু ফালতু বিষয় নিয়ে আর মাথা ঘামাবেন না। কে নিজেকে বিশাল কিছু প্রমাণ করতে আমাকে নিয়ে কবে কীসব লিখেছিল সেসব নিয়ে কেন মাথা ঘামিয়ে সময় নষ্ট করছেন? মনে রাখবেন ছদিন হয়ে গেল আমার মেয়ে বাড়ি ফেরেনি।
স্বয়ম্ভু হাসল। বলল, তাহলে স্বীকার করছেন তো যে কথাকলি বুধবার নয়, মঙ্গলবার পার্টিতে গিয়েছিল। কারণ গত মঙ্গলবার থেকে আজ সোমবার অর্থাৎ ছয়দিন। সাতেও নয়, পাঁচেও নয়। ছয়দিন। নিমেষে যেন সোমেনের মুখটা রক্তশূন্য হয়ে গেল।
ওটা কথার কথা। হিসেবের ভুল মাত্র। ওটা ধরবেন না।
একটু আগেই বললাম না, গোয়েন্দার কথার জাল ষড়যন্ত্রের জালের থেকেও মারাত্মক।
শুনুন, সোজা কথা এবার সোজাভাবেই বলি। আমার হাতে বিশেষ সময় নেই। আপনি আমার থেকে আমার মেয়ের ওপর বেশি ধ্যান দিন। আমার ইহকাল পরকাল নিয়ে নাই বা ভাবলেন।
কান না টানলে যে মাথা আসে না সোমেনবাবু।
কী বলতে চাইছেন কী?
এবার সোমেনের গলায় কড়া ধাঁচের মোচড়
বলছি আমি কিছু বের করছি না। আপনার মেয়েকে খুঁজতে গিয়ে অতীতের কবরগুলো থেকে আপনা থেকেই সব বেরিয়ে আসছে। আমার কাজ দুয়ে দুয়ে চার করা।
দেখবেন, দুয়ে দুয়ে চার করতে গিয়ে সব কিছু যেন ছারখার হয়ে না যায়। ওই কী যেন নাম মেয়েটার, যে আপনার পেছন পেছন ঘুরঘুর করে।
আমার সাবঅর্ডিনেট, লালবাজারের একজন যোগ্য অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব ইন্সপেক্টর শিবাঙ্গী বসু। ও ফেউ নয় যে পেছন পেছন ঘুরঘুর করবে।
হ্যাঁ হ্যাঁ, ওই শিবাঙ্গী বসু, ওনাকে নাকি কাল রাতে শ্লীলতাহানির চেষ্টা করা হয়েছে? ছেলেগুলো মাঝরাস্তায় নাকি কাপড়-টাপড় খুলতে চেয়েছিল।
সোমেনবাবু, যারা শিবাঙ্গীর কাপড় খুলতে চেয়েছিল এবার তাদের কাপড় খোলা হবে। ন্যাংটা করে রাস্তায় নাচাব। আর সেই ফুটেজ আপনি টিভিতে বসে দেখবেন।
সোমেনের চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে। স্বয়ম্ভুর কানের কাছে মুখ এনে সোমেন ফিসফিস করে বলল, নিজের কাপড়টা সামলে রাখবেন। বলা তো যায় না, কখন কী হয়! চলি! সোমেন সরকার দৃপ্ত পদে স্বয়ম্ভুর বাড়ি ছাড়ল। যাওয়ার বেলার কথাগুলো স্বয়ম্ভুর শিরায় বিদ্যুৎ ছুটিয়ে দিয়ে গেল।
এই কেসটা তুই ছেড়ে দে ভোলা।
সুচিত্রা কখন যে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে খেয়াল করেনি স্বয়স্তু।
এ কথা কেন বলছ মা?
আমার ভয় করছে। ও তোকে মেরে ফেলবে ভোলা।
এসব কী আজেবাজে বকছ? তোমায় কিছু বলেছে?
.
সুচিত্রা চুপ করে থাকে। স্বয়ম্ভু আবার প্রশ্ন করে, কী গো বলো। কী বলেছে তোমায়? সারা মুখে ভয়ের আস্তরণ নিয়ে সুচিত্রা বলল, আমায় জিজ্ঞেস করল তুই আমার একমাত্র ছেলে কিনা। আমি বললাম হ্যাঁ। ও বলল, হাজব্যান্ড? বললাম, তোর ছোটোবেলায় মারা গেছে। তারপর থেকে তুই-ই আমার সব। তোর জন্যেই বেঁচে থাকা। তখন ও বলল, ওহো, তাহলে তো ছেলেকে ছাড়া আপনার একা থাকতে বড্ড অসুবিধে হবে। আমার বুকটা না ছ্যাঁৎ করে উঠল। আমি বললাম, মানে? ও বলল, না মানে আপনার ছেলে যে প্রফেশনে আছে তাতে কখন কী হয়ে যায় কেউ কী বলতে পারে? ছেলেকে একটু সাবধান করে দেবেন। যাই কাজ করুক যেন সাবধানে করে। আমার মেয়েটাকে হারাবার পর থেকে সব বাবা মায়েদের আমি এই কথাই বলছি। সন্তান বড়ো আদরের ধন। যত্ন করে আগলে রাখবেন। ও ভোলা, এই কেসটা ছেড়ে দিলে কি তোর খুব ক্ষতি হয়ে যাবে? মায়ের কথা শুনে স্বয়ম্ভুও চিন্তায় পড়ে গেছে। কিন্তু সেটাকে প্রশ্রয় না দিয়ে সুচিত্রাকে দুহাতে ধরে বলল, এই না কদিন আগেও তুমি লেকচার দিতে, গোয়েন্দাকে পেটে ধরেছি আমি। কার কত সাধ্য দেখি আমার ক্ষতি করে! সেই তুমি এখন পুরো পালটি খেয়ে গেলে?
বয়স হচ্ছে। বড্ড ভয় করে। এই তো অপর্ণা ফোন করে শিবাঙ্গীর ঘটনাটা বলল। অসহায়ের মতো কাঁদছে। এত খারাপ লাগল। বীরাঙ্গনা মেয়ে তার বাপ-মাকেও এত বড়ো দুর্ঘটনাটা বলেনি।
.
পকেটে রাখা ফোনটা বেজে উঠল। শিবাঙ্গী। স্বয়ম্ভু তার মাকে বলল, নাম নিতেই তোমার বীরাঙ্গনা হাজির। হ্যালো…! ফোনের ওপার থেকে প্রবল উত্তেজনা, সব ঠিক আছে তো স্যার? স্বয়ম্ভু বুঝল খবর চলে গেছে। তোমায় কে আনাল?
পুলিশ কখনও তার খবরের সোর্স বলে না।
নিঃশব্দে হাসল স্বয়ম্ভু। বাইরের দিকে মুখ বাড়িয়ে গাড়ির মধ্যে সঞ্জয়কে দেখে নিয়ে বলল, সোর্স সম্ভবত এখনও আমার বাড়ির সামনে গাড়িতে বসে আছে। ফোনের ওপারে ফিক করে হেসে ফেলার শব্দ। স্বয়ম্ভু বলল, যাক গে শোনো, কাল সকালে অপারেশন ডায়মন্ডহারবার।
জানি স্যার। ফোর্স রেডি আছে।
স্বয়ম্ভু আকাশ থেকে পড়ল। জানো? কীভাবে? শিবাঙ্গী বলল, ঘটি খায় বাটি ভরে, মানে ঘটিরা বাটি ভরে চিংড়ি মাছ খায়। ঘটিদের প্রিয় খাবার কিলায় নাই সেই পোকা। এটা কোনো অবাঙালির লেখা তাই কেল্লাকে কিলা বলেছে আর চিংড়িকে জলের পোকা বলা হয়। কিলায় নাই সেই পোকা মানে কেল্লায় চিংড়ি নেই। মানে চিংড়িখালি। দরগায় হাজি আলি, মানে হাজির দরগা। এখানে একটু চালাকি আছে। হাজির দরগা বলে তেমন কিছু পেলাম না যেটার সঙ্গে চিংড়িখালি রিলেটেড। তবে হাজিপুরে দরগা আছে। আর এই হাজিপুরেই আছে চিংড়িখালি কেল্লা। এখন যদিও ধ্বংসাবশেষটুকুই সম্বল। কিন্তু প্রশ্ন হল এই হাজিপুরটা কোথায়? খুঁজে দেখলাম, ডায়মন্ডহারবারের আসল নাম হাজিপুর। সেখানেই চিংড়িখালি কেল্লা এবং একটি দরগাও আছে।
ব্র্যাভো শিবাঙ্গী ব্র্যাভো। কিন্তু ফোর্স কেন রেডি করেছ? আমি তো কিছু বলিনি। আর কালকেই লাগবে সেটাই বা জানলে কীভাবে?
আমার ওপর যে দুজন হামলা করেছে একটা তো চোখের সামনেই খালাস। বাকি আছে মারুফ হোসেন। যাকে এই চত্বরে পাওয়া যাচ্ছে না। এদিকে আপনি এমন একটা ধাঁধা দিলেন যেটা একটা মুসলিমদের দরগার কথা বলছে। তাই আন্দাজেই দুয়ে দুয়ে চার করে ফোর্সকে বলে রেখেছি। লাগলে ভালো, না লাগলে না লাগল।
গ্রেট জব শিবাঙ্গী।
থ্যাংক ইউ স্যার।
তবে কাল বেরোবার আগে এই অ্যাড্রেসটা আমায় একবার কনফার্ম করতে হবে। তারপর বেরোব।
কোথা থেকে স্যার?
কাল সকালে তোমার গলির মুখে দাঁড়িয়ো তুলে নেব।
ওকে স্যার।
বাইরে অতটা প্রকাশ না করলেও ভিতরে ভিতরে স্বয়ম্ভুর মনে আনন্দের বন্যা বইল। সকাল থেকে মিছেই কষ্ট পাচ্ছিল সে। শিবাঙ্গী তার স্বয়ম্ভুর কড়া কথার ধরন ধরে বসে থাকেনি।
তবে স্যার নর্থ বেঙ্গল থেকে এখনও কোনো পজেটিভ খবর পাইনি। আমি নিজে কয়েকটা জায়গায় কল করেছিলাম। নর্থ বেঙ্গলের কোথাওই ঈশিতা ভদ্র বা তার পরিবারকে দেখা যায়নি।
বেঙ্গল হয়ে ভুটান ঢুকে যেতে পারে।
হ্যাঁ স্যার সেখানেও খোঁজ নিয়েছি। ওরা ছবি দেখে আইডেনটিফাই করতে পারেনি।
স্বয়ম্ভু একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। এখন ভরসা শুধু ভুটান এম্ব্যাসি। তারা যদি খবর না দিতে পারে তাহলে বিষয়টা চাপের।
স্যার আমরা শুধু ভুটানেই কেন খোঁজ করছি? নেপাল, অসম এমনকী বাংলাদেশেও তো যেতে পারে।
গাড়িটা যেখান থেকে পাওয়া গেছে সেটা ভুটানের একদম কাছে ওখান থেকে নেপাল, অসম বা বাংলাদেশে সম্ভাবনা কম। তা ছাড়া প্রত্যেকটা বর্ডারে স্পেশ্যাল সিকিউরিটি রাখা আছে। তাদের সব্বার কাছে ঈশিতার ফ্যামিলি আর কথাকলির ছবি আছে। এয়ারপোর্টেও দেখা যায়নি। রেলওয়ে থেকেও কোনো খবর দিতে পারেনি। ব্যাটারা মাঝপথ থেকে উবে গেল নাকি?
আরও খারাপ কিছু হয়নি তো?
সেটা হলেও তো লাশ পাওয়া যেত। এতগুলো লাশ একসঙ্গে ভ্যানিশ কীভাবে হয়ে যায়? প্রতিটা মরচুয়ারি খোঁজা হয়েছে। কোনো অ্যাক্সিডেন্টের খবর নেই।
.
হাত দিয়ে নিজের মাথার চুলগুলো ঘেঁটে নিল স্বয়ম্ভু। কাল সকালের টাইমিংটা. হোয়াটসঅ্যাপ করে দেবে জানিয়ে ফোনটা রেখে দিল।
.
সারাদিন অপরাধ আর অপরাধীদের পিছনে ছুটতে ছুটতে ক্লান্ত লাগে স্বয়ম্ভুর। তাও যদি কোনো না কোনো ক্লু পাওয়া যায় সেখানে ছুটে মজা আছে। কিন্তু কূলকিনারা নেই যে কেসের, কেবল রহস্য খুঁড়তে খুঁড়তে অতল পাতালে তলিয়ে যাওয়াই ভবিতব্য সেখানে অন্তরাত্মা নুইয়ে আসে। অঝোর শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে শুরু থেকে মেলাবার চেষ্টা করছে স্বয়ম্ভু। মনে পড়ছে নানান লোকের নানা কথা। বুধবার কথাকলি পার্টিতে গেল। যাওয়ার আগে কাকা ভূপেন খেয়াল করল কথা কী রঙের ড্রেস পরে যাচ্ছে। ভেনুর সিসিটিভিতে দেখা গেল পার্টিটা মঙ্গলবার ছিল। কথার গায়ে সেই একই ড্রেস। তাহলে বাড়ির লোক একটা দিন লুকোচ্ছে কেন? ঈশিতার সঙ্গে কথা বলাটা সম্পূর্ণ মিথ্যে। কিন্তু কেন? ঈশিতাদের সঙ্গে এর কানেকশন কীসের? পার্টিতে মেঘা নন্দীর সঙ্গে ঝগড়া। বিষয় সোমেন সরকার। স্যামকে ঘটনাস্থলে পাওয়াই গেল না। স্যামের মা কথাকে পছন্দ করে না। অথচ কথা স্যামের বাড়ি গিয়ে অনেক রাত কাটিয়েছে। কীভাবে সম্ভব? ধরে নেওয়া হল মেঘা স্যামকে লাইক করে। কথাকলিকে সরাতে সোমেনের কেচ্ছা শুনিয়ে মেঘাই স্যামের মায়ের মন বিষিয়ে দিয়েছে। কিন্তু তাও কথাকলি নিমন্ত্রণ পেল। কথাকলির অনেক বয়ফ্রেন্ড। তারা অনেকেই কথার রাতের সঙ্গীও। কিন্তু তারা সবাই উপস্থিত। কথাকলি নেই। সোমেন ও তার পরিবারের দাবি মেয়ে পার্টি থেকে বাড়িতে ফেরেনি। অথচ বুধবার কথাকলির গাড়ি ঈশিতাদের রিসিভ করে। ড্রাইভার কে ছিল? সোমেনের বাড়ির একটা সিসিটিভিও কাজ করে না। অথচ আছে। অদ্ভুত। সবথেকে বড়ো কথা, সোমেন সরকার প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে নিজেই বাধা দিচ্ছে কেন? বুঝতে পারেনি, যে নিজের অতীতটাও বেরিয়ে আসবে? নিজের মেয়ের কেসটাকে দিয়ে কি প্রশাসনকে ব্যস্ত রাখছে যাতে তাদের দৃষ্টি অন্য কোনো দিকে না যায়। আর সেই ফাঁকে কোনো গোপন বড়ো কাজ সেরে নেবে! কী কাজ? সেলিম বলল, সোমেন বাচ্চা পাচার করে না। কিন্তু মেয়ে পাচার করে শিয়োর। কিন্তু এখন তো সবদিকে অজস্র পাহারা। অবশ্য যদি সরষের ভেতরেই ভূত থাকে তাহলে তো আর…
.
শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে থেকে দুপাশে মাথাটা ঝাঁকিয়ে নিল। জলগুলো মুক্তোবিন্দুর মতো বাথরুমের চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ল।
.
স্নান সেরে চুল আঁচড়ে কোমরে বাঁধা টাওয়েলটা খুলে একটা বার্বুডা গলিয়ে নিল। বিছানায় এলোমেলো করে রাখা জামাকাপড়গুলো তুলে আলনার ওপর রাখতে গিয়ে থমকে গেল। জামার পকেট থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ পড়ল। ছাড়া জামাকাপড় আলনায় ঝুলিয়ে কাগজের টুকরোটা তুলে ভাঁজ খুলে দেখল তাতে বাচ্চাদের মতো ট্যাঁড়াব্যাঁকা হাতের লেখায় নীল কালিতে লেখা, কথা আছে ভগবানের কাছে। লেখাটা পড়েই চমকে ওঠে স্বয়ম্ভু। কে দিল কাগজ? কখন দিল? কথা ভগবানের কাছে আছে মানে? ভগবান দাস? সোমেন সরকারের মালি? ওর কাছে কথা কীভাবে…! এটা দিল কে? সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ল আজ সকালেই ঠাকুরঘরে মাটি ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে গিয়ে স্বয়ম্ভুর গায়ে টলে পড়েছিল কস্তুরী। তার মানে তখনই কস্তুরী চালাকি করে লেখাটা পকেটে গুঁজে দিয়েছে! হাতের লেখাটা হয়তো ইচ্ছে করেই বাচ্চাদের মতো করে লিখেছে যাতে কেউ ওকে সন্দেহ না করে। বিছানায় ধপ করে বসে পড়ল স্বয়ম্ভু। লোকটাকে শুরু থেকেই একটু সন্দেহজনক মনে হয়েছিল। যতই ভুলে যাওয়া রোগ থাক, নিজের বড়ো ছেলে বেঁচে আছে না মরে গেছে সেটাও খেয়াল থাকবে না? স্বয়ম্ভু ঘেঁটে যাচ্ছে। কাল সকালেই কি অতর্কিতে হানা দেবে ভগবানের বাড়ি? নাকি মারুফের বন্দোবস্ত করে তারপর…! মগজে চিড়িক আলো। সোমেন সরকার নিজের মেয়েকে ভগবানের কাছে রেখে হারিয়ে যাওয়ার নাটক সাজায়নি তো? নিজের মেয়ে চেনা বিশ্বস্ত লোকের কাছেই রইল অথচ কারও মাথাতেই আসবে না অত বড়োলোকের মেয়ে একজন মালির ঘরে লুকিয়ে আছে। এদিকে নিজের দুষ্কর্ম চালিয়ে যাবে। কাজ হাসিল হলে আরও একটা নাটক লিখে বলে দেবে মেয়ে ফিরে এসেছে। এই ভাবনাটা মাথায় আসতে স্বয়ম্ভু যেটুকু চনমনে হয়ে উঠেছিল নিমেষে সেটা ফেটে যাওয়া গ্যাসবেলুনের মত চুপসে গেল। কস্তুরী যদি জানেই যে মেয়ে তার পরিচিত লোকের কাছেই আছে তাহলে দিনরাত না খেয়ে ঠাকুরের চরণে কেন পড়ে থাকবে? কেঁদে ভেঙে পড়বে কেন? ভগবানের কাছে কথাকলি তার মানে সেফ নয়? এর পরেই যে ভাবনাটা স্বয়ম্ভুর মাথায় বিষাক্ত পোকার মতো কামড়ে ধরে সেটা বড়ো ভয়ংকর এবং অবিশ্বাস্য। সোমেন নিজেই বলেছে, অর্থ অনর্থের মূল। সেই অর্থের লোভেই কি নিজের মেয়েকে … না না। এ অসম্ভব!
.
মাথাটা গুলিয়ে উঠছে। বুদ্ধির গোড়ায় একটু ধোঁয়া না দিলে চলছে না। দেরাজ খুলে গোপন জায়গায় রাখা একটা সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল স্বয়ম্ভু। ঠোঁটের সামনে লাইটারের উত্তাপ। মনের সব ধন্দ নিয়ে একরাশ ধোঁয়া উড়ে গেল স্বয়ম্ভুর ঠোঁট ছুঁয়ে। চোখের সামনে থেকে ধোঁয়ার আস্তরণ সরতেই দূরে গলির মুখে একটা অবয়ব। আলোর নিচে ছায়ামূর্তি হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে কেউ একজন চোখটা ঘষে আরও ভালো করে দেখার চেষ্টা করল স্বয়ম্ভু। কারওর জন্য কেউ অপেক্ষা করছে কি? নাহ! লোকটার মুখ এই বাড়ির দিকেই। মাথার মধ্যে অজস্র রক্তজালিকাগুলো ফুলে উঠছে স্বয়ম্ভুর। দিগ্ভ্রান্ত হয়ে ছুটছে রক্তকণিকাগুলো। স্বয়ম্ভু সেনের বাড়ির ওপর নজর? কেন কে জানে, একটা নাম চলকে উঠল হঠাৎ করে। পুরুষোত্তম মাল! সিগারেটটাও তেতো লাগল। দোতলার বারান্দা থেকে সিগারেটটা ছুড়ে ফেলে ঘরে চলে এল। বারান্দার দরজাটা বন্ধ করে দিল। কিছুক্ষণ পর জানলাটা অল্প ফাঁক করে দেখল টি লাইটের আলোটা একলা হয়ে গেছে। সেই ছায়ামূর্তি আর নেই।
.
ঘরে আলো নিভিয়ে বিছানায় বসল স্বয়ম্ভু। পাশের টেবিলে ল্যাম্পটা জ্বলছে। আজকে বাড়িতে সোমেনের আসা, বাইরে ছায়ামূর্তির পাহারা দেওয়া, সেলিমের ধাঁধা সব মিলিয়ে স্বয়ম্ভুর মন ভীষণ কু ডাকছে। কেবলই মনে হচ্ছে কিছু ঘটতে চলেছে। কারণ হয়তো-বা কেউটের লেজে পা ঠেকে গেছে।
সরি এত রাতে ফোন করছি।
শিবাঙ্গীকে ফোন করল স্বয়ম্ভু।
এগারোটা কোনো রাত নয় স্যার। বলুন।
শিবাঙ্গী উত্তর দিল।
কাল ফোর্স নিয়ে তুমি ডায়মন্ডহারবার চলে যেয়ো। সবাই যেন নরমাল পোশাকে থাকে। যত সকালে পারো ওই দরগাকে ঘিরে ভালো করে নজর রেখো। কারা বেরোচ্ছে কারা ঢুকছে পারলে ছবি তুলো।
ওকে স্যার। বাট আপনি যাবেন না?
যাব। তবে ওই যে বললাম এক জায়গায় যাব। সেখানে ভেবেছিলাম তোমায় সঙ্গে নেব কিন্তু সেটা সম্ভব নয়। দেরি হয়ে যাবে। আমি জাস্ট একটা কথা জেনেই বেরিয়ে যাব।
একটা কথা বলব স্যার?
প্লিজ।
কৌশিককে সঙ্গে নেব?
কেন? একা সাহস পাচ্ছ না?
না স্যার। ওর আসলে ফোটোগ্রাফির হাত খুব ভালো। ওকে ভাবছি ফোটগ্রাফার সাজিয়ে নিয়ে যাব। তা ছাড়া আপনার সঙ্গে কাজ করতে পারছে না বলে দিনরাত খালি হাহুতাশ করে। তাই ভাবছিলাম…
নো ইস্যু। ওকে ভালো করে কেসটার ডিটেলস দাও। আর এই অপারেশনটা তুমিই হ্যান্ডেল করো।
ওকে স্যার। স্যার, একটা কথা বলব?
বলো।
শুধু দেরি হয়ে যাওয়ার জন্যে নয়, আপনি নিশ্চয়ই কিছু সাসপিশিয়াস জিনিস অবজার্ভ করেছেন তাই এই প্ল্যান। তাই তো?
স্বয়ম্ভু হাসে। ও এতদিনে জেনে গেছে শিবাঙ্গীর কাছ থেকে কিছু আড়াল করে রাখা এত সহজ নয়। গুড অবজার্ভেশন। আচ্ছা শোনো, কীভাবে হবে মন দিয়ে শুনে নাও। এক কাজ করো তো, কৌশিককেও লাইনে নাও।
.
বেশ কিছুক্ষণ ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে করতেই পুরো প্ল্যানটা ছকে নিল দুই সাবর্ডিনেটের সঙ্গে। ফোনটা রাখার পর স্বয়ম্ভু বুঝতে পারল একটু আগেই বুকের মধ্যেকার চাপ চাপ ভাবটা অনেকটা হালকা হয়ে গেছে। কিন্তু কেন? এখনও তো কিছু সলভই হয়নি। তাহলে? কারণ কি তবে শিবাঙ্গী? ওকে কিছু শেয়ার করলেই স্বয়ম্ভু হালকা হয়ে যায়! নিজেই হেসে ফেলে। ঘরের আলোটা নিভিয়ে শুয়ে পড়ে।
আগের দিনের রাস্তাটা মনে ছিল সঞ্জয়ের। সোজা খিদিরপুরের সেই এঁদো গলির মুখেই গাড়িটা এনে দাঁড় করাল। আজ পনেরোই আগস্ট। মোড়ে আয়োজন হয়েছে পতাকা তোলার। স্বয়ম্ভু আর সঞ্জয় দুজনেই অবাক হয়ে গেল। সকাল সকাল তিনটে পুলিশের গাড়ি কেন? কিছু পুলিশও ইতিউতি ছড়িয়ে আছে। এই এঁদো গলিতে কোনো মিনিস্টার এসে পতাকা তুলবে নাকি? তাই আগেভাগে পুলিশ পোস্টিং? স্বয়ম্ভু গাড়ি থেকে নেমেই গলির মুখে যেতে এক পুলিশ ইনস্পেক্টর পথ আটকায়। স্বয়ম্ভু চোখের দিকে তাকাতেই ইনস্পেক্টর জিভ কাটে। ওহ সরি স্যার। আমি প্রথমে চিনতে পারিনি। স্বয়ম্ভু জিজ্ঞেস করে, খিদিরপুর পি এস?
ইয়েস স্যার।
কিছু হয়েছে?
আর বলবেন না স্যার, এই গলিতেই এককালের কুখ্যাত খুনি ও বাচ্চাপাচারকারি সেলিম থাকত। আজ ভোর রাতে মার্ডার হয়ে গেছে।
হোয়াট?
.
বিস্ময়তে গলা ফেটে কথাটা বেরিয়ে এল। আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে রীতিমতো দৌড়ে গলি, তস্য গলি পার করে সেলিমের ঘরে। খিদিরপুর থানার ওসির সঙ্গে ছোট্ট দুটো কথায় পরিচয় পর্ব সারল স্বয়ম্ভু। তারপরেই মাটির দিকে চোখ। কাঠের তক্তাপোশের সামনেই মুখ থুবড়ে পড়ে আছে সেলিম। পিঠে ছুরি গাঁথা। রক্তে ভেসে যাচ্ছে ঘর। স্বয়ম্ভু ওসিকে জিজ্ঞেস করন, এটা হল কখন?
আজ ভোরের দিকে।
খবর দিল কে?
পাশের লোকজন ভোর রাতে একটা দুটো গুলির আওয়াজ শোনে।
গুলি?
হ্যাঁ। রিভলভারটা পেয়েছি। দূরেই পড়েছিল।
.
আবার ভালো করে সেলিমের বড়ির দিকে তাকিয়ে স্বয়ম্ভু বলল, রিভলভারটা সেলিমেরই। সেলিমের ডেডবডির ওপর একের পর এক ঝলসে উঠছে ক্যামেরার ফ্ল্যাশ। ওসি বলল, সেটাই মনে হচ্ছে। কারণ ছুরি দিয়ে খুন করলে খুনি রিভলভার ফেলে যাবে কেন? স্বয়ম্ভু সঙ্গে সঙ্গে ঘরের একটা নির্দিষ্ট দিকের দেয়াল পর্যবেক্ষণ করতে করতে বলল, আর কারও লাশ পাননি তো?
না।
এই দেখুন।
.
স্বয়ম্ভু পুরোনো ইট বেরিয়ে থাকা দেয়ালে আঙুল তুলে দেখাল। ওসি দেখল। স্বয়ম্ভু দেয়ালের একটা ছোটো গর্তের মধ্যে থেকে গুলি উদ্ধার করল। গুলিটাকে দুই আঙুলের ফাঁকে ধরে স্বয়ম্ভু বলল, নাইন এম এম প্রমাণ সংগ্রহকারীর হাতে দিল গুলিটাকে। তৎক্ষণাৎ সেটা পলিথিনের পাউচে ঢুকে গেল।
কিন্তু আরেকটা গুলি কোথায় গেল? দেয়ালে তো নেই। ঘরে পেয়েছেন?
না তো।
তার মানে সেটা মার্ডারারের গায়েতেই লেগেছে। ওই দেখুন রক্তের ফোঁটা।
.
এই ঘরে প্রবেশের যে দরজা সেদিকে মাথা করেই শুয়ে থাকত সেলিম। ঠিক উলটোদিকের আয়নায় দরজাটা রিফ্লেক্ট করত। কিন্তু রক্ত পড়েছে দরজার দিকে নয়। ঘর দিয়ে আরেকটা ঘরে যাওয়ার যে দরজা অর্থাৎ সেলিমের পায়ের কাছের যে দরজা সেদিকে। সেই দরজাটা এখন খোলাই। সেদিন এটা বন্ধ ছিল। স্বয়ম্ভু রক্তের ফোঁটা বাঁচিয়ে পাশের অন্ধকার ঘরে ঢুকল। পিছন পিছন ওসিও গেল। সেই ঘরেই একটা জানলা। পাল্লাদুটো খোলা। রক্তের ফোটাগুলো সেই জানলার কাছেও পড়েছে। স্বয়ম্ভু কাছে গিয়ে দেখল। প্রায় ভেঙে আসা প্রাচীন কাঠের পাল্লাতে রক্তমাখা হাতের আঙুলের ছাপ। সেই ছাপটাই চোখ টেনে ধরল স্বয়ম্ভুর। যে মানুষের হাতের ছাপ তার ডান হাতের রিং ফিঙ্গারটা অর্ধেক। অর্থাৎ তার হাতে সাড়ে চারটে আড়ন। এই জানলার পিছনেই আরেকটা গলি। যেটা এঁকেবেঁকে কোনো একটা রাস্তায় মিশেছে। ওসি বলল, যে এসেছে তার এ বাড়িতে আনাগোনা ছিল। নইলে এই রাস্তা জানবে কীভাবে?
অস্বাভাবিক কিছু নয়। কালকেই একটা কেসের ব্যাপারে আমার সেলিমের সঙ্গে কথা হয়। এই বাড়িতেই।
তাই নাকি?
হুম। কথা বলে বুঝেছিলাম, এই পুরোনো বাড়িটায় বসে সারা কলকাতা শহরে কোথায় কোন অপরাধ হচ্ছে, কে পালাচ্ছে সব সেলিম জানতে পারে। এতটাই সাংঘাতিক সোর্স ওর।
স্ট্রেইঞ্জ।
ঠিক তখনই স্বয়ম্ভুর স্মৃতিতে চলকে ওঠে কালকে চলে যাওয়ার আগে সেলিমের বলা কথাগুলো। যদি আল্লাতালাহ জিন্দা রাখে তো ফিরসে বাতচিত জরুর হোবে। সেলিম আরও বলছিল, আপনার পিছে জিন আছে। উও সবসময় আপনাকে দেখে। সম্ভলকর চলিয়ে গা।
.
সেলিমের বডির সামনে হাঁটু মুড়ে বসল স্বয়ম্ভু। মনে মনে বলল, আমার পিছে জিনের নামটা না বলেই চলে গেলে সেলিম? তখনই মাটির ওপর উপুড় হয়ে থাকা সেলিমের ডান হাতটা নজরে পড়ে স্বয়স্তুর। হাতের আঙুলে রক্ত। আততায়ী ঘরে ঢুকল সেলিমকে মারতে এল। সেলিম টের পাওয়ার আগেই পিঠে ছুরি বসিয়ে দিল। সেলিম কি উপুড় হয়ে শুয়েছিল? স্বয়ম্ভু চট করে বিছানার চাদরটা দেখে নিল। হ্যাঁ ঠিক, সেখানটাও রক্তে লাল। তার মানে ছুরি খাওয়ার পরেই রিভলভার বের করে সেলিম গুলি ছোড়ে। আততায়ীর গায়ে না লেগে দেয়ালে লাগে। তারপর আততায়ী পালাতে যায়। তখন আবার একটা গুলি। নাকি তার আগে কিঞ্চিৎ ধস্তাধস্তিতে সেলিম মাটিতে পড়ে? যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে লোকটি ছুরিটি না তুলে ঘরে থেকে গেল কেন? নাকি সেলিম দ্বিতীয় গুলি ছোড়ে এবং আততায়ী পালাবার আগে জখম হয়। তারপর কোনোভাবে যন্ত্রণায় হোক বা কোনো কারণে সেলিম তক্তাপোশ থেকে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে!
কী বুঝঝেন স্যার?
অনেকক্ষণ স্বয়ম্ভুকে চুপ করে হাঁটু মুড়ে বসে থাকতে দেখে খিদিরপুর থানার ওসি প্রশ্ন করল। স্বয়ম্ভু বলল, ভাবছি, সেলিম মাটিতে কীভাবে পড়ল? বলেই ঘাড় বেঁকিয়ে সেলিমের বুকের দিকে দেখতেই লক্ষ করল বেশিরভাগ রক্তই তার বুক চুইয়ে বেরিয়ে মাটি লাল করেছে। লাশটাকে উলটে দি স্বয়ম্ভু। সেলিমের বুকের ওপর আরও একটা ছুরিকাঘাতের চিহ্ন।
.
ওহ গড।
.
ওসি বলে উঠল। স্বয়ম্ভু বলল, সেলিমকে দুবার ছুরি মারা হয়েছে। প্রথমে বুকে। কিন্তু সেলিম তাতে মরেনি। বরং পালটা বন্দুক চালাতে যায়। ঠিক সেই মুহূর্তে হয়তো আততায়ীর সঙ্গে ধস্তাধস্তি হয়। সেলিম মাটিতে পড়ে যায়। আবার একটা ছুরির ঘা পিঠে। এবার সেলিম ঘুরে গুলি চালায়। কিন্তু প্রথমটা মিস করে। পরেরটায় আততায়ী জখম হয় আর পালিয়ে যায়। এটা কী?
.
স্বয়ম্ভুর নজর এতক্ষণ বুকের দিকে থাকায় নজর পড়েনি। এখন স্বপ্নভূর সঙ্গে খিদিরপুর থানার ওসির নজরও মাটিতে পড়ে। এখন বুঝতে পারছে, সেলিমের হাতে কেন রক্ত। সেলিম নিজের রক্ত দিয়ে মাটিতে কিছু একটা হিন্দিতে লিখতে চেষ্টা করেছে। খানিকটা শুকিয়ে গেছে। কিছুটা এখনও থকথকে হয়ে জমে আছে। স্বয়ম্ভু উচ্চারণ করে, ভ?
-ভ নাকি ম? হিন্দিতে দুটোই প্রায় সেম স্যার। শুধু মাত্রার পার্থক্য।
ওসি বলল। কিন্তু স্বয়ম্ভুর মনে অন্য চিন্তা, কথা আছে ভগবানের কাছে। ভ দিয়ে ভগবান। কিন্তু ম দিয়ে কে? এই মুহূর্তে এই কেস ঘিরে যতগুলো নাম বাতাসে ঘুরে বেড়াচ্ছে সেগুলো স্বয়ম্ভুর মানসচক্ষে একবার করে ভেসে উঠেই মিলিয়ে গেল। নাহ! একটাও ম দিয়ে নেই। বরং ভ দিয়ে আছে। হাত উলটে ঘড়ি দেখল স্বয়ম্ভু। অনেকটা দেরি হয়ে গেল। আজ ব্যাটা মারুফকে … চড়াক করে বাজ পড়ল মাথায়। ম-এ মারুফ? মারুফ এখানে? কাল রাতে ও খুন করেছে? না না, শিবাঙ্গী যা বলেছে তাতে মারুফের পক্ষে উঠে হেঁটে বেড়ানো সম্ভব নয়। কারণ পায়ের হাড় জখম হওয়ার শব্দটা শিবাঙ্গী স্পষ্ট পেয়েছে বলল। ডায়মন্ডহারবার না গেলে বোঝা যাবে না। উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল স্বয়ম্ভু। লাশটাকে পোস্ট-মর্টেমে পাঠান। পকেট থেকে নিজের কার্ডটা বের করে এগিয়ে দিয়ে স্বয়ম্ভু বলল, এখানে আমার নম্বর আছে। আপডেট দেবেন। যদি ফোনে না পান অবশ্যই টেক্সট করে রাখবেন। আমায় এখনই বেরোতে হবে। কথাটা শেষ করেই দেয়ালে ঝোলানো ছোট্ট আয়নাটার দিকে চোখ পড়ে স্বয়ম্ভুর। যার মধ্যে এই মুহূর্তে ওর পিছনের দরজাটা দৃশ্যমান। আবারও সেলিমের শেষ কথাগুলো গুমোট বাতাসটা স্বয়ম্ভুর কানের কাছে ভনভন করে গেল। যদি আল্লাতালাহ জিম্মা… পিছে জিন আছে! স্বয়ম্ভু শিয়োর, কাল এই ঘরে যখন ও আর সেলিম ছিল তখন ঘরের বাইরে ছিল অন্য কেউ। যাকে এই আরশি দিয়ে দেখতে পেয়েছিল সেলিম। তাই হয়তো রিভলভার নিয়েই রেডি হয়েছিল। কিন্তু শেষ রক্ষা হল না।
.
মাজারের গেট দিয়ে পা রাখলেই খোলা চাতাল। মাঝে গোল মতন জায়গা করে একটা সবুজ রঙের বড়ো পতাকা পোঁতা। এই গোলাকার জায়গা ঘিরেই আজ মানুষের মেলা। হারমোনিয়াম আর ঢোলক বাজিয়ে একদল বসে কাওয়ালি ধরেছে। সঙ্গে গানের ছন্দে সমবেত হাততালিতে মুখরিত বিশাল মাজার। পুরুষ কাওয়ালরা সকলেরই সাদা পোশাক। প্রধান গায়ক ও তার সহ গায়ক যথাক্রমে লাল আর সবুজ রঙের পোশাকে সেজেছে। এই মাজারে নাকি মাসে একবার করে কাওয়ালির আসর বসে। এখানে যত মহিলা বেশিরভাগই আজ কালোর সঙ্গে গোলাপি, নীলচে, সবজে, ছাইরঙা বোরখায় সেজেছে। চার পাশেই মাজারের অলিন্দ। ভিড়ের মাঝেই পা রাখল লোকটা। চতুর্দিকে সতর্ক চাহনি তার। অজস্র মুখের ভিড়ে সুরমা আঁকা দুটো চোখ খুঁজে চলেছে একটি মুখ। লোকটির গালভরতি লাল দাড়ি। গাল থেকে প্রায় গলা ছাপিয়ে বুক পর্যন্ত নেমেছে। পরনে ধবধবে সাদা পাঠানি কুর্তা পাজামা। মাথায় ঘিয়ে রঙের ফেজ টুপি। গায়ের রং ফরসা।
.
স্বয়ম্ভুর নির্দেশ মতো ছবির পর ছবি উঠছে বিশাল মাজারটার। কৌশিক মনপ্রাণ ঢেলে ছবি তুলছে। খানিক এপাশ-ওপাশ করছে আর আড়চোখে নজর রাখছে। পুলিশের লোক ছড়িয়ে আছে সিভিল ড্রেসে।
তুই কোথায়?
ছবি তুলতে তুলতেই প্রশ্ন করল কৌশিক। কানে গোঁজা এয়ারড্রোপ। উত্তর এল, ভেতরে!
ভেতরে কখন ঢুকলি?
চুপ করে ছবি তোল। আল্লাহ…
.
একটা দীর্ঘশ্বাস শোনা গেল শিবাঙ্গীর গলা থেকে। এসেছে? আবার প্রশ্ন করল কৌশিক। উত্তর এল, চোখে পড়েনি। এপার থেকে অমনি কৌশিক ভেঙিয়ে বলল, আল্লাআআআআআহ! ভিতরে বোরখার আড়ালে ফিক করে হেসে ফেলল শিবাঙ্গী।
.
অলিন্দের মধ্যে ঢুকতেই ইসলামীয় বৈভবের প্রকাশ। রঙের বাহারে চোখ জুড়িয়ে যায়। ঝকঝক করছে মাটি, দেয়াল, সিলিং। নানান জায়গায় উর্দু লেখ। জায়গাটা পেরিয়ে গেলেই পিরের থান। সেখানেও ভক্তের সমাগম। বৌদ্ধদের যেমন থানকা এখানেও সেরকম রঙিন লম্বা লম্বা ঝলমলে কাপড় দিয়ে সাজানো পিরের আসনের চারপাশ। কিছু মানুষ আসছে। প্ৰাৰ্থনা করছে। আবার বেরিয়ে যাচ্ছে। শুধু একটাই মহিলা কালো বোরখা পরে ঠায় বসে আছে। লোকটা কী যেন ভাবল। তারপর মহিলাটির পাশে গিয়ে বসল। ভবে একটু পিছন দিক করে। পাশে কারও উপস্থিতি টের পেল শিবাঙ্গী। বলে উঠল, ইয়া আলি! পাশের লোকটি অমনি ফিসফিস করে বলে উঠল, রহেম আলি। তারপর দুজনেই চুপ। শিবাঙ্গী বলল, অন্দর সে কবুল হ্যায়। পাশ থেকে আরও দুজন আল্লাহর চরণে প্রার্থনা জানিয়ে চলে গেল। সেই ফাঁকে কৌশিক এয়ারড্রোপে জিজ্ঞেস করল, এসেছে? শিবাঙ্গী উত্তর দিল না। দুবার কাশল। এবার পাশ থেকে আবার বলল, আল্লাআআআহ, মুঝে অন্দর সে সাফ করো।
শিবাঙ্গী বলল, কবুল হ্যায়।
শিবাঙ্গী উঠে দাঁড়াল। বাঁ-দিক দিয়ে আরও ভিতরে যাওয়া যায়। সেদিকে ঘুরতেই শিবাঙ্গী আড়চোখে দেখে লোকটি মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে আছে। মুচকি হেসে ভিতরের দিকে ঢুকে যায়। বুঝতে পারে ওর পিছনে পিছনে ওর সবচেয়ে ভরসার, ভীষণ চেনা লোকটিই আসছে। কিন্তু স্যার তো কাল বলল, ও যেদিকে সার্চ করবে তার উলটোদিকে স্বয়ম্ভু সার্চ করবে। একবার জিজ্ঞেস করা যাক, কিন্তু সাবধানে। এদিকটায় খুব একটা লোকজন নেই ঠিকই। তবে মাজারের বাইরের দিকটা যতটা আলো ভিতরটা ঠিক ততটাই অন্ধকার। সেটাই স্বাভাবিক। নইলে মারুফের মতো দুষ্কৃতিকে আদর করে রাখবে কী করে? ভাবতে ভাবতেই স্বয়ম্ভু শিবাঙ্গীকে ক্রস করে এগিয়ে যাওয়ার আগে ফিসফিসে গলাতেই বলল, ডাঁয়ে তরফ। বলেই ঝড়ের যেগে লোকটি সামনে এগিয়ে বাঁ-দিকে বেঁকে গেল। সেদিকে একটা সিঁড়ি উঠে গেছে। শিবাঙ্গী কথা না বাড়িয়ে বসের কথামতো ডানদিকের ঘরে ঢুকে গেল। স্যাঁতসেঁতে খালি ঘর। ভিতরে কীসের যেন চড়া গন্ধ। তেমন কিছুই নেই। কেবল একটা তক্তাপোশ। হঠাৎ এয়ারড্রোপটা টুক শব্দ করে বন্ধ হয়ে গেল। হ্যালো, হ্যালো। দুবার বলার পরেই সশব্দে ঘরের দরজাটাও বন্ধ হয়ে গেল বাইরে থেকে। চমকে ঘুরে তাকাল শিবাদী। ঘরের কোণ থেকে ক্রমাগত স্প্রে হতে থাকে। ঘরের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে থাকে ক্লোরোফর্মের গন্ধটা। শিবাঙ্গী বুঝতে পারে। সঙ্গে সঙ্গে নিজের নাক-মুখ চেপে ধরে। প্রথমে মুখ না খুলে দরজায় ধাক্কা দিতে থাকে। কিন্তু তাতে কোনো ফল হচ্ছে না। বাইরে উচ্চৈঃস্বরে কাওয়ালি গাওয়া হচ্ছে। চোখ মাথা ভারী হয়ে আসছে শিবাঙ্গীর। শেষে বাধ্য হয়ে চিৎকার করে উঠল, কেউ আছেন? শুনছেন? হ্যালো, কেউ আছেন। বাইরে থেকে দরজার ফাঁক দিয়েও ফস করে একটানা খানিকটা স্প্রে করে দিল কেউ। কাশতে কাশতে দরজার পাশ থেকে সরে এল শিবাঙ্গী। তারপর একটা ভারী গলা ভেসে এল, আছিইইই, আমি আছিইই। আল্লাহকে ডাকো শিবাঙ্গী বসু। বাঁচালে সেই বাঁচাবে। চেতনা অবলুপ্ত হতে হতে বুকের ভিতরে কেউ যেন ঢেঁকিতে পাড় দিতে থাকে শিবাঙ্গীর।
.
ভেজানো ঘরের দরজাটা খুলে ফেলল স্বয়ম্ভু। সাদা ধবধবে কুর্তা পাজামা। মুখটা যাতে বোঝা না যায় তাই দাড়ির সঙ্গে মুখে বসন্তের দাগ। চোখে চশমা। ঘরের তক্তাপোশে চাদর পাতা। একটা আলমারি। আরেকটা বুকশেলফে ভরতি উর্দু ভাষার বই। এ ঘরে কেউ নেই। বেরিয়ে যেতে গিয়েই ঘরের ভিতর ঢুকে আসে স্বয়ম্ভু। একটি লোক এদিকেই আসছে। লোকটি চলে যেতে আবার বারান্দায় বেরিয়ে পাশের ঘরে যেতে গেল। কিন্তু সে ঘরে তালা দেওয়া। অথচ ঘরটা দেখতেই হবে। ঠিক সেই মুহূর্তে পকেটে রাখা ফোনটা ভাইব্রেট করতে শুরু করল। এইসময় কে ফোন করছে আবার? ইয়ারফোনে কলটা রিসিভ করতেই কৌশিকের গলা। স্যার, শিবাঙ্গীর ফোনটা ডিসকানেক্ট। কল যাচ্ছেই না।
সে কী! ওকে কল করতে থাকো। আর আমাকেও কানেক্ট করে রাখো।
ওকে স্যার।
.
কথাগুলো বলতে বলতেই লম্বা বারান্দাটার এপাশ-ওপাশ ভালো করে দেখে নিল। কেউ যেন সিঁড়ি দিয়ে উঠছে। চট করে পকেট থেকে একটা চুলের কাঁটা বের করে তালার মধ্যে দু-তিনবার ঘোরাতেই খুলে গেল। তালাটি হাতে নিয়ে সোজা ভিতরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দিল। লোকটা সিঁড়ি দিয়ে উঠে এসেছে। দরজায় ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। পায়ের আওয়াজটা এই দরজার কাছে এসেই যেন থেমে গেল। দরজার নিচের ফাঁকা অংশ দিয়ে যেটুকু আলো ঢুকছে তাতে লোকটি যে দাঁড়িয়ে আছে তা স্পষ্ট।
বাইরের লোকটি ভুরু কুঁচকে দরজাটিকে দেখতে লাগল। তারপর দরজাটি ঠেলে খুলে দিল। ঢুকে এল ঘরে। অন্ধকার ঘর। দরজা দিয়েই যা আলো ঢুকেছে তাতেই যেটুকু আলোকিত। লোকটি এগিয়ে এল ঘরের আরও ভিতরে। খাটের নিচে উঁকি দিল। পাশেই ছিল আলমারি। আর সেই আলমারির আড়ালেই স্বয়ম্ভু যতটা সম্ভব নিজেকে সরু করে দেয়ালের সঙ্গে ঠেকিয়ে রেখেছে। স্বয়ম্ভু খেয়াল করল লোকটি হঠাৎ করে দেয়ালের একটা অংশ দরজার মতো খুলে দিল। ভিতরে যেন আরও অন্ধকার। মুখ বাড়িয়ে কাউকে দেখল। তারপর দরজা বন্ধ করে ঘুরে তাকাতেই একটা প্রবল ঘুষি এসে পড়ল তার মুখে। দরজার ছিটকিনিটা দেয়নি বলে সেই অন্ধকার কক্ষের ভিতরেই ছিটকে পড়ল লোকটি। সঙ্গে সঙ্গে মোবাইলের আলো জ্বেলে সেই গুপ্তকক্ষের ভিতরে ঢুকল স্বয়ম্ভু। নাকে ওষুধের গন্ধ এসে ঠেকল। আলোটা এপাশ-ওপাশ নাড়াতেই ঘরখানায় একটা মাত্র বিছানা আর কিছু রক্তমাখা তুলো আর ব্যান্ডেজ পড়ে আছে। খাবার থালা আর গ্লাস দেয়ালের কোণে সাজানো। কিন্তু বিছানা খালি। তার মানে এই ঘরেই মারুফের চিকিৎসা হয়েছে? কিন্তু মারুফ কোথায়?
কৌশিক, শুনতে পাচ্ছ?
হ্যাঁ স্যার।
মারুফ এখানেই ছিল। কিন্তু এখন এখানে নেই। জানি না অন্য কোনো ঘরে আছে কিনা। তুমি আমায় কেটে শিবাঙ্গীর খোঁজ করো। কিন্তু ভুলেও ভেতরে ঢুকো না। আমরা যে এসেছি সেটা এরা সামহাউ বুঝতে পেরেছে।
আপনাকে চিনতে পেরেছে?
না। তবে হুবহু আমার মতোই মেক আপ নিয়ে অন্য লোক এসেছে।
মেক আপ?
.
স্বয়ম্ভু হাঁটু মুড়ে বসে লোকটার মুখ থেকে নকল দাড়ি আর গোঁফ খুলে নেয়। লোকটির চিবুকের কাছে একটুখানি দাড়ি। গোঁফ কামানো। পরিচিত নয়। মোবাইলে একটা ছবিও তোলে লোকটার। পকেট ঘেঁটে একটা মানিব্যাগ পায়। সেখানে আধার কার্ড। নাম শামিম সঈদ। কিন্তু খামোখা মেক আপ নিয়েছে কেন? তা ছাড়া হুবহু স্বয়ম্ভুর মতো! শুধু মুখে বসন্তের দাগটা করেনি। লোকটাকে এই ঘরেই বন্ধ করে বেরিয়ে পড়ল স্বয়ম্ভু। বাইরের বারান্দায় আসার আগেই থমকে গেল। একটা কমবয়সি ছেলে কাকে যেন মনের সুখে গালাগালা দিতে দিতে চলেছে। ছেলেটি চলে যেতেই মুখ বাড়াল। ছেলেটি বেশ দ্রুত পায়ে হেঁটে যাচ্ছে সিঁড়ির দিকে। ঘরের দরজাটা খোলা রেখেই ছেলেটির পিছনে ছুটল স্বয়ম্ভু।
সালামওয়ালেকম।
স্বয়ম্ভুর গলা শুনে ঘুরে তাকাল ছেলেটি। সামনের দাঁতটা উঁচু। চোখ দুটো প্রকৃত অর্থে গোল গোল। গালে অল্প অল্প দাড়ি। গোঁফেরও একই অবস্থা। রোগাপাতলা ছেলেটি হাত তুলে ওয়ালেকুম সালাম বলল। স্বয়ম্ভু বলল, এটা পবিত্র পিরের মাজার। এখানে কার ওপর এত্ত গুসসা?
গুসসা কি আর এমনি এমনি? শালা চশমখোর। মৌলবি হয়েছে বলে মাথা কিনে নিয়েছে।
কেন? কী হয়েছে?
শালা কাল মাঝরাতে হঠাৎ আমায় ডেকে পাঠাল। সুফি এক্ষুনি তোকে গাড়ি নিয়ে বেরোতে হবে। বললাম, সকালে যাই। সে হবে না। জরুরি তলব। একজন অসুস্থ মানুষকে নিয়ে এক্ষুনি পাথর প্রতিমা যেতে হবে। তখন স্পষ্ট করে বলেছিলাম আমার পাঁচশো টাকা চাই। এখন টাকা চাইতে এসেছি বলে কিনা দুশোর বেশি পাবি না? তুই মৌলবির কাছ থেকে টাকা চাইছিস? সমাজ ছাড়া করে দেব। শালা পাজি লোক একটা।
.
কথাগুলো বলেই সিঁড়ি দিয়ে হনহন করে নেমে যাচ্ছিল ছেলেটি। স্বয়ম্ভুর মন যেন চূড়ান্ত সংকেত পেল। এই সুফি, সুফি শোনো না। সুফি ঘুরে তাকাল। যাকে পাথর প্রতিমায় রেখে এসেছ তার নাম বলতে পারবে?
না। ওসব নামধাম জেনে কী করব?
আচ্ছা ছেলে না মেয়ে?
ছেলে।
কী হয়েছিল ছেলেটার?
পা-ফা ভেঙে গেছে বোধহয়। ব্যান্ডেজ করা ছিল দেখলাম।
এই এই সুফি, ভাই আমার একটা উপকার করো।
সুফি ঘুরে তাকাল।
বাইরে কৌশিক ফোনের পর ফোন করে যাচ্ছে। শিবাঙ্গীর উত্তর নেই। একবার যাবে ভেতরে? ভাবতে ভাবতেই স্বয়ম্ভুর ফোন। হ্যাঁ স্যার।
.
সুফি এগিয়ে এসে বাইরে কাওয়ালি দলের ভিড় বাঁচিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল। সেই সময় স্বয়ম্ভু মাজারের সিঁড়িটার সামনে দাঁড়িয়েই কৌশিককে বলল, হোয়াটসঅ্যাপ! বলেই টকাটক টাইপ করতে লাগল। স্বয়ম্ভু লিখল, ফরুমা লকাতগ চাপার। রথপা মাতিপ্র। তেযে বেহ। কথাটা পড়েই কৌশিক শঙ্কিত। ভেতরে কিছু এমন হয়েছে যার জন্য ফোনে বলা যাচ্ছে না। এমনকী হোয়াটসঅ্যাপেও অক্ষর ওলটপালট করে লিখছে। কৌশিক ভালো করে পড়ল লেখাটা। সবথেকে সহজ পদ্ধতিটা ব্যবহার করল কৌশিক। গুলোকে পিছন থেকে পড়া শুরু করল। ফরুমা মানে মারুফ, লকাতগ মানে গ-ত-কা-ল, চাপার মানে রপাচা? রপাচা মানে কী? আবার দেখল, এবার অন্য পদ্ধতিতে পা-টাকে আগে আনলে পাচার? চমকে উঠল কৌশিক।
.
স্বয়ম্ভুর মাথায় আরও একটা পাথর চেপেছে। শিবাঙ্গী উধাও। চুপিচুপি পা ফেলে কাওয়ালি যেদিকে হচ্ছে সেদিকে এগোতে গিয়ে হঠাৎ স্বয়ম্ভু খেয়াল করল সিঁড়ির দিকে যখন এসেছিল তখন বাঁ-হাতের ঘরটা তো খোলাই ছিল। কিন্তু এখন সেখানে তালা কেন? গোয়েন্দার ষষ্ঠেন্দ্রিয় কোনো এক ভয়ানক বার্তা পাঠায় মগজের হেড অফিসে। পকেট থেকে সেই তালা খোলার কাঁটাটা দিয়ে কয়েকবার এপাশ-ওপাশ করতেই তালা খুলে যায়।
রথপা মাতিপ্র মানে পাথর প্রতিমা। তেযে বেহ মানে যেতে হবে! নিজের মনেই আওড়াল কৌশিক। সবেমাত্র স্বয়ম্ভুকে বলতে যাবে, বুঝে গেছি স্যার। কিন্তু তার আগেই ওপাশ থেকে স্বয়ম্ভুর আঁতকে ওঠা গলা, শিবাঙ্গী।
কী হয়েছে স্যার?
বাঁ-দিকের…
.
শব্দটা বলেই ফোনটা কেটে গেল স্বয়ম্ভুর। বেশ কয়েকবার হ্যালো হ্যালো করেও সাড়া পেল না।
.
স্বয়ম্ভু রুমালে মুখ চেপে কাশছে। শিবাঙ্গী মাটিতে বেহুঁশ। স্বয়ম্ভু বাঁ-হাতে মুখ চেপে শিবাঙ্গীকে ঠেলতে থাকে। সঙ্গে সঙ্গে কয়েকটা ছায়া স্বয়ম্ভু আর শিবাঙ্গীর শরীর মাড়িয়ে দূরের দেয়ালটা ছোঁয়। স্বয়ম্ভু ঘুরে তাকায়। মাথাটা ঝিমঝিম করছে। তবু স্পষ্ট দেখল মুখে কাপড় বেঁধে দুজন মুসলিম পুরুষ ঘরে এসে দাঁড়িয়েছে। হাতে তাদের চকচক করছে শানিত তরোয়াল। স্বয়ম্ভুর কাছে রিভলভার আছে। কিন্তু সেটা কুর্তির নিচে। চট করে বের করা যাবে না। ঘাড়ের কাছে নিশ্বাস ফেলছে যমদূতেরা।
আমাদের এলাকায় এসে গুণ্ডামি করে বেরিয়ে যাবেন কী করে ভাবলেন স্বয়ম্ভুবাবু? অনেক দূর এগিয়ে গেছেন। আর তো আপনাকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে না।
লম্বা-চওড়া লোকটা কথাগুলো বলল। এ সম্ভবত এখানকার মৌলবি।
স্বয়ম্ভু উঠে দাঁড়িয়ে বলল, গায়ে হাত দেবেন না। আমি চাই না এই ধর্মস্থানে কোনোরকম রক্তারক্তি হোক। গুলি চলুক।
চপ শালা। ধর্মস্থান দেখাচ্ছে। তুই গায়ে হাত দিয়ে সটকে যাবি আর আমরা বুড়ো আঙুল চুষব?
.
