কথাকলি কোথায় – ৩

শতসহস্র বিরক্তি ঝেড়ে ক্লান্ত শরীরে উঠে বসল শিবাঙ্গী। এই হোয়াটসঅ্যাপের যুগে চিঠি কে লেখে ভাই? সাদা খামের ওপর টাইপ করা শিবাঙ্গীর নাম। খাম থেকে চিঠি বের করে চোখের সামনে মেলে ধরল। চার লাইনের একটা কবিতা।

জেতার নেশা সর্বনাশা
হারলেও আছে সুখ,
নেশার পিছে ছুটলে বৃথা
পুড়বে জেনো মুখ।

লেখাটা টাইপ করে প্রিন্ট আউট নেওয়া। তাই হাতের লেখা বোঝার উপায় নেই। নিচে কারও নামও নেই। শিবাঙ্গীর মুখটা ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে গেল। বিন্দু বিন্দু ঘাম ফুটে উঠল কপালে আর নাকের নিচে। টেনশনের কিছু হলে আজও শিবাঙ্গীর কান-মাথা সব গরম হয়ে যায় নিমেষে। এটা এখুনি স্বয়ম্ভুকে পাঠাতে হবে ভেবে সবে চিঠিটাকে বিছানায় রেখেছে ছবি তোলার জন্য। অমনি অপর্ণা কীসের চিঠি রে? বলে এগিয়ে এল। শিবাঙ্গী ঝড়ের গতিতে চিঠিটা তুলে আড়াল করে নিল। কাজের চিঠি। তুমি বুঝবে না। যাও এখন। অপর্ণা খানিক থমকে বলল, এই রাতে বাড়ি ফিরেও কীসের যে এত কাজ বুঝি না বাপু। তাও আবার চিঠিচাপাটিতে।

মা তুমি যাও প্লিজ।

অপর্ণা চলে যেতে ঘরের দরজাটা ভিতর থেকে বন্ধ করে দিল। চিঠিটাকে বিছানায় ফেলে সমান করে মোবাইলে ছবি তুলে তৎক্ষণাৎ স্বয়ম্ভুকে হোয়াটসঅ্যাপ করল। সবে একদিন হয়েছে কেসটাতে হাত দিয়েছে। একেবারে সেদিনই বাড়ি চিনে কে হুমকি দিয়ে গেল? ভাবতে ভাবতেই স্বয়ম্ভুর ফোন

হ্যাঁ স্যার, দেখেছেন?

শিবাঙ্গীর গলায় উত্তেজনা।

কংগ্র্যাচুলেশনস। নিজের পিঠটা চাপড়ে নাও।

মানে?

আমার সঙ্গে ঘুরে ঘুরেও তোমার এতটুকু বুদ্ধি খুলল না।

স্বয়ম্ভুর কথার কোনো থই পাচ্ছে না শিবাঙ্গী। স্বয়ম্ভু বলল, কেসের প্রথম দিনেই অপরাধীদের বুকে ভয় ধরিয়ে দিতে পেরেছ। তাই এই কবিতা উপহার পেলে। তা এটা কে দিয়েছে? কখন এসেছে? শিবাঙ্গী ফিসফিস করে সবটা বলল। স্বয়ম্ভু বলল, এটা মিডিয়াকে বোলো না বা দেখিয়ো না।

কী বলছেন স্যার? পুলিশ ডিপার্টমেন্টকে ভয় দেখানো হচ্ছে।

শিবাঙ্গীর উত্তেজনা তুঙ্গে। স্বয়ম্ভু শান্ত হয়ে বলল, মিডিয়াকে জানালে অপরাধী যেই হোক না কেন তারা ভেবে নেবে আমরা ভয় পেয়েছি। ঠিক এটাই হতে দেওয়া যাবে না। জাস্ট ইগনোর। যত্ন করে ফাইল বন্দি করে রাখো। একদম নরমাল থাকো, যেন কিচ্ছু হয়নি। আমরা কোনো চিঠি পাইনি। যেমন কাজ করছি তেমনই করব। তাহলে দেখবে অপরাধীরা আরও কিছু ভুল করবে আমাদের ভয় দেখানোর জন্য। আর ঠিক তখনই নিজেদের অজান্তেই আরও কিছু প্রমাণ ওরা নিজেরাই তুলে দেবে আমাদের হাতে।

আমাকে নিয়ে চিন্তা করছি না স্যার। বাবা-মা বাড়িতে একা থাকে তো।

জানালে আরও বিপদ বাড়তে পারে। খেপে গিয়ে ক্ষতি করতে পারে। তাই বলছি এই মুহূর্তে সেফ সাইডে থাকো। আর রাস্তাঘাটে চলাফেরাটা একটু সাবধানে কোরো। কবিতার শেষ লাইনটা বিপদজনক।

হুমম।

মাসি-মেসোকে বলো, দুমদাম কাউকে যেন দরজা না খোলে। দরজায় আইহোল লাগানো আছে?

না স্যার, আমাদের তো পুরোনো দিনের দরজা।

ইমিডিয়েটলি একটা লাগাবার ব্যবস্থা করো।

জো হুকুম।

স্বয়ম্ভু যতই নিজের পিঠ চাপড়াতে বলুক। সারারাত কবিতাটাই চেতনে অবচেতনে ঘুরেফিরে শিবাঙ্গীর মনের মধ্যে বেজেছে। সত্যি বলতে, ভয়ই পেয়েছে। এর আগের কেসে বাড়ির চৌহদ্দি থেকে খণ্ডবিখণ্ড লাশ পাওয়া গিয়েছিল। এই কেসে আবার সরাসরি চিঠি। জীবনে এমন হুমকি প্রথম বেরোতে ইচ্ছে করছিল না শিবাঙ্গীর। বাড়িতে একলা বাবা-মাকে নিয়েই যত চিন্তা। কতবার ভেবেছে মামার কাছে কটাদিন কাটিয়ে আসতে বলবে। কিন্তু বলেও লাভ নেই। মেয়েকে বাড়িতে একা রেখে বুড়োবুড়ি কিছুতেই যাবে না। পরের দিন সকালে বেরোবার আগে পাখি পড়ার মতো করে বুঝিয়ে দিল অপর্ণা আর শেখরকে। তারা যেন দুমদাম করে দরজা না খোলে। ব্যস, অপর্ণা চেপে ধরেছে। এ কথা কেন বলছিস রে? কিছু হয়েছে? ওই এম.এল.এ-র কেসটায় কিছু হয়েছে? কাল কার চিঠি এল রে? হাজারটা প্রশ্নবাণ নিমেষের মধ্যে শিবাঙ্গীর শরশয্যা রচনা করে দিল।

ভুলভাল ভেবো না তো মা। কিচ্ছু হয়নি।

·

খানিক ধমকের সুরেই কথাগুলো বলে বাইরের গেটটা দিল। মাকে হাত নেড়ে পিছন ঘুরতেই একটি ছেলের ওপর চোখ আটকে গেল শিবাঙ্গীর। ঠিক উলটো ফুটেই একটা বাড়ির সানশেডের নিচে চুপ করে দাঁড়িয়ে। অপরিচিত। এ পাড়ায় এমন সুন্দর দেখতে ছেলে কোনোদিন দেখেনি শিবাঙ্গী। রোদে ঝলসে লাল হয়ে গেছে রং। মাথার চুলগুলো কপালের ওপর নকশা এঁকেছে। গায়ে একেবারেই সাধারণ একটা ঢোলা ঢালা ক্রিম রঙের শার্ট। গায়ের রঙের সঙ্গে যেন মিশে আছে জামাটা। নস্যি রঙের প্যান্ট। পায়ে কিটো। ছেলেটি এপাশ-ওপাশ দেখতে দেখতে মাঝেমধ্যেই শিবাঙ্গীকে দেখে নিচ্ছে। স্বয়ম্ভুর কথাগুলো কানে বাজল, রাস্তাঘাটে চলাফেরাটা একটু সাবধানে কোরো। পৃথিবীতে যত অপরাধ ঘটে তার অর্ধেকের বেশি অপরাধী এমনই সুন্দর হয়। রূপে ভুলিয়ে কাজ হাসিল করে পগারপার। এমন কত অ্যাসিড অ্যাটাকের কেস আছে যেখানে ছেলেটা ভীষণ সুন্দর দেখতে। তারাই মেয়েদের মুখগুলো ঝাঁঝালো তরলে জ্বালিয়ে দিয়ে পৈশাচিক আনন্দ পায়।

কাউকে খুঁজছেন আপনি?

