১০
একটু আগের হাসিখুশি পরিবেশটা হঠাৎই কুয়াশায় ভরে গেল। যে কুয়াশা আপনজনের মতো ঘিরে ধরে। ছেড়ে যায় না। রাজারামই পরিবেশটাকে হালকা করে বলে ওঠে, প্রেম করার আগে একটু বাজিয়ে নিন ঘরের কাজ আমি কতটা ভালো করি। দাঁড়ান, কফি আনছি। বলেই রাজারাম ঘরের বাইরে চলে গেল। ছেলেটা কি সত্যিই মজা করছে? নাকি মনের কোণে কোথাও কিছু উঁকি দিয়েছে? শিবাঙ্গী নিজেই হেসে ফেলল।
পকেটের ফোনটা কেঁপে উঠল। স্বয়ম্ভু। হ্যাঁ স্যার।
কোথায় বাড়িতে তো?
সর্বনাশ করেছে। স্বয়ম্ভু কি জানতে পেরেছে কোনোভাবে? একটু সামলে নিয়ে সযত্নে প্রশ্নটার পাশ কাটিয়ে আলতো হেসে উত্তর দিল শিবাঙ্গী, রাস্তায় নেই স্যার বলুন।
আমার কেন জানি না মনে হচ্ছে কিছু একটা ঘটবে। চারপাশে জাল বিস্তার করে রেখেছে কেউ।
স্বয়ম্ভুর গলায় একটা ভয়ের আস্তরণ। রাজারামের গোটা ঘরটা ঘুরে দেখতে দেখতে শিবাঙ্গী জিজ্ঞেস করে, মাসি ঠিক আছে তো স্যার?
কেন? হঠাৎ মাসির কথা জিজ্ঞেস করলে কেন?
জামাকাপড় ছাড়তে ছাড়তে ব্লু টুথে শিবাঙ্গীর সঙ্গে কথা বলছিল স্বয়ম্ভু। শার্ট খুলে হ্যাঙ্গারে ঝোলাতে গিয়ে হাতটা থেমে গেল। শিবাঙ্গী বলল, মাসির ব্যাপার ছাড়া আর কোনো ব্যাপারে আপনি এত ভয় পান না স্যার। এইজন্যেই শিবাঙ্গীর সঙ্গে কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা না করলে মনের ছটফটানিটা কমে না স্বয়ম্ভুর।
পুরুষোত্তম মালের কথা বলেছিলাম তোমায়?
.
রাজারাম চামচ মেপে গরম দুধে কফি দিচ্ছে। রান্নাঘর থেকে উঁকি মেরে একবার ঘরের দিকে দেখে নিল। শিবাঙ্গীকে দেখতে পেল না ঠিকই। তবে বুঝল মেয়েটি সারা ঘর ঘুরে বেড়াচ্ছে। কী দেখছে? কিছু খোঁজার চেষ্টা করছে নাকি? এখনই সব ফাঁস হয়ে গেলে বসের কাছে বলবে কী? এই লাইনে গোপনীয়তা মেনটেইন করাটাই তো আসল খেলা। পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে লক খোলে রাজারাম।
.
ওটা যদি পুরুষোত্তমেরই হয় তাহলে এম কেন লিখবে? টাইটেল তো কেউ লকেট করে পরে বলে শুনিনি।
শিবাঙ্গী বলতে বলতে রাজারামের তাকের বইগুলো এক এক করে সরিয়ে সরিয়ে দেখতে থাকে। স্বয়ম্ভু বলে, দ্বিতীয় কোনো ব্যক্তিও আসেনি বাড়িতে। তার ওপর…
স্যার স্যার স্যার এক মিনিট।
দুম করে স্বয়ম্ভুকে থামিয়ে দিল শিবাঙ্গী। বলল, আমাদের ফোনে কথা বলাটা সেফ তো?
হ্যাঁ সেফ। আপাতত তোমার, আমার কারও ফোন ট্যাপ করা নেই।
থ্যাংক গড।
শিবাঙ্গী হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। সঙ্গে সঙ্গে স্বয়ম্ভু বলল, মোটেও থ্যাংক গড নয়। এটা আরও বেশি চিন্তার।
মানে?
রাজারামের স্টাডি টেবিল। সেখানেও থরে থরে বই। ছেলেটা যে বইপাগল সেটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু শিবাঙ্গী খানিক থমকে দাঁড়িয়েছে স্বয়ম্ভুর কথা শুনে
আমাদের কোডগুলো কীভাবে মারুফ বা ভানুপ্রিয়া জানল? কীভাবে আমাদের মাজার অভিযানের খবর পৌঁছোল দুষ্কৃতিদের কাছে?
.
স্যার কি কৌশিকের কথা বলতে চাইছেন? মনে মনে ভাবল শিবাঙ্গী। স্বয়ম্ভু আরও বলল, আরও ইম্পর্টেন্ট যে প্রশ্নটা সেটা হল পুরুষোত্তম এর আগে নির্ঘাত আমাদের সিঁড়ির নিচে গিয়েছিল। তখনই ওর লকেটটা খুলে পড়ে যায়। আজ ও সেটা খুঁজতেই এসেছিল। একজন অতিথি খামোখা কেন আমার সিঁড়ির নিচের ঘরে যাবে? যেখানে এ বাড়ির মিটার আছে! আবার আজকেই বাড়ির ফিউজের প্রবলেম। সামান্য ফিউজটাকে চেপে দিলেই প্রবলেম সলভ হয়ে যায়। কিন্তু পুরুষোত্তম পারল না। হাতে ব্যথা তো কী হয়েছে? একটা ফিউজই তো লাগাবে। সবই কীরকম কাকতালীয়ভাবে মিলে যাচ্ছে।
.
স্বয়ম্ভুর কথা শুনতে শুনতে শিবাঙ্গী অবচেতন মনেই টেবিলে জমিয়ে রাখা বইগুলোর পাতা উলটে দেখছে। তবে কান আর মন তার স্যারের কথাতেই জমে আছে।
.
সারা শহর জেনে গেছে মারুফ হোসেন ধরা পড়ে সব বলে দিয়েছে। তার মানে যারা যারা ভাবছে তাদের নাম আমরা জেনে গেছি তারা আমাদের নতুন কোনো বিপদে ফেলার চেষ্টা করবে খুব তাড়াতাড়ি। হয়তো আজ রাতের মধ্যেই।
আজ রাত!
