কথাকলি কোথায় – ১১

১১

ফাঁকা বাড়ি। একলা স্বয়ম্ভু। কুবো ডাকা নির্জন দুপুরটা ধীরে ধীরে বিকেলের দিকে গড়াচ্ছে। বাইরের জামাকাপড় আগের মতোই গায়ের সঙ্গে লেপটে আছে। বিছানার গায়ে মাথা দিয়ে মাটিতে লুটিয়ে অনেকক্ষণ কেঁদেছে স্বয়ম্ভু। দরজা-জানলা শক্ত করে আঁটা। বাইরের পৃথিবীতে এক নরম আলো যে শিশুর মতো খেলতে খেলতে ঘরে ফিরছে সেটা দেখল না স্বয়ম্ভু। শিবাঙ্গীর গলার স্বরটা বারবার কানে বাজছে, আপনি কবে থেকে হুকুমের দাস হয়ে গেলেন স্যার? আইনের রক্ষক হয়ে স্বয়ম্ভু কি সত্যিই আইন ভাঙবে? না না, কীসের আইন ভাঙা? স্বয়ম্ভুকে ডিপার্টমেন্ট থেকে তো আর বের করে দেয়নি। এমনকী কেস থেকেও না। তাহলে? দূর থেকে আজানের শব্দ ভেসে আসছে। সেটুকুর অনুরণন ঘুরে ফিরে জানলার ফাঁকফোঁকর দিয়ে ঘরে ঢুকে স্বয়ম্ভুকে ঠেলছে। কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান করছে আজানের সুর। আরও যেন উদাস সুরে মনটাকে শূন্য করে দিয়ে যাচ্ছে। ঠিক তখনই স্বয়ম্ভুর নরম হয়ে আসা শিরদাঁড়াটায় চিলতে আগুনের রেখা খেলে গেল। মাথার মধ্যে আজানের সুর জাগিয়ে দিল মাজারের স্মৃতি। উন্মত্ত কাওয়ালি, অন্ধকার ঘর, আততায়ীর আক্রমণ, শিবাঙ্গীর পড়ে থাকা আর স্বয়ম্ভুর বলা কোড ওয়ার্ড। সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল স্বয়ম্ভু। সেদিন তো এই ঘরে দাঁড়িয়েই পুরো প্ল্যানটা ছকেছিল আর ফোনে শিবাঙ্গী ও কৌশিককে বলেছিল। বাথরুমে তো যায়নি। ফোনটাও ট্যাপ করেনি কেউ। তাহলে এই ঘরেই…

.

পাঁচটা মিনিটের মধ্যে ঘরদোর তোলপাড় করে ফেলল স্বয়ম্ভু। এই ঘরের কোনো ফুটেজ পাঠায়নি দুষ্কৃতি। কিন্তু মন বলছে সেটাও তার কাছে আছে। প্রায় বেশ খানিক বাদে আলমারির মাথার একটা কোণ থেকে উদ্ধার হল একইরকম ছোট্ট ক্যামেরা। এমন ক্যামেরা যা দুই আঙুলের ফাঁকে নিয়ে কড়াইশুঁটির মতো গিলে ফেলা যায়। ক্যামেরাটা মাটিতে আছড়ে ফেলল। তারপর লোহার তালা দিয়ে ঘা মেরে ভেঙে টুকরো করে দিল। নিচে নেমে বাড়ির বাইরে এসে পরপর দুখানা ফোন সারল স্বয়ম্ভু।

শিবাঙ্গী, যত তাড়াতাড়ি পারো একটা খোঁজ নাও। দরকার হলে লোক লাগাও। গত সাত থেকে দশদিনের মধ্যে কোন কোন থানায় মিসিং ডায়েরি হয়েছে। স্পেশ্যালি মেয়ে। ডিটেলস খবর লাগবে।

.

এরপরেই খোঁচড়কে ফোন, রতন, পরশুরামকে লাগবে। সঙ্গে ওর টোটাল টিম। আজকেই লাগবে। এক ঘণ্টার মধ্যে আমি তোদের সঙ্গে দেখা করব। গোপনে। বসির, লালন, প্রভাত, রসুল সবাইকে আসতে বল। 

.

এখনও ভালোই আলো আছে আকাশে। হলদেটে আভা আকাশের শরীর থেকে কমতে কমতে পশ্চিমে ঢলে পড়ছে। মোবাইলটা কান থেকে নামাতেই দেখল পাশের বাড়ির টুবাই ব্যাট হাতে খেলে ফিরছে। স্বয়ম্ভু হাসল। টুবাই হাসল না। মুখ ঘুরিয়ে বাড়ির দিকে চলে গেল। ওদের বাড়িতে টিভি আছে। সেখানে নিউজ চলে। হাতে মোবাইলও আছে। ইচ্ছে হলেই স্বরঘুর ন্যাংটো চেহারাটা দেখে নিতে পারে। টুবাইও কি দেখেছে সব?

আর রাগ হল না। হাসি পেল স্বয়ম্ভুর। মনে মনে আওড়ে নিল প্রবাদটা, ল্যাংটার নেই বাটপারের ভয়।

.

কথাকলির ঘর রোজ খোলা হয়। দেয়াল জোড়া বিশাল ছবিটা নিয়ম করে ঝাড়া হয়। একটু আগেই ঈশ্বরকে ডেকে একপ্রস্থ ঝাড় দিল সোমেন। ছবির ওপর আঙুল দিয়ে দেখেছে ময়লা জমেছে। ঘরে শুধু ল্যাম্পশেডের আলো। কথাকলি তাতেই হাসছে। ছবির সামনে চুপ করে দাঁড়িয়ে সোমেন। অসহায় চোখে একদৃষ্টে চেয়ে আছে মেয়ের দিকে। একভাবে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখটা জ্বালা করে উঠছে সোমেনের।

কাকে দেখছ?

মেয়ের স্মৃতিতে ডুবে গিয়েছিল সোমেন। আচমকা মানুষের গলার স্বর ভেসে আসাতে চমকে তাকায়। তুমি? ঠাকুরঘর থেকে বেরোলে তাহলে? কস্তুরী জবাব দিল, একমনে ঠাকুর ডাকতে পারলাম না যে। চারপাশে বঙ্গ শব্দ হচ্ছে। সোমেন অবাক হয়ে স্ত্রীর দিকে তাকাল। আশেপাশে তো তেমন কোনো শব্দ নেই। তাহলে কস্তুরী কীসের কথা বলছে? কীসের শব্দ? প্রশ্ন করল সোমেন। কস্তুরী জবাব দিল, ভেঙে পড়ার। ঘরের বাইরে একটা ছায়া এসে চুপটি করে দাঁড়িয়েছে। সোমেন বলল, কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দিতে এসেছ?

