৬
চিকেনের লেগ পিসটা ছেলের পাতে দিতে দিতে সুচিত্রা বলল, এবার থেকে ঘরে একটু মিষ্টি-ফিষ্টি এনে রাখিস তো ভোলা। ছেলেটাকে শুধু মুখে ফেরাতে হল।
কে?
লেগপিসে কামড় দিল স্বয়ম্ভু। সুচিত্রা বলল, পুরুষোত্তম। খেতে খেতে অবাক হয়ে মুখ তুলল স্বয়ম্ভু। নামটা যেন চেনা চেনা। সুচিত্রা বলল, আরে যে ছেলেটা আমায় যমের মুখ থেকে টেনে নিয়ে এল। সত্যিই ভুল গিয়েছিল স্বয়ম্ভু। সে আবার কেন এসেছিল?
·
খবর নিতে। আমি কেমন আছি।
এত দরদ ভালো নয় মা।
কেন?
কে কী মতলবে আসছে তুমি তো জানো না।
গোয়েন্দা বানিয়েই তোকে ভুল হয়েছে আমার। সবসময় সবাইকে সন্দেহ তোর।
সময়টা ভালো নয় মা। কিছুক্ষণ আগে শিবাঙ্গীর ওপর অ্যাটাক হয়েছিল।
সুচিত্রা আঁতকে উঠল। কী বলছিস? কী হয়েছে?
জানি না। বাড়ি ফেরার সময় রাস্তায় দুজন ঘিরে ধরেছিল শিবাঙ্গীকে। সেখানেও পাড়ার একটি ছেলে ওকে বাঁচিয়েছে।
ওর কোনো ক্ষতি হয়নি তো রে?
হতে পারত যদি না ছেলেটা এসে পড়ত।
.
কথাটা বলতে বলতেই আনমনা হয়ে যায় স্বয়ম্ভু। পরক্ষণেই ভাবনার জগত থেকে নিজেকে বের করে নিয়ে এসে স্বয়ম্ভু বলে, তুমি আবার যেন এসব কথা ওর বাবা-মাকে বলতে যেয়ো না। মাসিদের কিছু বলা হয়নি। বেকার টেনশন করবে।
স্বয়ম্ভুর মোবাইলটা বেজে ওঠে। সুচিত্রা খেঁচিয়ে ওঠে, খেতে বসে একদম ফোন ধরবি না। এই করে তোর খাবার হজম হয় না। বাজতে থাকা ফোনটা হাতে তুলে স্বয়ম্ভু বলে, তুমি না ইউটিউবে ডাক্তারির ক্লাস করাটা এবার বন্ধ করো মা। যত্তসব! হ্যাঁ, তুহিনদা বলো। বিয়েবাড়ি মিটল তোমার?
.
ফরেন্সিক এক্সপার্ট তুহিনশুভ্র ওপার থেকে বলে ওঠে, হ্যাঁ। সে তো মিটেছে। কিন্তু তুমি যেটা দিয়েছ সেখানে তো ব্লাড স্যাম্পেল আছে ভাই।
হোয়াট?
হ্যাঁ। চুল আর সুইচ দুটোতেই।
ঈষৎ বিস্ফারিত চোখে মাংসের গ্রেভি লাগা আঙুল চাটতে চাটতে স্বয়ম্ভু জিজ্ঞেস করে, ব্লাড স্যাম্পেলটা ঠিক কতদিনের?
চার-পাঁচদিন তো বটেই।
হুম।
কিন্তু আমি বুঝব কী করে এটা কার? ভিক্টিমের আরও কিছু চাই তো।
সেটার রাস্তাই বন্ধ তুহিনদা। বাট ব্যবস্থা আমি একটা করবই। একটু সময় লাগবে।
.
সোমবার সকালে শিবাঙ্গীর ঘুম ভাঙল লোকাল থানার ওসি সুরঞ্জন মুন্সীর ফোনে। বলেছিলাম না শিবাঙ্গী, সুরঞ্জন মুন্সীর কাছ থেকে কোনো কেস সুটকেস হয় না। বাইকটার নাম্বার, ঠিকুজিকুষ্ঠি উদ্ধার হয়েছে। মুন্সী এমনই লোক। কাজের কাজ করার আগে নিজের ঢাক না পেটালে ওনার ভাত হজম হয় না। অথচ শিবাঙ্গী ভালোই জানে এই কাজের কৃতিত্ব সুরঞ্জনের চেয়ে তার সাবর্ডিনেটের বেশি। কিন্তু সেসব ভাবার সময় নেই। শিবাঙ্গী জিজ্ঞেস করল, কোথাকার?
মারুফ হোসেনের নামে রেজিস্টার্ড। মাঝেরহাটে থাকে।
মাঝেরহাট!
হ্যাঁ। যাবে নাকি আমাদের সঙ্গে?
.
শিবাঙ্গী মনে মনে অঙ্ক কষে নিল। ঠাকুরপুকুর থেকে মাঝেরহাটের দূরত্ব খুব বেশি নয়। সঙ্গে সঙ্গে একটা নামও চলকে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে সুরঞ্জন মুন্সীকে জানিয়ে দিল যে আধঘণ্টার মধ্যেই থানায় পৌঁছোচ্ছে।
.
মেন রোড থেকে বাঁ-দিকে বেঁকে গেল পুলিশের গাড়ি। আরও চার- পাঁচটা প্যাঁচ মেরে একটা একতলা বাড়ির সামনে এসে গাড়ি থামল। পুলিশ নামল। সঙ্গে শিবাঙ্গী। সবুজ রঙের বাড়ি। খয়েরি রঙের দরজাটা বেশ পুরোনো। সেখানেই টোকা পড়ল বারকয়েক। বাইরে কোনো কলিং বেল নেই। কপাল পর্যন্ত শাড়ির আঁচলে ঢেকে একটি মহিলা বেরোল। দুটো কানের পাশ দিয়ে শাড়ির আঁচলটা কাঁধের দিকে নেমেছে। ফরসা মহিলাটি পুলিশ দেখেই যে ঘাবড়েছে সেটা তার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে।
মারুফ হোসেনের বাড়ি এটা?
সুরঞ্জন মুন্সী প্রশ্ন করল। মহিলাটি জুলজুল চোখে জবাব দিল, হ্যাঁ।
আপনি মারুফের কে হন?
মা। মারুফকে খুঁজছেন কেন?
ডাকুন ওকে।
ও তো বাড়ি নেই। কিন্তু কেন? মারুফ কী করেছে?
বাড়ি নেই? কোথায় গেছে?
জানি না।
পুলিশকে মিথ্যে বলছেন?
সুরঞ্জনের গলায় চড়া ধমক। মহিলাটি ভয়ে ভয়ে জবাব দিল, মিথ্যে কেন বলব স্যার? মারুফ কাল থেকে বাড়ি ফেরেনি। সুরঞ্জন ঘাড় ফিরিয়ে শিবাঙ্গীর দিকে চাইল। শিবাঙ্গী এবার সামনের দিকে এগিয়ে এসে মহিলাকে প্রশ্ন করল, রাতে যে ফিরবে না সেটা ফোন করে জানায়নি?
করেছিল। তখন প্রায় রাত সাড়ে বারোটা। ফোন করে বলল, আজ ফিব না। রাখছি। তারপর থেকে ফোনেও পাচ্ছি না।
নম্বরটা দিন। সঙ্গে আপনারটাও।
.
মারুফের মা আবারও জানতে চায় যে তার ছেলে কী করেছে? কেন পুলিশ এসেছে? কাজ আছে বলে কাজ সেরে দেয় শিবাঙ্গী। নম্বরটা নিয়ে লালবাজারে রঞ্জিতকে পাঠিয়ে শিবাঙ্গী বলে লাস্ট লোকেশন কোথায় ছিল জানাতে। মাঝের সময়টাতে একটা চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে চা খায় সুরঞ্জন, শিবাঙ্গী আর দুই কনস্টেবল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফোন আসে রঞ্জিতের। মারুফের লাস্ট ফোন গতকাল রাত বারোটা আটত্রিশে। ওই আরেকটা যে নম্বর দিলে….
হ্যাঁ ওর মায়ের নম্বর।
ওটাতেই লাস্ট ফোন। তারপর থেকে সুইচড অফ।
লোকেশন?
হরিদেবপুর।
জানতাম কাছেই থাকবে। লোকেশন ডিটেলসটা ইমিডিয়েটলি সেভ করো আমায়।
.
ফোনটা কেটেই সুরঞ্জনকে শিবাঙ্গী বলে, জানতাম বেশি দূর যেতে পারবে না। জানোয়ারের পা-টা নির্ঘাত ভেঙেছে জানেন। হরিদেবপুরে লাস্ট লোকেশন। টুং করে নোটিফিকেশন এল শিবাঙ্গীর ফোনে। লোকেশন চলে এসেছে। চলুন স্যার, যাওয়া যাক।
সকাল হতে না হতেই আই টি সেলের প্রাঞ্জলের সঙ্গে বসেছে স্বয়ম্ভু। মেঘা নন্দীর মোবাইলের লক খোলা হয়েছে সবে। ফোনটির মেমরি ফাঁকা। একটাও ছবি নেই। শুধু কন্ট্যাক্টসে নম্বর আছে। রিসাইকেল বিনে চেক করো তো। রিসাইকেল বিনও ধবধব করছে ফরসা। প্রাঞ্জল দেখল স্বয়ম্ভুর চোখ-মুখ লাল হয়ে উঠেছে। প্রাঞ্জল বলল, এর আগেও কেউ লকটা খুলেছিল স্বয়ম্ভুদা। বাড়ির কেউ?
লোকাল থানার পুলিশ নিয়েছিল ফোনটা।
খানিকটা চমক যেন প্রাঞ্জলের চোখেও চলকে উঠল।
হার্ড ড্রাইভ আর ল্যাপটপটা চেক করো তো।
.
হার্ড ড্রাইভ ফাঁকা নয়। ওয়ান টিবির হার্ডড্রাইভ অর্ধেকের বেশি ভরতি নানা নামের অজস্র ফোল্ডার। স্বয়ম্ভু শুরুতে ভালো করে চোখ বুলিয়ে দেখল কোথাও স্ক্যান, বাবার লেখা বা স্বপন নন্দীর নামে ফোল্ডার আছে কিনা। পেল না। প্রতিটি ফোল্ডারই ক্লিক করতে থাকল। সেখানেই একটি ফোল্ডারে কলেজের বন্ধুদের সঙ্গে অজস্র মুহূর্ত আটকে আছে। কিন্তু তাদের মধ্যে কোথাও কথাকলির ছবি নেই। অথচ স্যামের ছবি আছে বেশ কটা। এমনকী মেঘার সঙ্গে প্রায় গলা জড়াজড়ি করে স্যামের ছবি। এইভাবেই তো কথাকলিকেই জড়িয়ে ধরেছিল স্যাম তার বার্থ ডে পার্টিতে।
ছেলেটির সঙ্গে যা ছবির ঘটা দেখছি তাতে তো বেশ বিশেষ কোনো সম্পর্ক ছিল বলে মনে হচ্ছে।
প্রাঞ্জল বলল। হুম। এই নিয়েই সম্ভবত কথাকলির সঙ্গে তর্কাতর্কি শুরু। এইটুকু বলেই চুপ করে গেল। কিন্তু স্বয়ম্ভুর মন অন্য অঙ্কের হিসেব মেলাতে লাগল মনে মনে। স্যামের মা কথাকলিকে সহ্য করতে পারে না। অথচ গেটকিপার বলল কথাকলি মাঝেমধ্যেই স্যামের সঙ্গে এসে রাত কাটিয়েছে। তার মানে আগে কি ছেলের সঙ্গে এম.এল.এ-র মেয়ের মেলামেশা মেনে নিয়েছিল স্যামের মা! পরে কী এমন হল যে কথাকলি চোখের বালি হয়ে গেল? মেঘা নন্দী কি এম.এল.এ-র অতীতের কুকীর্তিগুলো স্যামের মাকে শুনিয়ে তার মন বিষিয়ে দিয়েছিল? তাই মেঘার প্রতি কথাকলির এত রাগ? মেঘাও তার বাবার লেখাগুলোকে হাতিয়ার করে স্যামের জীবন থেকে কথাকলিকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু স্যাম তাতেও যখন সরল না কথাকলির সঙ্গে ঝগড়াটা প্রায় হাতাহাতির পর্যায়ে চলে যাচ্ছিল, ঈশিতা যদি না টেনে আনত। এদিকে ঈশিতাও ভ্যানিশ। কেন? ঈশিতা কেন?
কিছু বলছ স্বয়ম্ভুদা?
প্রাঞ্জল বলে উঠল। রহস্যের অতলে ডুবতে ডুবতে স্বয়ম্ভু চেতনায় ফিল। না না, চল দেখি।
একটা ফোল্ডার পাসওয়ার্ড প্রোটেক্টেড।
তাই নাকি? খোলার বন্দোবস্ত কর। আর শোন, মোবাইলটা থেকে যা যা ডিলিট হয়েছে সেগুলোকে রিকভার করা যাবে?
ট্রাই করতে পারি। বাট কথা দিতে পারছি না। যদি একবার ফরম্যাট মারে তাহলে হয়ে যাবে। কিন্তু মেমরি কার্ডটা যদি বারবার ফরম্যাট করা হয় তাহলে চাপ আছে।
.
পুলিশের গাড়িটা হরিদেবপুরের লোকেশনে ঢুকে পড়েছে। জানলার ধারেই বসেছিল শিবাঙ্গী। হঠাৎ একটা দোকানের সামনে আসতেই শিবাঙ্গী উত্তেজিত হয়ে পড়ল। গাড়িটাকে দাঁড়াতে বলল। গাড়ি থেকে শিবাঙ্গী নামতেই দোকানে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ছেলে হাতের সব জিনিস রাস্তায় ফেলে দে দৌড়। ছেলেটির ঠোঁটের কাছে কাটা দাগ। কপালে আঘাতের চিহ্ন। শিবাঙ্গী চিৎকার করে কনস্টেবলদের হুকুম ছোড়ে ছেলেটাকে ধরুন। বলেই শিবাঙ্গীও ছোটে। সুরঞ্জন আর কী করে? বাধ্য হয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো সেও শিবাঙ্গীকে ফলো করে। সকালে ভ্যানে বাজার নিয়ে বসেছিল। ছেলেটি সেই ভ্যানটাকে শিবাঙ্গীদের দিকে ঠেলে দিয়ে বাজারের মধ্যে ঢুকে পড়ে। ভ্যানটা শিবাঙ্গীর পেটের কাছে সজোরে লাগতে গিয়েও লাগে না। তার আগেই শিবাঙ্গী নিজেকে বাঁচিয়ে বাজারে ঢুকে যায়। ছেলেটির ধাক্কায় কত লোক পড়ে যায়। কত আনাজ সেজে ওঠার আগেই ফোয়ারার মতো লুটিয়ে পড়ে। জ্যান্ত মাছগুলোও ছটফট করে কিলবিল করে ওঠে। সবজিওয়ালাদের ক্ষতি হওয়ায় এন্তার গালাগাল দিতে থাকে। বাজার ছেড়ে বেরিয়ে যায় ছেলেটি। পালাবার চোটে খেয়ালই করে না পিছনে শিবাঙ্গী নেই। কেবল সুরঞ্জন মুন্সী ছুটে আসছে। ছেলেটি বাজার থেকে বেরোতেই আচমকা একটা ঠ্যালাগাড়ি এসে ভীষণ জোরে ধাক্কা মারে। ছেলেটি মাটিতে লুটিয়ে পড়তে বাধ্য হয়। ঠিক তখনই শিবাঙ্গীর থাবা দখল করে ছেলেটির ঘেঁটি। ঠ্যালাগাড়িটি পাঁজরে এসে লাগায় ছেলেটির পক্ষে আর সম্ভব হয় না উঠে শিবাঙ্গীর কবল ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার।
কাল আমার বুকে হাত বুলিয়ে ছিলি না। এবার তোর বুক-পেট কীভাবে মালিশ করি দ্যাখ শুয়োরের বাচ্চা। মারুফ কোথায় বল।
ছেলেটি ক্লান্ত বিধ্বস্ত চোখ তুলে শিবাঙ্গীকে মেপে নিল। সুরঞ্জন চারপাশ খুঁজতে খুঁজতে এতক্ষণে এসে পৌঁছোতে শিবাঙ্গী বলল, মারুফ হোসেনের সঙ্গী।
ও এ মারুফ নয়?
হওয়ার কথাও না। পা-টা তো শিয়োর ভেঙেছে। কীরে মারুফ কোথায়
ধমকের সঙ্গে শিবাঙ্গীর হাতে পাকানো ঘুষিটা এগিয়ে গেল ছেলেটির পেট লক্ষ্য করে। ব্যথায় কুঁকড়ে বলে উঠল, জানি নাআআআ, জানি না।
একদম মিথ্যে বলবি না। এই শালা তোর নাম কী?
শিবাঙ্গীর দেখাদেখি সুরঞ্জনও ফুঁসলে উঠল, এই নাম বল। কী নাম তোর? নাকি সেটাও জানিস না?
কথাটা বলতে বলতে পটাস করে সুরঞ্জনের হাতের চাঁটি গিয়ে পড়ল ছেলেটির মাথায়।
সঈদুল আহমেদ।
আরও বারকয়েক মারুফের হদিশ জিজ্ঞাসার সঙ্গে দুমদাম মার পড়ল সঈদুলের পেটে, পিঠে, কানের পাশে। কিন্তু মারুফের ঠিকানা বেরোল না। বাধ্য হয়ে হাতকড়া পরিয়ে সঈদুলকে পুলিশের গাড়ির দিকে টানতে টানতে নিয়ে চলল শিবাঙ্গী। আচমকা একটা গুলির শব্দ। শিবাঙ্গীর গায়ের ওপরেই সঈদুল লুটিয়ে পড়ল। সোজা বুকে এসে লেগেছে গুলিটা। একটা লাল রঙের মারুতি উলটোফুট দিয়ে ছুটে বেরিয়ে গেল। সুরঞ্জন গুলি ছুড়তে গিয়েও ছুড়তে পারল না। সকালের রাস্তায় এত লোক। কোথায় লাগতে গিয়ে কার গায়ে লাগবে! তারপর আবার অন্য বিপত্তি। এমনিতেই একটা গুলি চলতেই লোকজন উদ্ভ্রান্তের মতো এদিক-ওদিক ছুটতে শুরু করেছে।
.
এখনও পাগলের মতো অভীষ্ট প্রমাণ খুঁজে চলেছে প্রাঞ্জল আর স্বয়ম্ভু। সেই সময়েই শিবাঙ্গীর ফোনটা আসে। সব শুনে স্বয়ম্ভু নির্বাক হয়ে যায়। সামনের টেবিলে একটা ঘুষি মেরে বলে, আমাদের ওপর কয়েকজোড়া চোখ সর্বক্ষণ নজর রাখছে শিবাঙ্গী। কিন্তু তাদের আমরা চিনতে পারছি না।
স্যার, মারুফের লাস্ট লোকেশন যখন এখানে তখন হয় ও এই চত্বরে আছে নয়তো কাছেপিঠের কোনো হসপিটালে ভরতি।
হসপিটাল কেন?
কাল ও যা মার খেয়েছে তাতে ওর আজ হেঁটে চলে বেড়ানো সম্ভব নয়। ওর ডান পায়ের হাড় আমি নিজে ভেঙেছি।
আমি লোক লাগাচ্ছি। চিন্তা কোরো না। তুমি লাশটার ব্যবস্থা করো।
স্বয়ম্ভুদা, এই দ্যাখো।
প্রাভালের ডাকে ফোনটা রেখেই ল্যাপটপের দিকে তাকায়। মেঘা নদীয় হার্ড ড্রাইভের যে ফাইলটি পাসওয়ার্ড লক ছিল সেটা খুলে ফেলেছে। আর সেখানেই স্বপন নদীর অজস্র লেখার স্ক্যান কপি। স্বয়ম্ভুর ঠোঁটে হাসি সেই ঠিকই কিন্তু চোখের কোণে ঘন মেঘের বুক চিরে ঠিকরে আসা সরু সুতোর মতো আলো। সব কটার প্রিন্ট আউট দে। প্রাঞ্জলের পিঠ চাপড়ে কথাটা বলে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
.
প্রকাশ্য দিবালোকে চলল গুলি। রাজপথে পুলিশের সামনে খুন হল তরতাজা যুবক। কিন্তু পুলিশ তাকে ধরেছিল কেন? কেনই বা তার যথাযথ প্রোটেকশন দিতে পারল না পুলিশ? জেনে নেব ডিউটিরত পুলিশকর্মী শিবাঙ্গী বসুর কাছে।
.
ক্যামেরাটা ঝট করে ঘুরে গেল শিবাঙ্গীর দিকে। স্থানীয় বেশ কিছু মুসলিম অধিবাসী ঘিরে ধরেছে শিবাঙ্গীকে। তারা জবাবদিহি চাইছে সপ্তমে গলা চড়িয়ে। শিবাঙ্গী প্রাণপণে তাদের শান্ত করার চেষ্টা করছে।
.
রাজারাম নিজের বাড়িতে খেতে খেতে নিউজ চ্যানেল দেখছিল। হঠাৎ খবরটা দেখে এক্কেবারে স্ট্যাচু হয়ে গেছে। শিবাঙ্গী বলছে গত রাতের ঘটনা। যদিও সবটা নয়। কিন্তু লোকে প্রমাণ চাইছে। হঠাৎ করে একজন বলে উঠল, এসব পুলিশের মিথ্যে বানানো গল্প। নিজেদের অপদার্থতা ঢাকতে এ কথা বলছেন। বলুন কী দোষ করেছিল এই ছেলেটি। এই ফাঁকে আরেকজন বলে ওঠে, মুসলিম বলেই কি এই অত্যাচার পুলিশ ম্যাডাম?
প্লিজ শান্ত হোন আপনারা। অপরাধীর কোনো ধর্ম হয় না। এই লাশটা তোলো এখান থেকে।
শিবাঙ্গী বলল। কিন্তু রাজারাম বুঝে গেছে ওরা শুনবে না। হলও তাই, বেশ কয়েকজন বুক চিতিয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল, একদম নয়। এই রাস্তাতেই লাশ পড়ে থাকবে। আমরা উত্তর চাই কেন একটা মুসলিম ছেলেকে এভাবে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হল।
.
রাজারাম টিভি বন্ধ করে বাড়িতে তালা মেরে তৎক্ষণাৎ বেরিয়ে পড়ে।
এঁদো গলি। যত রকমের ময়লা হয় সেই সব কিছু দিয়ে এই রাস্তা সাজানো। তার মধ্যেই বাচ্চাগুলো দৌড়ে বেড়াচ্ছে। মুসলিমপট্টি। একটা নির্দিষ্ট বিন্দুতে এসে গাড়িটা থেমে গেল। এখানেই দাঁড়াও।
আমি যাব স্যার?
না। দরকার হলে ডাকব।
জায়গাটা সুবিধের নয় স্যার।
জানি। তুমি আছ তো।
.
কথাটা হাসিমুখেই বলল স্বয়ম্ভু। ঠাট্টা নয়, অন্তর থেকেই বলল। আলোর শহরেও দিনেরবেলা যে এমন একখানা আঁধার মাথা গলি থাকতে পারে তা এই সেলিম কলোনিতে না এলে বোঝা দায়। কারও বাড়ি থেকে পাইপ বেরিয়ে স্বয়ম্ভুর মাথায় ঠেকছে। কোথাও বা গলির মাঝে সাতসকালের কম্ম সেরে মাছিদের খেতে দিয়ে গেছে। নাকে রুমাল দিয়ে সেই সব মনোরম দৃশ্য পার করে প্রাচীন এক বাড়ির সামনে এসে ধাক্কা খেল স্বয়ম্ভু। বড়ো বাড়ির কঙ্কালটা কোনোরকমে টিকে আছে। দরজার অর্ধবৃত্তাকার মাথার ইটগুলো যেন কঙ্কালের দাঁত। স্বয়ম্ভুকে দেখে খলখল করে হাসছে।
.
রাজারাম যখন হরিদেবপুর পৌঁছোল তখন আরও কিছু সাংবাদিকের ভিড় আর স্থানীয় মানুষের বিদ্রোহ উপচে পড়ছে। ছেলেটা অপরাধী ছিল তার প্রমাণ কী? শিবাঙ্গীকে ঘিরে ধরেছে সবাই। তার মধ্যে রয়েছে সুরঞ্জন। সেও যতটা পারছে লোক সরাবার বন্দোবস্ত করছে। অলরেডি আরও বড়ো ফোর্স পাঠাবার জন্য বলেছে। ভিড় ঠেলে কোনোরকমে শিবাঙ্গীর পাশে পৌঁছোয় রাজারাম। শিবাঙ্গী হতবাক। এ কি আপনি? আপনি এখানে কেন? রাজারাম শিবাঙ্গীর কোনো প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে চিৎকার করে বলতে শুরু করে, প্রমাণ আছে। প্রমাণ আমি দেব। কথাটা শুধু মুখ থেকে খসানোর অপেক্ষা। রিপোর্টারদের ক্যামেরা, বুম, মোবাইল সব ঘুরে গেল রাজারামের দিকে। ফ্রেমে শুধু শিবাঙ্গী আর রাজারাম। শিবাঙ্গী দাঁত চেপে বলে ওঠে, কী করছেন রাজারাম! এভাবে নিজেকে জড়াবেন না। রাজারাম আবারও পাত্তা না দিয়ে নিজের মোবাইলে রেকর্ড করা ভিডিয়ো সকলের সামনে চালিয়ে দেয়। মুহূর্তের জন্য স্তিমিত হয়ে আসে চিৎকার-হইহল্লা। যারা চুপ করছে না ভিড়ের মধ্যে থেকেই বেশ কিছু লোক তাদেরকে ধমকে চুপ করিয়ে দিল। ভিডিয়োতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে শিবাঙ্গীকে দুটো ছেলে কী পরিমাণ হেনস্থা করছে। রাজারাম সম্পূর্ণটা না দেখিয়েই মোবাইল বন্ধ করে দিয়ে বলে ওঠে, এবার নিশ্চয়ই প্রশ্ন করবেন আমি সেখানে কী করছিলাম? তাই সকলের জানার জন্য জানিয়ে রাখি আমি যেখানে থাকি সেখানেই এই ঘটনাটা ঘটে। আমি কাজ সেরে ফেরার পথে দেখি এই অবস্থা। এরপর…।
.
কথার শেষটা শিবাঙ্গী ধরে বলে ওঠে, এর পরেরটা এবার আমি বলি। এই মানুষটা না থাকলে কাল হয়তো এই দুটো জানোয়ারের হাত থেকে বাঁচতাম না। এই মানুষটা ভয়ংকরভাবে এই দুটো পশুর সঙ্গে লড়াই করে। এবার সাক্ষী পেলেন তো? আরও শুনুন, এই ছেলে দুটোকে কেউ বা কারা আমাকে মারার জন্য পাঠায়। সেইজন্যেই এদের ধরতে আসা। কিন্তু এদের কাছ থেকে যাতে আমরা কোনো তথ্য না পাই তাই আচমকাই লোকটাকে মেরে দিয়ে চলে গেল। ওসি সাহেব ধাওয়া করেন বাট কোনো ফল হয় না। আশা করি, আপনাদের সব উত্তর সব সাক্ষী দিতে পেরেছি। এবার প্লিজ…
.
একজন রিপোর্টার বলে ওঠে, আরেকজন কোথায়? তার হদিশ কি পেয়েছেন?
না। তার খোঁজ চলছে। খুব শিগগিরিই ধরতে পারব।
আপনারা তো এখন কথাকলি সরকারের নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ার তদন্ত করছেন। এই কেসের সঙ্গে আপনার ওপর হামলা হওয়ার কি কোনো যোগাযোগ আছে?
তদন্ত না করে জবাব দেওয়া সম্ভব নয়। এবার প্লিজ আমাদের কর্তব্য করতে দিন। এই লাশটা তোলার ব্যবস্থা করো।
মধ্যরাতে পুলিশের ওপর হামলা। শ্লীলতাহানির চেষ্টা। এ. কোথায় বাস করছি আমরা? যে শহরে পুলিশই সুরক্ষিত নয় সেখানে সাধারণ মানুষ কীভাবে….
.
সেই একই বুলি। শুনে শুনে মানুষের কান পচে গেল। আরও হাজারও বক্তৃতা হরিদেবপুরের বাতাসে ভাসতে লাগল। চারপাশে অজস্র কোলাহলের মধ্যে লাশটা চ্যাংদোলা করে নিয়ে গেল পুলিশের লোক। শিবাঙ্গীর চোখ পড়ল রাজারামের চোখে। রাজারামও শিবাঙ্গীর চোখে চোখ রেখে নিরুত্তর। কী দেখছেন? প্রশ্ন করল রাজারাম।
আপনি কোত্থেকে এলেন বলুন তো?
ভগবানরা যখন-তখন যেখানে-সেখানে যেতে পারে জানেন না? আগে এখান থেকে চলুন।
পুলিশের গাড়ির কাছে গিয়ে রাজারাম বলল, বাড়িতে কারও নিউজ দেখার নেশা আছে?
হ্যাঁ বাবা দেখে।
ব্যাস হয়ে গেল তাহলে।
কেন?
প্রশ্নটা করেই চোখ গোল করে কপাল চাপড়াবার ভঙ্গিমা করে শিবাঙ্গী।
.
লোকটার একটা চোখ নেই। মনে হচ্ছে কেউ যেন এক খাবলা ছাই ভরে দিয়েছে চোখের মধ্যে। বিছানায় বসেই দিনের অর্ধেকের বেশি সময় কাটে। লাল রঙের দাড়ি। গালের মাংস শুকিয়ে ঢুকে গেছে। দাড়িতে গালটা ভরাট। গলায় কালো তাবিজ। গায়ে বহুদিন না কাচা আধা ছেঁড়া ফতুয়া। সঙ্গে খয়েরি চেককাটা লুঙ্গি। তক্তাপোশের ওপর বসেই লোকটা বলল, আমি সবকুছ ছোড় দিয়েছি। আবার কেন ডিস্টাব করতে এলেন?
জ্বালাব না সেলিম। জাস্ট কয়েকটা প্রশ্ন।
অউর কুছ ভি আমি জানি না। আমার খবর কৌন হারামি দিল?
পুরোনো খবরের কাগজ। সোমেন সরকারের কেস। শিশু পাচার।
উস মাদারচোদ কা নাম ভি মেরে সামনে না লো। শালা ঢ্যামনার বাচ্চা।
কেন? একসময় আপনি ওর হয়ে অনেক কাজ করেছেন।
গলতি কোরেছি। বহুত গলতি কোরেছি। আজ ভি আল্লাতালা আমায় সাজা দিয়ে যাচ্ছে। উস হারামি কা বাতো মে আ কর… ছোড়ো, ছোড়ো উও সব বাত। আপ যাইয়ে। আপ চলে যাইয়ে।
আমার প্রশ্নের উত্তর না নিয়ে আমি তো যাব না সেলিম।
ঠান্ডা স্বরে হুমকি দেয় সেলিম, এএএ পুলিশবাবু। সোচ সমঝকর বাত কর। আমি চলতে পারি না বলে ভাববেন না সেলিম না-মর্দ বোনে গেছে। আভি ভি এক ডাক দেব তো লোক হাজির হয়ে যাবে।
একটা মেয়েকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না সেলিম।
বহুত আচ্ছা হুয়া। সেলিম দারুণ খুশ হয়েছে। শালা অনেক মা কা কোল খালি করিয়েছে। আজ ও বুঝছে। আল্লাতালা আছেন সাব। আল্লাতালা আছেন। শালা নিজে প্ল্যান করে পুরণকে ফাঁসাল। ও নাকি সব বাচ্চা চোরি করেছে। পর আমি তো জানি ওই সোমেন সরকার কিতনা হারামি। ওর কাছে মেয়ে, বউ কারও দাম আছে নাকি? সব উসকে পাস সির্ফ জেনানা। মেয়েছেলে। অউর কুছ নেহি।
যদি জানতেই সোমেন সরকার অন্যায় করছে তাহলে ওর দলে ভিড়েছিলে কেন? কেন ধরা পড়ার পর রাজসাক্ষী হওনি?
জুলজুল চোখে সেলিম তাকায় স্বয়ম্ভুর দিকে। ওই ছাইরঙা চোখটাও কেঁপে উঠল যেন। গলা কেঁপে গেল সেলিমের। বলল, আমি রাজসাক্ষী হলে আমার একমাত্র বেটি জারিয়াকে ওরা মেরে ফেলত। তাই ভয়ে মুখ খুলিনি। কিন্তু তাতে কী হল? বাপ জেলখাটা আসামি। কাগজে বড়ো বড়ো করে নাম বেরোল। অপমান নিতে পারল না। জেলে বসেই খবর পেলাম জারিয়া রেললাইনে…! কেঁদে ফেলল সেলিম। স্বয়ম্ভুর বুকটাও ভারী হল। কিন্তু আবেগে ভেসে যাওয়ার সময় এটা নয়। আসল কথাটা জানতেই হবে। গলা ঝেড়ে শান্ত স্বরে বলল স্বয়ম্ভু, যদি অন্যায় করেই থাকে তাহলে সেটা সোমেন সরকার করেছে। তার দায় আরেকটা মেয়ে কেন পাবে সেলিম? সেও তো তোমার বেটির বয়সি তাই না?
পাপ। পাপ। ও সোমেন সরকার জাহান্নমে যাবে।
সে সোমেন সরকার যাক না। কিন্তু তার মেয়ে কথাকলি কেন জাহান্নমে যাবে? তার কী দোষ?
সির্ফ সোমেন হি নহি সাব। উসকে পিছে অউর ভি কই হ্যায়।
কে?
মালুম নেহি।
সেলিমের মালুম নেই। এটা বিশ্বাস করতে হবে?
বিসওয়াস করুন বা না করুন। ইয়ে হি সচ হ্যায়। ইস লাইন মে কোই ভি উসকো চেনে না।
নাম জানো?
বস। ইসকে সিওয়া কোই পহেচানতা নেহি। শুধু এটা জানি কে সোমেন সরকার যা কাম করে তা সব ওর কথায়।
ফোন নম্বর?
কারও কারও কাছে আছে। কিন্তু দেয় না। লাশ পড়ে যাওয়ার ভয়ে।
বাদ দিন, আপনি বলুন তো অউর কী জানতে চান?
বেশ একটু ভাবনাচিন্তা করে প্রশ্ন করল সেলিম।
তুমি এই পাপের জগত থেকে সরে গেলেও তোমার সঙ্গে এখনও অনেক খোঁচড়ের ওঠাবসা। এই ঘরে বসে তুমি যা খবর রাখো আমরা সে খবর পাই না। কথাকলির ব্যাপারে তুমি কিছু জানো?
নেহি।
সত্যি কিচ্ছু জানো না?
আল্লা কসম।
বেশ। একটা কথা বলো সেলিম, তোমরা যখন বাচ্চা পাচার করতে তখন কোন কোন দেশে পাচার হত?
বাংলাদেশ, আসাম, ওড়িশা, নেপাল, মায়ানমার। ভুটানেও হয়েছিল কয়েকটা।
ভুটান? কার কাছে?
স্বয়ম্ভু যেন একটু বেশিই উত্তেজিত। সেলিম চোখ মুখ কুঁচকে জানাল, তখন তো শেরিং বলে একজন ছিল। এখন ওর ছেলেও এই কাম কোরে। নাম জানি না। তবে তারা আর বাচ্চা পাচার কোরে না।
তবে?
মেয়ে পাঁচার। এখোন অবশ্য পাচার বোলে না। সাপ্লাই বোলে। সাপ্লাই। ভুটানে বাচ্চাদের থেকে পনরা সে পঁচিশ সালকা লেড়কি কা কিমত জ্যাদা হ্যায়।
কদিন আগে একটা বেঙ্গলি ফ্যামিলি গায়েব হয়ে গেছে। মেয়েটির নাম ঈশিতা। খবর জানো?
ঈ-শি-তা! নেহি নেহি। ইস নামকা কোই লড়কি কা খবর নেহি হ্যায় মেরে পাস।
হতাশ হল স্বয়ম্ভু। একটা শ্বাস ফেলে সে বলল, তার মানে সোমেন কি এখন…! সেলিম আবারও ওপর নিচে ঘাড় নাড়ল।
কোথায়? লাস্ট কোথায় সাপ্লাই করেছে?
এত সব জানি না। মেয়ে সাপ্লাই কোরে এটা বলতে পারি।
আচ্ছা, তোমাদের সময়ে যারা ইঞ্জিওরড হত তাদের ট্রিটমেন্ট করত কোথায়? কোনো হসপিটালে নিশ্চয়ই নয়।
.
এক চোখ তুলে সেলিম হাসে। দাড়ি-গোঁফের ফাঁক দিয়ে এই প্রথম ওর লালচে ক্ষয়ে যাওয়া দাঁতগুলো দেখতে পায় স্বয়ম্ভু। যেন গোটা জাহান্নম ওর মুখের মধ্যে হাসছে।
মারুফ হোসেন?
নামটা সেলিমের মুখে শুনে চমকে ওঠে স্বয়ম্ভু। আজ সকালে শিবাঙ্গী এই নামটাই তো হোয়াটসঅ্যাপ করেছে। কিন্তু সেলিম জানল কীভাবে? কোথায় আছে সেলিম। প্লিজ বলো। সেলিম একটু যেন গুছিয়ে বসল। অনেকক্ষণ বসে আছে বলে পিঠে ব্যথা করছে। ঠোঁটের আগায় ছলনার হাসি নিয়ে সেলিম বলল, আমাদের লাইনে সবসময় পরিষ্কার কোরে কিছু বোলা হত না। কোনো গোপন ডেরার সন্ধান চাইলে ধাঁধা কোরে বোলা হত। আমার যে গুরু, মনসুর মিঞা। উও খুব ভালো ধাঁধা লিখত। বাংলা, উর্দু দুভাষাতেই লিখতে জানত। সেরকমই এক ধাঁধা দিচ্ছি। খোপরিতে বুদ্ধি থাকলে বুঝে নিন। চোখ বন্ধ করে ভেবে ভেবে সেলিম বলল…
ঘটি খায় বাটি ভরে
কিলায় নাই সেই পোকা,
দরগায় হাজি আলি
খোপড়িতে না ঢুকলে শালা বোকা।
.
এখন এমন সময় চলছে, যখন ধাঁধা নিয়ে শব্দছক খেলার সময় নেই। তবু স্বয়স্তু ভিতর থেকে দাঁতে দাঁত চেপে ধাঁধাটা আবার শুনতে চাইল। সেলিম রিপিট করল। স্বয়ম্ভু নিজের মনে আওড়াতে আওড়াতে মোবাইলে টাইপ করে নিল ছন্দবদ্ধ ধাঁধাটা। স্বয়ম্ভু প্রশ্ন করতে যায়। সেলিম বলে ওঠে, আর কিছু জিজ্ঞেস করবেন না স্যার। আপনি চলিয়ে যান।
কিন্তু সেলিম আমার যে…
আর কিছু আমি জানি না, আপনি চলিয়ে যান। প্লিজ। সেলিম যা বলার বলে দিয়েছে। খুদা হাফিজ।
.
স্বয়ম্ভু চুপ করে উঠে দাঁড়ায়। বলে, বেশ। এখন চলে যাচ্ছি। এরপর যদি প্রয়োজন হয় আবার আসব সেলিম। সেলিম হাসে। দরজার উলটোদিকে ঘরের দেয়ালে ঝোলানো ছোট্ট আয়নাটার দিকে তাকিয়ে সেলিম বলে, যদি আল্লাতালাহ জিন্দা রাখে তো ফিরসে বাতচিত জরুর হোবে। সেলিম দেখে কালো পোশাক পরা একটা লোক পা টিপে টিপে সরে গেল। সেলিম চুপ করে থাকল। স্বয়ম্ভু সবে বেরোতে যাবে সঙ্গে সঙ্গে সেলিম ডাকল, শুনিয়ে। ঘুরে তাকাল স্বয়ম্ভু। সেলিম মাথা ঘুরিয়ে অদ্ভুত রহস্যময় চোখ তুলে স্বয়ম্ভুকে বলল, আপনার পিছে জিন আছে। উও সবসময় আপনাকে দেখে। সম্ভলকর চলিয়ে গা। কথাটা স্বয়ম্ভুকে কয়েক সেকেন্ডের জন্য মাটি আঁকড়ে দাঁড় করিয়ে রাখল।
.
গাড়িতে চাপতে না চাপতেই ড্রাইভার সঞ্জয় সাংঘাতিক উত্তেজিত হয়ে বলে উঠল, স্যার, খবর দেখেছেন? মনের মধ্যে ধাঁধাটাই ঘুরপাক খাচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ এমন প্রশ্ন করাতে ব্যোমকেই গেল স্বয়ম্ভু। না। কেন কী হয়েছে?
ম্যাডাম তো সাংঘাতিক ঝামেলায় ফেঁসে গিয়েছে।
শিবাঙ্গী?
হ্যাঁ স্যার এই দেখুন
বলে নিজের মোবাইলটা এগিয়ে দিল। সেখানে একটা নিউজ পোর্টালে সকালের খবরটা রসিয়ে রসিয়ে চলছে। রাজারামকেও দেখতে পেল স্বয়ম্ভু। খবরটা দেখে মোবাইলটা সঞ্জয়কে এগিয়ে দিয়ে বলল, এসপ্ল্যানেড চলো। সঞ্জয় গাড়ি স্টার্ট দিল। স্বয়ম্ভু শিবাঙ্গীর ফোন নম্বর ডায়াল করার আগেই একটা আননোন নম্বর থেকে ফোন। ছড়িয়ে থাকা অজস্র জটের মাঝে একটা সুতো পেল স্বয়ম্ভু। খবর এল, ঝালংয়ে যে গাড়িটা নদীগর্ভ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে তার ইঞ্জিন ও চেসিস নম্বরটি সোমেন সরকারের নামেই রেজিস্টার্ড। কিন্তু নম্বর প্লেট মিলছে না। স্বয়স্তু চোখ বুজে বলল, ওটা নকল। আসলটা গায়েব।
.
পরিবহণ ভবনে রিজিওনাল ম্যানেজারের ঘর। সুপ্রতিম সিনহা হাসিমুখে স্বয়ম্ভুকে স্বাগতম জানাল। হঠাৎ পরিবহন ভবনে ডিটেকটিভের আগমন! কিছু হয়েছে?
মরা না পড়লে কি শকুন আসে স্যার?
হো-হো করে হেসে উঠল সুপ্রতিম। লোকটির বয়স পঁয়তাল্লিশ থেকে পঞ্চাশের মধ্যে। মাথায় খুব পাতলা চুলের আস্তরণ। তুলনায় বড়ো জুলপি। ওপরের ঠোঁটে একটা কাটা দাগ। গায়ের রং উজ্জ্বল কালো। পরনে চেক কাটা সাদা শার্ট। কোমর থেকে পা দুটো টেবিলের নিচে থাকায় নিম্নাঙ্গের পোশাকটা দেখতে পায়নি স্বয়ম্ভু। চেহারা ভালো। সুপ্রতিম বলল, বলুন কী সেবা করতে পারি?
গত নয়ই আগস্ট একটি ব্যালেনো জোকা থেকে স্টার্ট করে ঝালং যায়। এই রাস্তায় যে কটা টোল প্লাজা পড়েছে প্রতিটার সিসিটিভি ফুটেজ চাই।
ওয়েট ওয়েট। এটা কি সেই ব্যালেনোটা যেটা জলঢাকা থেকে উদ্ধার হয়েছে?
কারেক্ট।
নিউজে দেখছিলাম। সোমেন সরকারের?
সেরকমই সন্দেহ। গাড়ির নম্বর প্লেটটা আলাদা। কিন্তু চেসিস নম্বর আর ইঞ্জিন সোমেন সরকারের নামেই আছে।
তাহলে তো দুটো নম্বর লাগবে সার্চ করতে।
আমি দুটোই প্রোভাইড করে দিচ্ছি। তবে মনে হচ্ছে কলকাতা বা কলকাতার আশেপাশে কোথাও এটা চেঞ্জ হয়নি। একটু আউটস্কার্টে গিয়ে কেসটা হয়েছে।
ড্রাইভারের লাইসেন্স পাওয়া যায়নি?
না স্যার। ওটাই তো আসল ব্যাপার। গাড়িটা যদি অ্যাক্সিডেন্টালি খাদে পড়ত তাহলে ড্রাইভারের বডির সঙ্গে সব ডকুমেন্ট পাওয়া যেত। ড্রাইভার যদি ভেসেও যায় জলের তোড়ে ওই লাইসেন্সগুলো তো আর ভেসে যান না? কারণ ড্যাশবোর্ডে তালা দেওয়া ছিল। আর সেখানে কোনো কাগজপত্র কিচ্ছু নেই।
হুম। ওকে। আমি সব ফুটেজ আনিয়ে চেক করাচ্ছি। তবে ইটস টাইম টেকিং জব।
জানি। তবু যত তাড়াতাড়ি করানো যায় একটু প্লিজ দেখুন।
শিয়োর স্বয়ম্ভু।
থ্যাংক ইউ সো মাচ।
সুপ্রতিমের চেম্বার ছেড়ে বেরিয়ে গেল স্বয়ম্ভু। সুপ্রতিম ফোনটা তুলে বলল, অর্জুন, একবার চেম্বারে এসো তো।
.
স্বয়ম্ভু যখন লালবাড়িটায় পা রাখল তখন শিবাঙ্গী ফোনে কার সঙ্গে যেন কথা বলছে। কাছে যেতেই বুঝল ফোনের ওপারে রয়েছে তার মা। ওফ মা আমি তো বলছি আমি একদম ঠিক আছি। আমার কিচ্ছু হয়নি।… বললে কী করতে তুমি বলো তো? গুচ্ছের টেনশন করে প্রেশার বাড়িয়ে আমার চিন্তা বাড়াতে।… আরে বাবা না না। দেখলে তো ছেলেটাকে। ওই ছেলেটাই আমায় বাঁচিয়েছে। আজকেও তো বাঁচাল।
.
স্বয়ম্ভু নিজের জায়গায় বসে ধাঁধাটার সমাধান করতে চাইছিল। রাজারামের কথা উঠতেই টুক করে চোখ তুলে শিবাঙ্গীর দিকে চাইল। ছেলেটার কথা বলতেই শিবাঙ্গীর মুখে কেমন যেন পরিবর্তন লক্ষ করল স্বয়ম্ভু। এতক্ষণ দিব্যি মাকে বেশ জোরের সঙ্গেই উত্তর দিচ্ছিল। ছেলেটার কথা ঠোঁটের আগায় আসতেই স্বর যেন নরম হয়ে গেল। কাঠের চেয়ারে ডান হাতের তর্জনীর নখ ঘষতে ঘষতে শিবাঙ্গী বলল, রাজারাম, রাজারাম ব্যানার্জি! স্বয়ম্ভু ফোঁস করে একটা শ্বাস ফেলে নড়েচড়ে বসল। হঠাৎ শিবাঙ্গী থ্যাঁক খ্যাঁক করে উঠল, হ্যাঁ বামুন। তো? বামুন, কায়স্থ নিয়ে তোমার কী হবে? রাখো মা, এখন আমার অনেক কাজ আছে। রাখছি। আর শোনো শোনো, প্রেশারের ওষুধটা খেয়ো কিন্তু। বলেই আড়চোখে স্বয়ম্ভুর দিকে চেয়ে নিল। কাকতালীয়ভাবে ঠিক সেই সময় স্বয়ম্ভুও তাকাতে শিবাঙ্গী লজ্জায় পড়ল। আসলে আগের কেসটার সময় লালবাজারের ক্যান্টিনে বসে শিবাজী মায়ের ফোনটা কেটেই গজগজ করে উঠেছিল, মা না, প্রশ্ন খুঁজে পায় না। মাছটা টাটকা তো?
স্বয়ম্ভু জিজ্ঞেস করেছিল, কাকিমা খেয়েছেন?
অ্যাঁ?
আচমকা প্রশ্নটা ধেয়ে আসাতে একটু হকচকিয়ে গিয়েছিল শিবাঙ্গী। স্বয়ম্ভু আবার বলেছিল, কাকিমা লাঞ্চ করেছেন? তোতলাল শিবাঙ্গী। জানি, বোধহয় খেয়েছে।
কাকিমার প্রেশার আছে না?
হ্যাঁ।
প্রেশারের ওষুধ খেয়েছেন?
হ্যাঁ, মা তো এই সময়েই খায়। খেয়েছে বোধহয়। জিজ্ঞেস করিনি।
অথচ কাকিমা তোমায় জিজ্ঞেস করলেন যে তুমি যে মাছটা খাচ্ছ সেটা টাটকা না বাসি।
হ্যাঁ, মানে…
স্বয়ম্ভু ঠোঁট চওড়া করে হেসে বলল, খাও।
.
শিবাঙ্গী মোবাইলটা কান থেকে সরাতেই স্বয়ম্ভু বেশ শক্ত গলাতে বলল, এবার থেকে ফোন এলে বাইরে গিয়ে কথা বোলো শিবাঙ্গী। আমার কাজের অসুবিধে হয়। স্বয়ম্ভুর কথা কখনোই ট্যাঁড়াব্যাঁকা পথে শিবাঙ্গীর কানে পৌঁছায়নি। যা বলেছে সব সোজাসুজি। কিন্তু এখনকার কথাগুলোর মধ্যে কিছুটা শ্লেষ লুকিয়ে থাকার গন্ধ পেল শিবাঙ্গী।
ছেলেটার লাশ পোস্ট-মর্টেমে গেছে?
নিজের মোবাইলের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল স্বয়ম্ভু।
ইয়েস স্যার।
জবাব দিল শিবাঙ্গী।
মারুফের খোঁজ পেয়েছ?
না স্যার।
একটা ধাঁধা দিচ্ছি, সমাধান কর। হোয়াটসঅ্যাপ করেছি।
ধাঁধা!
.
বিড়বিড় করল শিবাঙ্গী। সেলিমের ধাঁধাটা পড়ল। এর মানে কী? শিবাঙ্গী প্রশ্ন করল।
সেটা জানলে তোমায় দেব কেন? ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টে আছ যখন মগজটা খাটাও।
স্বয়ম্ভুর কথাগুলো প্রতিক্ষণে যেন বড্ড কড়া হয়ে যাচ্ছে। শিবাঙ্গীকে আঘাত করার অভিপ্রায়েই কি এই আচরণ? কিন্তু কেন? শিবাঙ্গী ধাঁধায় মনোনিবেশ করল। মোবাইল বেজে উঠল স্বয়ম্ভুর।
হ্যালো।… কে?… ছেড়ে দিয়েছ?… বেশ করেছ।
.
ফোনটা কেটে টেবিলে রাখতেই ঠক করে শব্দ হল। শিবাঙ্গী লক্ষ করল স্বয়ম্ভুর মধ্যে একটা অস্থিরতা বেড়েছে। চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ল। অন্য সময় হলে কোনো খবর এলেই শিবাঙ্গীকে জানায়। তারপর দুজনে মিলে প্ল্যান করে অ্যাকশনে নামে। কিন্তু এখন খবরটাই জানাল না। তাও প্রশ্ন করল শিবাঙ্গী, কী হল স্যার? কোনো খবর? স্বয়ম্ভু একটু থেমে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, হুম। আমায় বেরোতে হবে। স্বয়ম্ভুর এক পা তখন দরজার বাইরে চলে গেছে, লজ্জার মাথা খেয়ে প্রশ্ন করল শিবাঙ্গী, আমি যাব না স্যার?
প্রয়োজন নেই। ধাঁধাটা সমাধান করে রাখো।
মন্দ্রস্বরে জবাব দিয়ে জুতোয় ঠক ঠক আওয়াজ তুলে ঘর ছাড়ল স্বয়ম্ভু। করিডোর দিয়ে যেতে যেতেই মেজাজটা তেতো হয়ে উঠল। রাগ হচ্ছে। কেন? শিবাঙ্গীর সঙ্গে এইভাবে কথা বলল বলে? এমন করে সত্যিই তো কোনোদিন বলেনি স্বয়ম্ভু। কাল অত বড়ো একটা ফাঁড়া গেল মেয়েটার ওপর দিয়ে। অথচ সেসব কিছুকে তোয়াক্কা না করে নিজের কাজ করে চলেছে। যতই পুলিশ হোক, মেয়েমানুষ তো। এই জায়গায় অন্য মেয়ে থাকলে এতক্ষণে মরমে মরে ঘরের দরজায় খিল দিত। সেখানে নিজেই সে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। অমনি স্বয়ম্ভুর আরেকটা মন বলে ওঠে, ঘুরে না দাঁড়ানোর কী আছে? সঙ্গে আছে তো, রাজারাম। শিবাঙ্গীর জীবনের নতুন নায়ক। কে এই রাজারাম? এত যে ভরসা করছে শিবাঙ্গী ঠিক করে চেনে ছেলেটাকে? কোথায় থাকে? ব্যাস, এই কথাগুলো মনে হতেই মনের মাঝারে থিতিয়ে যাওয়া জ্বালাপোড়াটা আরও দ্বিগুণ হয়ে উঠল। দুঃসাহসী হয়ে উঠল স্বয়ম্ভু। সোজা শুভঙ্কর কাঞ্জিলালের ঘর। আজ যা বলার বলতেই হবে। এইভাবে খেলার পুতুলের মতো নিজেকে ব্যবহার করতে দেবে না স্বয়ম্ভু সেন।
তুমি কি আমার কাছ থেকে কৈফিয়ত চাইছ স্বয়ম্ভু?
জয়েন্ট কমিশনার অফ পুলিশ শুভঙ্কর কাঞ্জিলাল বাঘের মতো পালটা প্রশ্ন করল।
কৈফিয়ত নয়। জানতে চাইছি স্যার।
তার আগে তুমি বলো, কার পারমিশনে নার্সিং হোমে পুলিশি পাহারা বসিয়েছ?
স্যার, আমি জানতাম গোয়েন্দা হিসেবে এই অধিকারটুকু আমার গ্রহে। বিশেষ করে যেখানে একটা বাচ্চা মেয়ের প্রাণের ঝুঁকি আছে।
প্রাণের ঝুঁকি? মানে তুমি বলতে চাইছ নার্সিং হোমে গিয়ে কেউ…
ইয়েস স্যার। নাইন্টি নাইন পারসেন্ট চান্স।
কীসের ভিত্তিতে বলছ স্বয়ম্ভু?
গলা চড়ছে শুভঙ্করের। বুক চিতিয়ে জবাব দিল স্বয়ম্ভু, মেঘা নন্দীর ল্যাপটপ, হার্ড ড্রাইভ আর ফোনের ভিত্তিতে।
মানে?
ল্যাপটপ আর হার্ডড্রাইভ মিলিয়ে সোমেন সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্বপন নন্দীর লেখা সবকটা রিপোর্ট পাওয়া গেছে। সেগুলো যদি এই মুহূর্তে মিডিয়ার সামনে আবার চলে আসে তাহলে সোমেন সরকারকে কোনো সরকারই বাঁচাতে পারবে না। পাশাপাশি মেঘা নন্দীর ফোনের মেমরি কার্ড ফরম্যাট করা হয়েছে। একটা ছবিও নেই এবং এই কাজটা করা হয়েছে যাদবপুর থানায়। কারণ বাড়ির কেউ ফোনের লক খুলতে পারে না। আর পারলেও তারা অসুস্থ মেয়ের ফোন থেকে কেন সব ডিলিট করতে যাবে? তার থেকেও বড়ো কথা, স্বপন নন্দীর বডি যেদিন তার বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয় সেই মুহূর্তে স্বপনবাবুর বাড়ির দোতলার স্টাডি রুম থেকে ঠিক এই কাগজগুলোই চুরি হয়ে যায়। কীভাবে স্যার? কেন?
কে বলেছে তোমায় এসব কথা?
স্বপন নন্দীর স্ত্রী মধুজা নন্দী। এমনকী ওর বাড়ির সামনে বেশ কিছু ছেলে পাহারা দিচ্ছে। নজর রাখছে চব্বিশ ঘণ্টা। পুলিশের লোক তো তারা নয়। তাহলে তারা কারা?
.
এবার একটু যেন অস্বস্তির মুখে শুভঙ্কর। তুমি কি নিজের চোখে দেখেছ পাহারা বসেছে? স্বয়ম্ভু উত্তর দেয় না। চুপ করে শুভঙ্করের চোখে চোখ রেখে মুচকি হাসে। বিরক্ত হয় শুভঙ্কর। স্বয়ম্ভু বলে, দেখেছি স্যার। শুধু আপনার খোঁচড় আমায় দেখেও, আমার সঙ্গে কথা বলেও আমায় চিনতে পারেনি।
কী?
শুভঙ্কর হতভম্ব! জুনিয়রের সামনে এমন জড়ত্ব কখনও অনুভব করেনি সে। কিন্তু চুপ করে গেলে ছোটো হয়ে যেতে হবে। সেটা হতে দিলে এত বড়ো পদের অপমান।
তুমি… তুমি তোমার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছ স্বয়ম্ভু। এখন আমাকে সন্দেহ করছ?
স্বয়ম্ভু পকেট থেকে একটা খাম বের করে শুভঙ্করের সামনে ধরে
কী এটা?
দেখুন না স্যার। চিনতে পারবেন।
.
খামটা খুলতেই শুভঙ্কর তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠে। হাউ ডেয়ার ইউ স্বয়ম্ভু? নিজেকে কী ভাবো তুমি?
পাবলিক সার্ভেন্ট। সরকার বা আমার ডিপার্টমেন্ট যদি এই কেস থেকে আমায় সরিয়ে দেয় তাহলে মিডিয়া কেসটাকে ঘুরিয়ে দেবে স্যার। ওরা বলবে, স্বয়ম্ভু সেন কেঁচো খুঁড়তে কেউটে বের করে ফেলছিল বলে তাকে সরিয়ে দেওয়া হল। জানেনই তো স্যার, মিডিয়ার কাজটাই ওটা। তিল থেকে তাল করা।
.
সিপির ঘরে কয়েক পলক শুধু এসির যান্ত্রিক শব্দ। উভয়পক্ষই নীরব স্বয়স্তুই নীরবতা ভাঙল, স্যার, নর্থ বেঙ্গলের ঝালংয়ে যে গাড়িটা নদীগর্ভ থেকে উদ্ধার হয়েছে সেটার নম্বর প্লেটের সঙ্গে সোমেন সরকারের মেয়ে কথাকলি সরকারের গাড়ির কোনো মিল নেই। তবে, সেই গাড়িটার ইঞ্জিন আর চেসিস নম্বর সোমেন সরকারের নামেই রেজিস্টার্ড করা। অতএব, নম্বর প্লেটটা যে নকল সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। আর এটা অলরেডি নর্থ বেঙ্গলের মিডিয়াগুলো কভার করছে। ওখানকার পুলিশই বাইট দিয়েছে। এবার তো সোমেন সরকারকে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবেই স্যার। প্রয়োজনে তাদের বাড়ির লোককেও। অবশ্য যদি আপনি পারমিশন দেন তবেই।
.
স্বয়ম্ভুর শেষ কথাগুলো এক্কেবারে মারণবাণের মতো গিয়ে শুভঙ্করের বুকে বিঁধল। শুভঙ্কর বলতে বাধ্য হল, গো অ্যাহেড!
থ্যাংক ইউ স্যার।
.
স্যালুট ঠুকে স্বয়ম্ভু ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। রক্তবর্ণ চক্ষু আর ইস্পাত কঠিন চোয়াল নিয়ে হাতে ধরা ছবিগুলোতে আরও একবার চোখ রাখল কমিশনার অফ পুলিশ শুভঙ্কর কাঞ্জিলাল। ছবিগুলো রাতের বেলা তোলা হলেও ছবিতে শুভঙ্কর আর সোমেন সরকার হাতে হাত মেলাচ্ছে আর এদের দুজনের মাঝে দাঁড়িয়ে সেই লোকটা, যে স্বপন নন্দীর বাড়িতে ঢোকার আগে বৃদ্ধের ছদ্মবেশে থাকা স্বয়ম্ভুকে আটকেছিল। ঠান্ডা ঘরে বসেও শুভঙ্করের কানের পাশ দিয়ে ঘামের রেখা চুপিচুপি নেমে এল গলা পর্যন্ত।
খারাপ লাগে। খুব খারাপ লাগে। নিজের সন্তানকে এভাবে দেখা যেকোনো মা-বাবার জন্যই অভিশাপ।
মেঘার বিছানার পাশে বসে বসেই বিলাপ করে সোমেন সরকার। শাড়ির আঁচলটা গায়ে জড়িয়ে চুপ করে মেয়ের পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে কথাগুলো হজম করল স্বপন নন্দীর বিধবা স্ত্রী মধুজা নন্দী। বুক ফাটলেও মুখ ফুটল না। শুধু চোখের সাদা অংশটা টলটল করতে লাগল। ভিতর-ভিতর লাল হয়ে উঠল।
.
তাও তো আপনি আপনার মেয়েটাকে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছেন। দুদিন বাদে বাড়িও নিয়ে যাবেন। কিন্তু আমার কথাকলি! সে কোথায়? কীভাবে আছে? কিচ্ছু জানি না। জানেন মিসেস নন্দী, একটু আগেই খবর পেলাম। আমার মেয়ের গাড়িটা নাকি নর্থ বেঙ্গলে একটা নদীতে পাওয়া গেছে। বিশাল খাদের নিচে গাড়িটা তলিয়ে ছিল। আমার মেয়েটা হয়তো আরও নিচে তলিয়ে গেছে। যাক গে, নিজের দুঃখ এভাবে বলাটা ঠিক নয়।
.
গা ঝাড়া দিয়ে উঠল সোমেন সরকার। একটা কথা কী জানেন…. আবার বলতে শুরু করল সোমেন, আমাদের সবসময় একটা নিজস্ব গণ্ডির মধ্যে থাকা উচিত। কিন্তু আমরা সেটা করি না। প্রতি মুহূর্তে চাই আগের মুহূর্তটাকে ছাপিয়ে যেতে। ওই হিন্দিতে বলে না, আপনি অকাত মে রহো।
.
মধুজার চোখের পাতাটা চাবুকের মতো উঠে সোমেনের দৃষ্টিকে চ্যালেঞ্জ করল। সোমেন কিন্তু নির্বিকার। সে বলে চলল তার কথা, আমরা সেটাই ভুলে যাই। এই যে দেখুন না, স্বপনবাবু তো রোজই গাড়ি চালাতেন। সেদিনও তিনি চালাচ্ছিলেন। কিন্তু ভুলটা হয়েছিল ওই স্পিডে। ফাঁকা রাস্তা পেয়ে হুহু করে আশি-নব্বইতে গাড়ি তুলে দিলেন। পুলিশই বলল। আরে বাবা গাড়িতে মেয়েটা আছে সেটা তো ভাববেন। ওই, গণ্ডি ছাপিয়ে যাওয়ার নেশা। যাক গে, যে মানুষটা চলে গেছেন আজ আর তার কথা বলে লাভ নেই। খারাপ লাগছে শুধু মেয়েটার জন্য। বেচারি। বাবার লেখার কত বড়ো ফ্যান ছিল। ওর বাবাই ওর জীবনে আইডল ছিল না?
.
হঠাৎ করে প্রশ্নটা যে ধেয়ে যাবে মধুজা বুঝতে পারেনি। তবু অপ্রস্তুত
না হয়ে নিচু স্বরে উত্তর দিল, ছিল না, এখনও আছে।
ঠিক ঠিক ঠিক। ফেসবুক খুললেই তো ওর বাবার লেখায় ভরতি। এट ভালো লাগে দেখে।
আপনি কি আমার মেয়ের প্রোফাইল ফলো করেন?
অ্যাঁ? না না আমার সময় কোথায়? ওই খবরে দেখাচ্ছিল। বলছি মেঘার ল্যাপটপ, হার্ডড্রাইভ এগুলো একটু যত্ন করে রেখেছেন তো? কারণ ও নিশ্চয়ই ওখানেই সব গুছিয়ে রেখেছে। ওর বাবার স্মৃতি বলে কথা।
অজস্র নলে সাজানো নিস্তেজ মেয়েটার দিকে তাকিয়ে মধুজা দৃঢ় কণ্ঠে বলে, এই ঘরে আর কথা বলাটা বোধহয় উচিত নয়। বলেই ভদ্রতা করে হাতজোড় করে। এবার সোমেনের বুক ফাটল, কিন্তু মুখ ফুটল না। সেও প্রতিনমস্কার জানিয়ে ঘর ছাড়ল। বাইরে যেতেই তাকে পাহারাদার এক পুলিশ জানাল, বাইরে সব রেডি আছে স্যার। আপনি গেলেই স্টার্ট করবে।
.
সোমেন সরকার নার্সিং হোমের বাইরে যেতেই টিভি-খবরের কাগজের হাজারও মিডিয়া ছেঁকে ধরল। স্যার স্যার, আজ পাঁচদিন হয়ে গেল আপনার মেয়েকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এইমাত্র খবর পেয়েছি উত্তরবঙ্গের নদীগর্ভ থেকে আপনার মেয়ের গাড়ি পাওয়া গেছে। কিন্তু এই অবস্থাতেও আপনি মেঘা নন্দীকে দেখতে এসেছেন? সোমেন শান্ত গলায় উত্তর দিল, মেঘা আমার কথাকলির বন্ধু। তারা একই কলেজে পড়ে। তার মানে তো মেঘা আমারই মেয়ে। তার এই দুঃসময়ে তাকে দেখতে আসব না? এ হয় নাকি?
কিন্তু আপনার মেয়ে এখনও নিখোঁজ। পুলিশ কি এ ব্যাপারে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে না?
একদম না। প্রশাসনের ওপর আমার পূর্ণ আস্থা আছে। নইলে এই গাড়িটাও পাওয়া যেত না। কে জানে, হয়তো আমার মেয়েটাও তলিয়ে গেছে।
.
কথার ফাঁকেই চোখের কোল ছাপিয়ে জল এল সোমেনের। ক্যামেরাতে ধরা পড়ল এক অসহায় এম.এল.এ-র ছবি। চোখের জল মুছে সোমেন বলল, আমি জানি, কথাকলিকে যে বা যারা অপহরণ করেছে তারা খুব শিগগিরই ধরা পড়বে।
আপনি শিয়োর এটা অপহরণ?
এই মুহূর্তে একশো শতাংশ। নইলে গাড়ির নম্বর প্লেট পালটাবে কেন? তা ছাড়া আমার মেয়ে পালাবেই বা কেন? তার অভাব কীসের? যাক গে, মেঘা তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরুক এই কামনাই করি। স্বপনবাবুকেও যদি ফেরাতে পারতাম তাহলে বোধহয় শান্তি পেতাম।
ট্রাকচালক কি ধরা পড়েছে?
এখনও না। তবে আমি তাকে ধরেই ছাড়ব। আর মেঘার সুস্থ হওয়ার জন্য যত টাকা লাগে আমি দেব। আমার মেয়েটাকে তো ফেরাতে পারলাম মা। অন্তত আরেকটা মেয়ে ফিরুক।
কথাটা বলেই চোখ মুছতে মুহুতে চলে যাচ্ছিল সোমেন। ঠিক সেই মুহূর্তে আরেকজন সাংবাদিক একটা চকলেট বোম ছুড়ে দিল, স্যার স্যার, মেঘার বাবা তো আপনাকে নোংরা একটি কেসের সঙ্গে জড়িয়ে রিপোর্ট করেছিল…
চুপ করুন। প্লিজ চুপ করুন। পুরোনো কাদা না ঘাঁটলে কি আপনাদের টি আর পি ওঠে না? বিশেষ করে যিনি চলে গেছেন তার সম্পর্কে আর কোনো কেচ্ছা করবেন না। অনেক মানুষেরই অনেক সময়ে নানানরকম অ্যাসাইনমেন্ট থাকে তার কর্মস্থলে নিজের গুরুত্ব আরও বাড়ানোর জন্য। তিনিও তখন তাই করেছিলেন। এই যেমন এক্ষুনি আপনি করছিলেন। আমি নিশ্চিত, এই কাজগুলো আপনারা সবাই নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে করেন। আফটার অল সবাইকেই তো সংসার চালাতে হয়।
.
বলেই গাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল সোমেন। আরও অজস্র সাংবাদিক ডাকতে লাগল। কিন্তু সোমেন সাড়া দিল না। গাড়িতে উঠে বেরিয়ে গেল।
.
নিচের ড্রয়িং রুমে বসে ঈশ্বর, মতি, ভূপেন খবর দেখছে। ভূপেনের মুখ শান্ত। মতির চোখে ভয়। ঈশ্বর যেন পাথরের মূর্তি। ওর মনের রিফ্লেকশন মুখে পড়ে না। রিপোর্টাররা সোমেন সরকারের নামে ধন্য ধন্য করছে। নিজের মেয়ে নিখোঁজ থাকা সত্ত্বেও পরের মেয়ের খোঁজ নিতে এসেছেন। কত মহান। আজকের সমাজের এমন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বই দরকার।
.
দরজায় বেল বাজল। মতি দৌড়ে গেল। দরজা খুলতেই স্বয়ম্ভু। ভূপেন সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। আসুন বলার অপেক্ষাও করল না স্বয়ম্ভু। নবাবি চালে প্রবেশ করল বাড়িতে।
এ কি আপনি?
জানি আসার কথা ছিল না। তবুও এলাম। ওপরওয়ালার পারমিশন নিয়েই।
পাঁচদিন হয়ে গেল এখনও মেয়েটাকে উদ্ধার করতে পারলেন না। এদিকে জলঢাকায় মেয়েটার গাড়ি উদ্ধার হয়েছে। সেগুলো দেখুন। তা নয়, খালি দফায় দফায় প্রশ্নমালা সাজিয়ে আনছেন।
এম.এল.এ-র মেয়ে নিখোঁজ বলে কথা। প্রশ্নমালা তো বড়ো হবেই। এ কি যার তার ঘরের মেয়ে যে একটা দুটো প্রশ্ন করেই ছেড়ে দেব! যাক গে, যা বলছিলাম, কথাকলি যে ব্যালেনোটা ড্রাইভ করত তার চাবি কার কার কাছে থাকত?
কথার কাছেই।
বেশ। বুধবার সকালে মালি ভগবান দাস কথাকলিকে বেরোতে দেখেছে সাড়ে দশটা এগারোটা নাগাদ। ওদিকে আবার প্রায় একই সময়ে ঈশিতা আর তার পরিবারকে বুধবার সকালেই কথার ব্যালেনো পাহাড়ে নিয়ে গেল! অদ্ভুত না ব্যাপারটা?
মানে? ঈশিতা পাহাড়ে! কী বলছেন?
দেখেছেন তো। এই জন্য বলে বাড়ির মালিকের সঙ্গে কথা বলা বেটার। আপনি তো আবার এখানে থাকেনই না। যদিও তিনদিন এসেই আমি আপনাকে এখানেই পেলাম। যাই হোক, মালিক যখন নেই তখন মালকিনের সঙ্গে দেখা করাটা জরুরি। কোথায় কস্তুরী ম্যাডাম?
ওনার শরীর খারাপ। কথা বলতে পারবেন না।
সেটা আমি নিজের চোখে দেখব।
বলেই ওপরের সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। ভূপেন বাধা দিয়ে বলে উঠল, উনি ঠাকুরঘরে বাইরের কাউকে অ্যালাও করেন না।
সেটাও আমি বুঝে নেব।
.
স্বয়ম্ভু বারণ না শুনে সোজা ঠাকুরঘরের সামনে গিয়ে দেখল ঠিক প্রথম দিনের মতো কস্তুরী তার ইষ্ট কৃষ্ণের দিকে একভাবে তাকিয়ে বসে আছে। পিছন থেকেই বোঝা যাচ্ছে, কস্তুরী এই কদিনেই কৃষ্ণকায় হয়ে গেছে। একটু আসছি ম্যাডাম। বলেই ঢুকে এসে কস্তুরীর থেকে দু-হাত দূরত্বে হাঁটু মুড়ে বসল স্বয়ম্ভু। কিছুক্ষণ চুপ করে রইল দুজনেই। তারপর স্বয়ম্ভুই জিজ্ঞেস করল, আপনার মেয়ের গাড়িটা পাওয়া গেছে। কস্তুরীর ধ্যানদশা যেন ভাঙল। একটু নড়ে উঠল।
নর্থ বেঙ্গলের জলঢাকা রিভার থেকে।
কস্তুরীর মধ্যে আর কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। স্বয়ম্ভু তাও বলে চলল, আমার কাছ থেকে আপনার কি কিছুই জানার নেই?
আপনাকে তো বলেইছি, সব আমার কৃষ্ণ জানে।
সম্ভাবনাহীন স্বরে জানাল কস্তুরী। আবারও সেই কৃষ্ণভক্তি। অতি ভক্তি জিনিসটা বরাবরই সন্দেহজনক। স্বয়ম্ভু বলল, বুঝলাম। আপনি আজকের যুগের মীরা। ভালো। মীরা কখনও কৃষ্ণকে সাক্ষী রেখে মিথ্যে বলেনি জানেন তো সেটা? এবারে কস্তুরীর মুখে কিছুটা পরিবর্তন এল। বলল, কীসের মিথ্যে?
ঈশিতার কাছে আপনার ফোন থেকে কোনো ফোন যায়নি লাস্ট সাতদিনে। অথচ আপনার ফোনে ঈশিতার নম্বর সেভ করা আছে। আগের দিন আপনি নিজের মুখে আপনার ঠাকুরের সামনে বললেন আপনি নাকি ঈশিতাকে ফোন করেছেন এবং সে নাকি বলেছে পার্টিতে সে যায়নি। অথচ ঈশিতা পার্টিতে গিয়েছিল। আমাদের কাছে প্রমাণ আছে।
আমার ঠাকুর আমার মুখ দিয়ে যা বলিয়েছে তাই আমি বলেছি। সত্য- মিথ্যা জানি না।
এটা কথার মারপ্যাঁচ খেলার সময় নয় মিসেস সরকার। প্লিজ, আপনার মেয়েকে খুঁজতে যত দেরি হবে তত তার বিপদ বাড়বে।
সবই বিপদতারণের চরণে সমর্পিত। তিনিই বিপদ বাঁধান। আবার তিনিই বিপদভঞ্জন করেন।
উফফ!
শব্দটা খুব আস্তে স্বয়ম্ভুর মুখ দিয়ে বেরোলেও মনের ভিতর ঝনঝন করে উঠল বিরক্তির হুংকার!
বউদি, ওষুধ খাবার সময় হয়েছে।
ঈশ্বর এসে দাঁড়িয়েছে ওষুধ হাতে।
দূর হয়ে যা এখান থেকে। চলে যা। কেন আমায় বাঁচাতে চাস তোরা? গমগমে স্বরে খেপে উঠলেও কস্তুরীর কণ্ঠস্বর কিন্তু মাত্রা ছাড়াল না।
আপনি ওষুধ না খেলে দাদা আমায় তাড়িয়ে দেবে।
ঝংকার দিয়ে উঠে দাঁড়াল কস্তুরী। দাঁড়াতে গিয়েই মাথা ঘুরে স্বয়ম্ভুর বুকের ওপর টলে পড়ল। হাত বাড়িয়ে ধরে নিল স্বয়ম্ভু।
আ…আমি ঠিক আছি। সরি। কিছু মনে করবেন না।
না না ইটস ওকে
ওষুধ দে।
ঈশ্বরের হাত থেকে রীতিমতো ওষুধ কেড়ে জল দিয়ে গিলে নিল কস্তুরী। বুখ মুছে বলল, এবার শান্তি তোদের? চলে যা। আমায় একা থাকতে দে। আর স্বপ্নভুবাবু, আপনিও যান। আমি যা বলার বলে দিয়েছি। সত্য খোঁজার ভার তো আপনার। হাজারটা মিথ্যের মধ্যেই সত্য আছে। খুঁজে নিন।
.
হাতজোড় করে স্বয়ম্ভু আর ঈশ্বরকে বিদায় দিল কস্তুরী। ঠাকুরঘরের দরজা সশব্দে বন্ধ হল।
ব্যাস, যদিও বা সাধ্যসাধনা করে দরজাটা খোলা হয়েছিল আপনি আবার সেটা বন্ধ করিয়ে ছাড়লেন?
ভূপেন ওপরে উঠে এসেছে। একদমে এতগুলো কথা শুনিয়ে দিল স্বয়ম্ভুকে। পাত্তাও দিল না স্বয়ম্ভু। উলটে বলল, একবার কথাকলির ঘরে যাব।
সম্ভব নয়।
এই ভূপেন ব্যক্তিটি মহা ঢেঁটিয়া। ছিনে জোঁকের মতো সেঁটে থাকে।
ভূপেনবাবু, আপনি আর একবারও যদি আমার কাজে বাধার সৃষ্টি করেন আমি বাইরে বেরিয়ে মিডিয়াকে বলতে বাধ্য হব আমাকে আপনারাই বাধা দিচ্ছেন কাজে। তারপর মিডিয়া কী করবে, কোন তিল থেকে কোন তাল বানাবে বুঝতে পারছেন তো? আমি কথাকলির ঘরটা চিনি। দয়া করে আপনারা আমার পিছন পিছন না এলেই ভালো।
.
অপরপক্ষকে হ্যাঁ বা না কোনো কিছু বলারই সুযোগ না দিয়ে গটগট করে হেঁটে কথাকলির ঘরে ঢুকে গেল স্বয়ম্ভু। পরক্ষণেই দরজা থেকে মুখ বাড়িয়ে স্বয়ম্ভু প্রশ্ন করল, আচ্ছা ভূপেনবাবু, আপনারা ঘটি না বাঙাল?
হঠাৎ?
বলুন না।
ঘটি।
চমৎকার। আপনারা বাটি ভরতি করে কী খান?
মানে?
বলছি বাটি ভরতি করে আপনি কী খেতে ভালোবাসেন?
টমেটোর চাটনি। যত্তসব।
.
ভূপেন সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেল। ঈশ্বর মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। স্বয়ম্ভু ঈশ্বরের দিকে তাকাতেই প্রশ্ন করার আগেই স্বল্পভাষী ঈশ্বর উত্তর দিল, আমি বাঙাল। ইলিশ মাছ খেতে খুব ভালোবাসি। স্বয়ম্ভু হাসল। তারপর ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। ঈশ্বর পকেট থেকে নিজের মোবাইলটা বের করে দুবার আঙুল ঘষে কী যেন ভাবল। ফোনটা হাতের ওপরেই ভাইব্রেট করছে। এপাশ-ওপাশ দেখে ফোনটা কানে দিয়ে দূরের বারান্দায় চলে গেল। মুখের গোড়ায় হাত চেপে কথা বলতে লাগল। স্বয়ম্ভুর চোখ তখন দরজার ফাঁকেই সুরাগ খুঁজছে। নিজের মনেই বিড়বিড় করে বলে উঠল, চিংড়ি!
.
তাহলে শুভঙ্করবাবু, কথা রাখতে পারলেন না?
বেশ রসিয়ে রসিয়ে খোঁচা দিল সোমেন। নার্সিং হোম থেকে ফেরার পথেই ভূপেন খবর দিয়েছে সোমেনকে। গাড়ি ঘুরিয়ে সোজা লালবাজারে ছানা দিয়েছে সোমেন সরকার। শুভঙ্কর কোনো এক জরুরি কাজে বেরোচ্ছিল। কিন্তু সেটা স্থগিত রাখতে বাধ্য হল। চুপ করে থাকবেন না বলুন। বাড়িতে গিয়ে হাত মিলিয়ে এইভাবে কথার খেলাফ করলেন তো? সোমেন কড়া চোখে তাকিয়ে কথাগুলো বলল।
আমার কিচ্ছু করার নেই। স্বয়ম্ভু আমার কাছ থেকে পারমিশন আদায় করে নিয়েছে।
আচ্ছা। তাই নাকি? তা কোন মন্ত্র পড়ে এটা সম্ভব হল?
.
শুভঙ্কর ড্রয়ার টেনে স্বয়ম্ভুর দেওয়া খামটা বাড়িয়ে দিল সোমেনের দিকে। সোমেন খাম খুলেই চমকে ওঠে। নিজেই বিড়বিড় করে বলে ওঠে, আমার বাড়িতে সর্বক্ষণের পাহারা থাকে। তা সত্ত্বেও এই ছবি উঠল কীভাবে? শুভঙ্কর বলল, স্বয়ম্ভু সেনের মেরুদণ্ডটা খুব শক্ত সোমেনবাবু। সোমেন কমিশনারের চোখে চোখ রেখে বলে, তা সেই মেরুদণ্ডটা আমার মেয়েকে খোঁজার কাজে ব্যবহার করুক না। খামোখা আমার অতীত নিয়ে কাটাছেঁড়া কেন? আর কটা দিন এইভাবে গেলে আমার স্ত্রীকে আর বাঁচাতে পারব না। আর আমার স্ত্রীর যদি কিছু হয় তাহলে গোটা প্রশাসনের ব্যান্ড বাজিয়ে দেব। বলে গেলাম।
.
ঘটি খায় বাটি ভরে! বাঙালদের ইলিশ আর ঘটিদের চিংড়ি। বাটি ভরে খায়।
কফি খেতে খেতেই নিজের মনে বকবক করছে শিবাঙ্গী। ধাঁধাটা প্রায় মুখস্থ করে ফেলেছে। কিলায় নাই সেই পোকা? কিলা! কিল মারা! পোকা নেই? চিংড়ি, মাছ নয়। এক ধরনের পোকা। তাহলে চিংড়ি পোকা নেই সেখানে। কোনখানে? কিলায়?
কী বকবক করছিস রে শিবাঙ্গী?
সাব ইন্সপেক্টর কৌশিক দূরের টেবিলে বসেছিল। সেখান থেকেই ছুড়ল। চট করে ঘাড় ঘুরিয়ে পালটা প্রশ্ন করল শিবাঙ্গী, এই কিলা মানে কী রে?
কিলা?
হ্যাঁ।
গুগল আছে তো?
ঠিক কথা তো। এই সামান্য কথাটা মাথায় আসেনি শিবাঙ্গীর? সহকর্মীর কাছে লজ্জা ঢাকতেই একটু ওপরচালাকি করল শিবাঙ্গী, সে তো আমিও জানি। দেখছিলাম তুই জানিস কিনা। অকম্মার ধাড়ি। কৌশিক ভেবলে গিয়ে চোখ-মুখটাকে কেমন যেন করে বলে উঠল, কুছ ভি! সামনের ল্যাপটপে শিবাঙ্গী সার্চ করল কিলা মিনিং ইন বেঙ্গলি! উত্তর এল প্রতিটি। কিন্তু তার নিচেই পিপল অলসো আস্ক বিভাগে লেখা কেল্লা কথার অর্থ কী? বুদ্ধির বাল্ব জ্বলে উঠল। অবাঙালিরা কেল্লাকে কিলা বলে। যদি এক্ষেত্রেও সেরকম কিছু হয় তাহলে দাঁড়াচ্ছে চিংড়ি সেই কেল্লায় নেই। কিন্তু দরগায় হাজি আলি! এর মানে কী? গালে হাত দিয়ে খোপড়িটাকে আরও গভীরে কাজে লাগাতে শুরু করল শিবাঙ্গী। ঠিক সেই মুহূর্তেই স্বয়ম্ভুর ফোন বুকের ভেতরটা তড়াক করে লাফিয়ে উঠল শিবাঙ্গীর। ফোনটা ধরার আগে একটু ভাবল, উনি কি সরি বলার জন্য ফোন করেছেন? সকালের ব্যবহারে লজ্জিত? যদি সরি বলে তাহলে কী বলবে ও?
কী রে শিবাঙ্গী, ফোনটা ধর।
খেয়াল ছিল না পিছনেই কৌশিক বসে। হ্যাঁ স্যার বলুন। স্যার! মানে স্বয়ম্ভু সেন? তার ফোন ধরতে এত কী ভাবছিল শিবাঙ্গী? কৌশিকের কপালে একটা ভাঁজ টাল খেল।
ওকে স্যার। শিয়োর।
শিবাঙ্গী ফোনটা রেখে দিল। হুঁ! তিন পয়সার ছেমড়ির আশা কত। ডিটেকটিভ স্বয়ম্ভু সেন নাকি সরি বলবে! কেন যে এমন অলীক আশা করেছিল শিবাঙ্গী কে জানে? চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ল।
চললি কোথায়?
কৌশিকের প্রশ্ন।
সেন্ট জেভিয়ার্স।
হঠাৎ? ওওওও! কথাকলি পড়ত, না?
শিবাঙ্গী যেতে গিয়েও থেমে গেল। পড়ত কেন বলছিস? এখনও পড়ে।
হ্যাঁ খাতায় কলমে এখনও। বাট এতদিন হয়ে গেল মেয়েটার টিকিটিও পাওয়া যাচ্ছে না। পাস্ট হয়নি বলছিস?
বালাই-ষাট। খুঁজে ঠিক পাব।
হোপ ফর দ্য বেস্ট। তবে বেল পাকিলে কাকের কী?
এই ঠেসটা যেন কানে লাগল শিবাঙ্গীর। মানে? কৌশিক দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে আড়মোড়া ভেঙে বলল, স্বয়ম্ভু সেন তো আর শিবাঙ্গী ছাড়া কাউকে দেখতেই পায় না। একটু কেত নিয়ে শিবাঙ্গী বলল, সেরকমভাবে নিজেকে তৈরি কর। এলি তো মাত্র কদিন হল। এর মধ্যেই কেস হ্যান্ডেল করবি? ছ! কৌশিক হেসে ফেলে বলল, বড্ড দেমাক হয়েছে, না রে? শিবাঙ্গীর আর উত্তর দিতে বয়েই গেল। মুখ করুক আর যাই করুক, স্বয়ম্ভু সেন সত্যি সত্যিই শিবাঙ্গীকে ভরসা করে। একটা অদ্ভুত শান্তি নিয়ে কাজে বেরোল শিবাঙ্গী।
.
জেভিয়ার্সের চৌহদ্দির মধ্যে এসে দাঁড়াল শিবাঙ্গী। হাত উলটে ঘড়ি দেখল। দুপুর আড়াইটে বাজতে চলেছে। এখন লাঞ্চ ব্রেক চলছে। প্রিন্সিপালের অনুমতি নিয়েই কথাকলির কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। কলেজের অ্যাসিস্ট্যান্ট গিয়ে ডেকে আনল তিনজন মেয়েকে।
হাই। আমি শিবাঙ্গী বসু। ফ্রম লালবাজার।
শুনেই তিনটে মেয়ের মুখ চুন হয়ে গেল। একটি মেয়ে বলল, কিন্তু আমাদের যে বলল কথাকলির… মেয়েটি কথা শেষ করার আগেই শিবাঙ্গী বলে উঠল, কাজন তো? ওটা আমিই বলতে বলেছিলাম যাতে তোমরা ভয় না পাও। বাই দ্য ওয়ে, তোমাদের নামগুলো?
তিনজন মেয়ে পরপর নিজের পরিচয় দিল। তানিয়া, প্রিয়াঙ্কা, সুজান। শিবাঙ্গী জিজ্ঞেস করল, তোমরা কথাকলির বন্ধু তো? তানিয়া বলল, হ্যাঁ।
কলেজে এসেই পরিচয়?
হ্যাঁ আমাদের সঙ্গে কলেজে এসেই আলাপ।
আমার সঙ্গে ক্লাস নাইন থেকে।
সুজান জানাল।
বেশ। দেখো তোমরা নিশ্চয়ই চাও কথাকলিকে খুঁজে পাওয়া যাক।
ও শিয়োর। এই উইকেন্ডেই তো আমাদের পার্টি করার কথা ছিল। খুব মিস করছি কথাকে।
তানিয়া বলল।
কথাকলি খুব পার্টি করতে ভালোবাসত না?
শিবাঙ্গী জিজ্ঞেস করল।
ভীষণ। পার্টি মানেই কথাকলির গান। ওফফফ ফাটিয়ে গান গাইত। এত ভালো ফিউশন তৈরি করে ও।
বেশিরভাগ পার্টি তো কথাকলিই স্পনসর করত।
.
তানিয়া, প্রিয়াঙ্কা পরপর বলে গেল। মেয়ে যে বাপের পয়সায় ফূর্তি করতে ওস্তাদ ছিল সে ভালোই বুঝল শিবাঙ্গী। জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা তোমরা যে এত পার্টি করতে বাড়ি থেকে আপত্তি করত না? প্রিয়াঙ্কা বলল, এই সুজানের মা আর কথার মা। এদের ভীষণ প্রবলেম। কথার মা তো পারলে ওকে ঘরে আটকে রাখে। ঘাড় নেড়ে তানিয়া বলল, আসলে উনি না ভীষণ ব্যাকডেটেড মহিলা। খালি কানহাইয়া পুজো করে আর জ্ঞানের বুলি আওড়ান।
.
শিবাঙ্গীর মনে হল ঠাস করে একটা চড় লাগাক মেয়েটাকে। কথার কী ছিরি। কিন্তু মুখে হাসি রেখেই বলল, সত্যি কথা, আজকালকার যুগে এত প্যানপ্যানে হলে হয় নাকি? ছেলেমেয়েরা একটু পার্টি করবে না? তানিয়া উৎফুল্ল হয়ে বলে উঠল, আপনিও তাহলে আমাদের দলে?
অফকোর্স।
তিনজনেই হেসে ঢলে পড়ল।
তোমাদের পার্টিতে কথাকলির বয়ফ্রেন্ড থাকত?
দুম করে পরিবেশটা ঈষৎ গুরুগম্ভীর হয়ে যায়। মেয়েদের মুখের হাসিগুলো ফুস করে মিলিয়ে যায়।
কী হল? ভুল বললাম কিছু?
না না। আসলে কোন বয়ফ্রেন্ড সেটাই ভাবছি।
বাবা! অনেক ছিল নাকি?
সুজান চুপিচুপি বলল, মান্থে ফিফটিন ডেইজ নিজের বাড়িতে আর ফিফটিন ডেজ ওর বয়ফ্রেন্ডদের বাড়ি রাত কাটাত। আমাদের সঙ্গে তো রীতিমতো বাজি ফেলত কে সবথেকে বেশি বয়ফ্রেন্ডদের সঙ্গে রাত কাটাতে…
কথাটা সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই প্রিয়াঙ্কা কনুই দিয়ে আলতো ঠেলল সুজানকে। বন্ধুর ইশারায় থেমে গেল সুজান। শিবাঙ্গী ব্যাপারটা বুঝে জানতে চাইল, বাজিতে কথাকলিই জিতত নিশ্চয়ই? কে কী উত্তর দেবে সেই ভেবেই মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে থাকে। শিবাঙ্গীও ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করে, বয়ফ্রেন্ডদের নামগুলো জানতে পারি? একটু ইতস্তত করে তানিয়া বলে, অনেকেই। মানে স্যাম, পার্থ, রোহিত, কিরণ, সৌমাভ। এরাই।
আচ্ছা, এদের মধ্যে সবচেয়ে স্পেশ্যাল কে?
ওরকম কিছু নেই।
স্পেশ্যাল আবার কী? সব কটাই তো ছেলে। সবাই এক।
.
তানিয়া নিজের হাসি চেপে প্রিয়াঙ্কার হাত চাপল। ভিতরে শিবাঙ্গীর দীর্ঘশ্বাস উঠছে। এরা কারা? কোন শিক্ষায় বড়ো হচ্ছে? কলেজে জিশুর চরণে প্রেয়ার করছে আর বাইরে গিয়ে… ছি ছি ছি! মনে তোলপাড় হলেও বাইরে প্রকাশ করল না।
তা তোমরা যে এত মস্তি করো তোমাদের কোনো বন্ধুদের ফাটে না?
শিবাঙ্গীও এদের সঙ্গে মিশে যাওয়ার মতো ভাষা প্রয়োগ করল।
ফাটবে না কেন? আছে কিছু বিউটিফুল বিস্ট।
তারা কারা?
শ্রীতমা, নয়না, প্রীতম, অয়ন, অভনীজা। সব একেবারে ধোয়া তুলসীপাতা।
আর ঈশিতা?
ওই আরেক। ভালো মেয়ে ভালো মেয়ে টাইপ
কেন? ভালো নয়?
সুজান বলে উঠল, না না মেয়েটা ভালো। কথাকলির খুব বন্ধু। কথার মা তো আমাদের কাউকে দেখতে পারত না। আমরা তাই ওর বাড়িও যেতাম না। একমাত্র ঈশিতাকেই কস্তুরী আন্টি লাইক করত। তাই ও দু-একবার গেছে।
কিন্তু বেশ কিছুদিন হল ওর কোনো পাত্তাই নেই। শরীর খারাপ-টারাপ হয়েছে বোধহয়।
তোমরা জানো না ঈশিতার খবর?
না তো। মাঝে ওকে দিতিপ্রিয়া কল করেছিল বাট পায়নি। সেদিন স্যামের বার্থ-ডে পার্টির পর থেকে ওকে আমরা কেউ দেখিনি।
কোথাও হয়তো বেড়াতে গেছে।
বেড়াতে? ইম্পসেবল। আমরা জানব না? এর আগে যখন মলডিভস গেল ওরা, বাবা রে বাবা! সেই প্ল্যানিং শুরুর দিন থেকে কী নিচ্ছে, কোথায় কোথায় থাকছে, কদিন থাকছে। সব তো ঈশিতাই রাষ্ট্র করে বেড়াত।
সুজানকে থামিয়ে তানিয়া বলে উঠল, ওয়েট ওয়েট ওয়েট। এই দীপ্রভওওও, দীপ্রওওওও…! দূর থেকে একটা ছেলে ছুটে এল। তানিয়া বলল, বলছি ঈশিতারা কোথাও বেড়াতে গেছে জানিস?
কই না তো? ওদের টিকিট তো প্রতিবার ড্যাডই কেটে দেয়।
তানিয়া শিবাঙ্গীকে বলে, দীপ্রর বাবা এয়ারলাইন্সে আছেন। ঈশিতারা তো আঙ্কলকে দিয়েই টিকিট কাটায়।
দীপ্র বলল, তা ছাড়া সামনে এক্সাম। এই সময়ে বেড়াতে যাবে? ধুস!
.
সামনের পাতাভরতি গাছের ডালপালা ভেদ করে সূর্যের আলোটা তেরচাভাবে শিবাঙ্গীর মুখে এসে পড়ল। কায়দা করে এদের তিনজনের কাছ থেকেই চিনে নিল কথাকলির শত্রুপক্ষের ছেলেমেয়েগুলোকে। আজ নাকি ওদের লাস্ট ক্লাস অফ। তাই তিনটের সময় ছুটি। ওদের সামনে কিছু না বলে কলেজ ছেড়ে বেরিয়ে গেল শিবাঙ্গী। তখন বিকেল তিনটে দশ। একদল ছেলেমেয়ে মেন গেট দিয়ে বেরিয়ে এল। সবার ক্লাস তো সবসময় ছুটি অবধি চলে না। অনেক সময়ে একটা দুটো ক্লাস অফ থাকলে যে যার মতো বেরিয়ে পড়ে।
.
শ্ৰীতমা, শ্রীতমা…।
চোখে চশমা পরা একটি মেয়ে ঘুরে তাকাল। শিবাঙ্গী এগিয়ে গেল। তুমি শ্রীতমা মুখার্জি তো?
হ্যাঁ। আপনি?
আমি শিবাঙ্গী বসু। লালবাজার থেকে আসছি।
কী ব্যাপারে?
ভয় পাওয়ার কিছু নেই। কয়েকটা প্রশ্ন করার আছে। কথাকলি সরকারের ব্যাপারে।
শ্রীতমা চশমাটাকে ঠিক করে আশেপাশে দেখল। শিবাঙ্গী বলল, কথাকলির খবরটা আশা করি জানো।
হ্যাঁ। ভেরি স্যাড। বাট ওর ব্যাপারে আমি কিছু বলতে পারব না।
তোমরা তো এক ক্লাসেই পড়ো।
এক ক্লাসে পড়লেই তো আর বন্ধুত্ব হয় না।
কেন?
দেখুন আমি তো কোনো মন্ত্রীর মেয়ে নই। তাই আমার দম্ভ করার মতোও কিছু নেই।
কথাকলি দাম্ভিক?
অসম্ভব। ও একাই বড়ো আর বাকিরা ছোটো। এভরি উইক আমিও যদি আমার বন্ধুদের পার্টি দিতে পারতাম আর বাপের দেওয়া গাড়ি চড়িয়ে লং ড্রাইভে নিয়ে যেতে পারতাম তাহলে আমিও সবার চোখে বড়ো হয়ে যেতাম। ক্লাসের ছেলেগুলোর তো মাথা খেয়ে রেখে দিয়েছে।
কথাকলি কি কারও সঙ্গে পালাতে পারে? কী মনে হয় তোমার?
কলেজের কারও সঙ্গে পালায়নি এটুকু শিয়োর। কারণ সব কটা ছেলেই তো ক্লাস করছে। এখন বাইরে কারওর সঙ্গে কী করেছে বলতে পারব না।
বুঝলাম। কথাকলি তার মানে খুবই দাম্ভিক, ক্যারেক্টারলেস, জঘন্য মনের একজন মানুষ। তাই তো?
আমাদের সেটাই ধারণা। এ ছাড়া আমি কিচ্ছু জানি না।
ওকে। থ্যাংক ইউ।
ওয়েলকাম।
.
শ্রীতমা পিছন ফিরে হাঁটতে থাকল। শিবাঙ্গীও। মনে মনে বলল, গোল্লায় যাওয়া মেয়ে গোল্লায় গেছে। কেউ পছন্দ করে না একে। যারা ভালোবাসে অরাও সব কটা ওরই মতো।
শুনছেন।
.
কেউ যেন ডাকল পিছন থেকে। শিবাঙ্গী ঘুরে তাকাল। শ্রীতমাই এগিয়ে এসেছে। শিবাঙ্গী জিজ্ঞেস করল কিছু বলবে?
***