শিবাঙ্গী সরাসরি ছেলেটার সামনে গিয়েই প্রশ্ন করল। ছেলেটার হাত দুটো খালি দেখে এগিয়ে এল। পকেট থেকে কিছু বের করে ছুড়ে দিতে দিতে শিবাঙ্গী কাবু করে ফেলবে ব্যাটাকে এইটুকু নিজের প্রতি ভরসা আছে।

ক্যাব বুক করেছি। এখানে পিক আপ দেখাচ্ছে। তাই দাঁড়িয়ে আছি।

এখানে দেখিনি কখনও আপনাকে।

শিবাঙ্গী বলল।

দেখার কথাও নয়। কালকেই ভাড়া এসেছি। ওই শ্যামল গাঙ্গুলির নিচের তলাটা ভাড়া নিয়েছি।

আচ্ছা। আসি।

ছেলেটি হাসল শুধু। শিবাঙ্গী পিছন ফিরে দু-পা এগিয়েই ঝড়ের বেগে পিছনে তাকাল আর ঠিক সেই সময়েই ছেলেটি বলতে যাচ্ছিল, আপনি পুলি…! পুরো কথাটা বেরোবার আগেই শিরাঙ্গীর আচমকা ঘুরে তাকানো যথারীতি ছেলেটি ব্যোমকে গেছে। শিবাঙ্গী ঘুরে দেখল ছেলেটির হাতদুটো একইরকম খালি। ছেলেটির কথা অস্পষ্ট লাগল শিবাঙ্গীর কানে তাই পালটা প্রশ্ন করল, কিছু বলছিলেন?

না বলছিলাম, আপনি পুলিশ তো?

কথাটা টক করে শিবাঙ্গীর কানের পর্দায় বাজল। মাত্র এক রাতের মধ্যে জানল কী করে?

কী করে বুঝলেন?

বুঝিনি। যার কথা শুনেছি আপনিই সে কিনা মিলিয়ে দেখছিলাম। এই বাড়িটা থেকেই বেরোলেন তাই।

কী শুনেছেন? কে বলেছে? কী নাম আপনার?

প্রশ্নগুলো বেশ জেরা করার ধরনে শিবাঙ্গীর মুখ ফসকে বেরিয়ে এসেছে। ছেলেটি ভড়কে গিয়ে বলল, বাবা! জেরা করবেন নাকি?

ছেলেটি কি ফাজলামি করছে? নাকি ভালোমানুষ সাজার চেষ্টা করছে? মনে মনে ভাবল শিবাঙ্গী। কালকের চিঠিটা ওর মাথাটা গুলিয়ে দিয়েছে। সকালের সূর্যটাকেও সন্দেহ করতে ইচ্ছে করছে ওর। জেরা কেন করব? আমি আপনাকে চিনি না। অথচ আপনি আমায় চেনেন তাই জিজ্ঞেস করছি।

আপনাকে এই তল্লাটে সবাই চেনে। শ্যামলকাকুর স্ত্রী নির্মলা কাকিমাই কাল বলছিলেন। আপনাদের বাড়িতে নাকি কারা সব কাটা লাশ ফেলে দিয়ে গিয়েছিল!

কথাটা শুনেই বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠল শিবাঙ্গীর। আর কোনো কথা শোনেনি ছেলেটি? প্রথমেই এই কথা?

কী নাম আপনার বললেন না তো।

বেশ গম্ভীর শোনাল শিবাঙ্গীর কথাগুলো।

রাজারাম ব্যানার্জি। আমায় রাজু বলতে পারেন।

কেন? খামোখা রাজারামকে রাজু কেন বলতে যাব? কথাগুলো মনে মনেই আওড়াল শিবাঙ্গী। কী করা হয়?

হর্ন দিল একটা সাদা রঙের গাড়ি। রাজারাম বলল, আমার গাড়ি এসে গেছে। পাড়ায় আছি যখন নিশ্চয়ই দেখা হবে?

প্রশ্ন করছে? নাকি সবাই যেমন সাধারণভাবে বলে তেমন করেই বলল। শিবাঙ্গী ঠোঁট টিপে হাসল শুধু।

সুড়ুত করে চায়ের কাপে চুমুক দিল আধবুড়ো লোকটা। ক্ষয়ে যাওয়া গালে কাঁচা-পাকা দাড়ি। মাথায় প্রায় টাক। গালদুটোয় যেন সুপুরি পুরে রেখেছে সর্বক্ষণ। নাকটা থ্যাবড়া মোটা। নাকের দুপাশের চামড়ায় বসন্তের গর্ত। শর্ট হাইট। একটু কোলকুঁজো। গরম চা। তাই জিভে ছ্যাঁকা খেয়েছে। বাঁ-হাতে ধরা বিস্কুটটা চা ভরতি কাগজের কাপে ডুবিয়ে কামড় দিল। অতিরিক্ত পানমশলা খেয়ে দাঁতগুলোর পাশে কালো বর্ডার হয়ে গেছে।

দাদা দোকান কখন খোলেন?

বিস্কুটটা গলাধঃকরণ করে লোকটা প্রশ্ন করল দোকানদারকে। ফুটন্ত চায়ে হাতা ঘোরাতে ঘোরাতে ভুঁড়িওয়ালা তাগড়া দোকানদার জবাব দিল, ওই সাতটা নাগাদ।

অ। যাক বাঁচালেন।

কেন?

সকাল সাড়ে আটটা না বাজলে বউয়ের ঘুম ভাঙে না। আমার আবার কাক ডাকলেই ঘুম ভেঙে যায়। সকালে উঠে কার হাত পুড়িয়ে চা করতে ইচ্ছে করে বলুন তো? তাই জিজ্ঞেস করলাম। সকালবেলাটা তাহলে আপনার হাতের চা দিয়েই দিন শুরু করব।

এখানে থাকেন কোথায়?

দোকানদারের প্রশ্ন।

ওই তো পায়খানা বাথরুমের যে দোকানটা আছে না, অর পাশ দিয়ে যে গলি ওখানেই। ভাড়া নিয়েছি।

.

আবার সুড়ত করে চায়ে চুমুক। বলছি দাদা, ভালো মালি কোথায় পাই বলতে পারেন?

ভাড়া বাড়িতে ফুলবাগান করবেন নাকি?

দোকানদারের প্রশ্ন।

আর বলেন কেন? বউ বাড়ি ভাড়া নিয়েছে এই শর্তে। নিজের মতো বাগান করতে পারবে। আঠারোটা বাড়ি ক্যান্সেল হয়েছে এই চক্করে। শেষমেশ এই বাড়িওয়ালা বলল করতে পারো। তবে মাটিতে কিছু পোঁতা যাবে না। সব টবে। যাতে এখান থেকে বিদেয় হলে সব তুলে নিয়ে যেতে পারি। তাই সই।

আছে একজন। একটু বয়স্ক। এক চোখে দেখে না।

ও বাবা ওসব কানাখোঁড়া চলবে না।

খোদ এম.এল.এ-র বাড়ির বাগান করে। আছেন কোথায়? ওর হাতে নাকি ফুল কথা বলে।

চায়ে শেষ চুমুক দিয়ে লোকটি ভাবে খানিক, এম.এল.এ! মানে ওই সোমেন সরকার? যার মেয়েকে…!

হ্যাঁ হ্যাঁ ওই।

তাকে পাব কোথায়?

আমার দোকানেই আসে। বিড়ি কিনতে।

রোজ আসে?

হ্যাঁ। বেলা সাড়ে নটায় এম.এল.এ-র বাড়ি কাজে ঢোকার আগে এখান থেকে চা খেয়ে বিড়ি কিনে যায়। ওইসময়ে আসুন। কথা বলে নেবেন।

বেশ বেশ।

কাগজের কাপটা ডাস্টবিনে ফেলে দিল।

.

কলেজ থেকে ঠিকানা কালেক্ট করে বাড়ি চিনে যেতে বেলা সাড়ে এগারোটা বেজে গেল স্বয়ম্ভুর। যাদবপুর স্টেশন রোডে খানিকটা এগিয়ে ডানদিকের গলি। তারপর সেখান থেকে আরও চার-পাঁচ প্যাঁচ মেরে দোতলা বাড়ি। রাস্তার একপাশে গাড়িটা দাঁড় করিয়ে নেমে বেশ খানিকটা অবাক হল স্বয়ম্ভু। মেঘা নন্দীর বাড়ির সামনে প্রচুর লোক জড়ো হয়েছে। তারা একে অপরের সঙ্গে ফিসফিস করে কথা চালাচালি করছে। এগিয়ে গিয়ে একজনকে জিজ্ঞেস করল স্বয়ম্ভু, এটা স্বপন নন্দীর বাড়ি তো? লোকটি বলল, হ্যাঁ, কিন্তু আপনি কোত্থেকে আসছেন? স্বয়ম্ভু উত্তরটা এড়িয়ে গিয়ে পালটা প্রশ্ন করল, কিছু কি হয়েছে?

আর বলেন কেন? কাল রাতে মেয়েকে নিয়ে ফিরছিল। একটা লরি না ট্রাক এসে এক্কেবারে…

লোকটি তার হাতের ভঙ্গিমাতে বুঝিয়ে দিল দুর্ঘটনাটিকে। স্বয়ম্ভুর নিশ্বাসটা কয়েক সেকেন্ড স্তব্ধ হয়ে গেল। বলল, স্বপনবাবু, মেঘা এখন কোথায়?

মর্গ থেকে স্বপনের বডি নিয়ে এসেছে।

বড়ি! ঘটনাটা কবে ঘটেছে?

বললাম না কাল রাতে।

কাল রাতে অ্যাক্সিডেন্ট হল আর আজ বেলা সাড়ে এগারোটার মধ্যে পোস্টমর্টেম হয়ে চলে এল?

পাশ থেকে আরেকজন বলে উঠল, দিনকালের বড়ো জার্নালিস্ট ছিলেন তো স্বপন। ওপর মহলের যোগসাজশেই ব্যাপারটা তাড়াতাড়ি মিটে গেল। কাল রাতেই নাকি পোস্টমর্টেম হয়ে গেছে।

মগজের ভিতর কে যেন হাতুড়ির ঘা দিল। রাতে পোস্টমর্টেম? এও সম্ভব?

আর মেঘা?

বলছে তো সে নাকি কোমায়। ড্যাফোডিলে ভরতি আছে।

স্বপনের বউয়ের অবস্থাটা ভাবছি শুধু। এত বড়ো বাড়িতে পুরো একলা হয়ে গেল।

পাশের লোকটির কথা কানে গেলেও স্বয়ম্ভু কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না। সোজা বাড়ির ভিতর ঢুকে গেল। সামনের ডাইনিংয়েই ডেডবডি শোয়ানো। পুলিশও উপস্থিত। স্থানীয় থানার ওসি পথ আটকাল। আইকার্ড দেখাতেই রাস্তা ছেড়ে দিল।

মানুষটার মুখটা থেঁতলে রক্তাক্ত। সারা মুখে-মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা। গায়ের ওপর সাদা কাপড়। তার ওপরে থোকা থোকা ফুলের তোড়া। আশেপাশে আত্মীয় পরিজন। মাটিতে এক আত্মীয়ার কাঁধে মাথা এলিয়ে নির্বাক স্ত্রী। ভিড়ের মধ্যেই দিনকাল নিউজ পেপারের সম্পাদক আনন্দমোহন বসু। মিডিয়া সূত্রেই স্বয়ম্ভুর মুখ চেনা। যাদবপুর থানার ওসিকে প্রশ্ন করল স্বয়ম্ভু, ট্রাক না লরি? প্রশ্ন শুনে ওসি ঘাড় বেঁকিয়ে তাকাল স্বয়ম্ভুর মুখের দিকে। স্বয়ম্ভু বুঝল, পরিচয় জানতে চায়। বুক পকেটে কার্ড ছিল। বের করে দেখাতেই উন্নত গ্রীবার লোকটি টুক করে ঘাড় নামিয়ে নরম সুরে বলল, ট্রাক।

ধরা পড়েছে?

না।

কটায় হয়েছে?

রাত সাড়ে নটার পর

এত তাড়াতাড়ি পোস্টমর্টেম হল কীভাবে?

কোনো মিনিস্টারের লেভেল থেকে করানো হয়েছে। আসলে বড়ো জার্নালিস্ট ছিলেন তো। তাই ব্যাকআপ ভালো।

তাই বলে রাতে পোস্টমর্টেম? যাতে তড়িঘড়ি শ্মশানে নিয়ে যাওয়া যায়!

.

যাদবপুর থানার ওসি স্বয়ম্ভুর কথার ইঙ্গিত বুঝে একপলক চেয়ে মুচকি হাসল। বলল, উই আর জাস্ট আ পাবলিক সারভেন্ট স্যার।

রক্ষকই যদি হাত তুলে দেয় ভক্ষকেরা তো খাবেই।

.

ওসি চোখটা নামিয়ে নিল। সেই মুহূর্তেই ঢুকে এল চারজন টিভির রিপোর্টার। স্বয়ম্ভু চট করে নিজের মুখ লুকিয়ে ভিড় ঠেলে বেরিয়ে এল। এখুনি ডেডবডির সামনেই হয়তো জিজ্ঞেস করে বসবে কথাকলি কোথায়? খুঁজে পেয়েছেন? গাড়িতে উঠেই সঞ্জয়কে বলল, ড্যাফোডিল সুপার স্পেশ্যালিটি চলো।

.

মোবাইলটা বেজে উঠল স্বয়ম্ভুর। আননোন নম্বর।

হ্যালো… কে? ও হ্যাঁ বলো।… আচ্ছা… আচ্ছা… টেক্সট করে দাও। তুমি নজর রাখো। কিচ্ছু যেন মিস না হয়।

কার্ন থেকে ফোনটা সরিয়ে দেখল শিবাঙ্গী ওয়েটিং। কোনোরকমে কথা সেরেই শিবাজীকে কল ব্যাক করে। কাজ হল?

হ্যাঁ স্যার। নিখিল মণ্ডল কথাকলির থেকে এক বছরের সিনিয়র ছিল। শুধু তাই নয়, তেনারা নাকি স্কুল পালিয়ে মন্দারমণিও গিয়েছিলেন। স্কুলে জানাজানি হতে গার্জেন কল হয়। কথাকলির বাবা আসেন।

বলছ কী? মেয়ে তো তাহলে খেলুড়ে।

হ্যাঁ স্যার। তবে কথাকলি পড়াশুনোয় খুব ভালো ছিল।

নইলে কেউ সেন্ট জেভিয়ার্সে চান্স পায়?

কথাকলির কোনো ক্লাসমেটের সঙ্গে কথা হল স্যার?

না। পরে যাব। বলে এসেছি প্রিন্সিপালকে। এখন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মেঘার সঙ্গে কথা বলাটা জরুরি মনে হয়েছিল। কিন্তু কেউ একজন বা একাধিকজন আমাদের থেকেও বেশি বুদ্ধিমান। জানত আমরা মেঘার সঙ্গে দেখা করতে যাব। তাই আগেভাগে তাকে কোমায় পাঠিয়ে দিল।

মানে?

শিবাঙ্গীর গলায় বিস্ময়।

শুধু তাই নয়, আমি এই মাত্র মেঘার বাবা স্বপন নন্দীর ডেডবডি দেখে এলাম। কাল রাতে মেয়েকে জুম্বা ক্লাস থেকে নিয়ে ফিরছিল নিজের গাড়িতে। রাস্তায় একটা ট্রাক এসে পিষে দিয়ে যায়। ট্রাকটাকে ধরা যায়নি।

স্যার, ঈশিতাও নাকি পরিবার নিয়ে পাহাড়ে বেড়াতে গেছে। কেউ তাকে ফোনে পাচ্ছে না। ঠাকুরপুকুর থানার ওসি অভীক মুখার্জি কাল নিজে গিয়ে প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাঁরা বলেছেন, ঈশিতারা যখনই ঘোরার প্ল্যান করত তখনই নাকি তাদের জানাত। এবারে কেউ ঘুণাক্ষরেও কিছু জানতে পারেননি। পার্টির পরের দিন সকালবেলা হঠাৎ দেখে সব কিছু গুছিয়ে কোনোরকমে বেরিয়ে যাচ্ছে।

কোন পাহাড়ে যাচ্ছে কিছু বলেছে?

একজনকে বলেছে হিমাচল। বাকিরা সেটাও জানে না।

কীসে করে গেছে?

গেটকিপার তো বলেছে একটা ব্যালেনো কার নাকি ওদের নিয়ে গেল।

স্বয়ম্ভুর ভুরুটা কুঁচকে কাছাকাছি চলে এল। ব্যালেনো? রেন্ট ক্যাবে তো ব্যালেনো পাঠায় না।

সেটাই তো। এদিকে ওদের নিজেদেরও গাড়ি নেই।

নম্বরটা খেয়াল করেছে কি?

না স্যার।

এদিকে কথাকলির গাড়িটা কিন্তু ব্যালেনো।

ও হ্যাঁ। তাই তো।

আচ্ছা গেটকিপার গাড়িটার রং কিছু বলেছে?

নীল।

আমি শিওর ওটা কথাকলির গাড়ি ছিল। আমাদের একটা ভুল হয়ে গেছে শিবাঙ্গী।

কী স্যার?

কস্তুরী ঈশিতাকে ফোন করে জানতে চেয়েছিল কথাকলি কোথায়। কিন্তু সেটা কবে? ওরা বলেছে পার্টি হয়েছিল বুধবার রাতে। সেই রাতে বন্ধুর বাড়ি রাত কাটিয়ে বৃহস্পতিবার কথাকলির ফেরার কথা ছিল। কোন বন্ধুর বাড়িতে রাত কাটাত কথাকলি? এদিকে আসল পার্টি ছিল মঙ্গলবার রাতে। তাহলে বুধবার রাতে কী ছিল? বুধবার না বৃহস্পতিবার! কোন রাতে ফোন করেছিল কস্তুরী? সেদিন ফোনটা চেক করলেই ধরা যেত।

গেটকিপার বলছে ঈশিতারা পাহাড়ে গেছে বুধবার সকালে।

তাই যদি হবে শিবাঙ্গী তাহলে ঈশিতার ফোন নিশ্চয়ই বৃহস্পতিবার খোলা ছিল নইলে কথা বলল কী করে? এদিকে আমরা শুক্রবার থেকে ফোন পাচ্ছি না। এমনকী ওর মায়ের ফোনও না। আর হিমাচল যাবে অথচ কোনোরকমে বেরোবে… এটা সাসপিশিয়াস।

একটা কথা বলব স্যার?

বলো।

আমাদের কেউ খুব কাছ থেকে ফলো করছে। কিন্তু আমরা ধরতে পারছি না।

.