নুন কেন? গন্ধমাদন থেকে সঞ্জীবনী এনে দিলেও বাঁচার রাস্তা নেই। হাজারটা পাপ দিয়ে কী আর একটা পাপ ঢাকা যায়?

পাপ?

সোমেন হাসল। বলল, তোমার মতো নির্লজ্জ মহিলা ভূভারতে বিরল। পাপ দিয়ে পাপ ঢাকিনি। অন্য কারও অক্ষমতা ঢেকেছি। কথা না বাড়িয়ে জোরে জোরে পা ফেলে বাইরে বেরিয়ে গেল সোমেন। কস্তুরী আড়চোখে দেখল সোমেন যেন কাকে দেখে চুপ করে দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। দরজায় এসে দাঁড়াল দেওর ভূপেন। কস্তুরীর চোখ দুটো রাগে লাল হয়ে উঠল। পাহাড় ফুঁড়ে গলিত লাভার মতো চোখের জল নেমে এল ঝরঝর করে।

.

জেল থেকে ছাড়া পেয়ে ভানুপ্রিয়া সামনের রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছে। ফোনটায় চার্জ না থাকায় বন্ধ। একটা যে গাড়ি বুক করবে তারও উপায় নেই। এপাশ-ওপাশ দেখতে দেখতেই একটা মারুতি সুইফট ডিজায়ার সামনে এসে দাঁড়ায়। ড্রাইভার ভিতর থেকে হাঁকে, ও দিদি, যাবেন কোথায়?

এয়ারপোর্ট। যাবেন?

এয়ারপোর্ট! এখন ফিরতি প্যাসেঞ্জার পাব না। দুশো টাকা বেশি দেবেন।

ঠিক আছে ঠিক আছে চলুন।

ভানুপ্রিয়া দরজা খুলে গাড়ির মধ্যে রাজার হালে বসল। গাড়িটা স্পিড নিয়ে বেশ খানিকটা এগিয়েই একটু স্লো হতেই চারপাশ থেকে গাড়ির দরজা খুলে হুড়মুড় করে তিনজন লোক উঠে পড়ল। মুখ বাঁধা। চেনার উপায় নেই। চেহারা বেশ গাঁট্টাগোট্টা।

একি! কে তোমরা? গাড়িতে উঠেছ কেন? নামো। আরে….

.

কে শোনে কার কথা? একজন ভানুপ্রিয়ার মুখে রুমাল চেপে ধরতে যায়। ভানুপ্রিয়া কনুইয়ের গুঁতো মারে। আরেকজনের মুখে ঘুষি চালিয়ে দেয়। গাড়ির মধ্যেই ধস্তাধস্তি হতে থাকে। ওদিকে গাড়িটা পক্ষীরাজের মতো উড়ে যায় ভানুপ্রিয়াকে নিয়ে।

.

আজকের মতো ডিউটি সেরে সন্ধ্যা চলে গেছে প্রায় ঘণ্টাদুয়েক হল। এঁদো গলিটার মধ্যে এই একতলা দুকামরার বাড়িটা বেশ পুরোনো। অনেক জায়গায় ভেঙে গিয়েছিল বলে সদ্য সিমেন্টের তাপ্পি দেওয়া হয়েছে। প্রায় কপাল অবধি ঘোমটা টেনে মাঝবয়সি মহিলাটি গুটিসুটি মেরে দাঁড়িয়ে আছে। ঘোমটার আড়ালে মুখ চোখে বেশ বিরক্তি। এ ঘর ও ঘর, রান্নাঘর, ঝুল পড়া বাথরুম সব জায়গা ঘুরে ভালো করে দেখে এসে স্বয়ম্ভু প্রশ্ন করল, সত্যিই জানেন না ভগবান কোথায় গেছে?

না বাবু। আমি তো রান্নাঘরে রুটি কচ্ছিলাম। এসে দেখি ঘর খালি। দজ্জা ভেজিয়ে লোকটা বেরিয়ে গেছে।

রাতবিরেতে এ-রকম কি মাঝেমধ্যেই বেরিয়ে যায় ভগবান? ভগবানের বউ মাথা হেলিয়ে উত্তর দিল।

রাতে দেখতে পায় ভালো করে?

হ্যাঁ।

ওর তো একটা চোখে কী যেন হয়েছিল না?

অ্যাস্যিডেন। ছেলের সঙ্গে বাজি বানাতে গিয়ে বোমা ফেটে লোকটার চোখ গেল।

ছেলে মানে? ঈশ্বর?

দুপাশে মাথা নাড়ল ভগবানের বউ। মহেশ্বর!

সঙ্গে সঙ্গে স্বয়ম্ভুর ভুরু দুটো কুঁচকে গেল। বড়ো ছেলে?

হ্যাঁ।

ওর নাম পরমেশ্বর না?

না তো। আমি পরমেশ্বরই রাকতে চেছিলুম। কিন্তু ওর বাবাই ওর

নাম মহেশ্বর ঠিক করে।

স্বয়ম্ভু উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করে, আচ্ছা, বাজি বানাতে গিয়ে ভগবানের চোখ গেল। আর মহেশ্বরের কিছু হয়নি?

হয়েছিল। ডান হাতের একটা আঙুলের আদ্দেকটা উড়ে গেল।

স্বয়ম্ভুর মনের মধ্যে ছেঁড়া ছেঁড়া ফুলগুলো এক এক করে যেন একটি সুতোয় নিজে থেকেই গাঁথা হয়ে যাচ্ছে।

মহেশ্বর কোথায়?

জানি না। কত বছর হয়ে গেল বাপের সঙ্গে ঝগড়া করে বাড়ি ছাড়া।

কী নিয়ে ঝগড়া?

তাও জানি না। আমি তখন লোকের বাড়ি কাজ কত্তাম। সবে সবে করোনা শুরু হয়েছে। লকডাউন হয়নি। একদিন ফিরে এসে শুনি ছেলে ব্যাগ গুছিয়ে চলে গেছে। টাকাপয়সা নিয়ে বাপের সঙ্গে নাকি তক্কাতক্কি হয়েছে। আমি কত কাঁদলাম। তবু ছেলে ফিরল না।

ঈশ্বর কখন আসে বাড়িতে?

কথাকলি হারিয়ে যাওয়ার পর থেকে আর আসচে না। ও বাবুর কাছেই থাকছে।

বাইরে থেকে কাশির আওয়াজ ভেসে আসে। বউটা চঞ্চল হয়ে বলে ওঠে, অয় এল বোধহয়। খকখক করে কাশতে কাশতে ঘরে ঢুকল ভগবান দাস। স্বয়ম্ভুকে একেবারেই আশা করেনি এখানে। আপনি এত রাতে এখানে?