হ্যাঁ। আজ রাতটা একটু সতর্ক থেকো। আমরা যাতে আর এগোতে না পারি তার একটা চেষ্টা আজকেই হবে।
আপনি কি কোনো ব্লু পেয়েছেন?
হুম।
কোথায়? কী পেয়েছেন কিছু বলা যাবে?
আমার বাড়িতে।
.
কফি রেডি।
স্বয়ম্ভুর কথায় শিবাঙ্গী চমকাবার আগেই কথাটা পিছন থেকে উড়ে এল। দরজায় কফির ট্রে হাতে রাজারাম। স্বয়ম্ভু ওপার থেকে কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। শিবাঙ্গী আরও একটা বইয়ের পাতা ওলটাতে গিয়েও পারল না। তার আগেই মহাফাঁপরে ফেলে দিল রাজারাম। রাজারামের দিকে একটু বোকার মতো হেসে শিবাঙ্গী ব্যাপারটাকে সামলাতে গিয়ে বলল, হ্যাঁ স্যার কী পেয়েছেন? ওপারের গলাটা মধ্যসপ্তক থেকে মন্দ্রসপ্তকে (খাদে নেমে বলে উঠল, আপাতত কফি খেয়ে সাবধানে বাড়ি ফেরো। আর মাথায় রেখো, আমাদের চারপাশেই তারা ঘুরছে যাদের আমরা চিনি অথবা চিনি না। রাখছি। ফোনটা কেটে গেল। রাজারাম একটু ইতস্তত করে বলে উঠল, অসুবিধেয় ফেললাম?
না না। অসুবিধে কীসের? অসুবিধে তো আপনার করলাম। এত রাতে আবার কফি বানালেন।
শিবাঙ্গীর কথা শুনতে শুনতেই পলকের জন্য টেবিলের বইগুলোর দিকে একঝলক দেখে নিল রাজারাম। ভদ্রতা করে বলল, ছাড়ুন তো। ব্যাচেলার মানুষের আবার অসুবিধে। একলা থাকি। কেউ এসে কথা বললে ভালো লাগে। নিন নিন কফিটা ঠান্ডা হয়ে যাবে।
.
আর কফি! স্বয়ম্ভুর শেষ লাইনটা মনের মধ্যে যে বিষবৃক্ষ রোপন করে দিল তাতে হঠাৎ করে রাজারামকেও সন্দেহ হতে শুরু করেছে। প্রথম দিন দেখার পর দুর্ঘটনার হাত থেকে বাঁচানো, মারুফের সঙ্গী খুন হওয়ার দিন ছুটে আসা সব কিছু এখন সন্দেহজনক লাগছে শিবাঙ্গীর। যদিও সেদিন রাতে রাজারামের বাড়ির পথেই ঘটনাটা ঘটেছিল তাই ওঁর আসাটা অস্বাভাবিক কিছু না। তবু, এখানে তো অনেকেই থাকে। কেউ এল না, শুধু ওই এল কেন?
.
শিবাঙ্গী… কী ভাবছেন?
শিবাঙ্গীর মুখের সামনে হাত নাড়ল রাজারাম। কফিতে বিষ নেই, খেয়ে নিন! ছ্যাঁৎ করে উঠল বুকটা। এ কথা কেন বলল রাজারাম? কফিটা এড়িয়ে যে বেরিয়ে যাবে সেটাও অসম্ভব। অগত্যা কফির কাপে চুমুক দিল শিবাঙ্গী। দু-একটা কথা আর কফির প্রশংসা করে বেরিয়ে গেল শিবাঙ্গী। দরজা বন্ধ করে ঘরে এসে টেবিল থেকে রাজারাম হাতে তুলে নিল শিবাঙ্গীর বাছা শেষ বইটি। ভাগ্যিস পাতা ওলটাবার আগেই কফি নিয়ে এসে পড়েছিল রাজারাম। নইলে আজই পর্দা ফাঁস হয়ে যেত। রাজারাম মোটা বইটার পাতা ওলটাতেই বেরিয়ে এল নাইন এম এম রিভলভার। রাজারাম একটুর জন্য বেঁচে যাওয়ার কথা চিন্তা করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। রিভলভারটা হাতে তুলে মুচকি হাসে সে। বাইরে খোলা জানলা দিয়ে আচমকা আকাশের অট্টহাসি। আলোটা ঝলসে উঠল রাজারামের মুখে।
.
কোত্থেকে যে বেয়াড়া মেঘের দল রাতের আকাশের দখল নিল বোঝা গেল না। হঠাৎ করেই গুরুগুরু ডাকে ঝাঁপিয়ে নামল। রাত সাড়ে এগারোটা বেজে গেছে। শিবাঙ্গীর চোখে ঘুম নেই। খেয়েদেয়ে নিজের ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে মুখে বৃষ্টির ঝাপটা মাখছে। স্বয়ম্ভু বলেছে আজ রাতে কিছু হবে। সামনের রাস্তাটায় একটা কুকুর ছোটাছুটি করছে। মাঝেমধ্যে শেডের নিচে দাঁড়িয়ে গা ঝাড়ছে। আবার ভিজতে নেমে পড়ছে। একটা গাড়ি এসে থামল। রাস্তার আলো আর বৃষ্টির ঝাটের মধ্যেও গাড়িটাকে চেনা লাগল শিবাঙ্গীর। সামনে পাঁচিল থাকায় পা-দুটো ডিঙি মেরে মুখ তুলে বোঝার চেষ্টা করল কার গাড়ি? স্বয়ম্ভু সেনকে চিনতে দেরি হয়নি শিবাঙ্গীর। স্যারের সঙ্গে ছাতার নিচে আরও একজন আছে। নিশ্চয়ই কিছু হয়েছে। দৌড়ে ঘর থেকে বেরোতেই দেখল অপর্ণা সিরিয়ালের রিপিট টেলিকাস্ট শেষ করে সব গুছিয়ে শুতে যাওয়ার তোড়জোড় করছে। মা, স্যার এসেছেন। অপর্ণা অবাক। স্যার মানে, স্বয়ম্ভু? এখন? শিবাঙ্গীর পিছু পিছু অপর্ণাও ছুটল দরজার দিকে। বেল বাজার আগেই দরজা খুলে ফেলল শিবাঙ্গী। স্বয়ম্ভু বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ব্যোমকে গেল। এত রাতে বারান্দায় কী করছিলে? ঠিক ধরে ফেলেছে। লোকটার চোখ না দূরবিন বোঝা দায়। আপনি আগে ভেতরে আসুন তো। শিবাঙ্গী বলল। সঙ্গে চমকেও উঠল। মাসি তুমি? এসো এসো। মাসি ডাকটা শুনে অপর্ণাও এগিয়ে এল। সই এল নাকি?