স্বয়ম্ভু চুপ। চোখটা জানলার বাইরে থেকে সোজা ড্রাইভার সিটের দিকে। ওপার থেকে শিবাঙ্গী ফিক করে হেসে বলল, সঞ্জয়ের দিকে ওভাবে তাকাবেন না স্যার। ও ছাড়াও সাসপেক্ট থাকতে পারে। স্বয়ম্ভুর ক্ষণিকের নীরবতা ফোনের ওপার থেকেই শিবাঙ্গীকে বুঝিয়ে দিয়েছে এই মুহূর্তে স্বয়ম্ভু ঠিক কী ভাবছে। বাবা! আজকাল কি থট রিডিং করছ নাকি?

থট রিডিং করতে পারার থেকে মন পড়তে পারা ব্যাপারটা শুনতে

অনেক ভালো লাগে স্যার। খুব কাছের মনে হয়।

ঠিক যেমন স্যারের থেকে দাদা ডাকটা শুনতে লাগে।

ও নো।

এপারে বসে স্বয়ম্ভুও দেখতে পেল শিবাঙ্গী ঠিক কীভাবে মাথা ঝাঁকাল। কেমন করে তার মাথার পিছনে বাঁধা হর্সটেলটা নড়ে দুলে উঠল। নিজের মনেই হেসে ফেলল। শিবাঙ্গী জানতে চাইল, আপনি কি অফিসে আসছেন?

ড্যাফোডিল হয়ে যাব।

.

নাকে-মুখে হাজাররকমের নল গুঁজে কাচের ঘরে শুয়ে আছে মেঘা। তাকে ঘিরে কতরকম যন্ত্র বসানো। মাথা থেকে সারা মুখে ব্যান্ডেজ করা। স্বয়ম্ভুর পাশে ডাক্তার দাঁড়িয়ে। তাঁর কথামতো ফিরে আসার চান্স কম।

মেয়েটাকে বাঁচাতেই হবে ডক্টর। যেভাবেই হোক। নইলে আরও মেয়েরা হারাতে থাকবে।

মানে?

ডাক্তারের মাথার ওপর দিয়ে কথাটা উড়ে ভেসে গেল। স্বয়ম্ভু বলল, বুঝবেন না। আপনি শুধু মেঘাকে বাঁচান।

ব্যাঙ্গালোর থেকে আরও তিনজন ডক্টর আসছেন। আমরা একটা বোর্ড গঠন করছি।

থ্যাংক ইউ। আরেকটা কথা, যাকে তাকে যখন-তখন মেঘার কাছে অ্যালাও করবেন না। আমি পুলিশ পোস্টিংয়ের ব্যবস্থা করছি। যেই আসুক সঙ্গে পুলিশ থাকবে।

.

লাল জলে হালকা চুমুক। নিচের ডাইনিংয়ের মেহগনি কাঠের সোফাটায় হেলান দিয়ে আয়েশ করে বসে সোমেন সরকার। সামনে ভূপেন আর সমরেশ নামের দলের একটি লোক। সোমেন বেশ গম্ভীর হয়েই বলল, এবার আমায় বেরোতে হবে।

আর কটাদিন থেকে যাও দাদা।

খুব রিস্কি পয়েন্টে আটকে আছে। আমি না গেলে হবে না।

সব ঘেঁটে যাবে কিন্তু। সরকার থেকেই চাপ আসছে পুলিশের ওপর তিনদিন হয়ে গেল মেয়েটা নিখোঁজ। এবার না খুঁজে পেলে বিরোধীরা এটাকেই ইস্যু করবে।

কীসের ইস্যু?

যে নিজের মেয়েকেই আগলে রাখতে পারে না সেই এম.এল.এ এলাকার মানুষকে সুরক্ষা দেবে কী করে?

.

সোমেনের মাথায় বিদ্যুৎ খেলে গেল। চোয়াল শক্ত করে বিড়বিড় করে উঠল, আমারই ভুল। কলির দায়িত্ব ওর মায়ের ওপর না ছাড়লে আজকে এই দিনটা ফেস করতে হত না।

বউদির অবস্থা তো দিন কে দিন খারাপ হচ্ছে। এইভাবে চললে…

.

স্যার আসব।

দরজার দিকে তাকাতেই সোজা হয়ে উঠে বসল সোমেন। আবদুল এসে দাঁড়িয়েছে।

কী ব্যাপার আবদুল, তুমি এ সময়ে?

সোমেনের কথা শুনে আবদুল এগিয়ে আসতে আসতে বলল, স্যার চারদিন পেরিয়ে গেল। এখনও ভবতোষ মান্নার কাছে বা আমার কাছে কোনো উকিল এল না। জমিটাও পেলাম না।

তুমি কি পাগল?

ভূপেন খেপে বলে উঠল। সোমেন হাত তুলে থামাল। শান্ত গলায় বলল, আবদুল, তিনদিন হল আমার মেয়েটাকে পাওয়া যাচ্ছে না।

জানি স্যার। আমি মাফ চাইছি এ সময়ে আপনাকে বিরক্ত করার জন্য। আপনার উকিলকে একটু বলে দিন স্যার। ভবতোষকে কড়কে মালটা হাতিয়ে নিক।

কাজটা এত সহজ নয় আবদুল। সময় লাগবে। এই সময় মিভিয়া, গোয়েন্দা সবাই আমার বাড়ির আশেপাশে ঘুরছে। তাড়াহুড়ো করলে সব কেঁচে যাবে।

জমিটা না পেলে দোকানটা করতে পারব না স্যার। ছেলেটার ভবিষ্যতটাও কেঁচে যাবে।

হয়ে যাবে। বলেছি তো। তবে একটু সময় দাও। আমি করে দেব। আবদুল কাঁচুমাচু মুখ করে ঘাড় নাড়ল। যাওয়ার আগে শুনিয়ে গেল, অনেক টাকা ইনভেস্ট করে ফেলেছি স্যার। একটু দেখবেন। আবদুলের সামনেই কড়কড়ে নোটভরতি ব্যাগটা নিজের অফিসের সিন্দুকে পুরেছে। মনে পড়ে গেল সোমেনের। ঠিক তখনই চশমার আড়ালে চোখদুটো ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইল। কিন্তু পারল না। আবদুল বেরিয়ে যেতেই ভূপেন বলল, যতসব উটকো ঝামেলা মেটাও দাদা।

আমি কথা বলেছি। সন্দীপ উকিল বলেছে এটা করতে পারবে কিনা সন্দেহ। ভবতোষ মান্না শক্ত মাটি।

ভূপেন অবলীলায় বলল। তাহলে হয় ভবতোষের ব্যবস্থা করো নয়তো আবদুলের।

.

স্বয়ম্ভু সোমেনের বাগানের পাশ দিয়ে ভিতরের দিকে ঢুকছিল, ঠিক সেই সময়েই আবদুল নিজের মনে বিড়বিড় করতে করতে বেরিয়ে যাচ্ছিল, শালা টাকাগুলো গেলা হয়ে গেছে। এখন রোয়াব দেখাচ্ছে। যেমন বাপ তেমন মেয়ে।

শব্দগুলো কানে যেতেই স্বয়ম্ভু ডাকল, একটু শুনবেন।

.

আবদুল দাঁড়িয়ে পড়ল। স্বয়ম্ভু সামনে এসে প্রশ্ন করল, আপনার কাছ থেকেও টাকা নিয়েছে না? আবদুল বলবে কি বলবে না করছে। স্বয়ম্ভু নিজেই বলে চলল, আমার কাছ থেকে এই মোটা মোটা বান্ডিল নিয়েছে। এদিকে কাজের বেলায় অষ্টরম্ভা। আপনার কাজ হয়েছে?

ধুর। কাজ না হাতি। মেয়ে মেয়ে করে হেদিয়ে মরছে। বলেছিল নিজের উকিল দেবে

ও। আপনার মামলামোকদ্দমার কেস?

চোখ বড়ো বড়ো করে বলল স্বয়ম্ভু। যেন খুব সিরিয়াস এ ব্যাপারে।

না না। পাশের বাড়ির এককাটা জমি নেব। পড়েই থাকে। তার চেয়ে আমার কাজেই লাগুক।

ও গুপি কেস? ঠিক ধরেছিইইই….

মুচকি হেসে চোখ বেঁকিয়ে কথাটা বলল স্বয়ম্ভু। তারপর আবদুলকে চুপিচুপি বলল, আরে মশাই আমারও। আমার বাপ বোনকেও সম্পত্তি দিয়ে গেছে। তা সে শ্বশুরবাড়ি চলে গেছে। তার স্বামীর অঢেল আছে। সেটা নিয়েই থাক না। তা নয়, বাপের সম্পত্তি চাই ওর। তাই এম.এল.এ-র কাছে একটু ঘুরঘুর করছিলাম। ঘুষও দিয়েছি।

দেখুন কবে হয়। কড়কড়ে এক লাখ চারদিন আগে ওনার অফিসের লকারে ঢুকিয়েছি। শালা যদি না কাজ করে না আমিও ছেড়ে দেব না। আল্লা কসম! হাটে হাঁড়ি ফাটিয়ে দেব।

তাই না? একটু বলুন না কী কেস? আমিও কিছু কিছু জানি। আপনাকে বলে দেব।

ভগবান আসছে।

আবদুলের মুখে ভগবান শব্দটা শুনে প্রথমটায় চমকে গেল। কিন্তু পরক্ষণেই ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতে দেখল বয়স্ক মালি এগিয়ে আসছে। ভগবানের দিকে তাকিয়েই স্বয়ম্ভু ঝট করে জিজ্ঞেস করল, কোথায় থাকেন? কী নাম?