যাক আমায় মনে আছে তাহলে।

ভগবান হাসল। বলল, আসলে এখন চারপাশে আপনাকে নিয়ে এত কথাবার্তা হয় যে ভুলতে চাইলেও ভোলা সম্ভব নয়। তার মানে ভগবানও স্বয়ম্ভুর নগ্নতার সাক্ষী! চোয়ালটা শক্ত হয়েই নরম হয়ে গেল। রাগ দেখানোর সময় এটা নয়। তাই নিজেকে ঠান্ডা রেখেই স্বয়ম্ভু জানতে চাইল, এত রাতে কোথায় গিয়েছিলেন?

বিড়ি শেষ হয়ে গেসল। সেটাই আনতে গেসলুম। এই যে।

ফলে বিড়ির প্যাকেটটা স্বয়ম্ভুর মুখের সামনে বাড়িয়ে দেয়। প্যাকেটের দিকে একঝলক দেখে ভগবানের মুখের দিকে তাকায়। সরাসরি প্রশ্ন করে, কথাকলি কোথায়?

আজ্ঞে?

ভগবান ভেবলে যায়। ঘোমটার আড়ালে বউটা নড়ে ওঠে যেন!

কথাকলি কোথায়?

প্রশ্নটা আবার করে স্বয়ম্ভু।

সে তো আপনারাই জানবেন স্যার। আমি কী করে…?

আমাদের কাছে খবর আছে, কথাকলি আপনার কাছে আছে। আপনি তাকে লুকিয়ে রেখেছেন।

এ..এ কী বলছেন? আমি লুকিয়ে রাখব দিদিমণিকে? এমন বিদঘুটে খবর আপনাদের কে দিলে?

ভগবান, আমি ভালো করে জিজ্ঞেস করছি, কথাকলিকে কোথায় লুকিয়ে রেখেছ? কেন রেখেছ?

ও গো, ইনি কী বলছেন?

বউটা ঘোমটার আড়াল থেকে কাঁদো কাঁদো স্বরে বলে উঠল। আঃ, শিপ্রা। তুমি কেন কথা বলছ? স্বয়ম্ভুর দিকে চেয়ে ভগবান বলে, আজ বারো বছর হয়ে গেল আমি দাদাবাবুর নুন খেয়েছি। আমি তার মেয়েকে লুকিয়ে রাখব? এমন মশকরা করবেন না স্যার। কে কোথা থেকে শুনে ফেলবে। আমায় নিয়ে টানাটানি করবে। 

বারো বছর, না বিশ?

অ্যাঁ? বিশ? হবে হয়তো। সে যাই হোক, এ কাজ আমি করিনি।

মহেশ্বর কোথায়? ও তো মরেনি। দিব্যি বেঁচে আছে।

আমার কাছে মরে গেছে। তার সঙ্গে বহু বচ্ছর যোগাযোগ নেই। কুলাঙ্গার একটা।

কুলাঙ্গার কেন?

আর কেন! এই তো দেখছেন স্যার আমার এইটুকুন বাড়ি। সম্পত্তি বলতে এটাই। ওইটুকুন ছেলে বলে কিনা সবটা ওর নামে লিখে দিতে হবে। নয়তো লাখ দুয়েক টাকা ছাড়ো। পরে আরও লাগবে! দূর করে দিয়েছি। যাহ! খুঁটে খেয়ে দ্যাখ, দুলাখ টাকা রোজগার কত্তে কত পেচন ফাটে।

এই তো সব মনে আছে। শুধু বিশেষ কিছু কিছু কথা ভুলে যাও তাই না ভগবান।

আজ্ঞে।

কথাকলির হদিশ বলবে নাকি হাজতের ভাত খাবে?

এ কী আতান্তর! আমি কিচ্ছু জানি না। কিচ্ছুটি করিনি।

.

ভগবান আছ নাকিইইই?

হঠাৎ বাইরে থেকে ডাক। গলা শুনে বৃদ্ধই মনে হল। ভিতর থেকে ভগবান সাড়া দিল, কেএএএ?

নিরঞ্জন গো।

একটা বয়স্ক মানুষ খোলা দরজা দিয়ে মুখ বাড়াল। ভগবান বেশ অস্বস্তিতে পড়ল। আরে তুমি আবার এত রাতে এলে কেন? কোথায় পড়ে- ধরে যাবে। ভগবান নিজেই তরতর করে এগিয়ে গেল।

সারাজীবন রাজমিস্তিরির কাজ করলাম। এখনও চোখ বন্ধ করে ঘরের দেয়াল গেঁথে দিতে পারি।

বুঝেছি। তা এখন এলে যে?

তোমার বাবুর টাকাটা। ওই ঠাকুরের কাজটার সময়ে ধার নিয়েছিলাম না?

বোঝো অবস্থা। তা আমায় ফেরত দিচ্ছ কেন?

একবার ভেবেছিলাম, যার টাকা তাকেই ফেরত দিয়ে আসব। তোমাকে আর কষ্ট দেব না। তারপর ভাবলাম এখন যাওয়াটা ঠিক হবে না। মেয়েটাকেও তো খুঁজে পাওয়া গেল না।

আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে। অনেক রাত হয়েছে। তুমি যাও এখন সাবধানে যেও। পড়েধরে আবার কাণ্ড বাঁধিয়ো না।

না না। ঠিক আছে গো। আসি।

.

নিরঞ্জন বেরিয়ে যেতেই স্বয়ম্ভু বলল, কাল পর্যন্ত সময় দিচ্ছি ভগবানবাবু। যার নুন খেলেন এতদিন হঠাৎ তার মেয়েকেই কেন লুকিয়ে রাখলেন? কার কথায়? কালকের মধ্যে না জানালে হাজতবাস আপনার আটকানো যাবে না। আসি। স্বয়ম্ভু দ্রুত পায়ে বেরিয়ে অন্ধকারে হারিয়ে গেল। ভগবান ঠিক কী করবে বুঝতে পারল না।

.

পুলিশরাও তাহলে কিডন্যাপ করে?

দেয়ালে হেলান দিয়ে ভানুপ্রিয়া কথাটা বলে। সামনে দাঁড়িয়ে শিবাঙ্গী ও স্বয়ম্ভু। আশেপাশে চারজন ষণ্ডা মতন লোক। এরাই ভানুকে অপহরণ করে নিয়ে এসেছে।

কিডন্যাপ না করলে আজ হয়তো আপনি মার্ডার হয়ে যেতেন।

শিবাঙ্গীর কথা শুনে ভানুর চোখ দুটো বিস্ময়ে ছোটো হয়ে যায়। স্বয়ম্ভু বলে, আপনি জেল থেকে বেরোবার আগেই সোমেন সরকারের গাড়ি এসে অপেক্ষা করছিল।

আমি তো দেখিনি।

দেখেননি কারণ আমরা দেখার সুযোগটা দিইনি। তার আগেই গাড়িতে উঠে যান আপনি। সোমেনের গাড়ি ফলো করেছে বেশ কিছুটা। কিন্তু তারপর নিজে থেকেই অন্যদিকে ঘুরে যায়।

সোমেন সরকার আমায় কেন মার্ডার করবে?