জল ঝাড়তে ঝাড়তে বাড়িতে ঢুকল সুচিত্রা। আর বলিস না, পাগলা ভোলা কি আর সাধে বলি? হঠাৎ করে বাই তুলল চলো চলো চলো। আজ তোমায় শিবাঙ্গীর বাড়িতে রেখে আসি। অপর্ণা খুশিই হল। বলল, ভালোই করেছে। স্বয়ম্ভুর দিকে তাকিয়ে বলল, সেই এলে, এইভাবে এলে? চলো ভেতরে।
না মাসি। আজ রাতটা শুধু মাকে তোমাদের এখানে রাখো। আমায় বেরোতে হবে।
সর্বনাশের আঁচ পেয়েছে শিবাঙ্গী। উত্তেজনায় বলেই বসল, স্যার আমিও যাই? অপর্ণা বলবে কী? তার আগে সুচিত্রাই তড়পে উঠল, একদম নয়। এই বৃষ্টিবাদলা মাথায় করে কোথাও যাবি না। ও পাগলা যায় যাক।
তোমায় এখানে লাগবে শিবাঙ্গী। সজাগ থেকো।
কিছু কি খারাপ হবে বাবা?
অপর্ণার গলায় ভয়ের স্বর। স্বয়ম্ভু নিজের স্বরকে সামলে নিয়ে মুখে হাসি আনল। বলল, আরে না না মাসি। ভয়ের কিচ্ছু না। তোমরা ঘরে যাও। সঞ্জয় অপেক্ষা করছে। আমি আসি। কথাটা বলেই শিবাঙ্গীর চোখে চোখ পড়ল স্বয়ম্ভুর। বাইরে বাজ পড়ছে। অঝোরে বৃষ্টি। তারই মধ্যে শিবাঙ্গীর চোখে স্বয়ম্ভুর জন্য এক ভয় জেগে উঠল। স্বয়ম্ভু বুঝল সেটা। শান্ত গলায় বলল, সত্যি ভয়ের কিছু নেই। তোমায় পাঠাতে পারলে কি আর আমায় যেতে হত? কৌশিকের ওপর সবটা ছাড়া রিস্কি হয়ে যাবে।
এয়ারপোর্ট যাচ্ছেন?
না। ভানুপ্রিয়া নামের কেউ আজ ট্র্যাভেল করছে না। ট্রেনেও যাবে বলে মনে হয় না। যদিও সেখানে লোক আছে। দেখা যাক। আসি।
.
বাজের আলোয় পথ চিনে বেরিয়ে গেল স্বয়ম্ভু। গাড়ি না ছাড়া পর্যন্ত বৃষ্টি উপেক্ষা করেই মুখ বাড়িয়ে রইল শিবাঙ্গী। ব্যাপারটা সুচিত্রার নজর এড়াল না। শিবাঙ্গীর কাছে এসে বলল, ছেলেটা খুব বিপদে আছে নারে? শিবাঙ্গী হাসতে চেষ্টা করল। না না মাসি। এমন তো আকছারই হয় আমাদের।
তাই? কিন্তু আমায় তো কখনও ঘর ছাড়তে হয়নি। কেমন যেন ঠেলে জোর করে আমায় বার করে আনল।
তুমি এত চিন্তা কোরো না তো। তোমার ছেলে সুপারম্যান।
.
শিবাঙ্গী আর অপর্ণা হাসলেও সুচিত্রার ঠোঁটে হাসি ফুটল না।
স্বয়ম্ভু গাড়িতে যেতে যেতেই ফরেন্সিক এক্সপার্ট তুহিনশুভ্রকে ফোন করল। বেডসাইড ল্যাম্প জ্বালিয়ে খানিকটা ঘুম চোখেই ফোন তুলল তুহিন। কে খুন হল?
খুন নয়। ট্রেস পাসিং।
এসব পেঢ়ি কেস আমি নিই না।
এক পেট ভাত খেয়ে নাক ডাকতে ডাকতে এসব ইয়ার্কি মারাই যায়। আমাদের মতো বৃষ্টি মাথায় ছুটতে হলে বুঝতেন।
বাবা। তা কাকে ধরতে যাচ্ছ?
ভানুপ্রিয়া।
সেটা কে?
অত জেনে কাজ নেই আপনার। কাল আপনার টিমের কাউকে আমার তে আসতে হবে।
কেন?
তুহিন এবার সতর্ক।
রাত দুটো দশ। ডানকুনি টোল প্লাজা। বৃষ্টিটা ধরেছে। তবে টিপটিপ করে পড়েই চলেছে। বড়ো বড়ো ট্রাকের লাইন পড়ে গেছে। সঙ্গে মাঝেমধ্যে ছুয়েকটা মারুতি, বোলেরো জাতীয় চারচাকা। আজ টোল প্লাজায় যারাই দাঁড়াচ্ছে তারাই কয়েকটা খিস্তি দিয়ে তারপর যাচ্ছে। প্রতিটা গাড়ি চেকিং হচ্ছে যতটা সম্ভব। তাই বেশ জ্যাম সৃষ্টি হয়েছে। অনেক গাড়িই খুঁটিয়ে দেখা সম্ভব হচ্ছে না। বড়ো বড়ো ট্রাকে পাহাড়প্রমাণ বস্তা। সেগুলো খুঁটিয়ে দেখা মানে রাত কাবার। একটা মহিলা, দূর থেকে অদৃশ্য হয়ে কলকাঠি নাড়ছে। সে ট্রাকে চেপে পালাতেই পারে। স্বয়ম্ভু সেই সম্ভাবনাকেও উড়িয়ে দেয়নি। নিজে বসেছে টোল প্লাজার ঠিক মাঝের ঘরটায়। কানে এয়ারড্রপে কৌশিককে ধরা। সে আছে একটু ধার ঘেঁষে যেখানে টোলের আলোটা কম পড়ছে। বাকিগুলোতেও পুলিশ পোস্টিং হয়েছে যথাযথ।
.
দমাদ্দম আর ঘড়ঘড় শব্দ তুলে বিশাল ট্রাকটা বেরিয়ে যেতে ছোট্ট একটা মারুতি দেখা গেল। পুলিশ অমনি ছেঁকে ধরল। ডিকি খুলে মুখ ঢোকাল। দরজা খুলে গাড়ির মধ্যে ছানবিন শুরু করল। বিরক্ত হয়ে নেমে এল মোটাসোটা মহিলাটি। রীতিমতো তেড়েমেড়ে পুলিশকেই ওপরমহলের ভয় দেখাতে শুরু করল। গাড়ির সামনে বসেছিল একটি রোগাসোগা লোক। এবার তিনিও নেমে এসে মহিলার তালে তাল মেলালেন। স্বয়ম্ভু সবই লক্ষ্য করছিল কাচের গুমটি ঘরটিতে বসে। ঠিক সেই সময়েই ফোনটা টুংটাং শব্দ করে উঠল। হোয়াটসঅ্যাপের নোটিফিকেশন এল। বিরক্ত হয়ে একঝলক ওপর থেকে দেখে নিয়েই মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছিল। কিন্তু শেষমেশ মুখ ফেরাতে হল ফোনের দিকেই। আননোন নম্বর থেকে একটা ভিডিয়ো এসেছে তারপর সেটাকে ট্যাপ করে খুলতেই আঁতকে উঠল স্বয়ম্ভু। হ্যাঁ, গোয়েন্দা আঁতকেই উঠল। সামনে বসে যে ছেলেটি টোল কাটছিল তার থেকে নিজেকে লুকিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল স্বয়ম্ভু। একবার চোখ তুলে দেখে নিল বাইরের পরিস্থিতি। একজন পুলিশকর্মী এসে জানাল গাড়ি প্রায় ফাঁকা। দুজন মানুষ আর মহিলার একটা ব্যাগ ছাড়া কিচ্ছু নেই। মহিলার নামও ভানুপ্রিয়া নয়। তথ্যগুলো স্বয়ম্ভুর চোখের সামনে দিয়ে যেন কর্পূরের মতো উবে গেল। সেই স্থূলকায় চেহারার মহিলাকে নিয়ে গাড়িটি বেরিয়ে গেল। সেই জায়গা নিল একটি জাইলো। স্বয়ম্ভু ভালো করে ভিডিয়ো দেখছে। সারা গা গরম হয়ে উঠছে। হাত দুটোকে মুঠো করে এলোপাথাড়ি চালাতে ইচ্ছে করছে। ফোনে আসা ভিডিয়ো জুড়ে স্বয়স্তুর নগ্ন ছবি। সে স্নান করছে। সাবান মাখছে। মলমূত্র ত্যাগ করছে। স্বয়ম্ভুর শরীরের প্রতিটি অঙ্গ, তার ভাঁজ, খাঁজ এমনকী প্রতিটা রোমকূপের স্পষ্ট ছবি ধরা আছে ভিডিয়োতে। নিচে লেখা ভাইরাল ভিডিয়ো। সিডাকটিভ মুডে ডিটেকটিভ স্বয়ম্ভু সেন। একটি পর্ন সাইট থেকে পাওয়া গেছে ভিডিয়োটি। শরীর খারাপ লাগছে স্বয়ম্ভুর। সোমেন সরকারের কথাগুলো কানের কাছে বজ্রপাতের মতো বেজে উঠল, নিজের কাপড়টা সামলে রাখবেন। বলা তো যায় না, কখন কী হয়! সঙ্গে সঙ্গে যে নম্বর থেকে ভিডিয়োটা এসেছে সেই নম্বরে ফোন করল। সুইচড অফ।
কোথায় যেন একটা পয়সা পড়ল। স্বয়ম্ভুর সামনে বসা ছেলেটি টেবিলের ওপর রাখা নিজের মোবাইলটা উলটে দেখল। স্বয়স্তুর বুকটা ধড়াস করে উঠল। এখন এই ছেলেটিও স্বয়ম্ভুর সারা শরীর মেপে দেখবে? ছি ছি!
ফোন না দেখে সামনে দেখুন।
হালকা ধমক দিয়ে ফোন দেখা থেকে ছেলেটিকে বিরত করল স্বয়ম্ভু। কাচের ঘরের মধ্যে বসেই বাইরেটা দেখার চেষ্টা করল। কে কে এই মুহূর্তে ফোন দেখছে? সেটা দেখতে গিয়েই চোখে পড়ল জাইলোর মধ্যে ঠাসা জিনিস। এসি গাড়ি তাই জানলা বন্ধ। সামনের কাচ দিয়ে ভিতরটা দেখা যাচ্ছে। তোশকজাতীয় কিছু পাকিয়ে পাকিয়ে রাখা। না, কাউকে আর ফোন দেখতে দিলে চলবে না। স্বয়ম্ভু নিজেই কাচের ঘর থেকে নেমে এল। কিন্তু এই নেমে আসাটা কি ঠিক হল ওর? আচ্ছা, শিবাঙ্গীর ফোনেও তার মানে এই ভিডিয়ো যাবে। উফফফ… যন্ত্রণায়, লজ্জায় চোখ মুখ লাল হয়ে উঠেছে স্বয়ম্ভু সেনের। ওই তো কৌশিকও ফোন দেখছে। এয়ারড্রোপে ধমক, কী হল কী কৌশিক? ফোন দেখার জন্য এখানে এসেছ?
সরি স্যার। আমি নজর রাখছি।
.
ইতোমধ্যে দুজন পুলিশকর্মী ছুটে এসে আগের মতোই খবর দিল। ভিতরে ড্রাইভার ছাড়া কেউ নেই। অনেক তোশক গোল করে পাকিয়ে একটার পর একটা শোয়ানো আছে। দুর্গাপুর যাচ্ছে। কাল একটা অনুষ্ঠানবাড়িতে লাগবে। স্বয়ম্ভু আর কিচ্ছু জিজ্ঞেস না করে ডানহাতটা নেড়ে ছেড়ে দিতে বলল। সাদা রঙের জাইলোটা পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে গেল। স্বয়ম্ভুর অস্থির অস্থির লাগছে। চুলের মধ্যে হাত চালিয়ে নিজের চুলের মুঠি নিজেই চেপে ধরল। ঠিক তখনই নজর পড়ল জাইলোর পিছনের কাচের দিকে। গাড়িটা এসি। তাই ভিতরটা শীতল বাষ্পে ভরতি। যথারীতি কাচগুলোও ঝাপসা। সেই ঝাপসা কাচের ওপরেই স্পষ্ট একটা মানুষের হাতের ছাপ। ড্রাইভার সামনে বসে। বাকি গাড়িজুড়ে শুধু মোটা মোটা তোশক। তার ওপর বাইরে বৃষ্টি। তাই বাইরে থেকে কাচের ওপর হাতের ছাপ পড়া সম্ভব নয়। ভিতর থেকেই হাতের ছাপ পড়েছে এবং সেটা কিছুক্ষণ আগেই। পুলিশকর্মীরা বাইরে থেকে দরজা খুললেও ভিতর থেকে কাচের গায়ে ছাপ পড়া অসম্ভব। তার মানে নিশ্চয়ই গাড়ির ভিতর আরও কেউ আছে। আছেই। স্বয়ম্ভু চিৎকার করে উঠল, এই গাড়ি রোকো। থামাও বলছি। জাইলোটাকে ধরো। হাঁকডাক করে স্বয়ম্ভু ছুটছে দেখে বাকিরাও এপাশ-ওপাশ থেকে ছুটে এল। কিন্তু ততক্ষণে জাইলোটা অস্বাভাবিক গতি নিয়ে নিয়েছে। যেটা নেওয়ার সাধারণত কোনো কারণ নেই। একদিকে নিজের সম্ভ্রম অন্যদিকে কর্তব্য। ইচ্ছে করেই কি ঠিক এই সময় ভিডিয়োটা পাঠানো হল স্বয়ম্ভুকে? এসব ভাবার সময় নেই। স্বয়ম্ভু এবং কৌশিক দুটো গাড়িতে উঠে পড়েছে। আরও চারটে পুলিশের গাড়ি ছোটা শুরু করেছে। স্বয়ম্ভু কর্ডলেসে কাউকে নির্দেশ দিল, সামনে একটা জাইলো যাচ্ছে। ট্রাকগুলোকে রাস্তা ব্লক করতে বলো। হারি আপ। জাইলোটা আরও স্পিড বাড়াল। সঙ্গে এতগুলো পুলিশের গাড়ির সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে সাপের মতো এঁকেবেঁকে হাইওয়ে ধরে ছুটতে লাগল। হঠাৎ রাস্তার পাশ থেকে একটা করে ট্রাক সামনে এসে ব্রেক কষতে শুরু করে। জাইলোটা প্রায় হুমড়ি খাচ্ছে। কিন্তু থামছে না। হুহু করে জলভেজা রাতের পাঁজর ফুঁড়ে গাড়িটা ছুটছে। স্বয়ম্ভু নির্দেশ দিচ্ছে, দুটো ট্রাক এগিয়ে এসো। একটা পোকাও যেন গলতে না পারে। সেই মতোই প্রায় তিনখানা ট্রাক তেরচাভাবে হাইওয়ের ওপর এক এক করে গতিরোধ করে দাঁড়িয়ে পড়ল। জাইলোটা গতি কমাতে না পেরে ট্রাকগুলোকে কাটাতে গিয়ে একটা ট্রাকের গা ঘেঁষে বিকট শব্দ তুলে সোজা ডিভাইডারে গিয়ে ধাক্কা মারে। মুহূর্তে থমকে যায় সব। পিছন থেকে হেঁকে ধরে পুলিশের কনভয়। স্বয়ম্ভু গাড়ি থেকে নেমেই ছুটে যায় জাইলোটার পিছনে। চিৎকার করে কৌশিককে বলে, ড্রাইভারকে দেখো। স্বয়ম্ভু এক টানে জাইলোর পিছনের দরজাটা খুলে ফেলে। ডাই করা তোশকগুলোকে টেনে টেনে বাইরে ফেলতে থাকে। দুটো তোশক ফেলার পরেই তিন নম্বর তোশকটা টানতে গিয়ে বেশ ভারী ঠেকে। ঠিক তখনই কৌশিক ছুটে এসে বলে, স্যার, ড্রাইভার স্পট ডেড। সঙ্গে সঙ্গে উদ্ধত রাগত কন্ঠে স্বয়ম্ভু বলে ওঠে, বেরিয়ে আসুন ভানুপ্রিয়া। নইলে তোশক সমেত টেনে রাস্তায় আছড়ে ফেলব। কথাটা দ্বিতীয়বার বলতে হল না। অন্যান্য তোশকের তুলনায় অপেক্ষাকৃত বড়ো তোশকের মধ্যে থেকে চুরির ছনছন শব্দ ভেসে এল। নড়ে উঠল। নিমেষে আবরণ সরিয়ে বেরিয়ে এল এক নারী। পঞ্চাশের কোঠায় বয়স। গলায় থাক-থাক করা তিনটে হার। দুহাত ভরতি সোনালি চুড়ি। কানে ঝুমকো। কাজল আঁকা চোখ দুটোর ওপর স্ট্রিটলাইটের আলোটা তেরচাভাবে তরোয়ালের মতো পড়ে মুখটাকে যেন আলো আর আঁধারে ভাগ করে দিয়েছে। তোশকের মধ্যে গুটিসুটি মেরে থাকার জন্য চুলগুলো ঘেঁটে গেছে। কিছু চুল ঝুলের মতো কপাল আর গালে জালের সৃষ্টি করেছে। মহিলাটি বেশ ফরসা। এই আলো আঁধারিতেও রূপের সম্মোহনী গন্ধ বিলোচ্ছে। স্বয়ম্ভুর নজর পড়ল ঠোঁটের নিচে ডান দিকে ছোট্ট একটা কালো তিল আছে। আর সকলের চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়ার আগেই স্বয়ম্ভু বলে উঠল, বেশ তো ঘাপটি মেরে পালাচ্ছিলেন। কী দরকার ছিল কাচের ওপর হাত রেখে উঁকি মারার? অন্য সাধারণ কেউ হলে হয়তো চুপ করে থাকত। কিন্তু ভানুপ্রিয়া চুপ করে থাকল না। তার গলার স্বরে আলগা একটা আস্তরণ আছে। হাস্কি টোন। যা যেকোনো পুরুষমানুষকে সাপিনীর মতো জড়িয়ে ধরবে। স্বয়স্তুর চোখে চোখ রেখেই ভানুপ্রিয়া বলল, আপনারাই বলেন, অপরাধী নাকি কোথাও না কোথাও তার প্রমাণ ছেড়ে যায়!
.
উত্তর শুনে চমকে গেল স্বয়ম্ভু। কৌশিকও স্তম্ভিত। বাংলাটা তো ভালোই বলেন। স্বয়ম্ভু বলল।
মায়ের ভাষা। ভুলতে না চাইলে ভোলা যায় না।
.
কৌশিকের ফোন এবং আশেপাশের আরও দশটা ফোনে একসঙ্গে নোটিফিকেশন ঢুকতে শুরু করে। অনেকেই মোবাইল বের করার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু স্বয়ম্ভু থামিয়ে দেয়। কেউ মোবাইল দেখবে না। ওটা একটা ষড়যন্ত্রের জাল। পা দিয়ো না। কথাটা সবার উদ্দেশে বললেও স্বয়ম্ভুর চোখ ভানুপ্রিয়ার ওপর থেকে সরেনি। আলো আর অন্ধকার মুখটাকে দুভাগে ভাগ করেছে। তাই ভানুপ্রিয়ার লাল টকটকে ঠোঁটের হাসিটাও ফালা হয়ে গেছে।
এই একে গাড়িতে তোলো।
স্বয়ম্ভুর নির্দেশ মেনে ছুটে এল কিছু মহিলা কনস্টেবল। ভানুপ্রিয়াকে গাড়ি থেকে টেনে নামাতে যায়। কড়া চোখে ওদের দিকে চেয়ে হাত তুলে থামতে বলে। তারপর নিজেই গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ায়। রাতের বেলা একজন মহিলাকে কি গ্রেপ্তার করা যায়?
স্পেশ্যাল কেসে যায়।
ভানু এগিয়ে এসে বাঁ-হাতের তর্জনীটা স্বয়ম্ভুর কপাল থেকে নাক হয়ে ঠোঁট ছুঁয়ে নামতে নামতে বলে, কাল সকালের হট কেক! বলেই একটা চুমু ছুড়ে মহিলা কনস্টেবলদের সঙ্গে গাড়ির দিকে এগোতে থাকে। কৌশিক ব্যাপারটা বুঝতে পারে না। স্বয়ম্ভুকে জিজ্ঞেস করে, স্যার কী বলে গেল? স্বয়ম্ভু শক্ত হয়ে দাঁতে দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে বলল, ধর্ষণ করে গেল! কথাটা কৌশিকের মাথার দশ হাত ওপর দিয়ে উড়ে গেল।
.
একের পর এক খবরের কাগজ টেবিলের ওপর ফেলল শুভঙ্কর কাঞ্জিলাল। পাশে দাঁড়িয়ে ডিসিপি সীতাংশু ভড়। টেবিলের অপর প্রান্তে নত মস্তকে স্বয়ম্ভু সেন। সংবাদপত্রে, টিভিতে একই খবর, পর্ন সাইটে গোয়েন্দা স্বয়ম্ভু সেন। কোনো কাগজ লিখেছে, লালবাজারের ডিটেকটিভের নগ্ন ছবি ফাঁস। লালাবাজারের নীলছবি, ভাইরাল নগ্ন গোয়েন্দা! এমনই আরও কত জ্বালাময়ী সুড়সুড়ি দেওয়া হেডলাইন। এই সুযোগটাই নিল ডিসিপি সীতাংশু। মুখে পোকা পড়ার মতো ভাব করে বলে উঠল, ছি ছি ছি ছি! গোটা পুলিশ ডিপার্টমেন্ট আপনার জন্য আজ ন্যাকেড হয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে সীতাংশুর ফোন বেজে উঠল। কথা বলার ধরন দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে ওপরমহল থেকে চাপ আসছে। ফোনটা রেখেই খেঁকিয়ে উঠল সীতাংশু। ফোর টাইমস শুভঙ্কর। মিনিস্ট্রি থেকে কল এল। আমরা কী ব্যবস্থা নিচ্ছি সেটা জানতে চায়। তুমি তো এই কেসটার গুরুত্বটাই বোঝোনি শুভঙ্কর। যদি বুঝতে তাহলে ছাগল দিয়ে লাঙল চাষ করাতে না।
স্যার, এর আগের কেসটায় স্বয়ম্ভু যথেষ্ট…
মাই ফুট আগের কেস। এটা কুকুর বেড়ালের কেস নয়। এটা এম.এল.এ-র মেয়ে নিখোঁজ, সেই কেস।
শুভঙ্কর আবারও বলল, স্যার, ইমিডিয়েটলি এই ভিডিয়োটা ডিলিট করার চেষ্টা চলছে। তাছাড়া… আমি বলছি এগুলো আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সি দিয়ে ক্রিয়েট করা। কী স্বয়ম্ভু তাই তো? এটা তুমি নও নিশ্চয়ই?
সীতাংশু হাত নেড়ে বলে উঠল, হ্যাঁ হ্যাঁ এগুলো বলা ছাড়া আর উপায় কী? মিডিয়াকে এটাই খাওয়াতে হবে। কিন্তু আসলটা কীভাবে বেরোবে শুভঙ্কর? এবার তো ফেলুদার পেছনে ব্যোমকেশকে লাগাতে হবে দেখছি। আর স্বয়ম্ভু, তুমি নিজে যেখানে সিকিয়োর নও সেখানে সাধারণ মানুষকে কীভাবে সিকিয়োরিটি দেবে?
কিছু মনে করবেন না স্যার।
এবার মুখ খুলল স্বয়ম্ভু। বলল, যেখানে নিজের টিম লিডেরাই আমার সঙ্গে কাজ করেও আমার ওপর ভরসা করতে পারছেন না সেখানে সাধারণ মানুষ কীভাবে আমার ওপর ভরসা রাখবে স্যার?
সত্যিই তোমার লজ্জা নেই।
সীতাংশু বলল।
আছে স্যার। এই মুহূর্তে সত্যিই লজ্জা করছে আমার।
মানে?
কাল যখন ভিডিয়োটা পেলাম তখন মনে হল একজন দুষ্কৃতি আমায় ধর্ষণ করে গেল। আর এখন যখন নিজের ঘরে দাঁড়িয়ে আমার নিজের মানুষেরাই সব কিছু জানা সত্ত্বেও আমাকে ছি ছি করছেন তখন মনে হচ্ছে ওটা ধর্ষণ ছিল না।
কথার লেজটুকু মুখে এসেও থেমে গেল। তবে যতটুকু বলা হল তাতে যে ডেপুটি কমিশনারের বুকের পাঁজরে গিয়ে লেগেছে সেটা তার মুখের রক্তিম আভা দেখেই বোঝা যাচ্ছে। তাই অবস্থা সামলাতে শুভঙ্কর বলে উঠল, স্বয়ম্ভু একটা ছোট্ট কথা, যে এটা তুমি নও। সেটুকু তোমার মুখ থেকেই শুনতে চাইছি আমরা।
আমি অযথা মিথ্যে বলি না স্যার। আপনি জানেন।
শুভঙ্কর চমকে উঠে সীতাংশুর মুখের দিকে তাকায়। সীতাংশু ভুরু দুটো আরও ভাঁজ ফেলে কাছাকাছি চলে আসে। স্বয়ম্ভু বলে, ওই ভিডিয়োতে যে নগ্ন পুরুষটিকে দেখা যাচ্ছে সেটা আমি। স্বয়ম্ভু সেন। আর ওই বাথরুমটা আমারই।
হোয়াট!
শুভঙ্করের অভিব্যক্তি। সীতাংশু গলা ফুলিয়ে নিরুত্তর।
.
কাল রাতে ভানুপ্রিয়াকে হাজতে চালান করে রাত তিনটের পর নিজের বাড়িতে এসেই বাথরুম চেক করেছে স্বয়ম্ভু। বাথরুমের সিলিংয়ে তাকিয়ে দ্যাখে, টাইলসগুলোর খাঁজে খাঁজে চোখ রেখে দেখার চেষ্টা করে। শাওয়ারের মাথাটা দেখতে গিয়ে মনে হয় ছবির অ্যাঙ্গেল এটা নয়। আবার ভিডিয়োটা চালিয়ে দেখে। সেই অনুযায়ী চোখ রাখে দেয়ালের কোণে। টাইলসটা যেখানে শেষ ঠিক তার মাথায় দেয়ালের এক কোণে ছোট্ট কালো মতো বিন্দু। এতদিন চোখেই পড়েনি স্বয়ম্ভুর। খাবলে টেনে তুলে আনে ছোট্ট ক্যামেরাটাকে। সেলোটেপ দিয়ে মারা ছিল।
পকেট থেকে সেই ক্যামেরাটাই বের করে টেবিলে যেখানে আজকের কাগজগুলো সাজানো তার ওপর রাখল স্বয়ম্ভু।
কোনো সাসপেক্ট?
শুভঙ্করই প্রশ্নটা করল। স্বয়ম্ভু জবাব দিল, সাসপেক্ট নয় স্যার। শিয়োর হয়ে বলতে পারি। পুরুষোত্তম মাল।
ইনি কে?
কদিন আগে আমার মাকে একটা গাড়ি দুর্ঘটনার হাত থেকে বাঁচায়। সেই সূত্রেই আমার বাড়িতে আসে। কিন্তু আমি না থাকলে সে আসে আর মায়ের সঙ্গে গল্প করে। তার কথা অনুযায়ী সে নাকি ইলেকট্রিক এঞ্জিনিয়ার। আমার অ্যাসাম্পশন, সেদিনের সেই গাড়ি দুর্ঘটনাটি একটি নাটক। আর এই ছেলেটিও ড। নামটাও ভুয়ো।
ক্লু?
আমার বাড়িতে পাওয়া এম লেখা একটি লকেট। যেটা খুঁজতে ছেলেটি গতকালই আমার বাড়িতে এসেছিল। কিন্তু খুঁজে পায়নি। আমার বাড়ির মিটার বক্সের ওপর কোনো একটা মেশিন রাখা ছিল। ধুলোতে তার হাতের ছাপ স্পষ্ট। হতে পারে এই ক্যামেরার ওয়াইফাই। যেটার সাহায্যে এই ক্যামেরা চালু থাকত চব্বিশ ঘণ্টা।
তার মানে ওর কাছে তোমার আরও এইরকম বাথরুম মোমেন্টের ফুটেজ আছে?
চিবিয়ে চিবিয়ে কথাগুলো বলল সীতাংশু। স্বয়ম্ভু চোখ নামিয়ে শিরদাঁড়া টানটান করে জবাব দিল, ইয়েস স্যার।
নাকের নিচে আঙুল ঘষে হাসি চাপল সীতাংশু। স্বয়ম্ভু বুঝল সে আবার রেপড হল। সীতাংশু বলল, শোনো শুভঙ্কর। ভানুপ্রিয়া ধরা পড়েছে। ওকে যা জিজ্ঞাসাবাদ করার হিরণ্য করুক। এই কেসটার জন্য স্বয়ম্ভু ঠিক সটেবল নয়।
এমনই একটা কিছু আন্দাজ করছিল স্বয়ম্ভু। তাই চমকাল না। শুভঙ্করবলল, তাহলে এই কেসটা কি হিরণ্য দাশগুপ্ত…!
রাইট। একবার হিরণ্যকে ডাকো।
স্বয়ম্ভু মাথা নিচু করে ঠায় দাঁড়িয়ে।
ডাকার তিরিশ সেকেন্ডের মধ্যেই উদয় হল অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার অফ পুলিশ হিরণ্য দাশগুপ্ত। যেন ডাক পাওয়ার জন্য এক্কেবারে প্রস্তুত ছিল। স্যালুট ঠুকে দাঁড়াতেই সীতাংশু জানাল, আজ এই মুহূর্ত থেকে কথাকলি সরকার নিখোঁজের কেসটা তুমি দেখবে হিরণ্য।
শিয়োর স্যার। তবে স্যার, কেসটা আর কথাকলি নিখোঁজে আটকে নেই। এখন যা চলছে তাতে মনে হচ্ছে সোমেন সরকারের ঠিকুজিকুষ্ঠি উদ্ধারের কাজে লেগেছে কলকাতা পুলিশ।
.
ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি রেখেই কথাগুলো বলল হিরণ্য। স্বয়ম্ভুর অভিব্যক্তিতে কোনো পরিবর্তন নেই। যেন শক্ত কাঠ দিয়ে তাকে কেউ ক্রুশবিদ্ধ করে রেখেছে। সীতাংশু হিরণ্যর তালে তাল দিল। আরে সেটাই তো প্রবলেম। কেসটা গোছাতে গিয়ে ঘেঁটে দেওয়া হচ্ছে। সেইজন্যেই তো তোমায় দিলাম। অগোছালো কেসটা গুছিয়ে যত তাড়াতাড়ি পারো মেয়েটাকে খুঁজে বের কর।
দুই থেকে তিনদিন সময় দিন স্যার। হয়ে যাবে।
স্বয়ম্ভু বলল, স্যার, কথাকলির সঙ্গে সঙ্গে আমাদেরই ডিপার্টমেন্টের অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব ইন্সপেক্টর শিবাঙ্গী বসুর শ্লীলতাহানি করার চেষ্টা হয়েছিল। তাকে তো তুমি ধরে ফেলেছ। ওই মারুফ হোসেন না কী। কেস সলভড।
আর মারুফ যে আরও বড়ো মেয়ে পাচার এবং পাচারকারীর সন্ধান দিল সেই কেসটা?
এটা কথাকলির কেস স্বয়ম্ভু। তুমি মোটিভটাকেই ঘুরিয়ে দিচ্ছ। আর এখানেই সবথেকে বড়ো ভুল করছ। যাক গে, এ বিষয়ে আর তোমার সঙ্গে কথা বাড়িয়ে সময় নষ্ট করতে চাই না। এমনিতেই অনেকটা সময় তুমি নষ্ট করে দিয়েছ। কেস ডিটেলসটা হিরণ্যর হাতে ট্রান্সফার করো। নাও।
ওকে স্যার।
স্যার, একটা আর্নেস্ট রিকোয়েস্ট।
শুভঙ্কর অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বলল। সীতাংশু বিরক্ত হয়েই জবাব দিল, আবার কী শুভঙ্কর?
স্যার, এই কেসটার যাবতীয় যা কিছু সব স্বয়ম্ভু জানে। শুধুমাত্র কেস ডিটেইলস দিলে হিরণ্য যথেষ্ট অসুবিধেয় পড়বে। এখন হাতে আর সময়ও নেই। যখন-তখন ইনফরমেশনের প্রয়োজন আমাদের। তাই আমার সাজেশন এই কেসটায় হিরণ্যর সঙ্গে স্বয়ম্ভুও থাক। হিরণ্য যা বলবে স্বয়ম্ভু সেটাই করবে। একটা অ্যাসিস্ট্যান্টের তো দরকার। যেভাবে স্বয়ম্ভু টাইম কিল করেছে এবার সেটারই দাম দিক স্যার। একেবারে সরিয়ে দিলে তো আমাদেরই আবার নতুন করে সময় নষ্ট।
.
স্বয়ম্ভুর নিচু থাকা চোখটা এতক্ষণে ওপরে উঠে একঝলক দেখে নিল শুভঙ্করকে। শুভঙ্করের চোখ সীতাংশুর দিকে। একটু ভেবে সীতাংশু অনিচ্ছাসত্ত্বেও মত দিল। বেশ। থাকুক। হিরণ্য, ছেলেটিকে ভালো করে কাজ শেখাও। ওকে বুঝিয়ে দাও কোনটা প্রায়োরিটি আর কোনটা ট্রিভিয়ালিটি।
শিয়োর স্যার।
.
নিজের চেয়ারে আধশোয়া হয়ে চোখ বন্ধ করে বসে স্বয়ম্ভু। শিবাঙ্গী দৌড়ে ঘরে আসে। স্বয়ম্ভু চোখ খোলে না। ধীর পায়ে এগিয়ে যায় তার স্যারের দিকে। এটা সত্যি স্যার?
কোনটা?
চোখ বন্ধ করেই উত্তর দেয় স্বয়ম্ভু।
কেসটা এখন থেকে হিরণ্য স্যার দেখবেন?
আমি তার অ্যাসিস্ট্যান্ট।
আপনি মেনে নিলেন?
না মেনে উপায়?
.
শিবাঙ্গীর চোখ ভারী হয়ে কড়কড় করছে। সেও চেয়ারে বসে পড়ল। *প্রেস মিটে ফলাও করে বলছে।
কী?
মাত্র দুদিনের মধ্যে নাকি ওরা কথাকলিকে খুঁজে বের করবে। ওদের হাতে সব প্রমাণ এসে গেছে।
.
এবার উঠে বসল স্বয়ম্ভু। ভালোই তো। স্বয়ম্ভু সেন এমনিতেও পর্ন স্টার বনে গেছে। এবার তার ফেইলিওরটাও লোকে দেখবে।
তার মানে তলে তলে ওরা সব কিছু জানে স্যার। কথাকলি কোথায় আছে সেটাও ওদের জানা।
অস্বাভাবিক কিছু না।
ভানুপ্রিয়া? তার কী হবে?
প্রমাণের অভাবে ছেড়ে দেওয়া হবে। হিরণ্য দাশগুপ্ত বলে দিয়েছে।
মানে?
এই একটা শব্দ শিবাঙ্গীর বুকে জমা হওয়া সব হতাশাগুলোকে বাইরে এনে ফেলল। আমি উঠি বুঝলে? বলেই চেয়ার ছেড়ে তড়াক করে লাফিয়ে উঠে পড়ল।
কোথায় যাচ্ছেন?
বাড়ি। হিরণ্য বলল। এতদিন অনেক করেছি। এবার একটু রেস্ট নিতে। দরকার লাগলে বলবে।
ভানুকে ছাড়ার আগে আপনি একবারও জিজ্ঞাসাবাদ করবেন না?
হুকুম নেই।
শিবাঙ্গী প্রচণ্ড খেপে গেল। ক্ষণিকের জন্য সংযম হারিয়ে বলে উঠল, আপনি কবে থেকে হুকুমের দাস হয়ে গেলেন স্যার? স্বয়ম্ভু যেতে গিয়ে থমকে ফিরে তাকাল। হাসল। বলল, আইনের রক্ষক হয়ে তাকে অমান্য করার অধিকার আমাদের নেই। মাথা ঠান্ডা রাখো। আর একটা কথা, মাকে যদি আরেকটা দিন তোমাদের বাড়িতে রাখো তাহলে ভালো হয়। আমি একটু একা থাকতে চাই। স্বয়ম্ভু চোখ নিচু করেই কথাগুলো বলল। শিবাঙ্গী বলল, চোখ নিচু করে যে কথাগুলো বলতে হয় সেগুলো বলার দরকার কী? মাসির ভাবনা আপনাকে ভাবতে হবে না।
থ্যাংক ইউ।
স্বয়ম্ভু চলে গেল। শিবাঙ্গীর দুটো চোখ ভারী হয়ে এল। কয়েক ঘণ্টায় মানুষটা এক্কেবারে পালটে গেছে। বিশাল এক মহীরুহ যেন পলকের মধ্যে কোনোরকমে টিকে থাকা নরম আগাছায় পরিণত হয়েছে। রাগ আর দুঃখ একসঙ্গে উথলে পড়ল শিবাঙ্গীর চোখের কোল বেয়ে।
.
