৭-৮. ভয় দেখাতে গিয়ে ভয়ানক বিপদ

০৭. ভয় দেখাতে গিয়ে ভয়ানক বিপদ

রাতুল আর নবু ঘুমিয়েছিলো অনেক রাতে। কতো যে কথা ওদের, কিছুতেই শেষ হতে চায় না। ঘুম ভাঙতেও দেরি হলো। ওদের গভীর ঘুম দেখে রবি আগেই উঠে নিচে চলে গেছে।

সকালের সূর্যের আলো যখন খোলা জানালা দিয়ে এসে রাতুলের চোখের পাতায় চুমো খেলো, তখন ওর ঘুম ভাঙলো। ঘড়িতে তাকিয়ে দেখে সাড়ে নটা বাজে। হাই তুলে নবুকে ডাকলো, এই নবু উঠবে না! আর কতো ঘুমুবে?

নবু চোখ মেলে তাকালো। রাতুলকে দেখে মৃদু হাসলো–ঘুমোলাম কোথায়! শুয়েছি তো সাড়ে তিনটায়।

এখন সাড়ে নটা বাজে।

তাই নাকি! লাফ দিয়ে উঠে বসলো নবু–মা নির্ঘাত পিঠে খড়ম ভাঙবেন। বলেই শর্টস পরে রোজকার মতো ব্যায়াম শুরু করলো।

রাতুল বিছানায় শুয়ে নবুর ব্যায়াম করা দেখতে দেখতে বললো, নাদুখালা সব সময় ওরকম বলেন।

গুণে গুণে একশটা বুকডন আর পাঁচ শ বার স্কিপিং করে ঘাম ঝরিয়ে নবু ব্যায়াম থামালো। ওর বুকের মাপ চল্লিশ ইঞ্চি, রাতুলের পঁয়ত্রিশ! স্কুলে রাতুল মাঝে মাঝে বাস্কেট বল আর টেবিল টেনিস খেলে। খেলার সময় কোথায় ওর! স্কুল ছুটির পর যতোক্ষণ ওদের লাইব্রেরি থাকে খোলা ততোক্ষণ মুখ গুঁজে বই পড়ে। লাইব্রেরি বন্ধ হওয়ার আগে ওটা শেষ করে নতুন আরেকটা বই ইস্যু করিয়ে বাড়ি ফেরে। একবারে একটার বেশি বই নেয়া যায় না। ওই একটাও দুঘন্টার ভেতর শেষ হয়ে যায়। তারপর রাতুলকে বাধ্য হয়ে পড়ার বই নিয়ে বসতে হয়।

নবু রাতুলের চোখে প্রশংসা দেখতে পেয়ে লজ্জা পেলো–তোমারও ব্যায়াম করা উচিত রাতুল। এই শরীর নিয়ে এতো এ্যাডভেঞ্চার করবে কি করে? কাল রাতে তো কতো কি প্ল্যান করলে!

রাতুল হেসে বললো, রবির চেয়ে অনেক শক্ত আছি। তুমি বরং ওকে গড়েপিটে মানুষ করার চেষ্টা করো।

রবিদের বাড়িতে আসার পর থেকে রোজ দুপুরে এক ঘন্টা পুকুরে সাঁতার কেটে, বিকেলে নৌকা চালানো শিখতে গিয়ে-ব্যায়াম রাতুলেরও কম হচ্ছে না। শরীরের ভেতর শক্তি যে আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে এটা ও নিজেই বুঝতে পারে। নবু বললো, তোমার বডি-স্ট্রাকচার কিন্তু খুব সুন্দর। কয়েকটা ফ্রি হ্যাঁণ্ড শিখিয়ে দেবো তোমাকে, আরো সুন্দর হয়ে যাবে।

রাতুল হাই তুলে বললো, কার জন্য সুন্দর হবো বলো! আমার তো আর পারুল নেই!

দেবো এক থাপ্পড়। এই বকে নবু যেই হাত তুলেছে নিচের তলা থেকে তখনই হস্তদন্ত হয়ে রবি এসে হাজির।

এতোক্ষণে তোদের ঘুম ভাঙলো! নিচে দারোগা এসেছে তদন্ত করতে। মা তোদের নাশতা নিয়ে বসে আছে। শিগগির আয়। উত্তেজিত গলায় কথাগুলো বলে রবি যেভাবে এসেছিলো সেইভাবেই চলে গেলো।

নবু বললো, চুরি গেছে পনেরো দিন আগে, আজ এসেছে তদন্ত করতে। পুলিসের এই অকর্মা লোকগুলোকে দেখলে ইচ্ছে করে ওদের মুণ্ডু দিয়ে ফুটবল খলি।

রাতুল হেসে বললো, তাহলে তোমাকে কয়েক শ বছর আগে ইংল্যাণ্ডে জন্মাতে হতো!

কেন? অবাক হয়ে জানতে চাইলো নবু।

চামড়ার ফুটবল আবিষ্কারের আগে ইংল্যাণ্ডে মড়ার খুলি দিয়ে ফুটবল খেলা হতো। শত্রুদের খুলি দিয়ে ওরা ফুটবল খেলতো।

এ কথা কখনো শুনি নি তো! তুমি জানলে কিভাবে?

বইয়ে পড়েছি। ফুটবল না খেললেও খেলার খোঁজখবর কিছু রাখি। এই বলে রাতুল নবুকে তাড়া লাগালো, নাও উঠো এবার। ক্ষিদে পেয়েছে।

মুখ-হাত ধুয়ে ওরা নিচে নেমে দেখলো, বৈঠকখানায় বসে মোটাসোটা দারোগা নিয়ম মাফিক জেরা করছে। টেবিলে বিস্তর খাবার। আবেদালি বিগলিত হয়ে–এটা খান, ওটা খান করছে। আর দারোগা খেতে খেতে হুঙ্কার ছাড়ছে–বল তুই কোথায় ছিলি?।

দারোগার সামনে দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপছে শুটকো লিকপিকে একটা লোক! নবু বললো, ওটা নাকি ধলাপাগলা। রাতে ওদের নিচের বারান্দায় ঘুমোয়।

নাদুখালা মাথায় কাপড় টেনে একপাশে একটা চেয়ারে বসেছিলেন। এক সময় বিরক্ত হয়ে বললেন, ও পাগল-ছাগল মানুষ, ওর ওপর এতো হম্বিতম্বি কেন বাছা! এ্যাদ্দিন পর এসেছো ভালোমন্দ যা কিছু আছে খেয়ে যাও। গয়না পেতে হলে পপাদ্দার পাড়ায় নজর রাখো।

নাদুখালার কথা দারোগার পছন্দ হলো না–আপনি জানেন না খালা, এরা পাগল সেজে থাকে। আর এ্যাদ্দিন পর বলছেন বুঝি! চৌধুরীদের বাড়িতে ডাকাতি হয়েছে–গত এক মাসে যাবার সময় পেয়েছি! রোজ যদি এলাকায় একটা-দুটো খুন আর চার-পাঁচটা ডাকাতি হয়–কয় জায়গায় হাজিরা দেয়া যায় আপনিই বিবেচনা করুন। এই বলে আবার ধলাপাগলাকে ধমক–বল তুই কোথায় ছিলি?

নাদুখালা উঠে দাঁড়ালেন-আমাকে যদি বিবেচনার ভার দাও তাহলে এমন কথা বলবো বাছা, তোমাদের একটুও পছন্দ হবে না। তাই বিবেচনার কথা আর বলছি না। জেরা-টেরা সেরে দুপুরে খেয়ে যেও। গয়না না পাই, তবু যে এসেছো একি কম ভাগ্য!

দারোগা একগাল হেসে বললো, আপনি খালা মিছেমিছি রাগ করছেন। আমরা আপনাদের বাড়ির ছেলের মতো। যখন বলবেন তখনই খেতে বসবো। তবে চোর আপনাকে ঠিকই ধরে দেবো। এরপর আবার ধলাপাগলাকে–বল তুই কোথায় ছিলি?

রাতুলের হাত ধরে ওকে পেছনের পুকুরঘাটে নিয়ে এলো নবু। বললো, নসু দারোগার বল তুই কোথায় ছিলি–শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা হয়ে গেছে। রবি বসে বসে ওর জেরা শুনুক। আমরা বরং বড়শি দিয়ে মাছ ধরি।

মাছ ধরার ব্যাপারে রাতুলের উৎসাহের অন্ত নেই। দুপুর পর্যন্ত ওরা দুজন মিলে গোটা তিরিশেক বড় বড় ট্যাংরা আর পাবদা ধরলো। নবু আড়াই সেরি একটা শোল মাছও ধরেছে। রবি তখনো বৈঠকখানায় বসে নসু দারোগার জেরা করা দেখছে।

বিকেলে রবিকে নিয়েই নৌকা নিয়ে বেরুতে হলো। আবেদালি আসে নি। ও গেছে এক কাঁদি ডাব আর দুটো কলার ছড়া নিয়ে দারোগার সঙ্গে, লঞ্চে তুলে দেবে বলে।

জেরা করে কিছু বের করতে না পেরে যাওয়ার সময় নসু দারোগা ধলাপাগলাকে কোমরে দড়ি দিয়ে বেঁধে নিয়ে গেছে। ও নাকি খুব ফেরোশাস টাইপের লোক। নাদুখালা অবশ্য পই পই করে বলে দিয়ছেন, যদি শুনি ধলাকে থানায় নিয়ে মারধর করেছো, আমি তোমার নামে কেস করবো।

দারোগা রহস্য হেসে বলেছে, মারধোর করবো কেন! দেখবো শুধু ওর জামিনের জন্য কারা আসে।

নৌকা চালাতে চালাতে নবু বললো, নসু দারোগার তদন্ত করার বহর দেখেছো! দুদিন পর মা আর খালার তাড়া খেয়ে বেনুদাই তো যাবেন ধলাপাগলাকে আনতে।

রবি বললো, আমাদের মসজিদের হুজুর বলেছে, ধলাপাগলা নাকি জ্বীন দেখে পাগল হয়ে গেছে। এখনও নাকি ওর কাছে জ্বীনরা আসে। নসু দারোগা এবার টের পাবে মজাটা।

রবির কথা শুনে রাতুলও মনে মনে হাসলো। রাতে রবিকে যে মজা টের পাওয়ানোর প্ল্যান ওরা করেছে সেটা যদি ও জানতো! রাতুলের মনের খবর জানতে পেরে নবু ওকে চোখ টিপলো। হাসি চেপে রাতুল আকাশের দিকে তাকালো। রবি বললো, কতো বক দেখেছিস!

রাতুল গম্ভীর হয়ে বললো, কে জানে ওগুলো সত্যি সত্যি বক কিনা। জ্বীনরা তো বকের ছবি ধরেও ওভাবে একপায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে!

রবি রাগতে গিয়ে হেসে ফেললো–যখন ঘাড় ঘটকাবে তখন টের পাবি!

রাতে যথারীতি বেনুদাদের আত্মীয়-স্বজনরা এসেছে নতুন বউ দেখার জন্য। গত কদিন ধরে রোজ এরকম হচ্ছে। ওদের ছেলেমেয়েদের চ্যাঁচামেচি, কাজের লোকদের ছুটোছুটি আর হাঁকডাকে বাড়ি জমজমাট। সবাই নিচের তলায় ব্যস্ত। রাতুল এক ফাঁকে রবিকে ডেকে বললো, সকালে মাছ ধরতে গিয়ে আমড়া গাছের তলায় কোথায় যেন আমার স্যাণ্ডেল জোড়া ফেলে এসেছি। চল না ভাই, আমার সঙ্গে খুঁজবি।

রবি ওকে এড়াবার জন্য বললো, নবুকে নিয়ে যা না। বড় কাকার শ্বশুর বাড়ির লোকরা এসেছে। আমাকে ওদের কাছে থাকতে হবে যে!

রাতুল বললো, নবু বিমলদের বাড়ি গেছে। তুই চল না! কতোক্ষণ আর লাগবে!

তাহলে আবেদালিকে ডেকে দি। আসলে রাতে আমি আমড়া তলায় যাবো না। এই বলে রবি গেলো আবেদালিকে ডাকতে।

রাতুল মনে মনে প্রমাদ গুণলো। আবেদালি সঙ্গে থাকলেও রবি যদি না যায় তাহলে তো সব প্রান মাটি! ভাগ্য ভালো রাতুলের! আবেদালিকে অনেক ডাকাডাকি করেও কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না! নাদুখালা বললেন, কদিন ধরে দেখছি গরু তুলে আবেদালি কোথায় যেন আড্ডা মারতে যায়। আসুক আজ, ওর আড্ডা মারা বের করছি।

রাতুল একটু বিরক্ত হয়ে রবিকে বললো, ঘর ভর্তি এতো লোক। তবু তুই ভয়ে সিঁটিয়ে আছিস! এতো যদি ভয় তাহলে আসার সময় আমাকে বারণ করলে পারতি! বেনুদাকে বলে কালই আমি চলে যাবো। থাক তুই তোদের জ্বীনভূত নিয়ে। কাউকে কোথাও যেতে হবে না।

রাতুল একবার রেগে গেলে সহজে যে ওর রাগ ভাঙানো যায় না–রবি খুব ভালো করেই জানে। আমতা আমতা করে বললো, আমি কি তাই বলছি! চল কোথায় যাবি। দাঁড়া, টর্চটা নিয়ে আসি।

বেনুদার ঘর থেকে টর্চ এনে রবি এসে রাতুলের হাত ধরলো–তুই মিছেমিছি রাগ করছিস। চল যাই।

রবিদের বাড়ির খিড়কিপুকুরের কাছেই কয়েকটা আমড়া গাছ ঘন হয়ে বেড়ে উঠেছে। জোরে ডাকলে বাড়ি থেকে শোনা যায়। এটুকু পথ যেতে রবি শক্ত করে রাতুলের হাত আঁকড়ে ধরেছে। মনে মনে বেদম হাসছিলো রাতুল।

নবু আগে থেকেই একটা সাদা লুঙ্গি পরে, সাদা চাঁদরে গা মুড়ি দিয়ে আমড়া তলায় বসেছিলো। রবিই প্রথম দেখলো ওকে। দাঁড়িয়ে পড়ে ফিসফিস করে বললো, ভালো করে দেখ তো, সাদা মতো কি যেন দেখা যাচ্ছে ওখানটায়!

রাতুল ভালো করে দেখার ভান করে বললো, কোথায় সাদা মতো কি দেখছিস? ওখানে কিছুই নেই।

আহ্, ভালো করে দেখ না! ওই গাছ দুটোর আড়ালে।

তোর চোখ খারাপ হয়েছে নাকি! সারাক্ষণ মাথায় ওসব ঘোরে–আমার স্যাণ্ডেল না খোঁজার ফন্দি খাটাচ্ছিস বুঝি! তখন বললেই পারতি! না, এখানে এসে যতো উল্টোপাল্টা কথা!

রাতুলের কথা শুনে রবির ভয় আরো বেড়ে গেলো। ও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে, অথচ রাতুল দেখছে না–তার মানে ওসব না হয়ে যায় না। ওদের যে সবাই দেখতে পায় না এ কথা তো জানাই আছে। রাতুল অবিশ্বাসী বলে ওকে ওরা দেখা দিচ্ছে না। মনে মনে তিনবার কুলহুয়াল্লা পড়ে বুকে তিনবার ফুঁ দিলো রবি। তারপর শুকনো গলায় রাতুলকে বললো, চল তাহলে। ও ধরে নিলো কাছে গেলে বুঝি ওটা বাতাসে মিলিয়ে যাবে।

না, ওটার অদৃশ্য হওয়ার কোনো লক্ষণই দেখা গেলো না। রবির পা দুটো সিসার মতো ভারি মনে হলো। বুকের ভেতর কেউ যেন ধপধপ করে পেঁকি কুটছে। অথচ রাতুল নির্বিকার হেঁটে যাচ্ছে।

নবু আর রাতুল প্ল্যান করেছিলো, রবিকে এনে দেখাবে–কেউ ইচ্ছে করলে সারারাত বাগানের অন্ধকারে একা থাকতে পারে, ভয়ের কিছু নেই। আমাড়া গাছের কাছে এসে রাতুল যেই রবিকে বলতে যাবে–দ্যাখ, কাকে দেখে তুই কি ভাবছিস… তখনই নবু হাঁড়ির ভেতর মুখ নিয়ে খোনা গলায় বললো, এঁলে নাকি তোঁমরা! কঁতদিন মাঁনুষের রঁক্ত খাঁই নাঁ।

নবু যে এমন শয়তানি করবে রাতুর ভাবতেই পারে নি। তাই ও নিজেও চমকে উঠলো। আর রবি সঙ্গে সঙ্গে টর্চ ফেলে দুই হাতে রাতুলকে জড়িয়ে ধরে–ও মা গো! বাবা গো, খেয়ে ফেললো গো! বলে বিকট চিৎকার।

রবির এই চিঙ্কারের পরিণতির কথা ভেবে রাতুল ভয়ে কাঠ হয়ে গেলো। ওকে কোনো কথা বলার সুযোগই পেলো না।

চিকারের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির ভেতর থেকে সবাই হারিকেন হাতে-কী হলো, কী হলো, বলে ছুটে এলো। কারো হাতে লাঠিও। সবাই মিলে হাজারটা প্রশ্ন।

জবাবে রবি শুধু বললো, ভূত! ওর চোখের দৃষ্টি উদ্ভ্রান্ত।

কোথায়?

রবি আমড়া গাছের দিকে আঙুল তুলে দেখালো। সবাই হারিকেন তুলে দেখলো, কোথাও কিছু নেই। রাতুলকে কে যেন প্রশ্ন করলো, ছোড বেআই, তুই দ্যাখছো?

রাতুল ঢোক গিলে মাথা নাড়লো।

হঠাৎ একজন বললো, আমবাগানে দ্যাহো তো, কেডা জানি হাডে?

কোই, কোনহানে? কোরাসে বললো সবাই।

দূরে আমবাগানে দেখা গেলো আবছা সাদা কি যেন একটা হেঁটে যাচ্ছে গোরস্থানের দিকে। একজন বললো, চোর-ডাহাইতে হইতে পারে। লও গিয়া দেহি!

ভিড়ের ভেতর গুঞ্জন উঠলো। কেউ যেতে চায় না। পেছনে যারা ছিলো, তারা গুটি গুটি পায়ে বাড়ির দিকে গেলো। একজন বললো, নইমদ্দি, মোর লগে লও দেহি, কেডা?

নইমুদ্দি চিঁচিঁ করে বললো, মোর কোমরে বাত। সালাইম্মারে লইয়া যাও।

সালাম বললো, ক্যা সালাইম্মা ক্যা? মোর কি জানের ডর নাই?

শেষ পর্যন্ত চারজন সাহসী লোক লাঠি হাতে হারিকেন নিয়ে আমবাগানে ঢুকলো। বাকি সব দাঁড়িয়ে রইল, পুকুরঘাটের পাশে। কিছুক্ষণ পর ওরা ফিরে এসে বললো, সাদা মতো ওটা নাকি রাজবাড়ির দিকে যেতে যেতে হঠাৎ বাতাস মিলিয়ে গেছে।

একথা শুনে কয়েকজন বিড়বিড় করে দোয়া-দরুদ পড়তে লাগলো। সবার সঙ্গে রাতুলকেও ঘরে ফিরতে হলো। নবু আমবাগানে রয়ে গেছে একথা ওর বুকের ভেতর খচমচ করতে লাগলো। রবির ওপর এতো রাগ হলো যে ওর সঙ্গে কথা বলতেই ইচ্ছে হচ্ছিলো না।

রাতে খাওয়ার সময়ও নবু এলো না। রাতুল মনে মনে হিসেব করলো দুঘন্টা পেরিয়ে গেছে। ওকে আর রবিকে খেতে দিয়ে নাদুখালা বললেন, নবু কোথায়?

রবি বললো, বিমলদের বাড়ি গেছে। নাদুখালা বিরক্ত হলেন–তবেই হয়েছে। ও বাড়িতে গেলে ওর আর ফেরার কথা মনে থাকে না। তোমরা খেয়ে-দেয়ে শুয়ে পড়ো গে। রাত অনেক হয়েছে।

খাওয়ার পর রবিকে কিছু না বলেই রাতুল ওর ঘরে চলে এলো। একটা চেয়ার টেনে দক্ষিণের জানালার কাছে বসলো। খিড়কিপুকুরের পশ্চিমে আমবাগান, জানালা থেকে দেখা যায়। নবু নিশ্চয় এতোক্ষণে কোথাও চলে গেছে। রাতুলের রাগ হচ্ছিলো রবির ওপর। এভাবে না চাঁচালেই কি চলতো না? ভয়ে যদি মূৰ্ছা যেতো তাহলেও রক্ষা ছিলো। তা নয়, ষাঁড়ের মতো চাঁচাতে লাগলো! নবু ফিরে আসুক। রবিকে ভালোমতো জব্দ করতে হবে।

কিছুক্ষণ পর রবি এলো। রাতুলের চেহারা দেখে আগেই বুঝেছে, ও যে রাগ করে আছে। ততোক্ষণ খাটের ওপর চুপ করে বসে রইলো। মনে মনে চাইছিলো রাতুল কিছু বলুক। ওকে ওভাবে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে না পেরে বলেই ফেললো, তুই কি সত্যিই ভয় পেয়েছিস? আমি তো তোকে আগেই বলেছিলাম আমড়াতলায় কি যেন বসেছিলো। ওরা যে সত্যি সত্যিই আছে–কথা শুনে নিশ্চয়ই বিশ্বাস করেছিস! শুধু আমরা কেন, অন্য সবাইও তো দেখেছে।

রাতুল ওকে ধমক দিয়ে বললো, বাজে বকিস না তো!

রবি মাথা নিচু করে বসে রইলো। নাদুখালা ওদের জন্য দুধ নিয়ে এলেন। বললেন, তোমরা আর নবুর জন্য রাত জেগে না। বিমলদের বাড়ি গেলে ও অনেক সময় থেকে যায়। যেতে হয় পুরোনো গোরস্থানের পাশ দিয়ে। তাই ওকে বারবার বলে দিয়েছি বিমলদের বাড়ি রাত হয়ে গেলে ওখানে থেকে যাস। তোমরাও তো কি-সব দেখলে। না ফিরে ভালোই করেছে ছেঁড়া। দুধটুকু খেয়ে শুয়ে পড়ো।

টেবিলে রাখা দুধ টেবিলেই পড়ে রইলো। রাতুল ফিরেও তাকালো না। রবি একবার বললো, দুধ খাচ্ছিস না? ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে।

রাতুল ওর কথার জবাব দিলো না। দেয়াল ঘড়িতে বারোটার ঘন্টা বাজলো। নবু এখনো এলো না–এই একটা কথাই সারাক্ষণ ওর মাথার ভেতর ঘুরছে। একবার ওর মনে হলো, নবুর কোনো বিপদ হয় নি তো! জ্বীন ভূতের কথা বাদ দিলেও সাপ-খোপের ভয় তো আছে! যদি ডাকাতের খপ্পরে পড়ে? অন্ধকার গোরস্থানে একা নবুও তো ভয় পেতে পারে? এসব কথা ভাবতে গিয়ে রাতুলের বুকের ভেতরটা শিরশির করতে লাগলো। চোখ জ্বালা করে কান্না এলো। কাল রাতে এই সময় ওরা দুজন বারান্দায় বসে গল্প করছিলো। নবু ওর হাতে হাত রেখে বলছিলো, রাতুল ঢাকা গিয়ে আমাকে ভুলে যাবে না তো? রাতুল জবাব দিয়েছিলো, যতদিন বেঁচে থাকবো, ততদিন তোমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু থাকবো। নবুকে পেয়ে রাতুলের মনে হয়েছে এতোদিন ওর মতো একজন বন্ধুর অপেক্ষায় ছিলো ও। নবুর সঙ্গে পরিচয়ের আগে রবি ছিলো ওর সবচেয়ে কাছের বন্ধু। মাত্র কয়েকদিনের ভেতর রবির কাছ থেকে ও দূরে সরে গেছে। বারবার মনে হচ্ছে আর বুঝি কোনোদিন নবুকে দেখবে না। রাতুল টেরও পেলো না–চোখের পানিতে ওর গাল ভেসে যাচ্ছে।

রবি উঠে এসে কাঁদো কাঁদো গলায় বললো, রাতুল তোর মন খারাপ কেন? কি হয়েছে তোর, আমাকে বলবি না? তোর জন্য আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে।

কান্না সামলে রাতুল বললো, তোকে একটু কথা বলবো। আগে বল কাউকে ঘুণাক্ষরেও বলবি না?

রাতুলের কাঁধে হাত রেখে রবি বললো, তোর গা ছুঁয়ে বলছি, কাউকে কিছু বলবো না। কি হয়েছে বল।

রাতুল আস্তে আস্তে বললো, আমড়াতলায় তুই যাকে ভূত ভেবেছিলি, ওটা ভূত নয়–নবু।

বলিস কি! চমকে উঠলো রবি।

হ্যাঁ রবি।

নবু তাহলে বিমলদের বাড়ি যায় নি?

না।

তোরা দুজন মিলে আমাকে ভয় দেখাতে চেয়েছিলি?

ভয় দেখাতে নয়, তোর ভয় ভাঙাতে চেয়েছিলাম। তুই যে চেঁচিয়ে এমন কাণ্ড বাধাবি কে জানতো!!

আমি কি জানতাম ওটা নবু! আমি তো সত্যি সত্যি ভয় পেয়েছিলাম।

বিরক্ত হয়ে রাতুল বললো, এবার তো ভয় ভেঙেছে। যা, ঘুমোতে যা।

তুই ঘুমোবি না?

আমি পরে ঘুমোবো।

রবি কোনো কথা না বলে বিছানার ওপর থেকে একটা কাঁথা এনে রাতুলের গায়ে জড়িয়ে দিলো। খোলা জানালা দিয়ে হু হু করে কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস ঢুকছে। রাতুলের গায়ে জামার ওপর পাতলা হাতকাটা একটা সুয়েটার মাত্র।

রবি ওর গায়ে কাঁথা জড়িয়ে দেয়ার পর রাতুল টের পেলো এতোক্ষণ খোলা জানালার পাশে বসে থেকে ওর হাত-পা সব ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। এই শীতের ভেতর নবুর গায়ে কোনো সুয়েটার নেই, শুধু একটা খদ্দরের চাদর গায়ে দিয়ে বসেছিলো ও। কথাটা ভাবতে গিয়ে আবার কান্না পেলো রাতুলের।

রবি ওর কাছে একটা চেয়ার টেনে এসে বসলো। কিছুক্ষণ পর সমবেদনা ভরা গলায় বললো, তুই কি নবুর কথা ভাবছিস রাতুল?

রবির মুখের দিকে তাকালো রাতুল। রবিকে আর দূরের মনে হলো না। রবি ঠিকই বুঝতে পেরেছে রাতুল কি ভাবছে।

রবি দেখলো রাতুলের দুচোখে কান্নার দাগ। বললো, এতো ভাবছিস কেন রাতুল! নবু বুদ্ধিমান ছেলে। এতো গণ্ডগোল দেখে ও ইচ্ছে করেই বাড়ি ফেরে নি। ও তো সত্যি সত্যি বিমলদের বাড়ি যেতে পারে।

কথাটা রাতুলেরও মনে হয়েছিলো একবার। মনে মনে ভাবলো, রবির কথাই যেন সত্যি হয়। তারপর আবার মনে হলো, নবু বলেছিলো ফিরে এসে রবিকে বলবে, হানাবাড়ির অতৃপ্ত আত্মা কেমন দেখলি বল! রবিকে নিয়ে রগড় করার এতোবড় একটা সুযোগ কি ও ছেড়ে দেবে? বললো ও বিমলদের বাড়ি যাবে। একথা বলে নি।

হৈচৈ দেখে ঘাবড়ে গেছে নিশ্চয়ই। ধরা পড়লে ওর কি অবস্থা হতো ভেবে দেখেছিস?

হতেও পারে। মনে মনে ভাবলো রাতুল। বললো, সকালের ভেতর নবু না ফিরলে আমি একাই তোদের হানাবাড়ি যাবো ওকে খুঁজতে।

রবি কিছুক্ষণ হাত ধরে বসে রইলো। তারপর শান্ত গলায় বললো, তুই যদি একা যেতে পারিস আমিও তোর সঙ্গে যেতে পারবো।

রবির কথা শুনে রাতুল কিছুটা হালকা বোধ করলো। দেয়াল ঘড়িতে ঢং করে একটা বাজলো। রবি বললো, এবার শুতে চল রাতুল।

.

০৮. বিপদের বেড়াজালে আটকে পড়ছে নবু

আমড়াতলায় রবির মরণ চিৎকার শুনেই নবুর মনে হয়েছিলো মাটির হাঁড়ির ভেতর মুখ ঢুকিয়ে বিকট শব্দে কথা বলাটা একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। আসলে এটা ওদের প্ল্যানের ভেতরও ছিলো না। তবে ঘটনা যা ঘটার ছিলো ঘটে গেছে। এরপর পালানো ছাড়া আর কোনো পথ সামনে খোলা নেই। নবুকে সেই পথই নিতে হলো। রবিকে বলার সময়ও পেলো না, ও যে মিছেমিছি ভয় পেয়েছে।

আমবাগানের ভেতর দিয়ে হেঁটেই যাচ্ছিলো নবু। প্রথমে ভেবেছিলো ওর পেছনে আসার সাহস কারো হবে না। আমবাগান পেরিয়ে পুরোনো গোরস্থানে ঢুকতেই পেছনে দেখলো চার-পাঁচজন লোক ওর দিকে আসছে। আর ঝুঁকি নেয়া ঠিক হবে না ভেবে দৌড় লাগালো নবু।

অনেকখানি জায়গা জুড়ে পুরোনো গোরস্থান। গাছপালা বেশ ফাঁকা ফাঁকা। মানুষ সমান ছনঘাসে ঢাকা। পৌষ মাসের শেষে ছন শুকিয়ে মাটিতে শুয়ে পড়েছে। ভয়ে কেউ কাটতেও আসে না। কোথায় রাস্তা, কোথায় কবর অন্ধকারে কিছু ঠাহর হচ্ছিলো না নবুর।

গোরস্থানের ভেতর দৌড়ে পালাতে গিয়ে হঠাৎ খেয়াল হলো ও কোন দিকে যাচ্ছে? তখনো চাঁদ না উঠলেও পৌষের পরিষ্কার আকাশে ছিলো লক্ষ তারার মেলা। নবু তারার ফ্যাকেসে আলোয় দেখলো ও রাজবাড়ির দিকে দৌড়াচ্ছে। চমকে উঠলো সে। এদিকে তো যাওয়ার কথা নয়। বিমলদের বাড়ির উল্টো দিকে। মনে হলো যেন ও নিজে থেকে যাচ্ছে না, কোনো অদৃশ্য শক্তি ওকে টানছে কয়েক শ বছরের পুরোনো অভিশপ্ত বাড়িটার ধ্বংসস্তূপের দিকে। নবুর মনের ভেতর কে যেন বললো, ওদিকে যেও না। বিপদ আছে।

নবু জানে বিপদে পড়লে সবার আগে মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হয়। প্রথমে থমকে দাঁড়ালো ও। ঠাণ্ডা মাথায় ভাবতে চাইলো, এখন কি করবে। ঠিক তখনই নবু শুনলো, ভেতর থেকে আবার যেন ওকে কেউ বলছে, এখানে দাঁড়াবে না, পালিয়ে যাও।

প্রথমে নবু ঠিক করলো বিমলদের বাড়ির দিকে যাবে। পরে ভাবলো যা হবার হবে ওদের বাড়িতেই ফিরে যাবে। রান্নাঘর দিয়ে ঢুকলে কেউ টেরও পাবে না। একথা ভেবে যেই ডানদিকে ঘুরতে যাবে অমনি চারপাশ থেকে সাদা কুয়াশা এসে ওকে ঘিরে ধরলো। ভীষণ অবাক হলো নবু। এতোক্ষণ আকাশ ছিলো পরিষ্কার। কুয়াশা ছিলো খুবই হালকা। হঠাৎ কুয়াশা এতো ঘন হয়ে গেলো কি করে? শুধু কুয়াশা নয়, যেন ঠাণ্ডা বাতাস বরফের মতো জমাট বেঁধে ওকে চেপে ধরতে চাইছে। মনে হলো ঠাণ্ডায় জমে যাবে ও। কুয়াশা এতো ঘন যে নিজের হাত-পা পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। কুয়াশার সঙ্গে সঙ্গে ওর বুকের ভেতর ভয়ও জমতে লাগলো। এখান থেকে কি কখনো বেরুতে পারবে না? নবু আবার অনুভব করলো সেই অদৃশ্য শক্তি ওকে হানাবাড়ির দিকে টানছে।

না, হতে পারে না। মনের ভেতরে সাহস আনলো নবু। রাতুল ওর জন্য অপেক্ষা করছে। ও ফিরে না গেলে রাতুলের ঘুম হবে না। রবির ভয় ভাঙবে না। এই রাতে একা হানাবাড়িতে ও যাবে না। মনে মনে বললো, আমি তোমাদের ভয় পাই না। এখন আমি বড়ি ফিরে যাবো।

নবু পেছন ফিরে এক পা দুপা করে বাড়ির দিকে এগোতে গিয়ে অনুভব করলো, ওর পা দুটো এত ভারি মনে হচ্ছে যে কোনদিনই বাড়ি ফিরতে পারবে না। নিয়মিত ফুটবল খেলে নবু। একবার মনে হলো বেমক্কা দৌড়াতে গিয়ে মাসল পুল হয়েছে। খেলার সময় মাঝে মাঝে এরকম হয়। ভাবলো আর দৌড়ে কাজ নেই, হেঁটেই যাবে, ঘরে গিয়ে একটু ম্যাসেজ করলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো এটা মাসল পুল নয়। সেরকম হলে ব্যথা লাগতো। ওর পায়ে কোনো ব্যথা নেই। তবে পা দুটো ঠিক নিজের মনে হচ্ছে না। যেন অন্য কারো পায়ের উপর ভর দিয়ে হাঁটছে ও।

বাড়ি ফিরে যেতেই হবে। মনে জোর আনার জন্য দাঁতে দাঁত চেপে বললো নবু। আরো কয়েক পা এগোলো। মাটিতে শোয়া শুকনো ছন আর কাঁটাঝোঁপের জন্য হাঁটতে আরো অসুবিধে হচ্ছে। তখনো কুয়াশার দেয়াল ওকে ঘিরে রেখেছে। পৃথিবীর কোনো শব্দ ওর কানে আসছে না। যেন অন্য কানো গ্রহে এসে পড়েছে ও।

প্রাণপণ শক্তিতে পা দুটোকে টেনে নিয়ে আরো দুপা এগোলো নবু। তৃতীয়বার পা ফেলতে গিয়েই বুঝলো ভুল জায়গায় পা ফেলেছে। কিন্তু কিছুই করার নেই। কলজের ভেতরটা ধক করে উঠলো। পুরোনো কোন ভাঙা কবর হবে বোধ হয়। পা ফেলতেই কে যেন টেনে নিচে নিয়ে গেলো ওকে। সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞান হারালো ও।

যেটাকে পুরোনো কবর ভেবেছিলো ওটা আসলে ছিলো একটা পরিত্যক্ত কুয়ো। পানি বহু আগেই শুকিয়ে গেছে। তলায় শুকনো ঘাস পাতার স্থূপ জমাতে তেমন কোনো আঘাত লাগে নি ওর। কয়েক মিনিটের ভেতর ওর জ্ঞান ফিরলো। হাতের কনুই দুটো ঘষা লেগে ছড়ে গেছে। পড়ার সময় অবচেতন মনে গর্তের পাড় ধরতে গিয়ে এমনটি হয়েছে। কনুইতে চিনচিনে ব্যথা ছাড়া আর কোথাও কোনো ব্যথা নেই। মাথাটা শুধু ঝিমঝিম করছিলো।

কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে হাত-পা নেড়ে দেখলো নবু, সব ঠিক আছে। ওপরে তাকিয়ে দেখলো আঠারো উনিশ হাত গম্ভীর হবে গর্তটা। পড়ে যাওয়ার সময় ঘাস সরে যাওয়াতে গর্তের মুখের এক কোণে একটুখানি কালো আকাশ দেখা যাচ্ছিলো। চারপাশে হাতড়িয়ে দেখলো, গর্তের দেয়ালে ইটের গাঁথনি। বহুদিনের অব্যবহার ফাঁকে ফাঁকে ঝোঁপঝাড় গজিয়ে শুকিয়ে খড় হয়ে গেছে।

হঠাৎ নবুর খেয়াল হলো ওর জামার সাইড পকেটে দেয়াশলাই থাকার কথা। সঙ্গে সঙ্গে পকেটে হাত দিয়ে দেখলো ওটা জায়গা মতোই আছে। বের করে একটা কাঠি জ্বালালো। হিসেব করে খরচ করতে হবে। মাত্র অল্প কটা কাঠি আছে।

দেয়াশলাইর আলোয় চারপাশের কয়েক হাত অন্ধকার কেটে গেলো। হাতে ছ্যাকা না লাগা পর্যন্ত জ্বলন্ত কাঠিটা ধরে রাখলো নবু। আবছা আলোয় দেখলো ওর বাঁ পাশে দেয়ালের গায়ে একটা সুড়ঙ্গের মতো চলে গেছে। কুয়োর মুখের চেয়ে সরু, মাথা নিচু করে ঢুকতে হবে। সুড়ঙ্গের মুখে পা রেখে আরেকটা কাঠি জ্বালালো নবু। সুড়ঙ্গের চারপাশে কুয়োর মতো ইটের গাঁথুনি। সম্মোহিতের মতো অদৃশ্য কোনো শক্তির আকর্ষণে নবু সুড়ঙ্গের ভেতর ঢুকে গেলো।

ভেতরে অন্ধকার নিরেট কালো পাথরের মতো। দেয়াশলাইর তৃতীয় কাঠিটা নিভে যাওয়ার পর নবু ঠিক করলো আর কাঠি খরচ করবে না। সুড়ঙ্গের দেয়ালে এক হাত রেখে আরেক হাত সামনে বাড়িয়ে অন্ধকার ভেদ করে সে এগিয়ে। চললো।

অনেক লম্বা সুড়ঙ্গ। প্রথম দিকে দেয়াল শুকনো ছিলো। মিনিট দশেক পর হাতে ভেজা ভেজা লাগলো। নবুর মনে হলো আস্তে আস্তে যেন ওপরের দিকে যাচ্ছে। আরো কিছুদূর যাওয়ার পর দেয়াল শেষ হলো। নবু চতুর্থবার দেয়াশলাই জ্বালালো। দেখলো, বাঁ দিকে সুড়ঙ্গের একটা শাখা চলে গেছে। সামনের অংশ আস্তে আস্তে ওপরের দিকে উঠে গেছে। নবু বাঁ দিকে ঘুরলো। দেখলো এই অংশটা বেশ পরিষ্কার। আলো নিভে যাওয়ার পর আবার আগের মতো ঘোরের ভেতর সামনে এগিয়ে গেলো। তখন ওর নিজের বাড়ি-ঘর, রাতুল, রবি কারো কথাই মনে নেই। অদৃশ্য থেকে কে যেন নিঃশব্দে ওকে ডাকছে আয় আয় বলে।

আরো মিনিট দশেক হাঁটার পর একটা পচা গন্ধ ওর নাকে এসে লাগলো। প্রথমে কম ছিলো, যতো সামনে এগোলো, গন্ধটা ততো বাড়তে লাগলো। শেষে এমন হলো যে দুর্গন্ধে দম বন্ধ হয়ে আসতে চাইলো। নাকে চাদর চেপে কিছুটা পথ যাওয়ার পর আবার সুড়ঙ্গের দেয়াল শেষ হলো। নিঃশ্বাস বন্ধ করে নবু দেয়াশলাই কাঠি জ্বালালো। বাঁ পাশে দেখলো একটা কুয়োর মতো, হাত দশেক ওপরে খোলা মুখ দিয়ে নক্ষত্রের আবছা আলো ভরা আকাশ দেখা যাচ্ছে। কুয়োর তলায় নজর পড়তেই নবুর হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গেলো। সে এক বীভৎস। দৃশ্য। দেয়াশলাইর কাঠিটা ওর অজান্তেই হাত থেকে পড়ে গেলো।

যতোটুকু দেখার এরই ভেতরে নবুর দেখা হয়ে গেছে। পাঁচ-ছহাত নিচে কুয়োর তলায় কয়েকটা মানুষের কঙ্কাল। দুটোর গায়ে এখনো এখনে–সেখানে। মাংস লেগে আছে। কয়েকটা ছুঁচো আলোর আভাস পেয়ে চিকচিক করে ছুটোছুটি করতে লাগলো। আবার দেয়াশলাই জ্বালালো নবু। না, চেনার কোনো উপায় নেই। একটাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলা হয়েছিলো। দেখে মনে হয় পাঁচ-ছমাস আগের ফেলা। সামনে তাকিয়ে দেখলো সুড়ঙ্গটা ডান দিকে মোড় নিয়েছে।

নিজেকে আর সামলে রাখতে পারলো না। সেখানে বসেই হড়হড় করে বমি করে ফেললো নবু। তারপর নাক চেপে টলতে টলতে সামনের দিকে এগিয়ে গেলো। দুর্গন্ধটা আস্তে আস্তে কমে এলেও নবুর মনে হলো নাকের ওপর থেকে চাদর সরালেই বুঝি ওটা ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে।

আচ্ছন্নের মতো আরো কিছুটা পথ যাওয়ার পর নবু হঠাৎ চমকে উঠলো। দূরে সুড়ঙ্গের দেয়ালে একা জ্বলন্ত হারিকেন ঝোলানো। সঙ্গে সঙ্গে থমকে দাঁড়ালো সে।

হারিকেন যেখানে ঝোলানো সেখানে সুড়ঙ্গটা দুটো শাখায় ভাগ হয়ে গেছে। ঝোলানো হারিকেনের একটাই অর্থ–কাছাকাছি মানুষ আছে। আর তারা যে খারাপ মানুষ, এটা বলার অপেক্ষা রাখে না।

কারা থাকে এখানে? মনে মনে প্রশ্ন করলো নবু। উত্তর পাওয়ার জন্য আস্তে আস্তে সামনে এগিয়ে গেলো। হারিকেনের কাছে এসে দেখলো বাঁ দিকের সুড়ঙ্গ অন্ধকার, ডান দিকে পনেরো হাত দূরে আরেকটা হারিকেন জ্বলছে। এবার কোন দিকে যাবে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ভাবলো নবু। ওর নিজের উপস্থিতি ওদের টের পেতে দেবে না। তবে এখান থেকে বেরুবার আগে জানতে হবে এরা কারা! নবু মাথার ওপর ঝোলানো হারিকেনটা আস্তে নিভিয়ে দিলো। দূরের অন্ধকার থেকে কেউ ওকে দেখে ফেলতে পারে। এতোক্ষণ যেরকম ঘোরের ভেতর ছিলো সেটা কেটে গেছে ওর। উত্তেজনায় বুকটা ঢিবঢিব করছে। পা টিপে টিপে ডান দিকের সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়ে সামনে এগিয়ে গেলো নবু।

হারিকেন ওপরে ঝোলানো থাকায় ওটার তলায় অন্ধকার ছিলো। আলোর কাছাকাছি এসে নবু মাথা নিচু করে হাঁটলো যেন ওর গায়ে আলো না পড়ে। দ্বিতীয় হারিকেনের তলায় এসে সেটাও নিভিয়ে ফেললো।

এরপর সুড়ঙ্গ আবার ডান দিকে বাঁক নিয়েছে। তবে এখন আর ওটাকে সুড়ঙ্গ বলা যাবে না। দুপাশে দেয়াল, ওপরে ছাদ। দেয়ালের আস্তর খসে ইট বেরিয়ে পড়লেও সেখানে ঝোঁপঝাড় গজায় নি। নিয়মিত লোকজন চলাফেরা করলে যা হয়।

কিছুদূর যেতেই মানুষের গলা শোনা গেলো। নিঃশব্দে সেদিকে এগিয়ে গেলো নবু। বাঁ পাশে একটা ঘরের ভেতর থেকে কথা আসছে, ঘরে দরজা ভেজানো। ফাঁক দিয়ে ভেতরের কিছুটা অংশ দেখা যাচ্ছে। বেশ বড় ঘর । চার-পাঁচজন লোক বসে আছে হারিকেনের চারপাশে। পরনের কাপড়-চোপড় দেখে মনে হয় কামলা-টামলা হবে। এ গাঁয়ের বা আশেপাশের কেউ নয়। কাছাকাছি দুচার গাঁয়ের সব মানুষকে নবু চেনে।

একজন বললো, যাই কও ব্যাডা, পনেরো টাহায় পোষায় না। চাইলের স্যার পাঁচ টাহা, ছয় টাহা–।

আরেকজন বললো, দুবলার চরের হ্যারাই ভাল আছে। দশখান হরিণ মারলে কয় নয়খান মারছি। একখান নিজেগো মইদ্যে ভাগ কইরা লয়।

খালি হরিণ কও ক্যা। আরেকজন বললো, গত বছর বাঘ মারছেলে ছয়হান, হ্যারা কইছে পাঁচহান। একহান বাঘের চামড়া জায়গামতো বেচতে পারলে দশ হাজার টাহা।

প্রথমজন বিরক্ত হয়ে বললো, মোগগা আর কততখন বআইয়া রাখপে! অ ভাইডি দ্যাহ না, বর মেঞায় কয় কি?

যাকে উদ্দেশ্য করে কথাটা বলা হলো সে খেঁকিয়ে উঠলো, ক্যা, মোরে যাইতে কও ক্যা? গাইলমন্দ ব্যাবাক মুই এ্যাল্লা খামু? হাউশ হয় নিজে যাও।

পেছনের দরজা দিয়ে ভারিক্কি চেহারার একজন ঢুকে ধমকের গলায় বললো, এ্যাতো চিল্লাচিল্লি কিয়ের হুনি? ক্যাঠায় চিল্লায়?

প্রথমজন কাচুমাচু করে বললো, না ছোডমেঞা, রোস্তইম্যায় কয়, কামে কহন যাওন লাগবে–আবার না দেরি ওইয়া যায়–

যেসুম কমু হেসুম যাবি। চিল্লাবি না। কাকায় চিল্লানি হুনলে তগোরে দিয়া কুমির খিলাইবো। জানস না কাকার হাটের বিমারি আছে?

যে জোরে কথা বলছিলো সে মিনমিন করে বললো, মুই তো হেইয়াই কইতে গেছি–

খামুস মাইরা বইয়া থাক। এই বলে সর্দার গোছের লোকটা চলে গেলো।

নবু বুঝতে পারলো এটা ছোট সর্দার। ওর ওপরও কাকা নামের একজন আছে। ওদের কাজটা কি শুধু লুকিয়ে সুন্দরবনের বাঘ হরিণ মারা? নাকি অন্য কিছু? এ প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে কাকার কথাবার্তা শোনা দরকার। কিন্তু কিভাবে যাবে সেখানে?

এ নিয়ে নবুকে বেশিক্ষণ ভাবতে হলো না। চুপিসারে দুজন মুষকো জোয়ান কখন ওর পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে–ঘুণাক্ষরেও টের পায় নি। লোহার মতো শক্ত দুটো হাত যখন নবুর দুহাত চেপে ধরলো তখন চমকে উঠে ঝটকা মেরে ছাড়াতে গিয়েছিলো, কিন্তু ওর মতো শক্তিশালী ছেলেও লোক দুটোকে একচুল নড়াতে পারলো না। একজন বললো, আবে রোস্তইম্যা, হেরিকেনটা আন তো। চিড়িয়া ধরচি।

গলা শুনে নবু বুঝলো একটু আগে এই লোকই ঘরে ওদের ধমকাচ্ছিলো।

রোস্তম হারিকেন হাতে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো। উঁচু করে ধরলো নবুর মুখের ওপর। অবাক হয়ে বললো, অ ছোড কত্তা, এইডা কেডা?

নবু মনে মনে ঠিক করে ফেললো, ওর পরিচয় এদের জানানো যাবে না। ছোট সর্দার মালায়েম গলায় বললো অই তুই ক্যাঠা। এহানে আইছস কেমতে!

নবু হাউমাউ করে বললো, মুই কিছু জানি না কত্তা। মোরে ছাইড়া দ্যান। কাম না পাইয়া দুইদিন উপাস দিছি। গিরস্তের বাড়িতে ভাত চাইতে গিয়া খ্যাদান খাইছি। এক ব্যাড়ায় তো মোরে রাইতে বাড়ির কাছে গুরতে দেইখা চোর মনে কইরা কইছে–মোরে থানায় দেবে। মুই পলাইতে যাইয়া গাতায় পড়ছি। মোরে ছাইড়া দ্যান। মুই আর এই গ্যারামে আহুম না।

তুই চুরি করনের লাইগা বাইর ওইছিলি? জানতে চাইলো ছোট সর্দার।

মুই চোর না কত্তা। মুই হালুডি করি। পেন্দনের কাপড় ছেলে না, হেই পানে মুই গিরস্ত গো বাড়ি গনে তপনহান আর চাঁদইরহান নেছেলাম। মোরে থানায় দিয়েন না কত্তা। বাড়িতে ছোড বাই-বইনগুলা না খাইয়া মরবে হেনে।

ছোট সর্দার কয়েক মূহুর্ত কি যেন ভাবলো। তারপর বললো, তুই বাঘের গরে হান্দাইছস। বাইর অন মুসকিল ওইবো। আমগো ওস্তাদে আহুক। কি কয় হুনি। ছাড়তে কইলে ছাড়া পাবি। নাইলে কুমিররে খিলামু। তয় তোরে থানায় দিবো না এইডা কইবার পারি। এরপর রোস্তমকে বললো, যা পোলারে লাইলনের দড়ি দিয়া হাত-পা বাইন্ধা রাখ। গায়ে তাগদ আছে কইলাম। তুই বইয়া পাহারা দিবি। পালাইলে অর বদলে তরে কুমিরের খাড়ির ভিতরে ফালামু।

ভেতর থেকে একগোছা মোটা নাইলনের দড়ি এনে নবুকে দুজনে ধরে হাত দুটো পিছমোড়া করে বাঁধলো। ঘরের ভেতর নিয়ে একটা তক্তপোষের ওপর বসিয়ে পা দুটোও বাঁধলো।

নবু একবার বললো, মোরে এটু পানি দেন ভাইডি।

একজন ছোট সর্দারের দিকে তাকালো। ইশারায় সম্মতি পেয়ে পাশের ঘর থেকে মাটির সানকিতে পানি এনে ওর মুখের কাছে ধরলো। সবটুকু পানি সে এক নিঃশ্বাসে খেয়ে ফেললো। ওভাবে পানি খেতে দেখে ছোট সর্দারের প্রাণে বুঝি মায়া হলো। বললো, ছ্যারারে একখান রুটি আইনা দে। দড়ি খুলনের কাম নাই, ধইরা খিলাইয়া দে। আমি গিয়া কাকারে খবর কই!

ছোট সর্দার বেরিয়ে যাওয়ার পর তার সঙ্গী অন্যদের বললো, ওরা কিভাবে নবুকে ধরেছে। হেরিকেন নিভাইনা দেইখা আমার সন্দ ওইছিলো। আইয়া ছোট সদ্দাররে কইলাম। ছোট সদ্দার তহন এই গরের থেইকা বাইর ওইয়া উপরে ম্যালা করছিলো। আমার কতা হুইনা নাইমা আইলো। দেহি দরজার ফাঁক দিয়া ছ্যামরায় ফুক্তি মারতাছে। এই বলে হা হা করে হেসে নবুর দিকে তাকালো।

একজন দুটো রুটি এনে নবুকে খাওয়ালো। খেতে খেতে নবু বললো, মেঞা বাই, মোরে আপনে গো এইহানে একখান কাম দ্যান। যা কইবেন হেয়াই করুম।

লোকটা বললো, হেয়া মুই কই ক্যামনে? যারা মোগো কাম দিছে হ্যাঁগো কও। হ্যাঁগো মনে ধরলে দেবেনে।

নবুর খাওয়া শেষ হওয়ার পর একজন এসে বললো, রোস্তইম্যা বাদে ব্যাবাকটিরে ছোড কত্তায় ডাহে।

সবাই উঠে চলে গেলো। রোস্তম বিড়বিড় করে বললো, যতো ভোগান্তি দুনিয়ায় আছে ব্যাবাকই রোস্তইম্যার ভাইগ্যে ল্যাহ আছিলে?

নবু মনে মনে ভাবলো, যেভাবেই হোক এখান থেকে পালাতে হবে। মানুষ খুন করা এদের জন্য কোনো ব্যাপারই নয়। সুড়ঙ্গের পাশে কুয়োর ভেতর যে মানুষের পচা লাশ আর কঙ্কাল দেখেছে সে সব যে এদের কাজ এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। অনেকক্ষণ পর বাড়ির কথা মনে হলো। বাড়ি থেকে বেরিয়েছে খুব বেশি হলে ঘন্টা তিনেক হবে। অথচ ওর মনে হচ্ছে কতদিন কেটে গেছে। রাতুল, রবি কি করছে? রাতুল যদি কিছু না বলে সবাই ধরে নেবে সে বিমলদের বাড়িতে থেকে গেছে। রাতুলকে বলেছিলো খোঁজ করলে তাই বলতে। ও এখন কি করছে?

একবার ভাবলো, যদি কখনো এখান থেকে বেরুতে না পারে! রাতুল কি করে জানবে ও কোথায়? পারুলের কথা মনে পড়লো। গতবার যখন ওদের বাড়ি গিয়েছিলো, পারুল বলেছিলো, ওর জন্য পাকা কুল নিয়ে যেতে। বেনুদা ঢাকা থেকে দুটো নারকেলি কুলের গাছ এনে লাগিয়েছিলো। সারা গাছ ছেয়ে আছে কাঁচা-পাকা কুলে। আমবাগানের কাছে বলে কেউ পাড়তে যায় না। মাঝে মাঝে নবুই পেড়ে এনে দেয় সবাইকে।

নবু কি কুল নিয়ে কোনদিন পারুলদের বাড়ি যেতে পারবে? সাতদিনে একবার অন্তত নবুকে দেখা চাই ওর। নইলে গাল ফুলিয়ে কথা বলা বন্ধ করে দেয়। আর তিনদিন পরই তো ওরা আসবে রবিদের বাড়িতে দাওয়াত খেতে। বরিশাল থেকে রবির কাকারা আসবে। ওদের ছেলেমেয়েরা নাটক করবে। শুধু নবু থাকবে না ওদের সবার ভেতর। অন্য কেউ ওর অভাব না বুঝলেও পারুল আর রাতুলের নিশ্চয়ই মন খারাপ করবে। ওরা তখন কি করবে? এসব কথা ভাবতে গিয়ে নবুর বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠলো।

রোস্তম আড়চোখে নবুকে দেখে একটা বিড়ি ধরালো। অর্ধেক টেনে নবুকে বললো, খাবা?

নবু মাথা নেড়ে সায় জানালো। কোনোভাবে যদি লোকটার সঙ্গে খাতির করা যায়। নবুর শরীর বলিষ্ঠ হলেও ওর চোখের ভেতর এমন একটা নরোম ভাব আছে দেখলে মায়া লাগে। নবুকে দেখে রোস্তমের নিজের ছেলের কথা মনে হলো। তিন বছর আগে বাওয়ালিদের সঙ্গে সুন্দরবন গিয়ে বাঘের পেটে গেছে। বেঁচে থাকলে এই ছেলেটার মতো হতো। নিজের অর্ধেক খাওয়া বিড়িটা ও নবুর ঠোঁটের ফাঁকে খুঁজে দিলো।

লোকটার আন্তরিকতা নবুর মন স্পর্শ করলো। ভাব জমানোর জন্য বললো, চাচা এইডা কোন জায়গা?

এই গ্যারামের নাম তুষখালি। মোরা এহন আছি রাজবাড়ির মাডির নিচের কোডায়।

নবু ভয় পাওয়া গলায় বললো, হেইয়া কও কি চাচা! মুই হুনছি রাজবাড়িতে জ্বীন থাহে।

রোস্তম শুকনো গলায় বললো, জ্বীন থাহে গোরস্থানে। মুই দেখছি।

তোমাগো ভর করে না?

ডর করলে কি প্যাডে মানবে? প্যাডের জ্বালায় কত আকাম-কুকাম করতে অয়! মোর পোলাডারে বাঘে ধইরা নেছে। বাড়িতে আট-দশটা মানুষ। হ্যাঁগো খাওয়াইতে ওইবে না?

একটু ইতস্তত করে নবু বললো, চাচা, তোমরা কি মোরে মাইরা হালাইবা?

মুই ক্যামনে কমু বাপ! মোরে যা হুকুম পাড়ে মুই হেয়া করি। হ্যাঁগো কতা যদি কেউ না হোনে কাইট্টা গাঙ্গে ভাসাইয়া দ্যায়। কুমিরের ঘেরের ভিতরে ফেলাইয়া দ্যায়। তোমারে কি হরবে হেইয়া কি মুই কইতে ফারি!

কাঁদো কাঁদো গলায় নবু বললো, চাচা মুই মইরা গেলে মোর ছোড বাইবইনগুলা না খাইয়া মইরবে। মোর মা পাগল ওইয়া যাইবে। মুই তো হ্যাঁগো কোনো ক্ষেতি করি নাই। মোরে মারবে ক্যা?

নবুর কথা শুনে রোস্তমের মায়া হলো। কিন্তু ওর কিছুই করার নেই। ওর পাহারা থেকে যদি ছেলেটা পালায় তাহলে ওকেই মেরে ফেলবে। ছোট সর্দার অযথা হুমকি দেয়ার লোক নয়। বললো, মোর কিছুই হরনের নাই। যা কওনের হ্যাঁগো ধারে কইও। এ্যাহন আল্লারে ডাহ। আল্লা ছাড়া তোমারে কেউ বাঁচাইতে পারবে না। এই বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো–আল্লা মাবুদ রহম কর।

আল্লাকে ডাকতে নবুর আপত্তি নেই। তবে এটাও জানে আল্লা আকাশ থেকে নেমে এসে ওর দড়ি খুলে দেবে না। একবার রাগ হলো জ্বীনদের ওপর। জ্বীনরা যে কেন রাজবাড়ি ফেলে গোরস্থানে আড্ডা দিচ্ছে! ওরা যদি রাজবাড়িতে থাকতো তাহলে এভাবে গুণ্ডা-বদমাশদের হাতে পড়ে ওকে বেঘোরে প্রাণটা খোয়াতে হতো না। মনে মনে ভাবলো, রাতুল যদি বুদ্ধি করে বেনুদাকে বলে তাহলে হয়তো দিনের বেলা লোকজন নিয়ে বেনুদা খুঁজতে বেরুবে। কিন্তু ততক্ষণ ওকে কি বাঁচিয়ে রাখবে।