কোনো কারণ নেই বলছেন?

না।

মারুফ হোসেন ধরা পড়েছে। থার্ড ডিগ্রি সহ্য করতে না পেরে সব বলে দিয়েছে।

কে মারুফ?

ভানু যেন আকাশ থেকে পড়ে। স্বয়ন্তু হাসে। বলে, নিজের লোককেই আপনি চিনতে পারছেন না?

আমার কোনো লোক এখানে নেই। মারুফ হোসেন বলে কাউকে আমি চিনি না।

কিন্তু সে তো আপনাকে দিব্যি চেনে। আপনার ফোন নম্বর পর্যন্ত তার কাছে আছে।

বেনারস, লখনউতে আমার বেশ নামডাক আছে। দেখুন আপনাদের ওই মারুফ হয়তো কোনো মেয়েকে ভুলিয়ে ভালিয়ে ওখানে বেচে দিয়েছে। সেখান থেকেই আমার নম্বর পেয়েছে।

নিজে মুখেই স্বীকার করলেন তাহলে, আপনি নাম করা প্রস্টিটিউটদের মাসি।

ভানুপ্রিয়া বাঁ পা-টা তুলে দেয়ালে হেলান দিয়ে আরেকটু ভালো করে বসল। যেখানে এনে তুলেছে এটা কোথায় কেউ জানে না। তবে জায়গাটা যে বসবাসের উপযুক্ত নয় সেটা বলাই বাহুল্য। ভাঙাচোরা বিশাল ঘর। মাঝেমধ্যে খিলান উঠেছে। হাঁকলে ডাকলে কারও সাড়া পাওয়া যাবে না। ভানু বলল, মাসি ওয়ার্ডটার মধ্যেও একটা মা আছে স্বয়ম্ভুবাবু। যে মেয়েদের করার কিছু নেই, রাস্তায় নামলে শেয়াল শকুনরা ছিঁড়ে খাবে সেই সব মেয়েদের আমি আশ্রয় দিই। শরীর যখন শেয়াল শকুনকে দিতেই হবে তখন তার দামটাও তারা বুঝে নিক। বিনে পয়সার ভোগ করে কেটে কেন পড়বে? তবে হ্যাঁ, আমার মেয়েদের সঙ্গে শেয়াল শকুনের মতো আচরণ করলে তার গলার নলিটা বেনারসের গঙ্গায় প্রদীপের সঙ্গে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। আরেকটা কথা, মেয়ে পাচার আমি করি না। বরং মেয়েরা পাচার হয়ে আমার কাছে আসে। জীবনে বাইজিগিরি করে অনেক পয়সা লুটেছি। ইচ্ছে ছিল সেই পয়সা দিয়ে যে মেয়েগুলো পাচার হয়ে যায় তাদের আশ্রয় দেব। কিন্তু এই দুনিয়া আমায় সৎ থাকতে দিল না। আমিও ছোটোবেলায় পাচার হয়ে নরকে এসেছিলাম। আর এখন আমার কাছে আরও অনেক মেয়ে পাচার হয়ে আসে। কিন্তু আমার কাছ থেকে কেউ কোথাও পাচার হয় না। খবরিদের থেকে খবর নিতে পারেন।

পাচার করেন না। কিন্তু পাচার হওয়া মেয়েদের কিনে শরীরের ব্যবসায় নামিয়ে দেন।

যারা গানবাজনা করে খেতে চায় তাদের গান শেখাই। বাইজি বানাই। আর যাদের গলায় সুর নেই তাদের বেশ্যা বানাই। প্রস্টিটিউশনটাও আজকে একটা পেশা বাবুসাহেব। আপনাদের মতোই ভদ্দর লোকেরাই আসে। মেয়েগুলো নিজের গতর বেচে খায়। বেশ করে। তবে হ্যাঁ, আমারও কমিশন থাকে। নইলে আমি খেতে পাব না যে।

কিন্তু মারুফ নিজের মুখে স্বীকার করেছে আপনি মারুফ আর তার বন্ধু সঈদুলকে বলেছিলেন শিবাঙ্গীর শ্লীলতাহানি করার জন্য। যাতে কথাকলির কেস থেকে ও সরে যায়।

.

খেপে যায় ভানুপ্রিয়া। পাগল আছেন নাকি? ভানুপ্রিয়া লোক পাঠিয়ে একটা মেয়ের ইজ্জত নেবে? ভানুপ্রিয়া বাইজি, ভানুপ্রিয়া বেশ্যা। হারামি নয়। স্বয়ম্ভু ভানুর মুখের সামনে মুখ এনে বলল, তাহলে মারুফ জানল কী করে আপনি এখন কলকাতায়? আপনি পালাচ্ছিলেনই বা কেন? তাও আবার লুকিয়ে!

.

ভানুপ্রিয়া চোখ নামিয়ে নেয়। বলে, মারুফ কীভাবে জানল আমি জানি না। তবে আমি কেন পালাচ্ছিলাম সেটা বলতে পারব না।

বলতে আপনাকে হবেই।

ভানুপ্রিয়া ঘাড় বেঁকিয়ে স্বয়ম্ভুর দিকে তাকাল। যেন নাগিনী তার ফণা তুলে ফোঁস করে উঠল, বললাম না, ভানুপ্রিয়া বেশ্যা হতে পারে কিন্তু বেইমান নয়। ভানুর চোখদুটো টলটল করে উঠল। স্বয়ম্ভু শিবাঙ্গীর দিকে হাত বাড়াল। শিবাঙ্গী একটা ছবি স্বয়ম্ভুর হাতের ওপর রাখল। ছবিটা কথাকলির। ভানুপ্রিয়ার সামনে ধরে বলল, এ কে চেনেন? ভানুর নিশ্বাসটা আটকে গেল যেন। ছবিটা দুহাতে তালুতে নিল। ঠিক যেমন সদ্যজাত সন্তানকে তার মা দুহাতের অঞ্জলির মধ্যে নেয়। ছবিটার দিকে তাকিয়ে বসেই রইল ভানুপ্রিয়া। স্বয়ম্ভু বলল, আপনার আর কথাকলির মধ্যে অদ্ভুত একটা মিল আছে। আপনারও ঠোঁটের নিচে ছোট্ট তিল। আর কথাকলিরও…!

.

