৯
খেপে উঠল কথাকলি। তুমি কি এখানেও খবরদারি ফলাবে? কস্তুরী কড়া গলায় বলল, ঠিকভাবে কথা বল কলি। রাত বারোটার সময় বাড়ি মাথায় করে তুই টিভি দেখবি? তারপর সকালে উঠতে পারবি না বলে আবার স্কুল কামাই? এ মাসে কতদিন হল খেয়াল আছে তোর?
তাতে তোমার কী? আমি তোমার ব্যাপারে কখনও ইন্টারফেয়ার করেছি? নিজে তো সেদিন মঠ থেকে ফিরলে রাত একটায়। তার বেলা কিছু না? আমি রাত জেগে পার্টি করলেই ঘাড় ধরে টেনে নিয়ে আসবে।
শুধু পার্টি করেছিস? এইটুকু বয়সে সিগারেট খাচ্ছিলি তুই? আমার আড়ালে আরও কত কী খাস তার হিসেব আছে? লজ্জা করে না? কী ভেবেছিস? আমি কিচ্ছু বুঝি না?
.
এবার কথাকলি একটু ইতস্তত বোধ করল। মা, তুমি আমার সব ব্যাপারে নাক গলানো বন্ধ করো।
একশোবার গলাব। তুই সবে নাইনে পড়িস কলি। এর মধ্যেই তুই বেলেল্লাপনা করে বেড়াচ্ছিস!
শোনো মা, ওই ধম্মের নামে তোমার মঠে কী হয় আমার ভালো জানা আছে। ওই সব সাধন সঙ্গী, সাধন সঙ্গিনী কী করে আমি জানি না ভেবেছ? মুখ সামলে কথা বল কলি। যা জানিস না সেটা নিয়ে একদম মন্তব্য করবি না।
করতেও চাই না। আর তুমিও আমার জীবনে ইন্টারফেয়ার কোরো না।
কী হচ্ছে কী এত রাতে?
দোতলা থেকে বাড়ির পুরুষসিংহ হুংকার ছাড়ল। কস্তুরী, তুমি এত রাতেও মেয়েটাকে রেহাই দেবে না?
বাহ বাহ! আমার দোষ হয়ে গেল? তোমার মেয়ে অসভ্যতা করে বেড়াচ্ছে, রাত জেগে টিভি দেখে স্কুল কামাই করছে দিনের পর দিন। সেটা দেখতে পাচ্ছ না? এরপর গার্জেন কল হলে তুমি যাবে তো?
সিঁড়ি দিয়ে মদের গ্লাস হাতে নামতে নামতে সোমেন বলল, হবে না। কথাকলির গার্জেন কল করার সাহস আর কেউ পাবে না।
মানে?
কস্তুরীর ভুরু কুঁচকে গেল। সোমেন বলল, নেক্সট ইলেকশনে আমি দাঁড়াচ্ছি। তারপর জিতলেই এম.এল.এ। মোটা ডোনেশন দেব স্কুলে। তারপরেও কথার নামে নালিশ জানাবার সাহস থাকবে কারও?
রিয়েলি বাবা? তুমি বলোনি তো আমায়।
তুই বাড়ি থাকলে তবে না বলব। কস্তুরী, মেয়েটা অনেকদিন বাড়িতে বসে আছে। ওর পেছনে আর খিটখিট কোরো না। কাজের চাপে বেড়াতে যাওয়ারও সময় পাই না। শোন কলি, এক কাজ কর, নেক্সট উইকেন্ডে তুই তোর বন্ধুদের নিয়ে শর্ট ট্রিপ মেরে আয়। ভালো লাগবে।
মেয়ে নেচে ওঠার আগেই মা বলে উঠল, তুমি বাবা হয়ে মেয়েকে এইভাবে প্রশ্রয় দিচ্ছ তো? দেখে নিয়ো, এই মেয়েই একদিন তোমার সর্বনাশ করে ছাড়বে।
কস্তুরীইইইই…
সোমেনের গলায় ধমকের সুর। কস্তুরী চুপ করে গেল। রাগে ফুঁসতে লাগল। কিন্তু কিচ্ছু বলল না। কথা আহ্লাদি সুরে বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলল, থ্যাংক ইউ বাবা। থ্যাংক ইউ সো মাচ। ভাগ্যিস তুমি ছিলে, নইলে তো আমার জীবনটাই ন্যাতা হয়ে যেত। মায়ের দিকে তাকিয়েই শেষ কথাগুলো বলল কথা। কস্তুরীর চোখ ভারী হয়ে এল।
কিন্তু বাবা এবার আমি ড্রাইভ করব।
নো। একদম নয়। তাহলে যাওয়া ক্যান্সেল।
কেন?
আঠারো বছর হোক। তখন নিশ্চয়ই যাবে। আর নতুন গাড়ি নিয়ে যাবে।
নতুন গাড়ি?
কথাকলি উল্লসিত। মেয়ের গাল ধরে বাপ বলল, তোর আঠারো বছরে একটা গাড়ি দেব। প্রমিস।
কথাকলি দুপাশে হাত ছড়িয়ে এক চক্কর নিজেই ঘুরে নিল, উফফফফ ভগবান। আমায় কালকেই আঠারো করে দাও। প্লিজ প্লিজ প্লিজ। মদের গেলাসে চুমুক দিয়ে বাপ হো-হো করে হাসতে হাসতে বলল, পাগলি একটা। যা ঘুমোতে যা। অনেক রাত হয়েছে।
আর একটাও কথা না বাড়িয়ে কথাকলি রঙিন প্রজাপতির মতো ে উড়তে সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় নিজের ঘরে চলে গেল। মেয়ে চলে যেয়ে সোমেন বলল, বাপ-মা হতে গেলেও টেকনিক লাগে কস্তুরী। বাচ্চা মানুষ করা কি অত সহজ? দেখলে তো কী সুন্দর নিজে থেকেই ঘরে চলে গেল কলি। তুমি তো সেটাই চাইছিলে। কিন্তু পারোনি। ফেইলিওর।
.
এঁটো মদের গ্লাসটা কস্তুরীর গালে ঠেকিয়ে আলতো করে ঠেলে দিল। অ্যালকোহলের গন্ধে নাক সিঁটকোয় কস্তুরী। মেয়ের কাছে প্রতিবার এমনই হেনস্থা জোটে। সোমেন বারবার প্রমাণ করে দেয় কস্তুরী মা হিসেবে কটা খারাপ। সোমেন সিঁড়ি দিয়ে উঠতে শুরু করতেই কস্তুরী বলল, স্বপন নন্দীর করা খবরগুলো এখনও টাটকা। তুমি শিয়োর, জনগণের ভোট পাবে? কস্তুরী সোমেনের ওপর কখনও চ্যাঁচায় না। চূড়ান্ত অপমানে ও চুপচাপ বাণ হানে। এমন বাণ যেটা সরাসরি বুকে পিয়ে বেঁধে সোমেনের। ধূর্ত নেকড়ের হাসি নিয়ে সোমেন বলে, জনগণ এখন ভোট তাদেরই দেয় যারা জনপ্রিয়। প্রতিদিনের খবরের কাগজে, টিভির চ্যানেলে যারা হট কেক। ওসব সততা ফততার ড্যাশ মারা যায়। খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসতে হাসতে সেই রাতে ওপরে উঠে গিয়েছিল সোমেন। কস্তুরী জলভরা চোখে চেয়ে দেখেছিল টলমল পায়ে কীভাবে সোমেন ওপরে উঠে যাচ্ছে। সেদিন থেকে কস্তুরীর বুকে আতঙ্ক চেপে বসেছে, এই বুঝি সব কিছু নিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে যায় সোমেন সরকার।
***
বাড়ির গলিতে ঢুকে এগিয়ে আসতে আসতেই স্বয়ম্ভুর চোখে নিজের বাড়িটাকে কেমন যেন ভৌতিক বলে মনে হল। সন্ধে হতে না হতেই যেখানে তুলসীতলা থেকে ছাদের আলো পর্যন্ত জ্বলে ওঠে সেখানে আজ এক্কেবারে ঘুটঘুটে অন্ধকার। যদিও রাত অনেক হয়েছে। মুহূর্তের জন্য মনের ঈশানকোণে এর আগের কেসের দুর্ঘটনাটা চলকে ওঠে। আততায়ী বাড়িতে ঢুকে মায়ের মাথায় পিতলের ফুলদানির বাড়ি মেরে গলায় মৃত মানুষের পায়ের আঙুলের মালা পরিয়ে দিয়ে গিয়েছিল। হাজার ভোল্টের বৈদ্যুতিক শক খেল স্বয়ম্ভু। শেষ পথটুকু দৌড়ে বাড়ির দরজার সামনে গিয়েই মাকে ডাকতে শুরু করল দরজায় আঘাত করে। সঙ্গে সঙ্গে উত্তর এল ভিতর থেকে, আরে যাচ্ছি রে বাবা যাচ্ছি। নিমেষের মধ্যে দরজাটাও খুলে দিল সুচিত্রা। হলটা কী? পটি পেয়েছে নাকি? অন্ধকার ঘুরঘুট্টির মধ্যে সুচিত্রা যেন কোনো রহস্যময়ী নারী।
সারা বাড়ি অন্ধকার কেন?
সুচিত্রা বাড়ির ভিতর ঢুকতে ঢুকতে বলল, কত করে বলি ভোলা কটা খাতি এনে রাখ। ভাগ্যিস আমার কাছে একখানা ছিল তাই একটু আলো পাচ্ছি।
কারেন্ট তো যায়নি। তাহলে বাড়ি অন্ধকার কেন?
স্বয়ম্ভুর মনের মধ্যে অন্যরকম দুর্ভাবনায় উত্তেজনার পারদ চড়ে আছে।
জানি না। দুদিন ধরেই আলো কাঁপছিল। দুপুরেও দুম করে সব নিভে গেল। ওমা বিকেলে দেখি পুরুষোত্তম এসে হাজির। মাসিমা কেমন আছ? আজই এ চত্বরে আমার লাস্ট দিন। তাই ভাবলাম তোমার সঙ্গে দেখা করে যাই।
.
স্বয়ম্ভুর বুকের ভেতরে কে যেন বড়োসড়ো একটা মুষল ফেলল সজোরে। কেন? সিক্সথ সেন্স? সুচিত্রা বলে চলেছে, আমি ভাবলাম যাক ভালোই হল। ছেলেটাকে দিয়ে মিটারটা চেক করিয়ে নিই। করেও দিল। ওমা! ও চলে যাওয়ার পর আবার যে কে সেই। ও অবিশ্যি বলছিল, মাসিমা আমার হাতে স্পন্ডালাইসিসের ব্যথাটা বেড়েছে। তাই ভালো করে করতে পারলাম না। কাউকে দিয়ে দেখিয়ে নিয়ো।
.
স্বয়ম্ভু মোবাইলের লাইটটা জ্বেলেই তরতর করে সিঁড়ির নিচের মিটার ঘরে চলে গেল। এপাশ-ওপাশ আলো মেরে একটা ফিউজ খুলে আবার চেপে লাগিয়ে দিতেই সারা বাড়ির আলোগুলো পটপট করে জ্বলে উঠল।
বললাম না, ফিউজটা লুজ হয়ে গেছে।
ফুঁ দিয়ে মোমবাতিটা নিভিয়ে দিল সুচিত্রা। স্বয়ম্ভু বলল, সিঁড়ির নিচটার এ-রকম অবস্থা কেন গো?
ওই পুরুষোত্তমের টেস্টার না কী যেন পড়ে গেছিল। সেটাই খুঁজছিল। বেচারির হাতে ব্যথা বলে আমি বললাম ছেড়ে দাও। আমি লোক ডাকিয়ে পরিষ্কার করব।
স্বয়ম্ভু হাত দিয়ে সামনে যা ছিল তাই সরিয়ে সরিয়ে মোটামুটি গুছিয়ে রাখতে শুরু করল।
তুই আবার এখন নোংরা ঘাঁটতে বসলি কেন? ছাড় ওসব। চলে আয়।
সুচিত্রার পায়ে ব্যথাটা এখনও পুরোপুরি সারেনি। শরীরটাকে ডাঁয়ে- বাঁয়ে হেলিয়ে দুটো ধাপ উঠে সিঁড়ির কাছ থেকে ভিতরে চলে গেল সুচিত্রা। কিন্তু স্বয়ম্ভু সিঁড়ির নিচেই থমকে গেল। ধুলো পড়া নাইলনের বস্তাটার পায়ে কী যেন আটকে আছে। একটু ভিতর দিকে। চকচক করে উঠল। হাতে তুলে নিতেই দেখল ইংলিশে এম লেখা একটা লকেট। সোনার। স্বয়ম্ভুর মাথা থেকে পা পর্যন্ত কোনো এক অশনি সংকেত চিচ্চিড় শব্দ তুলে খেলে যায়। স্বয়ম্ভু দৌড়ে ডাইনিংয়ে যায়। সুচিত্রা টেবিল থেকে একটা খাবারের ট্রে তুলে রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছিল।
মা দাঁড়াও।
সুচিত্রা ফিরে তাকাল। স্বয়ম্ভু এগিয়ে গেল। সুচিত্রার হাতে একটা ট্রেতে কাচের প্লেট, তাতে মিষ্টির রস এখনও চটচট করছে। পাশে কাচের গ্লাসের নিচে অবশিষ্ট জল চলকাচ্ছে। এটা কি তোমার পুরুষোত্তমের প্রসাদ?
হ্যাঁ। কেন?
একবার দাও।
বলেই জলের গ্লাসটা মায়ের হাত থেকে নিয়ে টিউব লাইটের আলোর সামনে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখল। বলল, ছেলেটা কি সিঁড়ির ঘরে কাজ করার পর তারপর খেয়েছে?
হ্যাঁ। কেন বল তো?
সিঁড়ির ঘর থেকে এসে হাত ধুতে দেখেছিলে?
একটু মনে করে সুচিত্রা বলল, না। রুমালে মুছে নিল বোধহয়। ভোলা দে তো। অনেক গোয়েন্দাগিরি করেছিস। ট্রেটা সরিয়ে নিয়ে স্বয়ম্ভু বলল, এতে আর তুমি হাত দেবে না।
কেন?
স্বয়ম্ভু উত্তর দিল না। ট্রেটা টেবিলে রাখল। স্বয়ম্ভুর চোখ দুটো লাল হয়ে উঠেছে। মাথার দুপাশের শিরা ফুলে উঠেছে। কতবার বলেছি মা, যাকে তাকে দরজা খুলে দেবে না। বাইরের লোককে পীরিত দেখাবে না।
কেন? হয়েছেটা কী?
পুরুষোত্তম চলে যাওয়ার পর ঘর ঝাঁট দিয়েছ? বা মুছেছ?
না। কেন বলবি তো?
রাত সাড়ে দশটায় একজনের বাড়ি আসাটা একটু বেশিই অসভ্যতা হয়ে গেল। তবু বেলটা বাজাল শিবাঙ্গী। দরজা খুলেই চমকে উঠল রাজারাম। এত রাতে আপনি? আসুন আসুন। শিবাঙ্গী ঢুকতে ঢুকতে বলল, সত্যি খুব অর্ড টাইমে এলাম। ভেরি সরি। ডিনার হয়ে গেছে নিশ্চয়ই।
ধুস। এখন আমার কফি খাওয়ার টাইম। আমি আপনার কথা ভেবেই বলছিলাম।
পুলিশদের রাতকে ভয় পেলে চলে না। তা ছাড়া আজ মারুফ ধরা পড়েছে।
হ্যাঁ দেখলাম নিউজে। ঘরে আসুন।
.
ঘরে গিয়ে হাতের চকচকে প্যাকেটটা রাজারামের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে শিবাঙ্গী বলল, এটা আপনার। পুরোনোটা আমার কাছেই থাক। রাজারাম প্যাকেট খুলে দেখে নতুন একটা ব্র্যান্ডেড শার্ট। আপনি কি পাগল? আমি তো মজা করেছিলাম জাস্ট।
ও মা! আমিও তো মজা করেই দিলাম। হাসিমুখে পরবেন।
.
রাজারাম হাসল। বলল, এভাবে মজা করবেন না। প্রেমে পড়ে যাব কিন্তু। আচমকা এই কথাটা বলাতে শিবাঙ্গী প্রথম চোটে ব্যোমকে গেল। পরক্ষণেই স্বয়ম্ভুর মুখটা মনে পড়তেই হো-হো করে হেসে উঠল। এ কী! আমার প্রেমকে এভাবে হেসে উড়িয়ে দিচ্ছেন? রাজারাম ছদ্ম অভিমান দেখাল। সঙ্গে সঙ্গে শিবাঙ্গী বলল, সে কী, আপনি তো সব মজা করেই বলেন। তাই হাসছি। এবার রাজারামের হাসির পালা। বলল, চা না কফি?
না না থাক। অনেক রাত হল। আমি যাই।
কক্ষনো না। খালি মুখে অতিথি চলে গেলে গেরস্থের অকল্যাণ হয় বাবা!
আপনি এসব মানেন?
মা মানত। কোভিডে চলে গেল। তারপর থেকে মায়ের মানা না মানাগুলো অদ্ভুতভাবে আমার জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে গেল। ভালোই লাগে জানেন। মায়ের মতো কথা বলতে, ভাবতে। মনে হয় মা তো আমার সঙ্গেই আছে।
.