পূর্বপল্লি। আবদুল।

.

আবদুল তরতর করে চলে গেল। মোবাইলে টকটক করে কী যেন টাইপ করল। মুখ তুলতেই দেখল নিচে ভগবান আর ওপরের বারান্দায় ঈশ্বর। স্বয়ম্ভুকে দেখছে।

আপনি কি দুবেলা করে এখানে আসেন?

ভগবান উত্তর দিল, হ্যাঁ। সব দিন নয়। মাঝে মাঝে।

ফুলগুলো আপনার হাতে তো কথা বলে।

ভগবান হাসল। ঠিক সেই মুহূর্তে বাইরে রাখা স্বয়ম্ভুর গাড়িটাও স্টার্ট দিয়ে বেরিয়ে গেল। ভগবান বলল, এবার বাড়ি যাব। আলো পড়ে আসছে। চোখে ভালো দেখি না তো।

শুনুন, আপনার একটা চোখে কী হয়েছে?

চোখে? কী যেন… মনেও থাকে না। ও হো, ওই ছেলেদের জন্য বাজি বানাচ্ছিলাম। হঠাৎ করে একটায় আগুন ধরে ফেটে চোখটা গেল। আচ্ছা আসি। কেমন?

.

ভগবান একটু যেন দ্রুত পায়ে হেঁটে বেরিয়ে গেল। স্বয়ম্ভু দেখল ওপরের বারান্দায় ঈশ্বর নেই। যেখানে মানুষের মতিগতি বোঝা দুষ্কর সেখানে ঈশ্বর তো ধরাছোঁয়ার বাইরে! কথাটা ভেবে নিজের মনেই হাসল স্বয়ম্ভু।

ভূপেনের সঙ্গে কোনো এক গুরুতর আলোচনা করতে করতেই বাইরের দরজায় টোকা পড়ল, আসতে পারি সোমেনবাবু?

আরে স্বয়ম্ভুবাবু, আসুন আসুন।

সোমেন উত্তেজিত হয়ে সোফা ছেড়ে উঠতে গিয়েই টলে গেল। ভূপেন দাদা বলে লাফিয়ে ওঠে ধরবার জন্য। স্বয়ম্ভুও দৌড়ে আসে। সোমেন নিজেই বসে পড়ে। স্বয়ম্ভুকে সামনে দেখেই উৎকণ্ঠিত মুখে সোমেন জানতে চাইল, কোনো খবর পেলেন স্বয়ম্ভুবাবু? নিশ্চয়ই পেয়েছেন তাই না? স্বয়ম্ভু চুপ করে তাকিয়ে রইল কয়েক পলক।

কী হল চুপ কেন? বলুন না। আমার কলি কোথায়?

এখনও পাইনি। তবে আশা করছি তাড়াতাড়ি ঘরের মেয়েকে ঘরে ফেরাতে পারব যদি আপনারা সব তথ্য সঠিক দেন।

মানে?

স্বয়ম্ভু আর সময় নষ্ট না করে অসুস্থ সোমেনের চোখের দিকে চেয়ে সরাসরি প্রশ্ন করল, আপনার মেয়ে কথাকলি ঠিক কবে বন্ধুর পার্টিতে গিয়েছিল? একই প্রশ্ন করাতে সোমেন প্রথমটায় অবাক হয়ে তার নিজের ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে উত্তর দেয়, বুধবার। আপনাকে বললামই তো।

সেইজন্যেই তো আবার সঠিক তথ্যটা জানতে চাইছি। কোথায় পার্টি ছিল?

এই একই প্রশ্ন কেন করছেন জানতে পারি কি?

পাশ থেকে ভূপেন বলে উঠল।

গোয়েন্দারা প্রশ্ন করে ভূপেনবাবু। অপরপক্ষকে উত্তর দিতে হয়। পার্টিটা কোথায় ছিল?

সোমেন বলে, ভার্দে ভিস্তা।

যার জন্মদিন ছিল তার নাম কী?

আগের দিনই বলেছিলাম। কলির বন্ধুদের নাম আমি জানি না।

সোমেন বলল।

আমি বলছি। যার জন্মদিন ছিল তার নাম স্যাম ওরফে সামায়ন দত্ত। মা কেতকী দত্ত। বাবা রুদ্র দত্ত। পেশায় মেরিন ইঞ্জিনিয়ার। থাকে নরেন্দ্রপুর বাইপাসে সাউথ উইংসে। আর স্যামের জন্মদিন ছিল মঙ্গলবার। বুধবার নয়। যেটা ভার্দে ভিস্তাতে হয়।

মঙ্গলবার?

আকাশ থেকে পড়ে সোমেন। বলে, না না স্বয়ম্ভুবাবু, তাহলে হয়তো বুধবার কারও নিশ্চয়ই বার্থ-ডে পার্টি ছিল ওখানে।

না। বুধবার দুজনের বার্থ-ডে পার্টি ছিল। একজন ভার্দে ভিস্তার পাশের কমপ্লেক্সে থাকে। নাম রায়সা পণ্ডিত। বয়স পঁয়ত্রিশের ওপর। অবাঙালি। আরেকজন কালিকাপুরে বাইপাসের কাছে অভিদীপ্তা এনক্লেভে থাকে। নাম আয়াংশ বিশ্বাস। বয়স আঠারো। আমরা খোঁজ নিয়ে দেখেছি এঁরা কেউই কথাকলির পরিচিত নন। এমনকী সিসিটিভিতেও কথাকলিকে দেখা যায়নি। কিন্তু মঙ্গলবার স্যামের জন্মদিনের পার্টিতে কথাকলির প্রচুর ফুটেজ পাওয়া গেছে। শুধু তাই নয়, ওখানে ওদেরই এক ক্লাসমেট মেঘা নন্দীর সঙ্গে বেশ উত্তপ্ত বাগবিতণ্ডাও হয় কথাকলির। যার বাবার নাম স্বপন নন্দী। দিনকাল নিউজ পেপারের ক্রাইম জার্নালিস্ট। বেশ নামকরা। আশা করি তিনি আপনার বিশেষ পরিচিত।

আপনি কী বলছেন আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না। মেঘা নন্দী, বাবা স্বপন, আমি চিনি, মঙ্গলবার পার্টি…

মাথাটা ঝাঁকিয়ে নেয় সোমেন। আমি… আমি এত কিচ্ছু জানি না স্বয়ম্ভুবাবু। আমি শুধু আমার মেয়েকে ফেরত চাই অ্যাট এনি কস্ট। 

বেশ কিছু বছর আগে আপনাকে নিয়ে প্রায় এক মাস ধরে দিনকালে লেখালিখি হয়েছিল। শিশু পাচারের সঙ্গে নাকি আপনি জড়িত। সেই রিপোর্টগুলো করেছিলেন স্বপন নন্দী। মনে পড়েছে?

অনেক হয়েছে স্বয়ম্ভুবাবু। আমার ভাইঝিকে খোঁজার জন্য আপনাকে অ্যাপয়েন্ট করা হয়েছে। সেটা না করে দাদাকে নিয়ে কে কী কবে ভুয়ো খবর লিখেছিল সেটা নিয়ে পড়েছেন।

ভূপেনবাবু, আমার ডিপার্টমেন্ট আমায় অ্যাপয়েন্ট করেছে আপনি নন। তাই আমি কী নিয়ে পড়ব না পড়ব সেটা আমি বুঝব।

ভূপেন চুপ করতে বাধ্য হল।

ভূপেন তুই চুপ কর। বলুন স্বয়ম্ভুবাবু, আপনি কী বলতে চান সেটা খুলে বলুন।

সেদিন পার্টিতে মেঘা আর কথাকলির বাগবিতণ্ডার বিষয় কী ছিল জানেন? আপনি। তাই হয়তো ওর বাবাকে ট্রাকে চাপা পড়তে হল। আর মেঘাকে যেতে হল কোমায়।

সোমেন হাতদুটো মুঠো করে। গলা খাদে নামিয়ে আনে, আপনি কি এসবের জন্য আমায় অ্যাকিউজ করতে এসেছেন? আগে ছিল শিশু পাচারকারী, আর এখন আমি খুনিও হয়ে গেলাম। বেশ তো…! দুটো হাত স্বয়ম্ভুর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল সোমেন, নিন আমায় অ্যারেস্ট করুন। করুন করুন। শুধু আমার মেয়েটাকে খুঁজে দিন স্বয়ম্ভুবাবু প্লিজ। ওই আমার একমাত্র আশা ভরসা সব কিছু।

মঙ্গলবার পার্টির পরে কথাকলি বাড়িতে ফিরেছিল। তারপর?

কেন? ভগবান তো সেদিন আপনাকে বলল, বুধবার সকালে কথাকে বেরোতে দেখেছে।

আবারও হাল ধরল ভূপেন। সোমেনের দিক থেকে স্বয়ম্ভু ভূপেনের দিকে ঘুরে বলল, সেখানেই তো খটকা। তাহলে বুধবার সন্ধেবেলা আবার কোথায় গেল? ও, আরও একটা বড়ো জিনিস মিস করে যাচ্ছি, ভূপেনবাবু আপনি ঠিক যে পোশাকটা পরে কথাকলিকে বুধবার পার্টিতে যেতে দেখেছেন এক্সাক্ট ওই জামাটাই মঙ্গলবার স্যামের পার্টিতে কলি পরেছিল। এত বড়োলোকের মেয়ে, যে গাড়ি ছাড়া চলে না, সে কিনা একই ড্রেস পরে পরপর দুদিন বন্ধুর পার্টিতে গেল? এও সম্ভব?