টলটলে চোখ দুটো ছলাৎ করে গলিয়ে পড়ল ভানুপ্রিয়ার দুগাল বেয়ে। স্বর নরম করে স্বয়ম্ভু জানতে চাইল, কলকাতা, বাংলাদেশ, সুন্দরবন থেকে অনেক মেয়ে হারিয়ে গেছে। তাদের অনেকেরই ঠিকানা আপনার পতিতাপল্লি। আর অনেকে বাইরে পাচার হয়ে গেছে। দেখুন তো ভালো করে, আপনার বেশ্যাপট্টির কোনো মেয়ের মতো একে দেখতে কিনা।

এই শালা স্বয়ম্ভুউউউউউ…

স্বয়ম্ভুর মুখটা যেহেতু ভানুপ্রিয়ার সামনেই ছিল তাই গলাটাকে খামচে ধরতে বেশ সুবিধে হল ভানুপ্রিয়ার। শিবাঙ্গী এগিয়ে এল। এগিয়ে এল আরও কয়েকজন। স্বয়ম্ভু হাত তুলে থামাল তাদের। ভানুর চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করল স্বয়ম্ভু, কথাকলি কোথায়?

ভানুপ্রিয়ার চোখে জল আর আগুনের সহবাস। ভানুপ্রিয়া বাইজি। সুর ওদের জীবন। সুরের সূত্র ধরেই শরীর বিকোয় ওরা। আবার সেই সুরে সুরেই নিজেদের ধুয়ে নেয়। শুদ্ধ করে নেয়। স্বয়ম্ভুর জামার কলার ধরেই ভানুপ্রিয়া গেয়ে উঠল গীতগোবিন্দের দুইটি চরণ।

স্মরগরল খণ্ডনং মম শিরসি মণ্ডনং
দেহি পদপল্লবমুদারম।

স্বয়ম্ভুকে ঠেলে দিল ভানু। বলল, যা! খুঁজে নিয়ে আয় মেয়েটাকে। দেখি কস্তু বড়ো গোয়েন্দা তুই। ভানুর ঠোঁটদুটো থরথর করে কাঁপতে লাগল। আপেলের মতো দুই গাল অনবরত ভিজে চলেছে।

.

পরের দিন সকালে লালবাজারে পা রাখল স্বয়ম্ভু সেন। নিজের ঘর পর্যন্ত পৌঁছোতে হলে একটা বড়ো ঘরের মধ্যে দিয়ে যেতে হয় যেখানে নানান বিভাগীয় কাজকর্ম চলে। অনেক মানুষ। ঠিক সেখানেই অক্টোপাসের মতো চেপে ধরল হিরণ্য দাশগুপ্ত। কী ব্যাপার স্বয়স্তু? কাল যে তোমায় রেস্ট নিতে বললাম!

হ্যাঁ স্যার বললেন। কিন্তু কেন জানতে পারি?

কারণ এই মুহূর্তে তোমার কাছ থেকে যেটুকু যা পাওয়ার আমার পাওয়া হয়ে গেছে। তাই আর তোমায় দরকার নেই।

বেশ তো স্যার। আপনি আপনার মতো করে তদন্ত করুন। আমি ডিস্টার্ব তো করছি না।

আলবাত করছ। কার হুকুমে তুমি থানা থেকে সব মিসিং ডায়েরি জোগাড় করছ?

কথাটা বেশ ধমকেই বলল হিরণ্য। আশেপাশের লোকজনের দৃষ্টি স্বয়ম্ভু সেনের ওপর। স্বয়ম্ভুর দৃষ্টি কৌশিক আর শিবাঙ্গীর ওপর। তারা চোখের চাউনিতে বুঝিয়ে দিল এ ব্যাপারে তারা কিচ্ছু জানায়নি হিরণ্যকে।

এদিক-ওদিক কী দেখছ? কার হুকুমে এসব করছ বলো?

স্যার, আমি ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টে কাজ করি। যেখানে নিজের বুদ্ধিতে কাজ করাটা কর্তব্য এবং সেটাই মানদণ্ড। আমি যদি বসে থাকি কবে আমার বস আমায় কিছু হুকুম করবে তবে আমি কাজ করব আর অন্য সময়ে গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরব তাহলে কী এত বড়ো একটা ডিপার্টমেন্টের মান থাকবে?

শাট আপ। এমনিতেই তোমার জন্য আমরা কেউ জনসমাজে মুখ দেখাতে পারছি না। নেহাত শুভঙ্কর স্যার তোমায় যথেষ্ট স্নেহ করেন তাই, নইলে তোমায় এই মুহূর্তে স্যাক করা হত।

স্যার, আপনি আমার চেয়ে হায়ার ডেজিগনেশনে আছেন ঠিকই। তাই বলে অফিসের মধ্যে সবার সামনে আমায় স্যাক করা বা প্রোমোশন নিয়ে কথা বলবেন, সেটা কি ঠিক? এটাও কিন্তু আপনার বিরুদ্ধে যেতে পারে।

.

হিরণ্য রাগে ফেটে পড়ে। কিন্তু কিচ্ছু বলতে পারে না। শুধু বলে, আমি এখুনি তোমার ঔদ্ধত্য সম্পর্কে হায়ার অথোরিটিকে জানাচ্ছি। সঙ্গে এও বলছি তোমায় যেন আমার কেস থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। নইলে আমি এই কেস নেব না। হিরণ্য মুখ ঘুরিয়ে চলে গেল। থমথমে ঘর। সবার চোখ যেন স্বয়ম্ভুর মুখে এসে আটকে গেছে। সকলের মুখের দিকে একবার তাকিয়ে স্বয়ম্ভু আচমকাই ক্রউউউউম ব্যোম শংকর বলে গা ঝাঁকিয়ে নেয়। এক তুড়িতে সব্বার চটক ভাঙে। স্বয়ম্ভুও পরক্ষণে শিবাঙ্গী আর কৌশিককে ফলো মি বলে গটগট করে হাঁটা শুরু করে। শিবাঙ্গী আর কৌশিক কী করবে ভেবে না পেয়ে তরতর করে লাফিয়ে স্বয়ম্ভুর পিছু নেয়।

.

নিজের ঘরে বসেই শিবাঙ্গীকে প্রশ্ন করে, কাজের আপডেট কী? শিবাঙ্গী আর কৌশিক অমনি দুটো প্রিন্ট আউট স্বয়ম্ভুকে দেয়। কৌশিক বলে, স্যার গত দশ দিনে প্রায় তেইশ জন মিসিং। যাদের মধ্যে সাত জন মেয়ে।

এদের সঙ্গে কন্ট্যাক্ট করেছ?

শিবাঙ্গী বলল, আমি দুজনকে সকালেই কল করে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। আর কৌশিক তিনজনকে। বাকি দুজনের ফোন সুইচড অফ।

চলো আমার সঙ্গে।

কোথায় স্যার?

