১২
স্বয়ম্ভু দিগবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে শিবাঙ্গীকে জড়িয়ে ধরল। আনন্দে শিবাঙ্গীর পিঠ চাপড়ে বলতে থাকল, থ্যাংক ইউ সো মাচ। তুমি জানো না তুমি কী করেছ। স্বয়ম্ভু আনন্দে বিহ্বল হয়ে আরও কত কথা হাত নেড়ে বলে চলেছে। শিবাঙ্গীর কান শূন্য। চোখ ঝাপসা। চেতনা বিলুপ্ত। শুধু শরীরের সমস্ত ফুলে এক পাগল হাওয়ার নেচে বেড়ানো। কী এমন করেছে! একটা ছবিই তো আঁকিয়েছে সে। কিন্তু সেটার পুরস্কার যে এমন করে তার তনুতে তনুতে আঁকা হয়ে যাবে সেটা ভাবতেও পারেনি শিবাঙ্গী।
এই মুহূর্তে এই ছবি চতুর্দিকে ছড়িয়ে দাও। থানা, স্টেশন, বাসস্টপ, টোল প্লাজা সব জায়গায়। শুধু প্রকাশ্যে এনো না। এটা যেন মানুষের মোবাইলেই থাকে। নইলে পুরুষোত্তম ওরফে পরমেশ্বর ওরফে মহেশ্বর সাবধান হয়ে যাবে।
.
স্যার, লিস্ট পেয়ে গেছি উইথ নেম।
ঘরে ঢুকে এল রঞ্জিত। হাতে ল্যাপটপ। এক্সচেঞ্জ থেকে এক্সেল শিট পাঠিয়ে দিয়েছে।
স্বয়ম্ভু লিস্টটায় চোখ বোলাতে বোলাতে বলল, মালার নম্বরটা দাও তো শিবাঙ্গী।
স্যার, নামটা বললেই হবে।
স্পেলিং গণ্ডগোল হলে দেখাবেই না তোকে। তার চেয়ে নম্বর দিয়ে সার্চ কর।
.
মালার ছবির উলটোপিঠে নম্বরটা লিখেছিল শিবাঙ্গী। রঞ্জিত নম্বরটা এক্সেলে পুট করতেই বেরিয়ে এল মালা রায় বাদল দত্তকে কতবার ফোন করেছে। স্বয়ম্ভু বলল, গত সোমবার মানে সাতই আগস্ট রাত একটা বারো মিনিটের পর মালার নম্বর থেকে কোনো ফোন আসেনি বাদলের নম্বরে। কারণ পরদিন সকাল মানে মঙ্গলবার আটই আগস্ট সকালে মালা বাদলের সঙ্গে পালায়। হিসেব ঠিকই আছে। এবার মৃণালবাবুর নম্বরটা পুট করো তো। সব দেখে রঞ্জিত বলল, এই সোমবার মানে চোদ্দোই আগস্ট মাঝরাতে বাদলের নম্বর থেকে ফোন যায় মৃণালবাবুর নম্বরে।
সোমেন সরকারের নম্বরটা দিয়ে চেক কর।
স্বয়ম্ভুর কথামতোই কাজ হল। যথারীতি খুঁজে পাওয়া গেল। স্বয়ম্ভু জানতে চাইল আট বা নয়ই আগস্ট সোমেনের নম্বর থেকে ফোন এসেছে কিনা বাদলের কাছে।
হ্যাঁ স্বয়ম্ভুদা, সেদিন সকাল থেকে দুবার সোমেন কল করেছে। আর রাত সাড়ে নটায় বাদলের নম্বর থেকে সোমেনকে কল করা হয়। ব্যাস, তারপর আবার এগারো তারিখ বেলা একটা এগারোটা আট মিনিটে।
এগারো তারিখ মানে শুক্রবার। ইনভেস্টিগেশনের প্রথম দিন?
শিবাঙ্গী বলল, সেদিন সোমেন সরকার ভীষণ অসুস্থ ছিলেন না?
শুধু তাই নয়, আমরা সেদিন ওই সময় ওই বাড়িতেই উপস্থিত ছিলাম। সম্ভবত কস্তুরীদেবীর সঙ্গে কথা বলছিলাম। সকাল থেকেই ওনার ঘরে ডাক্তার বসে ছিলেন। আমরা যখন বেরিয়ে আসি তখন ডাক্তার ছিল না। বরং আরও কয়েকজন বাইরের লোক ছিল। সোমেন সরকার একবারের জন্যেও তখন ঘরের বাইরে বেরোননি। তার মানে ফোনটা ঘর থেকে বসেই করেছিলেন। অতগুলো লোকের সামনে? ডিউরেশন কতক্ষণ রে?
.
রঞ্জিত উত্তর দিল, বেশি না, দুমিনিট দশ সেকেন্ড। চুপ করে চিন্তা করল স্বয়ম্ভু। শিবাঙ্গী জানতে চাইল স্বয়ম্ভু এর মধ্যে থেকে বিশেষ কিছু খুঁজছে কিনা। স্বয়ম্ভু বলল, খুঁজছি। বিশেষ একজন আছে এইসব কিছুর পিছনে। যাকে এই দুনিয়ায় বস বলে ডাকা হয়। সে কে? কীরকম দেখতে কেউ জানে না। আড়াল থেকে কলকাঠি নাড়ে। আর যারা যারা জানে তারা ভুলেও মুখ খোলে না। লাশ হয়ে যাওয়ার ভয়ে।
মানে সোমেন সরকার পুতুল মাত্র?
পুতুল নয়। দাস। তাতে অপরাধের দায় এক্কেবারেই কমে না।
এর সঙ্গে কথাকলির যোগ কোথায় স্যার?
জানি না শিবাঙ্গী। যতবারই কথাকলির খোঁজ করছি ততবারই সোমেনের পাপের অনুসন্ধান করে ফেলছি। নিজেই বুঝতে পারছি না সেটা কেন? কস্তুরী আমায় চিরকুটে লিখল, কথা আছে ভগবানের কাছে। এদিকে ভগবানকে জেরা করে বা ওর বাড়ি গিয়ে তেমন কিছুই পেলাম না। কোনো খোঁচড় ভগবানের সম্পর্কে কোনো সন্দেহজনক গতিবিধি জানায়নি। যদিও বাজারে একটা খটকা…!
বলে খানিক কী যেন চিন্তা করে স্বয়ম্ভু। তারপর বলে, শিবাঙ্গী লোক লাগিয়ে খোঁজ নাও, ভগবান দাসের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট কোথায় আছে? সেখানে কত টাকা?
ওকে স্যার।
স্বয়ম্ভু বলতে থাকল, ভগবানের গোটা পরিবার সোমেনের ওপর নির্ভরশীল। সেই নির্ভরতা ভগবান কোনোভাবেই নষ্ট করবে না। তাহলে কথাকে কেন লুকিয়ে রাখবে?
তাহলে স্যার কস্তুরীদেবীর কথার মানে কী?
স্যার, ভগবানের টাইটেল কি দাস?
রঞ্জিত বলে উঠল।
হ্যাঁ। কেন?
তেরো তারিখ ভগবান দাসের ফোন থেকে বাদলের নম্বরে ফোন আসে। দুমিনিট কল ডিউরেশন। তারপর আজ দুপুর তিনটে নাগাদ আবার ভগবান দাস কল করে। ডিউরেশন এক মিনিটও না। আর এই নম্বর থেকে লাস্ট দশ দিনে কোনো কল যায়নি। বাদলও করেনি।
ঘরের মধ্যে যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। ভগবানের ফোন থেকে মেয়ে পাচারকারীর ফোনে কল গেছে!
ট্র্যাক করো। দেখো কোথায় আছে।
স্বয়ম্ভু বলল।
ওকে স্বয়ম্ভুদা। ও হো ওই মাঝেরহাটের ঠিকানাটা পেয়েছি। নোট করে রেখেছিলাম।
রঞ্জিত পকেট থেকে একটা হলুদ রঙের কাগজ বের করে স্বয়ম্ভুকে দেয়। ঠিকানাটা দেখেই স্বয়ম্ভু বলে ওঠে, এটা তো সোমেন সরকারের পুরোনো অফিসের ঠিকানা। সাত-আট বছর আগে এইখানে সোমেন সরকারের একটা ঘাঁটি ছিল। তার মানে মৃণালবাবুর নাতনিকে এই অফিসে রাখা হয়েছিল?
অফিসটার পাশে জনবসতি নেই? চিৎকার করলেই তো শোনা যাবে।
আছে। বাট। এলাকাটা কুখ্যাত। আরও একটা ব্যাপার দেখার আছে, মেয়েটা চিৎকার করার মতো পরিস্থিতিতে ছিল কিনা। যাই হোক, ট্র্যাক কর তো।
.
রঞ্জিত ল্যাপটপে নম্বরটা ট্র্যাকিংয়ে দিতেই লোকেশন শো করছে বারাসাত। বারাসাত থেকে ফোনের সিগনালটা এগোচ্ছে। স্বয়ম্ভু বলল, মনে তো হচ্ছে অশোকনগর, হাবড়ার দিকেই যাচ্ছে। স্বয়ম্ভু আওড়াল, অশোকনগর, হাবড়া, মসলন্দপুর, গোবরডাঙ্গা হয়ে বনগাঁর দিকেই গাড়িটা যাবে। ভগবানকে আজ জাহান্নমে পাঠাতে হবে। হয়তো আজ রাতেই মেয়েটা পাচার হবে। তাই বস নিজে যাচ্ছে। শিবাঙ্গী এখনই ওখানকার লোকাল থানাগুলোতে খবর দাও। ওদের ফোর্স আমাদের লাগবে। বলে দাও আমরা জানিয়ে দেব কোথায় আমাদের সঙ্গে যোগ দিতে হবে।
স্যার এখান থেকে ফোর্স নেব না?
না। শকুনের নজর আছে। তা ছাড়া তোমার বাবা অসুস্থ। তাই তোমায় বাড়িতে নামিয়ে আমি ফিরে যাব।
শিবাঙ্গী বুঝে গেল স্বয়ম্ভুর কথার মানে। তবু শিবাঙ্গী বলল, বুঝলাম। তবে স্যার, ওটা বর্ডার এরিয়া। আজই ওখান থেকে মেয়ে পাচার হচ্ছে এমনটা তো নয়। আগেও হয়েছে। তাই ওখানকার পুলিশ কিছু জানে না সেটা কি হতে পারে?
স্বয়ম্ভু ভাবল। শিবাঙ্গীর কথাটা ভুল নয়। পকেট থেকে মোবাইলটা বের করতে করতে স্বয়ম্ভু বলল, ওয়েট। বনগাঁ পুলিশ ডিস্ট্রিক্টের এস পি আমার পরিচিত। একবার ওঁকে কল করি।
বেটার।
.
শিবাঙ্গী আর রঞ্জিতকে নিয়ে স্বয়ম্ভু ছুটল ঘাটবাওড়ের পথে। চলন্ত গাড়িতেই রঞ্জিত ল্যাপটপে কন্টিনিউয়াসলি ট্র্যাক করছে দুটো নম্বরের লোকেশন। এক, ভগবান দাস। দুই, বাদল। ভগবান এগিয়ে চলেছে হুহু করে। স্বয়ম্ভুদের সন্দেহই ঠিক। বনগাঁর দিকেই যাচ্ছে ভগবান। অসহায়, দুর্বল সেজে লোকের চোখে ধুলো দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে আস্ত শয়তান। এমন সময় স্বয়ম্ভুর মোবাইলে পরিবহণ ভবনের রিজিওনাল ম্যানেজার সুপ্রতিম সিনহার ফোন। একবার আসতে পারবেন?
না স্যার। একটা অপারেশনে যাচ্ছি। কেন কিছু হয়েছে? আপনি বলতে পারেন। গাড়িতে আছি।
হয়েছে মানে গাড়িটার সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া গেছে।
তাই নাকি?
হ্যাঁ। কিন্তু গল্প আছে।
কীরকম?
প্রথমে ব্যালেনোটা বর্ধমান পর্যন্ত যায়। এখানেই আমার সন্দেহ হয় কারণ গাড়িটা যদি নর্থ বেঙ্গলের দিকেই যাবে তাহলে খামোখা বর্ধমান কেন যাবে?
ঠিক।
যাই হোক, বর্ধমানের এক জায়গায় গাড়িটা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে পড়ে। সেখানেই আরও একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল। ব্যালেনো থেকে দুজন মেয়ে ও একজন ভদ্রলোক তাদের মালপত্তর সমেত নেমে ওই যে গাড়িটা দাঁড়িয়ে ছিল সেটাতে ওঠে। আপনি যে মেয়েটির ছবি দিয়েছিলেন। ঈশিতা না কি যেন নাম।
হ্যাঁ হ্যাঁ ঈশিতা।
রাইট। সেই মেয়েটাই ছিল। সঙ্গে ওর মাকে চিনলাম। কারণ আপনি বাবার ছবিটা দেননি।
তারপর?
এরপর সেই গাড়িটা দুর্গাপুর, আসানসোল হয়ে এগোতে থাকে। যেটা মোটেও ঝালং যাওয়ার রাস্তা নয়। আর ওই ব্যালেনোটা বর্ধমান থেকে ডান দিকে বেঁকে ভাতার, মঙ্গলকোট হয়ে কিষাণগঞ্জের দিকে এগোতে থাকে। অদ্ভুতভাবে সিসিটিভিতে কিষাণগঞ্জে ব্যালেনোটাকে দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু এর নম্বর প্লেট আলাদা। আপনি যেটা সেকেন্ড নম্বর দিয়েছেন এটা সেই নম্বর। কিন্তু গাড়িটা অবশ্যই এক। একই রং। গাড়ির কাচে একই ডিজাইন।
তার মানে কিষাণগঞ্জের আগেই প্লেট চেঞ্জ হয়েছে।
একদমই তাই এবং এমন জায়গায় হয়েছে যেখানে সিসিটিভি নেই। ড্রাইভার বা প্ল্যান মেকারের রাস্তাটা গুলে খাওয়া।
স্বয়ম্ভু বলল, তাহলে ওই গাড়িটা কোথায় গেল?
ওটা আওরঙ্গাবাদ হয়ে বেনারসের দিকে চলে গেছে।
বেনারস?
হ্যাঁ। ওই জন্যেই তো সময় লাগল। কারণ আমরা দুম করে অন্য স্টেটের সিসিটিভি ফুটেজ চাইতে পারি না। পারমিশন লাগে। থ্যাংকস টু শুভঙ্কর কাঞ্জিলাল। উনিই পারমিশনটা করিয়ে দেন।
শুভঙ্কর স্যার?
হ্যাঁ। নইলে এত ইনফো দেওয়া ইম্পসেবল ছিল।
.
স্বয়ম্ভুর মনটা আর্দ্র হয়ে গেল। লোকটা মুখে যাই বলুক। প্রত্যক্ষে না হলেও পরোক্ষে শুভঙ্কর স্যার যে স্বয়ম্ভুকে যথেষ্ট স্নেহ করেন এবং ভরসা করেন এটা আজ প্রমাণিত হওয়াতে মনে মনে শান্তিই পেল স্বয়ম্ভু।
বেনারসের কোথায় গেছে ঈশিতাদের গাড়ি?
স্বয়ম্ভু প্রশ্ন করে। সুপ্রতিম বলে, বিন্ধ্যাচলের রাস্তায়।
বিন্ধ্যাচল?
নট শিয়োর। কারণ সেখানকার কোনো ফুটেজ আমাদের হাতে আসেনি।
ঈশিতারা কি ভানুপ্রিয়ার কাছে? ঈশিতাকেও কি ভানুপ্রিয়া নোংরা ব্যবসায় নামিয়ে দিয়েছে? সব শুনে শিবাঙ্গী বলল, সোমেন সরকার ঈশিতাকেও পাচার করে দিল। কিন্তু কেন? ও তো কথাকলির বন্ধু।
যারা মেয়ে পাচার করে তাদের কাছে মেয়েমানুষরা কারও বন্ধু হয় না। সে মেয়ের বন্ধুই হোক বা…
না স্যার। বলবেন না।
শিবাঙ্গীর ভিতর থেকে বুকটা মুচড়ে উঠল। ছেলেমেয়েরা সবার বাবা- মাকেই নিজের বাবা-মায়ের মতো ভালো চোখে দেখে। খারাপ ভাবতেই পারে না। পুলিশ হলেও শিবাঙ্গী একজন মেয়ে। সেও তার বাবার আদরের। তাই যেটা বলতে গিয়েও স্বয়ম্ভুকে শিবাঙ্গী থামিয়ে দিল সেটা ভাবতেও সর্বাঙ্গ শিউরে উঠছে।
জানি খারাপ ভাবনা। তবু এগুলো ভাবতে শেখো শিবাঙ্গী। অনেক শক্ত হবে ভেতর থেকে।
তাবলে নিজের বাবা?
কত মা তার সন্তানকে বেচে দেয় তুমি জানো? আমরা কেউ কারও নই শিবাঙ্গী। আমরা সবাই একটা আলাদা সত্তা। স্বার্থে ঘা লাগলে সম্পর্কের সুতোগুলো ছিঁড়ে যায়। ভুলে যাই কে আপন কে পর।
.
স্বয়ম্ভু বলল কথাগুলো। মনের মধ্যে ওর দেখা বেশ কিছু ছবির ঝলক ভেসে উঠল। ছন্নছাড়া সূত্রগুলো এক হয়েও ছেড়ে যাচ্ছে। কিছুতেই একটা মালায় গাঁথতে পারছে না স্বয়ম্ভু।
.
একগলা জল নিয়ে রাতের বাওড়টা চুপ করে আছে। এখানে নাকি মাঝেমধ্যেই লাশ ভেসে ওঠে। পুলিশ জানে। কিন্তু কোনো থই পায় না। দুদিন খোঁজাখুঁজি চলে। তার পরেই বাওড়ের জলে সব কিছু থিতিয়ে যায়। বাওড়ের পাশেই বিরাট একটা অশত্থ গাছ তার ডালপালা, শেকড়বাকড় মেলে মাটি কামড়ে বসে আছে আজ বহুকাল হল। এই চত্বরে তেমন একটা বাড়িঘর নেই। যে কটা আছে সব কটাই বহু প্রাচীন। এমনই এক শতাব্দীপ্রাচীন বাড়ি তার জড়ভরত বিশাল চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বেশ কিছু গাছপালা পরিবেষ্টিত হয়ে। দিনের বেলাতেই আঁধারপানা থাকে এদিকটা। আর এখন তো রাত। মধ্যরাত। এই ঘুরঘুট্টি অন্ধকারের মধ্যেই কয়েকটা ছায়াশরীর হেঁটে চলে বেড়াচ্ছে। হাত উলটে মোবাইলের আলো জ্বেলে সময় দেখছে। দূর থেকে একটা গাড়ির হেডলাইটের আলো ঝিকমিক করে উঠতেই ছায়াশরীরগুলো যে যার নিজের মতো সরে অন্ধকারে মিশে যায়। চার চাকার বড়ো গাড়িটা এসে দাঁড়ায়। হেডলাইটের আলো তিনবার নিভে আবার জ্বলে ওঠে। গাড়ি থেকে একটা ছায়ামানুষ নেমে তিনবার হাততালি দেয়। সঙ্গে সঙ্গে চারপাশ থেকে ছুটে আসে অন্ধকারে লুকিয়ে পড়া ছায়াশরীরগুলো। এক এক করে মোবাইলের আলো জ্বলে ওঠে। যে লোকটা গাড়ি থেকে নামল তার সারা শরীর যেন নিকষ কালো অন্ধকার দিয়ে বানানো পোশাকে ঢাকা। মুখে অদ্ভুত মাস্ক। শুধু চোখের মণি, নাসারন্ধ্র আর ঠোঁট দুটো বেরিয়ে আছে। মোটামুটি লম্বা। হেঁটে এগিয়ে গেল প্রাচীন বাড়িটার ভিতরে। দরজা খুলতেই ভিতর থেকে হলদেটে আলোটা বাইরে ঝাঁপিয়ে পড়ে হাঁফ ছাড়ল। লোকটা ঢুকে যেতেই আবার সব অন্ধকার।
.
ভিতরের ঘরে একটা লোক পায়চারি করছিল। ঢোলা কালো পাজামা। গায়ের কালো পাঞ্জাবিটাও ঢলঢল করছে। চোখে সুরমা। গালের লাল দাড়ি গলা ছাড়িয়ে খানিকটা নিচ পর্যন্ত নেমেছে। মাথায় ফেজ টুপি। রাতের শিকারি বিড়ালের মতো চোখ জ্বলে উঠল মাস্ক পরা লোকটাকে দেখে পান খাওয়া লাল মুখে ঝাল ঝাল সুরে মুসলিম লোকটি বলে উঠল, কথার খেলাপ হল কিন্তু বস।
জানি।
বলেই একটা মোটা খাম মুখের সামনে বাড়িয়ে ধরল বস। দুটো মাল কম দেওয়ার রিটার্ন।
টাকা রিটার্ন নিয়ে কী করব? দুবাইতে কথা দিয়েছি সাতটা মাল পাঠাব। সেই মতো ডিল ফাইনাল হয়েছে। এবার সাতটার বদলে পাঁচটা দেখে যদি পুরোটাই ক্যানসেল করে?
ওই জন্যেই তো রিটার্ন দিচ্ছি। তা ছাড়া দুবাই না নিলেও বাংলাদেশেই ব্যবস্থা করে দেবেন। চেখে দেখবেন নাকি?
নাহ।
আদা জল খেয়ে পুলিশ পিছনে পড়েছে। নইলে আরও দুটো তোলা কোনো ব্যাপার না। টাকাটা রাখুন।
মুসলিম লোকটা হাত বাড়িয়ে টাকাটা নিয়ে ঢিলেঢালা কালো জোব্বাটার পকেটে পুরে নিল। বস বলল, গাড়ি রেডি?
সব রেডি। হাতে বেশি সময় নেই।
আর পাঁচ মিনিট। আমি নিজে চেক করে ছাড়ব।
মুসলিম লোকটা ঘাড় নেড়ে সম্মতি দিল। বস আলো-ছায়া মাখা সরু সিঁড়িটা ধরে ওপরে উঠে গেল। যে দুজন পাহারায় ছিল থতোমতো খেয়ে উঠে দাঁড়াল।
বাদল কোথায়?
বস জিজ্ঞেস করল।
একজন প্রহরী উত্তর দিল, ওই ঘরে। আসুন বস। বস হাত তুলে ছেলেটাকে বাধা দিল। একটা বন্ধ দরজার দিকে এগিয়ে গেল। দরজায় টোকা দিল। একবার, দুবার। ঘরে ভিতর থেকে খেঁচিয়ে উঠল দল, কে বে শালা? পরে আয়। স্পষ্ট বোঝা গেল বাদল হাঁপাচ্ছে। বস শরীরের এক ধাক্কায় দরজার আগল ভেঙে ভিতরে ঢুকে গেল। ধড়মড় করে বাদল চাট্টি খিস্তি করতে করতে হামাগুড়ি দিয়ে জামাকাপড় টানাটানি করতে লাগল। মাটিতে পড়ে আছে নগ্ন মেয়েটা। একটু পরেই নদী পেরিয়ে সে বাংলাদেশে চলে যাবে। তারপর উড়ে যাবে দুবাই। বাদলও উলঙ্গ। তাতে বসের কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। বরং দৃপ্ত পদে এগিয়ে গিয়ে ঠাটিয়ে একটা চড় মারল বাদলকে। বাদল কোমরের কাছে পুঁটলি করে জামাপ্যান্ট ধরে নিজের লজ্জা নিবারণ করতে করতে বোকার মতো তাকিয়ে রইল। বস দাঁতে দাঁত চেপে বলল, নিচে শেখ করিম এদের নিয়ে যাওয়ার জন্য বসে আছে বানচোত। আর তুই শালা এখনও লাগাচ্ছিস? এতদিন লাগিয়ে আশ মেটেনি খানকির ছেলে?
স…স…সরি বস।
আবার একটা চড়। মেয়েগুলোকে পরিষ্কার করে সাজিয়ে পাঠাতে হবে। পার্টির যেন মেয়েগুলোকে দেখে পছন্দ হয়। আর তুই এর কী হাল করেছিস? মালা থেকে ফুল ছিঁড়ে পিষে খেয়ে নিলি? এবার যদি একে নিতে রাজি না হয় তাহলে তোর খবর আছে বাদল।
.
মাটিতে সত্যিই মালা ছিঁড়ে পড়ে আছে। ঘরে যে আরেকজন মদ্দা পুরুষমানুষ ঢুকেছে তাতে মেয়েটির যেন কোনো ভ্রূক্ষেপই নেই। মালা ধীরে ধীরে উঠে বসার চেষ্টা করছে। সর্ব অঙ্গে ব্যথা। মেয়েটির অবস্থা দেখে মাস্কের ফাঁক দিয়ে বাদলের দিকে যে আগুন চোখে তাকাল বস তাতে বাদলের সব কিছু শুকিয়ে গুটিয়ে দড়ি হয়ে গেল। আমি এখনি সব ঠিক করে দিচ্ছি বস।
পাঁচ মিনিট। এর বেশি সময় দিতে পারব না।
ওকে বস। বাকিগুলোরও কী একই অবস্থা?
না না। তবে একজনের পিরিয়ডস চলছে।
গাঁড় মেরেছে। এখনই এসব হতে হল?
ন্যাকড়া বেঁধে রাখিসনি তো?
না না। প্যাড এনে দিয়েছি।
তাড়াতাড়ি ঠিক কর।
বস ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পাশের ঘরে গিয়ে দেখল আরও চারটে মেয়ে একসঙ্গে বসে। সেখানে পাহারা দিচ্ছে দুজন সোমত্ত ছেলে। এর মধ্যে একটি মেয়ে হাঁটু মুড়ে দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসে। বস কাছে গিয়ে প্রশ্ন করে, পিরিয়ডস চলছে। মেয়েটি মুখ তুলে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নেয়।
কদিন চলছে?
মেয়েটি জবাব দেয় না। বস সপাটে লাথি চালায় মেয়েটির পাছা লক্ষ্য করে। মেয়েটি পেট চেপে কুঁকড়ে যায়।
দুদিন!
.
দুপাশে গাছের মিছিল। মাঝে পিচঢালা পথ। স্ট্রিট লাইট কম। মাঝেমধ্যে আলোর ঝলক স্বয়ম্ভুদের গাড়ির কাচে ঝাপটা মেরে যাচ্ছে। শুনশান রাস্তাটার ধার ঘেঁষেই কয়েকটা গাড়ি দাঁড়িয়ে। সেখানে গিয়েই স্বয়ম্ভুর গাড়িটা দাঁড়ায়।
অভিমন্যুদা উঠে এসো।
বনগাঁ ডিস্ট্রিক্টের সিপি দাঁড়িয়েছিল। তাদের লোকদের এই গাড়িটা ফলো করার জন্য বলে উঠে আসে সে। শিবাঙ্গীর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেয়
স্বয়ম্ভু।
আপনি নিজে থাকবেন ভাবতেই পারিনি।
স্বয়ম্ভু বলে।
হ্যাঁ জানি এইসব অঞ্চলের পুলিশদের বদনাম আছে। তবে সবাই এক নয়।
হাসালে অভিমন্যুদা। অসততার কোনো অঞ্চল হয় না গো। সোমেন সরকারের কেস সামলাতে গিয়ে আমরা কী ঝেলছি আমরাই জানি। যাক গে, রঞ্জিত লোকেশনটা একটু বলো তো।
সঙ্গে সঙ্গে অভিমন্যু বলে উঠল, আমি হয়তো জানি। ঘাটবাওড়ের কোন বাড়িতে মেয়েগুলোকে রাখতে পারে। আমি বলছি, তুমি ভাই মেলাতে থাকো।
ওকে স্যার।
রঞ্জিত বলল। অভিমন্যুর বলা পথ এক্কেবারেই ঠিক। রঞ্জিত লোকেশন মেলাচ্ছে। কিন্তু বাওড়ের সামনে এসে অভিমন্যু গাড়ি থামাতে বলে। দেখাদেখি পিছনের কনভয় দাঁড়িয়ে পড়ে সার বেঁধে। রাতের অন্ধকারে যে কটা হেডলাইট জ্বলে উঠেছিল সব কটা নিভে যায়।
স্বয়ম্ভু, এখান থেকে বাড়িটা হাফ কিলোমিটার। সামনে গাড়ি নেওয়া যাবে না। এখান থেকে অন্ধকারে লুকিয়ে গোটা বাড়িটাকে ঘিরে ফেলতে হবে।
সকলেই গাড়ি থেকে নেমে পড়ল। অভিমন্যুর নির্দেশে পুলিশ তিনভাগে ভাগ হয়ে গেল। একদল বাড়ির পিছন দিকটায়, একদল সামনে আর একদল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকবে। রঞ্জিত ফোনে কানেক্ট করে থাকবে স্বয়ম্ভু আর শিবাঙ্গীর সঙ্গে। অভিমন্যু তার দলের ইনস্পেক্টরদের সঙ্গে। স্বয়ম্ভু প্রশ্ন করল, আর আমার আসল লোক? অভিমন্যু বলল, পিছনের গাড়িতেই আছে। শিবাঙ্গী কিছু বুঝল না। শুধু বোকার মতো স্বয়ম্ভু আর অভিমন্যুর মুখের দিকে একবার করে ফ্যালফ্যাল করে তাকাল।
.
উদ্ভ্রান্তের মতো দৌড়ে আসছে মেয়েটা। পুরোনো বাড়িটার উঠোনে আছড়ে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে অস্ত্রধারী ছায়াশরীরগুলো ধেয়ে এল। এই কে রে। কে তুই? একজন টর্চ জ্বেলে মেয়েটার মুখে ফেলতেই মেয়েটা মুখের সামনে হাত নিয়ে আচমকা পড়া আলোটাকে সামলে নিল। মেয়েটার গায়ে ছেঁড়া শাড়ি। কেউ ছিঁড়ে দিয়েছে মনে হচ্ছে। ব্লাউজটারও একই অবস্থা। মাথায় সিঁদুর। মাথার পিছনে চুলটা এলোমেলো হয়ে গেলেও একটা গার্ডারের সঙ্গে কিছু চুল জট পাকিয়ে আছে। বোঝা যাচ্ছে চুলটা বাঁধা ছিল। বউটার শরীরে ধস্তাধস্তির চিহ্ন। ঠোঁটের কাছে লাল হয়ে আছে। কপালে কালশিটে। বয়স একদমই বেশি না। উচ্চতা পাঁচ ফুট দুইঞ্চির বেশি নয়। রোগা। কিন্তু চেহারার মধ্যে একটা ঢলঢলে ভাব আছে। মেয়েটাকে দেখে অস্ত্রধারী লোকগুলো একে অপরের মুখের দিকে চায়। মেয়েটা কেঁদে কেঁদে বলে, আমায় বাঁচাও ভাই। ওরা আমায় ছিঁড়ে খেয়ে লিবে।
কে খাবে তোকে?
বন্দুকটা কাঁধে ফেলে প্রশ্নটা করে এক প্রহরী। গলার স্বরেই তার খিদের গন্ধ। বউটা বলে, আমার হারামি মরদ ঘরে লোক ঢুকিয়ে দেছে। আমি পলায় এসছি। আমায় বাঁচাও ভাই।
আহা রে। বেশ করেছিস। এখানে কোনো ভয় নেই তোর।
বউটার কেমন যেন সন্দেহ হয় বন্দুক দেখে। দুপা পিছিয়ে এসে বলে তোমরা কি পুলিশ?
অ্যাঁ… হ্যাঁ তো। এই বন্দুক দেখছিস না?
গায়ে পুলিশের বেশ নাই কেনে?
ধুস। তাহলে তো অপরাধীরা বুঝে যাবে যে আমরা পুলিশের লোক। নে চল তোকে ভেতরে নিয়ে যাই।
ভেতরে কে আছে?
পুলিশ আছে। তোর ভয় নাই। তোর মতো আরও মেয়ে আছে। পুলিশ একটু পরেই তোদেরকে শহরে নিয়ে যাবে। কেউ ক্ষতি করতে পারবে না তোর।
বউটা একবার পিছনের অন্ধকার দিকটায় তাকিয়ে দেখে নেয় লোকগুলো ওকে দেখতে পেল কিনা সেই ভয়ে। তারপর ভীত গলায় বলল, ওদের হাতে তোমরা আমায় তুলে দেবে তাই না?
আচ্ছা জ্বালা। আমরা তোকে বাঁচাব বলে বাড়িতে থাকতে দিচ্ছি। আর আমরাই ওদের হাতে তুলে দেব? এই শোন, আমাদের এত সময় নেই। তুই ভেতরে গেলে চল নইলে এখান থেকে ভাগ।
না না চলো চলো।
.
রীতিমতো ভয়ে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে বাড়ির ভিতর ঢুকে গেল মেয়েটি। হারিয়ে গেল।
.
বসের মুখে বাঁকা হাসি। মনের মধ্যে লাড্ডু ফুটলেও ফুটতে পারে। সামনে যে বউটা দাঁড়িয়ে মন্দ না। বুকের সাইজ বেশ ভালোই। খানিকটা ক্লিভেজ নিজে থেকেই বেরিয়ে এসেছে। বউটার খেয়াল নেই। মাটিতে লজ্জায় পা ঘষছে। লজ্জা কী পুলিশের কাছে? এখন তো নিশ্চিন্ত। আমার লোকেরা তোমার হারামি বরকে ধরে অ্যায়সান ক্যালানি দেবে জীবনে আর তোমার নাম করবে না। গায়ের ফরসা রংটা অভাবে আর অত্যাচারে মরে এসেছে। বস বলে, বাদল একে তৈরি করে দে।
তৈরি মানে?
ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করে বউটা। বস বলে, এইরকম ছেঁড়া শাড়ি পরে যাবে নাকি? আমাদের কাছে ভালো জামাকাপড় আছে। যাও পরে নাও। বলেই চলে যাচ্ছিল। কিন্তু পরক্ষণেই ঘুরে তাকিয়ে বস বলল, তুমি শহরে কাজ করবে? বউটা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দেয়।
বেশ। দেখছি। যাও যাও। ঝটপট তৈরি হয়ে নাও। ও, তোমার
নামটাই তো জানা হল না। কী নাম তোমার?
লক্ষ্মী।
বাহ। সত্যিই তুমি লক্ষ্মী।
বাদল আর তার সহকারীরাও বেশ খুশি হল। বসের ঠোঁটে হাসি দেখা গেছে। এতক্ষণ তো চাবুকের ডগায় নাচাচ্ছিল। লক্ষ্মী সত্যিই সবদিক দিয়ে লক্ষ্মীমন্ত।
বাদল লক্ষ্মীকে নিয়ে ঘরে ঢোকে। সেই ঘরেই আরও পাঁচটা মেয়ে চুড়িদার আর শাড়ি পরে শুকনো মুখে বসে। মেয়েগুলো মরা মাছের মতো চোখ তুলে তাকায় লক্ষ্মীর দিকে। বাদল লক্ষ্মীকে কাচা একটা শাড়ি দিয়ে বলে, নাও পরে নাও।
বাইরে যাও।
কেন?
তোমার সামনে শাড়ি পরব নাকি? বাইরে যাও।
ব্যাঁকা ঠোঁটের হাসি ঝেড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে লক্ষ্মীও ভিতর থেকে ছিটকিনি দিয়ে দেয়। ঘুরে ঢাকায় মেয়েদের দিকে। একটি মেয়ের দিকে এগিয়ে যায় লক্ষ্মী। বলে, তুমিই মালা? মালা অবাক হয়ে চোখ তুলে তাকায়।
.