আমি যা দেখেছি আপনাকে সেটাই বলেছি।

খুব ভালো। আপনি তো এ বাড়িতে থাকেন না। তাহলে ঠিক সেদিনই ওই সময়ে এ বাড়িতে আপনি কী করছিলেন? তাছাড়া আপনি তো বলেছিলেন সোমেনবাবু যখন থানায় রিপোর্ট লেখাচ্ছিলেন তখন কথাকলির ড্রেসের সম্পর্কে আপনি জেনেছিলেন। তাহলে নিজের চোখে দেখলেন কী করে?

ও…ওটা তখন আমার খেয়াল ছিল না। সেদিন দাদাই ডেকেছিল একটা কাজে।

এরপর কিছুক্ষণ নীরবতা। স্বয়ম্ভুর দিকে তাকাচ্ছে না ভূপেন। কনফিডেন্সের সঙ্গে স্বয়ম্ভু কথা ছুড়ে দিল, সোমেনবাবু তো সেদিন বাড়িতেই ছিলেন না। সন্ধে থেকেই ওনার নতুন অফিসে ছিলেন। তাহলে আপনাকে বাড়িতে ডাকলেন কখন?

কক্ষনো না। দাদা তখন বাড়িতেই ছিল। কী গো দাদা? বলো।

ভূপেন যেন হালে পানি পাচ্ছে না। তাই সোমেনকে টেনে ধরল।

বিশ্বাস করুন, আমার কিচ্ছু মাথায় নেই। আমি শুধু আমার মেয়েকে ফেরত চাই।

কথার মাঝে ঈশ্বর এসে দাঁড়াল। দাদা, তোমার ওষুধ খাওয়ার সময় হয়েছে।

কীসের ওষুধ?

সটান প্রশ্ন করে স্বয়ম্ভু। ঈশ্বর বলে, জানি না। ডাক্তার দিয়েছেন।

সোমেনবাবু, আপনার তো হাই প্রেশারের প্রবলেম। সকালে জলখাবার খেয়েই বা অনেক সময়ে রাতে খাওয়ার পরে প্রেশারের ওষুধ খেতে হয়। কিন্তু বিকেলবেলায় কীসের ওষুধ?

আপনি ডাক্তারিটাও পাস করেছেন নাকি?

এবার সোমেনকে যেন একটু কড়া লাগল। স্বয়ম্ভু হাসল। বলল, না না, অত ট্যালেন্ট আমার নেই। যাই হোক, আমি একটু মিসেস সরকারের কাছে যাব।

সোফা ছেড়ে উঠেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল সোমেন। বলল, খাচ্ছে না, নড়ছে না। কারও সঙ্গে কথা অবধি বলছে না। ওই ঠাকুরঘরেই বসে আছে। ওনাকে আর বিরক্ত করবেন না। প্লিজ। এটা আমার রিকোয়েস্ট। হাতজোড় করল সোমেন। অগত্যা স্বয়ম্ভুও পালটা হাতজোড় করে বেরিয়ে এল। শুধু যাওয়ার আগে সারা বাড়িতে একঝলক চোখ বুলিয়ে নিল। তাতে নতুন একজন মানুষকে দেখতে পেল স্বয়ম্ভু। প্রথমদিন একঝলক দেখেছিল বোধহয়। সোমেনের মুখে নাম শুনেছিল, মতি। এ বাড়ির রাঁধুনি। সে রান্নাঘর থেকে মুখ বাড়িয়ে চুপচাপ দেখছিল স্বয়ম্ভুকে। কেন? কিছু কি বলতে চায়?

.

গাড়িতে উঠেই সঞ্জয়কে জিজ্ঞেস করে স্বয়ম্ভু, গিয়েছিলে?

হ্যাঁ স্যার। এখান থেকে মিনিট বারো। পূর্বপল্লি বলে একটা জায়গা আছে। সেখানে থাকে। চলো তো।

ওকে স্যার।

গাড়ি স্টার্ট দিল সঞ্জয়। মোবাইলে চোখ পড়তেই শিবাঙ্গীর ম্যাসেজ।

.

গাড়িটা এখনও ট্র্যাক করা যায়নি। অফিসে আসবেন বললেন, অন্য কোথাও গেছেন?

.

শিবাঙ্গী কি অপেক্ষা করে স্বয়ম্ভুর জন্য? কী জানি? নিজের মনেই ভালো লাগার হাসি হাসল। তবে সেই হাসিটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হওয়ার আগেই উড়ো মেঘের মতো গম্ভীর ভাব এসে জড়ো হল মুখের পেশিগুলোতে। সামনের জানলার পাশের ঝুলন্ত আয়নায় সন্দেহজনক একটা বাইক। হেলমেটে মুখ ঢাকা। তবে এই বাইকটাই যে এম.এল.এ-র বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছিল সেটা নিশ্চিত। তার মানে স্বয়স্তুর গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার জন্যই অপেক্ষা করছিল!

সঞ্জয়!

হ্যাঁ স্যার।

বাড়ি চলো।

পূর্বপল্লি যাবেন না?

আজকে নয়।

ওকে স্যার।

.

গাড়ি ছুটতে লাগল। পূর্বপল্লির মোড়টা ক্রস করে সোজা বেরিয়ে গেল স্বয়ম্ভু। পিছনের বাইকটা মোড়টা ক্রস করে বেশ খানিকটা এসে একটা পেট্রল পাম্পের কাছে থেমে গেল। কোনো লোকের সঙ্গে দেখা নয়, কোনো দোকান থেকে কিছু কেনা নয়, কোনো কারণও নেই। ছেলেটি এমনি এমনিই দাঁড়িয়ে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে শিবাঙ্গীকে ফোন। রিংয়ের শব্দও পেল না স্বয়ম্ভু, তার আগেই হ্যাঁ স্যার বলুন।

ফেউ লেগেছে। ফেউ

প্রথম চোটে কথাটা ধরতে দু-সেকেন্ড সময় নিয়ে শিবাঙ্গী বলল, কাউকে দেখলেন?

হুম। বাইকে। সোমেন সরকারের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। আমি বেরিয়ে গাড়িতে উঠতেই সেও দেখলাম বাইক নিয়ে আমায় ফলো করছে।

আপনি সোমেন সরকারের বাড়ি গেছিলেন?

হ্যাঁ।

পেলেন কিছু?

চেপে যাচ্ছে। অনেক কিছু চেপে যাচ্ছে। আমাদের আরও গভীরে যেতে হবে শিবাঙ্গী। একটা জিনিস খেয়াল করেছ? বিরোধীপক্ষ কিন্তু এ নিয়ে একদম স্পিকটি নট। কেউ কোনো বাইট দিচ্ছে না।

আজকেই দিয়েছে স্যার।

তাই নাকি? কে? কী বলেছে?

বিরোধীপক্ষের অর্ধেন্দু ব্যানার্জি। বলছে, সব পাপের ফল। যে এক সময় কত মায়ের কোল খালি করে শিশু পাচার করেছে। এমনকী গবাদিপশুকেও রেহাই দেয়নি। আজ তারই মেয়ে উধাও।

এর মধ্যে আবার স্বপন নন্দীর মৃত্যু। শিশু পাচারের ব্যাপারটা আবার উঠে আসবে দেখো।

কিন্তু স্যার, এসব যত উঠবে আমাদের কাজ তত ঘোলাটে হয়ে যাবে। একটা কাজ করো তো শিবাঙ্গী, কস্তুরীর কল লিস্টটা বের করার ব্যবস্থা করো। লাস্ট সাতদিন। আমার খুব সন্দেহ আছে আদৌ ঈশিতাকে ফোনটা করা হয়েছিল কিনা।

ও স্যার, বলতেই ভুলে গেছি। আমি আজ আরও বার কয়েক কল করেছিলাম ঈশিতা আর তার মায়ের ফোনে। আগে বলছিল সুইচড অফ। এখন বলছে নট রিচেবল।

.

নট রিচেবল কথাটা স্বয়ম্ভুর মগজে আবারও ধাক্কা দেয়। দেশ ছেড়ে পালাল নাকি? স্বয়ম্ভুর মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল। শূন্যে ঘুষি ছুড়ে বলে ওঠে, শালা গাড়িটার হদিশও যদি মিলত।

.

জন কোলাহলের মধ্যেই রাত নামে। প্রথমে গোধূলির ভেক ধরে। তারপর একটু একটু করে সন্ধের আঁধারকে শহরের বাতাসে ছড়িয়ে দেয়। সময় বুঝে নিকষ অন্ধকারটা রাজপথ, কানাগলি ধরে হেলে সাপের মতো জনজীবনের বুকের মধ্যে সেঁধিয়ে যায়। পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় তখন সাধুরা পুজোর জোগাড় সাজায় আর দুর্জনেরা সুজনের ছদ্মবেশে পথ ছেড়ে গলি ধরে ধীমে আলোর আঁচে গা বাঁচিয়ে ঘরের দরজায় এসে কড়া নাড়ে।

.