এই পাঁচজনের সঙ্গে আজকেই কথা বলব। কৌশিক, যে দুজনকে ফোনে পাওয়া যায়নি তাদের বাড়ির ঠিকানায় তুমি নিজে যাও।

স্যার আমরা আপনার সঙ্গে যাব?

.

কৌশিকের কথার সুরে ইতস্তত ভাব। স্বয়ম্ভু বোঝে। বলে, হায়ার অথোরিটি এখনও কিচ্ছু বলেনি। বলার আগেই আমাদের কাজ গোটাতে হবে।

ও…ওকে স্যার।

.

সেদিন সারাদিন শিবাঙ্গীকে নিয়ে শহরের এ মাথা থেকে ও মাথা টহল দিল স্বয়ম্ভু। কৌশিক একজনের ঠিকানা খুঁজে কথাও বলে। কিন্তু আরেকজনের বাড়িতে তালা ঝুলছে। কোথায় গেছে কেউ জানে না। পাঁচজন মেয়ের মধ্যে চারজনই পালিয়েছে। বাড়ি থেকে প্রেমিককে মেনে না নেওয়ায় দুজন মেয়ে পালিয়েছে সেটাও আবার চিঠি লিখে। বাকি দুজনের মধ্যে একজন হিরোইন হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে বাড়ি ছেড়েছে। অন্তত বাড়ির লোকের বয়ান তাই বলছে। আর অন্যজন কাজ করতে গিয়েছিল ব্যান্ডেলে। আর ফেরেনি। পুলিশ তদন্ত করছে। অপহরণের কোনো কেস নেই। বা তার প্রমাণও নেই। না আছে কোনো মুক্তিপণ চেয়ে ফোন।

.

আমরা পাগলের মতো ছুটছি না তো স্যার?

গাড়ি করে লালবাজারে ফিরতে ফিরতে কথাটা জিজ্ঞেস করে শিবাঙ্গী। স্বয়ম্ভু বলে, হয়তো তাই।

কেন? এদের খোঁজ করে আমাদের কী হবে?

একটা ক্লু। একটা গোপন ডেরা খুঁজে পেতে হবে আমাদের। কোথা থেকে কীভাবে পাচার হচ্ছে? একটাকেও যদি হাতেনাতে ধরতে পারি তাহলে পাচারের পথটা হয়তো পাব। মাথা না হোক, অন্তত গলাটাকেও যদি ধরতে পারি!

সোমেন সরকার ছাড়াও তো আরও মেয়েপাচারকারী আছে।

আছে। তবে এরা একে অপরকে চেনে। শুনেছি এখানে নাকি কেউ একজন ইনভিজিবল থেকে কাজ করে। যাকে লোকে বস বলে ডাকে। কিন্তু এই বসটি কে? কেউ জানে না। সেলিমের মতো লোকও এর হদিশ দিতে পারেনি।

কিন্তু স্যার, একদিনে তো এ কাজ হওয়ার নয়। আমাদের আরও খোঁজ করতে হবে। সেটা কি আমরা পারব? করতে কি দেওয়া হবে?

.

এতক্ষণ জানলার বাইরে চোখ মেলেই শিবাঙ্গীর কথাগুলোর উত্তর দিয়ে যাচ্ছিল স্বয়ম্ভু। এবার শিবাঙ্গীর দিকে তাকায়। একটু আগেই শুভঙ্কর কাঞ্জিলালের ফোন এসেছিল। কড়া গলায় হুকুম করেছে, আজ অফিসে ঢুকেই যেন তার সঙ্গে দেখা করে স্বয়ম্ভু। শিবাঙ্গীর দিকে তাকিয়ে স্বয়ম্ভু বলে, লড়ে আমি যাবই শিবাঙ্গী! তীরে এসে তরি ডুবতে আমি দেব না।

.

স্বয়ম্ভুর গাড়ি এসে থামল লালবাজারের সামনে। দ্রুত পায়ে নেমে এল স্বয়ম্ভু। খেয়াল করল কনস্টেবল তড়িঘড়ি রাস্তা থেকে একজন বৃদ্ধকে সরিয়ে দিতে চাইছে। কিন্তু সেই বৃদ্ধও নাছোড়। একেবারে দুহাত ছড়িয়ে পথ আটকে দাঁড়াল। কনস্টেবল টানতে থাকল। স্বয়ম্ভু হাত তুলে কনস্টেবলকে থামাল। কাছে এসে জিজ্ঞাসা করল, কী ব্যাপার? কনস্টেবল বিরক্তি নিয়ে বলল, আর বলবেন না স্যার। দাদুর নাতনি বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে বলে গোয়েন্দাদের কাছে নালিশ জানাতে এসেছে। এতক্ষণ বৃদ্ধ বেশ রেগেমেগেই কনস্টেবলের ওপর হম্বিতম্বি চালাচ্ছিল। কিন্তু এখন দুপাশে ছড়ানো দুহাত বুকের কাছে জড়ো করে কেঁদে ফেলল। বলল, এই অনামুখোটার কথা শুনবেন না প্লিজ। আমার কথাটা শুনুন। আপনিই তো স্বয়ম্ভু সেন?

হ্যাঁ।

আপনি তো ওই মন্ত্রীর মেয়েকে খুঁজছেন।

খুঁজছিলাম। এখন অন্য একজন খুঁজছেন।

বৃদ্ধ যেন একটু বিমর্ষ হয়ে পড়ল। স্বয়ম্ভু আর শিবাঙ্গী পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিল। হঠাৎ বৃদ্ধ বলে উঠল, তাহলে তো আপনি এখন ফাঁকা আছেন স্যার। আমার নাতনিটাকে একটু খুঁজে দিন না স্যার। আজ সাতদিন হয়ে গেল লোকাল থানা কিচ্ছু করছে না। উলটোপালটা কথা বলছে আমার নাতনির নামে।

.

বৃদ্ধ মানুষটা কাঁদতে কাঁদতে কাঁপছে দেখে সামনের বেঞ্চটাতে বসাল স্বয়ম্ভু। চোখ মুছুন। কাঁদবেন না। আপনি থাকেন কোথায়? সাদা রুমালটা দুগালে ঘষে বৃদ্ধ বলল, লাঙলবেড়িয়া।

সেটা কোথায়?

ওই দক্ষিণ গোবিন্দপুর আছে না, বারুইপুরের আগে। ওখানে। আমার নাতনি নাকি ছেলে চড়িয়ে খায়। তাই কোনো ছেলের সঙ্গে ভেগেছে। থানার ইন্সপেক্টর এই কথা বলছে জানেন। কিন্তু দুদিন আগে আমার কাছে একটা ফোন আসে। অচেনা নম্বর। ফোন তুলতেই শুনি আমার নাতনির গলা। খুব আস্তে আস্তে গলা চেপে মালা আমায় বলল, দাদু আমায় বাঁচাও। এরা আমায় পাচার করে দেবে। গলা শুনে বুঝলাম মালা কাঁদছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কোথায় আছিস মালা? বলল জানি না। এই নম্বরে ফোন কোরো না। তাহলে ওরা মেরে ফেলবে আমায়। তারপরেই ফোনটা কেটে গেল। থানায় বললাম। কোনো পাত্তাই দিল না। তখনই দেখলাম আপনাদের এখান থেকে একজন ওখানকার থানায় গিয়ে ওসির কাছে মিসিং ডায়েরির খোঁজ করছিল। থানার ওসি বেমালুম বলে দিল ওদের ওখানে এ-রকম কোনো কেস নেই। ডাহা মিথ্যে স্যার। লোকটা এক্কেবারে কোরাপ্টেড আমি কিচ্ছু বলিনি। কারণ ওখানে কিছু বলে কোনো লাভ নেই। ভাবলাম সোজা লালবাজারে গিয়েই বলব। তাই এখানে এলাম। কিন্তু এখানেও এই মুখপোড়া লোকটা দূর দূর করে তাড়িয়ে দিচ্ছে। আমরা তাহলে যাব কোথায় স্যার?

স্বয়ম্ভু কড়া চোখ তুলে গেটে দাঁড়িয়ে থাকা কনস্টেবলটার দিকে তাকাল। সে মুখ নিচু করে নিল। স্বয়ম্ভু বৃদ্ধকে বলল, মালা কবে থেকে নিখোঁজ?

গত মঙ্গলবার।

অলরেডি এগারোদিন? আর ফোনটা দুদিন আগে মানে কবে এসেছে?

এই সোমবার।

কোন নম্বর থেকে এসেছিল ফোনটা?

আমি লিখে এনেছি।

কাঁধের ব্যাগ থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের করে দিল বৃদ্ধ মানুষটা। স্বয়ম্ভু জিজ্ঞেস করল, আপনার নাম?

মৃণালকান্তি রায়।

আপনি আমার সঙ্গে আসুন।

.

মৃণালবাবুকে নিজের ঘরে বসিয়ে কৌশিককে বলে আসে চা-জলের ব্যবস্থা করতে। কৌশিক আগেই চলে এসেছে। তারপর দৌড়ে রঞ্জিতের কাছে আসে স্বয়ম্ভু। রঞ্জিত নম্বরটা শিগগির ট্র্যাক কর তো। কাগজটা স্বয়ম্ভুর হাত থেকে নেওয়ার সময় রঞ্জিত জানতে চায়, লিড পেলে কিছু?

না না এটা অন্য কেস। ট্র্যাক কর না।

.

খানিক্ষণের মধ্যেই এই নম্বরের লোকেশন ধরা পড়ল। ফোনটা খোলাই আছে। রঞ্জিত বলল, স্বয়ম্ভুদা, ঘাটবাওড়ের কাছে আছে। বনগাঁ ক্রস করে। লাস্ট চারদিন ধরে এই লোকেশনেই আছে।

এর আগে কোথায় ছিল দ্যাখ তো।

খানিক সময় নিয়ে রঞ্জিত বলল, এর আগে শিয়ালদায় ছিল তিনদিন। তার আগে মাঝেরহাট!

মাঝেরহাট! মারুফের বাড়ি!

নিজের মনে আওড়াল স্বয়ম্ভু। বেশ ঠিক আছে। এক কাজ কর তো। মাঝেরহাটের কোন লোকেশন সেটা আমায় জানা। আর তোকে একটু ল্যাপটপ সমেত আজ আমাদের সঙ্গে যেতে হবে রঞ্জিত।

ঘাটবাওড়?

হ্যাঁ।

ওকে।

স্বয়ম্ভু যেতে গিয়েও ফিরে এল, এই রঞ্জিত এই যে নম্বরটা দিলাম কার নামে আছে বের কর। আর এই নম্বরে লাস্ট দশ দিনের কল লিস্ট বের কর। এক্ষণি। আমি ততক্ষণ শুভঙ্কর কাঞ্জিলালকে সামলে আসি।

একটা কথা বলব স্বয়ম্ভুদা?

বল।

ওই হিরণ্য মোটেও ভালো লোক না। সকাল থেকে সিপির মাথা খাচ্ছে।

স্বাভাবিক। ডিসিপির প্যায়ারের লোক না। তুই এগুলো চটপট বের কর।

স্বয়ম্ভু প্রায় দৌড়ল জয়েন্ট সিপির ঘরের দিকে। শুভঙ্করের ঘরেই বসেছিল হিরণ্য। স্বয়ম্ভুকে দেখেই শুভঙ্কর বলে উঠল, স্বয়ম্ভু, তুমি হিরণ্যর আন্ডারে কাজ করছ। তাই ওঁর কথা শুনে চলাটা তোমার কর্তব্যের মধ্যে পড়ে।

শিয়োর স্যার।

কিন্তু তুমি তো সেসব মানছ না স্বয়ম্ভু।

কেন স্যার? উনি আমায় কী করতে বলেছেন যেটা আমি শুনিনি?

ভাজা মাছটা উলটে খেতে পারে না, এমন করেই কথাটা বলল স্বয়ম্ভু। এতে হিরণ্য বেশ অস্বস্তিতে পড়ল। শাক দিয়ে মাছ ঢাকার জন্য তড়িঘড়ি হিরণ্য বলে উঠল, আমি কি তোমায় বলেছি যে তুমি থানায় থানায় ঘুরে মিসিং ডায়েরি জোগাড় করো?

না স্যার বলেননি। কিন্তু শুভঙ্কর স্যার তো বলছেন আপনি নাকি আমায় কাজ বলেছেন আর আমি সেটা করিনি। আপনি তো আমায় রেস্ট নিতে বলেছেন স্যার। সেটা তো কোনো কাজ নয়। আমি কখন রেস্ট নেব আর নেব না সেটা তো একান্ত আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। সেটা তো কাজের মধ্যে পড়ে না।

.

এবার শুভঙ্কর হিরণ্যর দিকে অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে বলল, রেস্ট নিতে? মানে?

না মানে বলেছিলাম এক্ষুনি আর এই কেসে তোমার কিছু সাহায্য লাগবে না। তাই কিছু করার দরকার নেই।

কথাটা শেষ হতেই ধরতাই ধরে নেয় স্বয়ম্ভু। বলে, দেখুন স্যার, হিরণ্য স্যার আমায় কাজ করতে বারণ করেছেন তা সত্ত্বেও আমি স্যার যাতে কাজটা তাড়াতাড়ি করতে পারেন তার জন্য নিজের মতো করে কিছু ব্লু জোগাড় করছি। এটা কি আমার অপরাধ?

হিরণ্য, স্বয়ম্ভু তো ভুল কিছু করেনি। কাজে লাগুক না লাগুক অ্যাটলিস্ট কিছু তথ্য তো থাক আমাদের হাতে। কে বলতে পারে? এই মিসিং ডায়েরির মধ্যেই হয়তো কোনো মিসিং লিঙ্ক রয়ে গেছে।

হিরণ্য চুপ। শুভঙ্কর বলে, স্বয়ম্ভু, গো অ্যাহেড। তবে দুঃসাহসিক কিছু করতে যেয়ো না যাতে আমাদের ফেস লস হয়।

না স্যার। থ্যাংক ইউ।

.

স্বয়ম্ভু স্যালুট ঠুকে বুকফাটা হাসিটা মুখের মধ্যে চেপে বাইরে এসে ফস করে হেসে ফেলে। নিজেই হাসতে থাকে পাগলের মতো। হাসতে হাসতে রঞ্জিতের ঘরে ঢোকে। কী রে হল?

লোকটার নাম পেয়েছি। লাইনটা বাদল দত্তের নামে আছে। আর কল লিস্ট আসতে একটু সময় লাগবে।

এই রে। সময় নেই রঞ্জিত। তাড়া দে।

দিয়েছি। ওরা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পাঠাচ্ছে বলল।

তুই কিন্তু লোকেশনটা দেখতে থাক। এদিক-ওদিক নড়লেই বলবি। কম্পিউটারের দিকে একবার দেখে রঞ্জিত বলে, না, এখনও ওখানেই আছে।

ঠিক আছে। আমি ঘরে আছি।

.

মৃণালবাবুর কাছ থেকে তাঁর নাতনি মালার ছবিটা সংগ্রহ করে রাখল শিবাঙ্গী। রীতিমতো সশব্দে ঘরে ঢুকে এল হিরণ্য। কৌশিক চেয়ারে গা এলিয়ে ফেসবুক দেখছিল। তড়াক করে উঠে দাঁড়াল। শিবাঙ্গী উঠে দাঁড়াবার আগেই হিরণ্য হুকুম ছুড়ে দিল, এই শিবাঙ্গী, কৌশিক তোমাদের ইমিডিয়েট একটা কাজ করতে হবে। আমার ঘরে এসো একটু।

ওকে স্যার।

কৌশিক যাওয়ার জন্য তৈরি হলেও শিবাঙ্গী বলে উঠল, স্যার, আমায় এখুনি বাড়ি যেতে হবে।

কেন?

আমার বাবার শরীরটা খারাপ করেছে। বাড়িতে মা একা। খুব ঘাবড়ে গেছে।

ওয়ার্থ লেস।

শিবাঙ্গীকে লক্ষ্য করে কথাটা ছুড়ে দিয়েই দরজার দিকে ঘুরল হিরণ্য। স্বয়ম্ভু বোকা ভোলার মতো দাঁড়িয়ে। তোমার খোকা কিচ্ছু বোঝে না মা টাইপের চোখ-মুখ। হিরণ্যর চোখ থেকে গোটাকতক ইট-পাটকেল ছিটকে গিয়ে স্বয়ম্ভুর চোখে মুখে লাগল। গটগট করে বেরিয়ে গেল হিরণ্য। স্বয়ম্ভুর দিকে অসহায়ের মতো একটা লুক দিয়ে হিরণ্যর পিছু নিল কৌশিক। স্বয়ম্ভু মৃণালবাবুকে বাড়ি চলে যেতে বলল।

মেয়েটাকে পাব তো বাবা?

বৃদ্ধকে বড়ো অসহায় লাগল।

যদি কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে তাহলে নিশ্চয়ই পাবেন। আপনি বাড়ি যান। আশা করছি দুদিনের মধ্যে কোনো খবর দিতে পারব আপনাকে শিবাঙ্গী, মালার ছবিটা নিয়ে নিয়েছ তো?

ইয়েস স্যার।

বৃদ্ধ চলে গেল। স্বয়ম্ভু জিজ্ঞেস করল, বাবার কী হয়েছে?

কিচ্ছু হয়নি।

বসের বসকে ঢপ দিলে?

নইলে আমায় সরিয়ে দিত আপনার কাছ থেকে। দেখলেন না, কৌশিককে কেমন কাটিয়ে নিয়ে গেল।

.

কথাটা একটু অন্যরকম সুরে কানে বাজল স্বয়ম্ভুর। নরম দৃষ্টিতে তাকাল। বলল, সরতে চাও না আমার কাছ থেকে? কথাটা বলার মধ্যেই কিছু একটা ছিল স্বয়ম্ভুর। মুহূর্তের জন্য শিবাঙ্গীও থমকে গেল। আপনার কী মনে হয়?

কী জানি? সবসময় সব মনে হওয়া তো মেলে না।

আপনাকে না জানিয়ে একটা কাজ করেছি।

কী?

হোয়াটসঅ্যাপটা চেক করুন।

.

স্বয়ম্ভু মোবাইলটা পকেট থেকে বার করে দেখল শিবাঙ্গী একটা মানুষের স্কেচ পাঠিয়েছে। ছবিটা দেখেই স্বয়ম্ভু চমকে উঠল। এ কী! এ তো ঈশ্বরের ছবি!

আমরা একে ঈশ্বর নামে চিনলেও মাসি একে পুরুষোত্তম নামে জানে। পুরুষোত্তম মাল।

হোয়াট? তুমি ঠিক বলছ?

হ্যাঁ। মাসি যেমন যেমন বলেছে তেমনই এঁকেছে। ভাবলাম যখন আমার বাড়িতে আছেই তখন এই সুযোগ। আপনি চারপাশে হাজারটা সমস্যায় এমন ফেঁসে আছেন। এটা হয়তো কোনোভাবে মাথা থেকে বেরিয়ে গেছে। তাই আমার এক বোনের বন্ধুকে ডেকে আঁকালাম। ও আর্ট কলেজের ছাত্র, রোশন।

.

স্বয়ম্ভুর মগজে আলোর খেলা। যেন অজস্র ক্যামেরার ফ্ল্যাশ মস্তিষ্কের কোষগুলোতে ঝলসে উঠল একসঙ্গে। না শিবাঙ্গী, এ ঈশ্বর নয়।

মানে?

এ হল ঈশ্বরের দাদা পরমেশ্বর ওরফে মহেশ্বর। যে অনেক কাল আগে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গেছে। তার মানে সোমেন সরকারই কোনোভাবে এই ছেলেকে নিজের কাজে লাগাবে বলে বাড়ি ছাড়া করেছে। ওয়েল ডান শিবাঙ্গী। ওয়েল ডান।

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *