২
শিবাঙ্গী আর স্বয়ম্ভু তো থ। অভি বড়ো আস্তিকও এমন গলাবাজি করে ভগবানকে ডাকে না। ভূপেন কাকে ডাকছে? দরজা ঠেলে ঢুলে এল সেই বয়স্ক মালি। একটা চোখ ঘোলাটে। সামনে এসে বসতেই শিবাজী বলে উঠল, আপনার নাম ভগবান?
আজে ম্যাডাম।
পদবী জিজ্ঞেস করল স্বয়ম্ভু। ভাঙা গলায় জবাব এল, ভগবান দাস।
ঈশ্বর কে হয় আপনার?
স্বয়ম্ভুর প্রশ্ন। আমার ছেলে।
এই একটাই ছেলে?
ভগবান দুপাশে মাথা নেড়ে জবাব দিল, এ আমার ছোটো ছেলে। বড়ো ছেলে পরমেশ্বর করোনায় মারা গেছে।
ও সরি। স্ত্রী?
ক্যান্সার। বিছানা ছেড়ে উঠতে পারে না।
চিকিৎসা করান?
দাদাবাবু আছেন তাই হচ্ছে।
এখানে কত বছর আছেন?
ঘোলাটে চোখটা কুঁচকে তাআআআআ শব্দটাকে একটু টেনে উত্তর দিল, নয় নয় করে বারো তেরো বচ্ছর তো হবেই।
প্রতিদিন কাজে আসেন?
আজ্ঞে।
ভগবানের মাথাটা ডান দিকে হেলে পড়ল। স্বয়ম্ভু জিজ্ঞেস করল, কথাকলিকে শেষ কবে দেখেছেন?
পরশুদিন সকালেই বোধহয়। তাই না ভগবান?
ভূপেন ফুট কাটল। যথারীতি স্বয়ম্ভু খানিক ক্ষিপ্ত হয়েই বলে উঠল, ভূপেনবাবু, ভগবান তো কথা বলতে পারেন। ওদের উত্তরগুলো ওদেরকেই দিতে দিন। শিবাঙ্গী প্রশ্নটা আবার করল ভগবানকে। আসলে আমি যখন আসি তখন দিদিভাই কলেজ চলে যায়। তাই আমার সঙ্গে ছুটির দিন ছাড়া তেমন একটা দেখা হয় না।
শেষ কবে দেখেছেন?
ওই তো, ওই পরশুদিনই দেখেছি।
সকালে?
হ্যাঁ।
কটা নাগাদ?
ভগবান ঘড়ি পরে না স্বয়ম্ভুবাবু।
আবারও ভূপেন।
আপনি যদি এইভাবে উত্তর দিতে থাকেন তাহলে আমি বাধ্য হব আপনাকে এখান থেকে চলে যেতে বলতে। নিয়ম মতো সেটাই করা উচিত। নেহাত সোমেনবাবু বললেন তাই…
সরি।
দুঃখ প্রকাশটা যে বাধ্য হয়ে সেটা গলার স্বরেই প্রকাশ পেল।
.
বলুন ভগবানবাবু, সকাল কটায় দেখেছেন?
সাড়ে দশটা।
কী করে বুঝলেন?
.
একটা জিনস আর শার্ট পরে বাড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে এল কথাকলি। ডান হাতের আঙুলে গাড়ির চাবি ঘুরে চলেছে বনবন করে। আর বাঁ-হাতে কানে মোবাইল ধরা, আরে বাবা, এত টেনশন কেন করছিস? জাস্ট টেন টু ফিফটিন মিনিটস দে। আমি পৌঁছে যাচ্ছি। বাজে বকিস না। রাত অবধি শিবাংশু যদি বকবক করে আমি ফোন রেখে দিতে পারি? বলেই বাগানের পাশের সরু রাস্তাটা দিয়ে গাড়ির দিকে এগোতে এগোতে হেসে গড়িয়ে পড়ল। ভগবান তখন খুরপি দিয়ে ফুলগাছের মাটি খুঁড়ছে। কানে এল কথাকলির কথা, প্লিজ প্লিজ শোন, এখন সাড়ে দশটা বাজে তো। আমি জাস্ট পৌনে এগারোটায় রিচ করে যাচ্ছি। আমার স্পিড তো জানিসই তোরা। বলেই আবার খিলখিলিয়ে হাসি। ভাগ শালা। অসভ্য!
.
গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেল দিদিভাই।
কথাকলি নিজে ড্রাইভ করে?
হ্যাঁ।
ভূপেনের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করাতে এবারের উত্তরটা ভূপেনই দিল। শিবাঙ্গী বলল, ও কি বার্থ-ডে পার্টিতেও গাড়ি নিয়ে গেছিল?
হবে।
হুম। কিন্তু গাড়িটা আমাদের কনসার্ন নয়। মেয়েটাকে ফেরত পেলেই
ভুল করছেন। মেয়েটা তো গাড়িটার মধ্যেই আছে। আর গাড়ির মধ্যে থেকে একটা মেয়েকে কিডন্যাপ করা এত সোজা না। হতেও পারে কোনো দুর্ঘটনা ঘটেছে।
পারে। তো?
তো মানে? মেয়েটা যে নিজে গাড়ি ড্রাইভ করে বেরিয়েছিল ভার ইনফরমেশন পুলিশের কাছেও তো নেই। কেন?
স্বয়ম্ভুর কপালের দুপাশের রগ দুটো ফুলে উঠল। আপনাদের একবারও মনে হল না এটা একটা বড়ো তথ্য?
এখন তো জানলেন। খুঁজে দেখুন।
ভূপেনের ব্যবহার শুরুতে যত নম্র, অমায়িক ছিল এখন ধীরে ধীরে সেটা রুক্ষ হতে শুরু করেছে। মন্ত্রীর ভাই বলে রেলা নিচ্ছে।
ভগবান তুমি যাও।
স্বয়ম্ভুর পারমিশন না নিয়েই মালিকে ঘরছাড়া করল ভূপেন। হাঁক দিল, মতিইইই!
লাগবে না। এখনকার মতো এইটুকুই এনাফ।
ঝাঁঝের সঙ্গে কথাটা বলে উঠে দাঁড়াল স্বয়ম্ভু। গটমট করে বেরিয়ে এল।
.
বাড়ি ছাড়ার আগে সোমেনের দরজায় আবারও ঠক ঠক করল। সোমেন বিছানায় একইভাবে বসে আছে। ডাক্তার নেই। তখন বাইরে যারা দাঁড়িয়েছিল এখন তারা সোমেনকে ঘিরে রেখেছে। সরি আরেকবার বিরক্ত করছি। এ বাড়ির সিসিটিভির ফুটেজগুলো লাগবে। লাস্ট সাতদিনের। স্বয়ম্ভু দাবি করল। সোমেন বলল, পাবেন না।
কেন?
ওগুলো সব বন্ধ।
বুঝলাম না। বাড়িতে এতগুলো সিসিটিভি সব বন্ধ? তাহলে ক্যামেরাগুলো ঝুলিয়ে রেখেছেন কেন?
কস্তুরীর পাগলামি। বাড়ির সবার ওপর নজর রাখবে সারাক্ষণ। বাড়ির লোকের ওপরেই যদি বিশ্বাস না করতে পারি তাহলে আপামর জনগণের ওপর কীভাবে বিশ্বাস করব বলতে পারেন? তারাই বা আমার ওপর কীভাবে বিশ্বাস করবে? ভগবান এখানে প্রায় বারো-তেরো বছর কাজ করছে, তার ছেলে সেই ছোট্ট থেকে এখানে আসে। মতি রান্না করে তা নয় নয় করে আট বছর। মাঝে একটা ঠিকে লোক ছিল। তা সে তো করোনাতে মরে গেল। তারপর থেকে ওই ঈশ্বরই সব কাজ করে। এ ছাড়া আমি, কস্তুরী আর কলি, এই তো কটা লোক। তাই আমি ওসব বন্ধ করে দিয়েছি।
বাইরের লোকজন কিন্তু আপনার বাড়িতে কম যাতায়াত্ করে না। সবাই যে ভালো সেটা কি বুকে হাত রেখে বলতে পারেন? কে বলতে পারে হয়তো আপনার চেনা কোনো লোকই কলিকে সরিয়ে দিয়েছে।
.
সোমেন চোখ পাকিয়ে উঠে বসল। কী বলছেন? এ-রকম কিছু পেয়েছেন নাকি? ঘরের মধ্যে থাকা বাইরের লোকজনের মুখ শুকিয়ে আমশি। এবার কি তাদেরও ধরে ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করবে নাকি?
আপনার মেয়ে যে গাড়িটা চালাত তার ডিটেলস দিন। পুলিশের কাছে রিপোর্টে এটার উল্লেখ করেননি কেন? আপনার মেয়ে কোথায় পার্টি করতে গিয়েছিল সেটা আশা করি জানেন।
ভার্দে ভিস্তা।
সাউথে। গড়িয়া স্টেশনের দিকে।
.
শহুরে কোলাহল ফুঁড়ে গাড়ি ছুটছে। স্বয়ম্ভু মোবাইলে ঠাকুরপুকুর থানার ওসিকে ধরে বলল, ভার্দে ভিস্তায় পরশু দিনের পার্টি ছিল। কারা ভেনু বুক করেছিল এখনি খোঁজ নিয়ে জানান। সোমেনবাবু তো কিছুই বলতে পারলেন না। শিবাঙ্গীও মোবাইলে কাউকে ফোন করার ট্রাই করছিল। না পেয়ে নিজের মনেই ঠোঁট উলটাল।
কী হল? এখনও পেলে না?
স্বয়ম্ভু জানতে চাইল। না স্যার। বেলা এগারোটা বেজে গেল এখনও ফোন বন্ধ কেন সেটাই ভাবাচ্ছে। এক কাজ করি স্যার, নম্বরটা আমাদের সাইবার সেলে দিয়ে ট্র্যাক করতে বলি। যদি কোনোভাবে পায় তাহলে আমাদের সঙ্গে কথা বলিয়ে দেবে।
দাও। তবে মনটা বড়ো কু ডাকছে শিবাঙ্গী। মেয়েটার ফোন আর খুলবে বলে মনে হয় না।
কেন?
সোমেনবাবুর বাড়ি থেকে একমাত্র ঈশিতার বাড়িতেই ফোন গেল। আর তারপর থেকেই সুইচড অফ।
শিবাঙ্গী অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে স্বয়ম্ভুর দিকে তাকাল। স্বয়ম্ভুও শিবাঙ্গীর দিকে চাইল। শিবাঙ্গী বলল, আরও একটা মেয়ে?
ঠিক তাই। কথাকলির বাবা এম.এল.এ বলে খবরটা রাষ্ট্র হয়েছে। কিন্তু ঈশিতা তো তা নয়।
গাড়িসুদ্ধু কিডন্যাপ করে নিয়ে গেল?
শিবাঙ্গীর প্রশ্ন শুনে লাফিয়ে উঠল স্বয়ম্ভু, ও হো দেখেছ কাণ্ড। গাড়িয় ডিটেলসটাই তো দেওয়া হল না ঠাকুরপুকুর থানার ওসিকে।
স্যার কোথায় যাব এখন?
ড্রাইভার প্রশ্ন করল। স্বয়ম্ভু ব্যোমকে গিয়ে শিবাঙ্গীকে বলল, কী হচ্ছে বলো তো আমার! অ্যালজাইমার ধরে গেল নাকি? সঞ্জয়কে এটাও বলিনি?
ধুস।
আলতো হেসে-কথাটা উড়িয়ে দিল শিবাঙ্গী। স্বয়ম্ভু ড্রাইভার সঞ্জয়কে বলল, ভার্দে ভিস্তা চলো। চেনো তো?
হ্যাঁ স্যার। আমি তো নয়াবাদেই থাকি।
বাহ তাহলে তো ভালোই।
শিবাঙ্গী অবাক হয়ে প্রশ্ন করল, এই তো ওসিকে বললেন ইনফরমেশন জানতে।
ভালো জায়গা। দারুণ দারুণ সব খাবার পাওয়া যায়।
সেই। আপনি তো খেতেই যাচ্ছেন!
স্বয়ম্ভু ফোন কানে দিয়ে বলল, হ্যাঁ মিস্টার মুখার্জি, শুনুন আমি একটা গাড়ির ডিটেলস পাঠাচ্ছি। এখুনি ট্রেস করুন। সোমেনবাবুর মেয়ের গাড়ি। সব কটা থানায়, বর্ডারগুলোতে সর্বত্র ছড়িয়ে দিন। আর একটা কাজ করুন, আমি ভার্দে ভিস্তাতে যাচ্ছি। পঞ্চসায়র পুলিশকে ইনফর্ম করে দিন। যদি দরকার পড়ে ডাক পাঠাব।
.
ভার্দে ভিস্তা পৌঁছোতে পৌঁছোতেই ঠাকুরপুকুর থানার ওসি স্বয়ম্ভুকে জানিয়েছে পরশু দুজনের বার্থ-ডে পার্টি ছিল। একজন ভার্দে ভিস্তার পাশের কমপ্লেক্সে থাকে। নাম রায়সা পণ্ডিত। বয়স পঁয়ত্রিশের ওপর। অবাঙালি। আরেকজন কালিকাপুরে বাইপাসের কাছে অভিদীপ্তা এনক্লেভে থাকে। নাম আয়াংশ বিশ্বাস। বয়স আঠেরো।
রায়সা পণ্ডিত কোনোভাবেই নয়। হলে একমাত্র আয়াংশ হতে পারে।
শিবাঙ্গী বলল। স্বয়ম্ভু বলল, বয়স হিসাব করলে সেটাও দাঁড়াচ্ছে না। কথাকলির কুড়ি বছর। বাড়ির লোকের কথা অনুয়ায়ী সে তার বন্ধুর জন্মদিনের পার্টিতে গেছিল। দুবছরের ছোটো বন্ধু!
স্যার, গাড়িটা ভিতরে ঢুকিয়ে দিই?
সঞ্জয়ের কথায় স্বয়ম্ভু ভাবনার জগত থেকে বাস্তবে এসে পড়তেই দেখল বাঁ-হাতেই ভার্দে ভিস্তার বড়ো গেট। স্বয়ম্ভুর নির্দেশ পেয়ে গাড়িটা একেবারে সোজা ঢুকে এন্টেন্সে গিয়ে দাঁড়াল। গাড়ি থেকে নেমেই হাত উলটে ঘড়ি দেখল স্বয়ম্ভু। তাই ভাবি এত খিদে কেন পেয়েছে। পৌনে একটা বেজে গেছে। খিদে পাওয়ার কারণ ঘড়ি নয়, রেস্তোরাঁ। শিবাঙ্গী ফিকফিক হাসন।
স্বয়ম্ভু আর শিবাঙ্গী আসার খবর পেয়েই দৌড়ে এল ম্যানেজার। ঘন নীল রঙের ব্লেজার পরা প্রায় ছয়ফুটের কাছাকাছি লম্বা ফরসা একটা লোক। চেহারায় আভিজাত্য ঠিকরে পড়ছে। ক্লিন শেভ। হাউ ক্যান আই হেল্প ইউ স্যার?
.
সিসিটিভি রেকর্ডিংয়ে আয়াংশ বিশ্বাসের জন্মদিনের পার্টির ভিডিয়ো চলছে। স্বয়ম্ভু আর শিবাঙ্গী তীক্ষ্ণ নজরে নিরীক্ষণ করছে প্রতিটা ক্যামেরা। গেস্টদের আসা যাওয়া, খানাপিনা, নাচা-গানা। কিন্তু কোথাও কথাকলি নেই। প্রায় একঘণ্টার ওপর ভিডিয়ো চেক করার পর স্বয়ম্ভু নিজের পেটের নানান জায়গা টিপতে থাকে। মুখে অসম্ভব বিরক্তির ছাপ।
না, চলো শিবাঙ্গী। লাঞ্চটা এখানেই সারা যাক।
ওয়েলকাম স্যার। আপনারা সিট চুজ করে বসুন। আমি লোক পাঠিয়ে দিচ্ছি। যে এখানকার সবচেয়ে স্পেশ্যাল আইটেমগুলো আপনাকে বলে দেবে।
থ্যাংক ইউ। চলো শিবাঙ্গী।
.
সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে খাবার জায়গা বেছে নিল স্বয়ম্ভু আর শিবাঙ্গী। কিছুক্ষণের মধ্যে একজন ওয়েটার এসে পছন্দসই খাবার সার্ভ করে দিয়ে গেল। কাচের প্লেটে টুংটাং শব্দ।
মেয়েটা মিথ্যে বলেছে স্যার। এখানে মোটেও আসেনি। অন্য কোথাও গেছে।
শিয়োর?
হ্যাঁ স্যার। জানে বাড়ি থেকে বাপ-মা কেউ মাথা ঘামায় না। তাই তাদের যা খুশি তাই বলে দিলেই হল।
যদি সেটাও ধরে নিই তাহলে সোমেনবাবু হঠাৎ করে মেয়েকে কেউ কিডন্যাপ করেছে এটা বললেন কেন? ওনারা কাউকে সন্দেহ করছেন?
বললেন তো বিরোধীপক্ষ।
আরে ওটা তো ওদের মুখের বুলি….
কথাটা বলেই আটকে গেল স্বয়ম্ভু। ভাবনার কোণে লুকিয়ে থাকা অন্ধকার থেকে একচিলতে আলো ঠেলে উঠল, আচ্ছা, এমন নয় তো, নিজের মেয়েকে নিজেই কোথাও পাঠিয়ে দিয়ে একটা শোরগোল ফেলেছে ইচ্ছে করে।
লাভ?
অপোনেন্ট পার্টিকে কোনোভাবে দুষে লোকের চোখে অপরাধী বানানো। বা…
বা?
শিবাঙ্গী ভুরুতে ভাঁজ ফেলে সোজাসুজি স্বয়ম্ভুর দিকে তাকিয়ে আছে। -খোচর লাগাও শিবাঙ্গী। এই সোমেন সরকার এম.এল.এ হওয়ার আগে প্রোমোটার ছিলেন। সঙ্গে সিমেন্ট বালি ইট লোহা সব এক্সপোর্ট-ইম্পোর্ট করতেন। সেই সময়ে একটা বাজে কেসে ফেঁসে গিয়েছিলেন।
কী কেস?
সম্ভবত সিমেন্ট বালি ইট এক্সপোর্ট ইম্পোর্টের আড়ালে নাকি উনি বাচ্চা পাচার করতেন। সেটা নিয়ে বেশ কিছুদিন জলঘোলা হয়েছিল। এখনকার সরকার তখন সবে ক্ষমতায় এসেছে। এই সোমেনকে দিয়ে বেশ কিছু বড়ো বড়ো জায়গায় দানখয়রাত করিয়ে মিডিয়ার সামনে সোমেন সরকারকে একজন ধোপদুরস্থ সাদামাটা সৎ লোক বলে প্রমাণ করে দেয়। আজ শুনলে না, ভগবান দাসের স্ত্রীর চিকিৎসা উনিই করান। এমন আরও অনেকেরই মঙ্গলসাধন করেন সোমেন। স্বভাবতই কেসটা ধামাচাপা পড়ে যায়। খোচর লাগিয়ে জানতে চেষ্টা করো এই সময় আড়ালে বেনামে সোমেন সরকার ঠিক কী কী কাজ করছেন? হয়তো এমন কোনো কাজ করছেন যাতে সেদিকে কারও দৃষ্টি পড়ার আগেই অন্য একটা সিম্প্যাথেটিক ইস্যুতে লোকজন, প্রশাসন ও মিডিয়ার চোখ ঘুরিয়ে দিলেন।
নিজের মেয়েকে স্কেপগোট করলেন?
বাওয়া! মুখখানা অমন হয়ে গেল কেন?
শিবাঙ্গীর মুখটা সত্যিই দেখার মতো হয়েছে। নিজের মেয়েকে শিখণ্ডী করে নিজের পাপ কাজ হাসিল করবে কোনো বাবা এটা ভাবতেই পারছে না। স্বয়ম্ভু বলল, সবার বাবার মুখে নিজের বাবার মুখ বসাতে যেয়ো না। শেখর মেসোর মতো লোক আজকাল দুষ্কর। শেষের এই একটা কথা শিবাঙ্গীর মুখটাই পালটে দিল। সুর টেনে বলল, উমমমহ! শেখর মেসোকে কত যেন চেনেন! আজ অবধি একবারও আমার বাড়ি গেলেন? বাবা-মা অতবার করে বলল!
আঃ ফোনে তো কথা হয়েছে। মানুষের কথা শুনলেই বোঝা যায় সে কেমন মানুষ!
তাহলে আর খামোখা খোচর লাগাতে বলছেন কেন? সোমেন সরকারের মতো লোক হয় নাকি? কী ভালো ব্যবহার!
দুহাতে দুটো চামচ ধরে ভ্যাবলার মতো শিবাঙ্গীর দিকে চেয়ে স্বয়ম্ভু বলল, ব্যস, একটা চান্স পেয়েছ কি ঠুকে দিলে অ্যাঁ?
চাল কখনও ছাড়তে নেই শিবাঙ্গী। সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে শেখো। কে যেন বলেছিল?
বলেই টপ করে চিকেনের টুকরোটা মুখে পুরে দিল শিবাঙ্গী।
মেলা না বকে খাও। অনেক কাজ আছে।
.
খাওয়ার শেষে বিলের জন্য বসে আছে স্বয়ম্ভু। সেই ফাঁকে মোবাইলে কথাকলির ছবিটা বের করে ভালো করে নিরীক্ষণ করছে। জুম করে দেখল ঠোঁটের নিচে ডান দিকে বিন্দুর মতো ছোট্ট একটা তিল। চট করে ধরা পড়ে না। কপালের ওপর চুলগুলো চামরের মতো নেমেছে। কানের দুপাশ দিয়েও ঝাঁটার ফুলের মতো চুলগুলো ডিম্বাকৃতি হয়ে মুখটাকে দুপাশ থেকে যেন আগলে রেখেছে। কথাকলির যে ছবিটা ঘরে টাঙানো ছিল সেখানে চুলের স্টাইলটা একদম আলাদা। হঠাৎই মোবাইলের স্ক্রিনে কথাকলির ছবির ওপর আরেকটা কারও ছায়া ফুটে উঠল। ঝট করে মুখটা পিছনে ফেরাতে দেখল ওয়েটার দাঁড়িয়ে। কমবয়সি ছেলে। এতক্ষণ যে খাবার সার্ভ করছিল এ সে নয়। স্বয়ম্ভু আচমকা ঘাড় ফেরাতে চমকে উঠল ছেলেটি। বি….বিলটা স্যার। কথা বলতে গিয়ে আটকে গেল। ছেলেটি টেবিলে মশলার সঙ্গে বিলটা রেখে চলে যাচ্ছিল। স্বয়ম্ভু ডাকল, শোনো।
স্যার!
ছেলেটি ঘুরে তাকাল। কথাকলির ছবিটা ছেলেটির সামনে ধরে বলল, মেয়েটিকে চেনো? মুখে যেন কষ্ট করে হাসি ফুটে উঠল ছেলেটির। না স্যার!
ঠিক করে বলো। একে কোথাও দ্যাখোনি?
দেখেছি স্যার।
কোথায়?
টিভিতে। আজ সকাল থেকে নিউজ চ্যানেলে এই মেয়েটির ছবি দেখাচ্ছে। সেখানেই দেখেছি।
.
স্বয়ম্ভু আর শিবাঙ্গী বেশ হতাশই হল। বিল মিটিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল দুজনে। গাড়িতে ওঠার আগে হঠাৎ করেই থেমে গেল শিবাঙ্গী।
কী হল উঠে এসো।
গাড়ির ভিতর থেকে স্বয়ম্ভু ডাকল। শিবাঙ্গী বলল, স্যার, আরেকবার সিসিটিভির ফুটেজগুলো চেক করলে হয় না?
কেন?
ওয়েটার ছেলেটি মিথ্যে বলছে। ও চেনে কথাকলিকে। অ্যাটলি দেখেছে।
গত পরশুর দুটো ইভেন্টই তো দেখলাম।
স্যার, তার আগের দিনেরটা যদি একবার চেক করা যেত.. আসলে এখানে তো হরদম ইভেন্ট লেগেই থাকে।
ওকে। চলো।
.
ম্যানেজার বলল, পরশুর আগের দিন একটাই জন্মদিনের ইভেন্ট ছিল। সঙ্গে আরেকটা বিবাহ বার্ষিকীর অনুষ্ঠান।
ওই জন্মদিনেরটা দেখতে চাই।
.
স্বয়ম্ভুর কথামতো ব্যবস্থা হল। দুটো এল ই ডি স্ক্রিনের খোপ খোপ করে বারোটা ক্যামেরা চলতে থাকল। প্রায় কুড়ি মিনিট দেখার পর দেখা গেল রাত আটটা কুড়ি মিনিটে বেশ বড়োসড়ো গিফট হাতে ঢুকছে কথাকলি। গিফটের আকার এতটাই বড়ো ছিল যে প্রথমে মুখটাই ঢেকে গিয়েছিল। তারপর ক্যামেরার কাছাকাছি আসতে মুখটা স্পষ্ট হল। পরনে নীলের ওপর ঘন নীল স্ট্রাইপ দেওয়া শর্ট স্কার্ট। দেখে মনে হচ্ছে গায়ের কাপড়ে কেউ যেন আঁচড় কেটেছে। বেশ খানিকটা ক্লিভেজ বেরিয়ে আছে। একটি ছেলে জড়িয়ে ধরে গালে গাল ঠেকিয়ে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাল কথাকলিকে। কথাকলিও বেশ গদগদ হয়ে ছেলেটির গায়ে ঢলে পড়ল। আরও বেশ কিছু বন্ধুবান্ধবী কথাকলিকে নিয়ে ভেনুর ভিতরের আকাশ খোলা জায়গাটায় নিয়ে গেল। তাকে দেখতে পেয়ে দুহাত বাড়িয়ে আরও একটি ছেলে চকচকে ব্ল্যাক প্যান্ট আর ফুলবাহারি রংচঙে আলুথালু শার্ট পরে এগিয়ে এল। উপহার গ্রহণ করে একজন সাদা পোশাক পরা অ্যাটেন্ডেন্টের হাতে সেটা দিয়ে কথাকলিকে জড়িয়ে ধরে প্রায় কোলে তুলে নেয়। সেই দেখে সমবয়সিদের সে কী আহ্লাদ। ছেলেটা তো পারলে কথার বুকে মুখ গুঁজে আদর করে দেয়। খানিক অস্বস্তিতে স্বয়ম্ভু আড়চোখে চাইল শিবাঙ্গীর দিকে। বিড়বিড় করল স্বয়ম্ভু, এই জন্য মা-ঠাকুমারা ছেলেমেয়েদের একসঙ্গে মিশতে দিত না। শিবাঙ্গী মুচকি হাসল। ম্যানেজারও বেশ রঙ্গ অনুভ করল কথাটাতে। হঠাৎ স্বয়ম্ভু ভিডিয়ো পজ করার জন্য উত্তেজিত হয়ে উঠল। তারপর জুম। একজন ওয়েটার ড্রিংক্স হাতে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে কথাকলি আর তার বন্ধুদের ঢলাঢলি দেখছে। বাকিরা আশেপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু সেই ছেলেটির কোনো হেলদোল নেই। চোখে-মুখে যে তার বেশ একটা মজার ভাব আছে এমনটাও নয়। কোনো প্রশ্ন করার আগেই মানেজার বলল, স্যার কোনো প্রবলেম?
এই ছেলেটিকে একটু আগে আপনাদের এখানেই দেখলাম মনে
হ্যাঁ স্যার। এ তো আমাদের স্টাফ। নিখিল মণ্ডল।
কতদিন কাজ করছে?
দেড় বছর।
.
ফুটেজ আবার চলতে শুরু করে। খানাপিনা, নাচা-গানা যেমন হয় সব তেমনই চলছে। শুধু বেশ কিছু জায়গায় ভিডিয়ো পজ হল নিখিলের জন্য। কথার আশেপাশেই ছেলেটি ঘুরঘুর করছে। একটা ফুটেজে লক্ষ করা গেল কথাকলি নিখিলের হাতে ধরা ট্রে থেকে একটা ড্রিংক্স তুলেও রেখে দিল। তারপর মুখ ঘুরিয়ে চলে গেল। ব্যাপারটা ম্যানেজারের নজরেও পড়ে
নিখিলের ভিটেলসটা আমায় দিন। আর নিখিলকেও ডাকুন।
ওকে স্যার।
বলেই ইন্টারকম ভুলে কাউকে একটা হুকুম করল ম্যানেজারের রুমে নিখিলকে পাঠাবার জন্য। নিখিল আসতে আসতেই আরও এক কাণ্ড, কথাকলি একটি মেয়ের সঙ্গে বচসায় জড়িয়েছে। বেশ আঙুল তুলে কথা বলছে। জুম করে দেখা গেল মেয়েটির কাঁধে কথাকলি ধাক্কা দিল। সেই মেয়েটিও তেড়ে এল। পাশ থেকে আরও দুজন মেয়ে ব্যাপারটাকে সামলাবার চেষ্টা করছে। এর মধ্যেও দূরে দাঁড়িয়ে নিখিল।
.
আসব স্যার?
দরজা ফাঁক করে কথাটা বলেই একটু যেন থমকে গেল নিখিল।
হ্যাঁ নিখিল এসো। স্যারেরা তোমার সঙ্গে কথা বলবেন।
ধীর পায়ে এগিয়ে এল নিখিল। স্বয়ম্ভু চোখগুলো ছোটো করে ঠোঁট টিপে হাসল নিখিলের দিকে চেয়ে। নিখিলও বোকার মতো চেয়ে থেকে চোখটা এপাশ-ওপাশ করতে লাগল।
কোনদিকে তাকাবে বুঝতে পারছ না ভাই নিখিল?
স্বয়ম্ভুর কথা নিখিলের চোখদুটোকে আরও চঞ্চল করে তুলল।
গোয়েন্দার চোখে ফাঁকি দেবে? উঁ?
এবার ম্যানেজারের চোখ পিটপিট করছে। কী ব্যাপার স্যার? নিি কি কিছু করেছে?
আলবাত করেছে। মিথ্যে কথা বলেছে। কেন বললে ভাই নিখিল?
বলেই কম্পিউটারের মুণ্ডুটা নিখিলের দিকে ঘুরিয়ে বলল, এই মেয়েটিকে তো তুমি চেনো।
নিখিল সিসিটিভির ফুটেজটা ভালো করে দেখে বলে, এই জন্য আজ সকাল থেকে মেয়েটাকে চেনা চেনা লাগছিল। মনে করতে পারছিলাম না কোথায় দেখেছি।
বেশি ওভারস্মার্ট হওয়ার চেষ্টা কোরো না নিখিল। শুধু এই পার্টিতেই নয়। এর অনেক আগে থেকে কথাকলি সরকার তোমার পরিচিত। তাই তো?
না না স্যার। আমি কীভাবে ওনাকে চিনব?
তোমার স্কুলিং কোথায়?
স্কুল?
আমতা-আমতা করল নিখিল।
হ্যাঁ, স্কুল। ভুলে যাওনি নিশ্চয়ই।
ক্যালকাটা পাবলিক স্কুল।
.
শিবাঙ্গী মুহূর্তে মোবাইল বের করে কী যেন করতে শুরু করল।
আর কলেজ?
যাইনি স্যার।
যাওনি! কেন?
বাবা মারা গেল। ছোটো ভাই আছে। সংসারের হাল ধরতে কাজে নেমে পড়তে হল।
.
শিবাঙ্গী মোবাইলটা স্বয়ম্ভুর চোখের সামনে ধরল। নিখিলের দিক থেকে চোখটা নিমেষের জন্য নামিয়ে মেপে মোবাইলটা দেখে আবার প্রশ্ন করল, তোমার বয়স কত?
টোয়েন্টি ওয়ান প্লাস।
বাহ। খাপে খাপ পঞ্চার বাপ!
ম্যানেজার ভড়কে ভ। মানে স্যার? স্বয়ম্ভু বলল, মানেটা হল কথাকলি সরকার নিখিলের ক্লাসমেট বা এক বছরের জুনিয়র। দুজনের স্কুলিং একই। ক্যালকাটা পাবলিক স্কুল।
নিখিল ম্পিক আউট। স্যার যা বলছেন তা সত্যি? তুমি এই মেয়েটিকে চিনতে?
.
নিখিল নিরুত্তর। চোখে আর চঞ্চলতা নেই। স্থির মাটির দিকে তাকিয়ে।
নিখিল স্পিক আউট। সত্যিটা বলো। ওকে যদি চিনতেই তাহলে মিথ্যে বললে কেন?
ম্যানেজার খানিক কড়া গলাতেই জিজ্ঞেস করল। গলার নলিটা ওপর নিচে নড়ে উঠল নিখিলের।
লোকাল পি এসকে খবর দিন সুজয়বাবু। কথাকলি নিরুদ্দেশের সাসপেক্ট হিসেবে নিখিলকে আমরা জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যাব।
স্বয়ম্ভু বলল।
এইবার চড়বড় করে ফুটে উঠল নিখিল। হাতজোড় করে বলল, প্লিজ স্যার। আমাকে নিয়ে যাবেন না। বিশ্বাস করুন আমি কথাকলির ব্যাপারে কিচ্ছু জানি না। এটা ঠিক যে আমাদের স্কুলিং একই। ও আমার থেকে এক বছরের জুনিয়র ছিল। বাট স্কুল ছাড়ার পর আর আমাদের একদিনের জন্যেও সাক্ষাৎ হয়নি। সেদিন পার্টিতে অনেকদিন বাদে কথাকলিকে দেখে অবাক হয়েছিলাম। ও আমায় দেখেও চিনতে পারছিল না।
মিথ্যে কথা। ও তোমাকে চিনেছিল বলেই তোমার হাত থেকে ড্রিংক্স নিয়েও রেখে দিয়েছিল। কিন্তু কেন? কী হয়েছিল তোমাদের মধ্যে?
আমাদের মধ্যে কিচ্ছু হয়নি স্যার। কথা এম.এল.এ-র মেয়ে আর আমি একজন সামান্য ওয়েটার। আমি সবার সামনে বলেছিলাম, কি রে চিনতে পারছিস আমায়? ও সরাসরি মুখের ওপর বলে দিয়েছিল কে আপনি? চিনতে পারছি না তো? আর একজন ওয়েটার হয়ে গেস্টকে তুই-তোকারি করছেন! সাহস তো কম নয়? আমি আর কিছু বলিনি। সরে আসি।
সেই অপমানেই ওকে কিডন্যাপ করলে?
নিখিল খ্যাঁক করে হেসে ফেলে। স্বয়ম্ভুর ভুরুতে বিদ্যুৎ। শিবাঙ্গী বলে, হাসছ কেন?
এখান থেকে বারো টাকা অটো ভাড়া দিয়ে গড়িয়া স্টেশন। তারপর সেখান থেকে মান্থলিতে বারুইপুর। সেখান থেকে নেমে পনেরো মিনিট পায়ে হেঁটে বাড়ি পৌঁছোই। রিক্সা আছে। কিন্তু অনেক ভাড়া। আমি কিনা অত বড়ো লোকের মেয়েকে কিডন্যাপ করব? যার কিনা নিজের একটা গাড়ি আছে?
বাবা! কথা তো ভালোই বলতে পারো।
শিবাজী বলল।
শুধু কথাই নয়, কাজেও করিতকর্মা। পার্টিতে অত কাজের মধ্যেও কথাকলির যে নিজের গাড়ি আছে সেটা ঠিক খবর নিয়ে নিয়েছে।
না স্যার, আমায় কোনো খবর নিতে হয়নি। কথাকলি বেরোবার সময় ওর এক বন্ধুকে বলল, চল আমি তোকে নামিয়ে দিচ্ছি।
ছেলেবন্ধু না মেয়েবন্ধু?
মেয়ে।
কী নাম ধরে ডেকেছিল?
নিখিল একটু চিন্তা করে বলল, ঈশিতা। আঁতকে উঠল শিবাদী আর স্বয়ম্ভু।
ঈশিতা?
স্বয়ম্ভু আর শিবাঙ্গী দুজনে দুজনের দিকে তাকায়। শিবাঙ্গী প্রশ্ন করে, আচ্ছা নিখিল সেদিন যার সঙ্গে কথাকলির ঝগড়া হচ্ছিল সেটা কী নিয়ে? তুমি তো পুরোটাই দেখছিলে।
কারণ জানি না। তবে…
.
নিখিল ড্রিঙ্কস সার্ভ করছে। সঙ্গে স্ন্যাক্স। বেশ জোরে পার্টি সং বাজছে। যদিও সে গানের কথা বুঝতে যাওয়া বাতুলতা মাত্র। এলাকা জুড়ে ঢিকচ্যাক টিকচ্যাক গুমগুম হয়েই চলেছে। তারই মাঝে হঠাৎ চিনচিনে দুটো স্বর সুচের মতো নিখিলের কানে এসে বেঁধে। শব্দের সরণি লক্ষ্য করে দৃষ্টি চালিয়ে দিতেই নিখিল দেখে আঙুল উচিয়ে গলার শির ফুলিয়ে কাকে যেন ধমকাচ্ছে কথাকলি। নিখিল এগিয়ে যায়। কথাকলি চিৎকার করে বলে, একদম বাপ তুলে কথা বলবি না। ঝগড়ার সঙ্গিনীটি রেলা নিয়ে পালটা দেয়, কেন রে? এম.এল.এ-র মেয়ে বলে? মাথা কিনে নিয়েছিস নাকি?
হ্যাঁ কিনেছি। আমি তোর বাবা-মাকে টেনেছি?
তোর বাপের মতো আমার বাবার তো আর কেচ্ছা কেলেংকারি নেই রে। টানবি কী করে?
সঙ্গে সঙ্গে কথাকলি অপরপক্ষের কাঁধের ওপর ঠেলা দেয়। মেয়েটি এক পা পিছিয়ে আসে।
গায়ে হাত তুলবি না কথাকলি।
বেশ করব। অসভ্য ইতর আনকালচার্ড।
সামনের জন অঙ্গ দুলিয়ে ভেংচে উঠল, ওরে আমার কালচারাল খানকি রে!
শাট আপ ব্লাডি বিচ।
মাটিতে পা ঠুকে খেপে উঠল কথাকলি। পাশ থেকে আরও দুজন মেয়ে আর একটা ছেলে এসে ব্যাপারটাকে থামাবার চেষ্টা করল। কিন্তু কে শোনে কার কথা? কথাকলিকে উদ্দেশ্য করে মেয়েটি বলল, পয়সা থাকলেই সব হয় না রে। পাপ পাপই থাকে। বিশ্বাস না হয় তোর বাপকে গিয়েই জিজ্ঞেস করা
পাশের একটি মেয়ে গলা চেপে বলে উঠল, এই মেঘা, কী সব বলছিস। চুপ করে যা।
কেন বে? চুপ করব কেন? ও এম.এল.এ-র মেয়ে বলে কি ওর গুয়ে গন্ধ হয় না? ও আবার আমার ফ্যামিলি তুলে কথা বলে। শোন কথাকলি, তোর বাবার হিস্ট্রি জিওগ্রাফি না এ শহরে কারও জানতে বাকি নেই। বললাম তো, সব নিজেই মিলিয়ে দেখে নে না। যা না, নিজেই খোঁজ করে নে তোর ফ্যামিলির হিস্ট্রি।
তোরা একটু থাম প্লিজ। এটা স্যামের বার্থ ডে ইভেন্ট। এখানে এসে এইভাবে…
তোদের মতো আম আদমিরা না আমাদের মতো সেলেবদের স্ক্যান্ডালাইজড করেই আনন্দ পায়।
দাঁতে দাঁত চিপে কথাগুলো বলে কথাকলি।
বালের সেলেব তোরা।
রগড়ে দেয় মেঘা। এক বান্ধবী কথাকলিকে টানতে থাকে। যাওয়ার আগে মেঘাকে মধ্যমা দেখিয়ে চুল ঝাঁকিয়ে জায়গাটা ছেড়ে বেরিয়ে যায় কলি।
.
গড়গড় করে সব কথা উগরে দিয়ে চুপ করে নিখিল। স্বয়ম্ভু আবার ভিভিয়ো চালিয়ে বলে, এখানে কে ঈশিতা আমায় দেখাও। যে মেয়েটি কথাকলিকে টেনে নিয়ে গেল নিখিল তাকেই ঈশিতা বলে চিহ্নিত করল।
পরক্ষণেই স্বয়ম্ভু সুজয় অর্থাৎ ম্যানেজারকে বলল, সেদিন যে ছেলেটির জন্মদিন ছিল তার অ্যাড্রেস ডিটেইলসটা দিন। আর এই ফুটেজগুলো আমাদের এখুনি দিন।
স্যার আমি যেতে পারি?
নিখিল নম্র কণ্ঠে প্রশ্ন করল। স্বয়ম্ভু বলল, আপাতত। তবে মনে রেখো, তুমি কিন্তু কথাকলির কেসে সাসপেক্টদের মধ্যে একজন। হয়তো এর সঙ্গে তোমার কোনো সম্পর্কই নেই। তাও। আরেকটা কথা, সেদিন কথাকলি কটায় এখান থেকে বেরিয়েছিল?
রাত সাড়ে দশটার পর।
এক্স্যাক্ট টাইম মনে নেই।
ঠিক আছে তুমি যাও।
ওকে স্যার।
.
নিখিল চলে যেতেই স্বয়ম্ভু সিসিটিভির অন্য ফুটেজ দেখে মিলিয়ে নিল কথাকলির বেরোবার সময়টা। রাত দশটা বিয়াল্লিশ।
.
গাড়িতে উঠে বসামাত্রই স্বয়ম্ভুর মোবাইলটা নীরবে কেঁপে উঠল। প্ৰদ্যুৎ কলিং।
হ্যাঁ প্ৰদ্যুৎ বলো।
ওপার থেকে প্রদ্যুৎ জানাল ঈশিতার বাড়ির ঠিকানা পাওয়া গেছে আর ওর মায়ের নম্বর।
কোথা থেকে পেলে?
কথাকলির ফ্রেন্ডলিস্টেই আছে ঈশিতা ভদ্র। আপনার পাঠানো ছবির সঙ্গে এরই মিল পেলাম। স্টাডিড অ্যাট সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ। কথাকলিও তাই। দিওয়ালির একটা ভিডিয়োতে ওর বাড়ির জায়গাটা চেক ইন করেছে। বেসিক্যালি কমপ্লেক্স।
কোথায়?
জোকায়। সোনাঝুরি এম্পায়ার।
ও বাবা, আমরা তো এখন এক্সট্রিম সাউথে। ওর মাকে ফোনে পেলে?
না স্যার। ওর মায়ের ফোনও সুইচড অফ।
মা মেয়ে দুজনের ফোনই বন্ধ!
স্বয়ম্ভু এটা পাশে বসে থাকা শিবাঙ্গীর দিকে তাকিয়ে বলল। পুরোপুরি না বুঝলেও শিবাঙ্গী আঁচ করল কার সম্পর্কে কথা হচ্ছে। স্বয়ম্ভু জিজ্ঞেস করল, কথাকলির ফোন ট্র্যাক করা গেছে? জানো কিছু?
প্রদ্যুৎ গলা তুলল, এই রঞ্জিত, কথাকলির ফোন ট্র্যাক হয়েছে? খুব ক্ষীণ গলার স্বর শুনতে পেল স্বয়ম্ভু। রঞ্জিত দূর থেকেই বলছে, এখনও সুইচড অফ!
এরও ফোন বন্ধ স্যার।
দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল স্বয়ম্ভু, বুঝেছি! প্ৰদ্যুৎ বলল, গত মঙ্গলবার যার বার্ধ ডে ছিল সে কোথায় থাকে এখনও জানতে পারিনি।
ভেনু থেকে পেয়ে গেছি। আমরা এখন সেদিকেই যাচ্ছি। নরেন্দ্রপুরে যে নতুন বাইপাস হয়েছে সেখানে সাউথ উইংসে থাকে।
ওকে।
.
ফোনটা কেটেই ঠাকুরপুকুর থানায় একটা ফোন করে ওসিকে ঈশিতার ঠিকানাটা দিয়ে বলল এখুনি একবার হানা দিতে। ফোনটা রাখতে না রাখতেই শিবাঙ্গী বলে উঠল, কথাকলি আর তার বন্ধুর সঙ্গে ওদের বাবা তুলে বেশিরভাগ ঝগড়া হয়েছিল।
যদি নিখিল সত্যি বলে।
কেন? ওই মেয়েটির বাবার সঙ্গে কি সোমেন সরকারের কোনো পুরোনো শত্রুতা আছে?
এই সব কিছু বোঝা যাবে ঈশিতাকে পেলে। স্যাম কিছু বললেও বলতে পারে। তবে তার সম্ভাবনা নেই মনে হয়। কারণ সে স্পটে ছিল না। শিবাঙ্গী কাল তুমি একটা কাজ কোরো তো, একটু ক্যালকাটা পাবলিক স্কুলে যেয়ো।
ওকে স্যার।
আচ্ছা শিবাঙ্গী, এমন না হোক কোনোদিন, জাস্ট বলছি। ধরো তুমি পুলিশে চাকরি করো না। একজন সাধারণ গৃহবধূ। যদি তোমার মেয়ে হঠাৎ করে হারিয়ে যেত তাহলে তুমি কী করতে?
পাগলের মতো খোঁজ করতাম। যেখানে যত রিলেটিভ আছে তাদের ফোন করতাম। আপনাকে বারবার বল…
থেমে গেল শিবাঙ্গী। অল্প মাথা ঝাঁকিয়ে সরি, আমি তো পুলিশ নই। আমি… আমার হাজব্যান্ডকে বারবার ইনসিস্ট করতাম মেয়েকে খুঁজে এনে দেওয়ার জন্য। হয়তো নাওয়া-খাওয়া ত্যাগ করতাম। ঘুম তো হতই না। হয়তো নিজেই রাস্তায় নেমে পাগলের মতো খোঁজ করতাম মেয়ের বন্ধুবান্ধব সবার কাছে। কলেজে যেতাম।
তার মানে তুমি রেস্টলেস হয়ে যেতে।
একদম।
আর সেইখানে কস্তুরীদেবী নির্বিকার হয়ে একটা পাথরের মূর্তির দিকে তাকিয়ে বসে আছেন।
সব হাল ছেড়ে দিয়েছেন বলছেন?
অনেকটা সেরকম। উনি অনেক কিছু জানেন। কিন্তু বলছেন না।
বলা বারণও থাকতে পারে।
সেটাই যদি হবে তাহলে আমাদের এখানে ইনভলভ করা কেন?
স্যার আবারও সেই ঘুরেফিরে আমরা একই জায়গায় আসছি।
কোন জায়গায়?
সোমেন সরকার আড়ালে এমন কিছু কাজ করছে যে সেটার দিকে যাতে কারও নজর না পড়ে তাই নিজের মেয়েকেই লুকিয়ে রেখে একটা নাটক সাজাচ্ছেন।
আমাদেরও আড়ালে কাজ চালাতে হবে শিবাঙ্গী। ওদের বাড়ির লোকগুলোর সঙ্গে মোলাকাতটা ভালোভাবে করতে হবে। এদিকে গাড়িটাও বেপাত্তা। কোথাও গাড়ি দুর্ঘটনার খবর নেই। তাহলে মেয়েটা সমেত গাড়িটা গেল কোথায়?
তার থেকেও বড়ো কথা স্যার, গাড়ির কথাটা সোমেন সরকার বেমালুম চেপে গেল।
শুধু তাই-ই নয়। সোমেন বলেছে গত পরশুদিন মানে বুধবার বার্থ ডে-র পার্টি ছিল। এদিকে পার্টি ছিল পরশুর আগের দিন অর্থাৎ মঙ্গলবার।
কথাকলি মিথ্যে বলে অন্য কোথাও গেছে?
তাই যদি হবে তাহলে সোমেনের ভাই ভূপেনও একই কথা বলল কেন? এমনকী ড্রেসটাও একদম ঠিক বলেছে। নীলের ওপর নীল স্ট্রাইপ।
কিন্তু ভগবান দাস পরশু সকালে বাড়িতে কথাকলিকে দেখেছে গাড়ি নিয়ে বেরোতে।
শিবাঙ্গী আর স্বয়ম্ভু নিজেদের মধ্যে কথা চালাচালি করে ঝালিয়ে নিচ্ছে গোটা ব্যাপারটাকে। স্বয়ম্ভু খানিক চুপ থেকে বলল, ভগবান মিথ্যে বলছে? নাকি ভূপেন আর সোমেন? কস্তুরীদেবীও তো বলল পরশুদিন। সেও ঠাকুরের সামনে বসে মিথ্যে কথা বলবে?
.
ঠাকুরপুকুর থানার ওসি অভীক মুখার্জির বয়স পঞ্চাশ ছুই ছুই। জোকার সোনাঝুরি এম্পায়ারের কাছে নেমেই গোটা কমপ্লেক্সটার ওপর একঝলক চোখ বুলিয়ে নিল। গেট কিপারের কাছে ঈশিতার নাম বলতে গেটকিপার জানতে চাইল পদবী কী? বিস্তারিত জেনে পাওয়া গেল ফ্ল্যাট নম্বর। ব্লক সি, থার্ড ফ্লোর। কিন্তু স্যার ওনারা তো নেই। এই বুধবারই তো মিস্টার অ্যান্ড মিসেস ভদ্র তার মেয়েকে নিয়ে চলে গেলেন।
কোথায়?
বললেন তো পাহাড়ে। এক্স্যাক্ট কোথায় জানি না। ভীষণ তাড়ায় ছিলেন। ঠিক করে কথাই বললেন না।
কটার সময় বেরোলেন?
তা ধরুন সকাল সাড়ে দশ কি এগারোটা হবে।
অভীক মুখার্জি কালো মোটা গোঁফের কাছটা একটু চুলকে বললেন, ওনার প্রতিবেশীদের সঙ্গে একটু কথা বলব।
.
বেলটা দুবার টিপে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল স্বয়ম্ভু আর শিবাঙ্গী। দরজা খুলল এক মহিলা। বেশ লম্বা, সুন্দর চেহারা, চুলে লালচে খয়েরি আভা। ডান চোখের পাতার ওপর একটা ছোটো আঁচিল। তাই ডান চোখের পাতাটা পুরোটা খুলতে পারেন না। গায়ে জড়ানো হাউজ কোট। কাকে চাই?
সামায়ন দত্ত আছে?
মহিলাটি অবাক হয়ে প্রশ্ন করল, আপনারা? আইকার্ড দেখিয়ে নিজেদের পরিচয় দিতেই মহিলাটির মুখ শুকিয়ে এল। স্বয়ম্ভু আর শিবাঙ্গীকে ভিতরে ডেকে বসাল। একটু জোরেই ডাকল মহিলাটি, স্যাম, স্যাআআআআম! একটু বাইরে আয়।
আপনি কে হন স্যামের?
স্বয়ম্ভুর প্রশ্ন।
মা।
আপনার একটাই ছেলে?
হ্যাঁ।
.
কানে দুল, চুলের স্পাইকটা অবিন্যস্ত। শুয়ে ছিল বোধহয়। ফরসা। বাঁ-হাতে কালো রঙের বড়োসড়ো ট্যাটু। বার্মুডা আর কালো বর্ডার দেওয়া লাল গেঞ্জি পরে স্যাম এসে দাঁড়াল। প্রাথমিক আলাপ পর্ব সারা হলে স্যাম সামনের একটা সোফায় পায়ের ওপর পা তুলে বসল ঠিক যেমন তার মা বসেছে। বড়োলোকিয়া হাবভাব ঝরে ঝরে পড়ছে।
দেখুন আমি কথাকলির হারিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে সত্যি কিচ্ছু জানি না।
কোনো প্রশ্নের শুরুতেই স্যামের মুখ থেকে এমন উত্তর শুনে স্বয়ম্ভু বলল, আমি তো কোনো প্রশ্ন করিনি তোমায়।
তা করেননি। বাট আপনারা এই সময় এই কারণ ছাড়া আর কেন আসবেন?
বাহ! বেশ স্মার্ট আর বুদ্ধিমান ছেলে তুমি।
থ্যাংক ইউ।
কথাকলির সঙ্গে কতদিনের সম্পর্ক?
এক মিনিট মিস্টার…
স্যামের মা বলে উঠল। স্বয়ম্ভু জবাব দিল, স্বয়ম্ভু সেন।
রাইট। স্বয়ম্ভু সেন। দেখুন কথাকলির সঙ্গে কতদিনের সম্পর্ক বলতে আপনি ঠিক কী বোঝাতে চাইছেন?
তার আগে আপনি আমায় বলুন আমার প্রশ্ন শুনে আপনি কী বুঝলেন?
কথাকলি আর আমি ভীষণ ভালো বন্ধু। দ্যাটস ইট।
স্যামই উত্তর দিল।
সেটাই তো জানতে চাইছি। কত দিনের?
কলেজে এসেই আলাপ।
মানে এই বছর দুই। সেটাও হয়নি এখনও। তাই তো। ইয়াপ।
কথাকলি কীরকম মেয়ে?
স্যাম সঙ্গে সঙ্গে ওর মায়ের দিকে তাকিয়ে গলাটা একটু ঝেড়ে নিয়ে বলল, ভালো। খুবই জয়ফুল। হইহুল্লোড় করতে ভালোবাসে। ড্রাইভ করতে ভালোবাসে।
মহিলাটি এতক্ষণ কটমট চোখে তাকিয়ে ছিল ছেলের দিকে। ছেলের কথার শেষে নীরবে একটা শ্বাস ফেলে মুখটা নামিয়ে নিল। স্বয়ম্ভু যখন কথা বলে শিবাঙ্গীর তখন একটাই কাজ, সবার মুখের ভাবভঙ্গী লক্ষ করা। এই সময় মহিলাটির দিকে তাকিয়ে ফস করে শিবাঙ্গী বলে উঠল, ম্যাডামের কী মত? মেয়েটি কেমন?
স্যাম তো বললই।
আমি আপনার মত জিজ্ঞেস করেছি।
একজন এম.এল.এ-র মেয়ের ক্যারেক্টার সার্টিফিকেট দেওয়ার আমরা কেউ না। প্লিজ এসব থেকে আমাদের রেহাই দিন।
মেয়েটি আপনার ছেলের জন্মদিনের পার্টি থেকেই বেপাত্তা। তাই আপনারা রেহাই কোনোভাবেই পাবেন না।
কড়া গলায় বলল স্বয়ম্ভু। মহিলাটিও ছাড়বার পাত্রী নয়, কী আশ্চর্য! স্যামের বার্থ-ডে পার্টিতে সাড়ে পাঁচশো লোক ইনভাইটেড ছিল। আমরা কি সবার ঠেকা নিয়ে বসে আছি নাকি?
সবাই তো বেপাত্তা হয়নি ম্যাডাম। সেই মেয়েটিই বেপাত্তা হয়েছে যার সঙ্গে আপনার ছেলের জন্মদিনের পার্টিতে আরেকটি মেয়ের প্রচণ্ড অশান্তি হয়। কী নিয়ে ঝগড়া হয়েছিল সেদিন?
মহিলাটির দিক থেকে স্বয়ম্ভুর মুখ ঝট করে ঘুরে স্যামের দিকে চলে যায়।
আ… আমি ঠিক জানি না।
বাহ! তোমার জন্মদিনে তোমাদেরই ইনভাইটেড দুজন গেস্টের মধ্যে সর্বসমক্ষে অশান্তি হল আর তুমিই জানো না? কোথায় ছিলে তখন? ওখানে ছিলে না?
না। প্রবলেমটা বেশ রাতের দিকে হয়। অলমোস্ট সব গেস্টরা একে একে চলে যাচ্ছিল। তাদের এগিয়ে দিতে একটু বাইরে গিয়েছিলাম।
ফিরে কী দেখলে? ঝগড়া চলছে নাকি বন্ধ হয়ে গেছে?
ঈশিতা কথাকে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
তার আগে কিচ্ছু দেখোনি?
আচ্ছা স্যাম তো বলছে ও বাইরে গিয়েছিল।
স্যামের মা বলে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গে শিবাঙ্গী ঝাঁপিয়ে প্রশ্ন করে, আপনি তো পার্টিগ্রাউন্ডেই দাঁড়িয়েছিলেন। আটকাতে গেলেন না কেন?
খানিক আমতা-আমতা করে বলে, নেহাত এম.এল.এ-র মেয়ে তাই, মুখের যা ভাষা শুনছিলাম তাতে কাছে যাওয়ার প্রবৃত্তি হয়নি।
অন্য মেয়েটির মুখের ভাষা ভালো ছিল বলছেন?
স্বয়ম্ভু প্রশ্নটা করতেই মহিলা স্যামকে দাঁত খিঁচিয়ে উঠল, পইপই করে বারণ করেছিলাম এই মেয়েটাকে ইনভাইট করতে। তা নয়, ছেলের বেশি ঢং! কী ভাববে! দ্যাখ এবার। সামলা পুলিশের ঝামেলা।
ওহ মা, চিল। দেখুন স্যার, আমি সত্যিই আর কিছু জানি না। আমরা
একসঙ্গে পড়ি, আমরা নিজেরা একটা ব্যান্ড ফর্ম করেছি। এইটুকুই।
সিসিটিভিতে দেখা গেছে যে সময়টাতে ঝগড়া চলছিল সেই সময় তুমি পার্টিগ্রাউন্ডেই ছিলে মায়ের বাধ্য ছেলেটি হয়ে। তারপর তুমি সমস্যা এড়াতে বাইরে চলে যাও।
স্যামের মাথা নিচু। তাও সেই একই কথার পুনরাবৃত্তি, বললাম তো, গেস্টদের এগোতে গেছিলাম।
কথাকলির কোনো বিশেষ বন্ধু আছে?
ঠিক জানি না, আমরা সবাই একেক সময় একেকজনকে নিয়ে কথাকলিকে বুলিং করি।
যে মেয়েটির সঙ্গে ঝগড়াটা হয়েছিল তার নাম কী?
নামটা জানা সত্ত্বেও আরও একবার মিলিয়ে নিল স্বয়ম্ভু।
মেঘা। মেঘা নন্দী। যাদবপুরে থাকে।
অ্যাড্রেসটা দাও।
নেই। মানে আমি জানি না। কখনও ওর বাড়িতে যাইনি।
.
তড়াক করে দাঁড়িয়ে পড়ল স্বয়ম্ভু। শিবাঙ্গীও সোফা ছাড়ল। বেরোবার আগে বলল, আবার দরকার হতে পারে। এই সময় স্টেশন লিভ করবে না। স্যাম আর তার মা একে অপরের দিকে দৃষ্টি বিনিময় করল।
.
নিচে নেমে মেন গেট দিয়ে বেরোবার আগে থমকে গেল স্বয়ম্ভু। কী মনে হওয়াতে গেটকিপারকে কথাকলির ছবিটা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল চেনে কিনা। ভালো করে দেখে লোকটা জানাল, হ্যাঁ অবশ্যই চিনি। দত্ত স্যারের বান্ধবী। মাঝে মাঝেই আসত।
শেষ কবে এসেছে?
স্বয়ম্ভু জানতে চাইল। গেটকিপার ভেবে বলল, গত সপ্তাতেই। যেদিন এল তার পরের দিন দেখলাম চলে গেল। স্বয়ম্ভু শিবাঙ্গী একে অপরের দিকে কেন তাকাল সেটা ওরা দুজনে ভালোই জানে। শিবাঙ্গী বলল, এই মেয়েটি কি মাঝে মাঝেই এসে থাকত?
হ্যাঁ ম্যাডাম।
স্বয়ম্ভু জিজ্ঞেস করল, মেয়েটি এসে যখন থাকে তখন কি দত্ত ম্যাডাম বাড়িতে থাকেন?
হ্যাঁ থাকেন মনে হয়। মাঝেমধ্যে হয়তো বেরোন। আসলে অতটা খেয়াল করে দেখিনি।
স্বাভাবিক। থ্যাংক ইউ।
লোকটি হেসে বলল, ওয়েলকাম স্যার।
.
হঠাৎই স্বয়ম্ভুর চোখ ওপরের দিকে পড়তে দেখে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়ে আছে সামায়নের মা। গেটের দিকে তাকিয়ে। স্বয়ম্ভুর চোখে চোখ পড়তেই বারান্দার আলোটা নিভিয়ে ঘরে ঢুকে গেল।
.
স্বয়ম্ভুর সঙ্গে সারাদিন টইটই করে বাড়ি ঢুকতেই শরীর ছেড়ে দিয়েছে শিবাঙ্গীর। বাইরের জামাকাপড় পরেই ঘরের বিছানায় উদ্বাহু হয়ে চিৎপটাং। আলোটা ভালো লাগছে না। তাই ডিম লাইটটা জ্বেলে শুয়ে আছে। চড়াৎ করে ঘরের টিউবলাইটটা জ্বলে উঠতেই চোখ-মুখ কুঁচকে বিরক্তি প্রকাশ করল শিবাঙ্গী। ঘরের দোরে দাঁড়িয়ে অপর্ণা বলে উঠল, বাইরের জামাকাপড় না ছেড়ে সেই বিছানায় উঠেছিস?
ওফফফ মাআআ…
মা আবার কি রে? ওঠ। যা হাত মুখ ধুয়ে আয়। আমি ভাত বেছে দিচ্ছি। খেয়ে শুয়ে পড়।
শুয়ে শুয়ে আরও কিছু বিরক্তি উগরে দিল মেয়ে, আজ আবার জ করেছ? কতবার বলেছি রাতে রুটি করবে।
একটার বেশি তো খাবি না। তাই ভাতই খা। চেহারাটা দেখেছিস? কী রে ওঠ।
যাচ্ছি তুমি আলোটা নেভাও আগে।
দেরি করিস না। যা।
আলোটা নিভিয়ে ঘর ছাড়ল শিবাঙ্গী। দুপুরে স্বয়ম্ভু যা খাইয়েছে অ এখনও পেটের চারপাশে ছড়িয়ে রয়েছে। নইলে অন্যদিন এই সময় পেটের ভিতর ছুঁচো-বেজি সব ম্যারাথন জুড়ে দেয়। সত্যি, এমন বস পাওয়া ভাগ্যের কথা। আচ্ছা, সকালে হাজব্যান্ড বলতে গিয়ে যে স্যারের কথাটা শিবাঙ্গীর মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল সেটা কি স্বয়ম্ভু খেয়াল করেছে? ড্যাবড্যাব করে তো মুখের দিকে চেয়েছিল। মনে হয় না শিবাঙ্গীর অন্তরের কথাগুলো শুনতে পেয়েছে! মুখ ফসকে ও একদম ঠিক কথাই বলেছে। যেকোনো বিপদে তো ও সবার আগে স্বয়ম্ভু সেনকেই ডাকবে।
.
পটাং করে ঘরের আলোটা আবার জ্বলে উঠল। এবার একেবারে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে সবে দু-কথা শোনাতে যাবে, অমনি অপর্ণা বলে উঠল, বলতেই ভুলে গেছি। আজ বিকেলে তোর একটা চিঠি এসেছে।
চিঠি?
হ্যাঁ। বিকেলে দরজায় বেল দিয়ে কে যেন এই চিঠিটা দরজার খাঁজে গুঁজে দিয়ে চলে গেছে।
পিয়োন?
না রে। সে হলে তো সই করাত। কে জানে কে?
.