রাতের নামাজ শেষ করে বউকে ডাকল আবদুল, রাবেয়াআআআ, রাবেয়াআআআ। খেতে দাও। রান্নাঘর থেকে উত্তর উড়ে এল, দিই-ই। চেয়ারে বসেন। আবদুল ঘর ছেড়ে খাবার ঘরে গেল। মতিউর কই? খাবে মা? থালা বাসনের ঠুংঠাং শব্দের সঙ্গে রাবেয়ার গলা, ঘরে। একটু ডাক দেন না। দশবার না ডাকলে তো বাবুর দেখা মেলে না। আবদুল সবেমাত্র ছেলেকে ডাকবার জন্য মুখ খুলছিল অমনি দরজায় বেল বাজল। এত রাতে আবার কে এল? আবদুল দরজার দিকে এগিয়ে গেল। বেলটা আবার বাজল। আবদুল সাড়া করল, যাআআআই, কেএএএ? বাইরে থেকে সাড়া না পেয়েও আবদুল দরজাটা খুলে দিল।

.

রাবেয়া টেবিলে খাবার বেড়ে ছেলেকে ডেকে বসিয়ে দিল। কিন্তু আবদুলের দেখা নেই। খানিক গজগজ করতে করতে বাইরের ঘরে গিয়ে দেখে ঘর ফাঁকা। দরজা হাট করে খোলা। দরজার সামনে যেই গেছে অমনি এক অচেনা তাগড়া পুরুষমানুষ মুখের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। কালো জামা, কালো প্যান্ট। চমকে ওঠে রাবেয়া বিবি।

এ কী! কে আপনি?

লোকটি আবদুলের খোঁজ করল। রাবেয়া অবাক হয়ে বলল, সে কী! আপনিই তো বেল দিলেন বলে উনি দরজা খুলতে এলেন।

ফালতু কথা না বলে ডাকুন আবদুলকে।

আশ্চর্য! উনি তো কিছুক্ষণ আগেই বেল বাজল বলে দরজা খুললেন। কোথায় গেল সে?

বাড়ির ভেতর নেই?

না। কিন্তু আপনি কে?

আবদুল চেনে। তাকে ডাকুন। নইলে কিন্তু ওরই বিপদ

মানে? কী বিপদ? অ্যাই, মতিউর এদিকে আয় তো। বলছি তোর আব্বু নেই বিশ্বাস করছে না। নিশ্চয়ই আপনারা ওকে কোথাও সরিয়ে এখন নাটক করছেন।

থামুন।

ধমকে উঠল লোকটা। ভিতর থেকে ছেলে দৌড়ে এল। সেও একই কথা বলাতে লোকটা বলল, বেশ। এলে বলবেন উকিলবাবু এসেছিলেন। আর আসবেন না। এবার যেন নিজে বুঝে নেয়। বলেই লোকটা বাড়ির ভিতরে মুখ বাড়িয়ে এদিক-ওদিক দেখার চেষ্টা করে। অভীষ্টের টিকি না পেয়ে আবছা আঁধারে ঢাকা গলিটা ধরে চলে যায়। আতঙ্কিত মুখে অন্ধকারের দিকে চেয়ে থাকে রাবেয়া।

অন্যদিন স্বয়ম্ভু যে গাড়ি করে বাড়ি যায় সেটাই নামিয়ে দিয়ে যায় শিবাঙ্গীকে। কিন্তু আজ কোনো একটা কাজে সঞ্জয়কে ধরে রেখেছে স্বয়। কাজ শেষে বলল অফিসে আসবে। অনেকক্ষণ হাপিত্যেশ করে বসে রইল শিবাদী। কিন্তু স্বয়ম্ভুর দেখা পেল না। কত আর হোয়াটসঅ্যাপ আর ফোন করা যায়? উচিতও নয়। কে জানে কী কাজে আছে! তাই মেট্রো থেকে নেমে একটা রিক্সা ধরে বাড়ি এল। ভাড়া চুকিয়ে রিক্সাটাকে ছেড়ে দিয়ে নিজে বাড়ির দিকে ঘুরতে গিয়েই কী যেন একটা মনে হল। যেদিক দিয়ে ঘুরল সেদিকেই আবার ফিরে তাকাল। দূরের ল্যাম্পপোস্টের নিচে কেউ একজন দাঁড়িয়ে। ইচ্ছে করে আলোর নিচে না দাঁড়িয়ে খানিকটা ছায়ায় মুখ ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে আছে যাতে তেমন করে চেনা না যায়। কিন্তু শিবাঙ্গীর চোখে প্যান্ট আর শার্টের টেক্সচারটা চেনা চেনা লাগছে। সকালের ওই ছেলেটা না? নড়ছে না চড়ছে না, ওরকম একভাবে দাঁড়িয়ে আছে কার জন্যে? শিবাঙ্গীকে খানিক দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে দুরের আগন্তুকও মুখ ফিরিয়ে হাঁটা দিল। হঠাৎ করেই শিবাঙ্গীর চিঠিতে পাওয়া কবিতাটা মনে পড়ল, জেতার নেশা সর্বনাশা, হারলেও আছে সুখ/ নেশার পিছে ছুটলে বৃথা পুড়বে জেনো মুখ! বুকের কাছটা ভারী হয়ে উঠল। আজ শিবাঙ্গী এই ঘটনাটা স্বয়ম্ভুকে জানাবে বলে ঠিক করেই রেখেছিল। কিন্তু তিনি এলে তবে না! শিবাঙ্গী ও আশেপাশে ভালো করে চোখ বুলিয়ে ঘরে চলে গেল।

.

সুচিত্রা দরজা খুলতেই একেবারে হালুম করে উঠল স্বয়ম্ভু, কী ব্যাপার কী ঘুমিয়ে পড়েছিলে নাকি? সুচিত্রা জবাব দিল, না না। ঘর থেকে উঠে আসতে সময় লাগে তো নাকি! সুচিত্রার নড়নচড়ন দেখেই স্বয়ম্ভুর কীরকম যেন মনে হল। জুতো খুলতে খুলতে প্রশ্ন করল, পায়ে কী হয়েছে তোমার? খোঁড়াচ্ছ কেন? সুচিত্রা দরজাটা বন্ধ করে ঘুরে ঘরের দিকে যেতে গিয়ে যন্ত্রণায় মুখটা কুঁচকে ফেলল। স্বয়ম্ভু দুহাতে মাকে ধরে বেশ শঙ্কিত হয়েই বলল, কী হয়েছে বলো তো? পড়ে গেছ নাকি? দেখি সাবধানে। কোথা থেকে পড়েছ? কী গো?

উফফ দাঁড়া রে বাবা দাঁড়া।

বসার ঘরের ডিভানটায় ধপ করে বসে পড়ল সুচিত্রা। সত্যিই আর শরীর টানতে পারছে না। আজ অনেক বড়ো একটা দুর্ঘটনার হাত থেকে বেঁচে গেছি।

মানে! কী হয়েছে খুলে বলো তো।

আমি বিকেলে যেমন হাঁটতে বেরোই বেরিয়েছিলাম। এই তো সামনের রাস্তাটাতেই। কোথাও কিছু নেই। বেশ ধার দিয়ে দিয়েই হাঁটছিলাম। হঠাৎ একটা গাড়ির হর্ন শুনতে পাই। এক্কেবারে কানের কাছে এসে দিচ্ছে। পিছন ঘুরে দেখতে দেখতেই এক্কেবারে মুখের সামনে। মুহূর্তে মনে হল, আমি আর নেই। ও মা! কোথা থেকে একটা ছেলে আমায় একেবারে ঝড়ের বেগে উড়িয়ে নিয়ে সরিয়ে দিল। আর ওই গাড়িটা তক্ষুনি ফুল স্পিডে শাঁ শাঁ করে বেরিয়ে গেল।

কীরকম গাড়ি?

কী গাড়ি-ফাড়ি আমি জানি না। ওই সাদা রঙের ক্যাব রে। সেরকম তা আমি তো খানিকক্ষণের জন্য বোবা হয়ে গেছিলাম। থরথর করে কাঁপছি। ওই যে ছেলেটি, কী চমৎকার দেখতে রে ভোলা কী বলব। টকটকে ফরসা। গালে হালকা হালকা চাপ দাড়ি। যেন সাক্ষাৎ বীর রাজপুত্র।

উফ মা! রূপের বর্ণনা ছেড়ে তারপর কী হল বলো।

কী আবার হবে? ওই ধরে ধরে বাড়িতে দিয়ে গেল। এত ভালো ছেলে না রে ভোলা কী বলব। আজকাল ছেলেরা তো ফিরেও চায় না।

স্বয়ম্ভু আবার বিরক্ত হচ্ছে দেখে সুচিত্রা বলল, ছেলেটি নিজেই ফ্রিজ খুলে বরফ বের করে কুড়ি মিনিট ধরে পায়ে ঘষল। আমার তো কি লজ্জা করছে। চিনি না জানি না একটা ছেলে আমার পায়ে বরফ ঘষছে। তা ও বলল, লজ্জা কী মাসিমা? আমি তো আপনার ছেলের মতোই। এখন আপনার চিকিৎসা করা জরুরি। আবার বলে চুনহলুদ গরম করে নাকি এনে লাগিয়ে দেবে। আমি তো শুনে অবাক। আজকালকার ছেলে হয়ে এসব চুনহলুদ জানল কী করে? বলল, ওর ঠাকুমাকে দেখেছে ছোটোবেলায় তারপর নিজেই দেখি পকেট থেকে আর্নিকা বের করে খাইয়ে দিল আমায়। কাপে করে জল এনে লিকুইডটা লাগিয়েও দিল।

দাঁড়াও দাঁড়াও… আর্নিকা পকেটে নিয়ে ঘোরে নাকি ছেলেটা?

স্বয়ম্ভু চমকে উঠে জিজ্ঞেস করে। সুচিত্রা বলল, এইটাই আমিও জিজ্ঞেস করেছিলাম। ও বলল, ওকে নাকি লাইট পোস্টে উঠে কীসব কাজ করতে হয়। এদিকে তো সেই কাজেই এসেছিল। পড়ে ধরে যায় ঘন ঘন। তাই কাছে রেখে দিয়েছে। আমি শুধু ভাবছি, ভাগ্যিস ছেলেটা ছিল। নইলে আজ আর ফিরে মাকে দেখতে পেতিস না।

কী নাম ছেলেটার?

পুরুষোত্তম। জিজ্ঞেস করলাম পদবী কী? সে তো কিছুতেই বলতে চায় না। লজ্জায় মরে। তারপর বলল, মাল।

পুরুষোত্তম মাল!

ব্যথা নিয়েই হেসে ফেলল সুচিত্রা। ছেলেটা নাকি তার বাবাকে কতবার বলেছে টাইটেলটা পালটাতে। ওর বাবা রাজি হয়নি।

মা, আমি যতদিন না বলছি ততদিন তুমি বাড়ির বাইরে পা রেখো না।

অয় নাও! ছেলে একখান কেস পেল কী বাড়িতে হাজার একটা রেস্ট্রিকশন শুরু হয়ে গেল।

মাথায় কিন্তু ফাটা দাগটা এখনও জ্বলজ্বল করছে। ভুলে গেছ সে-কথা?

তুইও ভুলিস না, তোর আগের কেসে আমি বাড়িতেই ছিলাম। অও খুনি এসে আমার মাথা ফাটিয়ে চলে গেসল।

সে তো তোমার ওস্তাদির জন্য। কতবার করে বলেছিলাম ছাদের দরজা খুলে রেখো না। কে শোনে কার কথা।

নে নে অনেক হয়েছে। রাত সাড়ে এগারোটা বেজে গেল ভোলা। যা হাত-মুখ ধুয়ে আয়। আমি খেতে দিয়ে দিই তোকে।

কিচ্ছু করবে না।

ছদ্মবকুনি দিল ছেলে। ওরে আমি পারব।

চুপ করে বসে থাকো। আমি ফ্রেশ হয়ে এসে খাবার বেড়ে নিচ্ছি।

কোনো দরকার নেই। আমিই….

আবার বাড়তি কথা বলছ?

স্বয়ম্ভু ওপরের সিঁড়ির দিকে ঘুরেও আবার মায়ের দিকে চাইল, তুমি খেয়েছ? সুচিত্রার চোখে এড়ানোর চাউনি। আলতো করে বলল, এত ব্যথা করছিল খিদেই পায়নি। একটা কথাও না বলে রীতিমতো সিঁড়িতে ধপ ধপ করে পা ঠুকে ঠুকে উঠে গেল ভোলা।

.

ডাক পাঠালে পালাতে পারত। তাই সরাসরি কাজের জায়গা থেকে তুলে আনা হয়েছে নিখিল মণ্ডলকে। ভার্দে ভিস্তার ম্যানেজার বেশ বিব্রত হয়েছে। স্বয়ম্ভু পঞ্চসায়র পুলিশ স্টেশনে আগে থেকেই বসেছিল। শিবাঙ্গীকেও ডেকে নিয়েছে। পুলিশ স্টেশনের ছোট্ট জিজ্ঞাসাবাদের ঘরখানায় চৌকো টেবিলটার একপাশে বসে ঘামছে নিখিল। মুখ শুকিয়ে এসেছে। যথারীতি ভয় পেয়েছে।

স্যার, আমি যা জানি সবই তো সেদিন বলে দিলাম। আর আমায় কেন ধরে এনেছেন স্যার?

স্বয়ম্ভু নম্র হয়ে বলল, রোমিও-জুলিয়েটের গল্প শুনতে। নিখিল ভেবলে একবার স্বয়ম্ভু আরেকবার শিবাঙ্গীর দিকে তাকাচ্ছে। শিবাঙ্গী খোলসা করল ব্যাপারটা। স্কুল থেকে খবর পেলাম তোমরা নাকি একবার মন্দারমণি পালিয়ে ছিলে। নিখিলের বুকের ওপরে একখানা যে ভারী পাথর সশব্দে পড়ল সেটা মুখের পেশিগুলোর নড়াচড়া দেখে ভালোই বোঝা গেল।

সেদিন তার মানে মিথ্যে কথা বলেছিলি আমাদের। তোদের কোনো সম্পর্ক ছিল না? জাস্ট বন্ধু?

স্বয়ম্ভু বলল। নিখিল চুপ। এবার শিবাঙ্গী চাপ দিল, কী রে বল এবার সত্যি করে। প্রেম ঠিক কতটা গভীর ছিল যে কলকাতা ছেড়ে মন্দারমণিতে পালাতে হল?

নিখিল এবারেও চুপ। স্বয়ম্ভু বলল, ঠিক আছে তোকে বলতে হবে না। আমি বলি শোন। তুই তখন ক্লাস ইলেভেনে পড়িস। কথাকলি টেন। দেখতে শুনতে বেশ ভালো। স্টাইলিশ। এই বয়সে বেশিরভাগ ছেলের মধ্যেই একটা ইশে থাকে, মানে আগুন। চ্যালেঞ্জের আগুন। চুলকানিও বলা যায়। এই বয়সে একটা মেয়েকে পটাতেই হবে। নইলে বন্ধুমহলে পুরুষ বলে মান পাবে না। তার ওপর যদি বড়োলোক বাপের একমাত্র লাডলি হয় তাহলে তো তোর সব অভাব ঘুচে যাবে। তাই পিছু পিছু ঘুরে ঘুরে পটিয়ে ভোলাভালা মেয়েটাকে মন্দারমণি নিয়ে গেলি। তুই ভাবলি, একটু এদিক- ওদিক ঘুরতে নিয়ে গেলে কথাকলিও তোর প্রেমে মজে থাকবে আর তুই ফূর্তিটাও করতে পারবি দিব্যি। এমন কিছু করবি যাতে মেয়েটা তোকে বিয়ে করতে বাধ্য হবে। সেই সুযোগে বড়োলোক শ্বশুরের ঘরজামাই হয়ে গেলেই লাইফটা সেটেলড। কিন্তু ভাবতে পারিসনি মেয়েটার বাবা পলিটিকালি স্ট্রং। ওদের বাড়ি থেকে তেড়েফুঁড়ে ওঠাতে তোর সব প্ল্যান ভেস্তে গেল। তুই নিজেই কথাকলির দিক থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলি। তাতে রেগে গেল কথাকলি। আর সেই রাগে সেদিন পার্টিতে তোদের দেখা হওয়া সত্ত্বেও মেয়েটা তোকে না চেনার ভান করেছিল। তোর থেকে ড্রিংক্স নিয়েই ফিরিয়ে দিয়েছিল। ঘেন্নায়। কি রে তাই তো?

নিখিল এখনও চুপ দেখে স্বয়ম্ভু তড়পে ওঠে, কি রে হ্যাঁ কি না বলবি না হাজতবাস করবি? স্বয়ম্ভুর মুখে গল্প শুনতে শুনতে নিখিলের চোখের পাতাদুটো মাটিতে নেমে এসেছিল। এখন স্বয়ম্ভু ধমকে ওঠায় নিখিল তার নামিয়ে রাখা চোখদুটো তুলে স্বয়ম্ভুর দিকে তাকাল। সরাসরি। অচঞ্চল চোখের তারা। চোখের পাতায় কোনো ভয়ের কাঁপন নেই। নিখিল শান্ত গলায় বলল, সবার প্রেমকাহিনি ধরাবাঁধা ছকে হয় না স্যার। আমারটাও হয়নি। হ্যাঁ আমি আর কথাকলি প্রেম করতাম। হইহই করে প্রেম করতাম। আমরা মন্দারমণিও গিয়েছিলাম। আপনাদের ভাষায় ওই যেটা চুলকানি, আমাদের প্রেমে সেটাও ছিল। আগুনও ছিল তবে সেটা চ্যালেঞ্জের নয়। যৌবনের। প্রথম ভালোবাসার।

স্বয়ম্ভু আর শিবাঙ্গী ভাবেনি এই ছেলেটি এইভাবে তার জীবনের পরা বলে যাবে। নিখিল বলল, আপনারা যেভাবে গল্পটা সাজিয়েছেন আমাদের প্রেমটা সেভাবে শুরু হয়নি স্যার।

***

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *